আল কুরআন


সূরা আল-আহযাব (আয়াত: 4)

সূরা আল-আহযাব (আয়াত: 4)



হরকত ছাড়া:

ما جعل الله لرجل من قلبين في جوفه وما جعل أزواجكم اللائي تظاهرون منهن أمهاتكم وما جعل أدعياءكم أبناءكم ذلكم قولكم بأفواهكم والله يقول الحق وهو يهدي السبيل ﴿٤﴾




হরকত সহ:

مَا جَعَلَ اللّٰهُ لِرَجُلٍ مِّنْ قَلْبَیْنِ فِیْ جَوْفِهٖ ۚ وَ مَا جَعَلَ اَزْوَاجَکُمُ الّٰٓیِٴْ تُظٰهِرُوْنَ مِنْهُنَّ اُمَّهٰتِکُمْ ۚ وَ مَا جَعَلَ اَدْعِیَآءَکُمْ اَبْنَآءَکُمْ ؕ ذٰلِکُمْ قَوْلُکُمْ بِاَفْوَاهِکُمْ ؕ وَ اللّٰهُ یَقُوْلُ الْحَقَّ وَ هُوَ یَهْدِی السَّبِیْلَ ﴿۴﴾




উচ্চারণ: মা-জা‘আলাল্লা-হু লিরাজুলিম মিন কালবাইনি ফী জাওফিহী ওয়ামা-জা‘আলা আযওয়াজাকুমুল লাঈ তুজা-হিরূনা মিনহুন্না উম্মাহা-তিকুম ওয়ামা-জা‘আলা আদ‘ইয়াআকুম আবনাআকুম যা-লিকুম কাওলুকুম বিআফওয়া-হিকুম ওয়াল্লাহু ইয়াকূলুল হাক্কা ওয়াহুওয়া ইয়াহদিছছাবীল।




আল বায়ান: আল্লাহ কোন মানুষের অভ্যন্তরে দু’টি হৃদয় সৃষ্টি করেননি। তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে যাদের সাথে তোমরা যিহার* কর, তিনি তাদেরকে তোমাদের জননী করেননি। আর তিনি তোমাদের পোষ্যদেরকে তোমাদের পুত্র করেননি। এগুলো তোমাদের মুখের কথা। আর আল্লাহই সত্য কথা বলেন। আর তিনিই সঠিক পথ দেখান।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৪. আল্লাহ কোন মানুষের জন্য তার অভ্যন্তরে দুটি হৃদয় সৃষ্টি করেননি। আর তোমাদের স্ত্রীগণ, যাদের সাথে তোমরা যিহার করে থাক, তিনি তাদেরকে তোমাদের জননী করেননি(১) এবং তোমাদের পোষ্য পুত্রদেরকে তিনি তোমাদের পুত্র করেননি(২); এগুলো তোমাদের মুখের কথা। আর আল্লাহ সত্য কথাই বলেন এবং তিনিই সরল পথ নির্দেশ করেন।




তাইসীরুল ক্বুরআন: আল্লাহ কোন মানুষের বুকে দু’টি অন্তর সৃষ্টি করেননি। তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে যাদের সঙ্গে তোমরা জিহার কর, তিনি তাদেরকে তোমাদের জননী করেননি, আর তিনি তোমাদের পোষ্য পুত্রদেরকে তোমাদের পুত্র করেননি, এগুলো তোমাদের মুখের বুলি, আল্লাহই বলেন সত্য কথা, আর তিনিই দেখান (সঠিক) পথ।




আহসানুল বায়ান: (৪) আল্লাহ কোন মানুষের অভ্যন্তরে দু’টি হৃদয় সৃষ্টি করেননি;[1] তোমাদের স্ত্রীগণ যাদের সাথে তোমরা ‘যিহার’ করেছ তাদেরকে তোমাদের মা করেননি[2] এবং পোষ্যপুত্র -- যাদেরকে তোমরা পুত্র বল, আল্লাহ তাদেরকে তোমাদের পুত্র করেননি।[3] এগুলি তোমাদের মুখের কথা।[4] আল্লাহই সত্য কথা বলেন[5] এবং তিনিই পথনির্দেশ করেন।



মুজিবুর রহমান: আল্লাহ কোন মানুষের অভ্যন্তরে দু’টি হৃদয় সৃষ্টি করেননি; তোমাদের স্ত্রীরা, যাদের সাথে তোমরা যিহার করে থাক, তাদেরকে আল্লাহ তোমাদের জননী করেননি এবং তোমাদের পোষ্যপুত্রকে তিনি (আল্লাহ) তোমাদের প্রকৃত পুত্র করেননি; ঐগুলি তোমাদের মুখের কথা। আল্লাহ সত্য কথাই বলেন এবং তিনিই সরল পথ নির্দেশ করেন।



ফযলুর রহমান: আল্লাহ কোন মানুষের জন্য তার ভিতরে দুঞ্চটি হৃৎপিণ্ড বানাননি; তোমরা তোমাদের যে স্ত্রীদের সাথে যিহার করো (যিহার হল: স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য তাকে বলা, “তুমি আমার কাছে আমার মায়ের পিঠের মত নিষিদ্ধ”) তাদেরকে তোমাদের মা করে দেননি এবং তোমাদের পোষ্যপুত্রদেরকে তোমাদের পুত্র করে দেননি। এগুলো হচ্ছে তোমাদের মুখের (ফালতু) কথা। আল্লাহ যথার্থ কথা বলেন এবং তিনি সঠিক পথ দেখান।



মুহিউদ্দিন খান: আল্লাহ কোন মানুষের মধ্যে দুটি হৃদয় স্থাপন করেননি। তোমাদের স্ত্রীগণ যাদের সাথে তোমরা যিহার কর, তাদেরকে তোমাদের জননী করেননি এবং তোমাদের পোষ্যপুত্রদেরকে তোমাদের পুত্র করেননি। এগুলো তোমাদের মুখের কথা মাত্র। আল্লাহ ন্যায় কথা বলেন এবং পথ প্রদর্শন করেন।



জহুরুল হক: আল্লাহ্ কোনো মানুষের জন্য তার ধড়ের মধ্যে দুটি হৃদয় বানান নি, আর তোমাদের স্ত্রীদেরও যাদের থেকে তোমরা 'যিহার’ ক’রে ফিরে গেছ তাদের তিনি তোমাদের মা বানান নি, আর তোমাদের পোষ্য-সন্তানদেরও তোমাদের সন্তান বানান নি। এ-সব হচ্ছে তোমাদের মুখ দিয়ে তোমাদের কথা। আর আল্লাহ্‌ই সত্যকথা বলেন, আর তিনিই পথে পরিচালিত করেন।



Sahih International: Allah has not made for a man two hearts in his interior. And He has not made your wives whom you declare unlawful your mothers. And he has not made your adopted sons your [true] sons. That is [merely] your saying by your mouths, but Allah says the truth, and He guides to the [right] way.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৪. আল্লাহ কোন মানুষের জন্য তার অভ্যন্তরে দুটি হৃদয় সৃষ্টি করেননি। আর তোমাদের স্ত্রীগণ, যাদের সাথে তোমরা যিহার করে থাক, তিনি তাদেরকে তোমাদের জননী করেননি(১) এবং তোমাদের পোষ্য পুত্রদেরকে তিনি তোমাদের পুত্র করেননি(২); এগুলো তোমাদের মুখের কথা। আর আল্লাহ সত্য কথাই বলেন এবং তিনিই সরল পথ নির্দেশ করেন।


তাফসীর:

(১) এ আয়াতে 'যিহার'-এর দরুন স্ত্রী চিরতরে হারাম হয়ে যাওয়ার জাহেলিয়াত যুগের ভ্রান্ত ধারণা সম্পূর্ণ বাতিল বলে ঘোষণা করা হয়েছে। আর এরূপ বলার ফলে শরীয়তের কোন প্রতিক্রিয়া হয় কিনা, এ সম্পর্কে ‘সূরা মুজাদালায়’ এরূপ বলাকে পাপ বলে আখ্যায়িত করে এ থেকে বিরত থাকা ওয়াজিব বলে বর্ণনা করা হয়েছে। এরূপ বলার পর যদি যিহারের কাফফারা আদায় করে; তবে স্ত্রী তার জন্যে হালাল হয়ে যাবে। ‘সূরা আল-মুজাদালায়’ আল্লাহ্ তা'আলা স্বয়ং যিহারের কাফফারার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। [দেখুন: মুয়াস্‌সার; বাগভী; ফাতহুল কাদীর]


(২) দ্বিতীয় বিষয় পালক পুত্র সংশ্লিষ্ট। আয়াতের মর্ম এই, যেমন কোন মানুষের দুটি অন্ত:করণ থাকে না এবং যেমন স্ত্রীকে মা বলে সম্বোধন করলে সে প্রকৃত মা হয়ে যায় না; অনুরূপভাবে তোমাদের পোষ্য ছেলেও প্রকৃত ছেলেতে পরিণত হয় না। [দেখুন: মুয়াস্‌সার, সা’দী] অর্থাৎ, অন্যান্য সন্তানদের ন্যায় সে মীরাসেরও অংশীদার হবে না এবং বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন নিষিদ্ধ হওয়া সংশ্লিষ্ট মাসআলাসমূহও তার প্রতি প্রযোজ্য হবে না। সুতরাং সন্তানের তালাক প্রাপ্ত স্ত্রী যেমন পিতার জন্য চিরতরে হারাম, কিন্তু পোষ্যপুত্রের স্ত্রী পালক পিতার তরে তেমনভাবে হারাম হবে না।

যেহেতু এই শেষোক্ত বিষয়ের প্রতিক্রিয়া বহু ক্ষেত্রে পড়ে থাকে; সুতরাং এ নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে যে, যখন পালক ছেলেকে ডাকবে বা তার উল্লেখ করবে, তখন তা তার প্রকৃত পিতার নামেই করবে। পালক পিতার পুত্র বলে সম্বোধন করবে না। কেননা, এর ফলে বিভিন্ন ব্যাপারে নানাবিধ সন্দেহ ও জটিলতা উদ্ভবের আশংকা রয়েছে। হাদীসে এসেছে, সাহাবায়ে কেরাম বলেন, এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে আমরা যায়েদ ইবনে হারেসাকে যায়েদ ইবন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলে সম্বোধন করতাম। [বুখারী: ৪৭৮২, মুসলিম: ২৪২৫] কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে পালক ছেলেরূপে গ্ৰহণ করেছিলেন।

এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর আমরা এ অভ্যাস পরিত্যাগ করি। এ আয়াতটি নাযিল হবার পর কোন ব্যক্তির নিজের আসল বাপ ছাড়া অন্য কারো সাথে পিতৃ সম্পর্ক স্থাপন করাকে হারাম গণ্য করা হয়। হাদীসে এসেছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি নিজেকে আপনি পিতা ছাড়া অন্য কারো পুত্র বলে দাবী করে, অথচ সে জানে ঐ ব্যক্তি তাঁর পিতা নয়, তার জন্য জান্নাত হারাম।” [বুখারী: ৪৩২৬, মুসলিম: ৬৩] অন্য হাদীসে এসেছে, “তোমরা তোমাদের পিতাদের সাথে সম্পর্কিত হওয়া থেকে বিমুখ হয়োনা, যে তার পিতা থেকে বিমুখ হয় সে কুফরী করল।’ [মুসলিম: ৬২] অন্য হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “কোন মানুষ যখন না জেনে কোন নসব প্রমান করতে যায় বা অস্বীকার করতে যায় তখন সে কুফরী করে, যদিও তা সামান্য হোক।” [ইবনে মাজাহ: ২৭88]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৪) আল্লাহ কোন মানুষের অভ্যন্তরে দু”টি হৃদয় সৃষ্টি করেননি;[1] তোমাদের স্ত্রীগণ যাদের সাথে তোমরা ‘যিহার” করেছ তাদেরকে তোমাদের মা করেননি[2] এবং পোষ্যপুত্র -- যাদেরকে তোমরা পুত্র বল, আল্লাহ তাদেরকে তোমাদের পুত্র করেননি।[3] এগুলি তোমাদের মুখের কথা।[4] আল্লাহই সত্য কথা বলেন[5] এবং তিনিই পথনির্দেশ করেন।


তাফসীর:

[1] কোন কোন বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, একজন মুনাফিক দাবী করত যে, তার দু’টি অন্তর আছে। একটি মুসলিমদের সাথে ও অপরটি কুফর ও কাফেরেদের সাথে। (আহমাদ ১/২৬৭) উক্ত আয়াত তার কথা খন্ডন করার জন্যই অবতীর্ণ হয়েছে। উদ্দেশ্য এই যে, একই অন্তরে আল্লাহর মহববত ও তাঁর শত্রুর আনুগত্য একত্রিত হওয়া অসম্ভব। কেউ কেউ বলেন যে, মক্কার মুশরিকদের মধ্যে জামীল বিন মা’মার ফিহরী নামক এক ব্যক্তি ছিল, সে বড় হুঁশিয়ার, চতুর ও ধোঁকাবাজ ছিল। তার দাবী ছিল যে, আমার দু’টি অন্তর আছে যার দ্বারা আমি চিন্তা ভাবনা করি ও বুঝি। আর মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর অন্তর একটি। এই আয়াত তারই রদ স্বরূপ অবতীর্ণ হয়েছে। (আইসারুত তাফাসীর) পক্ষান্তরে কিছু তফসীরবিদগণ বলেন যে, সামনে যে দুটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে এটা তারই ভূমিকা। অর্থাৎ, যেরূপ এক ব্যক্তির দুই অন্তর হয় না, অনুরূপ যদি কোন ব্যক্তি নিজ স্ত্রীর সাথে ‘যিহার’ করে ফেলে; অর্থাৎ বলে ফেলে যে, ‘তোমার পিঠ আমার জন্য আমার মায়ের পিঠের মত’ তাহলে এ কথা বলাতে তার স্ত্রী তার মা হয়ে যাবে না। কারণ একজনের দুই মা হয় না। অনুরূপ কোন ব্যক্তি কাউকে পোষ্যপুত্র বানিয়ে নিলে সে তার প্রকৃত পুত্র হয়ে যায় না। বরং সে যার পুত্র তারই থাকে, তার দুই বাপ হতে পারে না। (ইবনে কাসীর)

[2] একে ‘যিহার’ বলা হয়। এর বিস্তারিত বর্ণনা সূরা মুজাদালাহ ২-৪নং আয়াতে আসবে।

[3] এর বিস্তারিত বর্ণনা এই সূরাতেই একটু পরে আসবে ـ أَدْعِيَاءُ دَعِيٌ -এর বহুবচন যার অর্থ পালিত সন্তান, পোষ্যপুত্র, পাতানো ছেলে বা মৌখিক সূত্রে বেটা।

[4] অর্থাৎ, মুখে কাউকে মা বলে সম্বোধন করলে সে প্রকৃত মা হয়ে যাবে না এবং কাউকে বেটা বললে সে আপন বেটা হয়ে যাবে না। অর্থাৎ তাদের উপর মা ও বেটা সম্পর্কিত সংশ্লিষ্ট শরয়ী বিধান প্রযোজ্য হবে না।

[5] সুতরাং তাঁরই অনুসরণ কর এবং যিহারকৃত স্ত্রীকে মা এবং পোষ্যপুত্রকে আপন পুত্র বলো না। প্রকাশ থাকে যে, কোন স্নেহভাজনকে আদর করে ‘বেটা’ বলা এবং পোষ্যপুত্রকে আপন পুত্র মনে করে ‘বেটা’ বলা একই পর্যায়ের নয়। প্রথমটি বৈধ। এখানে উদ্দেশ্য দ্বিতীয় বিষয়টিকে অবৈধ ঘোষণা করা।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৪-৫ নং আয়াতের তাফসীর:



আল্লাহ তা‘আলা একজন ব্যক্তিকে দুটি অন্তর দান করেননি। অর্থাৎ একজন ব্যক্তি একই সাথে দুটি কাজ করবে বা দুধরনের চিন্তা করবে তা কখনো সম্ভব হবে না। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: এভাবে ব্যক্ত করার কারণ হল কতক মুনাফিক বলতন মুহাম্মাদের দুটি অন্তর রয়েছেন কেননা কখনো কোন বিষয়ে মগ্ন থাকলেও অন্য বিষয়ে ফিরে আসে, তারপর আবার সে ঐ বিষয়ে ফিরে যায়। আল্লাহ তা‘আলা একথা দ্বারা তাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করলেন। এ ছাড়াও অনেক বর্ণনা পাওয়া যায়। (কুরতুবী) অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা যিহারের বিধান বর্ণনা করছেন ।



যিহারের পরিচয় ও বিধান:



ظهار এর শাব্দিক অর্থ: এটি আরবি শব্দ, অর্থ হল বিক্ষোভ প্রদর্শন করা, একে অপরকে সাহায্য বা সমর্থন করা, যিহার করা ইত্যাদি।



পরিভাষায় যিহার হল স্ত্রীকে বা স্ত্রীর কোন অঙ্গকে যাদের বিবাহ করা হারাম তাদের সাথে তুলনা করা। (সহীহ ফিকহুস সুন্নাহ:৩/৩৬৯) স্ত্রীকে এরূপ বলা যে, তুমি আমার মায়ের পিঠের মত বা অমুক অঙ্গের মত ইত্যাদি। কেউ কেউ যিহারকে মায়ের পিঠের সাথে তুলনা করাকে সীমাবদ্ধ করেছেন।



যিহারের হুকুম হল যদি কেউ তার স্ত্রীর সাথে যিহার করে তাহলে স্ত্রীর সাথে দৈহিক মিলন করা তার জন্য হারাম হয়ে যাবে। তবে কাফফারা দেয়ার পর দৈহিক মিলন করতে পারবে। কিন্তু কাফফারা আদায় না করা পর্যন্ত স্ত্রী তার জন্য হারাম। যিহারের কাফফারা হল:

(১) একজন গোলাম আযাদ করতে হবে।

(২) যদি সক্ষম না হয় তাহলে ধারাবাহিকভাবে দু মাস সিয়াম পালন করতে হবে।

(৩) যদি তাতেও সক্ষম না হয় তাহলে ষাটজন মিসকীনকে খাদ্য খাওয়াতে হবে।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَالَّذِيْنَ يُظَاهِرُوْنَ مِنْ نِّسَآئِهِمْ ثُمَّ يَعُوْدُوْنَ لِمَا قَالُوْا فَتَحْرِيْرُ رَقَبَةٍ مِّنْ قَبْلِ أَنْ يَّتَمَآسَّا ط ذٰلِكُمْ تُوْعَظُوْنَ بِه۪ ط وَاللّٰهُ بِمَا تَعْمَلُوْنَ خَبِيْرٌ - ‏ فَمَنْ لَّمْ يَجِدْ فَصِيَامُ شَهْرَيْنِ مُتَتَابِعَيْنِ مِنْ قَبْلِ أَنْ يَّتَمَآسَّا ط فَمَنْ لَّمْ يَسْتَطِعْ فَإِطْعَامُ سِتِّيْنَ مِسْكِيْنًا ط ذٰلِكَ لِتُؤْمِنُوْا بِاللّٰهِ وَرَسُوْلِه۪ ط وَتِلْكَ حُدُوْدُ اللّٰهِ ط وَلِلْكٰفِرِيْنَ عَذَابٌ أَلِيْمٌ)‏



“আর যারা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে যিহার করে, পরে তারা পরিত্যাগ করে যা তারা বলেছে, তাহলে তারা একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে একটি গোলাম মুক্ত করবে। এ আদেশ দিয়ে তোমাদেরকে নসীহত করা যাচ্ছে। তোমরা যা কর, আল্লাহ তা সবিশেষ অবহিত। তবে যার এ সামর্থ্য নেই, সে একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে ধারাবাহিকভাবে দু’মাস রোযা রাখবে। আর যে ব্যক্তি এতেও অসমর্থ, সে ষাটজন মিসকীনকে খাওয়াবে। এ নির্দেশ এ জন্য যে, তোমরা যেন ঈমান আনয়ন কর আল্লাহর প্রতি ও তাঁর রাসূলের প্রতি। আর এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা। আর কাফিরদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” (সূরা মুজাদালাহ ৫৮:৩-৪)



শুধু কাফফারা দিলেই হবে না সাথে সাথে মৌখিকভাবে উক্ত কথা প্রত্যাখ্যান করে নিতে হবে। কারণ আল্লাহ তা‘আলা বলছেন



(ثُمَّ يَعُوْدُوْنَ لِمَا قَالُوْا)



‘পরে তারা ফিরে আসে যা তারা বলেছে’।



হাদীসে এসেছে,



ইবনু আব্বাস (رضي الله عنه) হতে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট এসে বলল: আমি আমার স্ত্রীর সাথে যিহার করেছি এবং কাফফারা দেয়ার পূর্বেই তার সাথে সহবাস করেছি। তখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, আল্লাহ তা‘আলা তোমার ওপর রহম করুন। এ কাজ করতে তোমাকে কিসে উদ্বুদ্ধ করেছে? লোকটি বলল: আমি চাঁদনী রাতে তার পায়ের মলের (গহনার) সৌন্দর্য দেখে (তার সাথে সহবাস করে ফেলি)। তখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: আল্লাহ তা‘আলা তোমাকে যে নির্দেশ দিয়েছেন তা না আদায় করা পর্যন্ত তুমি তার নিকটবর্তী হয়ো না। (আবূ দাঊদ হা: ২২২৩, তিরমিযী হা: ১১৯৯, সহীহ)



যিহারের পদ্ধতি:



স্ত্রীকে স্বামী বলবে: তুমি আমার মায়ের পিঠের মত বা মায়ের অমুক অঙ্গের মত। অথবা যাদের সাথে বিবাহ বন্ধন হারাম তাদের কারো কোন অঙ্গের সাথে তুলনা করবে। স্ত্রীকে মায়ের পিঠের মত বা অঙ্গের সাথে তুলনা করলেই স্ত্রী মা হয়ে যায় না। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(اَلَّذِيْنَ يُظَاهِرُوْنَ مِنْكُمْ مِّنْ نِّسَآئِهِمْ مَّا هُنَّ أُمَّهٰتِهِمْ ط إِنْ أُمَّهٰتُهُمْ إِلَّا الّٰ۬ئِيْ وَلَدْنَهُمْ)



“তোমাদের মধ্যে যারা স্বীয় স্ত্রীদের সাথে যিহার করে (তারা জেনে রাখুক), তাদের স্ত্রীগণ তাদের মাতা নয়। তাদের মাতা তো কেবল তারাই যারা তাদেরকে জন্মদান করেছেন।” (সূরা মুযাদালাহ ৫৮:২) এ কথাই আল্লাহ তা‘আলা এখানে বলেছেন: এবং তোমাদের স্ত্রীদের মধ্য হতে যাদের সাথে তোমরা ‘যিহার’ কর তাদেরকে তোমাদের জননী করেননি।



أَدْعِيَا۬ءَ শব্দটি دعي এর বহুবচন। অর্থ হলো: পালক পুত্র, পাতানো ছেলে। অর্থাৎ পালক পুত্র প্রকৃত পক্ষে তোমাদের পুত্র নয়। সেজন্য আল্লাহ তা‘আলা পালক পুত্রের আসল বাবার পরিচয়ে ডাকার নির্দেশ দিয়েছেন। তাই পালক পুত্রের সাথে পর্দা ফরয এবং পালক পুত্রের স্ত্রীকে পালক বাবা বিবাহ করতে পারবে। জাহিলী ও ইসলামের প্রথম যুগে যদি কোন ব্যক্তি অপর কারো পুত্রকে পোষ্য পুত্ররূপে গ্রহণ করত তবে এ পোষ্যপুত্র তার প্রকৃত পুত্র বলে পরিচিত হত এবং তারই পুত্র বলে সম্বোধন করা হতো। এ পোষ্যপুত্র সকল ক্ষেত্রে প্রকৃত পুত্রের মর্যাদাভুক্ত হতো। যথা তারা প্রকৃত সন্তানের ন্যায়ই মীরাসের অধিকারী হত এবং বংশ ও রক্ত সম্পর্কের ভিত্তিতে যেসব নারীদেরকে বিবাহ করা হারাম তাদেরকে বিবাহ করতে পারত না। অনুরূপভাবে পালক পুত্রের তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীও সেই পালক পিতার জন্য বিবাহ করা হারাম ছিল। এ প্রথা রহিত করে দিয়ে আল্লাহ তা‘আলা বিধান দিলেন পালক পুত্র তোমাদের প্রকৃত পুত্র নয় এবং পালক বাবা প্রকৃত বাবা নয়। সুতরাং যখন পালক পুত্রকে ডাকবে তখন তার প্রকৃত পিতার পরিচয় দিয়ে ডাকবে। আর পালক পুত্রের স্ত্রীকে বিবাহ করা তোমাদের জন্য কোন দোষের কারণ নয়।



(اُدْعُوْهُمْ لِاٰبَآئِهِمْ هُوَ أَقْسَطُ....) শানে নুযূল:



আবদুল্লাহ বিন উমার (رضي الله عنه) হতে বর্ণিত, যায়েদ বিন হারিসা (رضي الله عنه) ছিল রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পালক পুত্র। আমরা তাকে যায়েদ বিন মুহাম্মাদ বলেই ডাকতাম। তখন আল্লাহ তা‘আলা এই আয়াতটি নাযিল করেন। (সহীহ বুখারী হা: ৪৭৮২, সহীহ মুসলিম হা: ২৪২৫)



সুতরাং আল্লাহ তা‘আলা এখানে পালক পুত্রকে তাঁর পিতৃ পরিচয়ে ডাকার জন্যই নির্দেশ প্রদান করেছেন। আর এটাই আল্লাহ তা‘আলার নিকট অধিক ন্যায়সঙ্গত বিষয়। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(مَا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَآ أَحَدٍ مِّنْ رِّجَالِكُمْ وَلٰكِنْ رَّسُوْلَ اللّٰهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّيْنَ ط وَكَانَ اللّٰهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيْمًا)‏



“মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তোমাদের মধ্যকার কোন পুরুষের পিতা নয়, বরং তিনি আল্লাহর রাসূল এবং সর্বশেষ নাবী। আল্লাহ সকল বিষয়ে সর্বজ্ঞ।” (সূরা আহযাব ৩৩:৪০)



আর যদি কারো পিতৃ পরিচয় না পাওয়া যায় তাহলে তারা তোমাদের দীনি ভাই এবং বন্ধু বলে গণ্য হবে। তবে কিছুতেই সন্তান বলে গণ্য হতে পারে না। হাদীসে এসেছে:



সাদ (رضي الله عنه) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি অন্যকে পিতা বলে দাবী করবে অথচ সে জানে যে, এ ব্যক্তি তার পিতা নয় তার জন্য জান্নাত হারাম। (সহীহ বুখারী হা: ৬৭৬৬, সহীহ মুসলিম হা: ৬৩)



আবূ হুরাইরাহ (رضي الله عنه) হতে বর্ণিত, নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: তোমরা তোমাদের পিতা (অর্থাৎ পিতার পরিচয় দেয়া) থেকে বিমুখ হয়ো না। যে ব্যক্তি তার পিতা থেকে বিমুখ হয়ে যায় সে কুফরী করল। (সহীহ বুখারী হা: ৬৭৬৮, সহীহ মুসলিম হা: ৬৯)



এরপর আল্লাহ দয়াদ্রতার কথা উল্লেখ করে বললেন, ইতোপূর্বে তোমরা যে সকল পাপ বা ভুল করেছ সেগুলোর জন্য তোমাদেরকে পাকড়াও করা হবে না। তবে যদি অন্তরে দৃঢ় সংল্পের সাথে করে থাক তাহলে সে কথা ভিন্ন অর্থাৎ এজন্য গুনাহগার হতে হবে আর এজন্য পাকড়াও করা হবে। আল্লাহ তা‘আলার বাণী:



(لَا يُؤَاخِذُكُمُ اللّٰهُ بِاللَّغْوِ فِيْٓ أَيْمَانِكُمْ وَلٰكِنْ يُّؤَاخِذُكُمْ بِمَا كَسَبَتْ قُلُوْبُكُمْ ط وَاللّٰهُ غَفُوْرٌ حَلِيْمٌ)‏



“অনর্থক কসমের জন্য আল্লাহ তোমাদেরকে পাকড়াও করবেন না, তবে তিনি তোমাদেরকে গ্রেফতার করবেন তোমাদের অন্তর যা অর্জন করে তার জন্য। আর আল্লাহ ক্ষমাপরায়ণ, ধৈর্যশীল।” (সূরা বাকারাহ ২:২২৫)



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. একজন ব্যক্তির একটাই অন্তর থাকে কখনো দুটো অন্তর থাকতে পারে না।

২. স্ত্রীর সাথে যিহার করলে কাফফারা দেয়ার পূর্বে ঐ স্ত্রীর সাথে দৈহিক মিলন করতে পারবে না।

৩. পোষ্য পুত্রদের স্ত্রীকে বিবাহ করা বৈধ। এদেরকে নিজের পুত্র মনে করা যাবে না।

৪. নিজের পিতা ব্যতীত অন্যকে পিতা বলে ডাকা যাবে না। যদি কেউ এমনটি করে তাহলে সে যেন কুফরী করল।

৫. পোষ্য পুত্রদের সম্মুখেও পর্দা করতে হবে। ছেলে মনে করে তাদের নিকট খোলা মেলা চলাফেরা করা ঠিক নয়।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৪-৫ নং আয়াতের তাফসীর

আল্লাহ তা'আলা উদ্দেশ্য বর্ণনা করার পূর্বে ভূমিকা ও প্রমাণের দৃষ্টান্ত স্বরূপ দু'একটি ঐ কথা বলেছেন যা সবাই অনুভব করে থাকে। অতঃপর সেদিক থেকে চিন্তা ও খেয়াল ফিরিয়ে নিজের উদ্দেশ্যের দিকে নিয়ে গিয়েছেন। তিনি বলেনঃ কোন মানুষের হৃদয় বা অন্তর দু’টি হয় না। এভাবেই তুমি বুঝে নাও যে, তুমি যদি তোমার কোন স্ত্রীকে মা বলে দাও তবে সে সত্যিই তোমার মা হয়ে যাবে। অনুরূপভাবে অপরের পুত্রকে তুমি পুত্র বানিয়ে নিলে সে সত্যিকারের পুত্র হবে না। কেউ যদি ক্রোধের সময় তার স্ত্রীকে বলে ফেলেঃ তুমি আমার কাছে এমনই যেমন আমার মায়ের পিঠ। এরূপ বললে সে সত্যি সত্যিই মা হয়ে যাবে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ “তারা তাদের মা নয়, তাদের মা তো তারাই যাদেরকে তারা জন্ম দিয়েছে বা প্রসব করেছে।” (৫৮:২) এ দু'টি কথা বর্ণনা করার পর মূল উদ্দেশ্য বর্ণনা করা হচ্ছে যে, মানুষের পালক পুত্র তার প্রকৃত পুত্র হতে পারে না। এ আয়াতটি হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা (রাঃ)-এর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) নবুওয়াতের পূর্বে তাঁকে পোষ্যপুত্র করে রেখেছিলেন। তাঁকে যায়েদ (রাঃ) ইবনে মুহাম্মাদ (সঃ) বলা হতো। এ আয়াত দ্বারা এ সম্পর্ক ছিন্ন করে দেয়াই উদ্দেশ্য। যেমন এই সূরারই মধ্যে রয়েছেঃ (আরবি)

অর্থাৎ “মুহাম্মাদ (সঃ) তোমাদের মধ্যে কোন পুরুষের পিতা নয়, রবং সে আল্লাহর রাসূল এবং শেষ নবী। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ।” (৩৩:৪০) এখানে মহান আল্লাহ বলেনঃ এটা তো তোমাদের মুখের কথা মাত্র। তোমরা কারো ছেলেকে অন্য কারো ছেলে বলবে এবং এভাবেই বাস্তব পরিবর্তন হয়ে যাবে এটা হতে পারে না। প্রকৃতপক্ষে তার পিতা সেই যার পিঠ হতে সে বের হয়েছে। একটি ছেলের দু’টি পিতা হওয়া অসম্ভব, যেমন একটি বক্ষে দু'টি অন্তর হওয়া অসম্ভব। আল্লাহ তা'আলা সত্য কথা বলে থাকেন ও সরল-সোজা পথ প্রদর্শন করে থাকেন।

এ আয়াতটি একটি কুরায়েশীর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়, যে প্রচার করে রেখেছিল যে, তার দুটি অন্তর আছে এবং দুটোই জ্ঞান ও বোধশক্তিতে পরিপূর্ণ রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা তার একথাকে খণ্ডন করে দেন।

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা নামাযে দণ্ডায়মান ছিলেন, এমতাবস্থায় তিনি আতংকগ্রস্ত হলেন। তখন যেসব মুনাফিক তাঁর সাথে নামায পড়ছিল তারা পরস্পর বলাবলি করলো: “দেখো, তাঁর দু’টি অন্তর রয়েছে, একটি তোমাদের সাথে এবং অপরটি তাদের সাথে।” ঐ সময় আল্লাহ তা'আলা (আরবি)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন।

যুহরী (রঃ) বলেন যে, এটা শুধু দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলা হয়েছে। অর্থাৎ যেমন কোন লোকের দু’টি অন্তর হয় না, তেমনই কোন ছেলের দু’টি পিতা হয় না। এ মুতাবেকই আমরাও এ আয়াতের তাফসীর করেছি। এসব ব্যাপারে মহামহিমান্বিত আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।

পূর্বে তো এর অবকাশ ছিল যে, পালক পুত্রকে পালনকারীর দিকে সম্বন্ধ লাগিয়ে তার পুত্র বলে ডাকা যাবে। কিন্তু এখন ইসলাম এটাকে রহিত করে দিয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, তাকে তার প্রকৃত পিতার দিকে সম্পর্ক লাগিয়ে ডাকতে হবে। ন্যায়, হক ও সত্য এর মধ্যেই নিহিত রয়েছে।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) বলেনঃ “এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে আমরা হযরত যায়েদ (রাঃ)-কে যায়েদ (রাঃ) ইবনে মুহাম্মাদ (সঃ) বলতাম। কিন্তু এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর আমরা এটা বলা পরিত্যাগ করি। পূর্বে তো পালক পুত্রের ঐ সমুদয় হক থাকতো যা ঔরষজাত ছেলের থাকে।`

এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর হযরত সালেহ বিনতে সুহায়েল (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা সালিম (রাঃ)-কে মৌখিক পুত্র বানিয়ে রেখেছিলাম। এখন কুরআন তার ব্যাপারে ফায়সালা করে দিয়েছে। আমি এখন পর্যন্ত তার থেকে পর্দা করিনি। সে আসে এবং যায়। আমার স্বামী হযরত হুযাইফা (রাঃ) তার এভাবে যাতায়াতে কিছুটা অসন্তুষ্ট রয়েছেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “তাহলে যাও, সালিম (রাঃ)-কে তোমার দুধ পান করিয়ে দাও। এতে তুমি তার উপর হারাম হয়ে যাবে (শেষ পর্যন্ত)।”

মোটকথা পূর্বের হুকুম রহিত হয়ে যায়। এখন পোষ্যপুত্রদের স্ত্রীদেরকে পোষ্যপুত্র রূপে গ্রহণকারীদের জন্যে বৈধ করে দেয়া হয়। অর্থাৎ তারা তাদের পোষ্যপুত্রদের স্ত্রীদেরকে বিয়ে করে নিতে পারে। হযরত যায়েদ (রাঃ) যখন তার স্ত্রী হযরত যয়নব বিনতে জাহশ (রাঃ)-কে তালাক দেন তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বিয়ে করে নেন এবং এভাবে মুসলমানরা একটি কঠিন সমস্যা হতে রক্ষা পেয়ে গেলেন। এর প্রতি লক্ষ্য রেখেই যেসব নারীকে বিয়ে করা হারাম তাদের বর্ণনা দিতে গিয়ে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ “এবং তোমাদের জন্যে অবৈধ বা নিষিদ্ধ তোমাদের ঔরষজাত পুত্রদের স্ত্রীরা।` (৪:২৩) তবে এখানে দুগ্ধ সম্পৰ্কীয় ছেলেরাও ঔরষজাত ছেলেদের হুকুমের অন্তর্ভুক্ত। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হাদীস রয়েছে যে, দুধপানের কারণে ঐ সব আত্মীয় হারাম যা বংশের কারণে হারাম হয়ে থাকে। তবে কেউ যদি স্নেহ বশতঃ কাউকেও পুত্র বলে ডাকে তাহলে সেটা অন্য কথা, এতে কোন দোষ নেই।

মুসনাদে আহমাদ ইত্যাদি হাদীস গ্রন্থে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, আমাদের ন্যায় আবদুল মুত্তালিব বংশের ছোট বালকদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুযদালাফাহ হতে রাত্রেই জামরাতের দিকে বিদায় করে দেন এবং আমাদের উরুতে হাত বুলিয়ে বলেনঃ “হে আমার ছেলেরা!

সূর্যোদয়ের পূর্বে জামরাতের উপর কংকর মারবে না।” এটা দশম হিজরীর যিলহজ্ব মাসের ঘটনা। এটা প্রমাণ করছে যে, স্নেহের বাক্য ধর্তব্য নয়।

হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা (রাঃ) যার ব্যাপারে এ হুকুম অবতীর্ণ হয়েছে, ৮ম হিজরীতে মূতার যুদ্ধে শহীদ হন। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে ‘হে আমার প্রিয় পুত্র বলে সম্বোধন করতেন।”

এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যদি তোমরা তাদের পিতৃ-পরিচয় না জান তবে তারা তোমাদের ধর্মীয় ভ্রাতা ও বন্ধু।

উমরাতুল কাযার বছরে যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) মক্কা হতে প্রত্যাবর্তন করেন তখন হযরত হামযা (রাঃ)-এর কন্যা তাকে চাচা বলে ডাকতে ডাকতে তার পিছনে পিছনে দৌড়তে শুরু করে। হযরত আলী (রাঃ) তখন তাকে ধরে হযরত ফাতেমা (রাঃ)-এর কাছে নিয়ে গেলেন এবং বললেনঃ “এটা তোমার চাচাতো বোন, একে ভালভাবে রাখো।` তখন হযরত যায়েদ (রাঃ) ও হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব (রাঃ) বলে উঠলেনঃ “এই শিশু কন্যার হকদার আমরাই। আমরাই একে লালন-পালন করবো।” হযরত আলী (রাঃ) প্রমাণ পেশ করলেন যে, সে তার চাচার মেয়ে। আর হযরত যায়েদ (রাঃ) বললেন যে, সে তার ভাই-এর কন্যা। হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব (রাঃ) বললেন : “এটা আমার চাচার মেয়ে এবং তার চাচী আমার বাড়ীতেই আছে অর্থাৎ হযরত আসমা বিনতে উমায়েস (রাঃ)।” অবশেষে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ ফায়সালা করলেন যে, এ কন্যা তার খালার কাছেই থাকবে, যেহেতু খালা মায়ের স্থলাভিষিক্তা। হযরত আলী (রাঃ)-কে তিনি বললেনঃ “তুমি আমার ও আমি তোমার।” হযরত জাফর (রাঃ)-কে বললেনঃ “তোমার আকৃতি ও চরিত্র তো আমার সাথেই সাদৃশ্যযুক্ত। হযরত যায়েদ (রাঃ)-কে তিনি বললেনঃ “তুমি আমার ভাই ও আমার আযাদকৃত দাস।” এ হাদীসে বহু কিছু হুকুম রয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ন্যায়ের হুকুম শুনিয়ে দিলেন, অথচ দাবীদারদেরকেও তিনি অসন্তুষ্ট করলেন না, বরং নম্র ভাষার মাধ্যমে তাঁদের অন্তর জয় করলেন। তিনি এ আয়াতের উপর আমল করতে গিয়ে হযরত যায়েদ (রাঃ)-কে বললেনঃ “তুমি আমার ভাই ও বন্ধু।”

হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেনঃ “এ আয়াত অনুযায়ী আমি তোমাদের দ্বীনী ভাই।” হযরত উবাই (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহর কসম! যদি জানা যেতো যে, তার পিতা ছিল গাদা তবে অবশ্যই তার দিকে সে সম্পর্কিত হতো।”

হাদীসে এসেছে যে, যদি কোন লোক তার সম্পর্ক জেনে শুনে তার পিতা ছাড়া অন্যের দিকে জুড়ে দেয় তবে সে কুফরী করলো। এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, নিজেকে নিজের সঠিক ও প্রকৃত বংশ হতে সরিয়ে অন্য বংশের সাথে সম্পর্কিত করা খুব বড় পাপ।

এরপর বলা হচ্ছেঃ তোমরা যদি তোমাদের সাধ্যমত তাহকীক ও যাচাই করার পর কাউকেও কারো দিকে সম্পর্কিত কর এবং সেটা ভুল হয়ে যায় তবে এতে তোমাদের কোন অপরাধ হবে না। কেননা, স্বয়ং আল্লাহ তাবারাক ওয়া। তাআলা আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন যে, আমরা যেন বলিঃ (আরবি)

অর্থাৎ “হে আমাদের প্রতিপালক! যদি আমরা বিস্মৃত হই অথবা ভুল করি তবে আপনি আমাদেরকে অপরাধী করবেন না।` (২:২৮৬) সহীহ মুসলিমে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন বান্দা এ প্রার্থনা করে তখন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “আমি তাই করলাম অর্থাৎ তোমাদের প্রার্থনা কবুল করে নিলাম।”

হযরত আমর ইবনুল আস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যদি বিচারক (বিচারের ব্যাপারে) ইজতেহাদ (সঠিকতায় পৌছার জন্যে চেষ্টা-তদবীর ও চিন্তা-ভাবনা করে এবং এতে সে সঠিকতায় পৌঁছে যায় তবে তার জন্যে দ্বিগুণ পুণ্য রয়েছে। আর যদি তার ইজতিহাদে ভুল হয়ে যায় তবে তার জন্যে রয়েছে একটি পুণ্য। (এ হাদীসটি সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে)

অন্য হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা আমার উম্মতের ভুল-চুক এবং যে কাজ তাদের দ্বারা জোরপূর্বক করিয়ে নেয়া হয় তা ক্ষমা করে দিয়েছেন। এখানেও মহান আল্লাহ একথা বলার পর বলেনঃ কিন্তু তোমাদের অন্তরে সংকল্প থাকলে অপরাধ হবে।

কসম সম্পর্কেও ঐ একই কথা। উপরে যে হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে, নসব বা বংশ পরিবর্তনকারী কাফিরের পর্যায়ভুক্ত, সেখানেও বলা হয়েছে যে, এরূপ অপরাধ হবে জেনে শুনে করলে।

কুরআন কারীমের আয়াত, যার তিলাওয়াত বা পঠন এখন মানসূখ বা রহিত, তাতে রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমাদের নিজেদের পিতাদের দিক হতে সম্পর্ক সরিয়ে নেয়া কুফরী।”

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন, তাঁর প্রতি কিতাব অবতীর্ণ করেছেন। তাতে রজমের আয়াত ছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিজে রজম করেছেন অর্থাৎ ব্যভিচারের অপরাধে বিবাহিত পুরুষ ও বিবাহিতা নারীকে প্রস্তরাঘাতে হত্যা করেছেন। আমরাও তার পরে রজম করেছি।” অতঃপর তিনি বলেনঃ “আমরা পাঠ করতাম কুরআন কারীমের (আরবি)-এ আয়াতটি (যার পঠন এখন রহিত হয়ে গেছে)।” (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)

রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা আমার প্রশংসার ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না, যেমন হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ)-এর প্রশংসার ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করা হয়েছিল। আমি তো আল্লাহর বান্দা। সুতরাং তোমরা আমাকে তাঁর বান্দা ও তাঁর রাসূল বলবে।” একটি রিওয়াইয়াতে শুধু ইবনে মারইয়াম (আঃ) আছে। আর একটি হাদীসে আছে যে, মানুষের মধ্যে তিনটি কুফরী (স্বভাব) রয়েছে। এগুলো হচ্ছেঃ বংশকে ভৎর্সনা ও ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা, মৃতের উপর ক্রন্দন করা এবং তারকার মাধ্যমে বৃষ্টি প্রার্থনা করা।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।