আল কুরআন


সূরা আর-রুম (আয়াত: 17)

সূরা আর-রুম (আয়াত: 17)



হরকত ছাড়া:

فسبحان الله حين تمسون وحين تصبحون ﴿١٧﴾




হরকত সহ:

فَسُبْحٰنَ اللّٰهِ حِیْنَ تُمْسُوْنَ وَ حِیْنَ تُصْبِحُوْنَ ﴿۱۷﴾




উচ্চারণ: ফাছুবহা-নাল্লা-হি হীনা তুমছূনা ওয়া হীনা তুসবিহূন।




আল বায়ান: অতএব তোমরা আল্লাহর তাসবীহ কর, যখন সন্ধ্যায় উপনীত হবে এবং সকালে উঠবে ।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৭. কাজেই(১) তোমরা আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর যখন তোমরা সন্ধ্যা কর এবং যখন তোমরা ভোর কর,




তাইসীরুল ক্বুরআন: অতএব তোমরা আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর যখন তোমরা সন্ধ্যায় উপনীত হও আর সকালে,




আহসানুল বায়ান: (১৭) সুতরাং তোমরা সন্ধ্যায় ও ভোর সকালে আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর



মুজিবুর রহমান: সুতরাং তোমরা আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর সন্ধ্যায় ও প্রভাতে –



ফযলুর রহমান: অতএব, তোমরা আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনা করো সন্ধ্যায় (মাগরিব ও এশা) ও সকালে (ফজর)।



মুহিউদ্দিন খান: অতএব, তোমরা আল্লাহর পবিত্রতা স্মরণ কর সন্ধ্যায় ও সকালে,



জহুরুল হক: সেজন্য আল্লাহ্‌র মহিমা ঘোষিত হোক যখন তোমরা বিকেল প্রাপ্ত হও এবং যখন তোমরা ভোরে পৌঁছাও।



Sahih International: So exalted is Allah when you reach the evening and when you reach the morning.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১৭. কাজেই(১) তোমরা আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর যখন তোমরা সন্ধ্যা কর এবং যখন তোমরা ভোর কর,


তাফসীর:

(১) এখানে ف শব্দটি পূর্ববর্তী বাক্যের জন্য কারণ সূচক। [আত-তাহরীর ওয়াত তানওয়ীর] তাই অনুবাদ করা হয়েছে, “কাজেই”। আয়াতে তাসবীহ, তাহমীদ দ্বারা যিকর উদ্দেশ্য হতে পারে। [সা’দী] তাছাড়া সালাত উত্তমরূপেই আয়াতের মধ্যে দাখিল আছে বলা যায়। [কুরতুবী] এ কারণেই কোন কোন আলেম বলেন, এই আয়াতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ও সেসবের সময়ের বর্ণনা আছে। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমাকে কেউ জিজ্ঞেস করল, কুরআনে পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের স্পষ্ট উল্লেখ আছে কি? তিনি বললেন, হ্যাঁ। অতঃপর তিনি প্রমাণ হিসেবে এই আয়াত পেশ করলেন (فَسُبْحَانَ اللَّهِ حِينَ تُمْسُونَ) এর অর্থ মাগরিবের সালাত, (وَحِينَ تُصْبِحُونَ) শব্দে ফজরের সালাত, عَشِيًّا দ্বারা আসরের সালাত এবং حِينَ تُظْهِرُونَ শব্দে যোহরের সালাত উল্লেখিত হয়েছে। অন্য এক আয়াতে (وَمِنْ بَعْدِ صَلَاةِ الْعِشَاءِ) [সূরা আন-নূর: ৫৮] এশার সালাতের কথা এসেছে।” [মুস্তাদরাকে হাকিম: ২/৪৪৫, নং ৩৫৪১] অবশ্য হাসান বসরী রাহেমাহুল্লাহর মতে (حِينَ تُمْسُونَ) মাগরিব ও এশা উভয় সালাতই উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে। [বাইহাকী, সুন্নানুল কুবরা: ১/৩৫৯] সে হিসেবে এ সূরাতেই সমস্ত সালাতের উল্লেখ আছে বলা যায়।

এ ছাড়াও সালাতের ওয়াক্ত সম্পর্কে কুরআন মজিদে আরো যেসব ইশারা করা হয়েছে সেগুলো হচ্ছেঃ “সালাত কায়েম করো সূর্য ঢলে পড়ার পর থেকে রাতের অন্ধকার পর্যন্ত এবং ফজরের সময় কুরআন পাঠ করো।” [সূরা আল-ইসরা: ৭৮] আরো এসেছে, “আর সালাত কায়েম করো দিনের দুই মাথায় এবং রাতের কিছু অংশে।” [সূরা হূদ: ১১৪] অন্যত্র এসেছে, “আর তোমার রবের প্রশংসা সহকারে তাঁর মহিমা ও পবিত্রতা ঘোষণা করো সূর্য উদিত হবার আগে এবং তার অস্ত যাবার আগে। আর রাতের কিছু সময়ও আল্লাহর মহিমা ও পবিত্রতা ঘোষণা করো এবং দিনের প্রান্তভাগেও”। [সূরা ত্বা-হা: ১৩০] এভাবে সারা দুনিয়ার মুসলিমরা আজ যে পাঁচটি সময়ে সালাত পড়ে থাকে। কুরআন মজীদ বিভিন্ন স্থানে সে সময়গুলোর প্রতি ইংগিত করেছে।


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (১৭) সুতরাং তোমরা সন্ধ্যায় ও ভোর সকালে আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর


তাফসীর:

-


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ১১-১৭ নং আয়াতের তাফসীর:



(اَللّٰهُ يَبْدَؤُا الْخَلْقَ ثُمَّ يُعِيْدُهُ)



এখানে পুনরায় বস্তুবাদীদের বিশ্বাসকে খণ্ডন করা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন এবং দুনিয়ার কর্মের হিসাব-নিকাশের জন্য তিনিই পূর্বের ন্যায় সৃষ্টি পুনরাবৃত্তি করবেন। অর্থাৎ দুনিয়াতে যে আকৃতি ও অবয়ব দিয়ে সৃষ্টি করেছেন সে আকৃতিতেই পুনরুত্থান করবেন, কিঞ্চিৎ পরিমাণ পরিবর্তন হবে না। সুতরাং সকলকে তাঁর দিকে ফিরে যেতে হবে এতে কোন সংশয় নেই।



(يُبْلِسُ الْمُجْرِمُوْنَ)



‘সেদিন পাপীরা হতাশ হয়ে পড়বে।’ যেদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে সেদিন পাপীরা নিজেদের ব্যাপারে একেবারে নিরাশ হয়ে যাবে। কারণ সুপারিশ পাওয়ার আশায় যে সকল মা‘বূদের ইবাদত করত তারা কোন সুপারিশ করতে পারবে না। বরং তারা আল্লাহ তা‘আলাকে বাদ দিয়ে যাদের ইবাদত করত তাদেরকেই অস্বীকার করবে। এ সম্পর্কে সূরা মারইয়াম ৮২ নং আয়াতসহ অন্যান্য সূরাতেও আলোচনা করা হয়েছে।



(يَوْمَئِذٍ يَّتَفَرَّقُوْنَ)



‘সেদিন মানুষ আলাদা আলাদা হয়ে যাবে।’ অর্থাৎ মু’মিনরা কাফিরদের থেকে আলাদা হয়ে যাবে। কিভাবে আলাদা হবে তা পরের দু’আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। যারা ঈমান এনেছে ও সৎ আমল করেছে তারা জান্নাতে চলে যাবে এবং সেখানে তারা আনন্দ-উল্লাসে থাকবে। পক্ষান্তরে যারা কাফির ও মুশরিক তারা জাহান্নামে চলে যাবে এবং তারা সেখানে কঠিন শাস্তিভোগ করবে।



(فَسُبْحَانَ اللّٰهِ)



অর্থাৎ এটা আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে সংবাদ যে, তিনি সকল অপূর্ণতা, মন্দ ও সাদৃশ্য থেকে পবিত্র। তিনি সকল প্রকার অপূর্ণাঙ্গ গুণ, কোন সৃষ্টির সদৃশ হওয়া থেকে ঊর্ধ্বে। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন সকাল-সন্ধ্যায় তাঁর পবিত্রতা বর্ণনা করা ও একনিষ্ঠভাবে তাঁর ইবাদত করার। ইবনু আব্বাস (رضي الله عنه) বলেন: কুরআনে পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের সময় উল্লেখ করা হয়েছে; বলা হল কোথায়ন তিনি বললেন:



(حِيْنَ تُمْسُوْنَ)



এখানে মাগরীব ও ইশার সালাতের সময় উল্লেখ করা হয়েছে।



(وَحِيْنَ تُصْبِحُوْنَ)



এখানে ফজরের সালাতের সময় উল্লেখ করা হয়েছে। وَعَشِيًّا এখানে আসর সালাতের সময় উল্লেখ করা হয়েছে। (وَّحِيْنَ تُظْهِرُوْنَ) আর এখানে যোহরের সালাতের সময়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।



অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(أَقِمِ الصَّلٰوةَ لِدُلُوْكِ الشَّمْسِ إِلٰي غَسَقِ اللَّيْلِ وَقُرْاٰنَ الْفَجْرِ ط إِنَّ قُرْاٰنَ الْفَجْرِ كَانَ مَشْهُوْدًا)



“সূর্য ঢলে পড়ার পর হতে রাত্রির ঘন অন্ধকার পর্যন্ত‎ সালাত কায়েম কর এবং কায়েম কর ফজরের সালাত। নিশ্চয়ই ফজরের সালাত (ফেরেশতাদের) উপস্থিতির সময়।” (সূরা বানী ইসরাঈল ১৭:৭৮)



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. সৃষ্টিকর্তা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই, অন্য কেউ নয়। সুতরাং তিনিই সকল ইবাদত পাওয়ার যোগ্য।

২. পাপীরা কিয়ামতের মাঠে নিরাশ হয়ে যাবে, তাদের পক্ষে কোন সুপারিশকারী থাকবে না।

৩. সকলকে পুনরুত্থিত হয়ে কর্মের হিসাব দিতে হবে।

৪. কিয়ামতের মাঠে জান্নাতী ও জাহান্নামীরা পৃথক হয়ে যাবে।

৫. সুপারিশ পাওয়ার আশায় আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া অন্য যাদের ইবাদত করা হয় তারা সেদিন কোন উপকার করতে পারবে না।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ১৭-১৯ নং আয়াতের তাফসীর

সেই আল্লাহ তাআলার একচ্ছত্র আধিপত্য এবং সার্বভৌম ও সীমাহীন রাজত্বের প্রকাশ ঘটবে তার তাসবীহ পাঠ ও প্রশংসা কীর্তনের মাধ্যমে। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাদেরকে সে দিকেই পথ নির্দেশ করেছেন। তিনি যে মহান ও পবিত্র এবং তিনি যে প্রশংসার যোগ্য তারই বর্ণনা তিনি দিচ্ছেন। সন্ধ্যায় যখন ঘনঘটা অন্ধকার বয়ে আনে তখন এরপর দিন জ্যোতির্ময় আলোক নিয়ে হাযির হয়। এতোটুকু বর্ণনা করার পর তার পরবর্তী বাক্য বর্ণনা করার আগেই এ কথাগুলো প্রকাশ করে দিয়েছেন যে, দুনিয়া ও আসমানে প্রশংসার যোগ্য একমাত্র তিনিই। তাঁর সৃষ্টিই স্বয়ং তার মর্যাদার ও বুযুর্গীর দলীল। সকাল ও সন্ধ্যার তাসবীহ পাঠের কথা বলার পর এশা ও যোহরের সময়ের কথা তিনি জুড়ে দিয়েছেন। রাত্রি হলো কঠিন অন্ধকারের সময় এবং এশা ও যোহর হলো পূর্ণ অন্ধকার ও আলোকোজ্জ্বলের সময়। নিশ্চয়ই সমস্ত পবিত্রতা ও মহিমা তাঁরই জন্যে শোভনীয় যিনি রাত্রির অন্ধকার ও দিনের ঔজ্জ্বল্য সষ্টিকারী। তিনিই সকালকে প্রকাশকারী ও রাত্রিকে বিশ্রামের জন্যে সৃষ্টিকারী। এ ধরনের আরো বহু আয়াত রয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ “শপথ দিবসের, যখন ওটা (সূর্য) ওকে প্রকাশ করে এবং শপথ রজনীর, যখন ওটা ওকে আচ্ছাদিত করে।` (৯১:৩-৪) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “শপথ পূর্বাহের এবং শপথ রজনীর যখন ওটা হয় নিঝুম।” (৯৩:১-২)।

হযরত মুআয ইবনে আনাস আলজুহনী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে বিশ্বস্ত বন্ধু আখ্যায় কেন আখ্যায়িত করেছেন এ খবর কি দেবো না? কারণ এই যে, সকালে ও সন্ধ্যায় তিনি এই কালেমাগুলো পাঠ করতেন।” অতঃপর তিনি(আরবি) হতে পর্যন্ত দু’টি আয়াত তিলাওয়াত করেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি সকাল সন্ধ্যায় এ আয়াত দু’টি পাঠ করবে, তার দিন-রাতের যা কিছু নষ্ট হয়েছে তা ফিরে পাবে।” (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তিনিই মৃত হতে জীবন্তের আবির্ভাব ঘটান এবং তিনিই জীবন্ত হতে মৃতের আবির্ভাব ঘটিয়ে থাকেন। প্রত্যেক জিনিসের উপর এবং ওর উল্টোর উপর তিনি পূর্ণ ক্ষমতাবান। তিনি বীজ হতে গাছ, গাছ। হতে বীজ, মুরগী হতে ডিম, ডিম হতে মুরগী, বীর্য হতে মানুষ ও মানুষ হতে বীর্য, মুমিন হতে কাফির ও কাফির হতে মুমিন বের করে থাকেন। মোটকথা, তিনি প্রত্যেক বিষয় ও তার প্রতিপক্ষ বিষয়ের উপর পূর্ণ কর্তৃত্ব রাখেন। শুষ্ক মাটিতে তিনি আর্দ্রতা আনয়ন করেন এবং অনুর্বর ভূমি থেকেও তিনি ফসল উৎপাদন করেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ “তাদের জন্যে একটি নিদর্শন মৃত ধরিত্রী, যাকে আমি সঞ্জীবিত করি এবং যা হতে উৎপন্ন করি শস্য যা তারা ভক্ষণ করে। তাতে আমি সৃষ্টি করি খর্জুর ও আঙ্গুরের উদ্যান এবং উৎসারিত করি প্রস্রবণ।` (৩৬:৩৩-৩৪) আর এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)

অর্থাৎ “তুমি ভূমিকে দেখ শুষ্ক, অতঃপর তাতে আমি বারি বর্ষণ করলে তা শস্য-শ্যামল হয়ে আন্দোলিত ও স্ফীত হয় এবং উদ্গত করে সর্বপ্রকার নয়নাভিরাম উদ্ভিদ ...... যারা কবরে আছে তাদেরকে আল্লাহ নিশ্চয়ই পুনরুত্থিত করবেন।” (২২:৫-৭) আরো বহু জায়গায় এ ধরনের আয়াত কোথাও সংক্ষিপ্ত আবার কোথাও বিস্তারিতভাবে তিনি বর্ণনা করেছেন। এখানে আল্লাহ পাক বলেনঃ এভাবেই তোমরাও সবাই মৃত্যুর পরে (কবর হতে) উথিত হবে।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।