সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 88)
হরকত ছাড়া:
وقالوا قلوبنا غلف بل لعنهم الله بكفرهم فقليلا ما يؤمنون ﴿٨٨﴾
হরকত সহ:
وَ قَالُوْا قُلُوْبُنَا غُلْفٌ ؕ بَلْ لَّعَنَهُمُ اللّٰهُ بِکُفْرِهِمْ فَقَلِیْلًا مَّا یُؤْمِنُوْنَ ﴿۸۸﴾
উচ্চারণ: ওয়া কা-লূকূলূবুনা-গুলফুন বাল্লা‘আনাহুমুল্লা-হু বিকুফরিহিম ফাকালীলাম মা-ইউমিনূন।
আল বায়ান: আর তারা বলল, আমাদের অন্তরসমূহ আচ্ছাদিত; বরং তাদের কুফরীর কারণে আল্লাহ তাদেরকে লা‘নত করেছেন। অতঃপর তারা খুব কমই ঈমান আনে।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৮৮. আর তারা বলেছিল, ‘আমাদের অন্তরসমূহ আচ্ছাদিত’, বরং তাদের কুফরীর কারণে আল্লাহ তাদেরকে লা'নত করেছেন। সুতরাং তাদের কম সংখ্যকই ঈমান আনে।
তাইসীরুল ক্বুরআন: তারা দাবী করেছিল যে, ‘আমাদের হৃদয় আচ্ছাদিত’, বরং কুফরী করার কারণে আল্লাহ তাদেরকে অভিসম্পাত করেছেন, অতএব তাদের অল্প সংখ্যকই ঈমান আনে।
আহসানুল বায়ান: ৮৮। তারা বলেছিল, আমাদের হৃদয় আচ্ছাদিত। [1] বরং (কুফরী) সত্য প্রত্যাখ্যানের জন্য আল্লাহ তাদেরকে অভিশাপ দিয়েছেন। সুতরাং তাদের অল্প সংখ্যকই বিশ্বাস করে (ঈমান আনে)। [2]
মুজিবুর রহমান: এবং তারা বলে, আমাদের হৃদয় আবৃত; এবং তাদের অবিশ্বাসের জন্য আল্লাহ তাদেরকে অভিসম্পাত করেছেন - যেহেতু তারা অতি অল্পই বিশ্বাস করে।
ফযলুর রহমান: তারা বলেছিল, “আমাদের অন্তরসমূহ মোড়কবদ্ধ (অর্থাৎ আল্লাহর কথা শুনতে পায় না)।” আসলে তাদের কুফরির কারণে আল্লাহ তাদেরকে অভিশপ্ত করেছেন। তাই তারা কমই বিশ্বাস করে।
মুহিউদ্দিন খান: তারা বলে, আমাদের হৃদয় অর্ধাবৃত। এবং তাদের কুফরের কারণে আল্লাহ অভিসম্পাত করেছেন। ফলে তারা অল্পই ঈমান আনে।
জহুরুল হক: আর তারা বলে -- “আমাদের হৃদয় হলো গেলাফ!” না, আল্লাহ্ তাদের বঞ্চিত করেছেন তাদের অবিশ্বাসের জন্য। তাই যৎসামান্যই যা তারা বিশ্বাস করে।
Sahih International: And they said, "Our hearts are wrapped." But, [in fact], Allah has cursed them for their disbelief, so little is it that they believe.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৮৮. আর তারা বলেছিল, ‘আমাদের অন্তরসমূহ আচ্ছাদিত’, বরং তাদের কুফরীর কারণে আল্লাহ তাদেরকে লা’নত করেছেন। সুতরাং তাদের কম সংখ্যকই ঈমান আনে।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: ৮৮। তারা বলেছিল, আমাদের হৃদয় আচ্ছাদিত। [1] বরং (কুফরী) সত্য প্রত্যাখ্যানের জন্য আল্লাহ তাদেরকে অভিশাপ দিয়েছেন। সুতরাং তাদের অল্প সংখ্যকই বিশ্বাস করে (ঈমান আনে)। [2]
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, হে মুহাম্মাদ! আমাদের উপর তোমার কথার কোনই প্রভাব পড়বে না। যেমন, অন্যত্র আছে,
{وَقَالُوا قُلُوبُنَا فِي أَكِنَّةٍ مِمَّا تَدْعُونَا إِلَيْهِ} অর্থাৎ, তারা বলে, তুমি যার প্রতি আমাদেরকে আহবান করছ, সে বিষয়ে আমাদের অন্তর আবরণে আচ্ছাদিত।’’ (সূরা হা-মীম সিজদা ৫ আয়াত)
[2] অন্তরে কথার প্রভাব সৃষ্টি না হওয়াটা কোন গর্বের ব্যাপার নয়, বরং এটা অভিশপ্ত হওয়ার নিদর্শন। অতএব তাদের ঈমান অতি অল্প (যা আল্লাহর নিকট গ্রহণীয় নয়) অথবা তাদের মধ্যে ঈমান আনার মত লোক খুব কম সংখ্যকই হবে।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৮৮-৯০ নং আয়াতের তাফসীর:
ইয়াহূদীরা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে ঈমান না আনার ওযর পেশ করে বলে আমাদের হৃদয় আচ্ছাদিত। অতএব হে নাবী! তুমি যা বল আমরা তা বুঝতে পারি না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَقَالُوا قُلُوبُنَا فِي أَكِنَّةٍ مِّمَّا تَدْعُونَا إِلَيْهِ)
“তারা বলেঃ তুমি যার প্রতি আমাদেরকে আহ্বান করছো সে বিষয়ে আমাদের অন্তর আবরণে আচ্ছাদিত।”(সূরা হা-মীম সিজদাহ ৪১:৫)
এটা তাদের মিথ্যা বানোয়াট উক্তি বরং আল্লাহ তা‘আলা তাদের কুফরীর কারণে তাদের ওপর লা‘নত করেছেন।
জেনে-বুঝে ইয়াহূদীরা কুরআন ও রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে প্রত্যাখ্যান করেছে- তারই বর্ণনা এখানে দেয়া হয়েছে।
যখন ইয়াহূদী ও আরবের মুশরিকদের মধ্যে যুদ্ধ বাধত তখন ইয়াহূদীরা কাফিরদেরকে বলত, অতি সত্বরই একজন বড় নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহ তা‘আলার সত্য কিতাব নিয়ে আবির্ভুত হবেন। আমরা তাঁর অনুসারী হয়ে তোমাদেরকে এমনভাবে হত্যা করব যে, তোমাদের নাম-নিশানা দুনিয়ার বুক থেকে মুছে যাবে। তারা আল্লাহ তা‘আলার নিকট প্রার্থনা করত: হে আল্লাহ! আপনি অতি সত্বরই ঐ নাবীকে পাঠিয়ে দিন যাঁর গুণাবলী আমরা তাওরাতে পাচ্ছি, যাতে আমরা তাঁর ওপর ঈমান এনে তাঁর সঙ্গ লাভ করত আমাদের বাহু মজবুত করতে পারি। আপনার শত্র“দের প্রতিশোধ নিতে পারি। তারা কাফিরদেরকে বলত যে, ঐ নাবীর আগমনের সময় খুবই নিকটবর্তী হয়েছে।
অতঃপর যখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রেরিত হলেন তখন তারা তাঁর মধ্যে সমস্ত নিদর্শন দেখতে পেল, তাকে চিনতে পারল এবং মনে মনে বিশ্বাস করল। কিন্তু যেহেতু তিনি তাদের বংশদ্ভূত ছিলেন না বিধায় তারা হিংসার বশবর্তী হয়ে তাঁর নবুওয়াতকে অস্বীকার করে বসল। তখন তাদের ওপর আল্লাহ তা‘আলার অভিশাপ নেমে আসল। বরং মদীনার লোকেরা যারা তাদের (ইয়াহূদীদের) মুখেই এ কথা শুনে আসছিল তারা ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নেয় এবং রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সঙ্গী হয়ে ইয়াহূদীদের ওপর বিজয় লাভ করে।
একদা মুয়ায বিন জাবাল (রাঃ) বাসার বিন বারা (রাঃ) এবং দাঊদ বিন সালমা (রাঃ) মদীনার ঐ ইয়াহূদীদেরকে বলেই ফেললেন: ‘তোমরাই তো আমাদের সামনে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নবুওয়াতের আলোচনা করতে, তাঁর যে গুণাবলী তোমরা বর্ণনা করতে তা সবই তাঁর মধ্যে রয়েছে। এমনকি তোমরা তাকে কেন্দ্র করে আমাদেরকে কত কথা শোনাতে আর এখন তোমরাই তার প্রতি ঈমান আনছ না কেন? তার সঙ্গী হচ্ছ না কেন? সালাম বিন মিশকিম উত্তর দেয়: আমরা তাঁর কথা বলতাম না। এ আয়াতের মধ্যে তারই বর্ণনা রয়েছে যে, তারা প্রথম হতেই মানত, অপেক্ষমানও ছিল, কিন্তু তাঁর আগমনের পর হিংসা ও অহঙ্কারবশত এবং শাসন ক্ষমতা হাত ছাড়া হয়ে যাওয়ার ভয়ে আল্লাহ তা‘আলা মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর যা কিছু নাযিল করেছেন তা স্পষ্টভাবে অস্বীকার করে বসে। ফলশ্র“তিতে তাদের ওপর আল্লাহ তা‘আলার ক্রোধ এবং অপমানজনক শাস্তি অবধারিত হলো।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: অহঙ্কারী লোকেদেরকে কিয়ামাতের দিন মানুষের আকারে পিঁপড়ার ন্যায় উঠানো হবে। তাদেরকে সমস্ত জিনিস পদদলিত করে চলে যাবে এবং তাদেরকে জাহান্নামের বুলাস নামক কয়েদখানায় নিক্ষেপ করা হবে, যে স্থানের আগুন অন্য স্থানের আগুন অপেক্ষা অনেক বেশী দাহ্যসম্পন্ন। আর তাদেরকে জাহান্নামের পুঁজ, রক্ত ইত্যাদি পান করানো হবে। (তিরমিযী হা: ২৪৯, মুসনাদ আহমাদ হা: ১৬৭৭. হাদীসটি হাসান সহীহ)
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. অহংকার মানুষকে সত্য গ্রহণে বাধা দেয়, যেমন ইবলিস অহংকারের কারণে বিতাড়িত হয়েছে।
২. অহংকারীদের জাহান্নামের শাস্তির কথা জানতে পারলাম।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ইয়াহূদীরা এ কথাও বলতো যে, তাদের অন্তরের উপর আচ্ছাদন রয়েছে। অর্থাৎ ওটা জ্ঞানে পরিপূর্ণ রয়েছে, সুতরাং এখন আর তাদের জ্ঞানের প্রয়োজন নেই। উত্তরে তাদেরকে বলা হচ্ছে যে, এটা নয়, রবং তাদের অন্তরেরর উপর আল্লাহর লানতের মোহর লেগে গেছে। তাদের ঈমান লাভের সৌভাগ্যই হয় না (আরবি) শব্দটিকে (আরবি) ও পড়া হয়েছে। অর্থাৎ ইলমের বরতন। কুরআন পাকের অন্য জায়গায় আছেঃ “তোমরা যে জিনিসের দিকে আমাদেরকে আহবান করছে ওটা হতে আমাদের অন্তর পর্দার আড়ালে রয়েছে। ওর উপর মোহর লেগে রয়েছে, ওটা (অন্তর) এটা বুঝে না, ওর প্রতি আসক্তও হয় না, ওকে স্মরণও রাখে না। একটি হাদীসের মধ্যেও আছে যে, কতক অন্তর আচ্ছাদনী যুক্ত রয়েছে, যার উপর আল্লাহর অভিশাপ থাকে, এ রকম অন্তর কাফিরদের হয়ে থাকে।
সূরা নিসার মধ্যেও এ অর্থের একটি আয়াত আছে। অল্প ঈমান রাখার একটি অর্থ তো এই যে, তাদের মধ্যে খুব অল্প লোকই ঈমানদার আছে। আর দ্বিতীয় অর্থ এটাও হয় যে, তাদের ঈমান খুবই অল্প। অর্থাৎ যারা হযরত মূসা (আঃ)-এর উপর ঈমান এনেছে তারা কিয়ামত, পুণ্য, শাস্তি ইত্যাদির উপর ঈমান রাখে, তাওরাতকে আল্লাহর কিতাব বলে মেনে থাকে। কিন্তু শেষ নবী (সঃ)-এর উপর ঈমান এনে তাদের ঈমানকে পূর্ণ করে না, বরং তার সঙ্গে কুফরী করতঃ ঐ অল্প ঈমানকেও নষ্ট করে থাকে।
তৃতীয় অর্থ এই যে, তারা সরাসরি বেঈমান। কেননা, আরবী ভাষায় এরূপ স্থলে সম্পূর্ণ না হওয়ার অবস্থাতেও এরকম শব্দ আনা হয়ে থাকে। যেমন আমি এরকম লোক খুব কমই দেখেছি , অর্থাৎ মোটেই দেখিনি। আল্লাহই সবচেয়ে বেশী জানেন।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।