সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 3)
হরকত ছাড়া:
الذين يؤمنون بالغيب ويقيمون الصلاة ومما رزقناهم ينفقون ﴿٣﴾
হরকত সহ:
الَّذِیْنَ یُؤْمِنُوْنَ بِالْغَیْبِ وَ یُقِیْمُوْنَ الصَّلٰوۃَ وَ مِمَّا رَزَقْنٰهُمْ یُنْفِقُوْنَ ۙ﴿۳﴾
উচ্চারণ: আল্লাযীনা ইউ’মিনূনা বিলগাইবি ওয়াইউকীমূনাসসালা-তা ওয়া মিম্মা-রাযাকনা-হুমইউনফিকূ ন।
আল বায়ান: গায়েবের প্রতি ঈমান আনে, সালাত কায়েম করে এবং আমি তাদেরকে যে রিয্ক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩. যারা গায়েবের(১) প্রতি ঈমান আনে (২), সালাত কায়েম করে(৩) এবং তাদেরকে আমরা যা দান করেছি তা থেকে ব্যয় করে।(৪)
তাইসীরুল ক্বুরআন: যারা গায়বের প্রতি ঈমান আনে, নামায কায়িম করে এবং আমি যে জীবনোপকরণ তাদেরকে দিয়েছি তা থেকে তারা ব্যয় করে।
আহসানুল বায়ান: ৩। যারা অদৃশ্যে বিশ্বাস করে, [1] যথাযথভাবে নামায পড়ে[2] ও তাদেরকে যা দান করেছি তা হতে ব্যয় করে। [3]
মুজিবুর রহমান: যারা অদৃশ্য বিষয়গুলিতে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সালাত প্রতিষ্ঠা করে এবং আমি তাদেরকে যে উপজীবিকা প্রদান করেছি তা হতে দান করে থাকে ।
ফযলুর রহমান: যারা অদৃশ্য সত্যকে বিশ্বাস করে, নামায আদায় করে, আর আমি তাদেরকে যা দান করেছি তা থেকে (সৎকাজে) ব্যয় করে;
মুহিউদ্দিন খান: যারা অদেখা বিষয়ের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে এবং নামায প্রতিষ্ঠা করে। আর আমি তাদেরকে যে রুযী দান করেছি তা থেকে ব্যয় করে
জহুরুল হক: যারা গায়েবে ঈমান আনে, আর নামায কায়েম করে, আর আমরা যে রিযেক তাদের দিয়েছি তা থেকে তারা খরচ করে থাকে।
Sahih International: Who believe in the unseen, establish prayer, and spend out of what We have provided for them,
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৩. যারা গায়েবের(১) প্রতি ঈমান আনে (২), সালাত কায়েম করে(৩) এবং তাদেরকে আমরা যা দান করেছি তা থেকে ব্যয় করে।(৪)
তাফসীর:
১. غيب এর অর্থ হচ্ছে এমনসব বস্তু যা বাহ্যিকভাবে মানবকুলের জ্ঞানের ঊর্ধ্বে এবং যা মানুষ পঞ্চ-ইন্দ্রিয়ের দ্বারা অনুভব করতে পারে না, চক্ষু দ্বারা দেখতে পায় না, কান দ্বারা শুনতে পায় না, নাসিকা দ্বারা ঘ্রাণ নিতে পারে না, জিহবা দ্বারা স্বাদ গ্রহণ করতে পারে না, হাত দ্বারা স্পর্শ করতে পারে না, ফলে সে সম্পর্কে জ্ঞান লাভও করতে পারে না। কুরআনে غيب শব্দ দ্বারা সে সমস্ত বিষয়কেই বোঝানো হয়েছে যেগুলোর সংবাদ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দিয়েছেন এবং মানুষ যে সমস্ত বিষয়ে স্বীয় বুদ্ধিবলে ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অভিজ্ঞতার মাধ্যমে জ্ঞান লাভে সম্পূর্ণ অক্ষম। এখানে غيب শব্দ দ্বারা ঈমানের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেয়া হয়েছে। যার মধ্যে আল্লাহর অস্তিত্ব ও সত্তা, সিফাত বা গুণাবলী এবং তাকদীর সম্পর্কিত বিষয়সমূহ, জান্নাত-জাহান্নামের অবস্থা, কেয়ামত এবং কেয়ামতে অনুষ্ঠিত হওয়ার ঘটনাসমূহ, ফেরেশতাকুল, সমস্ত আসমানী কিতাব, পূর্ববর্তী সকল নবী ও রাসূলগণের বিস্তারিত বিষয় অন্তর্ভুক্ত যা সূরা আল-বাকারাহর (آمَنَ الرَّسُولُ) আয়াতে দেয়া হয়েছে। এখানে ঈমানের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা আর এ সূরারই শেষে ২৮৫ নং আয়াতে ঈমানের বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে।
২. ঈমান এবং গায়েব। শব্দ দুটির অর্থ যথার্থভাবে অনুধাবন করলেই ঈমানের পুরোপুরি তাৎপর্য ও সংজ্ঞা হৃদয়ঙ্গম করা সম্ভব হবে। ঈমান শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে, কোন বিষয়ে মুখের স্বীকৃতির মাধ্যমে অন্তরে দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করা এবং তা কাজে পরিণত করা। এখানে ঈমানের তিনটি দিক তুলে ধরা হয়েছে। প্রথমতঃ অন্তরে অকপট চিত্তে দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করা। দ্বিতীয়তঃ সে বিষয়ের স্বীকৃতি মুখে দেয়া। তৃতীয়তঃ কর্মকাণ্ডে তার বাস্তাবায়ন করা। শুধু বিশ্বাসের নামই ঈমান নয়। কেননা খোদ ইবলিস, ফিরআউন এবং অনেক কাফেরও মনে মনে বিশ্বাস করত। কিন্তু না মানার কারণে তারা ঈমানদারদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারেনি। তদ্রুপ শুধু মুখে স্বীকৃতির নামও ঈমান নয়। কারণ মুনাফেকরা মুখে স্বীকৃতি দিত। বরং ঈমান হচ্ছে জানা ও মানার নাম। বিশ্বাস করা, মুখে স্বীকৃতি দেয়া এবং কার্যে পরিণত করা -এ তিনটির সমষ্টির নাম ঈমান। তাছাড়া ঈমান বাড়ে ও কমে। উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে ঈমান বিল-গায়েব অর্থ এই দাঁড়ায় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে হেদায়াত এবং শিক্ষা নিয়ে এসেছিলেন, সে সবগুলোকে আন্তরিকভাবে মেনে নেয়া। তবে শর্ত হচ্ছে যে, সেগুলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শিক্ষা হিসেবে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হতে হবে। আহলে-ইসলামের সংখ্যাগরিষ্ট দল ঈমানের এ সংজ্ঞাই দিয়েছেন। [ইবনে কাসীর]
‘ঈমান বিল-গায়েব’ সম্পর্কে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘গায়েবের বিষয়াদির উপর ঈমান আনার চেয়ে উত্তম ঈমান আর কারও হতে পারে না। তারপর তিনি এ সূরার প্রথম পাঁচটি আয়াত তেলাওয়াত করলেন। [মুস্তাদরাকে হাকিম: ২/২৬০] অন্য বর্ণনায় এসেছে, আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি, আপনার সাথে জিহাদ করেছি, আমাদের থেকে উত্তম কি কেউ আছে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “হ্যাঁ, তারা তোমাদের পরে এমন একটি জাতি, যারা আমাকে না দেখে আমার উপর ঈমান আনবে [সুনান দারমী: ২/৩০৮, মুস্তাদরাকে হাকিম: ৪/৮৫] মূলত: এটি ঈমান বিল গায়েব এর একটি উদাহরণ। সাহাবা, তাবেয়ীনদের থেকে বিভিন্ন বর্ণনায় ঈমান বিল গায়েবের বিভিন্ন উদাহরণ পেশ করা হয়েছে। কেউ বলেছেন, কুরআন। আবার কেউ বলেছেন, জান্নাত ও জাহান্নাম। [আত-তাফসীরুস সহীহ: ৯৯] এ সবগুলোই ঈমান বিল গায়েবের উদাহরণ। ঈমানের ছয়টি রুকন সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়াদি ঈমান বিল গায়েবের মূল অংশ।
৩. সালাত’-এর শাব্দিক অর্থ হচ্ছে প্রার্থনা বা দো'আ। শরীআতের পরিভাষায় সে বিশেষ ইবাদাত, যা আমাদের নিকট ‘নামায’ হিসেবে পরিচিত। কুরআনুল কারীমে যতবার সালাতের তাকীদ দেয়া হয়েছে - সাধারণতঃ ‘ইকামত’ শব্দের দ্বারাই দেয়া হয়েছে। সালাত আদায়ের কথা শুধু দু'এক জায়গায় বলা হয়েছে। এ জন্য ইকামাতুস সালাত (সালাত প্রতিষ্ঠা)-এর মর্ম অনুধাবন করা উচিত। ‘ইকামত’ এর শাব্দিক অর্থ সোজা করা, স্থায়ী রাখা। সাধারণতঃ যেসব খুঁটি, দেয়াল বা গাছ প্রভৃতির আশ্রয়ে সোজাভাবে দাঁড়ানো থাকে, সেগুলো স্থায়ী থাকে এবং পড়ে যাওয়ার আশংকা কম থাকে। এজন্য ‘ইকামত’ স্থায়ী ও স্থিতিশীল অর্থেও ব্যবহৃত হয়।
কুরআন ও সুন্নাহর পরিভাষায় ইকামাতুস সালাত অর্থ, নির্ধারিত সময় অনুসারে যাবতীয় শর্তাদি ও নিয়মাবলী রক্ষা করে সালাত আদায় করা। শুধু সালাত আদায় করাকে ‘ইকামাতুস সালাত বলা হয় না। সালাতের যত গুণাবলী, ফলাফল, লাভ ও বরকতের কথা কুরআন হাদীসে বর্ণনা করা হয়েছে, তা সবই ‘ইকামাতুস সালাত’ (সালাত প্রতিষ্ঠা)-এর সাথে সম্পর্কযুক্ত। যেমন, কুরআনুল কারীমে আছে - নিশ্চয়ই সালাত মানুষকে যাবতীয় অশ্লীল ও গর্হিত কাজ থেকে বিরত রাখে। [সূরা আল-আনকাবুত: ৪৫] বস্তুত: সালাতের এ ফল ও ক্রিয়ার তখনই প্রকাশ ঘটবে, যখন সালাত উপরে বর্ণিত অর্থে প্রতিষ্ঠা করা হবে। এ জন্য অনেক সালাত আদায়কারীকে অশ্লীল ও নক্ক্যারজনক কাজে জড়িত দেখে এ আয়াতের মৰ্ম সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করা ঠিক হবে না। কেননা, তারা সালাত আদায় করেছে বটে, কিন্তু প্রতিষ্ঠা করেনি। সুতরাং সালাতকে সকল দিক দিয়ে ঠিক করাকে প্রতিষ্ঠা করা বলা হবে। ইকামত অর্থে সালাতে সকল ফরয-ওয়াজিব, সুন্নাত, মুস্তাহাব পরিপূর্ণভাবে আদায় করা, এতে সব সময় সুদৃঢ় থাকা এবং এর ব্যবস্থাপনা সুদৃঢ় করা সবই বোঝায়।
তাছাড়া সময়মত আদায় করা। সালাতের রুকু, সাজদাহ, তিলাওয়াত, খুশু, খুযু ঠিক রাখাও এর অন্তর্ভুক্ত। [ইবনে কাসীর] ফরয-ওয়াজিব, সুন্নাত ও নফল প্রভৃতি সকল সালাতের জন্য একই শর্ত। এক কথায় সালাতে অভ্যস্ত হওয়া ও তা শরীআতের নিয়মানুযায়ী আদায় করা এবং এর সকল নিয়ম-পদ্ধতি যথার্থভাবে পালন করাই ইকামতে সালাত। তন্মধ্যে রয়েছে - জামা'আতের মাধ্যমে সালাত আদায়ের ব্যবস্থা করা। আর তা বাস্তাবায়নের জন্য সকল ক্ষমতা প্রয়োগ করা। প্রয়োজনে রাষ্ট্রীয়ভাবে তার তদারকির ব্যবস্থা করা। আল্লাহ তা'আলা ইসলামী কল্যাণ-রাষ্ট্রের যে রূপরেখা প্রণয়ন করেছেন তার মধ্যে সালাত কায়েম করাকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাসীনদের অন্যতম কর্ম বলে ঘোষণা করে বলেনঃ “যাদেরকে আমরা যমীনের বুকে প্রতিষ্ঠা দান করলে তারা সালাত কায়েম করবে, যাকাত দিবে, সৎকাজের নির্দেশ দিবে এবং অসৎ কাজের নিষেধ করবে”।[সূরা আল-হাজ্জঃ ৪১]
৪. আল্লাহর পথে ব্যয় অর্থে এখানে ফরয যাকাত, ওয়াজিব সদকা এবং নফল দানসদকা প্রভৃতি যা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করা হয় সে সবকিছুকেই বোঝানো হয়েছে। [তাফসীর তাবারী] কুরআনে সাধারণত ইনফাক নফল দান-সদকার জন্যই ব্যবহৃত হয়েছে। যেখানে ফরয যাকাত উদ্দেশ্য সেসব ক্ষেত্রে 'যাকাত' শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। মুত্তাকীদের গুণাবলী বর্ণনা করতে গিয়ে প্রথমে গায়েবের উপর ঈমান, এরপর সালাত প্রতিষ্ঠা এবং আল্লাহর পথে ব্যয় করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: ৩। যারা অদৃশ্যে বিশ্বাস করে, [1] যথাযথভাবে নামায পড়ে[2] ও তাদেরকে যা দান করেছি তা হতে ব্যয় করে। [3]
তাফসীর:
[1] গায়েবী, অদৃশ্য তথা অদেখা বিষয়সমূহ হল এমন সব জিনিস যার উপলব্ধি জ্ঞান ও ইন্দ্রিয় দ্বারা সম্ভব নয়। যেমন মহান আল্লাহর সত্তা, তাঁর অহী (প্রত্যাদেশ), জান্নাত ও জাহান্নাম, ফিরিশতা, কবরের আযাব এবং মৃত দেহের পুনরুত্থান ইত্যাদি। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহ ও তাঁর রসূল (সাঃ) কর্তৃক বর্ণিত এমন কথার উপর বিশ্বাস স্থাপন করাও ঈমানের অংশ যা জ্ঞান ও ইন্দ্রিয় দ্বারা উপলব্ধি করা যায় না। আর তা অস্বীকার করা কুফরী ও ভ্রষ্টতা।
[2] যথাযথভাবে নামায পড়া বা নামায কায়েম করার অর্থ হল, নিয়মিতভাবে রসূল (সাঃ)-এর তরীকা অনুযায়ী নামায আদায়ের প্রতি যত্ন নেওয়া। নচেৎ নামায তো মুনাফিকরাও পড়তো।
[3] ব্যয় করা’ কথাটি ব্যাপক; যাতে ফরয ও নফল উভয় প্রকার (ব্যয়, খরচ, দান বা সদকা)ই শামিল। ঈমানদাররা তাদের সামর্থ্যানুযায়ী উভয় প্রকার সদকার ব্যাপারে কোন প্রকার কৃপণতা করে না। এমনকি পিতা-মাতা এবং পরিবার ও সন্তান-সন্ততির উপর ব্যয় করাও এই ‘ব্যয় করা’র মধ্যে শামিল এবং তাও নেকী লাভের মাধ্যম।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৩-৫ নং আয়াতের তাফসীর:
আলোচ্য আয়াত তিনটিতে আল্লাহ তা‘আলা মুত্তাকীন বা মু’মিনদের পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন। (المتقين) মুত্তাকীন শব্দটি (المتقي) মুত্তাকী-এর বহুবচন। অর্থ- যারা পরহেয করে চলেন। একজন বান্দা আল্লাহ তা‘আলার ক্রোধ ও শাস্তি থেকে বাচার জন্য তার ও আল্লাহ তা‘আলার ক্রোধ ও শাস্তির মাঝে যে প্রতিবন্ধক নির্ধারণ করে নেয় তাই হল তাকওয়া। সে প্রতিবন্ধক হল- আল্লাহ তা‘আলার আনুগত্যমূলক কাজ করা এবং তাঁর অবাধ্য কাজ থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে। উমর বিন আবদুল আযীয (রহঃ) বলেন: দিনের বেলা সিয়াম পালন, রাতের বেলা কিয়াম করার নাম তাকওয়া নয়। বরং তাকওয়া হল আল্লাহ তা‘আলা যা হারাম করেছেন তা বর্জন করা এবং যা ফরয করেছেন তা আদায় করা। এরপরেও যাকে ভাল কাজ করার তাওফীক দান করা হয়েছে তা ভালোর ওপর ভাল।
সুতরাং মুত্তাকী হলেন তারা, যারা আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করতঃ জীবনের সর্বক্ষেত্রে তাঁদের আদেশ পালন ও নিষেধ থেকে বিরত থাকেন।
মুত্তাকীদের বৈশিষ্ট্য নিম্নরূপ:
প্রথম বৈশিষ্ট্য গায়েবের প্রতি ঈমান রাখা: গায়েব হল যা আল্লাহ তা‘আলা প্রদত্ত ওয়াহী ব্যতীত পঞ্চন্দ্রীয় ও জ্ঞান দ্বারা জানা যায় না। যেমন আল্লাহ তা‘আলা, ফেরেশতা, জান্নাত ও জাহান্নাম ইত্যাদি।
আবুল আলিয়া (রহঃ) বলেন: গায়েবের প্রতি ঈমান আনা হল- আল্লাহ তা‘আলার প্রতি, ফেরেশতাদের প্রতি, রাসূলদের প্রতি, আখিরাতের প্রতি, জান্নাত ও জাহান্নাম, আল্লাহ তা‘আলার সাথে সাক্ষাত লাভের প্রতি এবং মৃত্যুর পরবর্তী জীবন ও পুনরুত্থানের প্রতি ঈমান আনা। কাতাদাহও (রহঃ) এ মত পোষণ করেছেন। (তাফসীর ইবনে কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর)
ইবনু মাসউদ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাহাবীদের থেকে বর্ণনা করে বলেন: গায়েব হল- যা বান্দাদের থেকে অনুপস্থিত থাকে। যেমন জান্নাত, জাহান্নাম এবং কুরআনে যা উল্লেখ করা হয়েছে।
গায়েবের প্রতি ঈমান আনার অন্যতম একটি দিক হল- এ গায়েব আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া অন্য কোন ব্যক্তি জানে না। কোন ওলী-আউলিয়া, বিদ্বান, মুর্শিদ এমনকি নাবী-রাসূলগণও না।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(قُلْ لَّا یَعْلَمُ مَنْ فِی السَّمٰوٰتِ وَالْاَرْضِ الْغَیْبَ اِلَّا اللہُ)
“বল ‘আল্লাহ ব্যতীত আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে কেউ অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান রাখে না।”(সূরা নামল ২৭:৬৫)
এরূপ ৫৪টিরও বেশি আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আল্লাহ তা‘আলাই একমাত্র গায়েবের খবর রাখেন অন্য কেউ নয়। এমন কি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)ও গায়েব জানেন না, আল্লাহ তা‘আলা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে ঘোষণা দেয়ার জন্য বলেন:
(قُلْ لَّآ اَمْلِکُ لِنَفْسِیْ نَفْعًا وَّلَا ضَرًّا اِلَّا مَا شَا۬ئَ اللہُﺚ وَلَوْ کُنْتُ اَعْلَمُ الْغَیْبَ لَاسْتَکْثَرْتُ مِنَ الْخَیْرِﹱ وَمَا مَسَّنِیَ السُّوْ۬ئُﹱ اِنْ اَنَا اِلَّا نَذِیْرٌ وَّبَشِیْرٌ لِّقَوْمٍ یُّؤْمِنُوْنَﰋﺟ)
“বল: ‘আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন তা ব্যতীত আমার নিজের ভাল-মন্দের ওপরও আমার কোন অধিকার নেই। আমি যদি গায়েব জানতাম তবে তো আমি প্রভূত কল্যাণই লাভ করতাম এবং কোন অকল্যাণই আমাকে স্পর্শ করত না। আমি তো শুধু মু’মিন সম্প্রদায়ের জন্য সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা ছাড়া আর কিছুই নই।’(সূরা আ‘রাফ ৭:১৮৮)
তবে আল্লাহ তা‘আলা নাবী-রাসূলদের মাঝে যাকে ইচ্ছা করেন তাকে ওয়াহীর মাধ্যমে যতটুুকু গায়েবের তথ্য জানিয়েছেন ততটুকুই তিনি জানেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(عٰلِمُ الْغَيْبِ فَلَا يُظْهِرُ عَلٰي غَيْبِه۪ٓ أَحَدًا إِلَّا مَنِ ارْتَضٰي مِنْ رَّسُوْلٍ فَإِنَّه۫ يَسْلُكُ مِنْم بَيْنِ يَدَيْهِ وَمِنْ خَلْفِه۪ رَصَدًا)
“তিনি গায়েবের অধিকারী, তিনি তাঁর গায়েবের জ্ঞান কারো নিকট প্রকাশ করেন না, তাঁর মনোনীত রাসূল ব্যতীত। নিশ্চয়ই তিনি তার সামনে এবং পিছনে প্রহরী নিয়োজিত করেন।”(সূরা জিন ৭২:২৬-২৭)
এ গায়েবের খবর জানার একমাত্র মাধ্যম হল ওয়াহী, কোন প্রকার কাশফ বা ইলহামের মাধ্যমে নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(ذٰلِكَ مِنْ أَنْۭـبَآءِ الْغَيْبِ نُوْحِيْهِ إِلَيْكَ ط وَمَا كُنْتَ لَدَيْهِمْ إِذْ يُلْقُوْنَ أَقْلَامَهُمْ أَيُّهُمْ يَكْفُلُ مَرْيَمَ ص وَمَا كُنْتَ لَدَيْهِمْ إِذْ يَخْتَصِمُوْنَ)
“এসব গায়েবের সংবাদ ওয়াহীর মাধ্যমে আমি তোমাকে জানাই। তুমি তো সে সময় তাদের কাছে ছিলে না যখন মারইয়ামের অভিভাবক কে হবে এজন্য তারা লটারী করেছিল এবং তুমি তো তখনও তাদের কাছে ছিলে না যখন তারা তর্ক-বিতর্ক করছিল।”(সূরা আলি ইমরান ৩:৪৪)
এরূপ সূরা হূদের ৪৯ নং ও সূরা ইউসুফের ১০২ নং আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে গায়েব জানার একমাত্র মাধ্যম হল ওয়াহী অর্থাৎ কুরআন ও হাদীস। আর আমরা জানি নাবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ইনতেকালের পর ওয়াহী আসা বন্ধ হয়ে গেছে। সুতরাং কেউ গায়েব জানে এ দাবি করার সুযোগ নেই। যদি কেউ গায়েব জানে ও তার কাছে ওয়াহী আসে বলে দাবি করে সে নিশ্চয়ই শয়তানের বন্ধু ও তার অনুসারী। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَإِنَّ الشَّيٰطِيْنَ لَيُوْحُوْنَ إِلٰٓي أَوْلِيَا۬ئِهِمْ لِيُجَادِلُوْكُمْ)
“নিশ্চয়ই শয়তানেরা তাদের বন্ধুদের কাছে ওয়াহী করে তোমাদের সাথে বিবাদ করার জন্য।”(সূরা আন‘আম ৬:১২১)
সুতরাং আমরা বিশ্বাস করব- গায়েব একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা জানেন, এটা তাঁর বৈশিষ্ট্য। কোন ওলী-আউলিয়া, ফকীর, গাউস-কুতুব ও পীর-দরবেশ এ জ্ঞান রাখে না। যদি কেউ গায়েব জানার দাবি করে তাহলে নিশ্চয়ই সে শয়তানের বন্ধু ও অনুসারী।
দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য- সালাত কায়িম করা:
মুত্তাকীন বা মু’মিনদের ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে যত বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বের সাথে সালাতের কথা উল্লেখ করেছেন। কুরআনে শতাধিক বার সালাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কখনো সালাতের প্রতি নির্দেশ, কখনো উৎসাহ প্রদান, কখনো ভীতি প্রদর্শন, কখনো সফলকামের কথা উল্লেখ করেছেন।
রাসূলুল্লাহও (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাদীসে সালাতের অনেক গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য বর্ণনা করেছেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: ইসলাম পাঁচটি স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত। আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া সত্যিকার কোন মা‘বূদ নেই আর মুহাম্মাদ আল্লাহ তা‘আলার বান্দা ও রাসূল এ সাক্ষ্য দেয়া, সালাত কায়িম করা, যাকাত প্রদান করা, রমাযান মাসে সিয়াম পালন করা এবং বায়তুল্লায় হাজ্জ পালন করা। (সহীহ বুখারী হা: ৮)
তিনি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরো বলেন:
إِنَّ بَيْنَ الرَّجُلِ وَبَيْنَ الشِّرْكِ وَالْكُفْرِ تَرْكَ الصَّلَاةِ
নিশ্চয়ই মু’মিন এবং মুশরিক ও কাফিরের মাঝে পার্থক্য হল সালাত বর্জন করা। (সহীহ মুসলিম হা: ৮২)
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যাদের থেকে বাইয়াত বা প্রতিশ্র“তি গ্রহণ করতেন তাদের জন্য সালাত কায়িম করা শর্ত করে দিতেন। (সহীহ বুখারী হা: ৫৭)
ইকামাতুস সালাত:
আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে সালাত পড়ার কথা বলেননি বরং বলেছেন সালাত কায়িম করার কথা। ইকামাতুস সালাত অর্থ বাহ্যিকভাবে সালাতের রুকন, ওয়াজিব ও শর্তসহ যথাসময়ে আদায় করা এবং অভ্যন্তরীণভাবে বিনয়-নম্রতা ও অন্তরের উপস্থিতিসহ যা পাঠ করা হয় তা অনুধাবন করে আদায় করা। (তাফসীর সা‘দী: ১৭)
ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: ইকামাতুস সালাত হল তার ফরযসহ আদায় করা। তিনি আরো বলেন, ইকামাতুস সালাত হল- রুকু, সিজদাহ, তেলাওয়াত পরিপূর্ণ করতঃ বিনয়-নম্রতার সাথে অন্তরের উপস্থিতিসহ আদায় করা।
ইবনু জারির আত-তাবারী (রহঃ) বলেন: ইকামাতুস সালাত হল সালাতের যে সকল ফরয, ওয়াজিব ও বিধি-বিধান আছে তা যথাযথভাবে আদায় করা। (তাফসীর আত-তাবারী: ১/১৬৮) আর তা অবশ্যই হতে হবে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর তরীকায়। কেননা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
وَصَلُّوْا كَمَا رَأَيْتُمُونِيْ أُصَلِّيْ
তোমরা যেভাবে আমাকে সালাত আদায় করতে দেখেছো সেভাবেই আদায় কর। (সহীহ বুখারী হা: ৬৩১)
সালাত আদায় করতে হবে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর তরীকায়, অন্য কোন মত ও কারো দেখনো পদ্ধতিতে নয়। কারণ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পদ্ধতি ব্যতীত অন্য কারো তৈরি করা পদ্ধতিতে ইবাদত সস্পাদন করলে তা আল্লাহ তা‘আলার কাছে কবূল হবে না। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: যে ব্যক্তি এমন কোন আমল করল যা আমাদের নির্দেশ বহির্ভূত তা প্রত্যাখ্যাত। (সহীহ মুসলিম হা: ১৭১৮)
সুতরাং ইকামাতুস সালাত হল নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পদ্ধতির আলোকে সালাতের সকল ফরয, ওয়াজিব ও বিধি-বিধান যথাযথভাবে এবং যথাসময়ে আদায় করা।
অতএব যারা সালাত কায়িম দ্বারা সমাজের সকল ব্যক্তিকে নিয়ে সালাত আদায় করাকে বুঝান, যদিও রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সঠিক পদ্ধতি অনুসারে না হয়। তাদের এ বুঝ কুরআন ও সুন্নাহর পরিপন্থী। কেননা সালাত রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পদ্ধতি অনুযায়ী না হলে তা আল্লাহ তা‘আলার কাছে গ্রহণযোগ্যই হবে না।
তৃতীয় বৈশিষ্ট্য-
আল্লাহর দেয়া রিযিক হতে আল্লাহর পথে ব্যয় করা: আল্লামা আবদুর রহমান আস সা‘দী (রহঃ) তার স্বীয় তাফসীর গ্রন্থে বলেন- এখানে ফরয যাকাত, ফরয ব্যয় যেমন পরিবার, নিকট আত্মীয় ও দাস-দাসীদের জন্য ব্যয় এবং সকল কল্যাণকর কাজে মুস্তাহাব দান-খয়রাতও অন্তর্ভুক্ত। (তাফসীরে সা‘দী পৃ. ১৭)
একজন মু’মিন-মুত্তাকী ব্যক্তি যতই সম্পদের মালিক হোক না কেন সে সর্বদাই বিশ্বাস করে যে, এসব সম্পদ প্রকৃত পক্ষে আল্লাহ তা‘আলারই। তাই সে সর্বদাই আল্লাহ তা‘আলার পথে সম্পদ ব্যয় করে আত্মতৃপ্তি লাভ করে। এরূপ ব্যয়কারীদের জন্য ফেরেশতা দু‘আ করে বলে: হে আল্লাহ! তুমি ব্যয়কারীর স¤পদ আরো বৃদ্ধি করে দাও। (সহীহ মুসলিম হা: ১০১০)। অপরপক্ষে যার ঈমান দুুর্বল আল্লাহ তা‘আলার পথে ব্যয় করা তার জন্য খুবই কঠিন ও কষ্টকর। সে আল্লাহ তা‘আলার পথে ব্যয় করা থেকে বিরত থাকে। তার জন্য ফেরেশতা বদ্দু‘আ করে বলে: হে আল্লাহ! তুমি কৃপণ ব্যক্তির সম্পদ ধ্বংস করে দাও। (সহীহ মুসলিম হা: ১০১০) তবে ফরয যাকাত আদায়ের পর সাধারণ দানের ক্ষেত্রে মধ্যম পন্থা অবলম্বন করা উচিত।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَلَا تَجْعَلْ يَدَكَ مَغْلُولَةً إِلٰي عُنُقِكَ وَلَا تَبْسُطْهَا كُلَّ الْبَسْطِ)
“তুমি তোমার হাতকে তোমার গলায় গুটিয়ে রেখ না এবং তা সম্পূর্ণ প্রসারিতও কর না।” (সূরা বানী ইসরাঈল ১৭:২৯)
অর্থাৎ অতি কাপর্ণ্য কর না এবং অপব্যয়ও কর না। বরং মধ্যমপন্থা অবলম্বন কর। আল্লাহ তা‘আলা মু’মিন বান্দাদের বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন:
(وَالَّذِيْنَ إِذَا أَنْفَقُوْا لَمْ يُسْرِفُوْا وَلَمْ يَقْتُرُوْا وَكَانَ بَيْنَ ذٰلِكَ قَوَامًا)
“এবং যখন তারা ব্যয় করে তখন অপব্যয় করে না, কার্পণ্যও করে না, বরং তারা এতদুভয়ের মাঝে মধ্যম পন্থা অবলম্বন করে।” (সূরা ফুরকান ২৫:৬৭) সুতরাং মু’মিন-মুত্তাকীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল তারা আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টির জন্য তাঁর পথে সাধ্যানুসারে সম্পদ ব্যয় করে।
চতুর্থ ও পঞ্চম বৈশিষ্ট্য- কুরআনসহ পূর্ববর্তী সকল আসমানী কিতাবের প্রতি ঈমান রাখা ও পরকালের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাসী হওয়া : আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَالَّذِیْنَ یُؤْمِنُوْنَ بِمَآ اُنْزِلَ اِلَیْکَ وَمَآ اُنْزِلَ مِنْ قَبْلِکَﺆ وَبِالْاٰخِرَةِ ھُمْ یُوْقِنُوْنَ)
“এবং যারা তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে ও তোমার পূর্বে যা অবতীর্ণ করা হয়েছিল তাতে ঈমান আনে এবং পরকালের প্রতি যারা দৃঢ় বিশ্বাস রাখে।”
ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, এর ভাবার্থ হচ্ছে: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে যা কিছু নিয়ে এসেছেন এবং তাঁর পূর্ববর্তী নাবীগণ যা কিছু নিয়ে এসেছিলেন তারা ঐ সমুদয়ের সত্যতা স্বীকার করে। উভয়ের প্রতি ঈমান আনতে কোন পার্থক্য করে না, কোন কিছু অস্বীকারও করে না এবং পরকালের ওপর দৃঢ় বিশ্বাসী। অর্থাৎ পুনরুত্থান, কিয়ামত, জান্নাত, জাহান্নাম, হিসাব, মিযান ইত্যাদি সমস্ত পূর্ণভাবে বিশ্বাস করে।
চতুর্থ বৈশিষ্ট্য হতে প্রমাণিত হয় যে,
তাওরাত ও ইঞ্জিলে ঈমান আনয়নকারী ইয়াহূদী বা খ্রিস্টান কুরআনের প্রতি ঈমান না আনা পর্যন্ত মু’মিন হতে পারে না বরং তারা জাহান্নামী হবে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
لاَ يَسْمَعُ بِي أَحَدٌ مِنْ هَذِهِ الأُمَّةِ يَهُودِيٌّ وَلاَ نَصْرَانِيٌ ثُمَّ يَمُوتُ وَلَمْ يُؤْمِنْ بِالَّذِي أُرْسِلْتُ بِهِ إِلاَّ كَانَ مِنْ أَصْحَابِ النَّارِ
এ উম্মাতের কোন ইয়াহূদী বা খ্রিস্টান আমি যে রিসালাত দিয়ে প্রেরিত হয়েছি সে কথা শোনার পর তার প্রতি ঈমান না আনলে জাহান্নামের অধিবাসী হবে। (সহীহ মুসলিম হা: ১৫৩, নাসায়ী হা: ১২৪১ সিলসিলা সহীহাহ হা: ৩০৯৩)
অপরপক্ষে তাওরাত বা ইঞ্জিলের প্রতি বিশ্বাসী ব্যক্তি নাবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও কুরআনের প্রতি ঈমান আনলে তাদের দ্বিগুণ প্রতিদান রয়েছে। যেমন সাহাবী আবূ মূসা আল-আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: তিন ব্যক্তিকে তার কাজের বিনিমেয় দ্বিগুণ পুণ্য দেয়া হবে- ১. ঐ আহলে কিতাব যে তার নাবীর ওপর ঈমান এনেছে এবং সেই সঙ্গে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতিও ঈমান এনেছে ২. সেই কৃতদাস যে আল্লাহ তা‘আলার হক আদায় করে এবং সেই সঙ্গে তার মুনিবের হক আদায় করে এবং ৩. ঐ ব্যক্তি যার নিকট কৃতদাসী রয়েছে সে তাকে ব্যবহার করে, এরপর সে তাকে উত্তম শিক্ষা দেয় এবং আযাদ দিয়ের তাকে বিয়ে করে, তার জন্য দ্বিগুণ প্রতিদান। (সহীহ বুখারী হা: ৯৭, সহীহ মুসলিম হা: ১৫৪)
মুজাহিদ (রহঃ) বলেন: সূরা বাকারার প্রথম চারটি আয়াতে মু’মিনের বৈশিষ্ট্য, পরের দু’টি আয়াতে কাফিরদের আলোচনা এবং পরের ১৩টি আয়াতে মুনাফিকদের আলোচনা রয়েছে।
অতএব এ চারটি আয়াত প্রত্যেক মু’মিন মুত্তাকীর জন্য সমভাবে প্রযোজ্য। সে আরবি হোক বা অনারবী হোক, মানব হোক বা দানব হোক।
কেননা এগুলো এমন গুণ যা একটি অন্যটির সম্পূরক। তাই কেউ গায়েবের প্রতি ঈমান আনল, সালাত কায়িম করল, যাকাত দিল, কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যা নিয়ে এসেছেন তাতে ঈমান আনল না, সে মূলত পূর্ববর্তী রাসূলগণ যা নিয়ে এসেছেন তার প্রতি ঈমান আনল না এবং আখিরতের প্রতিও বিশ্বাস করল না, তার সালাত, যাকাত কোন কাজে আসবে না। পূর্ববর্তী নাবী-রাসূল ও আসমানী কিতাবকে সাধারণভাবে বিশ্বাস করতে হবে, আর জীবনের সর্বক্ষেত্রে আল কুরআন ও আমাদের নাবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে পূর্ণভাবে মেনে চলতে হবে।
আল্লাহ তা‘আলা কুরআনুল কারীমে সূরা নিসার ৪৬ ও ১৩৭ নং আয়াতে, সূরা আনকাবুতের ৪৬ নং আয়াতে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যা নিয়ে এসেছে তার প্রতি ঈমান ও পূর্ববর্তী নাবীগণ যা নিয়ে এসেছেন তার প্রতিও ঈমান আনার নির্দেশ দিয়েছেন। আর সূরা বাকারার ২৮৫ নং আয়াতে, সূরা যুমারের ১৫২ নং আয়াতে সকল নাবী-রাসূলের প্রতি কোন পার্থক্য ছাড়াই ঈমান আনার নির্দেশ দিয়েছেন। (তাফসীর ইবনে কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর)
অতএব সকলকে ঈমানের প্রত্যেক রুকনের প্রতি সমানভাবে ঈমান আনতে হবে। তাহলেই প্রকৃত মু’মিন-মুত্তাকী হওয়া সম্ভব। আল্লাহ তা‘আলা পূর্বের আয়াতসমূহে যে বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন, যারা ঐ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হবে তাদেরকে ৫ নং আয়াতে তার সুসংবাদ প্রদান করেছেন। তারা হিদায়াতের ওপর সুপ্রতিষ্ঠিত এবং তারাই সফলকাম। অর্থাৎ তারা জান্নাতে চিরস্থায়ী থাকবে এবং জাহান্নাম থেকে নাজাত পাবে। তাকওয়া অবলম্বনের আরো ফলাফল হল- দুনিয়া ও আখেরাতে সফল ও সার্থক হওয়া সম্ভব। দুনিয়ার সফলতা সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَمَنْ يَّتَّقِ اللّٰهَ يَجْعَلْ لَّه۫ مَخْرَجًا)
“যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে আল্লাহ তার নিষ্কৃতির পথ বের করে দেন।”(সূরা তালাক ৬৫:২) যে আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করে আল্লাহ তা‘আলা তার কাজ-কর্ম সহজ করে দেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَمَنْ يَّتَّقِ اللّٰهَ يَجْعَلْ لَّه۫ مِنْ أَمْرِه۪ يُسْرًا)
“আল্লাহকে যে ভয় করে আল্লাহ তার কাজ-কর্ম সহজ করে দেন।”(সূরা তালাক ৬৫:৪) তাকওয়া অবলম্বন করলে পাপরাশি মোচন করে দেয়া হবে।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَمَنْ یَّتَّقِ اللہَ یُکَفِّرْ عَنْھُ سَیِّاٰتِھ۪ وَیُعْظِمْ لَھ۫ٓ اَجْرًا)
“আল্লাহকে যে ভয় করে তিনি তার পাপরাশি মোচন করবেন এবং তাকে দেবেন মহাপুরস্কার।”(সূরা তালাক ৬৫:৫)
পরকালের সফলতা সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(مَثَلُ الْجَنَّةِ الَّتِيْ وُعِدَ الْمُتَّقُوْنَ تَجْرِيْ مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهٰرُ أُكُلُهَا دَآئِمٌ وَّظِلُّهَا تِلْكَ عُقْبَي الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّعُقْبَي الْكٰفِرِيْنَ النَّارُ)
“মুত্তাকীদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্র“তি দেয়া হয়েছে, তার উপমা এরূপ যে, তার পাদদেশে নদী প্রবাহিত, তার ফলসমূহ ও ছায়া চিরস্থায়ী। যারা মুত্তাকী এটা তাদের কর্মফল এবং কাফিরদের কর্মফল জাহান্নাম।”(সূরা রা‘দ ১৩:৩৫)
(وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِيْنَ غَيْرَ بَعِيْدٍ)
“আর জান্নাতকে নিকটস্থ করা হবে মুত্তাকীদের, কোন দূরুত্ব থাকবে না।”(সূরা কাফ ৫০:৩১) সুতরাং শুধু মৌখিক দাবির মাধ্যমে মু’মিন-মুত্তাকী হওয়া যায় না, এ জন্য আকীদাহ, আমল ও আখলাকে উক্ত বৈশিষ্ট্যসমূহ থাকা একান্ত প্রয়োজন।
আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. মু’মিন-মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূলের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাসী এবং তাদের আদেশ ও নিষেধাবলী জীবনের সর্বক্ষেত্রে পালন করার যথাসাধ্য চেষ্টা করে।
২. মু’মিন-মুত্তাকীদের গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি বৈশিষ্ট্য- গায়েবের প্রতি ঈমান আনা, সালাত কায়িম করা, আল্লাহ তা‘আলার পথে ব্যয় করা, আল্লাহ তা‘আলার নাযিলকৃত বিষয়ের প্রতি এবং আখিরাতের প্রতি ঈমান আনা।
৩. গায়েবের মালিক একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা। তিনি ছাড়া কোন নাবী-রাসূল, ওলী-আউলিয়া, গাউস-কুতুব, পীর-দরবেশ ইত্যাদি ব্যক্তিরা গায়েব জানে না। তবে আল্লাহ তা‘আলা ওয়াহীর মাধ্যমে নাবী-রাসূলদের যতটুকু জানান তা ব্যতীত।
৪. মু’মিনরা সালাতের ব্যাপারে খুব সচেতন। তারা যথাসময়ে জামাআতের সাথে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সহীহ পদ্ধতিতে সালাত আদায় করে থাকে। এটাই হল ইকামাতুস সালাত।
৫. গায়েব জানার একমাত্র মাধ্যম ওয়াহী। নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ইনতেকালের পর ওয়াহী আসা বন্ধ হয়ে গেছে। সুতরাং কারো গায়েব জানার সুযোগ নেই। ইলহাম ও কাশফের মাধ্যমে গায়েব জানা যায় না।
৬. ঈমানের রুকন ছয়টি- আল্লাহ তা‘আলার প্রতি বিশ্বাস, ফেরেশতাদের প্রতি বিশ্বাস, আসমানী কিতাবের প্রতি বিশ্বাস, রাসূলগণের প্রতি বিশ্বাস, আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস এবং তাকদীরের ভাল-মন্দের প্রতি বিশ্বাস। এসবগুলোর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস করতে হবে। কোন একটি রুকনকে অস্বীকার করলে ঈমান থাকবে না।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন যে, সত্য বলে স্বীকার করাকে ঈমান বলে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এটাই বলেন। হযরত যুহরী (রঃ) বলেন যে, ‘আমলকে ঈমান বলা হয়। হযরত রাবী’ বিন আনাস (রাঃ) বলেন যে, ঈমান আনার অর্থ হচ্ছে অন্তরে আল্লাহর ভয় সৃষ্টি করা। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এসব মতের মধ্যে বিশেষ কোন পার্থক্য নেই। এগুলোর একই অর্থ। ভাবার্থ এই যে, তারা মুখের দ্বারা, অন্তর দ্বারা ও আমল দ্বারা অদৃশ্যের উপর ঈমান আনে এবং আল্লাহর ভয় রাখে। 'ঈমান' শব্দটি আল্লাহর উপর, তার কিতাব সমূহের উপর এবং তাঁর রাসূলগণের (আঃ) উপর বিশ্বাস স্থাপন করা-এ কয়টির সমষ্টিকে বুঝিয়ে থাকে। আমি বলি যে, আভিধানিক অর্থে শুধু সত্য বলে স্বীকার করাকেই ঈমান বলে। কুরআন মাজীদের মধ্যেও এ অর্থের ব্যবহার এসেছে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ তারা আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন করে এবং ঈমানদারগণকে সত্য বলে স্বীকার করে। (৯:৬১) হযরত ইউসুফ (আঃ) এর ভ্রাতাগণ তাদের পিতাকে বলেছিলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ আমরা সত্যবাদী হলেও আপনি আমাদেরকে বিশ্বাস করবেন না। (১২:১৭)
এভাবে ‘ঈমান শব্দটি ইয়াকীনের অর্থেও এসে থাকে যখন ওটা আমলের বর্ণনার সঙ্গে মিলিত হয়ে থাকে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (১০৩:৩) (আরবি) কিন্তু যখন ওটা সাধারণভাবে ব্যবহৃত হবে তখন ঈমানে শরঈ' হবে-অন্তরে বিশ্বাস, মুখে স্বীকারোক্তি এবং কার্যসাধনা এই তিনের সমষ্টির নাম। অধিকাংশ ইমামের এটাই মাযহাব। ইমাম শাফিঈ (রঃ), ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল (রঃ), ইমাম আবু উবাইদাহ (রঃ) প্রভৃতি ইমামগণ একমত হয়ে বর্ণনা করেছেন। যে, মুখে উচ্চাণ করা ও কার্যসাধন করার নাম হচ্ছে ঈমান এবং ঈমানের হ্রাস-বৃদ্ধি হয়ে থাকে। এর প্রমাণ আছে বহু হাদীসে যা আমরা বুখারী শরীফের শরাহতে বর্ণনা করেছি।
কেউ কেউ ঈমানের অর্থ করেছেন আল্লাহর ভয়।' যেমন আল্লাহ পাক বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “নিশ্চয় যারা তাদের প্রভুকে না দেখেই ভয় করে।' (৬৭:১২) অন্য এক জায়গায় তিনি বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহকে না দেখেই ভয় করেছে এবং (আল্লাহর দিকে) প্রত্যাবর্তনকারী অন্তর নিয়ে এসেছে।' (৪০:৩৩) প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর ভয়ই হচ্ছে ঈমান ও ইলমের সারাংশ। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ নিশ্চয়ই আল্লাহকে তাঁর আলেম বান্দাগণই ভয় করে থাকে। (৩৫:২৮) কেউ কেউ বলেছেন যে, তারা বাহ্যিকভাবে যেমন ঈমান আনে তদ্রুপ ভিতরেও ঈমান এনে থাকে। তারা ঐ মুনাফিকদের মত নয় যাদের সম্বন্ধে আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ যখন তারা মুমিনদের সাথে মিলিত হয় তখন তারা বলে আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি এবং যখন তারা তাদের শয়তানদের সন্নিকটে একাকী হয় তখন বলে, নিশ্চয় আমরা তোমাদের সঙ্গেই আছি, আমরা শুধু উপহাস করছিলাম।' (২:১৪) অন্য জায়গায় মুনাফিকদের অবস্থা নিম্নরূপ বর্ণিত হয়েছেঃ (আরবি)
অর্থাৎ মুনাফিকেরা যখন তোমার নিকট আগমন করে তখন বলে আমরা (অন্তরের সঙ্গে) সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নিশ্চয় আপনি আল্লাহর রাসূল, আর এটা তো আল্লাহ ভালভাবে অবগত আছেন যে, তুমি আল্লাহর রাসূল এবং আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, নিশ্চয় মুনাফিকরাই মিথ্যাবাদী।' (৬৩:১)
এই অর্থ হিসেবে (আরবি) শব্দটি (আরবি) হবে, অর্থাৎ তারা ঈমান আনয়ন করে এমন অবস্থায় যে, মানুষ হতে তা পোগন থাকে। এখানে আয়াতে যে (আরবি) শব্দটি রয়েছে তার অর্থ সম্বন্ধেও মুফাসৃসিরগণের মধ্যে অনেক মতভেদ রয়েছে। কিন্তু ঐ সবগুলোই সঠিক এবং সব অর্থই নেয়া যেতে পারে। আবুল আলিয়া (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে আল্লাহর উপর, ফেরেশতাদের উপর,
কিতাবসমূহের উপর, কিয়ামতের উপর, বেহেশতের উপর, দোযখের উপর, আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের উপর এবং মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের উপর বিশ্বাস স্থাপন করা। কাতাদাহ্ বিন দায়মারও (রঃ) এটাই মত।
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) এবং আরও কয়েকজন সাহাবী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে ঐ সব গোপনীয় জিনিস যা দৃষ্টির অন্তরালে রয়েছে। যেমন জান্নাত, জাহান্নাম ইত্যাদি যা কুরআন মাজীদে উল্লিখিত আছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ ‘আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে যা এসেছে সবই (আরবি) এর অন্তর্গত। হযরত জার (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ কুরআন'। আতা’ বিন আবু রাবাহ্ (রঃ) বলেন যে, আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপনকারীই হচ্ছে অদৃশ্যের উপর বিশ্বাস স্থাপনকারী। ইসমাঈল বিন আবু খালিদ (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে ইসলামের সমুদয় গোপনীয় বিষয়সমূহ। যায়েদ বিন আসলাম (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে ভাগ্যের উপর বিশ্বাস স্থাপন। সুতরাং এ সমস্ত কথা অর্থ হিসেবে একই। কেননা এসব জিনিসই অদৃশ্য এবং (আরবি) এর তাফসীরের মধ্যে এসবই জড়িত রয়েছে এবং সবগুলোর উপরেই ঈমান আনা ওয়াজিব।
একদা হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদের (রাঃ) মজলিসে সাহাবীগণের (রাঃ) গুণাবলীর আলোচনা চলছিল। তিনি বলেনঃ যারা রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে দেখেছেন। তাদের তো কর্তব্যই হলো তাঁর উপর বিশ্বাস স্থাপন করা; কিন্তু আল্লাহর শপথ! ঈমানী মর্যাদার দিক দিয়ে তাঁরাই উত্তম যারা না দেখেই তাঁকে বিশ্বাস করে থাকেন। অতঃপর তিনি (আরবি) থেকে শুরু করে (আরবি) পর্যন্ত পাঠ করলেন। (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম ও তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই) ইমাম হাকিম (রঃ) এই বর্ণনাটিকে সঠিক বলে থাকেন। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যেও এ বিষয়ের একটি হাদীস আছে। ইবনে মাহীরীজ (রঃ) আবূ জুমআ’ (রাঃ) নামক সাহাবীকে জিজ্ঞেস করেনঃ “এমন একটি হাদীস আমাকে শুনিয়ে দিন যা আপনি স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে শুনেছেন। তিনি বলেনঃ আচ্ছা, আমি আপনাকে খুবই ভাল একটা হাদীস শুনাচ্ছি। একবার আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর সঙ্গে নাশতা করছিলাম। আমাদের সঙ্গে হযরত আবু উবাইদাহ বিন জাররাহও (রাঃ) ছিলেন। তিনি বলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের চেয়েও উত্তম আর কেউ আছে কি? আমরা আপনার সঙ্গে ইসলাম গ্রহণ করেছি, আপনার সঙ্গে ধর্ম যুদ্ধে অংশ নিয়েছি।' তিনি বলেনঃ হাঁ, আছে। ঐ সমুদয় লোক তোমাদের চেয়ে উত্তম যারা তোমাদের পরে আসবে এবং আমার উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে অথচ তারা আমাকে দেখতেও পাবে না।
তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে রয়েছে হযরত সালিহ বিন জুবাইর (রঃ) বলেন হযরত আবু জুমআ আনসারী বায়তুল মুকাদ্দাসে আমাদের নিকট আগমন করেন। রিযা বিন হাইঅহও (রাঃ) আমাদের সঙ্গেই ছিলেন। তিনি ফিরে যেতে লাগলে আমরা তাঁকে পৌছিয়ে দেয়ার জন্যে তাঁর সঙ্গে সঙ্গে চলি। তিনি আমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হবার সময় বলেনঃ 'আপনাদের এই অনুগ্রহের প্রতিদান ও হক আদায় করা আমার উচিত। শুনে রাখুন! আমি আপনাদেরকে এমন একটা হাদীস শুনাবো যা আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে শুনেছি। আমরা বলিঃ “আল্লাহ আপনার উপর দয়া করুন! আমাদেরকে তা অবশ্যই বলুন'। তিনি বললেনঃ
‘শুনুন! আমরা দশজন লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে ছিলাম। হযরত মুআয বিন জাবালও (রাঃ) ছিলেন। আমরা বলিঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) আমাদের চেয়েও কি বড় পুণ্যের অধিকারী আর কেউ হবে? আমরা আল্লাহর উপর ঈমান এনেছি এবং আপনার অনুসরণ করেছি। তিনি বললেনঃ “তোমরা কেন করবে না? আল্লাহর রাসূল (সঃ) তো স্বয়ং তোমাদের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছেন। আকাশ হতে আল্লাহর ওয়াহী তোমাদের সামনেই মুহুর্মুহু অবতীর্ণ হচ্ছে। ঈমান তো ঐ সব লোকের যারা তোমাদের পরে আসবে, তারা দুই জিলদের মধ্যে কিতাব পাবে এবং তার উপরেই ঈমান এনে আমল করবে। তারাই তোমাদের দ্বিগুণ পুণ্যের অধিকারী।” এ হাদীসটি তাদের প্রার্থনা কবুল হওয়ার দলীল যাতে মুহাদ্দিসগণের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। আমি এ বিষয়টি বুখারী শরীফের শারাতে খুব স্পষ্ট ভাবে বর্ণনা করেছি। কেননা পরবর্তীদের প্রশংসা এর উপরে ভিত্তি করেই হচ্ছে এবং এই হিসেবেই তাদেরকে বড় পুণ্যের অধিকারী বলা হয়েছে। নতুবা সাধারণভাবে তো সাহাবীগণই (রাঃ) প্রত্যেক দিক দিয়েই উত্তম। আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন। অন্য একটি হাদীসে আছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা সাহাবীগণকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমাদের মতে ঈমান আনার ব্যাপারে সর্বোত্তম কে?' তারা বলেনঃ “ফেরেশতাগণ।' তিনি বলেন, তারা কেন ঈমান আনবে না? তারা তো প্রভুর নিকটেই আছে। সাহাবীগণ (রাঃ) বলেন, তারপর নবীগণ (আঃ)।' তিনি বলেন, 'তারা ঈমান আনবে না কেন? তাদের উপর তো ওয়াহী অবতীর্ণ হয়ে থাকে। তারা বলেন, ‘তাহলে আমরা।' তিনি বলেন, তোমরা ঈমান কবুল কেন করবে না? আমি তোমাদের মধ্যেই বিদ্যমান রয়েছি। জেনে রেখো, আমার মতে সর্বোত্তম ঈমানদার তারাই হবে যারা তোমাদের পরে আসবে। সহীফাসমূহের মধ্যে তারা লিখিত পুস্তক পাবে এবং তার উপরেই তারা ঈমান আনবে।' এর সনদে মুগীরা বিন কায়েস রয়েছে। আবূ হাতিম রাযী তাকে মুনকারুল হাদীস' বলে থাকেন। কিন্তু তারই মত একটি হাদীস দুর্বল সনদে মুসনাদ-ই-আবূ ইয়ালা', তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই এবং মুসতাদরাক-ই-হাকিমের মধ্যে বর্ণিত হয়েছে। এবং হাকীম (রঃ) তাকে সহীহ বলেছেন। হযরত আনাস বিন মালিক (রাঃ) হতেও তারই মত মারফু' রূপে বর্ণিত আছে। আল্লাহই এ সম্পর্কে সবচেয়ে ভাল জানেন।
মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে হযরত বুদাইলা বিনতে আসলাম (রাঃ) বলেনঃ বানু হারিসার মসজিদে আমরা যোহর বা আসরের নামাযে ছিলাম এবং আমাদের মুখ বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে ছিল। দুই রাকাত পড়েছি এমন সময়ে কোন একজন এসে সংবাদ দিল যে, নবী (সঃ) বাইতুল্লাহর দিকে মুখ করেছেন। শোনা মাত্রই আমরা ঘুরে গেলাম। স্ত্রী লোকেরা পুরুষদের জায়গায় চলে আসলো এবং পুরুষেরা স্ত্রীলোকদের জায়গায় চলে গেল এবং বাকী দুই রাকআত আমরা বায়তুল্লাহ শরীফের দিকে মুখ করে আদায় করলাম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর নিকট এ সংবাদ পৌছলে তিনি বললেনঃ ‘এসব লোক তারাই যারা অদৃশ্যের উপর বিশ্বাস করে থাকে। এই ইসনাদে এই হাদীসটি গরীব।
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ তারা ফরয নামায আদায় করে, রুকূ' সিজদাহ্, তিলাওয়াত, নম্রতা এবং মনোযোগ প্রতিষ্ঠিত করে।' কাতাদাহ্ (রঃ) বলেন যে, নামায প্রতিষ্ঠিত করার অর্থ হচ্ছে নামাযের সময়ের প্রতি লক্ষ্য রাখা, ভালভাবে অযু করা এবং রুকূ' ও সিজদাহ্ যথাযথভাবে আদায় করা। মুকাতিল (রঃ) বলেন যে, সময়ের হিফাযত করা, পূর্ণ পবিত্রতা অর্জন করা “রুকূ ও সিজদাহ্ ধীরস্থিরভাবে আদায় করা, ভালভাবে কুরআন পাঠ করা, আত্তাহিয়্যাতু এবং দুরূদ পাঠ করার নাম হচ্ছে ইকামাতে সালাত।
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ (আরবি)-এর অর্থ হচ্ছে যাকাত আদায় করা। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) এবং আরও কয়েকজন সাহাবী (রাঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে মানুষের তার সন্তান সন্ততিকে পানাহার করাননা। এটা যাকাতের হকুমের পূর্বেকার আয়াত।
হযরত যহাক (রাঃ) বলেন যে, সূরা-ই- বারাআতের মধ্যে যাকাতের যে সাতটি আয়াত আছে তা অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে এই নির্দেশ ছিল যে,বান্দা যেন নিজ সাধ্য অনুসারে কমবেশী কিছু দান করতে থাকে। কাতাদাহ্ (রঃ) বলেনঃ ‘এই মাল তোমাদের নিকট আল্লাহর আমানত, অতি সত্বরই এটা তোমাদের থেকে পৃথক হয়ে যাবে। সুতরাং ইহলৌকিক জীবনে তা থেকে আল্লাহর পথে ব্যয় কর।
ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এই আয়াতটি সাধারণ। যাকাত, সন্তান সন্ততির জন্যে খরচ এবং যেসব লোককে দেয়া প্রয়োজন এ সব কিছুই এর অন্তর্ভুক্ত। এ জন্যে মহান প্রভু একটা সাধারণ বিশেষণ বর্ণনা করেছেন এবং সাধারণভাবে প্রশংসা করেছেন, কাজেই সব খরচই এর অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
আমি বলি যে, কুরআন কারীমের মধ্যে অধিকাংশ জায়গায় নামায ও মাল খরচ করার বর্ণনা মিলিতভাবে এসেছে। এজন্যে নামায হচ্ছে আল্লাহর হক এবং তাঁর ইবাদত-যা তাঁর একত্ববাদ, প্রশংসা, শ্রেষ্ঠত্ব, তার দিকে প্রত্যাবর্তন, তাঁর উপর ভরসা এবং তাঁর কাছে প্রার্থনা করার নাম। আর খরচ করা হচ্ছে সৃষ্ট জীবের প্রতি অনুগ্রহ করা-যার দ্বারা তাদের উপকার হয়। এর সবচেয়ে বেশী হকদার হচ্ছে তার পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন এবং দাসদাসী। অতঃপর দূরের লোক এবং অপরিচিত ব্যক্তিরা তার হকদার। সুতরাং অবশ্যকরণীয় সমস্ত ব্যয় ও ফরয যাকাত এর অন্তর্ভুক্ত। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি। (১) আল্লাহ তা'আলার একত্ববাদ ও মুহাম্মদ (সঃ)-এর প্রেরিতত্বের সাক্ষ্য প্রদান। (২) নামায প্রতিষ্ঠিত করণ। (৩) যাকাত প্রদান। (৪) রমযান শরীফের রোযা পালন এবং (৫) বায়তুল্লাহ শরীফের হজ্জ কার্য সম্পাদন। এ সম্পর্কে আরও বহু হাদীস রয়েছে।
আরবী ভাষায় সালাতের অর্থ হচ্ছে প্রার্থনা। আরব কবিদের কবিতা এর সাক্ষ্য দেয়। সালাতের প্রয়োগ হয়েছে নামাযের উপর যা রুকু সিজদাহ এবং অন্যান্য নির্দিষ্ট কতকগুলি কার্যের নাম এবং যা নির্দিষ্ট সময়ে কতকগুলি নির্দিষ্ট শর্ত , সিফাত ও পদ্ধতির মাধ্যমে পালিত হয়। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেনঃ “সালাত নামাযকে বলার কারণ এই যে, নামাযী ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার নিকট স্বীয় কার্যের পুণ্য প্রার্থনা করে এবং তার নিকট তার প্রয়োজন যাজ্ঞা করে। কেউ কেউ বলেছেনঃ “যে দুটি শিরা পৃষ্ঠদেশ থেকে মেরুদণ্ডের অস্থির দু দিকে এসে থাকে তাকে আরবী ভাষায় (আরবি) বলা হয়। নামাযের এটা নড়ে থাকে বলে একে (আরবি) বলা হয়েছে। কিন্তু এ কথাটি সঠিক নয়। আবার কেউ কেউ বলেছেন যে, এটা (আরবি) হতে নেয়া হয়েছে, যার অর্থ হচ্ছে সংলগ্ন ও সংযুক্ত থাকা। যেমন কুরআন মাজীদে আছে (আরবি) অর্থাৎ দুর্ভাগা ব্যক্তি ছাড়া কেউই দোযখে চিরকাল থাকবে না।' (৯২:১৫)
কোন কোন পণ্ডিত ব্যক্তি বলেছেন যে, যখন কাঠকে সোজা করার জন্যে আগুনের উপর রাখা হয় তখন আরববাসীরা (আরবি) বলে থাকে। নামাযের মাধ্যমে আত্মার বক্রতাকে সোজা করা হয় বলে একে (আরবি) বলে। যেমন কুরআন মাজীদে আছে (আরবি) অর্থাৎ ‘নিশ্চয় নামায নির্লজ্জতা ও অসৎ কাজ হতে বিরত রাখে।' (২৯:৪৫)। কিন্তু এর অর্থ প্রার্থনা হওয়াই সর্বাপেক্ষা সঠিক ও প্রসিদ্ধ। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। যাকাত শব্দের আলোচনা ইনশাআল্লাহ পরে আসবে।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।