সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 51)
হরকত ছাড়া:
وإذ واعدنا موسى أربعين ليلة ثم اتخذتم العجل من بعده وأنتم ظالمون ﴿٥١﴾
হরকত সহ:
وَ اِذْ وٰعَدْنَا مُوْسٰۤی اَرْبَعِیْنَ لَیْلَۃً ثُمَّ اتَّخَذْتُمُ الْعِجْلَ مِنْۢ بَعْدِهٖ وَ اَنْتُمْ ظٰلِمُوْنَ ﴿۵۱﴾
উচ্চারণ: ওয়াইয ওয়া- ‘আদনা-মূছা আরবা‘ঈনা লাইলাতান ছুম্মাত তাখাযতুমুল ‘ইজলা মিম বা‘দিহী ওয়া আনতুমজা-লিমূন।
আল বায়ান: আর যখন আমি মূসাকে চল্লিশ রাতের ওয়াদা দিয়েছিলাম অতঃপর তোমরা তার যাওয়ার পর বাছুরকে (উপাস্যরূপে) গ্রহণ করেছিলে, আর তোমরা ছিলে যালিম।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৫১. আর স্মরণ কর, যখন আমরা মূসার সাথে চল্লিশ রাতের অঙ্গিকার করেছিলাম(১),তার (চলে যাওয়ার) পর তোমরা গো-বৎসকে (উপাস্যরূপে) গ্রহণ করেছিলে(২); আর তোমরা হয়ে গেলে যালিম।(৩)
তাইসীরুল ক্বুরআন: যখন মূসার উপর চল্লিশ রজনীর ওয়া‘দা করেছিলাম (কিতাব প্রদানের জন্য), তার (প্রস্থানের) পর তোমরা তখন বাছুরকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করেছিলে, বস্তুতঃ তোমরা তো ছিলে যালিম।
আহসানুল বায়ান: ৫১। (স্মরণ কর,) যখন মূসার জন্য চল্লিশ রাত্রি নির্ধারিত করেছিলাম, তখন তার প্রস্থানের পর তোমরা গো-বৎসকে (উপাস্যরূপে) গ্রহণ করেছিলে; বাস্তবে তোমরা ছিলে অনাচারী। (1)
মুজিবুর রহমান: এবং যখন আমি মূসার সঙ্গে চল্লিশ রজনীর অঙ্গীকার করেছিলাম, অনন্তর তোমরা গো-বৎসকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করেছিলে এবং তোমরা ছিলে অত্যাচারী।
ফযলুর রহমান: (স্মরণ করো) যখন আমি মূসার জন্য চল্লিশ রাত নির্ধারণ করেছিলাম। অতঃপর নিজেরা জালেম বলেই তার অনুপস্থিতিতে তোমরা (উপাস্যরূপে) বাছুর গ্রহণ করেছিলে।
মুহিউদ্দিন খান: আর যখন আমি মূসার সাথে ওয়াদা করেছি চল্লিশ রাত্রির অতঃপর তোমরা গোবৎস বানিয়ে নিয়েছ মূসার অনুপস্থিতিতে। বস্তুতঃ তোমরা ছিলে যালেম।
জহুরুল হক: আর স্মরণ করো! আমরা মূসার সঙ্গে চল্লিশ রাত্রি নির্ধারিত করেছিলাম, তখন তোমরা বাছুরকে তাঁর অনুপস্থিতিতে গ্রহণ করলে, আর তোমরা হলে অন্যায়কারী।
Sahih International: And [recall] when We made an appointment with Moses for forty nights. Then you took [for worship] the calf after him, while you were wrongdoers.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৫১. আর স্মরণ কর, যখন আমরা মূসার সাথে চল্লিশ রাতের অঙ্গিকার করেছিলাম(১),তার (চলে যাওয়ার) পর তোমরা গো-বৎসকে (উপাস্যরূপে) গ্রহণ করেছিলে(২); আর তোমরা হয়ে গেলে যালিম।(৩)
তাফসীর:
১. এখানে চল্লিশ রাতের ব্যাপারে এটা বলেন নি যে, এ চল্লিশ রাতের ওয়াদা প্রথমেই নিয়েছিলেন কি না? কিন্তু অন্যত্র বলে দিয়েছেন যে, তাকে প্রথমে ত্রিশ রাতের ওয়াদা করেছিলেন তারপর আরও দশ রাত বাড়িয়ে দিয়ে তা চল্লিশে পূর্ণ করে দিলেন। [সূরা আল-আরাফ: ১৪২]
২. এখানে গো বৎসের উৎস ও কারিগর সম্পর্কে কিছু বলেন নি। অন্যত্র সেটা বিস্তারিত এসেছে। আল্লাহ বলেন, “মূসার সম্প্রদায় তার অনুপস্থিতিতে নিজেদের অলংকার দিয়ে একটি বাছুর তৈরী করল, একটা দেহ, যা ‘হাম্বা’ শব্দ করত। তারা কি দেখল না যে, ওটা তাদের সাথে কথা বলে না ও তাদেরকে পথও দেখায় না? তারা ওটাকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করল এবং তারা ছিল যালেম [সূরা আল-আরাফ: ১৪৮]
আরও বলেন, “তারা বলল, আমরা আপনাকে দেয়া অঙ্গীকার স্বেচ্ছায় ভংগ করিনি; তবে আমাদের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল লোকের অলংকারের বোঝা এবং আমরা তা আগুনে নিক্ষেপ করি, অনুরূপভাবে সামিরাও (সেখানে কিছু মাটি) নিক্ষেপ করে। তারপর সে তাদের জন্য গড়লো এক বাছুর, এক অবয়ব, যা হাম্বা রব করত। তারা বলল, “এ তোমাদের ইলাহ এবং মূসারও ইলাহ, কিন্তু মূসা ভুলে গেছে।” (সূরা ত্বা-হাঃ ৮৭-৮৮]
৩. এ ঘটনা ঐ সময়ের যখন ফিরআউন সমুদ্রে নিমজ্জিত হওয়ার পর ইসরাঈল-বংশধররা কারো কারো মতে মিশরে ফিরে এসেছিল, আবার কারো কারো মতে অন্য কোথাও বসবাস করছিল। তখন মূসা আলাইহিস সালাম-এর খেদমতে ইসরাঈল-বংশধররা আরয করলো যে, আমরা এখন সম্পূর্ণ নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত। যদি আমাদের জন্য কোন শরীআত নির্ধারিত হয়, তবে আমাদের জীবন বিধান হিসেবে আমরা তা গ্রহণ ও বরণ করে নেবো। মূসা আলাইহিস সালাম-এর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ্ তাআলা অঙ্গীকার প্রদান করলেন যে, আপনি তুর পর্বতে অবস্থান করে একমাস পর্যন্ত আমার ইবাদাতে নিমগ্ন থাকার পর আপনাকে এক কিতাব দান করবো। মূসা আলাইহিস সালাম তাই করলেন।
এরপর আল্লাহ্ তা'আলা মূসা আলাইহিস সালাম-কে অতিরিক্ত আরও দশদিন ইবাদাত করতে নির্দেশ দিলেন। এভাবে চল্লিশ দিন পূর্ণ হলো আর আল্লাহ্ তা'আলা মূসা আলাইহিস সালাম-কে তাওরাত দিলেন। মূসা আলাইহিস সালাম তো ওদিকে তুর-পর্বতে রইলেন, এদিকে সামের নামক এক ব্যক্তি সোনা-রূপা দিয়ে গোবৎসের একটি প্রতিমূর্তি তৈরী করলো এবং তার কাছে পূর্ব থেকে সংরক্ষিত জিবরীল আলাইহিস সালাম-এর ঘোড়ার খুরের তলার কিছু মাটি প্রতিমূর্তির ভিতরে ঢুকিয়ে দেয়ায় সেটি শব্দ করতে থাকলো। আর ইসরাঈল-বংশধররা তারই পূজা করতে শুরু করে দিল। [তাফসীরে মা'আরিফুল কুরআন]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: ৫১। (স্মরণ কর,) যখন মূসার জন্য চল্লিশ রাত্রি নির্ধারিত করেছিলাম, তখন তার প্রস্থানের পর তোমরা গো-বৎসকে (উপাস্যরূপে) গ্রহণ করেছিলে; বাস্তবে তোমরা ছিলে অনাচারী। (1)
তাফসীর:
(1) এই গোবৎস পূজার ঘটনা সেই সময় ঘটেছিল, যখন ফিরআউন-সম্প্রদায়ের কবল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর বানী-ইস্রাঈলেরা 'সীনা' (সিনাই) নামক উপদ্বীপে পৌঁছে ছিল। সেখানে মহান আল্লাহ মূসা (আঃ)-কে তাওরাত দেওয়ার লক্ষ্যে চল্লিশ রাতের জন্য ত্বূর পাহাড়ে ডেকেছিলেন। মূসা (আঃ)-এর যাওয়ার পর বানী-ইস্রাঈলেরা সামেরীর চক্রান্তে গোবৎস পূজা শুরু করে দিয়েছিল। মানুষ কতই না বাস্তববাদী যে, মহান আল্লাহর মহিমার কত বৃহৎ বৃহৎ নিদর্শনাবলী দেখা সত্ত্বেও এবং তাঁর নবী (মূসা এবং হারুন আলাইহিমাসসালাম) তাদের মাঝে বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও গোবৎসকে নিজেদের উপাস্য মনে করে নিলো! বর্তমানে মুসলমানরাও শির্কী আক্বীদা-বিশ্বাস ও কার্যকলাপে লিপ্ত রয়েছে। কিন্তু তারা মনে মনে ভাবে, মুসলিম মুশরিক কিভাবে হয়? এই মুসলিম মুশরিকরা শির্ককে কেবল পাথরের মূর্তি পূজার সাথে নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। তারাই নাকি শুধু মুশরিক। অথচ এই নামমাত্র মুসলিম কবরের গম্বুজের সাথে তা-ই করে, যা প্রতিমা-পূজারী নিজের মূর্তির সাথে করে থাকে -أَعَاذَنَا اللهُ مِنْهُ-।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৪৯-৫৭ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তা‘আলার গযবে ধ্বংসপ্রাপ্ত পৃথিবীর আদি ৬টি জাতির মধ্যে কওমে নূহ, ‘আদ, সামূদ, লূত ও কওমে মাদইয়ানের বর্ণনার পর ৬ষ্ঠ গযবপ্রাপ্ত জাতি হিসেবে এখানে ফির‘আউন জাতি সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা আলোচনা করেছেন। এছাড়াও কুরআনের ২৭টি সূরায় ৭৫টি স্থানে বিভিন্ন প্রসঙ্গে এদের আলোচনা রয়েছে। (তারীখুল আম্বিয়া ১/১৩৬)
আল্লাহ তা‘আলা তাদের কাছে প্রসিদ্ধ উলূল আযম নাবী মূসা ও বড় ভাই হারুনকে প্রেরণ করেছিলেন। কুরআনে সর্বাধিক আলোচিত জাতি হল এরা। যেন উম্মতে মুহাম্মাদী ফির‘আউনের জাতির চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য এবং তাদের সীমালঙ্ঘনের মাত্রা ও তাদের পরিণতি দেখে হুশিয়ার হয়ে যায়। আল্লাহ তা‘আলা মূসা (আঃ) ও ফির‘আউনের কাহিনীকে এত গুরুত্ব দিয়েছেন যে, অধিকাংশ সূরায় এর কিছু না কিছু আলোচনা করেছেন। কারণ এ নাবীর জীবন চরিত ও দাওয়াতী বিবরণে এবং ফির‘আউনের অবাধ্যতায় অগণিত শিক্ষা, আল্লাহ তা‘আলার অপার শক্তি ও অনুগ্রহের বিস্ময়কর রহস্যসমূহ সন্নিবেশিত হয়েছে। এ আলোচনার মাধ্যমে আসমানী কিতাবধারী ইয়াহূদী-খ্রিস্টানদের পেছনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া এবং শেষ নাবীর ওপর ঈমান আনার পক্ষে যৌক্তিকতা উপস্থাপন করা হয়েছে। নিম্নে এদের বিবরণ তুলে ধরা হলো:
বানী ইসরাঈল, মূসা (আঃ) ও ফির‘আউনের সংক্ষিপ্ত পরিচয়:
ইবরাহীম (আঃ)-এর কনিষ্ঠ পুত্র ইসহাক (আঃ)-এর পুত্র ইয়া‘কূব (আঃ)-এর অপর নাম ‘ইসরাঈল’। হিব্রু ভাষায় ‘ইসরাঈল’অর্থ আল্লাহ তা‘আলা দাস। সে হিসেবে ইয়া‘কূব (আঃ)-এর বংশধরকে ‘বানু ইসরাঈল’বলা হয়।
ইয়া‘কূব (আঃ)-এর আদি বাসস্থান ছিল কেন‘আনে, যা বর্তমান ফিলিস্তিন এলাকায় অবস্থিত। তখনকার সময় ফিলিস্তিন ও সিরিয়া মিলিতভাবে শাম দেশ ছিল। এর গোটা অঞ্চলকে বর্তমানে ‘মধ্যপ্রাচ্য’বলা হয়। ইয়া‘কূব (আঃ)-এর পুত্র ইউসুফ (আঃ) যখন মিসরের মন্ত্রী হন এবং অন্যান্য অঞ্চলের ন্যায় কিন‘আনে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, তখন ইউসুফ (আঃ)-এর আমন্ত্রণে পিতা ইয়া‘কূব (আঃ) সপরিবারে মিসরে চলে আসেন ও বসবাস শুরু করেন। ক্রমে সেখানে তাঁরা আধিপত্য বিস্তার করেন ও সুখ-শান্তিতে দিনাতিপাত করতে থাকেন। পরবর্তীতে পুনরায় মিসর ফির‘আউনের অধিকারে ফিরে আসে। ইউসুফ (আঃ)-এর মৃত্যুর পরে তাঁর ৫ম অধঃস্তন পুরুষ মূসা ও হারুনের সময় নিপীড়ক ফির‘আউন শাসন ক্ষমতায় ছিল, তার নাম রেমেসীস-২।
মূসা (আঃ) হলেন ইবরাহীম (আঃ)-এর ৮ম অধঃস্তন পুরুষ। তাঁর পিতার নাম ‘ইমরান’। তাঁর জন্ম হয় মিসরে আর লালিত-পালিত হন ফির‘আউনের ঘরে। তাঁর জন্ম ও লালন পালন সম্পর্কে কুরআনের বিভিন্ন স্থানে আলোচিত হয়েছে। তাঁর সহোদর ভাই হারুন ছিলেন তাঁর চেয়ে তিন বছরের বড়। উভয়ের মৃত্যু হয় মিসর ও শামের মধ্যবর্তী তীহ প্রান্তরে বানী ইসরাঈলের ৪০ বছর আটক থাকাকালীন সময়ে। মূসা (আঃ)-এর কবর হয় বায়তুল মুক্বাদ্দাসের উপকণ্ঠে। নাবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সেখানে একটি লাল টিবির দিকে ইশারা করে সে স্থানেই মূসা (আঃ)-এর কবর রয়েছে বলে জানিয়েছেন। (মুত্তাফাক আলাইহি, মিশকাত হা: ৫৭১৩)
ফির‘আউন কোন ব্যক্তির নাম নয়। বরং এটি হল তৎকালীন মিসরের সম্রাটদের উপাধি। কিবতী বংশীয় এ সম্রাটগণ কয়েক শতাব্দীব্যাপী মিসর শাসন করে। এ সময় মিসর সভ্যতা ও সমৃদ্ধির শীর্ষে পৌঁছে গিয়েছিল। লাশ মমিকরণ, পিরামিড, স্ফিংক্র প্রভৃতি তাদের সময়কার বৈজ্ঞানিক উন্নতির প্রমাণ বহন করে।। মূসা (আঃ)-এর সময়কার পরপর দুজন ফির‘আউন ছিল। সর্বসম্মত ইসরাঈলী বর্ণনাও হল এটাই এবং মূসা (আঃ) দু’জনেরই যুগ পান। উৎপীড়ক ফির‘আনের নাম ছিল রেমেসিস-২ এবং ডুবে মরা ফির‘আউন ছিল তার পুত্র মানেপতাহ। লোহিত সাগর সংলগ্ন তিক্ত হ্রদে তিনি সসৈন্য ডুবে মরেন। যার মমি ১৯০৭ সালে আবিষ্কৃত হয় এবং আজও তার লাশ মিসরের পিরামিডে রক্ষিত আছে।
আল্লাহ তা‘আলা বানী ইসরাঈলের প্রতি প্রদত্ত নেয়ামতগুলো ধারাবাহিকভাবে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলছেন: স্মরণ কর, তোমাদের পুত্র সন্তানদের হত্যা করে ফির‘আউন জঘন্যতম শাস্তি দিত। আমি তোমাদেরকে মূসা (আঃ)-এর মাধ্যমে মুক্তি দিয়েছি। ঘটনাটির সারসংক্ষেপ হলো- একদা ফির‘আন স্বপ্নে দেখে যে, বায়তুল মুক্বাদ্দিসের দিক হতে এক আগুন এসে মিসরের প্রত্যেক কিবতীর ঘরে প্রবেশ করছে, কিন্তু তা বানী ইসরাঈলের ঘরে যায়নি। এ স্বপ্নের ব্যাখ্যা ছিল এই যে, বানী ইসরাঈলের মধ্যে এমন একটি ছেলে জন্ম গ্রহণ করবে যার হাতে তার অহঙ্কার চূর্ণ হয়ে যাবে। তাই সে চারদিকে নির্দেশ জারি করে দিল যে, বানী ইসরাঈলের ঘরে যে সন্তান জন্মগ্রহণ করবে সরকারি লোক দ্বারা যাচাই করে দেখবে। যদি পুত্র সন্তান হয় তৎক্ষণাৎ তাকে মেরে ফেলবে। আর যদি কন্যা সন্তান হয় তবে তাকে ছেড়ে দিবে। এ নীতি চালু অবস্থায় আল্লাহ তা‘আলা মূসা (আঃ)-কে ঐ ফেরআউনের ঘরেই লালিত-পালিত করেন। আল্লাহ তা‘আলা বলছেন, পরিণত বয়সে নবুয়তী পেয়ে ফির‘আউনের এ নির্যাতন থেকে মুক্তি লাভ করার পর মূসা (আঃ)-এর সাথে স্বদেশ ত্যাগকালে যখন ফির‘আউন দলবল নিয়ে তোমাদেরকে পাকড়াও করতে এসেছিল আর তোমরা এমতাবস্থায় সমুদ্রের উপকূলে ছিলে যখন তোমাদের নাজাতের কোন উপায় ছিল না, এমতাবস্থায় আমি তোমাদের জন্য সমুদ্রের মধ্য দিয়ে রাস্তা তৈরি করে দিলাম আর তোমরা মুক্তি পেলে। সুতরাং এসব নেয়ামত পেয়ে আল্লাহ তা‘আলার শুকরিয়া আদায় করা উচিত এবং তাঁর বিধান মেনে চলা উচিত।
(وَإِذْ وَاعَدْنَا)
‘আর যখন আমি মূসার সঙ্গে চল্লিশ রাত্রির অঙ্গীকার করেছিলাম’এখানে আল্লাহ তা‘আলা মূসা (আঃ)-কে তাওরাত দেয়ার জন্য যে ৪০ দিনের ওয়াদা দিয়েছিলেন সে নেয়ামতের কথা আলোচনা করেছেন। প্রথমে ত্রিশ দিনের ওয়াদা দিয়েছিলেন পরে দশ দিন বাড়িয়ে দিয়ে চল্লিশ দিন পূর্ণ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَوٰعَدْنَا مُوْسٰی ثَلٰثِیْنَ لَیْلَةً وَّاَتْمَمْنٰھَا بِعَشْرٍ فَتَمَّ مِیْقَاتُ رَبِّھ۪ٓ اَرْبَعِیْنَ لَیْلَةً)
“স্মরণ কর, মূসার জন্য আমি ত্রিশ রাত্রি নির্ধারণ করি এবং আরও দশ দ্বারা সেটা পূর্ণ করি। এভাবে তার প্রতিপালকের নির্ধারিত সময় চল্লিশ রাত্রিতে পূর্ণ হয়।”(সূরা আ‘রাফ ৭:১৪২)
কিন্তু তারা সময় হওয়ার পূর্বেই ধৈর্যহারা হয়ে গেল। এমনকি মূসা (আঃ) চলে যাবার পর তারা গো-বৎসের পূজা/উপাসনা করতে শুরু করে দিল, যার মাধ্যমে তারা নিজেদের ওপর জুলুম করল। তারপরও আল্লাহ তা‘আলা একজন আরেকজনকে হত্যা করার মাধ্যমে তাওবাহ করার নির্দেশ দিলেন এবং এর মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে ক্ষমা করে দিলেন যাতে তারা শুকরিয়া আদায় করে।
অতঃপর মূসা (আঃ) তাঁর সম্প্রদায়কে বললেন: তোমরা গো-বৎসকে তোমাদের মা‘বূদরূপে গ্রহণ করে নিজেদের ওপর জুলুম করেছ। অতএব একজন আরেকজনকে হত্যা করার মাধ্যমে তোমাদের প্রতিপালকের নিকট তাওবাহ কর। জাহান্নামে চিরস্থায়ী থাকার চেয়ে এটা তোমাদের জন্য উত্তম। তারপর আল্লাহ তা‘আলা তাদের অবাধ্যতার সীমালঙ্ঘনের কথা তুলে ধরেছেন, যখন তারা আল্লাহ তা‘আলার কথা শুনল তখন মূসাকে বলল: এগুলো যে আল্লাহ তা‘আলার কথা তা আমরা কখনো বিশ্বাস করব না যতক্ষণ না আমরা আল্লাহ তা‘আলাকে দেখতে পাব। তাদের দাবি অনুযায়ী আল্লাহ তা‘আলাকে দেখতে গেলে বজ্রধ্বনি তাদেরকে পাকড়াও করল। যার ফলে তারা সবাই মৃত্যু বরণ করল। অতঃপর মূসা (আঃ)-এর দু‘আয় তাদেরকে পুনরায় জীবন ফিরিয়ে দেয়া হলো। এভাবে তাদের প্রয়োজনীয় মুহূর্তে আল্লাহ তা‘আলা করুণা করে তাদের এ ইহকালীন ও পরকালীন মুক্তির পথ সুগম করেছেন কিন্তু তারা ছিল বড়ই অবাধ্য ও অকৃতজ্ঞ জাতি। নিম্নে তাদের প্রতি প্রদত্ত নিয়ামতকে সংক্ষেপে উল্লেখ করা হলো।
আল্লাহ তা‘আলা বানী ইসরাঈলকে যে সকল নেয়ামত প্রদান করেছিলেন তা হল:
১. বানী ইসরাঈলের হিদায়াতস্বরূপ মূসা (আঃ)-কে আসমানী কিতাব তাওরাত প্রদান। (সূরা বাকারাহ ২:৫৩)
২. বিভিন্ন জঘন্য অপরাধ করার পরও আল্লাহর পক্ষ হতে ক্ষমা প্রদান। (সূরা বাকারাহ ২:৫২)
৩. ফির‘আউনের শাস্তি থেকে মুক্তি প্রদান। (সূরা বাকারাহ ২:৪৯)
৪. সমুদ্রে নিমজ্জিত হওয়া থেকে মুক্তি প্রদান। (সূরা বাকারাহ ২:৫০)
৫. বারটি গোত্রের জন্য বারটি ঝর্ণা প্রবাহিত করা। (সূরা বাকারাহ ২:৬০)
৬. আসমানী খাদ্য মান্না ও সালওয়া প্রদান। (সূরা বাকারাহ ২:৫৭)
মান্না ও সালওয়া এক প্রকার আল্লাহ তা‘আলা প্রদত্ত খাদ্য যা একমাত্র বানী ইসরাঈলের জন্যই নির্দিষ্ট ছিল। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: সালওয়া হল এক প্রকার ছোট পাখি। ইকরামা বলেন: সালওয়া হল এক প্রকার পাখি যা চড়ুই পাখির ন্যায়। বারী বিন আনাস বলেন: মান্না মধু জাতীয় জিনিস যা তারা পানি দিয়ে মিশিয়ে পান করত।
হাদীসে এসেছে, ব্যাঙ-এর ছাতা মান্নার অর্ন্তভুক্ত, তার পানি চক্ষু রোগের প্রতিষেধক। (সহীহ বুখারী হা: ৪৬৩৯) সঠিক কথা হচ্ছে মান্না হল মিষ্টি জাতীয় আর সালওয়া হল পাখির গোশত।
৭. সকল খাদ্য বানী ইসরাঈল এর জন্য হালাল করা। (সূরা আলি-ইমরান ৩:৯৩)
৮. তাদের মাঝে ধারাবাহিকভাবে নাবী-রাসূলগণের আগমন। যেমন হাদীসে এসেছে:
عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللّٰهِ صلي اللّٰه عليه وسلم إِنَّ بَنِي إِسْرَائِيلَ كَانَتْ تَسُوسُهُمْ الْأَنْبِيَاءُ إِذَا مَاتَ نَبِيٌّ قَامَ نَبِيٌّ وَإِنَّهُ لَا نَبِيَّ بَعْدِي
আবূ হুরাইরাই (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, নিশ্চয়ই বানী ইসরাঈদের মধ্যে নাবীগণ ধারাবাহিকভাবে এসেছে। যখন কোন নাবী মারা গেছেন তখনই তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছে অন্য নাবী। আর আমার পরে কোন নাবী নেই। (মুসনাদ আবূ আওয়ানা: ৭১২৮)
৯. স্বাছন্দময় জীবন যাপনের ব্যাবস্থাকরণ।
এ ছাড়াও বানী ইসরাঈলকে আরো অনেক নেয়ামত দান করা হয়েছিল। কিন্তু তারা এত নেয়ামত পাওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ তা‘আলার সাথে কুফরী করেছে, মূসা (আঃ)-এর প্রতি ঈমান আনার পরিবর্তে তাঁর বিরোধিতা করেছে। সুতরাং আমাদের সতর্ক হওয়া উচিত, রাত-দিন আমরা আল্লাহ তা‘আলার কত নেয়ামত ভোগ করছি, তিনি আমাদের ওপর কত অনুগ্রহ করছেন! কখনো যেন আমরা তাঁর সাথে কুফরী না করি, তাঁর নেয়ামত অস্বীকার না করি। বরং সর্বদা তাঁর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করব এবং তাঁর আদেশ নিষেধ মেনে চলব। আল্লাহ তা‘আল্ াআমাদের তাওফীক দিন। (আমীন)!
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. নেয়ামতের কথা স্মরণ করে আল্লাহ তা‘আলার শুকরিয়া আদায় করা কর্তব্য।
২. আল্লাহ তা‘আলা বান্দাদেরকে বিভিন্ন বিপদাপদ দ্বারা পরীক্ষা করেন এটা জানার জন্য যে, কারা তাঁর দীনের ওপর অটল থাকে।
৩. বানী ইসরাঈলের প্রতি আল্লাহ তা‘আলার বিভিন্ন নেয়ামতের কথা জানতে পারলাম।
৪. যারা আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূলের বিরোধিতা করে তথা ইসলাম বিদ্রোহী হয় তাদের পরিণতি খুব খারাপ, যেমন মূসা (আঃ)-এর বিরোধী বানী ইসরাঈল জাতির হয়েছিল।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৫১-৫৩ নং আয়াতের তাফসীর
এখানেও মহান আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহসমূহের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে, হযরত মূসা (আঃ) যখন চল্লিশ দিনের অঙ্গীকারে বানী ইসরাঈলের নিকট হতে তূর পাহাড়ে চলে যান তখন তারা ইতিমধ্যেই বাছুর পূজা আরম্ভ করে দেয়। অতঃপর হযরত মূসা (আঃ) তাদের নিকট ফিরে আসলে তারা এ শিরক হতে তওবা করে। তাই, আল্লাহ পাক বলেন যে, এত বড় অপরাধের পরেও তিনি তাদেরকে ক্ষমা করে দেন। এটা বানী ইসরাঈলের প্রতি তাঁর কম বড় অনুগ্রহ নয়। কুরআন মাজীদের অন্য জায়গায় আছেঃ “যখন আমি মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে ত্রিশ রাত্রির ওয়াদা করেছিলাম এবং আরও দশ বাড়িয়ে পুরো চল্লিশ করেছিলাম।' বলা হয় যে, এ ওয়াদার সময়কাল ছিল জীক’কাদার পুরো মাস এবং জিলহজ্জ মাসের দশ দিন। এটা ফিরআউনীদের হাত হতে মুক্তি পাওয়ার পরের ঘটনা। “কিতাব’-এর ভাবার্থ তাওরাত এবং ফুরকান প্রত্যেক ঐ জিনিসকে বলা হয় যা সত্য ও মিথ্যার মধ্যে এবং হিদায়াত ও গুমরাহীর মধ্যে পার্থক্য করে থাকে। এ কিতাবটিও উক্ত ঘটনার পরে পেয়েছিলেন। যেমন সূরা-ই-আরাফের এ ঘটনার বর্ণনা রীতি দ্বারা প্রকাশ পাচ্ছে। অন্যত্র রয়েছে ‘আমি পূর্ব যুগীয় লোকদেরকে ধ্বংস করার পর মূসা (আঃ) কে এ কিতাব দিয়েছিলাম যা সমুদয় লোকের জন্য উজ্জ্বল নিদর্শনসমূহ এবং হিদায়াত ও রহমত স্বরূপ, যেন তারা উপদেশ লাভ করে।' এটাও বলা হয়েছে টি অতিরিক্ত এবং স্বয়ং কিতাবকেই ফুরকান বলা হয়েছে। কিন্তু এটা গরীব।
কেউ কেউ বলেন যে, কিতাবের উপরে ফুরকানের সংযোগ হয়েছে, অর্থাৎ ‘কিতাবও দিয়েছি এবং মু'জিযাও দিয়েছি। প্রকৃতপক্ষে অর্থ হিসেবে দু'টোর অর্থ একই এবং এ রকম দু’নামের একই জিনিস সংযোগরূপে আরবদের কথায় দেখা যায়। আরব কবিদের কবিতাগুলোও এর সাক্ষ্য বহন করে।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।