আল কুরআন


সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 49)

সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 49)



হরকত ছাড়া:

وإذ نجيناكم من آل فرعون يسومونكم سوء العذاب يذبحون أبناءكم ويستحيون نساءكم وفي ذلكم بلاء من ربكم عظيم ﴿٤٩﴾




হরকত সহ:

وَ اِذْ نَجَّیْنٰکُمْ مِّنْ اٰلِ فِرْعَوْنَ یَسُوْمُوْنَکُمْ سُوْٓءَ الْعَذَابِ یُذَبِّحُوْنَ اَبْنَآءَکُمْ وَ یَسْتَحْیُوْنَ نِسَآءَکُمْ ؕ وَ فِیْ ذٰلِکُمْ بَلَآ ءٌ مِّنْ رَّبِّکُمْ عَظِیْمٌ ﴿۴۹﴾




উচ্চারণ: ওয়া ইযনাজ্জাইনা-কুম মিন আ-লি ফির‘আওনা ইয়াছুমূনাকুম ছূআল ‘আযা-বি ইউযাব্বিহুনা আবনাআকুম ওয়াইয়াছতাহইউনা নিছাআকুম ওয়া ফী যা-লিকুম বালাউম মিররাব্বিকুম ‘আজীম।




আল বায়ান: আর স্মরণ কর, যখন আমি তোমাদেরকে ফির‘আউনের দল থেকে রক্ষা করেছিলাম। তারা তোমাদেরকে কঠিন আযাব দিত। তোমাদের পুত্র সন্তানদেরকে যবেহ করত এবং তোমাদের নারীদেরকে বাঁচিয়ে রাখত। আর এতে তোমাদের রবের পক্ষ থেকে ছিল মহা পরীক্ষা।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৪৯. আর স্মরণ কর, যখন আমরা ফিরআউনের বংশ হতে তোমাদেরকে নিস্কৃতি দিয়েছিলাম তারা তোমাদেরকে মর্মান্তিক শাস্তি দিত। তোমাদের পুত্রদের যবেহ করে ও তোমাদের নারীদের বাঁচিয়ে রাখত(১)। আর এতে ছিল তোমাদের রব-এর পক্ষ থেকে এক মহাপরীক্ষা।(২)




তাইসীরুল ক্বুরআন: স্মরণ কর, আমি যখন তোমাদেরকে ফেরাউন গোষ্ঠী হতে মুক্তি দিয়েছিলাম, যারা তোমাদের পুত্র সন্তানকে হত্যা ক’রে আর তোমাদের নারীদেরকে জীবিত রেখে তোমাদেরকে মর্মান্তিক যাতনা দিত আর এতে তোমাদের প্রভুর পক্ষ হতে ছিল মহাপরীক্ষা।




আহসানুল বায়ান: ৪৯। স্মরণ কর, যখন আমি ফিরআউনের অনুসারী দল (1) হতে তোমাদেরকে নিষ্কৃতি দিয়েছিলাম, যারা তোমাদের পুত্রগণকে হত্যা করে ও তোমাদের নারীদের জীবিত রেখে তোমাদেরকে মর্মান্তিক যন্ত্রণা দিত এবং ওতে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে এক মহা পরীক্ষা ছিল।



মুজিবুর রহমান: এবং যখন আমি তোমাদেরকে ফির‘আউনের সম্প্রদায় হতে বিমুক্ত করেছিলাম - তারা তোমাদেরকে কঠোর শাস্তি প্রদান করত, তোমাদের পুত্রদেরকে হত্যা করত এবং তোমাদের কন্যাদেরকে জীবিত রাখত এবং এতে তোমাদের রাব্ব হতে তোমাদের জন্য মহা পরীক্ষা ছিল।



ফযলুর রহমান: (স্মরণ করো) যখন আমি ফেরাউনের লোকদের থেকে তোমাদেরকে রক্ষা করেছিলাম, যারা তোমাদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন চাপিয়ে দিয়েছিল। তারা তোমাদের ছেলেদেরকে হত্যা করত এবং নারীদেরকে জীবিত রাখত। এর মধ্যে ছিল তোমাদের প্রভুর পক্ষ থেকে এক বিরাট পরীক্ষা।



মুহিউদ্দিন খান: আর (স্মরণ কর) সে সময়ের কথা, যখন আমি তোমাদিগকে মুক্তিদান করেছি ফেরআউনের লোকদের কবল থেকে যারা তোমাদিগকে কঠিন শাস্তি দান করত; তোমাদের পুত্রসন্তানদেরকে জবাই করত এবং তোমাদের স্ত্রীদিগকে অব্যাহতি দিত। বস্তুতঃ তাতে পরীক্ষা ছিল তোমাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে, মহা পরীক্ষা।



জহুরুল হক: আর স্মরণ করো! তোমাদের আমরা ফিরআউনের লোকদের থেকে মুক্ত করেছিলাম, যারা তোমাদের নির্যাতন করেছিল কঠোর যন্ত্রণায়, তারা হত্যা করত তোমাদের পুত্র সন্তানদের ও বাঁচতে দিত তোমাদের নারীদের। আর এতে তোমাদের জন্যে তোমাদের প্রভুর কাছ থেকে ছিল কঠোর পরীক্ষা।



Sahih International: And [recall] when We saved your forefathers from the people of Pharaoh, who afflicted you with the worst torment, slaughtering your [newborn] sons and keeping your females alive. And in that was a great trial from your Lord.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৪৯. আর স্মরণ কর, যখন আমরা ফিরআউনের বংশ হতে তোমাদেরকে নিস্কৃতি দিয়েছিলাম তারা তোমাদেরকে মর্মান্তিক শাস্তি দিত। তোমাদের পুত্রদের যবেহ করে ও তোমাদের নারীদের বাঁচিয়ে রাখত(১)। আর এতে ছিল তোমাদের রব-এর পক্ষ থেকে এক মহাপরীক্ষা।(২)


তাফসীর:

১. কোন ব্যক্তি ফিরআউনের নিকট ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল যে, ইসরাঈল বংশে এমন এক ছেলের জন্ম হবে, যার হাতে তোমার রাজ্যের পতন ঘটবে। এজন্য ফিরআউন নবজাত পুত্রসন্তানদের হত্যা করতে আরম্ভ করলো। আর যেহেতু মেয়েদের দিক থেকে কোন রকম আশংকা ছিল না, সুতরাং তাদের সম্পর্কে নিশ্চুপ রইলো। দ্বিতীয়তঃ এতে তার নিজস্ব একটি মতলবও ছিল যে, সে স্ত্রীলোকদেরকে দিয়ে ধাত্রী পরিচারিকার কাজও করানো যাবে। সুতরাং এ অনুকম্পাও ছিল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এখানে উল্লেখিত হত্যাকাণ্ড থেকে অব্যাহতি দানের কথা বুঝানো হয়েছে, যা এক অনুগ্রহ ও নেয়ামত। আর নেয়ামতের ক্ষেত্রেই শুকরিয়া বা কৃতজ্ঞতার পরীক্ষা হয়। এত বড় নে’আমতের শুকরিয়া স্বরূপ নবীগণ কি করেছেন?

হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মদীনা আগমন করলেন, তখন দেখলেন যে, ইয়াহুদীরা মহররমের দশ তারিখের সাওম পালন করছে। তিনি তাদেরকে বললেন, ব্যাপারটি কি? তারা বললঃ এটি একটি ভাল দিন। এ দিনে আল্লাহ বনী ইসরঈলকে তাদের শক্রদের হাত থেকে নাজাত দিয়েছিলেন, ফলে মূসা আলাইহিস সালাম এ দিন সাওম পালন করেছিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আলাইহি ওয়া সাল্লাম সে দিনের সাওম পালন করলেন এবং লোকদেরকে সেদিনের সাওম রাখার নির্দেশ দিলেন।” [বুখারী: ২০০৪, মুসলিম: ১২৮]


২. অবশ্য ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে সহীহ সনদে بلاء শব্দের অর্থ, নেয়ামত বর্ণিত হয়েছে। তখন উদ্দেশ্য হবে, তাদের নাজাত ছিল এক বড় নেয়ামত। [তাবারী]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: ৪৯। স্মরণ কর, যখন আমি ফিরআউনের অনুসারী দল (1) হতে তোমাদেরকে নিষ্কৃতি দিয়েছিলাম, যারা তোমাদের পুত্রগণকে হত্যা করে ও তোমাদের নারীদের জীবিত রেখে তোমাদেরকে মর্মান্তিক যন্ত্রণা দিত এবং ওতে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে এক মহা পরীক্ষা ছিল।


তাফসীর:

(1) آل فرعون (ফিরআউনের বংশধর) বলতে কেবল ফিরআউনের পরিবারের লোকদেরকেই বুঝানো হয়নি, বরং তার অর্থ ফিরআউনের সকল অনুসারীগণ। যেমন পরের আয়াতে বলা হয়েছে, {اَغْرَقْنَا آلَ فِرْعَوْنَ} ;ফিরআউনের অনুসারীদেরকে (সমুদ্রে) ডুবিয়ে দিলাম। এখানে যারা ডুবেছিল তারা কেবল ফিরআউনের পরিবারেরই লোকজন ছিল না, বরং তার সৈন্য ও অন্যান্য অনুসারীরাও ছিল। অর্থাৎ, ক্বুরআনে আল (বংশ) অনুসারীর অর্থেও ব্যবহার হয়। এর আরো ব্যাখ্যা সূরা আহযাবে (৩৩নং আয়াতে) আসবে- ইন শাআল্লাহ।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৪৯-৫৭ নং আয়াতের তাফসীর:



আল্লাহ তা‘আলার গযবে ধ্বংসপ্রাপ্ত পৃথিবীর আদি ৬টি জাতির মধ্যে কওমে নূহ, ‘আদ, সামূদ, লূত ও কওমে মাদইয়ানের বর্ণনার পর ৬ষ্ঠ গযবপ্রাপ্ত জাতি হিসেবে এখানে ফির‘আউন জাতি সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা আলোচনা করেছেন। এছাড়াও কুরআনের ২৭টি সূরায় ৭৫টি স্থানে বিভিন্ন প্রসঙ্গে এদের আলোচনা রয়েছে। (তারীখুল আম্বিয়া ১/১৩৬)



আল্লাহ তা‘আলা তাদের কাছে প্রসিদ্ধ উলূল আযম নাবী মূসা ও বড় ভাই হারুনকে প্রেরণ করেছিলেন। কুরআনে সর্বাধিক আলোচিত জাতি হল এরা। যেন উম্মতে মুহাম্মাদী ফির‘আউনের জাতির চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য এবং তাদের সীমালঙ্ঘনের মাত্রা ও তাদের পরিণতি দেখে হুশিয়ার হয়ে যায়। আল্লাহ তা‘আলা মূসা (আঃ) ও ফির‘আউনের কাহিনীকে এত গুরুত্ব দিয়েছেন যে, অধিকাংশ সূরায় এর কিছু না কিছু আলোচনা করেছেন। কারণ এ নাবীর জীবন চরিত ও দাওয়াতী বিবরণে এবং ফির‘আউনের অবাধ্যতায় অগণিত শিক্ষা, আল্লাহ তা‘আলার অপার শক্তি ও অনুগ্রহের বিস্ময়কর রহস্যসমূহ সন্নিবেশিত হয়েছে। এ আলোচনার মাধ্যমে আসমানী কিতাবধারী ইয়াহূদী-খ্রিস্টানদের পেছনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া এবং শেষ নাবীর ওপর ঈমান আনার পক্ষে যৌক্তিকতা উপস্থাপন করা হয়েছে। নিম্নে এদের বিবরণ তুলে ধরা হলো:



বানী ইসরাঈল, মূসা (আঃ) ও ফির‘আউনের সংক্ষিপ্ত পরিচয়:



ইবরাহীম (আঃ)-এর কনিষ্ঠ পুত্র ইসহাক (আঃ)-এর পুত্র ইয়া‘কূব (আঃ)-এর অপর নাম ‘ইসরাঈল’। হিব্রু ভাষায় ‘ইসরাঈল’অর্থ আল্লাহ তা‘আলা দাস। সে হিসেবে ইয়া‘কূব (আঃ)-এর বংশধরকে ‘বানু ইসরাঈল’বলা হয়।



ইয়া‘কূব (আঃ)-এর আদি বাসস্থান ছিল কেন‘আনে, যা বর্তমান ফিলিস্তিন এলাকায় অবস্থিত। তখনকার সময় ফিলিস্তিন ও সিরিয়া মিলিতভাবে শাম দেশ ছিল। এর গোটা অঞ্চলকে বর্তমানে ‘মধ্যপ্রাচ্য’বলা হয়। ইয়া‘কূব (আঃ)-এর পুত্র ইউসুফ (আঃ) যখন মিসরের মন্ত্রী হন এবং অন্যান্য অঞ্চলের ন্যায় কিন‘আনে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, তখন ইউসুফ (আঃ)-এর আমন্ত্রণে পিতা ইয়া‘কূব (আঃ) সপরিবারে মিসরে চলে আসেন ও বসবাস শুরু করেন। ক্রমে সেখানে তাঁরা আধিপত্য বিস্তার করেন ও সুখ-শান্তিতে দিনাতিপাত করতে থাকেন। পরবর্তীতে পুনরায় মিসর ফির‘আউনের অধিকারে ফিরে আসে। ইউসুফ (আঃ)-এর মৃত্যুর পরে তাঁর ৫ম অধঃস্তন পুরুষ মূসা ও হারুনের সময় নিপীড়ক ফির‘আউন শাসন ক্ষমতায় ছিল, তার নাম রেমেসীস-২।



মূসা (আঃ) হলেন ইবরাহীম (আঃ)-এর ৮ম অধঃস্তন পুরুষ। তাঁর পিতার নাম ‘ইমরান’। তাঁর জন্ম হয় মিসরে আর লালিত-পালিত হন ফির‘আউনের ঘরে। তাঁর জন্ম ও লালন পালন সম্পর্কে কুরআনের বিভিন্ন স্থানে আলোচিত হয়েছে। তাঁর সহোদর ভাই হারুন ছিলেন তাঁর চেয়ে তিন বছরের বড়। উভয়ের মৃত্যু হয় মিসর ও শামের মধ্যবর্তী তীহ প্রান্তরে বানী ইসরাঈলের ৪০ বছর আটক থাকাকালীন সময়ে। মূসা (আঃ)-এর কবর হয় বায়তুল মুক্বাদ্দাসের উপকণ্ঠে। নাবী মু‏হাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সেখানে একটি লাল টিবির দিকে ইশারা করে সে স্থানেই মূসা (আঃ)-এর কবর রয়েছে বলে জানিয়েছেন। (মুত্তাফাক আলাইহি, মিশকাত হা: ৫৭১৩)



ফির‘আউন কোন ব্যক্তির নাম নয়। বরং এটি হল তৎকালীন মিসরের সম্রাটদের উপাধি। কিবতী বংশীয় এ সম্রাটগণ কয়েক শতাব্দীব্যাপী মিসর শাসন করে। এ সময় মিসর সভ্যতা ও সমৃদ্ধির শীর্ষে পৌঁছে গিয়েছিল। লাশ মমিকরণ, পিরামিড, স্ফিংক্র প্রভৃতি তাদের সময়কার বৈজ্ঞানিক উন্নতির প্রমাণ বহন করে।। মূসা (আঃ)-এর সময়কার পরপর দুজন ফির‘আউন ছিল। সর্বসম্মত ইসরাঈলী বর্ণনাও হল এটাই এবং মূসা (আঃ) দু’জনেরই যুগ পান। উৎপীড়ক ফির‘আনের নাম ছিল রেমেসিস-২ এবং ডুবে মরা ফির‘আউন ছিল তার পুত্র মানেপতাহ। লোহিত সাগর সংলগ্ন তিক্ত হ্রদে তিনি সসৈন্য ডুবে মরেন। যার মমি ১৯০৭ সালে আবিষ্কৃত হয় এবং আজও তার লাশ মিসরের পিরামিডে রক্ষিত আছে।



আল্লাহ তা‘আলা বানী ইসরাঈলের প্রতি প্রদত্ত নেয়ামতগুলো ধারাবাহিকভাবে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলছেন: স্মরণ কর, তোমাদের পুত্র সন্তানদের হত্যা করে ফির‘আউন জঘন্যতম শাস্তি দিত। আমি তোমাদেরকে মূসা (আঃ)-এর মাধ্যমে মুক্তি দিয়েছি। ঘটনাটির সারসংক্ষেপ হলো- একদা ফির‘আন স্বপ্নে দেখে যে, বায়তুল মুক্বাদ্দিসের দিক হতে এক আগুন এসে মিসরের প্রত্যেক কিবতীর ঘরে প্রবেশ করছে, কিন্তু তা বানী ইসরাঈলের ঘরে যায়নি। এ স্বপ্নের ব্যাখ্যা ছিল এই যে, বানী ইসরাঈলের মধ্যে এমন একটি ছেলে জন্ম গ্রহণ করবে যার হাতে তার অহঙ্কার চূর্ণ হয়ে যাবে। তাই সে চারদিকে নির্দেশ জারি করে দিল যে, বানী ইসরাঈলের ঘরে যে সন্তান জন্মগ্রহণ করবে সরকারি লোক দ্বারা যাচাই করে দেখবে। যদি পুত্র সন্তান হয় তৎক্ষণাৎ তাকে মেরে ফেলবে। আর যদি কন্যা সন্তান হয় তবে তাকে ছেড়ে দিবে। এ নীতি চালু অবস্থায় আল্লাহ তা‘আলা মূসা (আঃ)-কে ঐ ফেরআউনের ঘরেই লালিত-পালিত করেন। আল্লাহ তা‘আলা বলছেন, পরিণত বয়সে নবুয়তী পেয়ে ফির‘আউনের এ নির্যাতন থেকে মুক্তি লাভ করার পর মূসা (আঃ)-এর সাথে স্বদেশ ত্যাগকালে যখন ফির‘আউন দলবল নিয়ে তোমাদেরকে পাকড়াও করতে এসেছিল আর তোমরা এমতাবস্থায় সমুদ্রের উপকূলে ছিলে যখন তোমাদের নাজাতের কোন উপায় ছিল না, এমতাবস্থায় আমি তোমাদের জন্য সমুদ্রের মধ্য দিয়ে রাস্তা তৈরি করে দিলাম আর তোমরা মুক্তি পেলে। সুতরাং এসব নেয়ামত পেয়ে আল্লাহ তা‘আলার শুকরিয়া আদায় করা উচিত এবং তাঁর বিধান মেনে চলা উচিত।



(وَإِذْ وَاعَدْنَا)



‘আর যখন আমি মূসার সঙ্গে চল্লিশ রাত্রির অঙ্গীকার করেছিলাম’এখানে আল্লাহ তা‘আলা মূসা (আঃ)-কে তাওরাত দেয়ার জন্য যে ৪০ দিনের ওয়াদা দিয়েছিলেন সে নেয়ামতের কথা আলোচনা করেছেন। প্রথমে ত্রিশ দিনের ওয়াদা দিয়েছিলেন পরে দশ দিন বাড়িয়ে দিয়ে চল্লিশ দিন পূর্ণ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَوٰعَدْنَا مُوْسٰی ثَلٰثِیْنَ لَیْلَةً وَّاَتْمَمْنٰھَا بِعَشْرٍ فَتَمَّ مِیْقَاتُ رَبِّھ۪ٓ اَرْبَعِیْنَ لَیْلَةً)



“স্মরণ কর, মূসার জন্য আমি ত্রিশ রাত্রি নির্ধারণ করি এবং আরও দশ দ্বারা সেটা পূর্ণ করি। এভাবে তার প্রতিপালকের নির্ধারিত সময় চল্লিশ রাত্রিতে পূর্ণ হয়।”(সূরা আ‘রাফ ৭:১৪২)



কিন্তু তারা সময় হওয়ার পূর্বেই ধৈর্যহারা হয়ে গেল। এমনকি মূসা (আঃ) চলে যাবার পর তারা গো-বৎসের পূজা/উপাসনা করতে শুরু করে দিল, যার মাধ্যমে তারা নিজেদের ওপর জুলুম করল। তারপরও আল্লাহ তা‘আলা একজন আরেকজনকে হত্যা করার মাধ্যমে তাওবাহ করার নির্দেশ দিলেন এবং এর মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে ক্ষমা করে দিলেন যাতে তারা শুকরিয়া আদায় করে।



অতঃপর মূসা (আঃ) তাঁর সম্প্রদায়কে বললেন: তোমরা গো-বৎসকে তোমাদের মা‘বূদরূপে গ্রহণ করে নিজেদের ওপর জুলুম করেছ। অতএব একজন আরেকজনকে হত্যা করার মাধ্যমে তোমাদের প্রতিপালকের নিকট তাওবাহ কর। জাহান্নামে চিরস্থায়ী থাকার চেয়ে এটা তোমাদের জন্য উত্তম। তারপর আল্লাহ তা‘আলা তাদের অবাধ্যতার সীমালঙ্ঘনের কথা তুলে ধরেছেন, যখন তারা আল্লাহ তা‘আলার কথা শুনল তখন মূসাকে বলল: এগুলো যে আল্লাহ তা‘আলার কথা তা আমরা কখনো বিশ্বাস করব না যতক্ষণ না আমরা আল্লাহ তা‘আলাকে দেখতে পাব। তাদের দাবি অনুযায়ী আল্লাহ তা‘আলাকে দেখতে গেলে বজ্রধ্বনি তাদেরকে পাকড়াও করল। যার ফলে তারা সবাই মৃত্যু বরণ করল। অতঃপর মূসা (আঃ)-এর দু‘আয় তাদেরকে পুনরায় জীবন ফিরিয়ে দেয়া হলো। এভাবে তাদের প্রয়োজনীয় মুহূর্তে আল্লাহ তা‘আলা করুণা করে তাদের এ ইহকালীন ও পরকালীন মুক্তির পথ সুগম করেছেন কিন্তু তারা ছিল বড়ই অবাধ্য ও অকৃতজ্ঞ জাতি। নিম্নে তাদের প্রতি প্রদত্ত নিয়ামতকে সংক্ষেপে উল্লেখ করা হলো।



আল্লাহ তা‘আলা বানী ইসরাঈলকে যে সকল নেয়ামত প্রদান করেছিলেন তা হল:



১. বানী ইসরাঈলের হিদায়াতস্বরূপ মূসা (আঃ)-কে আসমানী কিতাব তাওরাত প্রদান। (সূরা বাকারাহ ২:৫৩)

২. বিভিন্ন জঘন্য অপরাধ করার পরও আল্লাহর পক্ষ হতে ক্ষমা প্রদান। (সূরা বাকারাহ ২:৫২)

৩. ফির‘আউনের শাস্তি থেকে মুক্তি প্রদান। (সূরা বাকারাহ ২:৪৯)

৪. সমুদ্রে নিমজ্জিত হওয়া থেকে মুক্তি প্রদান। (সূরা বাকারাহ ২:৫০)

৫. বারটি গোত্রের জন্য বারটি ঝর্ণা প্রবাহিত করা। (সূরা বাকারাহ ২:৬০)

৬. আসমানী খাদ্য মান্না ও সালওয়া প্রদান। (সূরা বাকারাহ ২:৫৭)



মান্না ও সালওয়া এক প্রকার আল্লাহ তা‘আলা প্রদত্ত খাদ্য যা একমাত্র বানী ইসরাঈলের জন্যই নির্দিষ্ট ছিল। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: সালওয়া হল এক প্রকার ছোট পাখি। ইকরামা বলেন: সালওয়া হল এক প্রকার পাখি যা চড়ুই পাখির ন্যায়। বারী বিন আনাস বলেন: মান্না মধু জাতীয় জিনিস যা তারা পানি দিয়ে মিশিয়ে পান করত।



হাদীসে এসেছে, ব্যাঙ-এর ছাতা মান্নার অর্ন্তভুক্ত, তার পানি চক্ষু রোগের প্রতিষেধক। (সহীহ বুখারী হা: ৪৬৩৯) সঠিক কথা হচ্ছে মান্না হল মিষ্টি জাতীয় আর সালওয়া হল পাখির গোশত।



৭. সকল খাদ্য বানী ইসরাঈল এর জন্য হালাল করা। (সূরা আলি-ইমরান ৩:৯৩)



৮. তাদের মাঝে ধারাবাহিকভাবে নাবী-রাসূলগণের আগমন। যেমন হাদীসে এসেছে:



عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللّٰهِ صلي اللّٰه عليه وسلم إِنَّ بَنِي إِسْرَائِيلَ كَانَتْ تَسُوسُهُمْ الْأَنْبِيَاءُ إِذَا مَاتَ نَبِيٌّ قَامَ نَبِيٌّ وَإِنَّهُ لَا نَبِيَّ بَعْدِي



আবূ হুরাইরাই (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, নিশ্চয়ই বানী ইসরাঈদের মধ্যে নাবীগণ ধারাবাহিকভাবে এসেছে। যখন কোন নাবী মারা গেছেন তখনই তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছে অন্য নাবী। আর আমার পরে কোন নাবী নেই। (মুসনাদ আবূ আওয়ানা: ৭১২৮)



৯. স্বাছন্দময় জীবন যাপনের ব্যাবস্থাকরণ।



এ ছাড়াও বানী ইসরাঈলকে আরো অনেক নেয়ামত দান করা হয়েছিল। কিন্তু তারা এত নেয়ামত পাওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ তা‘আলার সাথে কুফরী করেছে, মূসা (আঃ)-এর প্রতি ঈমান আনার পরিবর্তে তাঁর বিরোধিতা করেছে। সুতরাং আমাদের সতর্ক হওয়া উচিত, রাত-দিন আমরা আল্লাহ তা‘আলার কত নেয়ামত ভোগ করছি, তিনি আমাদের ওপর কত অনুগ্রহ করছেন! কখনো যেন আমরা তাঁর সাথে কুফরী না করি, তাঁর নেয়ামত অস্বীকার না করি। বরং সর্বদা তাঁর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করব এবং তাঁর আদেশ নিষেধ মেনে চলব। আল্লাহ তা‘আল্ াআমাদের তাওফীক দিন। (আমীন)!



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. নেয়ামতের কথা স্মরণ করে আল্লাহ তা‘আলার শুকরিয়া আদায় করা কর্তব্য।

২. আল্লাহ তা‘আলা বান্দাদেরকে বিভিন্ন বিপদাপদ দ্বারা পরীক্ষা করেন এটা জানার জন্য যে, কারা তাঁর দীনের ওপর অটল থাকে।

৩. বানী ইসরাঈলের প্রতি আল্লাহ তা‘আলার বিভিন্ন নেয়ামতের কথা জানতে পারলাম।

৪. যারা আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূলের বিরোধিতা করে তথা ইসলাম বিদ্রোহী হয় তাদের পরিণতি খুব খারাপ, যেমন মূসা (আঃ)-এর বিরোধী বানী ইসরাঈল জাতির হয়েছিল।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৪৯-৫০ নং আয়াতের তাফসীর

এই আয়াতসমূহে মহান আল্লাহ হযরত ইয়াকূব (আঃ)-এর সন্তানদেরকে লক্ষ্য করে বলছেন যে, আল্লাহর সেই অনুগ্রহের কথা তাদের স্মরণ করা উচিত যে, তিনি তাদেরকে ফিরআউনের জঘন্যতম শাস্তি হতে রক্ষা করেছেন। অভিশপ্ত ফির'আউন স্বপ্নে দেখেছিল যে, বায়তুল মুকাদ্দাসের দিক হতে এক আগুন জ্বলে উঠে মিসরের প্রত্যেক কিবতীর ঘরে প্রবেশ করেছে, কিন্তু তা বানী ইসরাঈলের ঘরে যায়নি। এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা ছিল এই যে, বানী ইসরাঈলের মধ্যে এমন একটি ছেলে জন্মগ্রহণ করবে যার হাতে তার অহংকার চূর্ণ হয়ে যাবে এবং তার খোদায়ী দাবীর চরম শাস্তি তার হাতেই হবে। এজন্যেই সেই অভিশপ্ত ব্যক্তি চারদিকে এ নির্দেশ জারী করে দিল যে, বানী ইসরাঈলের ঘরে যে সন্তান জন্মগ্রহণ করবে, সরকারী লোক যাচাই করে দেখবে। যদি পুত্র সন্তান হয় তবে তৎক্ষণাৎ তাকে মেরে ফেলা হবে। আর যদি মেয়ে সন্তান হয় তবে তাকে ছেড়ে দেয়া হবে। আরও ঘোষণা করলো যে, বানী ইসরাঈলের দ্বারা কঠিন ও ভারী কাজ করিয়ে নেয়া হবে এবং তাদের মাথার উপরে ভারী ভারী বোঝা চাপিয়ে দেয়া হবে। এখানে শাস্তির তাফসীর পুত্র সন্তান হত্যার দ্বারা করা হয়েছে। সূরা-ই-ইবরাহীমে একের সংযোগ অন্যের উপর করা হয়েছে। এর পূর্ণ ব্যাখ্যা ইনশাআল্লাহ সূরা-ই কাসাসের প্রথমে দেয়া হবে।

(আরবি)-এর অর্থ হচ্ছে ‘লাগিয়ে দেয়া এবং সদা করতে থাকা। অর্থাৎ তারা বরাবরই কষ্ট দিয়ে আসছিল। যেহেতু এই আয়াতের পূর্বে বলেছিলেন যে, তারা যেন আল্লাহর পুরস্কার রূপে দেয়া নিয়ামতের কথা স্মরণ করে। এজন্যে ফিরআউনীদের শাস্তিকে ব্যাখ্যা হিসেবে পুত্র সন্তান হত্যা দ্বারা বর্ণনা করেছেন। আর সূরা-ই-ইবরাহীমের প্রথমে বলেছিলেন যে, তারা যেন আল্লাহর নিয়ামতকে স্মরণ করে এজন্যে সেখানে সংযোগের সঙ্গে বর্ণনা করেছেন, যাতে নিয়ামতের সংখ্যা বেশী হয়। অর্থাৎ বিভিন্ন শাস্তি হতে এবং পুত্র সন্তান হত্যা হতে তাদেরকে হযরত মূসা (আঃ)-এর মাধ্যমে রক্ষা করেছিলেন।

মিসরের আমালীক কাফির বাদশাহদেরকে ফির'আউন বলা হতো। যেমন রূমের কাফির বাদশাহকে কাইসার, পারস্যের কাফির বাদশাহকে কিসরা, ইয়ামনের কাফির বাদশাহকে ‘তুব্বা, হাবশের কাফির বাদশাহকে নাজ্জাসী এবং ভারতের কাফির বাদশাহকে বলা হতো বাতলীমুস।

ঐ ফিরআউনের নাম ছিল ওয়ালিদ বিন মুসআব বিন রাইহান। কেউ কেউ মুসআব বিন রাইয়ানও বলেছেন। আমালীক বিন আউদ বিন আরদাম বিন সাম বিন নূহের সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তার কুনইয়াত ছিল আবু মাররাহ্। প্রকৃতপক্ষে সে ইসতাগার ফারসীদের মুলোদ্ভূত ছিল। তার উপর আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হোক। আল্লাহ পাক বলেন যে, এ মুক্তি দেয়ার মধ্যে তাঁর পক্ষ হতে এক অতি নিয়ামত ছিল। (আরবি)-এর প্রকৃত অর্থ হচ্ছে নিয়ামত। পরীক্ষা ভাল ও মন্দ উভয়ের সাথেই হয়ে থাকে। কিন্তু (আরবি)-এর শব্দ সাধারণতঃ মন্দের পরীক্ষার জন্যে এবং (আরবি) এর শব্দ মঙ্গলের পরীক্ষার জন্যে এসে থাকে। এটা বলা হয়েছে যে, এতে অর্থাৎ ঐ শাস্তি এবং পুত্র সন্তানদের হত্যা করার মধ্যে তাদের পরীক্ষা ছিল।

কুরতবী (রঃ) দ্বিতীয় ভাবকে জমহরের কথা বলে থাকেন। তাহলে এতে ইঙ্গিত হবে যবাহ ইত্যাদির দিকে এবং (আরবি)-এর অর্থ হবে মন্দ। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেছেন যে, তিনি তাদেরকে ফির'আউনের দল হতে বাঁচিয়ে নিয়েছেন। তারা হযরত মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে বেরিয়ে গিয়েছিল এবং ফির'আউন তাদেরকে ধরার জন্যে দলবলসহ বেরিয়ে পড়েছিল। অতঃপর আল্লাহ তাআলা সমুদ্রকে বিভক্ত করে দিয়ে তাদেরকে পার করেছিলেন এবং তাদের চোখের সামনে ফিরআউনের তার সৈন্যবানিহীসহ ডুবিয়ে দিয়েছিলেন। এসব কথার বিস্তারিত বর্ণনা ইনশাআল্লাহ সূরা-ই-শু’রার মধ্যে আসবে।

আমর বিন মাইমুন আওদী (রঃ) বলেন যে, যখন হযরত মূসা (আঃ) বানী ইসরাঈলকে নিয়ে বের হন তখন ফিরআউন এ সংবাদ পেয়ে তার লোকজনকে বলে যে, তারা যেন মোরগের ডাকের সাথে সাথে বেরিয়ে পড়ে এবং তাদেরকে ধরে যেন হত্যা করে দেয়। কিন্তু সেই রাতে সকাল পর্যন্ত আল্লাহর হুকুমে মোরগ ডাকেনি। অতঃপর মোরগের ডাক শোনা মাত্রই ফিরআউন একটি ছাগী যবাহ্ করে এবং বলেঃ আমি এর কলিজা খাওয়ার পূর্বেই ছয় লাখ কিবতী সৈন্য আমার সামনে হাজির চাই। সুতরাং সৈন্যরা হাজির হয়ে গেল। ফিরআউন এই দলবল নিয়ে বড়ই জাকজমকের সাথে বানী ইসরাঈলকে ধ্বংস করার জন্যে বেরিয়ে বানী ইসরাঈলকে তারা সমুদ্রের ধারে পেয়ে গেল। এখন বানী ইসরাঈলের নিকট বিরাট পৃথিবী সংকীর্ণ হয়ে পড়লো। পিছনে সরলে ফিরআউনদের তরবারীর নীচে পড়তে হবে, আবার সামনে এগুলে মাছে গ্রাস করে নেবে। সে সময় হযরত ইউসা বিন নূন বললেন যে, হে আল্লাহর নবী (আঃ)! এখন কি করা যায়? তিনি বলেনঃ “আল্লাহর নির্দেশ আগে আগে রয়েছে। এটা শোনা মাত্রই তিনি ঘোড়া নিয়ে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। কিন্তু গভীর পানিতে যখন ঘোড়া ডুবতে লাগলো তখন তিনি ধারে ফিরে আসলেন এবং জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে মূসা! প্রভুর সাহায্য কোথায়? আমরা আপনাকেও মিথ্যাবাদী মনে করি না, প্রভুকেও নয়।' তিনবার তিনি এরকমই করলেন। এখন হযরত মূসা (আঃ)-এর নিকট ওয়াহী আসলোঃ “হে মূসা (আঃ)! তোমার লাঠিটি নদীর উপর মার।' লাঠি মারা মাত্রই পানির মধ্যে রাস্তা হয়ে গেল এবং পানি পাহাড়ের মত উঁচু হয়ে গেল। হযরত মূসা (আঃ) ও তাঁর অনুসারীগণ ঐ রাস্তা দিয়ে পার হয়ে গেলেন। তাদেরকে এভাবে পার হতে দেখে ফিরআউন ও তার সঙ্গীরা এ পথে তাদের ঘোড়া ছেড়ে দিল। যখন সবাই তার মধ্যে এসে গেল তখন আল্লাহ পানিকে মিলে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। দুই দিকের পানি একাকার হয়ে গেল এবং তারা সবাই ডুবে মরে গেল। বানী ইসরাঈল নদীর অপর তীরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আল্লাহর ক্ষমতার এ দৃশ্য স্বচক্ষে অবলোকন করলো। তারা অত্যন্ত সন্তুষ্ট হলো। নিজেদের মুক্তি এবং ফিরআউনের ধ্বংস তাদের জন্য খুশীর কারণ হয়ে গেল। এও বর্ণিত আছে যে, এটা আশূরার দিন ছিল। অর্থাৎ মহরম মাসের ১০ তারিখ।

মুসনাদ-ই-আহমাদের হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মদীনায় এসে যখন দেখলেন যে, ইয়াহূদীরা আশূরার রোযা রয়েছে, তখন তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেনঃ এইদিন তোমরা রোযা রাখ কেন? তারা উত্তরে বলেঃ ‘এজন্যে যে, এ কল্যাণময় দিনে বানী ইসরাঈল ফিরআউনের হাত হতে মুক্তি পেয়েছিল এবং তাদের শত্রুরা ডুবে মরেছিল। তারই কৃতজ্ঞতা প্রকাশরূপে হযরত মূসা (আঃ) এ রোযা রেখেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমাদের অপেক্ষা মূসা (আঃ)-এর আমিই বেশী হকদার। সুতরাং রাসূলুল্লাহও (সঃ) ঐ দিন রোযা রাখেন এবং জনগণকে রোযা রাখতে নির্দেশ দেন। সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম ও সুনান-ই- ইবনে মাজার মধ্যেও এ হাদীসটি আছে। অন্য একটি দুর্বল হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “ঐ দিন আল্লাহ্ তা'আলা বানী ইসরাঈলের জন্যে পানি উঁচু করে দিয়েছিলেন। এ হাদীসের বর্ণনাকারী জায়দুলআমা দুর্বল এবং তার শিক্ষক ইয়াযীদ রেকাশী তার চেয়েও বেশী দুর্বল।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।