সূরা আস-সাজদাহ (আয়াত: 21)
হরকত ছাড়া:
ولنذيقنهم من العذاب الأدنى دون العذاب الأكبر لعلهم يرجعون ﴿٢١﴾
হরকত সহ:
وَ لَنُذِیْقَنَّهُمْ مِّنَ الْعَذَابِ الْاَدْنٰی دُوْنَ الْعَذَابِ الْاَکْبَرِ لَعَلَّهُمْ یَرْجِعُوْنَ ﴿۲۱﴾
উচ্চারণ: ওয়ালানুযীকান্নাহুম মিনাল ‘আযা-বিল আদনা-দূনাল ‘আযা-বিল আকবারি লা‘আল্লাহুম ইয়ারজি‘ঊন।
আল বায়ান: আর অবশ্যই আমি তাদেরকে গুরুতর আযাবের পূর্বে লঘু আযাব আস্বাদন করাব, যাতে তারা ফিরে আসে।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২১. আর অবশ্যই আমরা তাদেরকে মহা শাস্তির পূর্বে কিছু লঘু শাস্তি আস্বাদন করাব(১), যাতে তারা ফিরে আসে।
তাইসীরুল ক্বুরআন: গুরুতর শাস্তির আগে আমি তাদেরকে অবশ্য অবশ্যই লঘু শাস্তি আস্বাদন করাবো যাতে তারা (অনুশোচনা নিয়ে) ফিরে আসে।
আহসানুল বায়ান: (২১) গুরু শাস্তির পূর্বে ওদেরকে আমি অবশ্যই লঘু শাস্তি[1] আস্বাদন করাব, যাতে ওরা (আমার পথে) ফিরে আসে। [2]
মুজিবুর রহমান: বড় শাস্তির পূর্বে তাদেরকে আমি অবশ্যই লঘু শাস্তি আস্বাদন করাব, যাতে তারা ফিরে আসে।
ফযলুর রহমান: আর আমি তাদেরকে (আখেরাতের) বড় শাস্তির পূর্বে অবশ্যই (দুনিয়ার) ছোট ছোট শাস্তি (নানারকম বিপদাপদ) আস্বাদন করাব, যাতে তারা (সঠিক পথে) ফিরে আসে।
মুহিউদ্দিন খান: গুরু শাস্তির পূর্বে আমি অবশ্যই তাদেরকে লঘু শাস্তি আস্বাদন করাব, যাতে তারা প্রত্যাবর্তন করে।
জহুরুল হক: আর আমরা অবশ্যই লঘু শাস্তি থেকে তাদের আস্বাদন করাব বৃহত্তর শাস্তির উপরি, যেন তারা ফিরে আসে।
Sahih International: And we will surely let them taste the nearer punishment short of the greater punishment that perhaps they will repent.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ২১. আর অবশ্যই আমরা তাদেরকে মহা শাস্তির পূর্বে কিছু লঘু শাস্তি আস্বাদন করাব(১), যাতে তারা ফিরে আসে।
তাফসীর:
(১) নিকটতম শাস্তি বা ‘ছোট শাস্তি’ বলে বোঝানো হয়েছে, এ দুনিয়ায় মানুষ যেসব কষ্ট পায় সেগুলো। যেমন, ব্যক্তিগত জীবনে কঠিন রোগ, নিজের প্ৰিয়তম লোকদের মৃত্যু, ভয়াবহ দুৰ্ঘটনা, মারাত্মক ক্ষতি, ব্যর্থতা ইত্যাদি। আর বৃহত্তর শাস্তি বা ‘বড় শাস্তি’ বলতে আখেরাতের শাস্তি বোঝানো হয়েছে। কুফরী ও ফাসেকীর অপরাধে এ শাস্তি দেয়া হবে। [মুয়াস্সার]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (২১) গুরু শাস্তির পূর্বে ওদেরকে আমি অবশ্যই লঘু শাস্তি[1] আস্বাদন করাব, যাতে ওরা (আমার পথে) ফিরে আসে। [2]
তাফসীর:
[1] العَذَاب الأَدنَى (ছোট, লঘু বা নিকটতম শাস্তি) বলে ইহলৌকিক শাস্তি বা বিপদাপদ ও রোগ-ব্যাধিকে বুঝানো হয়েছে। অনেকের নিকট এর অর্থ হল, বদর যুদ্ধে কাফেররা হত্যার মাধ্যমে যে কষ্ট পেয়েছিল সেই শাস্তি। অথবা মক্কাবাসীদের উপর যে দুর্ভিক্ষ এসেছিল তা উদ্দেশ্য। অথবা কবরের আযাবকে বুঝানো হয়েছে। ইমাম শওকানী (রঃ) বলেন, উল্লিখিত সব অর্থই উদ্দেশ্য হতে পারে।
[2] পারলৌকিক বৃহত্তম শাস্তির পূর্বে ক্ষুদ্রতম বা লঘু শাস্তি প্রেরণ করার কারণ হল, সম্ভবতঃ তারা কুফর ও শিরক এবং আল্লাহর অবাধ্যাচরণ করা থেকে বিরত হবে।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১৮-২২ নং আয়াতের তাফসীর:
মু’মিন আর বে-ঈমান কখনো সমান হতে পারে না, বরং তাদের মধ্যে রয়েছে আকাশ-পাতাল তফাৎ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(أَمْ حَسِبَ الَّذِيْنَ اجْتَرَحُوا السَّيِّاٰتِ أَنْ نَّجْعَلَهُمْ كَالَّذِيْنَ اٰمَنُوْا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ لا سَوَا۬ءً مَّحْيَاهُمْ وَمَمَاتُهُمْ ط سَا۬ءَ مَا يَحْكُمُوْنَ)
“যারা খারাপ কাজ করে তারা কি মনে করে যে, আমি জীবন ও মৃত্যুর দিক দিয়ে তাদেরকে সেসব ব্যক্তিদের সমান গণ্য করব যারা ঈমান আনে ও আমল করে? তাদের সিদ্ধান্ত কতই না মন্দ।” (সূরা জাসিয়া ৪৫:২১) আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
(أَمْ نَجْعَلُ الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ كَالْمُفْسِدِيْنَ فِي الْأَرْضِ ز أَمْ نَجْعَلُ الْمُتَّقِيْنَ كَالْفُجَّارِ)
“যারা ঈমান এনেছে এবং সৎ কাজ করেছে আমি কি তাদেরকে ঐসব লোকের সমান করে দেব, যারা পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করে বেড়ায়? অথবা আমি কি মুত্তাক্বীদেরকে গুনাহগারদের সমান করে দেব?” (সূরা সোয়াদ ৩৮:২৮)
মু’মিনরা থাকবে জান্নাতুল মাওয়াতে, যা তাদের আমলের প্রতিদানে আপ্যায়নস্বরূপ প্রদান করা হবে। পক্ষান্তরে যারা পাপী তারা থাকবে জাহান্নামে, তারা সেখান থেকে বের হতে পারবে না এবং সেখান থেকে পরিত্রাণও পাবে না। আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
(كُلَّمَآ أَرَادُوْآ أَنْ يَّخْرُجُوْا مِنْهَا مِنْ غَمٍّ أُعِيْدُوْا فِيْهَا ق وَذُوْقُوْا عَذَابَ الْحَرِيْقِ)
“যখনই তারা যন্ত্রণাকাতর হয়ে জাাহান্নাম হতে বের হতে চাইবে তখন তাদেরকে ফিরিয়ে দেয়া হবে তাতে; (তাদেরকে বলা হবে) ‘আস্বাদ কর দহন-যন্ত্রণা।’’ (সূরা হজ্জ ২২:২২)
(الْعَذَابِ الْأَدْنٰي) দ্বারা ইহলৌকিক শাস্তি বা বিপদ-আপদ ও রোগ-ব্যাধিকে বুঝানো হয়েছে। (الْعَذَابِ الْأَكْبَرِ) দ্বারা পারলৌকিক শাস্তি অর্থাৎ জাহান্নামের শাস্তিকে বুঝানো হয়েছে।
এরপর আল্লাহ সর্বাধিক বড় জালিমের পরিচয় বর্ণনা করে বলছেন: যে ব্যক্তিকে আল্লাহ তা‘আলার আয়াত স্মরণ করিয়ে দেয়ার পরেও সে আয়াত থেকে বিমুখ হয় সেই হচ্ছে সবচেয়ে বড় জালিম।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. মু’মিনদের শেষ পরিণতি জান্নাত ও কাফিরদের জাহান্নাম।
২. আল্লাহর দীন সম্পর্কে জানার পরেও যে তা পালনে বিরত থাকবে সে-ই বড় জালিম এবং তার শাস্তিও হবে বড়।
৩. কাফির জাহান্নাম থেকে বের হতে চাইবে কিন্তু তারা সেখান থেকে বের হতে পারবে না।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১৮-২২ নং আয়াতের তাফসীর
আল্লাহ তা'আলার আদল, ইনসাফ ও করুণার কথা এখানে বর্ণনা করা হচ্ছে। তিনি সকর্মশীল ও পাপাচারীকে সমান চোখে দেখেন না। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যারা মন্দ কাজে লিপ্ত আছে তারা কি মনে করে যে, আমি তাদেরকে ঈমানদার ও সঙ্কৰ্মশীলদের মত করবো? তাদের জীবন ও মরণ সমান। তাদের অভিসন্ধি কতই জঘন্য!” (৪৫:২১) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ “যারা ঈমান আনে ও সঙ্কর্ম করে তাদেরকে কি আমি ঐ লোকদের মত করবো যারা ভূপৃষ্ঠে বিশৃংখলা সৃষ্টি করে? অথবা আমি কি আল্লাহভীরুদেরকে পাপাচারীদের মত করবো?” (৩৮:২৮) অন্য এক জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ ‘জাহান্নামের অধিবাসী ও জান্নাতের অধিবাসী সমান নয়।' (৫৯:২০)
এখানেও বলা হয়েছে যে, কিয়ামতের দিন মুমিন ও কাফির এক মর্যাদার লোক হবে না। বলা হয়েছে যে, এ আয়াত হযরত আলী (রাঃ) এবং উকবাহ ইবনে আবি মুঈতের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়।
অতঃপর আল্লাহ তা'আলা এই দুই প্রকারের লোকের বিস্তারিত বর্ণনা দিচ্ছেন যে, যে ব্যক্তি আন্তরিকতার সাথে আল্লাহর কালামের সত্যতা স্বীকার করে ও ওটা অনুযায়ী আমল করে তাকে এমন জান্নাত দেয়া হবে যেখানে বাড়ী ঘর রয়েছে, অট্টালিকা রয়েছে, উঁচু উঁচু প্রাসাদ রয়েছে এবং শান্তিতে বসবাসের উপযোগী সমস্ত উপকরণ রয়েছে। এটা হবে তার ভাল কাজের বিনিময়ে আপ্যায়ন। পক্ষান্তরে যারা আনুগত্য ছেড়ে দিয়েছে তাদের বাসস্থান হবে জাহান্নাম, যেখান হতে তারা বের হতে পারবে না। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবি)
অর্থাৎ “যখনই তারা তথাকার (জাহান্নামের) দুঃখ-কষ্ট হতে বের হতে চাইবে তখনই তাদেরকে ফিরিয়ে দেয়া হবে।” (২২:২২)।
হযরত ফুয়েল ইবনে আইয়ায (রঃ) বলেনঃ “আল্লাহর কসম! তাদের হাত-পা বাঁধা থাকবে। অগ্নিশিখা তাদেরকে নিয়ে উপরে-নীচে যাওয়া-আসা করবে। ফেরেশতারা তাদেরকে শাস্তি দিতে থাকবেন।”
তাদেরকে ধমক দিয়ে বলা হবেঃ যে অগ্নির শাস্তিকে তোমরা মিথ্যা বলতে তা আস্বাদন কর। (আরবি) বা লঘু শাস্তি দ্বারা পার্থিব বিপদ-আপদ, দুঃখ-কষ্ট, ব্যথা-বেদনা, রোগ-শোক ইত্যাদিকে বুঝানো হয়েছে। এগুলো এ জন্যেই দেয়া হয় যে, যেন মানুষ সতর্ক হয়ে যায় ও আল্লাহর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে এবং পারলৌকিক ভীষণ শাস্তি হতে পরিত্রাণ লাভ করতে পারে। একটি উক্তি এও আছে যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো পাপসমূহের ঐ নির্ধারিত শাস্তি যা দুনিয়ায় দেয়া হয়ে থাকে, যাকে শরীয়তের পরিভাষায় হুদূদ বলা হয়। এও বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা কবরের শাস্তিকে বুঝানো হয়েছে। সুনানে নাসাঈতে রয়েছে যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো দুর্ভিক্ষ। হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) বলেন যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত হওয়া, ধূম্র বহির্গত হওয়া, ধর-পাকড় হওয়া, ধ্বংসাত্মক শাস্তি হওয়া, বদরের যুদ্ধে কাফিরদের বন্দী ও নিহত হওয়া। কেননা, বদর-যুদ্ধের এ পরাজয়ের কারণে মক্কার ঘরে ঘরে শোলে ও বিলাপের ছায়া পড়ে গিয়েছিল। এই আয়াতে এই আযাবের প্রতিই ইঙ্গিত করা হয়েছে।
এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের নিদর্শনাবলী দ্বারা উপদিষ্ট হয়ে তা হতে মুখ ফিরিয়ে নেয় তার চেয়ে অধিক যালিম আর কে আছে?
হযরত কাতাদা (রঃ) বলেনঃ আল্লাহর যিকর হতে মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না। যারা এরূপ করে তারা মর্যাদাহীন, নীতি বিহীন ও বড় পাপী।
এখানেও মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ ঘোষণা করেনঃ আমি অবশ্যই অপরাধীদেরকে শাস্তি প্রদান করে থাকি।
হযরত মুআয ইবনে জাবাল (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ তিনটি কাজ যে করে সে পাপী হয়ে যায়। যে অন্যায়ভাবে পতাকা বাঁধে অথবা পিতা-মাতার অবাধ্যাচরণ করে কিংবা যালিমের সাহায্যার্থে তার সাথে গমন করে, সে পাপী হয়ে থাকে। আর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ অবশ্যই আমি অপরাধী ও পাপীদের হতে প্রতিশোধ গ্রহণকারী। (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইবনে আবি হাতিমও (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটা খুবই গরীব বা দুর্বল হাদীস)
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।