সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 86)
হরকত ছাড়া:
أولئك الذين اشتروا الحياة الدنيا بالآخرة فلا يخفف عنهم العذاب ولا هم ينصرون ﴿٨٦﴾
হরকত সহ:
اُولٰٓئِکَ الَّذِیْنَ اشْتَرَوُا الْحَیٰوۃَ الدُّنْیَا بِالْاٰخِرَۃِ ۫ فَلَا یُخَفَّفُ عَنْهُمُ الْعَذَابُ وَ لَا هُمْ یُنْصَرُوْنَ ﴿۸۶﴾
উচ্চারণ: উলাইকাল্লাযীনাশ তারাউল হায়া-তাদ্দুনইয়া-বিলআ-খিরাতি ফালা- ইউখাফফাফু ‘আনহুমুল ‘আযা-বু ওয়া লাহুম ইউনসারূন।
আল বায়ান: তারা আখিরাতের বিনিময়ে দুনিয়ার জীবনকে খরিদ করেছে। সুতরাং তাদের থেকে আযাব হালকা করা হবে না এবং তারা সাহায্যপ্রাপ্তও হবে না।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৮৬. তারাই সে লোক, যারা আখেরাতের বিনিময়ে দুনিয়ার জীবন ক্রয় করে; কাজেই তাদের শাস্তি কিছুমাত্র কমানো হবে না এবং তাদেরকে সাহায্যও করা হবে না।
তাইসীরুল ক্বুরআন: তারাই পরকালের বিনিময়ে পার্থিব জীবন ক্রয় করে। কাজেই তাদের শাস্তি কম করা হবে না এবং তারা সাহায্যপ্রাপ্তও হবে না।
আহসানুল বায়ান: ৮৬। তারাই পরকালের বিনিময়ে পার্থিব জীবন ক্রয় করেছে, সুতরাং তাদের শাস্তি লাঘব করা হবে না এবং তারা কোন সাহায্যও পাবে না। [1]
মুজিবুর রহমান: এরাই আখিরাতের বিনিময়ে পার্থিব জীবন ক্রয় করেছে, অতএব তাদের দন্ড লঘু করা হবেনা এবং তারা সাহায্য প্রাপ্তও হবেনা।
ফযলুর রহমান: ওরাই পরকালের মূল্যে পার্থিব জীবন ক্রয় করেছে। সুতরাং ওদের শাস্তিও লাঘব করা হবে না এবং ওদেরকে সাহায্যও করা হবে না।
মুহিউদ্দিন খান: এরাই পরকালের বিনিময়ে পার্থিব জীবন ক্রয় করেছে। অতএব এদের শাস্তি লঘু হবে না এবং এরা সাহায্যও পাবে না।
জহুরুল হক: এরাই তারা যারা আখেরাতের বদলে ইহজীবন খরিদ করেছে। তাই তাদের উপর থেকে শাস্তি লাঘব করা হবে না, আর তাদের সাহায্যও দেয়া হবে না।
Sahih International: Those are the ones who have bought the life of this world [in exchange] for the Hereafter, so the punishment will not be lightened for them, nor will they be aided.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৮৬. তারাই সে লোক, যারা আখেরাতের বিনিময়ে দুনিয়ার জীবন ক্রয় করে; কাজেই তাদের শাস্তি কিছুমাত্র কমানো হবে না এবং তাদেরকে সাহায্যও করা হবে না।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: ৮৬। তারাই পরকালের বিনিময়ে পার্থিব জীবন ক্রয় করেছে, সুতরাং তাদের শাস্তি লাঘব করা হবে না এবং তারা কোন সাহায্যও পাবে না। [1]
তাফসীর:
[1] এখানে শরীয়তের কোন বিধানকে মেনে নেওয়া এবং কোন বিধানকে পরিত্যাগ করার শাস্তির কথা বর্ণিত হচ্ছে। আর শাস্তি হল, দুনিয়াতে (পূর্ণ শরীয়তের উপর আমল করলে প্রতিদানে যা পাওয়া যায় সেই) সম্মান ও মর্যাদা লাভের পরিবর্তে লাভ হবে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং আখেরাতে চিরন্তন নিয়ামত ও সুখের পরিবর্তে লাভ হবে কঠিন শাস্তি। এ থেকে এ কথাও সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, আল্লাহর নিকট পূর্ণ আনুগত্যই কেবল গৃহীত হয়। আংশিকভাবে কোন কোন বিধানকে মেনে নেওয়া বা তার উপর আমল করার কোনই মূল্য আল্লাহর নিকট নেই। এই আয়াত মুসলিমদেরকেও চিন্তা-ভাবনা করার প্রতি আহবান জানাচ্ছে যে, মুসলিমরা যে লাঞ্ছনা ও অধঃপতনের শিকার, তার কারণও মুসলিমদের এমন কার্যকলাপ নয় তো, যা ইয়াহুদীদের ব্যাপারে বহু আয়াতে উল্লিখিত হয়েছে?
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৮৫ ও ৮৬ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তা‘আলা ইয়াহূদীদের থেকে যে সকল অঙ্গীকার গ্রহণ করেছেন তারা তা ভঙ্গ করে নিজেরা পরস্পর রক্তপাত, ঝগড়া-বিবাদ শুরু করল। একে অপরকে স্বীয় বাসস্থান থেকে বের করে দিল এবং জমিনে ফাসাদ সৃষ্টি করতে শুরু করল।
মদীনার আনসারদের দু’টি গোত্র ছিল: ১. আউস ও ২. খাযরায। ইসলাম পূর্বযুগে এ গোত্রদ্বয়ের মধ্যে কখনো কোন মিল ছিল না। পরস্পর যুদ্ধ-বিগ্রহ লেগেই থাকত। মদীনার ইয়াহূদীদের তিনটি গোত্র ছিল: ১. বনু-কাইনুকা, ২. বনু নাযীর ও ৩. বনু কুরাইযা।
বনু কাইনুকা ও বনু নাযীর খাযরাজের পক্ষপাতি ছিল এবং তাদের বন্ধুতে পরিণত হয়েছিল। আর বনু কুরাইযার বন্ধুত্ব ছিল আউসের সঙ্গে। আউস ও খাযরাজের মধ্যে যখন যুদ্ধ শুরু হত তখন ইয়াহূদীদের তিনটি দল নিজ নিজ মিত্রের সঙ্গে যোগ দিয়ে শত্র“দের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করত। দুই পক্ষের ইয়াহূদী স্বয়ং তাদেরই হাতে নিহত হত এবং সুযোগ পেলে একে অপরের ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দিত এবং দেশ থেকে তাড়িয়ে দিত। ধন-সম্পদও দখল করে নিত। যুদ্ধ বন্ধ হয়ে গেলে পরাজিত দলের বন্দীদেরকে তারা মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়িয়ে নিত এবং বলত, আমাদের প্রতি আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশ আছে যে, আমাদের মধ্যে যদি কেউ বন্দী হয়ে যায় তবে আমরা যেন তাদেরকে মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়িয়ে নেই। তারই উত্তরে মহান আল্লাহ তাদেরকে বলেছেন: এর কারণ কী যে, আমার এ হুকুম মানছ, কিন্তু আমি তোমাদেরকে বলেছিলাম তোমরা পরস্পর হানাহানি কর না, একে অপরকে বাড়ি হতে বের করে দিও না, তা মানছ না কেন? এক হুকুমের ওপর ঈমান আনা এবং অন্য হুকুমকে অমান্য করা- এটা আবার কোন্ ঈমানদারী? আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(ثُمَّ اَنْتُمْ ھٰٓؤُلَا۬ئِ تَقْتُلُوْنَ اَنْفُسَکُمْ وَتُخْرِجُوْنَ فَرِیْقًا مِّنْکُمْ)
“অনন্তর তোমরাই সেই লোক যারা (পরস্পর) তোমাদের নফসসমূহকে হত্যা করছ এবং তোমরা তোমাদের মধ্য হতে এক দলকে তাদের গৃহ হতে বহিষ্কার করে দিচ্ছ।”(সূরাহ বাকারাহ ২:৮৫)
কারণ তোমরা এক মতের লোক এবং সবাই এক আত্মার মত।
(اَفَتُؤْمِنُوْنَ بِبَعْضِ الْکِتٰبِ) –
‘তবে কি তোমরা গ্রন্থের (তাওরাতের) কিয়দাংশ বিশ্বাস কর’এর পূর্বের অংশ দ্বারা সুস্পষ্ট হয় যে, তারা বন্দীদের মুক্তিপণের ওপরই শুধু ঈমান এনেছিল। আর লোকজনদেরকে স্বীয় বাসস্থান থেকে বের করে দেয়, তাদের সাথে যুদ্ধ করে এ অংশের প্রতি কুফরী করেছিল। যারা এ সমস্ত কর্মকাণ্ড করে আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়াতে তাদের জন্য লাঞ্ছনা ও পরকালে কঠিন শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছেন। এ বিধান শুধু ইয়াহূদীদের জন্য নয় বরং মুসলিমদের জন্যও প্রযোজ্য। অতএব কুরআনের কিছু বিধান মানব আর কিছু বিধান মানব না এমন আচরণ হলে দুনিয়াতে লাঞ্ছনা এবং পরকালে কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. নিজের কুপ্রবৃত্তি বা দলের ও মতের সাথে শরীয়তের যে সকল বিধান মুআফিক হবে তা মানব আর যা মুআফিক হবে না তা মানব না এরূপ করা কুফরী কাজ।
২. আমাদের উচিত ইসলামের সকল বিধানকে মাথা পেতে মেনে নেয়া। অন্যথায় মুসলিম হতে পারব না।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৮৪-৮৬ নং আয়াতের তাফসীর
মদীনার দুটি বিখ্যাত গোত্র এবং তাদের পরস্পর শত্রুতা
মদীনার আনসারদের দুটি গোত্র ছিলঃ (১) আউস ও (২) খাযরা। ইসলামের পূর্বে এই গোত্রদ্বয়ের মধ্যে কখনও কোন মিল ছিল না। পরস্পর যুদ্ধ গ্রিহ লেগেই থাকতো। মদীনার ইয়াহুদীদের তিনটি গোত্র ছিলঃ (১) বান্ কাইনুকা, (২) বানু নাযীর এবং (৩) বানু কুরাইযা। বানূ কাইনুকা ও বানু নাযীর খাযরাজের পক্ষপাতী ছিল এবং তাদের বন্ধুতে পরিণত হয়েছিল। আর বানু কুরাইযার বন্ধুত্ব ছিল আউসের সঙ্গে। আউস ও খাযরাযের মধ্যে যখন যুদ্ধ শুরু হতো তখন ইয়াহুদীদের তিনটি দল নিজ নিজ মিত্রের সঙ্গে যোগ দিয়ে শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতো। দুই পক্ষের ইয়াহূদী স্বয়ং তাদেরই হাতে মারাও পড়তো এবং সুযোগ পেলে একে অপরের ঘর বাড়ী ধ্বংস করতে এবং দেশ থেকে তাড়িয়েও দিতো। ধন-মালও দখল করে নিতে। অতঃপর যুদ্ধ বন্ধ হয়ে গেলে পরাজিত দলের বন্দীদেরকে তারা মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়িয়ে নিতে এবং বলতোঃ “আমাদের প্রতি আল্লাহর নির্দেশ আছে যে, আমাদের মধ্যে যদি কেউ বন্দী হয়ে যায় তবে আমরা যেন তাদেরকে মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়িয়ে নেই। তারই উত্তরে মহান আল্লাহ্ তাদেরকে বলছেনঃ “এর কারণ কি যে, আমার এ হুকুম তো মানছে, কিন্তু আমি তোমাদেরকে বলেছিলাম তোমরা পরস্পর কাটাকাটি করো না, একে অপরকে বাড়ী হতে বের করে দিও না, তা মাননা কেন? এক হুকুমের উপর ঈমান আনা এবং অন্য হুকুমকে অমান্য করা, এটা আবার কোন ঈমানদারী?` আয়াতে আল্লাহ পাক বলেছেনঃ “নিজেদের কুক্ত প্ৰহিত করো না, নিজেদের লোককে তাদের বাড়ী হতে বের করে দিও না। কেননা তোষর এক মাযহাবের লোক এবং সবাই এক আত্মার মত।”
হাদীস শরীফেও আছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সমস্ত মু'মিন প্রম্পর বন্ধুত্ব, দয়া ও সাহায্য-সহানুভূতি করার ব্যাপারে একটি শরীরে মত। কোন একটি অঙ্গের ব্যথায় সমস্ত শরীর অস্থির হয়ে থাকে, শরীরে জ্বর চলে আসে এবং রাত্রে দ্রিা হারিয়ে যায়। এরকমই একজন সাধারণ মুসলমানের বিপদে সারা বিশ্ব জাহানের মুসলমানদের অস্থির হওয়া উচিত।
আব্দ খায়ের (রাঃ) বলেনঃ “আমরা সালমান বিন রাবীর নেতৃত্বে ‘লালজারে’ জিহাদ করছিলাম। ওটা অবরোধের পর আমরা ঐ শহরটি দখল করি। ওর মধ্যে কিছু বন্দীও ছিল। এদের মধ্যে একটি ক্রীতদাসীকে হযরত আবদুল্লাহ বিন সালাম (রাঃ) সাতশো তে কিনে নেন। রাসূল জালুতের নিকট পৌছে হযরত আবদুল্লাহ বিন সালাম (রাঃ)তার নিকট গমন করেন এবং তাকে বলেনঃ “দাসীটি তোমার ধর্মের নারী। আমি একে সাত শোর বিনিময়ে কিনেছি। এখন তুমি তাকে কিনি আযাদ করে দাও।` সে বলেঃ খুব ভাল কথা, আমি চৌদ্দশো দিচ্ছি।' তিনি বলেনঃ আমি চার হাজারের কমে একে বেচবো। তখন সে বলেঃ তাহলে আমার কেনার প্রয়োজন নেই। তিনি বলেনঃ একে ক্রয় কর,নতুবা তোমার ধর্ম চলে যাবে। তাওরাতে লিখিত আছে-বানী ইসরাঈলের কোন একটি লোকও যদি বন্দী হয়ে যায় তবে তাকে কিনে নিয়ে আযাদ করে দাও। সে যদি বন্দী অবস্থায় তোমাদের নিকট আসে তবে মুক্তিপণ দিয়ে তাকে ছাড়িয়ে নাও এবং বাস্তুহারা করো না। এখন হয় তাওরাতকে মেনে তাকে ক্রয় কর,আর না হয় তাওরাতকে অস্বীকার কর।' সে বুঝে নেয় এবং বলেঃ তুমি কি আবদুল্লাহ বিন সালাম?' তিনি বলেনঃ হাঁ। সুতরাং সে চার হাজার নিয়ে আসে। তিনি দু'হাজার তাকে ফেরত দেন। কোন কোন বর্ণনায় আছে যে, রাসূল জালুত কুফায় ছিল। আরবের স্ত্রী লোক ছাড়া সে অন্য কারও মুক্তিপণ দিতো না। কাজেই আবদুল্লাহ বিন সালাম তাকে তাওরাতের এ আয়াতটি শুনিয়ে দেন। মোট কথা, কুরআন মাজীদের এ আয়াতটিতে ইয়াহুদীদেরকে নিন্দে করা হয়েছে যে, তারা আল্লাহর নির্দেশাবলী জানা সত্ত্বেও তাকে পৃষ্ঠের পিছনের নিক্ষেপ করেছে। আমানতদারী ও ঈমানদারী তাদের মধ্যে লোপ পেয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর গুণাবলী, তার নির্দেশাবলী, তার জন্ম স্থান, তার হিজরতের স্থান ইত্যাদি সব কিছুই তাদের কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে। কিন্তু এ সবগুলোই তারা গোপন করে রেখেছে। শুধু এটুকুই নয়, বরং তারা তার বিরুদ্ধাচরণ করেছে। এরই কারণে তাদের উপর ইহলৌকিক লাঞ্ছনা এসেছে এবং পরকালেও তাদের জন্যে চিরস্থায়ী কঠিন শাস্তি রয়েছে।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।