আল কুরআন


সূরা আল-আহযাব (আয়াত: 21)

সূরা আল-আহযাব (আয়াত: 21)



হরকত ছাড়া:

لقد كان لكم في رسول الله أسوة حسنة لمن كان يرجو الله واليوم الآخر وذكر الله كثيرا ﴿٢١﴾




হরকত সহ:

لَقَدْ کَانَ لَکُمْ فِیْ رَسُوْلِ اللّٰهِ اُسْوَۃٌ حَسَنَۃٌ لِّمَنْ کَانَ یَرْجُوا اللّٰهَ وَ الْیَوْمَ الْاٰخِرَ وَ ذَکَرَ اللّٰهَ کَثِیْرًا ﴿ؕ۲۱﴾




উচ্চারণ: লাকাদ কা-না লাকুমফীরাছূলিল্লা-হি উছওয়াতুনহাছানাতুল লিমান কা-না ইয়ারজুল্লা-হা ওয়াল ইয়াওমাল আখিরা ওয়া যাকারাল্লা-হা কাছীরা-।




আল বায়ান: অবশ্যই তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ তাদের জন্য যারা আল্লাহ ও পরকাল প্রত্যাশা করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২১. অবশ্যই তোমাদের জন্য রয়েছে রাসূলুল্লাহর মধ্যে উত্তম আদর্শ(১), তার জন্য যে আশা রাখে আল্লাহ ও শেষ দিনের এবং আল্লাহকে বেশী স্মরণ করে।




তাইসীরুল ক্বুরআন: তোমাদের জন্য আল্লাহর রসূলের মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে যারা আল্লাহ ও শেষ দিনের আশা রাখে আর আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে।




আহসানুল বায়ান: (২১) তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও পরকালকে ভয় করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে[1] তাদের জন্য রাসূলুল্লাহর (চরিত্রের) মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে। [2]



মুজিবুর রহমান: তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে তাদের জন্য রাসূলের অনুসরণের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।



ফযলুর রহমান: তোমাদের জন্য আল্লাহর রসূলের মাঝে উত্তম এক আদর্শ রয়েছে; (কেবল) তার জন্য যে আল্লাহ ও শেষ দিনের (সাক্ষাতের) আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে।



মুহিউদ্দিন খান: যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্যে রসূলুল্লাহর মধ্যে উত্তম নমুনা রয়েছে।



জহুরুল হক: তোমাদের জন্য নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌র রসূলের মধ্যে রয়েছে এক অত্যুৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত তার জন্য যে আল্লাহ্‌কে ও আখেরাতের দিনকে কামনা করে আর আল্লাহ্‌কে প্রচুর পরিমাণে স্মরণ করে!



Sahih International: There has certainly been for you in the Messenger of Allah an excellent pattern for anyone whose hope is in Allah and the Last Day and [who] remembers Allah often.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ২১. অবশ্যই তোমাদের জন্য রয়েছে রাসূলুল্লাহর মধ্যে উত্তম আদর্শ(১), তার জন্য যে আশা রাখে আল্লাহ ও শেষ দিনের এবং আল্লাহকে বেশী স্মরণ করে।


তাফসীর:

(১) এরপর অকপট ও খাঁটি মুসলিমগণের বর্ণনা প্রসঙ্গে এদের অসম দৃঢ়তার প্রশংসা করা হয়েছে। এরই প্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অনুসরণ অনুকরণের প্রয়োজনীয়তা ও অপরিহার্যতাকে মূলনীতিরূপে বর্ণনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য রাসূলের মধ্যে উত্তম অনুপম আদর্শ রয়েছে’। এদ্বারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণীসমূহ ও কার্যাবলী উভয়ই অনুসরণের হুকুম রয়েছে বলে প্রমাণিত হয়। [দেখুন: মুয়াস্‌সার]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (২১) তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও পরকালকে ভয় করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে[1] তাদের জন্য রাসূলুল্লাহর (চরিত্রের) মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে। [2]


তাফসীর:

[1] অর্থাৎ হে মুসলিমগণ এবং হে মুনাফিকদল! তোমাদের জন্য রসূল (সাঃ)-এর ব্যক্তিত্বে উত্তম আদর্শ রয়েছে, অতএব তোমরা জিহাদে এবং ধৈর্যশীলতা ও পদদৃঢ়তায় তাঁরই অনুসরণ কর। মহানবী (সাঃ) ক্ষুধার্ত থেকে জিহাদ করেছেন; এমনকি তাঁকে পেটে পাথর বাঁধতে হয়েছে। তাঁর চেহারা মুবারক যখম হয়েছে, তাঁর দাঁত ভেঙ্গে গেছে, তিনি নিজ হাতে পরিখা খনন করেছেন এবং প্রায় এক মাস শত্রু বাহিনীর অবরোধের মুখে সাহসিকতার সাথে মুকাবেলা করেছেন। উক্ত আয়াত যদিও আহযাব যুদ্ধের সময় অবতীর্ণ হয়েছে, যাতে যুদ্ধের সময় বিশেষভাবে রসূল (সাঃ)-এর আদর্শকে সামনে রাখা ও তাঁর অনুসরণ করার আদেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এটি একটি ব্যাপক আদেশ। অর্থাৎ নবী (সাঃ)-এর সকল কথা, কাজ ও অবস্থাতে মুসলিমের জন্য তাঁর অনুসরণ আবশ্যিক; তা ইবাদত সম্পর্কিত হোক বা সমাজ সম্পর্কিত, জীবিকা সম্পর্কিত হোক বা রাজনীতি সম্পর্কিত, জীবনের সকল ক্ষেত্রে তাঁরই নির্দেশ পালন করা একান্ত কর্তব্য। (ومَآاََتَكُمُ الرَّسُوْلُ فَخُذُوْهُ ) সূরা হাশরের ৭নং আয়াত এবং (اِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّوْنَ اللهَ) সূরা আলে ইমরানের ৩১নং আয়াতের দাবীও তাই।

[2] এই আয়াতে পরিষ্কার হয়ে গেল যে, রসূল (সাঃ)-এর আদর্শে ঐ ব্যক্তি আদর্শবান হবে, যে কিয়ামতের দিন আল্লাহর সাথে সাক্ষাতে বিশ্বাসী এবং যে বেশি বেশি আল্লাহকে স্মরণ করে থাকে। বর্তমানে অধিকাংশ মুসলমান উক্ত দুই গুণ থেকে বঞ্চিত। যার ফলে তাদের অন্তরে রসূল (সাঃ)-এর আদর্শের কোন গুরুত্ব নেই। এদের মধ্যে যারা দ্বীনদার তাদের আদর্শ হল পীর ও বুযুর্গরা। আর যারা দুনিয়াদার বা রাজনৈতিক তাদের আদর্শ ও পথপ্রদর্শক হল পাশ্চাত্যের নেতারা। রসূল (সাঃ)-এর প্রতি ভক্তি ও ভালোবাসার কথা এরা মুখে খুব দাবী করে, কিন্তু কার্যতঃ তাঁকে নিজেদের আদর্শ, নেতা ও পথপ্রদর্শক মানার ব্যাপারে অধিকাংশই পিছনে। সুতরাং এ বিচার আল্লাহই করবেন।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ২১-২৭ নং আয়াতের তাফসীর:



মুসলিমদের উত্তম আদর্শের প্রতীক একমাত্র নাবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। তাই তাঁর জীবন ও কর্ম থেকে প্রত্যেক মুসলিম জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জীবনের সর্বক্ষেত্রে আদর্শ গ্রহণ করবে। আজ বিভিন্ন দল, তরীকা ও সম্প্রদায়ের অনুসারীরা তাদের নেতা ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তির আদর্শের দিকে আহ্বান করে থাকে। কখনো একজন মুসলিম রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আদর্শ বর্জন করে অন্য কোন ব্যক্তির আদর্শ গ্রহণ করতে পারে না। কেননা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর জীবনাদর্শে রয়েছে ইহকালীন কল্যাণ ও পরকালীন মুক্তি। পৃথিবীতে এমন কোন ব্যক্তি নেই যার সকল কথা ও কাজ পালনীয় ও অনুসরণীয়, কেবলমাত্র রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ব্যতীত। একমাত্র রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সমস্ত কথা, কাজ ও অবস্থা আনুগত্য ও অনুসরণযোগ্য। প্রতিটি স্থান, কাল ও পাত্রে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আদর্শ অনুসরণ করলে মুসলিমরা আবার সে স্বর্ণ যুগে ফিরে যেতে পারবে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যেভাবে কথা বলেছেন, কাজ করেছেন, এমনকি যুদ্ধে রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যে ধৈর্য, সহনশীলতা ও বীরত্বের অতুলনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তা অবশ্যই অনুসরণীয়। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিপদে কখনো বিচলিত হননি। বরং সর্বদা আল্লাহ তা‘আলার সাহায্য প্রার্থনা করেছেন। আল্লাহ তা‘আলার বাণী:



(أَمْ حَسِبْتُمْ أَنْ تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَأْتِكُمْ مَّثَلُ الَّذِيْنَ خَلَوْا مِنْ قَبْلِكُمْ ط مَسَّتْهُمُ الْبَأْسَآءُ وَالضَّرَّآءُ وَزُلْزِلُوْا حَتّٰي يَقُوْلَ الرَّسُوْلُ وَالَّذِيْنَ اٰمَنُوْا مَعَهُ مَتٰي نَصْرُ اللّٰهِ ط أَلَآ إِنَّ نَصْرَ اللّٰهِ قَرِيْبٌ)‏



“তোমরা কি ধারণা করেছ যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে? অথচ তোমাদের পূর্ববর্তীদের মত সংকটময় অবস্থা এখনো তোমাদের ওপর আসেনি। তাদেরকে বিপদ ও দুঃখ স্পর্শ করেছিল এবং তাদেরকে কাঁপিয়ে তুলা হয়েছিল। এমনকি রাসূল ও তার সাথে ঈমান আনয়নকারীরা শেষপর্যন্ত বলেছিল, কখন আল্লাহর সাহায্য আসবে? জেনে রাখ, নিশ্চয়ই আল্লাহর সাহায্য নিকটবর্তী।” (সূরা বাকারাহ ২:২১৪)



নাফি‘(رحمه الله) হতে বর্ণিত যে, ইবনু উমার (رضي الله عنه) তাঁর ছেলে আব্দুল্লাহ ইবনু আবদুল্লাহ এর নিকট গেলেন যখন তাঁর (হাজ্জ যাত্রার) বাহন প্রস্তুত, তখন তাঁর ছেলে বললেন: আমার আশংকা হয় এ বছর মানুষের মধ্যে লড়াই হবে, তারা আপনাকে কাবায় যেতে বাধা দেবে। কাজেই এবার নিবৃত্ত হওয়াটাই উত্তম। তখন ইবনু উমার (رضي الله عنه) বললেন: আল্লাহ তা‘আলার রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একদা রওনা হয়েছিলেন, কুরাইশ কাফিররা তাঁকে বাইতুল্লাহ যেতে বাধা দিয়েছিল। আমাকেও যদি বাইতুল্লাহ যেতে বাধা দেয়া হয়, তবে আল্লাহ তা‘আলার রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যা করেছিলেন আমিও তাই করব। কেননা “নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ” (সূরা আহযাব ২১)। এরপর তিনি বললেন: তোমরা সাক্ষী থেকো, আমি উমরাহর সাথে হাজ্জ এর নিয়ত করলাম। নাফি‘ বলেন: তিনি মক্কায় উপনীত হয়ে উভয়টির জন্য মাত্র একটি তাওয়াফ করলেন। (সহীহ বুখারী হা: ১৬৩৯)



সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আদর্শ তারাই মনে প্রাণে গ্রহণ করে নিতে পারবে যারা পরকালের সফলতা কামনা করে। তাই আমাদের উচিত হবে যদি আমরা পরকালীন কল্যাণ ও সফলতা চাই তাহলে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আদর্শ অনুরসণ করব। কোন কাজ করার পূর্বে ভেবে দেখব, এ কাজ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) করেছেন কিনা। আর করে থাকলে তিনি তা কিভাবে করেছেন সেভাবেই করতে হবে।



এরপর আল্লাহ তা‘আলা যুদ্ধের কঠিন মুহূর্তে যখন মুসলিম বাহিনীকে তাঁর সাহায্য পাঠিয়ে বিজয়ী করলেন, যারা প্রকৃত মু’মিন ছিল তারা বুঝতে পারলেন এটা আল্লাহ তা‘আলার ও তাঁর রাসূলের ওয়াদার বাস্তবরূপ। ফলে তাদের ঈমান বহুগুণে বৃদ্ধি পেল। এখানে সুস্পষ্টভাবে বুঝা যাচ্ছে, আল্লাহ তা‘আলার নিদর্শন ও সাহায্য পেলে ঈমান বৃদ্ধি পায়। এ সম্পর্কে সূরা ফাতহ-এর ৪ ও সূরা তাওবার ১২৪ নং আয়াতে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।



(مِنَ الْمُؤْمِنِيْنَ رِجَالٌ.....) শানে নুযূল:



আনাস (رضي الله عنه) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমার চাচা আনাস বিন নযর বদর যুদ্ধে অনুপস্থিত ছিলেন। তখন তিনি বললেন: হে আল্লাহ তা‘আলার রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! আপনি মুশরিকদের সাথে প্রথম যে যুদ্ধ করেছেন আমি তাতে অনুপস্থিত ছিলাম। আল্লাহ তা‘আলা যদি আমাকে মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগদান করার সুযোগ দেন তাহলে দেখিয়ে দেব যে, আমি কী করছি। অতঃপর যখন উহুদ যুদ্ধের সময় আসল তখন তিনি দেখতে পেলেন যে, সা‘দ বিন মুআয (رضي الله عنه) পেছনে ফিরে আসছেন। তখন তিনি তাকে বললেন: হে সা‘দ বিন মুআয! আল্লাহ তা‘আলার শপথ আমি এ দিক থেকে জান্নাতের সুগন্ধ পাচ্ছি। তখন সে সামনের দিকে অগ্রসর হল এবং জিহাদ করতে করতে শহীদ হয়ে গেল। তখন তাঁর গায়ে আশিটিরও বেশি যখমের চিহ্ন পাওয়া গিয়েছিল। কোনটা বর্শার আবার কোনটা তরবারীর। তাঁর ব্যাপারেই এ আয়াতটি নাযিল হয়। (সহীহ বুখারী হা: ২৮০৫, সহীহ মুসলিম হা: ১৯০৩)



আয়িশাহ (رضي الله عنها) অত্র আয়াতের তাফসীরে বলেন: এদের অন্তর্ভুক্ত হলেন তালহা বিন উবাইদুল্লাহ যিনি উহুদের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে ছিলেন এমনকি ৭০ এর অধিক তীরবিদ্ধ হয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছিলেন: তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে গেছে। (সিলসিলা সহীহাহ হা: ৯৪৫)



জনৈক সাহাবী অজ্ঞ গ্রাম্য ব্যক্তিকে বললেন: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞেস করুন ‘তাদের মধ্যে কেউ কেউ শাহাদাত বরণ করেছে’ তারা কারা? সাহাবীরা সহজে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে প্রশ্ন করার সাহস পেত না। সে গ্রাম্য ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুখ ফিরিয়ে নেন, এভাবে দুবার হয়। সে সাহাবী বলছেন: আমি মাসজিদের দরজা দিয়ে আসছি তখন আমার গায়ে সবুজ কাপড় ছিল, যখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে দেখলেন তখন বললেন: প্রশ্নকারী কোথায়? সেই গ্রাম্য ব্যক্তি বলল: আমি হে আল্লাহ তা‘আলার রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: এ হল সেই ব্যক্তিদের একজন। (তিরমিযী হা: ৩২০৩, সিলসিলা সহীহাহ হা: ১২৬)



(فَمِنْهُمْ مَّنْ قَضٰي نَحْبَه)- نَحْبَه অর্থ ارادته ومطلوبه



অর্থাৎ তাদের অনেকে তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করেছে এবং তাদের ওপর যে হক ছিল তা আদায় করে আল্লাহ তা‘আলার রাস্তায় শাহাদাত বরণ করেছে। আর কেউ কেউ দুটি প্রতিদানের একটির অপেক্ষায় রয়েছে। দুটি প্রতিদান হলন এক. সাহায্য-সহযোগিতা, দুই. আল্লাহ তা‘আলার পথে শাহাদাত বরণ। (তাফসীর মুয়াসসার)



আল্লাহ তা‘আলা যুদ্ধ-জিহাদ শরীয়ত সিদ্ধ করে দিয়েছেন যাতে সত্যবাদীদেরকে তাদের ওয়াদা সত্যে পরিণত করার প্রতিদান দিতে পারেন।



অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(قَالَ اللّٰهُ هٰذَا يَوْمُ يَنْفَعُ الصّٰدِقِيْنَ صِدْقُهُمْ ط لَهُمْ جَنّٰتٌ تَجْرِيْ مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهٰرُ خٰلِدِيْنَ فِيْهَآ أَبَدًا ط رَضِيَ اللّٰهُ عَنْهُمْ وَرَضُوْا عَنْهُ ط ذٰلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيْمُ)‏



“আল্লাহ বলবেন, ‘এ সেদিন যেদিন সত্যবাদীগণ তাদের সত্যতার জন্য উপকৃত হবে, তাদের জন্য আছে জান্নাত যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত। তারা সেখানে চিরস্থায়ী হবে; আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট; এটা মহাসফলতা।’ (সূরা মায়িদা ৫:১১৯) আর আল্লাহ তা‘আলা ইচ্ছা করলে মুনাফিকদেরকে তাদের কর্মের কারণে শাস্তি দেবেন অথবা তাওবা করার সুযোগ দিলে তাওবা করতে পারবে ফলে আল্লাহ তা‘আলা ক্ষমা করে দেবেন।



(وَرَدَّ اللّٰهُ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا بِغَيْظِهِمْ)



‘আল্লাহ কাফিরদেরকে তাদের ক্রোধ সহকারে ফিরিয়ে দিয়েছেন’ অর্থাৎ কাফিররা খুব আশা নিয়ে এসেছিল তারা যুদ্ধে বিজয়ী হবে, কিন্তু মু’মিনদেরকে আল্লাহ তা‘আলা সাহায্য করেছিলেন বিধায় কাফিররা বিজয়ী হতে পারেনি। সে কথাই বলা হচ্ছে: আল্লাহ তা‘আলা কাফিরদেরকে তাদের ক্রোধসহ ফিরিয়ে দিলেন, তারা কোন কল্যাণ তথা বিজয় অর্জন করতে পারেনি। আয়িশাহ  বলেন: এখানে কাফির দ্বারা উদ্দেশ্য হল আবূ সুফিয়ান ও উআইনা বিন বদর। আবূ সুফিয়ান ফিরে এসেছিল তুহামাহ এলাকায়, আর উআইনা ফিরে এসেছিল নাজদে। (কুরতুবী)



(وَأَوْرَثَكُمْ أَرْضَهُمْ وَدِيٰرَهُمْ.....)



‘আর তিনি তোমাদেরকে উত্তরাধিকারী করে দিলেন তাদের জমিনের’ এ আয়াত দ্বারা বানী কুরাইযার যুদ্ধের কথা বলা হয়েছে। যেমন হাদীসে এসেছে:



আয়িশাহ (رضي الله عنها) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খন্দকের যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে অস্ত্র সরঞ্জামাদী রাখলেন এবং গোসল শেষ করলেন। এমতাবস্থায় তাঁর নিকট জিবরীল (عليه السلام) এসে বললেন, আপনি অস্ত্র সরঞ্জামাদী রেখে দিয়েছেন? আল্লাহ তা‘আলার শপথ! আমরা (ফেরেশতারা) এখনো অস্ত্র সরঞ্জামাদী রাখিনি। আপনি বানী কুরাইযার সাথে যুদ্ধ করার জন্য বের হন। তখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের সাথে যুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। (সহীহ বুখারী হা: ৪১১৭, সহীহ মুসলিম হা: ১৭৬৯)



এ যুদ্ধের মাধ্যমেই মুসলিম বাহিনীকে ইয়াহূদীদের ঘর-বাড়ি, ভূমি ও ধন-সম্পদের মালিক বানিয়ে দেয়।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. জীবনের সর্বাবস্থায় রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কর্মপদ্ধতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও রাজনীতির অনুসরণ করতে হবে। কেননা তিনি হলেন মানুষের জন্য উত্তম আদর্শ এবং অনুসরণীয় ব্যক্তি।

২. বিপদে বিচলিত হওয়া যাবে না বরং বিপদ যত বড়ই হোক না কেন আল্লাহ তা‘আলার ওপর ভরসা করতে হবে।

৩. ঈমান বৃদ্ধি পায় আবার কমেও যায়।

৪. অঙ্গীকার করার পর তা অবশ্যই পূর্ণ করতে হবে, ভঙ্গ করা যাবে না।

৫. বাতিলকে কখনো কোন প্রকার সাহায্য সহযোগীতা করা যাবে না।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ২১-২২ নং আয়াতের তাফসীর

এ আয়াত ঐ বিষয়ের উপর বড় দলীল যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সমস্ত কথা, কাজ ও অবস্থা আনুগত্য ও অনুসরণের যোগ্য। আহযাবের যুদ্ধে তিনি যে ধৈর্য, সহনশীলতা ও বীরত্বের অতুলনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, যেমন আল্লাহর পথের প্রস্তুতি, জিহাদের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ এবং কাঠিন্যের সময়ও আসমানী সাহায্যের আশা যে তিনি করেছিলেন, এগুলো নিঃসন্দেহে এ যোগ্যতা রাখে যে, মুসলমানরা এগুলোকে জীবনের বিরাট অংশ বানিয়ে নেয়। আর যেন আল্লাহর প্রিয় রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে নিজেদের জন্যে উত্তম নমুনা বানিয়ে নেয় এবং তার গুণাবলী যেন নিজেদের মধ্যে আনয়ন করে। এই কারণেই ভয় ও উদ্বেগ প্রকাশকারী লোকদের জন্যে আল্লাহ পাক কুরআন কারীমে ঘোষণা দেনঃ তোমরা আমার নবী (সঃ)-এর অনুসরণ কর না কেন? আমার রাসূল (সঃ) তো তোমাদের মধ্যেই বিদ্যমান রয়েছেন। তার নমুনা তোমাদের সামনে বিদ্যমান ছিল। তোমাদেরকে তিনি ধৈর্য ও সহনশীলতা অবলম্বনের কথা শুধু শিক্ষাই দিচ্ছেন না বরং কার্যে অটলতা, ধৈর্য এবং দৃঢ়তা তিনি নিজের জীবনেও ফুটিয়ে তুলেছেন। তোমরা যখন আল্লাহর উপর ও কিয়ামতের উপর বিশ্বাসের দাবী করছো তখন তাকে নমুনা বানাতে আপত্তি কিসের?

এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ তাঁর সেনাবাহিনী, খাঁটি মুসলমান এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সত্য সঙ্গীদের পাকা ঈমানের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, মুমিনরা যখন শত্রুপক্ষীয় ভীরু ও কাপুরুষ সম্মিলিত বাহিনীকে দেখলো তখন তারা বলে উঠলো: এটা তো তাই আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) যার প্রতিশ্রুতি আমাদেরকে দিয়েছিলেন এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) সত্যই বলেছিলেন। আর এতে তাদের ঈমান ও আনুগত্যই বৃদ্ধি পেলো।

খুব সম্ভব আল্লাহর যে ওয়াদার দিকে এতে ইঙ্গিত রয়েছে তা সূরায়ে বাকারার নিম্নের আয়াতটিঃ (আরবি)

অর্থাৎ “তোমরা কি মনে কর যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে, যদিও এখনো তোমাদের নিকট তোমাদের পূর্ববর্তীদের অবস্থা আসেনি? অর্থ সংকট ও দুঃখ-ক্লেশ তাদেরকে স্পর্শ করেছিল এবং তারা ভীত ও কম্পিত হয়েছিল।

এমনকি রাসূল এবং তার সাথে ঈমান আনয়নকারীরা বলে উঠেছিলঃ আল্লাহর সাহায্য কখন আসবে? হ্যা, হ্যা, আল্লাহর সাহায্য নিকটেই।” (২:২১৪) অর্থাৎ এটা তো পরীক্ষা মাত্র। এদিকে তোমরা যুদ্ধে অটল থেকেছো, আর ওদিকে আল্লাহর সাহায্য এসেছে। এজন্যেই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আল্লাহ এবং তার রাসূল (সঃ) সত্য বলেছেন এবং এতে তাদের ঈমান ও আনুগত্যই বৃদ্ধি পেলো। অর্থাৎ তাদের ঈমান পূর্ণ হয়ে গেল এবং আনুগত্য আরো বৃদ্ধি পেলো। ঈমান বেশী হওয়ার একটি দলীল এই আয়াতটি এবং অন্যদের তুলনায় তাঁদের ঈমান বেশী হওয়ারও দলীল। জমহুর ইমামগণও একথাই বলেন যে, ঈমান বাড়ে ও কমে। আমরাও সহীহ বুখারীর শরাহের শুরুতে এটা বর্ণনা করেছি। সুতরাং আল্লাহ তা'আলার জন্যেই সমস্ত প্রশংসা।

মহান আল্লাহ তাই বলেনঃ তাদের ঈমান যা ছিল, কঠিন বিপদের সময় তা আরো বৃদ্ধি পেয়ে গেল।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।