সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 37)
হরকত ছাড়া:
فتلقى آدم من ربه كلمات فتاب عليه إنه هو التواب الرحيم ﴿٣٧﴾
হরকত সহ:
فَتَلَقّٰۤی اٰدَمُ مِنْ رَّبِّهٖ کَلِمٰتٍ فَتَابَ عَلَیْهِ ؕ اِنَّهٗ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِیْمُ ﴿۳۷﴾
উচ্চারণ: ফাতালাক্কা আ-দামুমির রাব্বিহী কালিমা-তিন ফাতা-বা ‘আলাইহি ইন্নাহূ হুওয়াত্তাওওয়া-বুর রাহীম।
আল বায়ান: অতঃপর আদম তার রবের পক্ষ থেকে কিছু বাণী পেল, ফলে আল্লাহ তার তাওবা কবূল করলেন। নিশ্চয় তিনি তাওবা কবূলকারী, অতি দয়ালু।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩৭. তারপর আদম(১) তার রবের কাছ থেকে কিছু বাণী পেলেন(২)। অতঃপর আল্লাহ তার তাওবা কবুল করলেন(৩)। নিশ্চয় তিনিই তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।
তাইসীরুল ক্বুরআন: তারপর আদাম (আ.) তার প্রতিপালকের নিকট হতে কিছু বাণী প্রাপ্ত হল, অতঃপর আল্লাহ তার প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করলেন, তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
আহসানুল বায়ান: ৩৭। অতঃপর আদম তার প্রতিপালকের নিকট হতে কিছু বাণী প্রাপ্ত হল। (1) আল্লাহ তার তওবা (অনুশোচনা) কবুল করলেন। নিশ্চয় তিনি তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।
মুজিবুর রহমান: অতঃপর আদম স্বীয় রাব্ব হতে কতিপয় বাণী শিক্ষা লাভ করল, আল্লাহ তখন তার প্রতি কৃপা দৃষ্টি দিলেন; নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল, করুণাময়!
ফযলুর রহমান: আদম তখন (ক্ষমা চাওয়ার জন্য) তার প্রভুর কাছ থেকে কয়েকটি কথা শিখে নেয়। অতঃপর তিনি তাকে ক্ষমা করে দেন। কারণ, তিনি তো ক্ষমাশীল, দয়ালু।
মুহিউদ্দিন খান: অতঃপর হযরত আদম (আঃ) স্বীয় পালনকর্তার কাছ থেকে কয়েকটি কথা শিখে নিলেন, অতঃপর আল্লাহ পাক তাঁর প্রতি (করুণাভরে) লক্ষ্য করলেন। নিশ্চয়ই তিনি মহা-ক্ষমাশীল ও অসীম দয়ালু।
জহুরুল হক: তখন আদম তার প্রভুর কাছ থেকে কিছু কথা শিখে নিলে, তাই তিনি তার দিকে ফিরলেন। নিঃসন্দেহ তিনি নিজেই সদা ফেরেন, অফুরন্ত ফলদাতা।
Sahih International: Then Adam received from his Lord [some] words, and He accepted his repentance. Indeed, it is He who is the Accepting of repentance, the Merciful.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৩৭. তারপর আদম(১) তার রবের কাছ থেকে কিছু বাণী পেলেন(২)। অতঃপর আল্লাহ তার তাওবা কবুল করলেন(৩)। নিশ্চয় তিনিই তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।
তাফসীর:
১. আদম 'আলাইহিস সালাম চরমভাবে বিচলিত হলেন। মহান আল্লাহ অন্তর্যামী এবং অত্যন্ত দয়ালু ও করুণাময়। এ করুণ অবস্থা দেখে আল্লাহ্ তা'আলা নিজেই ক্ষমা প্রার্থনারীতি সম্বলিত কয়েকটি বচন তাদেরকে শিখিয়ে দিলেন। তারই বর্ণনা এ আয়াতসমূহে দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে যে, আদম 'আলাইহিস সালাম স্বীয় প্রভুর কাছ থেকে কয়েকটি শব্দ লাভ করলেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রতি করুণা করলেন। অর্থাৎ তাদের তাওবা গ্রহণ করে নিলেন। নিঃসন্দেহে তিনি মহা ক্ষমাশীল এবং অতি মেহেরবান। কিন্তু যেহেতু পৃথিবীতে আগমনের মধ্যে আরও অনেক তাৎপর্য ও কল্যাণ নিহিত ছিল - যেমন, তাদের বংশধরদের মধ্য থেকে ফেরেশতা ও জ্বিন জাতির মাঝামাঝি এক নতুন জাতি - মানব জাতির আবির্ভাব ঘটা, তাদেরকে এক ধরনের কর্ম স্বাধীনতা দিয়ে তাদের প্রতি শর’য়ী বিধান প্রয়োগের যোগ্য করে গড়ে তোলা এবং অপরাধীর শাস্তি বিধান, শরীআতী আইন ও নির্দেশাবলী প্রবর্তন। এই নতুন জাতি উন্নতি সাধন করে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী হবে।
২. যেসব বাক্য আদম 'আলাইহিস সালামকে তাওবার উদ্দেশ্যে বলে দেয়া হয়েছিল, তা কি ছিল? এ সম্পর্কে মুফাসসির সাহাবাগণের কয়েক ধরনের বর্ণনা রয়েছে। ইবনে আব্বাসের অভিমতই এক্ষেত্রে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ, যা কুরআনুল কারীমের অন্যত্র বর্ণনা (رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنْفُسَنَا وَإِنْ لَمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ) “হে আমাদের রব, আমরা আমাদের নিজেদের উপর অত্যাচার করেছি। যদি আপনি আমাদেরকে ক্ষমা না করেন এবং আমাদের প্রতি দয়া না করেন, তবে আমরা নিশ্চয়ই ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে পরিগণিত হয়ে যাব [সূরা আল-আরাফঃ ২৩] আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে যখন তাদেরকে তাওবার এই বাক্যগুলো শিখিয়ে দেয়া হলো, তখন আদম 'আলাইহিস সালাম যথোচিত মর্যাদা ও গুরুত্বের সাথে তা গ্রহণ করলেন।
৩. (তাওবা) এর প্রকৃত অর্থ, ফিরে আসা। যখন তাওবার সম্বন্ধ মানুষের সংগে হয়, তখন তার অর্থ হবে তিনটি বস্তুর সমষ্টি:- এক কৃত পাপকে পাপ মনে করে সেজন্য লজ্জিত ও অনুতপ্ত হওয়া। দুই পাপ সম্পূর্ণভাবে পরিহার করা। তিন, ভবিষ্যতে আবার এরূপ না করার দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করা। আর যদি পাপ বান্দার হকের সাথে সম্পৃক্ত হয় তবে তা ফেরৎ দেয়া বা তার থেকে মাফ নিয়ে নেয়া।
এ বিষয়গুলোর যেকোন একটির অভাব থাকলে তাওবা হবে না। সুতরাং মৌখিকভাবে “আল্লাহ তাওবা” বা অনুরূপ শব্দ উচ্চারণ করা নাজাত লাভের জন্য যথেষ্ট নয়। আয়াতে বর্ণিত (فَتَابَ عَلَيْهِ) এর মধ্যে তাওবার সম্বন্ধ আল্লাহর সাথে। এর অর্থ তাওবা গ্রহণ করা। অর্থাৎ আল্লাহ তার তাওবা কবুল করলেন। এ আয়াতের দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, তাওবা গ্রহণের অধিকারী আল্লাহ্ তাআলা ছাড়া আর কেউ নয়। ইয়াহূদী ও নাসারাগণ এই ক্ষেত্রে মারাত্মক ভুলে পড়ে আছে। তারা পাদ্রী-পুরোহিতদের কাছে কিছু হাদিয়া উপঢৌকনের বিনিময়ে পাপ মোচন করিয়ে নেয় এবং মনে করে যে, তারা মাফ করে দিলেই আল্লাহর নিকটও মাফ হয়ে যায়। বর্তমানে বহু মুসলিমও এ ধরনের ভ্রান্ত বিশ্বাস পোষণ করে। তারা কোন কোন পীরের কাছে তাওবা করে এবং মনে করে যে, পীর মাধ্যম হয়ে আল্লাহর কাছ থেকে তার পাপ মোচন করিয়ে নেবেন। অথচ কোন পীর বা আলেম কারো পাপ মোচন করিয়ে দিতে পারেন না।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: ৩৭। অতঃপর আদম তার প্রতিপালকের নিকট হতে কিছু বাণী প্রাপ্ত হল। (1) আল্লাহ তার তওবা (অনুশোচনা) কবুল করলেন। নিশ্চয় তিনি তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।
তাফসীর:
(1) আদম (আঃ) লজ্জিত অবস্থায় দুনিয়ায় আগমন করে তাওবা ও ক্ষমা প্রার্থনায় মনোনিবেশ করলেন। এই সময় মহান আল্লাহ তাঁর দিক-নির্দেশনা ও সহযোগিতা করে তাঁকে ক্ষমা চাওয়ার সেই বাক্যগুলো শিখিয়ে দিলেন, যা সূরা আ'রাফে (২৩নং আয়াতে) উল্লেখ করা হয়েছে। {قَالَا رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنْفُسَنَا وَإِنْ لَمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا...} কেউ কেউ এখানে একটি জাল হাদীসের আশ্রয় নিয়ে বলেন যে, আদম (আঃ) আল্লাহর আরশের উপরে "লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ" লেখা দেখেন এবং মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর অসীলা গ্রহণ করে দুআ করেন; ফলে আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করে দেন। এটা ভিত্তিহীন বর্ণনা এবং ক্বুরআনের বর্ণনারও পরিপন্থী। এ ছাড়া এটা আল্লাহর বর্ণিত তরীকারও বিপরীত। প্রত্যেক নবী সব সময় সরাসরি আল্লাহর নিকট দুআ করেছেন। অন্য কোন নবী ও অলীর মাধ্যম ও অসীলা ধরেননি। কাজেই নবী করীম (সাঃ) সহ সকল নবীদের দুআ করার নিয়ম এটাই ছিল যে, তাঁরা বিনা অসীলা ও মাধ্যমে আল্লাহর দরবারে সরাসরি দুআ করেছেন।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৩৫ হতে ৩৯ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তা‘আলা ফেরেশতা কর্তৃক আদমকে সিজদাহ করার নির্দেশ দেয়ার পর আদমকে যে মর্যাদা দান করেছেন সেই সম্পর্কে আলোচনা শুরু করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা তাদের উভয়ের জন্য জান্নাতকে বসবাসের স্থান করে দিলেন এবং সকল প্রকার ভোগ-সম্ভোগ দিলেন, তবে একটি গাছের নিকটবর্তী হতে নিষেধ করলেন। আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:
(وَيَا آدَمُ اسْكُنْ أَنْتَ وَزَوْجُكَ الْجَنَّةَ فَكُلَا مِنْ حَيْثُ شِئْتُمَا وَلَا تَقْرَبَا هٰذِهِ الشَّجَرَةَ فَتَكُونَا مِنَ الظَّالِمِينَ)
“হে আদম! তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস কর এবং যেখান থেকে ইচ্ছা খাও, কিন্তু এ বৃক্ষের নিকটবর্তী হয়ো না, হলে তোমরা জালিমদের অন্তর্ভুক্ত হবে।” (সূরা আ‘রাফ ৭:১৯)
সে বৃক্ষের নাম কী বা সে বৃক্ষটি কী এ নিয়ে তাফসীরে অনেক বর্ণনা পাওয়া যায়, তবে সঠিক কথা হল: তা জান্নাতের গাছগুলোর অন্যতম একটি গাছ। আল্লাহ তা‘আলাই ভাল জানেন।
অতঃপর উভয়ে জান্নাতে বসবাসকালে শয়তানের প্ররোচনায় আল্লাহ তা‘আলার নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করেন।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(فَوَسْوَسَ لَھُمَا الشَّیْطٰنُ لِیُبْدِیَ لَھُمَا مَا و۫رِیَ عَنْھُمَا مِنْ سَوْاٰتِھِمَا وَقَالَ مَا نَھٰٿکُمَا رَبُّکُمَا عَنْ ھٰذِھِ الشَّجَرَةِ اِلَّآ اَنْ تَکُوْنَا مَلَکَیْنِ اَوْ تَکُوْنَا مِنَ الْخٰلِدِیْنَ)
“অতঃপর তাদের লজ্জাস্থান যা তাদের কাছে গোপন রাখা হয়েছিল তা তাদের কাছে প্রকাশ করার জন্য শয়তান তাদেরকে কুমন্ত্রণা দিল এবং বলল, তোমরা উভয়ে ফেরেশতা হয়ে যাবে অথবা তোমরা স্থায়ী হয়ে যাবে এজন্যই তোমাদের প্রতিপালক এ বৃক্ষ সম্বন্ধে তোমাদেরকে নিষেধ করেছেন।”(সূরা আ‘রাফ ৭:২০)
এমনকি শয়তান আল্লাহ তা‘আলার নামে শপথ করে বলল, আমি তোমাদের কল্যাণকামী।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَقَاسَمَهُمَآ إِنِّيْ لَكُمَا لَمِنَ النّٰصِحِيْنَ لا فَدَلّٰهُمَا بِغُرُوْرٍ )
“সে তাদের উভয়ের নিকট শপথ করে বলল: আমি তো তোমাদের কল্যাণকারীদের একজন। এভাবে সে তাদের উভয়কে প্রবঞ্চনার দ্বারা অধঃপতিত করল।”(সূরা আ‘রাফ ৭:২১-২২)
এভাবে প্ররোচিত করে শয়তান জান্নাতের নেয়ামত থেকে তাদেরকে অপদস্থ ও অপমানিত করে বের করে দিল। তারপর আল্লাহ তা‘আলা উভয়কে সম্বোধন করে বললেন; “আমি কি তোমাদেরকে ঐ গাছের নিকটবর্তী হতে নিষেধ করিনি এবং তোমাদেরকে বলিনি যে, শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্র“?”
আল্লাহ তা‘আলা এরূপ অন্যত্র বলেন:
(وَنَادٰهُمَا رَبُّهُمَآ أَلَمْ أَنْهَكُمَا عَنْ تِلْكُمَا الشَّجَرَةِ وَأَقُلْ لَّكُمَآ إِنَّ الشَّيْطٰنَ لَكُمَا عَدُوٌّ مُّبِيْنٌ)
“তখন তাদের প্রতিপালক তাদেরকে সম্বোধন করে বললেন: ‘আমি কি তোমাদেরকে এ বৃক্ষের নিকটবর্তী হতে বারণ করিনি এবং আমি কি তোমাদেরকে বলিনি যে, শয়তান তো তোমাদের প্রকাশ্য শত্র“?” (সূরা আ‘রাফ ৭:২২)
তাদের এ অপরাধের জন্য আল্লাহ তা‘আলা নির্দেশ জারি করলেন:
(وَقُلْنَا اھْبِطُوْا بَعْضُکُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّﺆ وَلَکُمْ فِی الْاَرْضِ مُسْتَقَرٌّ وَّمَتَاعٌ اِلٰی حِیْنٍ)
“এবং আমি বললাম, নেমে যাও, তোমরা পরস্পর পরস্পরের শত্র“। আর পৃথিবীতেই তোমাদের জন্য এক নির্দিষ্টকালের বসবাস ও ভোগ-সম্পদ রয়েছে।”
ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: আল্লাহ তা‘আলা আদমকে বললেন, আমি তোমাকে যে গাছের নিকটবর্তী হতে নিষেধ করেছি সে গাছের ফল খেতে কিসে তোমাকে উদ্বুুদ্ধ করল। সে বলল: হাওয়া আমাকে তা সুশোভিত করে দেখিয়েছে। তখন আল্লাহ তা‘আলা বললেন: আমি তার শাস্তিস্বরূপ গর্ভধারণ বেদনা ও প্রসব বেদনা দিয়েছি। (দুররুল মানসুর, ১/১৩২, ফাতহুর কাদীর, ১১১, আল মাত্বালিব আল আলিয়া- কিতাবুল হায়েয। হাদীসটি মাওকুফ কিন্তু তার সনদ সহীহ)
ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: আদমকে হিন্দুস্তানে পাঠানো হয়েছিল এবং হাওয়াকে জেদ্দায়। হাওয়া (আঃ)-কে আদম (আঃ) খুঁজতে খুঁজতে মুযদালিফায় একত্রিত হন। হাওয়া তাকে জড়িয়ে ধরল। এ জন্য মুযদালিফাকে মুযদালিফা বলা হয়।
অতঃপর আদম ও হাওয়া তাদের অপরাধ বুঝতে পেরে আল্লাহ তা‘আলার কাছে অনুশোচনা ও তাওবাহ করল। সে তাওবার বাক্যও আল্লাহ তা‘আলার কাছ থেকে শিখে নিলেন।
( رَبَّنَا ظَلَمْنَآ اَنْفُسَنَاﺒ فَاِنْ لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَکُوْنَنَّ مِنَ الْخٰسِرِیْنَ)
‘‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিজেদের প্রতি অন্যায় করেছি, যদি তুমি আমাদেরকে ক্ষমা না কর এবং দয়া না কর তবে তো আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব।’(সূরা আ‘রাফ ৭:২৩)
কেউ এখানে একটি জাল হাদীসের আশ্রয় নিয়ে বলেন যে, আদম (আঃ) আল্লাহ তা‘আলার আরশের ওপর ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’লেখা দেখেন এবং মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওসীলা গ্রহণ করে দু‘আ করেন; ফলে আল্লাহ তা‘আলা তাঁেক ক্ষমা করে দেন। এটা ভিত্তিহীন বর্ণনা এবং কুরআনের বর্ণনার পরিপন্থী। এ ছাড়া এটা আল্লাহ তা‘আলার বর্ণিত তরীকারও বিপরীত। প্রত্যেক নাবী সব সময় সরাসরি আল্লাহ তা‘আলার নিকট দু‘আ করেছেন। অন্য কোন নাবী ও অলীর ওসীলা বা মাধ্যম ধরেননি। কাজেই নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-সহ সকল নাবীদের দু‘আ করার নিয়ম এটাই ছিল যে, তাঁরা বিনা ওসীলা ও মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলার দরবারে সরাসরি দু‘আ করেছেন।
তারপর আল্লাহ তা‘আলা উভয়ের তাওবাহ কবূল করে দুনিয়াতে প্রেরণ করলেন। দুনিয়াতে আদম ও হাওয়াকে পাঠিয়ে বলে দিলেন- তোমাদের নিকট আমার পক্ষ থেকে হিদায়াত আসবে, যে ব্যক্তি তার প্রতি ঈমান আনবে এবং তার প্রদর্শিত পথ অবলম্বন করবে তাদের কোন শঙ্কা নেই এবং কোন দুশ্চিন্তাও নেই। অর্থাৎ পরকালে সকল প্রকার ভয় ও হতাশামুক্ত থাকবে।
অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(فَاِمَّا یَاْتِیَنَّکُمْ مِّنِّیْ ھُدًیﺃ فَمَنِ اتَّبَعَ ھُدَایَ فَلَا یَضِلُّ وَلَا یَشْقٰی)
“পরে আমার পক্ষ হতে তোমাদের নিকট সৎ পথের নির্দেশ আসলে যে আমার পথ অনুসরণ করবে সে বিপথগামী হবে না ও দুঃখ-কষ্ট পাবে না।”(সূরা ত্বা-হা: ২০:১২৩)
যে ব্যক্তি আমার হিদায়াতের অনুসরণ করবে সে পথভ্রষ্ট হবে না এবং দুর্ভাগাও হবে না। তাই যে ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলা প্রদত্ত হিদায়াত অনুসরণ করবে সে ব্যক্তি চারটি জিনিস থেকে মুক্ত থাকবে।
১. দুশ্চিন্তা, ২. ভয়-ভীতি, ৩. পথভ্রষ্টতা, ৪. দুর্ভাগ্য। (তাফসীরে সা‘দী পৃঃ ২৭)
আদম ও হাওয়া (আঃ)-এর বিষয়কে কেন্দ্র করে আল্লাহ তা‘আলা সকল আদম সন্তানকে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন:
(يٰبَنِيْٓ اٰدَمَ لَا يَفْتِنَنَّكُمُ الشَّيْطٰنُ كَمَآ أَخْرَجَ أَبَوَيْكُمْ مِّنَ الْجَنَّةِ يَنْزِعُ عَنْهُمَا لِبَاسَهُمَا لِيُرِيَهُمَا سَوْاٰتِهِمَا ط إِنَّه۫ يَرٰكُمْ هُوَ وَقَبِيْلُه۫ مِنْ حَيْثُ لَا تَرَوْنَهُمْ ط إِنَّا جَعَلْنَا الشَّيٰطِيْنَ أَوْلِيَآءَ لِلَّذِيْنَ لَا يُؤْمِنُوْنَ )
“হে বানী আদম! শয়তান যেন তোমাদেরকে কিছুতেই ধোঁকায় না ফেলে- যেভাবে তোমাদের পিতা-মাতাকে (আদম-হাওয়া) সে জান্নাত হতে বহিষ্কার করেছিল, তাদেরকে তাদের লজ্জাস্থান দেখানোর জন্য বিবস্ত্র করেছিল। সে নিজে এবং তার দল তোমাদেরকে এমনভাবে দেখে যে, তোমরা তাদেরকে দেখতে পাও না। যারা ঈমান আনে না, শয়তানকে আমি তাদের অভিভাবক করেছি।”(সূরা আ‘রাফ ৭:২৭)
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. আল্লাহ তা‘আলার নিকট আদম (আঃ) ও তাঁর সন্তানদের মর্যাদার কথা জানতে পারলাম।
২. আল্লাহ তা‘আলার অবাধ্য হলে নেয়ামতের পরিবর্তে শাস্তি দেন।
৩. কোন বস্তুর নাম বা ধরণ কুরআনে উল্লেখ না হলে এবং হাদীসেও এর বিবরণ না আসলে তা নিয়ে অহেতুক আলোচনা করা শরীয়তসম্মত নয়।
৪. শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্র“, তার কুমন্ত্রণা থেকে বাঁচার জন্য সতর্ক থাকা দরকার।
৫. কোন অপরাধ হয়ে গেলে তার ওপর অটল না থেকে বরং তা বর্জন করে অনুশোচিত হয়ে তাওবাহ করা ওয়াজিব।
৬. যে ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলা প্রদত্ত হিদায়াতের অনুসরণ করে চলবে সে দুশ্চিন্তা, ভয়-ভীতি, পথভ্রষ্টতা ইত্যাদি থেকে মুক্ত থাকবে।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: যে কথাগুলো হযরত আদম (আঃ) শিখে ছিলেন তা কুরআন মাজীদের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। তা হচ্ছেঃ (আরবি) অর্থাৎ তারা দুইজন বললো-হে আমাদের প্রভু! নিশ্চয় আমরা আমাদের নফসের উপরে অত্যাচার করেছি, আপনি যদি আমাদেরকে ক্ষমা না করেন, তবে অবশ্যই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে হয়ে যাবো।' (৭:২৩) অধিকাংশ লোকের এটাই অভিমত। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে হজ্জের নির্দেশাবলী শিক্ষা করাও বর্ণিত আছে। হযরত উবাইদ বিন উমাইর (রাঃ) বলেন যে, কথাগুলি নিম্নরূপঃ হে আল্লাহ! যে ভুল আমি করেছি, তা কি আমার জন্মের পূর্বে আমার ভাগ্যে লিপিবদ্ধ ছিল, না আমি নিজেই তা আবিষ্কার করেছি। উত্তর হলোঃ তুমি নিজে আবিষ্কার করনি, বরং আমি তোমার ভাগ্যে তা লিখে রেখেছিলাম। এটা শুনে তিনি বললেন হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করে দিল।
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এও বর্ণিত আছে যে, হযরত আদম (আঃ) বলেছিলেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি কি আমাকে স্বহস্তে সৃষ্টি করেননি এবং স্বীয় রূহ কি আমার মধ্যে ফুকে দেননি? আপনি কি আমার হাঁচির উপর (আরবি) বলেননি? আপনার দয়া কি আপনার ক্রোধের উপর প্রাধান্য লাভ করেনি? আমার সৃষ্টির পূর্বেই কি এই ভুল আমার ভাগ্যে লিপিবদ্ধ করেননি? উত্তর হলোঃ হ, এ সব কিছুই করেছি।' তখন বললেনঃ “তা হলে হে আমার প্রভু! আমার তওবা কবূল হওয়ার পর পুনরায় আমি জান্নাত পেতে পারি কি? উত্তর হলোঃ হাঁ।' এটাই ঐকথাগুলো যা হযরত আদম (আঃ) আল্লাহর নিকট শিখেছিলেন।
মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমের আর একটি মারফু হাদীসে আছে যে, হযরত আদম (আঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহ! আমি যদি এ পাপ হতে ফিরে যাই তবে কি পুনরায় বেহেশতে যেতে পারব? উত্তর হলোঃ হ’। আল্লাহ্ নিকট হতে কথাগুলো শিক্ষা করার এটাই অর্থ। কিন্তু এ হাদীসটি গরীব হওয়ার সাথে সাথে মুনকাতিও বটে। কোন কোন মুরুব্বী হতে বর্ণিত আছে যে, কথাগুলো নিম্নরূপঃ হে আল্লাহ! আপনি ছাড়া কোন উপাস্য নেই, আপনি পবিত্র, আমি আপনার প্রশংসা করছি, হে আমার প্রভু! নিশ্চয় আমি আমার আত্মার উপর জুলুম করেছি, সুতরাং আপনি আমাকে ক্ষমা করুন, নিশ্চয় আপনি উত্তম ক্ষমাশীল। হে আল্লাহ! আপনি ছাড়া অন্য কেউ মাবুদ নেই, আমি আপনার পবিত্রতা ঘোষণা করছি এবং প্রশংসা করছি, হে আমার প্রভু! নিশ্চয় আমি আমার আত্মার উপর অত্যাচার করেছি, সুতরাং আপনি আমার প্রতি দয়া প্রদর্শন। করুন, নিশ্চয়ই আপনি উত্তম দয়ালু। হে আল্লাহ! আপনি ছাড়া অন্য কোন মাবুদ নেই, আমি আপনার পবিত্রতা বর্ণনা করছি এবং প্রশংসা করছি, হে আমার প্রভু! নিশ্চয় আমি আমার নাসের উপর জুলুম করেছি, সুতরাং আপনি আমার তাওবা কবুল করুন, নিশ্চয় আপনি তাওবা কবূলকারী ও পরম দয়ালু। কুরআন মাজীদের অন্য জায়গায় আছেঃ “এই লোকেরা কি জানেনা যে, আল্লাহ। তা'আলা তাঁর বান্দাদের তাওবা কবুল করে থাকেন?” অন্যত্র রয়েছেঃ “যে ব্যক্তি কোন খারাপ কাজ করে বা স্বীয় আত্মার উপর অত্যাচার করে বসে, অতঃপর আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে, সে দেখে নেবে যে, আল্লাহ তার তাওবা কবুল করবেন এবং তাকে স্বীয় করুণার মধ্যে নিয়ে নিবেন। আর এক জায়গায় আছেঃ “যে ব্যক্তি তাওবা করে এবং ভাল কাজ করে .....।' এসব আয়াতে বর্ণনা আছে যে, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাদের তাওবা কবুল করে থাকেন। ঐ রকমই এখানেও রয়েছে যে, সেই আল্লাহ তাওবাকারীদের তাওবা ককূলকারী এবং অত্যন্ত দয়ালু। আল্লাহ তা'আলার করুণা ও দয়া এত সাধারণ যে, তিনি তাঁর পাপী বান্দাদেরকেও স্বীয় রহমতের দরজা হতে ফিরিয়ে দেন না। সত্যই তিনি ছাড়া কোন মাবুদ নেই, তিনি বান্দাদের অনুতাপ গ্রহণকারী এবং পরম দয়ালু।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।