সূরা আল-আহযাব (আয়াত: 37)
হরকত ছাড়া:
وإذ تقول للذي أنعم الله عليه وأنعمت عليه أمسك عليك زوجك واتق الله وتخفي في نفسك ما الله مبديه وتخشى الناس والله أحق أن تخشاه فلما قضى زيد منها وطرا زوجناكها لكي لا يكون على المؤمنين حرج في أزواج أدعيائهم إذا قضوا منهن وطرا وكان أمر الله مفعولا ﴿٣٧﴾
হরকত সহ:
وَ اِذْ تَقُوْلُ لِلَّذِیْۤ اَنْعَمَ اللّٰهُ عَلَیْهِ وَ اَنْعَمْتَ عَلَیْهِ اَمْسِکْ عَلَیْکَ زَوْجَکَ وَ اتَّقِ اللّٰهَ وَ تُخْفِیْ فِیْ نَفْسِکَ مَا اللّٰهُ مُبْدِیْهِ وَ تَخْشَی النَّاسَ ۚ وَ اللّٰهُ اَحَقُّ اَنْ تَخْشٰهُ ؕ فَلَمَّا قَضٰی زَیْدٌ مِّنْهَا وَطَرًا زَوَّجْنٰکَهَا لِکَیْ لَا یَکُوْنَ عَلَی الْمُؤْمِنِیْنَ حَرَجٌ فِیْۤ اَزْوَاجِ اَدْعِیَآئِهِمْ اِذَا قَضَوْا مِنْهُنَّ وَطَرًا ؕ وَ کَانَ اَمْرُ اللّٰهِ مَفْعُوْلًا ﴿۳۷﴾
উচ্চারণ: ওয়া ইযতাকূলু লিল্লাযী আন‘আমাল্লা-হু আলাইহি ওয়াআন‘আমতা ‘আলাইহি আমছিক ‘আলাইকা যাওজাকা ওয়াত্তাকিল্লা-হা ওয়া তুখফী ফী নাফছিকা মাল্লা-হু মুবদীহি ওয়া তাখশান্না-ছা ওয়াল্লা-হু আহাক্কুআন তাখশা-হু ফালাম্মা-কাদা-যাইদুম মিন হাওয়াতারান যাওয়াজনা-কাহা-লিকাই লা-ইয়াকূনা ‘আলাল মু’মিনীনা হারাজুন ফীআযওয়াজি আদ‘ইয়াইহিম ইযা-কাদাও মিনহুন্না ওয়াতারা- ওয়া কা-না আমরুল্লা-হি মাফ ‘ঊলা-।
আল বায়ান: আর স্মরণ কর, আল্লাহ যার উপর নিআমত দিয়েছিলেন এবং তুমিও যার প্রতি অনুগ্রহ করেছিলে, তুমি যখন তাকে বলেছিলে ‘তোমার স্ত্রীকে নিজের কাছে রেখে দাও এবং আল্লাহকে ভয় কর’। আর তুমি অন্তরে যা গোপন রাখছ আল্লাহ তা প্রকাশকারী এবং তুমি মানুষকে ভয় করছ অথচ আল্লাহই অধিকতর হকদার যে, তুমি তাকে ভয় করবে; অতঃপর যায়েদ যখন তার স্ত্রীর সাথে বিবাহ সম্পর্ক ছিন্ন করল তখন আমি তাকে তোমার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করলাম, যাতে পালক পুত্রদের স্ত্রীদের ব্যাপারে মুমিনদের কোন অসুবিধা না থাকে; যখন তারা তাদের স্ত্রীদের সাথে বিবাহসম্পর্ক ছিন্ন করে।* আর আল্লাহর নির্দেশ কার্যকর হয়ে থাকে।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩৭. আর স্মরণ করুন, আল্লাহ যাকে অনুগ্রহ করেছেন এবং আপনিও যার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, আপনি তাকে বলেছিলেন, তুমি তোমার স্ত্রীর সাথে বজায় রাখ এবং আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর(১) আর আপনি আপনার অন্তরে গোপন করছিলেন এমন কিছু যা আল্লাহ প্রকাশ করে দিচ্ছেন(২); এবং আপনি লোকদেরকে ভয় করছিলেন, অথচ আল্লাহকেই ভয় করা আপনার পক্ষে অধিকতর সংগত। তারপর যখন যায়েদ তার (স্ত্রীর) সাথে প্রয়োজন শেষ করল(৩), তখন আমরা তাকে আপনার নিকট বিয়ে দিলাম(৪), যাতে মুমিনদের পোষ্য পুত্রদের স্ত্রীদেরকে (স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে) কোন সমস্যা না হয় যখন তারা (পোষ্য পুত্ররা) নিজ স্ত্রীর সাথে প্রয়োজন শেষ করবে (এবং তালাক দিবে)। আর আল্লাহ্র আদেশ কার্যকর হয়েই থাকে।
তাইসীরুল ক্বুরআন: স্মরণ কর, আল্লাহ যাকে অনুগ্রহ করেছেন আর তুমিও যাকে অনুগ্রহ করেছ তাকে তুমি যখন বলছিলে- তুমি তোমার স্ত্রীকে (বিবাহবন্ধনে) রেখে দাও এবং আল্লাহকে ভয় কর। তুমি তোমার অন্তরে লুকিয়ে রাখছিলে যা আল্লাহ প্রকাশ করতে চান, তুমি লোকদেরকে ভয় করছিলে, অথচ আল্লাহই সবচেয়ে বেশি এ অধিকার রাখেন যে, তুমি তাঁকে ভয় করবে। অতঃপর যায়্দ যখন তার (যায়নাবের) সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করল তখন আমি তাকে তোমার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করে দিলাম যাতে মু’মিনদের পোষ্যপুত্ররা তাদের স্ত্রীদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করলে সেসব নারীকে বিবাহ করার ব্যাপারে মু’মিনদের কোন বিঘ্ন না হয়। আল্লাহর আদেশ কার্যকরী হবেই।
আহসানুল বায়ান: (৩৭) স্মরণ কর, আল্লাহ যাকে অনুগ্রহ করেছেন এবং তুমিও যার প্রতি অনুগ্রহ করেছ, তুমি তাকে বলেছিলে, ‘তুমি তোমার স্ত্রীকে ত্যাগ করো না এবং আল্লাহকে ভয় কর।’ আর তুমি তোমার অন্তরে যা গোপন করছিলে আল্লাহ তা প্রকাশ করে দিচ্ছেন; তুমি লোককে ভয় করছিলে, অথচ আল্লাহকেই ভয় করা তোমার পক্ষে অধিকতর সঙ্গত।[1] অতঃপর যায়েদ যখন তার (স্ত্রী যয়নাবের) সাথে বিবাহ-সম্পর্ক ছিন্ন করল,[2] তখন আমি তোমার সাথে তার বিবাহ দিলাম;[3] যাতে বিশ্বাসীদের পোষ্যপুত্রগণ নিজ স্ত্রীদের সাথে বিবাহসূত্র ছিন্ন করলে সে সব রমণীকে বিবাহ করায় তাদের কোন বিঘ্ন না থাকে।[4] আর আল্লাহর আদেশ কার্যকর হয়েই থাকে।[5]
মুজিবুর রহমান: স্মরণ কর, আল্লাহ যাকে অনুগ্রহ করেছেন এবং তুমিও যার প্রতি অনুগ্রহ করছ, তুমি তাকে বলেছিলেঃ তুমি তোমার স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক বজায় রাখ এবং আল্লাহকে ভয় কর। তুমি তোমার অন্তরে যা গোপন রেখেছ আল্লাহ তা প্রকাশ করে দিচ্ছেন; তুমি লোকদেরকে ভয় করছিলে, অথচ আল্লাহকে ভয় করাই তোমার পক্ষে অধিকতর সঙ্গত। অতঃপর যায়িদ যখন তার (যাইনাবের) সাথে বিয়ের সর্ম্পক ছিন্ন করল তখন আমি তাকে তোমার সাথে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ করলাম, যাতে মু’মিনদের পোষ্য পুত্ররা নিজ স্ত্রীর সাথে বিবাহ সূত্র ছিন্ন করলে সেই সব রমনীকে বিয়ে করায় মু’মিনদের জন্য কোন বিঘ্ন না হয়। আল্লাহর আদেশ কার্যকরী হয়েই থাকে।
ফযলুর রহমান: (স্মরণ করো,) যখন তুমি সেই লোকটিকে বলেছিলে (তোমার আযাদকৃত দাস যায়েদ ইবনে হারিছাকে বলেছিলে) যার প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন এবং তুমিও অনুগ্রহ করেছো, “তোমার স্ত্রীকে তোমার কাছে রাখ এবং আল্লাহকে ভয় কর।” তুমি তোমার মনে একটি কথা (আল্লাহর এই সিদ্ধান্তের কথা যে, তিনি যায়েদের স্ত্রী যয়নবকে তোমার স্ত্রী করে দেবেন) লুকিয়ে রেখেছিলে যা আল্লাহ প্রকাশ করে দেবেন। (এ ক্ষেত্রে) তুমি মানুষকে ভয় করেছিলে (অর্থাৎ মানুষের এই কথাকে ভয় করেছিলে যে, মুহাম্মাদ নিজের আযাদকৃত দাসের তালাক-দেওয়া স্ত্রীকে বিয়ে করেছে), অথচ তোমার ভয় করার কথা তো আল্লাহকে। অতঃপর যায়েদ যখন তার সাথে (স্ত্রী যয়নবের সাথে) সম্পর্ক ছিন্ন করল তখন আমি তাকে তোমার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করলাম; যাতে (ভবিষ্যতে) পোষ্যপুত্ররা তাদের স্ত্রীদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলে তাদের ব্যাপারে (তাদেরকে বিয়ে করতে) মুমিনদের কোন বাধা না থাকে। আর আল্লাহর আদেশ কার্যকর হয়েই থাকে।
মুহিউদ্দিন খান: আল্লাহ যাকে অনুগ্রহ করেছেন; আপনিও যাকে অনুগ্রহ করেছেন; তাকে যখন আপনি বলেছিলেন, তোমার স্ত্রীকে তোমার কাছেই থাকতে দাও এবং আল্লাহকে ভয় কর। আপনি অন্তরে এমন বিষয় গোপন করছিলেন, যা আল্লাহ পাক প্রকাশ করে দেবেন আপনি লোকনিন্দার ভয় করেছিলেন অথচ আল্লাহকেই অধিক ভয় করা উচিত। অতঃপর যায়েদ যখন যয়নবের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করল, তখন আমি তাকে আপনার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করলাম যাতে মুমিনদের পোষ্যপুত্ররা তাদের স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলে সেসব স্ত্রীকে বিবাহ করার ব্যাপারে মুমিনদের কোন অসুবিধা না থাকে। আল্লাহর নির্দেশ কার্যে পরিণত হয়েই থাকে।
জহুরুল হক: আর স্মরণ করো! তুমি তাকে বলেছিলে যার প্রতি আল্লাহ্ অনুগ্রহ করেছেন ও যার প্রতি তুমি অনুগ্রহ করেছ -- "তোমার স্ত্রীকে তোমার কাছেই রাখো, আর আল্লাহ্কে ভয়ভক্তি করো, আর তুমি তোমার অন্তরে যা লুকিয়ে রেখেছিলে আল্লাহ্ তা প্রকাশ করে দিচ্ছেন, আর তুমি মানুষকে ভয় করেছিলে, অথচ আল্লাহ্রই বেশী অধিকার যে তুমি তাঁকেই ভয় করবে।" কিন্তু যায়েদ যখন তার থেকে বিবাহবন্ধন সন্বন্ধে মীমাংসা করে ফেলল তখন আমরা তাকে তোমার সাথে বিবাহ দিলাম -- যাতে মুমিনদের উপরে কোন বাধা না থাকে তাদের পালকপুত্রদের স্ত্রীদের ব্যাপারে, যখন তারা তাদের থেকে বিবাহবন্ধন সন্বন্ধে মীমাংসা করে ফেলে। আর আল্লাহ্র নির্দেশ প্রতিপালিত হয়েই থাকে।
Sahih International: And [remember, O Muhammad], when you said to the one on whom Allah bestowed favor and you bestowed favor, "Keep your wife and fear Allah," while you concealed within yourself that which Allah is to disclose. And you feared the people, while Allah has more right that you fear Him. So when Zayd had no longer any need for her, We married her to you in order that there not be upon the believers any discomfort concerning the wives of their adopted sons when they no longer have need of them. And ever is the command of Allah accomplished.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৩৭. আর স্মরণ করুন, আল্লাহ যাকে অনুগ্রহ করেছেন এবং আপনিও যার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, আপনি তাকে বলেছিলেন, তুমি তোমার স্ত্রীর সাথে বজায় রাখ এবং আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর(১) আর আপনি আপনার অন্তরে গোপন করছিলেন এমন কিছু যা আল্লাহ প্রকাশ করে দিচ্ছেন(২); এবং আপনি লোকদেরকে ভয় করছিলেন, অথচ আল্লাহকেই ভয় করা আপনার পক্ষে অধিকতর সংগত। তারপর যখন যায়েদ তার (স্ত্রীর) সাথে প্রয়োজন শেষ করল(৩), তখন আমরা তাকে আপনার নিকট বিয়ে দিলাম(৪), যাতে মুমিনদের পোষ্য পুত্রদের স্ত্রীদেরকে (স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে) কোন সমস্যা না হয় যখন তারা (পোষ্য পুত্ররা) নিজ স্ত্রীর সাথে প্রয়োজন শেষ করবে (এবং তালাক দিবে)। আর আল্লাহ্–র আদেশ কার্যকর হয়েই থাকে।
তাফসীর:
(১) অর্থাৎ “স্মরণ করুন যখন আল্লাহ ও আপনি নিজে যার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, তাকে বলছিলেন যে, তুমি নিজের স্ত্রীকে তোমার বিবাহাধীনে থাকতে দাও।” এ ব্যক্তি হলো যায়েদ। আল্লাহ তাকে ইসলামে দীক্ষিত করে তার প্রতি প্রথম অনুগ্রহ প্ৰদৰ্শন করেন। যায়েদ রাদিয়াল্লাহু আনহু যায়নাব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহার সম্পর্কে ভাষাগত শ্রেষ্ঠত্ব, গোত্ৰগত কৌলিন্যভিমান এবং আনুগত্য ও শৈথিল্য প্রদর্শনের অভিযোগ উত্থাপন করতেন। একদিন যায়েদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর খেদমতে এসব অভিযোগ পেশ করতে গিয়ে যায়নবকে তালাক দেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেনঃ “নিজ স্ত্রীকে তোমার বিবাহধীনে থাকতে দাও এবং আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর।” [দেখুন: বাগভী; ফাতহুল কাদীর; তাবারী]
(২) এর ব্যাখ্যা এই যে, আপনি অন্তরে যে বিষয় গোপন রেখেছেন তা এ বাসনা যে, যায়েদ রাদিয়াল্লাহু আনহু যয়নবকে তালাক দিলে পরে আপনি তাকে বিয়ে করবেন। [ফাতহুল কাদীর; বাগভী]
(৩) অর্থাৎ যায়েদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু যখন নিজের স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দিলেন এবং তার ইদ্দত পুরা হয়ে গেলো। “প্রয়োজন পূর্ণ করলো” শব্দগুলো স্বতঃস্ফৰ্তভাবে একথাই প্রকাশ করে যে, তার কাছে যায়েদের আর কোন প্রয়োজন থাকলো না। [মুয়াস্সার; ফাতহুল কাদীর]
(৪) অর্থাৎ আপনার সাথে তার বিয়ে স্বয়ং আমরা সম্পন্ন করে দিয়েছি। এর ফলে একথা বোঝা যায় যে, এ বিয়ে স্বয়ং আল্লাহ নিজেই সম্পন্ন করে দেয়ার মাধ্যমে বিয়ে-শাদীর সাধারণভাবে প্রচলিত শর্তাবলীর ব্যতিক্রম ঘটিয়ে এ বিয়ের প্রতি বিশেষ মর্যাদা আরোপ করেছেন। [তাবারী; বাগভী]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৩৭) স্মরণ কর, আল্লাহ যাকে অনুগ্রহ করেছেন এবং তুমিও যার প্রতি অনুগ্রহ করেছ, তুমি তাকে বলেছিলে, ‘তুমি তোমার স্ত্রীকে ত্যাগ করো না এবং আল্লাহকে ভয় কর।” আর তুমি তোমার অন্তরে যা গোপন করছিলে আল্লাহ তা প্রকাশ করে দিচ্ছেন; তুমি লোককে ভয় করছিলে, অথচ আল্লাহকেই ভয় করা তোমার পক্ষে অধিকতর সঙ্গত।[1] অতঃপর যায়েদ যখন তার (স্ত্রী যয়নাবের) সাথে বিবাহ-সম্পর্ক ছিন্ন করল,[2] তখন আমি তোমার সাথে তার বিবাহ দিলাম;[3] যাতে বিশ্বাসীদের পোষ্যপুত্রগণ নিজ স্ত্রীদের সাথে বিবাহসূত্র ছিন্ন করলে সে সব রমণীকে বিবাহ করায় তাদের কোন বিঘ্ন না থাকে।[4] আর আল্লাহর আদেশ কার্যকর হয়েই থাকে।[5]
তাফসীর:
[1] কিন্তু যেহেতু তাঁদের মন-মানসিকতায় পার্থক্য ছিল, স্ত্রীর মনে বংশ-মর্যাদা ও আভিজাত্য বাসা বেঁধেই ছিল, অন্য দিকে যায়েদের সমভ্রমে ছিল দাসত্বের দাগ। ফলে তাঁদের আপোসে কলহ লেগেই থাকত, যা যায়েদ (রাঃ) মাঝে মাঝে নবী (সাঃ)-এর নিকট প্রকাশ করতেন এবং ত্বালাক দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করতেন। কিন্তু নবী (সাঃ) তাঁকে ত্বালাক দিতে নিষেধ করতেন ও কোন রকম ভাবে চালিয়ে নেওয়ার জন্য বলতেন। অপর দিকে আল্লাহ তাআলা নবী (সাঃ)-কে অহীর মাধ্যমে এই ভবিষ্যদ্বাণী করে দিয়েছিলেন যে, যায়েদের পক্ষ থেকে ত্বালাক হবে এবং তারপর যয়নাবের সাথে তোমার বিয়ে হবে; যাতে জাহেলিয়াতের পোষ্যপুত্র রাখার প্রথার উপর জোর কুঠারাঘাত হেনে প্রকাশ করে দেওয়া হবে যে, শরীয়তের দৃষ্টিতে পোষ্যপুত্র আপন পুত্রের মত নয় এবং তার ত্বালাক দেওয়া স্ত্রীকে বিবাহ করা বৈধ। উক্ত আয়াতে এই কথার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। যায়েদ (রাঃ)-এর উপর আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ এই ছিল যে, তিনি তাঁকে দ্বীন ইসলাম গ্রহণ করার তাওফীক দান করেন এবং দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করেন। আর নবী (সাঃ)-এর তাঁর প্রতি দয়া এই ছিল যে, তিনি তাঁকে দ্বীনী তরবিয়ত দান করেন ও তাঁকে স্বাধীন করে আপন পুত্র বানিয়ে নেন এবং আপন ফুফু উমাইমা বিনতে আব্দুল মুত্তালেবের মেয়ের সাথে তাঁর বিবাহ সম্পন্ন করেন। অন্তরে গোপন করা কথা তাই ছিল, যা তাঁকে যয়নাবের সাথে তাঁর নিজের বিয়ের ব্যাপারে অহী দ্বারা জানানো হয়েছিল। নবী (সাঃ) এই কথার ভয় করতেন যে, লোকে বলবে, ছেলের স্ত্রীকে (পুত্রবধূকে) বিয়ে করে নিয়েছে। অথচ যখন আল্লাহ তাঁর দ্বারা এই প্রথার মূল উৎপাটন করতে চান, তখন মানুষকে ভয় করার কোন প্রয়োজন ছিল না। নবী (সাঃ)-এর যদিও এটা প্রকৃতিগত ভয় ছিল, তবুও তাঁকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। প্রকাশ করার অর্থ হল যে, এ বিবাহ হবে, যাতে এ ব্যাপারে সকলে অবগত হয়ে যায়।
[2] অর্থাৎ, বিয়ের পর ত্বালাক দিল এবং যয়নাব ইদ্দত পূর্ণ করল।
[3] অর্থাৎ, এ বিয়ে স্বয়ং আল্লাহ পাকের আদেশে সাধারণ বিয়ে-শাদীর প্রচলিত নিয়ম ও শর্তাবলী থেকে ব্যতিক্রম ভাবে সুসম্পন্ন হয়। অর্থাৎ ঈজাব-কবুল, অলী (অভিভাবক), মোহর এবং কোন সাক্ষী ছাড়াই।
[4] এটি হল যয়নাবের সাথে নবী (সাঃ)-এর বিয়ের কারণ। আর তা এই যে, আগামীতে কোন মুসলিম যেন এই ব্যাপারে কোন সংকীর্ণতা বোধ না করে এবং প্রয়োজনে পোষ্যপুত্রের ত্বালাক দেওয়া স্ত্রীকে বিবাহ করতে পারে।
[5] অর্থাৎ, পূর্ব থেকে তকদীরে লেখা ছিল। যা যে কোন অবস্থাতেই হওয়ার ছিল।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৩৭ নং আয়াতের তাফসীর:
শানে নুযূল:
আনাস বিন মালিক (رضي الله عنه) হতে বর্ণিত
(وَتُخْفِيْ فِيْ نَفْسِكَ مَا اللّٰهُ مُبْدِيْهِ)
-এ আয়াতটি যয়নব বিনতে জাহাশ ও যায়েদ বিন হারেসার ব্যাপারে নাযিল হয়। (সহীহ বুখারী হা: ৪৭৮৭, সহীহ মুসলিম হা: ৮৬, ১৪২৮)
উক্ত আয়াতে “যার প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন এবং তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)ও অনুগ্রহ করেছেন” বলে উল্লেখ করা হয়েছে সে ব্যক্তিটি হল রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পালক পুত্র যায়েদ বিন হারেসা। সেই অনুগ্রহ ছিল এই যে, আল্লাহ তা‘আলা তাকে দীন ইসলাম গ্রহণ করার সুযোগ দিয়েছেন এবং তাকে দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করেছেন। তার প্রতি নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর অনুগ্রহ ছিল এই যে, তিনি তাকে দীনি তরবিয়ত দান করেন ও তাকে স্বাধীন করে পুত্র বানিয়ে নেন এবং আপন ফুফু উমাইয়া বিনতে আবদুল মুত্তালিবের মেয়ের সাথে বিবাহ দেন।
“مبديه” যে বিষয়টি প্রকাশ করে দিয়েছিলেন সেটি হল, আল্লাহ তা‘আলা মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সঙ্গে যয়নবকে পুনরায় বিবাহ দেবেন।
(فَلَمَّا قَضٰي زَيْدٌ مِّنْهَا وَطَرًا....)
যখন যয়নবের ইদ্দত পূর্ণ হয়ে গেল তখন আল্লাহ তা‘আলা তাকে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করিয়ে দিলেন। হাদীসে এসেছে, আনাস (رضي الله عنه) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: যখন যয়নব তার ইদ্দত পূর্ণ করল তখন রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যায়েদ বিন হারেসাকে বললেন: তুমি যাও এবং তাকে আমার ব্যাপারে স্মরণ করিয়ে দাও অর্থাৎ আমার বিবাহের প্রস্তাব পৌঁছে দাও যায়েদ তার নিকট গেল, যখন তিনি আটা খামীর করছিলেন। যায়েদ বলেন: যখন আমি তাকে দেখলাম তখন তার শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা আমার ওপর এমনভাবে প্রাধান্য পেয়ে গেল যে, আমি তার দিকে তাকিয়ে কথা বলব, এমন সামর্থ্য ছিল না। কারণ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে বিবাহের প্রস্তাব দিয়েছেন। বরং আমি মুখ ফিরিয়ে বসলাম এবং তাকে বললাম, তুমি সুসংবাদ গ্রহণ কর আল্লাহ তা‘আলার রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তোমাকে প্রস্তাব দিয়েছেন। যয়নব বলল: আমি আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশ ছাড়া কিছুই করব না। তখন তিনি সালাতে দাঁড়ালেন, এদিকে কুরআন নাযিল হয়ে গেল এবং রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার গৃহে তার অনুমতি ছাড়াই প্রবেশ করলেন। (মুসনাদ আহমাদ হা: ১৯৫-১৯৬, নাসায়ী হা: ১১৪১০, সহীহ)
অন্য এক হাদীসে রয়েছে যে, আনাস হতে বর্ণিত, যয়নব (رضي الله عنها) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর অন্যান্য স্ত্রীদের কাছে গর্ব করে বলতেন, তোমাদের বিবাহ দিয়েছেন তোমাদের পরিবার। আর আমার বিবাহ দিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ তা‘আলা সপ্তম আকাশের ওপর থেকে। (সহীহ বুখারী হা: ৭৪২০)
এ বিবাহ দেয়ার সবচেয়ে বড় একটি কারণ আল্লাহ তা‘আলা বর্ণনা করেছেন যে, যাতে করে মানুষেরা এটা মনে করা থেকে বিরত থাকে যে, পোষ্য-পুত্রদের স্ত্রীদেরকে বিবাহ করা বৈধ নয়। যেমনটি জাহেলী যুগে চালু ছিল। এ আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলা জানিয়ে দিলেন যে, পোষ্য-পুত্রদের স্ত্রীদেরকে বিবাহ করা বৈধ, এরা আপন ছেলেদের মত নয়।
আল্লাহ তা‘আলা:
(وَحَلَآئِلُ أَبْنَآئِكُمُ الَّذِيْنَ مِنْ أَصْلَابِكُمْ لا وَأَنْ تَجْمَعُوْا بَيْنَ الْأُخْتَيْنِ إِلَّا مَا قَدْ سَلَفَ ط إِنَّ اللّٰهَ كَانَ غَفُوْرًا رَّحِيْمًا)
“তোমাদের ঔরসজাত পুত্রবধুকে এবং দুই বোনকে একসাথে বিয়ে করাও হারাম করা হয়েছে। তবে আগে যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, অতি দয়ালু।” (সূরা নিসা ৪:২৩)
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. মানুষের প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শন করতে হবে, কঠোর হওয়া যাবে না। তবে কারণবশত সেটি ভিন্ন কথা।
২. সদা-সর্বদা আল্লাহ তা‘আলাকেই ভয় করা উচিত। আর আল্লাহ তা‘আলাই এ ব্যাপারে অধিক হকদার।
৩. ইদ্দত পূর্ণ হওয়ার পূর্বে কোন তালাক প্রাপ্তা মহিলাকে বিবাহ করা যাবে না।
৪. পোষ্যপুত্রদের স্ত্রীদের বিবাহ করা বৈধ, তাই তাদের সাথে পর্দা করে চলা ওয়াজিব।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় আযাদকৃত গোলাম হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা (রাঃ)-কে বিশেষভাবে বুঝিয়েছেন। তার উপর আল্লাহ তাআলার বিশেষ মেহেরবানী ছিল। তাঁকে তিনি ইসলাম ও নবী (সঃ)-এর অনুসরণ করার তাওফীক দান করেছিলেন। তাঁর প্রতি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিশেষ আকর্ষণ ছিল। তাঁকে তিনি গোলামী হতে মুক্তি দান করেছিলেন। তিনি বড়ই জাঁকজমকপূর্ণ লোক ছিলেন। তিনি(আরবি) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অত্যন্ত প্রিয়পাত্র ছিলেন। এমন কি সমস্ত মুসলমান তাঁকে রাসূলের প্রিয়’ নামে আখ্যায়িত করেছিলেন। তাঁর পুত্র হযরত উসামা (রাঃ)-কে (আরবি) ‘প্রিয়ের প্রিয়’ নামে সবাই সম্বোধন করতেন। হযরত আনাস (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, কোন স্থানে সৈন্য পাঠালে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকেই দলের নেতা মনোনীত করতেন। যদি তিনি শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকতেন তবে তাকেই হয়তো তিনি তাঁর খলীফা নিযুক্ত করে যেতেন।
হযরত উসামা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমি এক সময় মসজিদে অবস্থান করছিলাম এমন সময় আমার কাছে হযরত আব্বাস (রাঃ) ও হযরত আলী (রাঃ) আসলেন ও বললেনঃ “যান, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট হতে আমাদের জন্যে অনুমতি নিয়ে আসেন।” আমি গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ খবর দিলাম। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তারা কি জন্যে এসেছে তা তুমি জান কি?` আমি উত্তর দিলামঃ জ্বি না। তখন তিনি বললেনঃ “আমি কিন্তু জানি। যাও, তাদেরকে ডেকে আনো।” তাঁরা এলেন এবং বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! বলুন তো, আপনার পরিবারে আপনার কাছে সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তি কে? তিনি জবাবে বললেনঃ “আমার কন্যা ফাতিমা (রাঃ)। তাঁরা বললেনঃ “আমরা হযরত ফাতিমা (রাঃ) সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করিনি।” তখন তিনি বললেনঃ “উসামা ইবনে যায়েদ ইবনে হারেসা (রাঃ), যাকে আল্লাহ তাআলা পুরস্কৃত করেছেন এবং আমিও যার প্রতি স্নেহশীল।”
রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় ফুফু উমাইমা বিনতে আবদিল মুত্তালিব (রাঃ)-এর কন্যা হযরত যয়নাব বিনতে জাহশ আসাদিয়্যা (রাঃ)-এর সাথে তাঁর (যায়েদ রাঃ -এর) বিয়ে দিয়েছিলেন। মোহর হিসেবে দশ দীনার (স্বর্ণ মুদ্রা) ও সাত দিরহাম (রৌপ্য মুদ্রা) প্রদান করেছিলেন। আর দিয়েছিলেন একখানা শাড়ী, একখানা চাদর এবং একটি জামা। আরো দিয়েছিলেন পঞ্চাশ মুদ্দ (ওযন বিশেষ) শস্য ও দশ মুদ্দ খেজুর। এক বছর অথবা তা থেকে কিছু কম-বেশী সময়ের মধ্যে নিজ সংসার তিনি গুছিয়ে নিয়েছিলেন। পরে তাদের মনোমালিন্য শুরু হয়ে যায়। হযরত যায়েদ (রাঃ) গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট অভিযোগ করেন। তিনি তাকে বুঝিয়ে বললেনঃ “সংসার ভেঙ্গে দিয়ো না এবং আল্লাহকে ভয় কর।” এই জায়গায় ইবনে আবি হাতিম (রঃ) এবং ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) সঠিক নয় এরূপ বহু আসার বর্ণনা করেছেন, যেগুলো বর্ণনা করা উচিত নয় মনে করে আমরা ছেড়ে দিলাম। কেননা ওগুলোর মধ্যে একটিও প্রমাণিত ও সঠিক নয়। মুসনাদে আহমাদেও হযরত আনাস (রাঃ) হতে একটি রিওয়াইয়াত রয়েছে। কিন্তু তাতেও বড়ই অস্বাভাবিকতা পরিলক্ষিত হয়। এ জন্যে আমরা ওটাও বর্ণনা করলাম না।
সহীহ বুখারীতে রয়েছে যে, এ আয়াতটি হযরত যয়নাব বিনতে জাহশ (রাঃ) ও হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা (রাঃ)-এর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে।
মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে যে, যয়নাব বিনতে জাহশ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সহধর্মিণী হবেন একথা পূর্বে আল্লাহ তাকে অবহিত করেছিলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ) একথাটি প্রকাশ করেননি। তিনি হযরত যায়েদ (রাঃ)-কে বুঝিয়ে বলেছিলেনঃ “তুমি তোমার স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক বজায় রাখো এবং আল্লাহকে ভয় কর।” তাই আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে বলেনঃ “তুমি তোমার অন্তরে যা গোপন করছে আল্লাহ তা প্রকাশ করে দিচ্ছেন।”
হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “যদি হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) তাঁর উপর অহীকৃত কিতাবুল্লাহর কোন আয়াত গোপন করতেন তবে অবশ্যই (আরবি)-এ আয়াতটিই গোপন করতেন।” (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
(আরবি) শব্দের অর্থ হলো প্রয়োজন। ভাবার্থ হচ্ছেঃ যখন হযরত যায়েদ (রাঃ)-এর মন ভেঙ্গে গেল এবং বহু বুঝানোর পরেও তাদের মনোমালিন্য কাটলো না, বরং তালাক হয়ে গেল তখন আল্লাহ তা'আলা হযরত যয়নাব (রাঃ)-কে স্বীয় নবী (সঃ)-এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করলেন। এজন্যে অলী, প্রস্তাব-সমর্থন, মহর এবং সাক্ষীদের কোন প্রয়োজন থাকলো না।
মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, যখন হযরত যয়নাব (রাঃ)-এর ইদ্দত পূর্ণ হয়ে গেল তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা (রাঃ)-কে বললেনঃ “তুমি যাও এবং তাকে আমার বিবাহের পয়গাম পৌঁছিয়ে দাও।` হযরত যায়েদ (রাঃ) গেলেন। ঐ সময় হযরত যয়নাব (রাঃ) আটা ঠাসছিলেন। হযরত যায়েদ (রাঃ)-এর উপর তার শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা এমনভাবে ছেয়ে গেল যে, সামনে থেকে তার সাথে কথা বলতে পারলেন না। বরং তিনি মুখ ফিরিয়ে বসে পড়লেন এবং রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর প্রস্তাব শুনিয়ে দিলেন। হযরত যয়নাব (রাঃ) তখন তাকে বললেনঃ “থামুন, আমি আল্লাহ তাআলার নিকট ইসতিখারা (লক্ষণ দ্বারা শুভাশুভ বিচার) করে নিই।” অতঃপর তিনি দাড়িয়ে নামায পড়তে শুরু করলেন। আর এদিকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর অহী অবতীর্ণ হলো এবং তাকে বলা হলো: “আমি তাকে তোমার সাথে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ করলাম।” সুতরাং নবী (সঃ) কোন খবর না দিয়ে সেখানে চলে গেলেন। ওলীমার দাওয়াতে তিনি সাহাবীদেরকে গোশত ও রুটি খাওয়ালেন। সব লোক খাওয়া-দাওয়া শেষ করে চলে গেলেন। কতিপয় লোক সেখানে বসে থেকে খোশ-গল্পে মত্ত হয়ে পড়লো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বের হয়ে তাঁর অন্যান্য স্ত্রীদের নিকট গেলেন। তিনি তাদেরকে সালাম দিচ্ছিলেন। তাঁরা তাঁকে জিজ্ঞেস করছিলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! বলুন, আপনি আপনার স্ত্রীকে (যয়নাব রাঃ-কে) কিরূপ পেয়েছেন?` বর্ণনাকারী হযরত আনাস (রাঃ) বলেনঃ “লোকেরা তার বাড়ী হতে চলে গেছে এ খবর আমি তাঁকে দিলাম কি অন্য কারো মাধ্যমে তাঁকে এ খবর দেয়া হলো তা আমার জানা নেই। এরপর তিনি তাঁর বাড়ীতে গেলেন। আমিও তার সাথে ছিলাম। আমি তার সাথে তার বাড়ীতে যাওয়ার ইচ্ছা করলাম। কিন্তু তিনি পর্দা ফেলেদিলেন। ফলে আমার ও তাঁর মধ্যে আড় হয়ে গেল। ঐ সময় পর্দার আয়াত অবতীর্ণ হলো এবং তিনি সাহাবীদের যা উপদেশ দেয়ার তা দিলেন। মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ “তোমরা নবী (সঃ)-এর বাড়ীতে তাঁর অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করো।” (৩৩:৫৩) (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম মুসলিম (রঃ) ও ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত যয়নাব (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অন্যান্য স্ত্রীদের কাছে গর্ব করে বলতেনঃ “তোমাদের বিয়ে দিয়েছেন তোমাদের অভিভাবক ও ওয়ারিশরা। আর আমার বিয়ে দিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা সপ্তম আকাশের উপর।” (এটা ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
সূরায়ে নূরের তাফসীরে আমরা এ রিওয়াইয়াতটি বর্ণনা করেছি যে, হযরত যয়নাব (রাঃ) বলেছিলেনঃ “আমার বিবাহ আকাশ হতে অবতীর্ণ হয়েছে।” তাঁর একথার জবাবে হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “আমার নিষ্কলুষতা ও সতীত্বের আয়াতগুলো আকাশ হতে অবতীর্ণ হয়েছে।” হযরত যয়নাব (রাঃ) তাঁর একথা স্বীকার করে নেন।
হযরত শা’বী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা হযরত যয়নাব (রাঃ) নবী (সঃ)-কে বললেনঃ “আল্লাহ তা'আলা আমার মধ্যে তিনটি বিশেষত্ব রেখেছেন যা আপনার অন্যান্য স্ত্রীদের মধ্যে নেই। প্রথম এই যে, আমার নানা ও আপনার দাদা একই ব্যক্তি। দ্বিতীয় এই যে, আপনার সাথে আমার বিবাহ আল্লাহ তা'আলা আকাশে পড়িয়েছেন। আর তৃতীয় হলো এই যে, আমাদের মাঝে সংবাদবাহক ছিলেন হযরত জিবরাঈল (আঃ) (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আমি তার সাথে তোমার বিবাহ বৈধ করলাম, যাতে মুমিনদের পোষ্যপুত্ররা নিজ স্ত্রীর সাথে বিবাহসূত্র ছিন্ন করলেই সেই সব রমণীকে বিবাহ করায় মুমিনদের কোন বিঘ্ন না হয়। আরবে এ প্রথা চালু ছিল যে, পোষ্যপুত্রদের স্ত্রীদের বিয়ে করা বৈধ নয়। এ আয়াত দ্বারা তাদের ঐ কু-প্রথাকে উঠিয়ে দেয়া হলো। কারণ আরব দেশে এ ধরনের পুত্র বহু বাড়ীতে বিদ্যমান ছিল। হযরত যয়নাব (রাঃ)-এর জন্যে এ গৌরব প্রথম থেকেই আল্লাহর ইলমে নির্ধারিত ছিল যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পবিত্র ও সতী-সাধ্বী স্ত্রীদের অন্তর্ভুক্ত হবেন।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।