আল কুরআন


সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 246)

সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 246)



হরকত ছাড়া:

ألم تر إلى الملأ من بني إسرائيل من بعد موسى إذ قالوا لنبي لهم ابعث لنا ملكا نقاتل في سبيل الله قال هل عسيتم إن كتب عليكم القتال ألا تقاتلوا قالوا وما لنا ألا نقاتل في سبيل الله وقد أخرجنا من ديارنا وأبنائنا فلما كتب عليهم القتال تولوا إلا قليلا منهم والله عليم بالظالمين ﴿٢٤٦﴾




হরকত সহ:

اَلَمْ تَرَ اِلَی الْمَلَاِ مِنْۢ بَنِیْۤ اِسْرَآءِیْلَ مِنْۢ بَعْدِ مُوْسٰی ۘ اِذْ قَالُوْا لِنَبِیٍّ لَّهُمُ ابْعَثْ لَنَا مَلِکًا نُّقَاتِلْ فِیْ سَبِیْلِ اللّٰهِ ؕ قَالَ هَلْ عَسَیْتُمْ اِنْ کُتِبَ عَلَیْکُمُ الْقِتَالُ اَلَّا تُقَاتِلُوْا ؕ قَالُوْا وَ مَا لَنَاۤ اَلَّا نُقَاتِلَ فِیْ سَبِیْلِ اللّٰهِ وَ قَدْ اُخْرِجْنَا مِنْ دِیَارِنَا وَ اَبْنَآئِنَا ؕ فَلَمَّا کُتِبَ عَلَیْهِمُ الْقِتَالُ تَوَلَّوْا اِلَّا قَلِیْلًا مِّنْهُمْ ؕ وَ اللّٰهُ عَلِیْمٌۢ بِالظّٰلِمِیْنَ ﴿۲۴۶﴾




উচ্চারণ: আলাম তারা ইলাল মালাই মিমবানী ইছরাঈলা মিম বা‘দি মূছা-। ইযকা-লূ লিনাবিইয়িল্লাহুমুব ‘আছলানা-মালিকান্নুকা-তিল ফী ছাবীলিল্লা-হি কা-লা হাল ‘আছাইতুম ইন কুতিবা ‘আলাইকুমুল কিতা-লুআল্লা-তুকা-তিলূ কা-লূওয়ামা লানাআল্লা-নুকা-তিলা ফী ছাবীলিল্লা-হি ওয়া কাদ উখরিজনা-মিন দিয়া-রিনা-ওয়া আবনাইনা ফালাম্মা কুতিবা ‘আলাইহিমুল কিতা-লুতাওয়াল্লাও ইল্লা-কালীলাম মিনহুম ওয়াল্লাহু ‘আলীমুম বিজ্জা-লিমীন।




আল বায়ান: তুমি কি মূসার পর বনী ইসরাঈলের প্রধানদেরকে দেখনি? যখন তারা তাদের নবীকে বলেছিল, ‘আমাদের জন্য একজন রাজা পাঠান, তাহলে আমরা আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করব’। সে বলল, ‘এমন কি হবে যে, যদি তোমাদের উপর লড়াই আবশ্যক করা হয়, তোমরা লড়াই করবে না’? তারা বলল, আমাদের কী হয়েছে যে, আমরা আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করব না, অথচ আমাদেরকে আমাদের গৃহসমূহ থেকে বের করা হয়েছে এবং আমাদের সন্তানদের থেকে (বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে)’? অতঃপর যখন তাদের উপর লড়াই আবশ্যক করা হল, তখন তাদের মধ্য থেকে স্বল্প সংখ্যক ছাড়া তারা বিমুখ হল। আর আল্লাহ যালিমদের সম্পর্কে সম্যক অবগত।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২৪৬. আপনি কি মূসার পরবর্তী ইসরাঈল-বংশীয় নেতাদের দেখেননি? তারা যখন তাদের নবীকে বলেছিল, আমাদের জন্য একজন রাজা নিযুক্ত কর যাতে আমরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করতে পারি', তিনি বললেন, ‘এমন তো হবে না যে, তোমাদের প্রতি যুদ্ধের বিধান দেয়া হলে তখন আর তোমরা যুদ্ধ করবে না? তারা বলল, আমরা যখন নিজেদের আবাসভূমি ও স্বীয় সন্তান-সন্ততি হতে বহিস্কৃত হয়েছি, তখন আল্লাহর পথে কেন যুদ্ধ করবো না’? অতঃপর যখন তাদের প্রতি যুদ্ধের বিধান দেয়া হলো তখন তাদের কিছু সংখ্যক ছাড়া সবাই পৃষ্ঠ প্রদর্শন করল আর আল্লাহ যালিমদের সম্পর্কে সবিশেষ জ্ঞানী।




তাইসীরুল ক্বুরআন: তুমি কি মূসার পরবর্তী বানী ইসরাঈলের প্রধানদের প্রতি লক্ষ্য করনি? তারা তাদের নাবীকে বলেছিল, ‘আমাদের জন্য একজন বাদশাহ ঠিক করুন, যাতে আমরা আল্লাহর পথে জিহাদ করি’। নির্দেশ হল, ‘এমন সম্ভাবনা আছে কি যে, যদি তোমাদের প্রতি জিহাদের হুকুম দেয়া হয় তবে তোমরা জিহাদ করবে না’? তারা বলল, ‘আমরা কী ওজরে আল্লাহর পথে জিহাদ করব না, যখন আমরা আমাদের গৃহ ও সন্তানাদি হতে বহিস্কৃত হয়েছি’। অতঃপর যখন তাদের প্রতি জিহাদের হুকুম হল, তখন তাদের অল্প সংখ্যক লোক ছাড়া সকলেই ফিরে দাঁড়াল এবং আল্লাহ যালিমদেরকে খুব ভালভাবেই জানেন।




আহসানুল বায়ান: (২৪৬) তুমি কি মূসার পরবর্তী বনী-ইস্রাঈল প্রধানদের দেখনি?[1] যখন তারা নিজেদের নবীকে বলেছিল, ‘আমাদের জন্য একজন রাজা নিযুক্ত কর,[2] যাতে আমরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করতে পারি।’ সে বলল, ‘বোধ হয় যদি তোমাদের প্রতি যুদ্ধের বিধান দেওয়া হয়, তাহলে তোমরা তা করবে না?’ তারা বলল, ‘আমরা যখন আপন ঘর-বাড়ি ও সন্তান-সন্ততি থেকে বহিষ্কৃত হয়েছি, তখন আল্লাহর পথে যুদ্ধ করব না কেন?’ অতঃপর যখন তাদেরকে যুদ্ধের বিধান দেওয়া হল, তখন তাদের স্বল্পসংখ্যক ব্যতীত অধিকাংশই পৃষ্ঠ প্রদর্শন করল। আর আল্লাহ অপরাধিগণ সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত।



মুজিবুর রহমান: তুমি কি মূসার পরে ইসরাঈল বংশীয় প্রধানদের প্রতি লক্ষ্য করনি? নিজেদের এক নাবীকে যখন তারা বলেছিলঃ আমাদের জন্য একজন রাজা নিযুক্ত করে দাও (যেন) আমরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করতে পারি। সে বলেছিলঃ এটা কি সম্ভবপর নয় যে, যখন তোমাদের উপর যুদ্ধ বিধিবদ্ধ হয়ে যাবে তখন তোমরা যুদ্ধ করবেনা? তারা বলেছিলঃ আমরা যুদ্ধ করবনা এটা কিরূপে (সম্ভব), অথচ নিজেদের আবাস হতে ও স্বজনদের নিকট হতে আমরা বহিস্কৃত হয়েছি? অনন্তর যখন তাদের উপর যুদ্ধ বিধিবদ্ধ হল তখন তাদের অল্প সংখ্যক ব্যতীত সবাই পশ্চাৎপদ হয়ে পড়ল এবং অত্যাচারীদেরকে আল্লাহ সম্যক রূপে অবগত আছেন।



ফযলুর রহমান: তুমি কি মূসার পরে বনী ইসরাঈল নেতাদেরকে দেখনি? যখন তারা তাদের এক নবীকে বলেছিল, “আমাদের জন্য একজন রাজা নিযুক্ত করো, আমরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করব।” নবী বলেছিলেন, “এমন হবে নাতো যে, তোমাদের ওপর যুদ্ধ ধার্য করা হলে তখন তোমরা যুদ্ধ করবে না?” তারা বলল, “আমাদেরকে যখন নিজেদের ঘরবাড়ি থেকে ও সন্তান-সন্ততির কাছ থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে তখন আল্লাহর পথে যুদ্ধ করব না কেন?” কিন্তু যখন (ঠিকই) তাদের ওপর যুদ্ধ ধার্য করা হল তখন অল্প কয়েকজন ব্যতীত তারা পিঠটান দিল। আল্লাহ জালেমদের সম্পর্কে ভালভাবে অবগত আছেন।



মুহিউদ্দিন খান: মূসার পরে তুমি কি বনী ইসরাঈলের একটি দলকে দেখনি, যখন তারা বলেছে নিজেদের নবীর কাছে যে, আমাদের জন্য একজন বাদশাহ নির্ধারিত করে দিন যাতে আমরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করতে পারি। নবী বললেন, তোমাদের প্রতিও কি এমন ধারণা করা যায় যে, লড়াইর হুকুম যদি হয়, তাহলে তখন তোমরা লড়বে না? তারা বলল, আমাদের কি হয়েছে যে, আমরা আল্লাহর পথে লড়াই করব না। অথচ আমরা বিতাড়িত হয়েছি নিজেদের ঘর-বাড়ী ও সন্তান-সন্ততি থেকে। অতঃপর যখন লড়াইয়ের নির্দেশ হলো, তখন সামান্য কয়েকজন ছাড়া তাদের সবাই ঘুরে দাঁড়ালো। আর আল্লাহ তা’আলা জালেমদের ভাল করেই জানেন।



জহুরুল হক: তুমি কি মূসার পরবর্তীকালে ইসরাইলের বংশধরদের প্রধানদের বিষয়ে ভেবে দেখ নি, যখন তারা তাদের নবীকে বলেছিল -- "আমাদের জন্য একজন রাজা উত্থাপন করো যেন আমরা আল্লাহ্‌র পথে লড়তে পারি"? তিনি বলেছিলেন -- "এমনটা কি তোমাদের হবে যে তোমাদের জন্য যুদ্ধ বিধিবদ্ধ করা হলে তোমরা যুদ্ধ করবে না?" তারা বলেছিল -- "আমাদের কী হয়েছে যে আমরা আল্লাহ্‌র পথে যুদ্ধ করবো না যখন আমরা আমাদের বাড়িঘর ও সন্তান-সন্ততি থেকে বিতাড়িত হয়েছি?" কিন্তু যখন তাদের জন্য যুদ্ধ বিধিবদ্ধ করা হলো, তারা ফিরে দাঁড়াল তাদের মধ্যের অল্প কয়েকজন ছাড়া। আর আল্লাহ্ অন্যায়কারীদের সন্বন্ধে সর্বজ্ঞাতা।



Sahih International: Have you not considered the assembly of the Children of Israel after [the time of] Moses when they said to a prophet of theirs, "Send to us a king, and we will fight in the way of Allah "? He said, "Would you perhaps refrain from fighting if fighting was prescribed for you?" They said, "And why should we not fight in the cause of Allah when we have been driven out from our homes and from our children?" But when fighting was prescribed for them, they turned away, except for a few of them. And Allah is Knowing of the wrongdoers.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ২৪৬. আপনি কি মূসার পরবর্তী ইসরাঈল-বংশীয় নেতাদের দেখেননি? তারা যখন তাদের নবীকে বলেছিল, আমাদের জন্য একজন রাজা নিযুক্ত কর যাতে আমরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করতে পারি’, তিনি বললেন, ‘এমন তো হবে না যে, তোমাদের প্রতি যুদ্ধের বিধান দেয়া হলে তখন আর তোমরা যুদ্ধ করবে না? তারা বলল, আমরা যখন নিজেদের আবাসভূমি ও স্বীয় সন্তান-সন্ততি হতে বহিস্কৃত হয়েছি, তখন আল্লাহর পথে কেন যুদ্ধ করবো না’? অতঃপর যখন তাদের প্রতি যুদ্ধের বিধান দেয়া হলো তখন তাদের কিছু সংখ্যক ছাড়া সবাই পৃষ্ঠ প্রদর্শন করল আর আল্লাহ যালিমদের সম্পর্কে সবিশেষ জ্ঞানী।


তাফসীর:

-


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (২৪৬) তুমি কি মূসার পরবর্তী বনী-ইস্রাঈল প্রধানদের দেখনি?[1] যখন তারা নিজেদের নবীকে বলেছিল, ‘আমাদের জন্য একজন রাজা নিযুক্ত কর,[2] যাতে আমরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করতে পারি।’ সে বলল, ‘বোধ হয় যদি তোমাদের প্রতি যুদ্ধের বিধান দেওয়া হয়, তাহলে তোমরা তা করবে না?’ তারা বলল, ‘আমরা যখন আপন ঘর-বাড়ি ও সন্তান-সন্ততি থেকে বহিষ্কৃত হয়েছি, তখন আল্লাহর পথে যুদ্ধ করব না কেন?’ অতঃপর যখন তাদেরকে যুদ্ধের বিধান দেওয়া হল, তখন তাদের স্বল্পসংখ্যক ব্যতীত অধিকাংশই পৃষ্ঠ প্রদর্শন করল। আর আল্লাহ অপরাধিগণ সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত।


তাফসীর:

[1] مَلأ কোন জাতির এমন সম্মানিত ও সমভ্রান্ত লোকদেরকে বলা হয়, যারা বিশেষ উপদেষ্টা ও নেতা হন। যাদেরকে দেখলে চোখ ও অন্তর প্রতাপে ভরে যায়। مَلأ এর আভিধানিক অর্থ ভরে যাওয়া। (আইসারুত্ তাফাসীর) যে নবীর কথা (আয়াতে) উল্লেখ হয়েছে, তার নাম ‘শামবীল’ বলা হয়। ইবনে কাসীর ও অন্যান্য মুফাসসিরগণ যে ঘটনা বর্ণনা করেছেন তার সার কথা হল, বানী-ইস্রাঈল মূসা (আঃ)-এর পর কিছুকাল পর্যন্ত সঠিক পথেই ছিল। তারপর তাদের মধ্যে বিমুখতা এল। দ্বীনে নতুন নতুন বিদআত আবিষ্কার করল। এমন কি মূর্তিপূজাও আরম্ভ করে দিল। নবীগণ তাদেরকে বাধা দিলেন, কিন্তু তারা অবাধ্যতা ও শিরক থেকে বিরত হল না। ফলে আল্লাহ তাদের শত্রুদেরকে তাদের উপর আধিপত্য দান করলেন। তারা ওদের অঞ্চল ওদের কাছ থেকে কেড়ে নিল এবং ওদের মধ্য থেকে বহু সংখ্যক মানুষকে বন্দী করল। তাদের মধ্যে নবী আগমনের ধারাবাহিকতাও বন্ধ হয়ে গেল। শেষে কিছু লোকের দু’আয় শামবীল নবী (আঃ) জন্ম লাভ করলেন। তিনি দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ শুরু করলেন। তারা নবীর কাছে দাবী পেশ করল যে, আমাদের জন্য একজন বাদশাহ নির্বাচিত করে দিন; আমরা তার নেতৃত্বে শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব। নবী তাদের অতীত চরিত্রের আলোকে বললেন, তোমরা দাবী তো করছ, কিন্তু আমার অনুমান তোমরা তোমাদের কথার উপর অটল থাকবে না। সুতরাং সেই রকমই হল, যে রকম কুরআন বর্ণনা করেছে।

[2] নবী বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও রাজা নিযুক্ত করার দাবী পেশ করা, রাজতন্ত্র বৈধতার দলীল। কেননা, যদি রাজতন্ত্র বৈধ না হত, তাহলে মহান আল্লাহ তাদের দাবীকে প্রত্যাখ্যান করতেন। কিন্তু আল্লাহ তাদের দাবীকে প্রত্যাখ্যান করেননি, বরং ত্বালূতকে তাদের জন্য রাজা নিযুক্ত করে দিলেন; যাঁর কথা পরে আসছে। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, রাজা যদি লাগামহীন স্বেচ্ছাচারী না হয়ে আল্লাহর বিধি-বিধানের প্রতি যত্নবান এবং ন্যায়পরায়ণ হন, তাহলে তাঁর রাজত্ব কেবল বৈধই নয়, বরং কাম্য এবং বাঞ্ছনীয়ও। (অধিক জানার জন্য দ্রষ্টব্যঃ সূরা মায়েদা ২০নং আয়াতের টীকা)


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ২৪৬-২৫২ নং আয়াতের তাফসীর:



এ আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা‘আলা মূসা (আঃ)-এর পরবর্তী যুগের একটি জাতির ঘটনা উল্লেখ করেছেন। সাগরডুবি থেকে নাজাত পেয়ে মূসা ও হারূন (আঃ) বানী ইসরাঈলের নিয়ে শামে এসে শান্তিতে বসবাস করতে থাকলেন। এমতাবস্থায় আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে পিতৃভূমি ফিলিস্তীন ফিরে গিয়ে আমালেকা জাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তা পুনরুদ্ধারের নির্দেশ দেয়া হল, সাথে এ ওয়াদাও দেয়া হল- যুদ্ধ করলেই বিজয় দান করা হবে (সূরা মায়িদাহ ৫:২৩)। কিন্তু তারা মূসা (আঃ)-কে পরিস্কার জানিয়ে দিল- ‘তুমি ও তোমার রব গিয়ে যুদ্ধ কর, আমরা এখানে বসে রইলাম’(সূরা মায়িদাহ ৫:২৪)। ফলে শাস্তিস্বরূপ তারা তীহ ময়দানে ৪০ বছর উ™£ান্ত অবস্থায় ঘুরতে থাকল। পরে ইউশা বিন নূনের নেতৃত্বে ফিলিস্তীন দখল করা হলেও বানী ইসরাঈল পুনরায় বিলাসিতায় গা ভাসিয়ে দেয় এবং নানাবিধ অনাচারে লিপ্ত হয়। তখন আল্লাহ তা‘আলা তাদের ওপর পুনরায় আমালেকা জাতি চাপিয়ে দেন। বানী ইসরাঈলরা আবার নিগৃহীত হতে থাকে। এভাবে বহু দিন কেটে যায়। এক সময় শামাবীল (شمويل) নাবীর যুগ আসে। তারা এ নাবীর কাছে একজন বাদশা নির্ধারণের দাবি জানাল যাতে তার নেতৃত্বে পূর্বের ঐতিহ্য ফিরে পেতে পারে এবং বর্তমান দুর্দশা থেকে মুক্তি পেতে পারে। আল্লাহ তা‘আলা তাদের দাবি মতে নেতা হিসেবে তালূতকে প্রেরণ করেন। কিন্তু তারা তালূতকে মেনে নেয়নি। কারণ তালূত ঐ বংশের ছিল না যে বংশ থেকে ধারাবাহিকভাবে বানী ইসরাঈলের নেতৃত্বের আগমন ঘটেছে। তিনি একজন দরিদ্র ও সাধারণ সৈনিক ছিলেন। তাই তারা আয়াতে বর্ণিত অভিযোগ আনল।



বিষয়টি হল- বানী ইসরাঈলের নিকট একটি সিন্দুক ছিল। যার মধ্যে তাদের নাবী মূসা ও হারূন (আঃ) এবং তাদের পরিবারের ব্যবহৃত কিছু পরিত্যক্ত সামগ্রী ছিল। তারা এটাকে খুবই বরকতময় মনে করত এবং যুদ্ধকালে একে সম্মুকে রাখত। একবার আমালেকাদের সাথে যুদ্ধের সময় বানী ইসরাঈল পরাজিত হলে আমালেকাদের বাদশা জালূত উক্ত সিন্দুকটি নিয়ে যায়। এক্ষণে যখন বানী ইসরাঈলগণ পুনরায় জিহাদের সংকল্প করল, তখন আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে উক্ত সিন্দুক ফিরিয়ে দিতে মনস্থ করলেন। অতঃপর এ সিন্দুকটির মাধ্যমে তাদের মধ্যকার নেতৃত্ব নিয়ে ঝগড়ার নিসরন করেন। সিন্দুকটি তালূতের বাড়িতে আগমনের ঘটনা এই যে, জালূতের নির্দেশে কাফিররা যেখানেই সিন্দুকটি রাখে, সেখানেই দেখা দেয় মহামারী ও অন্যান্য বিপদাপদ শুরু হয়ে যায়। এমনিভাবে তাদের পাঁচটি শহর ধ্বংস হয়ে যায়। অবশেষে অতিষ্ট হয়ে তারা একে তার প্রকৃত মালিকের কাছে পাঠিয়ে দেবার সিদ্ধান্ত নিল এবং গরুর গাড়িতে উঠিয়ে হাঁকিয়ে দিল। তখন ফেরেশতাগণ আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশক্রমে গরুর গাড়িটি তাড়িয়ে এনে তালূতের ঘরের সম্মুখে রেখে দিল। বানী ইসরাঈল এ দৃশ্য দেখে সবাই একবাক্যে তালূতের নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করল। অতঃপর তালূত আমালেকাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনার প্রস্তুতি নেন। সকল প্রস্তুতি শেষ হলে কথিত মতে ৮০,০০০ হাজার সেনা নিয়ে রওনা হন। অল্প বয়স্ক তরুণ দাউদ (আঃ) ছিলেন উক্ত সেনা দলের সদস্য। পথিমধ্যে সেনাপতি তালূত তাদের পরীক্ষা করতে চাইলেন। সম্মুখেই ছিল এক নদী। মৌসুম ছিল প্রচণ্ড গরমের। পিপাসায় ছিল সবাই কাতর। তাই তিনি বললেন,



(مُبْتَلِيْكُمْ بِنَهَرٍ)



‘তোমাদেরকে একটি নদী দ্বারা পরীক্ষা করবেন’এ নদীটি হল জর্ডান ও প্যালেস্টাইনের মধ্যবর্তী এলাকায় অবস্থিত। বস্তুত নদী পার হওয়া অল্প সংখ্যক ঈমানদার ব্যতীত সকলেই পানি পান করেছিল, যাদের সংখ্যা ছিল ৩১৩ জন, যা বদর যুদ্ধে মুসলিম যুদ্ধাদের সংখ্যা ছিল। যারা পানি পান করেছিল তারা আলস্যে ঘুমিয়ে পড়ে। এ স্বল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়ে তালূত শৌর্য-বীর্যের প্রতীক আমালেকাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে চললেন। বস্তুবাদীদের হিসেবে এটা ছিল নিতান্তই আত্মহননের শামিল, একটি অসম যুদ্ধ।



(وَلَمَّا بَرَزُوْا لِجَالُوْتَ وَجُنُوْدِه)



‘আর যখন তারা জালূত ও তার সৈন্যদের মুখোমুুখি হল’জালূত ছিল শত্র“দলের সেনাপতি। তালূত ও তাঁর সঙ্গীরা জালূতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়েছিল। এরা ছিল আমালিকা জাতি। তৎকালীন সময়ে তারা বড় দুর্ধর্ষ ও যুদ্ধবাজ ছিল। তাই এ যুদ্ধবাজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সময় তারা আল্লাহ তা‘আলার কাছে দু‘আ করে নিল। আল্লাহ তা‘আলার সহযোগিতায় তারা সংখ্যায় অল্প হলেও জয় লাভ করল।



(وَقَتَلَ دَاو۫دُ جَالُوْتَ)



‘দাঊদ (আঃ) জালূতকে হত্যা করল’তখন দাঊদ (আঃ) নাবী ছিলেন না। তালূতের একজন সাধারণ সৈন্য ছিলেন। পরে আল্লাহ তা‘আলা তাকে নবুওয়াত ও রাজত্ব উভয়টি দান করলেন।



এসব ঘটনা বর্ণনা করার দু’টি উদ্দেশ্য:



(১) শিক্ষা গ্রহণ, (২) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নবুওয়াতের সত্যতার প্রমাণ। কেননা; তিনি এ সব ঘটনা কোন কিতাবে পড়েননি এবং কারো কাছে শোনেননি। বরং অতীতের এসব ঘটনা আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রাসূলকে ওয়াহীর মাধ্যমে অবগত করেছেন। সেজন্য শেষে আল্লাহ তা‘আলা বললেন:



(إِنَّكَ لَمِنَ الْمُرْسَلِينَ)



“নিশ্চয়ই তুমি রাসূলগণের অন্যতম একজন।”(সূরা ইয়াসীন ৩৬:২)



আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. শরীয়তসম্মত জিহাদের শর্ত হল শরীয়তসম্মত ইমাম থাকতে হবে।

২. রাসূলদের ব্যবহৃত জিনিস দ্বারা বরকত নেয়া জায়েয। তবে কোন পীর-ফকির বাবা ইত্যাদি ব্যক্তির থেকে নয়। এটা শুধু রাসূলদের সাথে সীমাবদ্ধ।

৩. ঈমানদার যুদ্ধে গেলে পিছপা হয় না।

৪. মুনাফিকরা যুদ্ধের জন্য খুব আগ্রহ দেখাবে কিন্তু ফরয হলে বা সরাসরি মোকাবেলার সময় হলে পালাবে।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: যে নবীর এখানে বর্ণনা রয়েছে তার নাম হযরত কাতাদাহ (রঃ)-এর উক্তি অনুসারে হযরত ইউশা ইবনে নূন ইবনে আফরাইয়াম বিন ইউসুফ বিন ইয়াকুব (আঃ)! কিন্তু এই উক্তি সঠিক বলে মনে হয় না। কেননা, এটি হযরত মূসা (আঃ)-এর বহু পরে হযরত দাউদ (আঃ)-এর যুগের ঘটনা। এটা স্পষ্টভাবেই বর্ণিত রয়েছে। আর হযরত দাউদ (আঃ) ও হযরত মূসা (আঃ)-এর মধ্যে একাত্তর বছরেরও বেশী ব্যবধান রয়েছে। হযরত সুদ্দী (রঃ)-এর উক্তি এই যে, এই নবী হচ্ছেন হযরত শামাউন। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, তিনি হচ্ছেন হযরত শামবিল বিন বালী বিন আলকামা বিন তারখাম বিনিল ইয়াহাদ বাহরাম বিন আলকামা বিন মাজিব বিন উমারসা বিন ইযরিয়া বিন সুফইয়া বিন আলকামা বিন আবি ইয়াসিফ বিন কারূন বিন ইয়াসহার বিন কাহিস বিন লাবী বিন ইয়াকুব বিন ইসহাক বিন ইবরাহীম খালীল (আঃ)।

ঘটনাটি এই যে, হযরত মূসা (আঃ)-এর পরে কিছুদিন পর্যন্ত বানী ইসরাঈল সত্যের উপরেই ছিল। অতঃপর তারা শিরক ও বিদআতের মধ্যে পতিত হয়। তথাপি তাদের মধ্যে ক্রমাগত নবী পাঠান হয়। কিন্তু যখন তাদের অন্যায় কার্যকলাপ সীমা ছাড়িয়ে যায় তখন আল্লাহ তা'আলা তাদের শত্রুদেরকে তাদের উপর জয়যুক্ত করে দেন। সুতরাং তাদের শত্রুরা তাদের বহু লোককে হত্যা করলো, বহু বন্দী করলো এবং তাদের বহু শহর দখল করে নিলো। পূর্বে তাদের নিকট তাওরাত ও শান্তিতে পরিপূর্ণ তাবূত (সিন্দুক) বিদ্যমান ছিল যা হযরত মূসা (আঃ) হতে উত্তরাধিকার সূত্রে চলে আসছিল। এর ফলে তারা যুদ্ধে জয়লাভ করতো। কিন্তু তাদের দুষ্টামি ও জঘন্য পাপের কারণে মহান আল্লাহর এই নিয়ামত তাদের হাত হতে ছিনিয়ে নেয়া হয় এবং তাদের বংশের মধ্যে নবুওয়াতও শেষ হয়ে যায়। যেলাভী নামক ব্যক্তির বংশধরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে নবুওয়াত চলে আসছিল তারা সবাই যুদ্ধসমূহে মারা যায়। তাদের মধ্যে শুধুমাত্র একটি গর্ভবতী স্ত্রী লোক বেঁচে থাকে। তার স্বামীও নিহত হয়েছিল। এখন বানী ইসরাঈলের দৃষ্টি ঐ স্ত্রী লোকটির উপর ছিল। তাদের আশা ছিল যে, আল্লাহ তাকে পুত্রসন্তান দান করবেন এবং তিনি নবী হবেন। দিন-রাত ঐ স্ত্রী লোকটিরও এই প্রার্থনাই ছিল। আল্লাহ তা'আলা তার প্রার্থনা কবুল করেন এবং তাকে একটি পুত্রসন্তান দান করেন। ছেলেটির নাম শ্যামভীল বা শামউন রাখা হয়। এর শাব্দিক অর্থ হচ্ছে আল্লাহ আমার প্রার্থনা কবুল করেছেন।'

নবুওয়াতের বয়স হলে তাকে নবুওয়াত দেয়া হয়। যখন তিনি নবুওয়াতের দাওয়াত দেন তখন তাঁর সম্প্রদায় তাঁর নিকট প্রার্থনা জানায় যে, তাদের উপর যেন একজন বাদশাহ্ নিযুক্ত করা হয় তাহলে তারা তাঁর নেতৃত্বে জিহাদ করবে। বাদশাহ তো প্রকাশিত হয়েই পড়েছিলেন। কিন্তু উক্ত নবী (আঃ) তাঁর সন্দেহের কথা তাদের নিকট বর্ণনা করেন যে, তাদের প্রতি জিহাদ ফরয করা হলে তারা জিহাদ হতে মুখ ফিরিয়ে নেবে না তো: তারা উত্তরে বলে যে, তাদের সাম্রাজ্য ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে এবং তাদের সন্তানাদিকে বন্দী করা হয়েছে তথাপি তারা কি এতই কাপুরুষ যে মৃত্যুর ভয়ে তারা জিহাদ হতে মুখ ফিরিয়ে নেবে: তখন জিহাদ ফরয করে দেয়া হলো এবং তাদেরকে বাদশাহর সাথে যুদ্ধ ক্ষেত্রে গমন করতে বলা হলো। এই নির্দেশ শ্রবণমাত্র অল্প কয়েকজন ব্যতীত সবাই অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করলো। তাদের এই অভ্যাস নতুন ছিল না। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা এটা জানতেন।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।