আল কুরআন


সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 237)

সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 237)



হরকত ছাড়া:

وإن طلقتموهن من قبل أن تمسوهن وقد فرضتم لهن فريضة فنصف ما فرضتم إلا أن يعفون أو يعفو الذي بيده عقدة النكاح وأن تعفوا أقرب للتقوى ولا تنسوا الفضل بينكم إن الله بما تعملون بصير ﴿٢٣٧﴾




হরকত সহ:

وَ اِنْ طَلَّقْتُمُوْهُنَّ مِنْ قَبْلِ اَنْ تَمَسُّوْهُنَّ وَ قَدْ فَرَضْتُمْ لَهُنَّ فَرِیْضَۃً فَنِصْفُ مَا فَرَضْتُمْ اِلَّاۤ اَنْ یَّعْفُوْنَ اَوْ یَعْفُوَا الَّذِیْ بِیَدِهٖ عُقْدَۃُ النِّکَاحِ ؕ وَ اَنْ تَعْفُوْۤا اَقْرَبُ لِلتَّقْوٰی ؕ وَ لَا تَنْسَوُا الْفَضْلَ بَیْنَکُمْ ؕ اِنَّ اللّٰهَ بِمَا تَعْمَلُوْنَ بَصِیْرٌ ﴿۲۳۷﴾




উচ্চারণ: ওয়া ইন তাল্লাকতুমূহুন্না মিন কাবলি আন তামাছছূহুন্না ওয়াকাদ ফারাদতুম লাহুন্না ফারীদাতান ফানিসফুমা-ফারাদতুম ইল্লাআই ইয়া‘ফূনা আও ইয়া‘ফুওয়াল্লাযী বিয়াদিহী ‘উকদাতন নিকা-হিওয়া আন তা‘ফূআকরাবুলিত্তাকওয়া-ওয়ালা-তানছাউল ফাদলা বাইনাক ুম ইন্নাল্লা-হা বিমা-তা‘মালূনা বাসীর।




আল বায়ান: আর যদি তোমরা তাদেরকে তালাক দাও, তাদেরকে স্পর্শ করার পূর্বে এবং তাদের জন্য কিছু মোহর নির্ধারণ করে থাক, তাহলে যা নির্ধারণ করেছ, তার অর্ধেক (দিয়ে দাও)। তবে স্ত্রীরা যদি মাফ করে দেয়, কিংবা যার হাতে বিবাহের বন্ধন সে যদি মাফ করে দেয়। আর তোমাদের মাফ করে দেয়া তাকওয়ার অধিক নিকটতর। আর তোমরা পরস্পরের মধ্যে অনুগ্রহ ভুলে যেয়ো না। তোমরা যা কর, নিশ্চয় আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক দ্রষ্টা।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২৩৭. আর তোমরা যদি তাদেরকে স্পর্শ করার আগে তালাক দাও, অথচ তাদের জন্য মাহর ধার্য করে থাক, তাহলে যা তোমরা ধার্য করেছ তার অর্ধেক(১), তবে যা স্ত্রীগণ অথবা যার হাতে বিয়ের বন্ধন রয়েছে সে মাফ করে দেয়(২) এবং মাফ করে দেয়াই তাকওয়ার নিকটতর। আর তোমরা নিজেদের মধ্যে অনুগ্রহের কথা ভুলে যেও না। তোমরা যা কর নিশ্চয় আল্লাহ তা সবিশেষ প্রত্যক্ষকারী।




তাইসীরুল ক্বুরআন: যদি তোমরা তাদেরকে স্পর্শ করার পূর্বে তালাক দাও, অথচ তাদের মহর ধার্য করা হয়, সে অবস্থায় ধার্যকৃত মহরের অর্ধেক, কিন্তু যদি স্ত্রীরা দাবী মাফ করে দেয় কিংবা যার হাতে বিয়ের বন্ধন আছে সে মাফ করে দেয়, বস্তুতঃ ক্ষমা করাই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী এবং তোমরা পারস্পরিক সহায়তা হতে বিমুখ হয়ো না, যা কিছু তোমরা করছ আল্লাহ নিশ্চয়ই তার সম্যক দ্রষ্টা।




আহসানুল বায়ান: (২৩৭) যদি স্পর্শ করার পূর্বে স্ত্রীদের তালাক দাও, অথচ মোহর পূর্বেই ধার্য করে থাক, তাহলে নির্দিষ্ট মোহরের অর্ধেক আদায় করতে হবে।[1] কিন্তু যদি স্ত্রী অথবা যার হাতে বিবাহ-বন্ধন[2] সে যদি মাফ করে দেয়, (তাহলে স্বতন্ত্র কথা।) অবশ্য তোমাদের মাফ করে দেওয়াই আত্মসংযমের নিকটতর। তোমরা নিজেদের মধ্যে সহানুভূতি (ও মর্যাদার) কথা বিস্মৃত হয়ো না। নিশ্চয় তোমরা যা কর, আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা।



মুজিবুর রহমান: আর তোমরা যদি তাদেরকে স্পর্শ করার পূর্বেই তালাক প্রদান কর এবং তাদের মোহর নির্ধারণ করে থাক তাহলে যা নির্ধারণ করেছিলে তার অর্ধেক দিয়ে দাও; কিন্তু যদি তারা ক্ষমা করে কিংবা যার হাতে বিবাহ বন্ধন সে ক্ষমা করে তাহলে তা স্বতন্ত্র কথা; অথবা তোমরা পুরুষরা যদি ক্ষমা কর তাহলে এটা পরহেজগারীর অতি নিকটবর্তী; এবং পরস্পরের উপকারকে যেন ভুলে যেওনা; তোমরা যা কর নিশ্চয়ই আল্লাহ তা প্রত্যক্ষকারী।



ফযলুর রহমান: আর যদি তাদেরকে স্পর্শ করার আগে এবং তাদের জন্য মোহরানা ধার্য করার পরে তালাক দাও, তাহলে যে পরিমাণ মোহরানা ধার্য করেছো তার অর্ধেক (দিতে হবে)। তবে যদি তারা (অর্থাৎ স্ত্রীরা তাদের অর্ধেক) ছেড়ে দেয় (অর্থাৎ কোন মোহরানা না নেয়) কিংবা যার হাতে বিবাহবন্ধন সে (অর্থাৎ স্বামী তার অর্ধেক) ছেড়ে দেয় (অর্থাৎ পুরো মোহরানা দিয়ে দেয়) তাহলে ভিন্ন কথা। আর তোমরা (এভাবে যার যার পাওনা) ছেড়ে দিলে সেটাই হবে তাকওয়ার নিকটতর (কাজ)। তোমরা নিজেদের মধ্যে উদারতা (প্রদর্শন করতে) ভুলে যেয়ো না। তোমরা যা কিছু করো আল্লাহ তা দেখতে পান।



মুহিউদ্দিন খান: আর যদি মোহর সাব্যস্ত করার পর স্পর্শ করার পূর্বে তালাক দিয়ে দাও, তাহলে যে, মোহর সাব্যস্ত করা হয়েছে তার অর্ধেক দিয়ে দিতে হবে। অবশ্য যদি নারীরা ক্ষমা করে দেয় কিংবা বিয়ের বন্ধন যার অধিকারে সে (অর্থাৎ, স্বামী) যদি ক্ষমা করে দেয় তবে তা স্বতন্ত্র কথা। আর তোমরা পুরুষরা যদি ক্ষমা কর, তবে তা হবে পরহেযগারীর নিকটবর্তী। আর পারস্পরিক সহানুভূতির কথা বিস্মৃত হয়ো না। নিশ্চয় তোমরা যা কিছু কর আল্লাহ সেসবই অত্যন্ত ভাল করে দেখেন।



জহুরুল হক: কিন্তু যদি তোমরা তাদের তালাক দাও তাদের স্পর্শ করার আগে এবং ইতিমধ্যে দেয় তাদের জন্য ধার্য করে ফেলেছ, যা ধার্য করেছ তার অর্ধেক, যদি না তারা মাফ করে দেয় অথবা তারা মাফ করে দেয় যাদের হাতে রয়েছে বিবাহ-গ্রন্থি। আর যদি তোমরা দাবি ছেড়ে দাও তবে তা ধর্মপরায়ণতার অধিকতর নিকটবর্তী। আর তোমাদের পরস্পরের মধ্যে সদয়তা ভুলে যেয়ো না। নিঃসন্দেহ তোমরা যা করো আল্লাহ্ তার দর্শক।



Sahih International: And if you divorce them before you have touched them and you have already specified for them an obligation, then [give] half of what you specified - unless they forego the right or the one in whose hand is the marriage contract foregoes it. And to forego it is nearer to righteousness. And do not forget graciousness between you. Indeed Allah, of whatever you do, is Seeing.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ২৩৭. আর তোমরা যদি তাদেরকে স্পর্শ করার আগে তালাক দাও, অথচ তাদের জন্য মাহর ধার্য করে থাক, তাহলে যা তোমরা ধার্য করেছ তার অর্ধেক(১), তবে যা স্ত্রীগণ অথবা যার হাতে বিয়ের বন্ধন রয়েছে সে মাফ করে দেয়(২) এবং মাফ করে দেয়াই তাকওয়ার নিকটতর। আর তোমরা নিজেদের মধ্যে অনুগ্রহের কথা ভুলে যেও না। তোমরা যা কর নিশ্চয় আল্লাহ তা সবিশেষ প্রত্যক্ষকারী।


তাফসীর:

(১) মাহর ও স্ত্রীর সাথে নির্জনবাস ও সহবাসের প্রেক্ষিতে তালাকের চারটি অবস্থা নির্ধারিত হয়েছে। তন্মধ্যে ২৩৬ ও ২৩৭ নং আয়াতে দু'টি অবস্থার হুকুম বর্ণিত হয়েছে। তার একটি হচ্ছে, যদি মাহর ধার্য করা না হয়। দ্বিতীয়টি, মাহর ধার্য করা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু স্ত্রীর সাথে নির্জনবাস বা সহবাস হয়নি। তৃতীয়তঃ মাহর ধার্য হয়েছে এবং সহবাসও হয়েছে। এক্ষেত্রে ধার্যকৃত মোহর সম্পূর্ণই পরিশোধ করতে হবে। কুরআনুল কারীমের অন্য জায়গায় এ বিষয়টি বর্ণিত রয়েছে। চতুর্থতঃ মাহর ধার্য করা হয়নি, অথচ সহবাসের পর তালাক দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে স্ত্রীর পরিবারে প্রচলিত মাহর পরিশোধ করতে হবে। এর বর্ণনাও অন্য এক আয়াতে এসেছে। ২৩৬ ও ২৩৭ নং আয়াতদ্বয়ে প্রথম দুই অবস্থার আলোচনা রয়েছে। তন্মধ্যে ২৩৬ নং আয়াতে প্রথম অবস্থার নির্দেশ হচ্ছে, মাহর কিছুই ওয়াজিব নয়।

তবে নিজের পক্ষ থেকে স্ত্রীকে কিছু দিয়ে দেয়া স্বামীর কর্তব্য। অন্ততপক্ষে তাকে এক জোড়া কাপড় দিয়ে দেবে। কুরআনুল কারীম প্রকৃতপক্ষে এর কোন পরিমাণ নির্ধারণ করেনি। অবশ্য এ কথা বলেছে যে, ধনী ব্যক্তিদের পক্ষে তাদের মর্যাদা অনুযায়ী দেয়া উচিত, যাতে অন্যরাও অনুপ্রাণিত হয় যে, সামর্থ্যবান লোক এহেন ব্যাপারে কার্পণ্য করে না। হাসান রাদিয়াল্লাহু আনহু এমনি এক ব্যাপারে দশ হাজারের উপঢৌকন দিয়েছিলেন। আর কাজী শোরাইহ পাঁচশ দিরহাম (রৌপ্য মুদ্রা) দিয়েছেন। দ্বিতীয় অবস্থায় হুকুম হচ্ছে এই যে, যদি স্ত্রীর মাহর বিয়ের সময় ধার্য করা হয়ে থাকে এবং তাকে সহবাসের পূর্বে তালাক দেয়া হয়, তবে ধার্যকৃত মাহরের অর্ধেক দিতে হবে। আর যদি স্ত্রী তা ক্ষমা করে দেয় কিংবা স্বামী পুরো মাহরই দিয়ে দেয়, তবে তা হচ্ছে তাদের ঐচ্ছিক ব্যাপার।


(২) “যার হাতে বিয়ের বন্ধন রয়েছে”-এ আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় আলেমগণ দুটি মতে বিভক্ত- (১) একদল আলেম বলেনঃ এখানে “যার হাতে বিয়ের বন্ধন রয়েছে” বলতে স্ত্রীর অভিভাবককে বোঝানো হয়েছে। তাদের মতের সমর্থনে ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে এ তাফসীর বর্ণনা করা হয়ে থাকে। এ মত একদিকে শক্তিশালী, অপরদিকে দূর্বল, শক্তিশালী হলো এদিক থেকে যে, ক্ষমা করাটা মূলতঃ স্ত্রীর অভিভাবকের পক্ষেই মানানসই। অপরদিকে দূর্বল হলো এ দিক থেকে যে, সত্যিকারভাবে বিয়ের বন্ধন স্বামীর হাতেই। স্ত্রীর অভিভাবকের এখানে কোন হাত নেই। (২) আরেক দল আলেম বলেনঃ এখানে “যার হাতে বিয়ের বন্ধন” বলতে স্বামীকে বোঝানো হয়েছে। তাদের মতের সমর্থনেও আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে সহীহ সনদে বর্ণনা রয়েছে। তাছাড়া ইবনে আব্বাস, ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমসহ অন্যান্য সাহাবী ও তাবেয়ীনদের থেকে বর্ণনা এসেছে। [দারাকুতনী: ৩/২৭৯]

এ মতও একদিক থেকে শক্তিশালী, অপরদিক থেকে দূর্বল। শক্তিশালী হলো এদিক থেকে যে, মূলতঃ যার হাতে বিয়ের বন্ধন, সে হলো স্বামী। আর দূর্বল হলো এদিক থেকে যে, যদি স্বামী উদ্দেশ্য হয় তবে ক্ষমা কিভাবে করা হবে? মাহর দেয়া তো তার উপর ওয়াজিব। সে কিভাবে ক্ষমা করতে পারে? তবে ইবন জারীর রাহিমাহুল্লাহ এ মতের সমর্থন করেছেন এবং যুক্তি দিয়েছেন যে- ক) স্বামীর হাতেই মূলতঃ বিয়ের বন্ধন। স্ত্রীর অভিভাবকের হাতে নেই। খ) স্বামীর পক্ষ থেকে ক্ষমার অর্থ হলো এই যে, তারা পূর্বকালে পূর্ণ মাহর আদায় করেই বিয়ে করত, তারপর বিয়ে ভঙ্গ হলে স্বামী বাকী অর্ধেক মাহর ফিরিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে ক্ষমার দৃষ্টান্ত দেখাতো।


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (২৩৭) যদি স্পর্শ করার পূর্বে স্ত্রীদের তালাক দাও, অথচ মোহর পূর্বেই ধার্য করে থাক, তাহলে নির্দিষ্ট মোহরের অর্ধেক আদায় করতে হবে।[1] কিন্তু যদি স্ত্রী অথবা যার হাতে বিবাহ-বন্ধন[2] সে যদি মাফ করে দেয়, (তাহলে স্বতন্ত্র কথা।) অবশ্য তোমাদের মাফ করে দেওয়াই আত্মসংযমের নিকটতর। তোমরা নিজেদের মধ্যে সহানুভূতি (ও মর্যাদার) কথা বিস্মৃত হয়ো না। নিশ্চয় তোমরা যা কর, আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা।


তাফসীর:

[1] এখানে আর এক নিয়মের কথা বলা হচ্ছে, সহবাসের পূর্বে তালাক দিয়ে দিয়েছে, কিন্তু মোহর নির্ধারিত ছিল। এমতাবস্থায় স্বামীর জন্য জরুরী হল অর্ধেক মোহর আদায় করা। কিন্তু স্ত্রী যদি তার মোহরের অধিকার মাফ করে দেয়, তাহলে স্বামীকে কিছুই দিতে হবে না।

[2] এ থেকে স্বামীকে বুঝানো হয়েছে। কারণ, বিবাহের বন্ধন (অটুট রাখা না রাখার এখতিয়ার) তার হাতেই। সে অর্ধেক মোহর মাফ করে দেয়। অর্থাৎ, আদায়কৃত মোহর থেকে অর্ধেক মোহর ফিরিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে নিজের এ অধিকার (অর্ধেক মোহর) মাফ করে দিয়ে সম্পূর্ণ মোহর স্ত্রীকে দিয়ে দেয়। এরপর পারস্পরিক সহানুভূতি ও অনুগ্রহের কথা বিস্মৃত না হওয়ার তাকীদ করে মোহরের অধিকারেও এই সহানুভূতি ও অনুগ্রহ প্রদর্শনের উপর অনুপ্রাণিত করা হয়েছে।

দ্রষ্টব্যঃ কেউ কেউ {بِيَدِهِ عُقْدَةُ النِّكَاحِ} (যার হাতে বিবাহ-বন্ধন) থেকে মহিলার অভিভাবককে বুঝিয়েছেন। অর্থাৎ, মহিলা নিজে মাফ করে দিক অথবা তার অভিভাবক মাফ করে দিক। কিন্তু এ অর্থ সঠিক নয়। কারণ, প্রথমতঃ অভিভাবকের হাতে বিবাহের বন্ধন নেই। দ্বিতীয়তঃ মোহর মহিলার নিজসব অধিকার ও তার ব্যক্তিগত সম্পদ, তাই এটা মাফ করার অধিকার অভিভাবকের নেই। সুতরাং পূর্বের অর্থই সঠিক। (ফাতহুল ক্বাদীর)

জরুরী বিশ্লেষণঃ তালাকপ্রাপ্তা মহিলারা চার ধরনের। (ক) যার মোহর নির্ধারিত, স্বামী তার সাথে সহবাসও করেছে, তাকে তার মোহরের সম্পূর্ণ অধিকার দেওয়া হবে। যেমন, ২২৯নং আয়াতে এর বর্ণনা রয়েছে। (খ) মোহরও নির্ধারিত নেই এবং তার সাথে সহবাসও করা হয়নি, তাকে কেবল কিছু খরচপত্র দেওয়া হবে। (গ) মোহর নির্ধারিত, কিন্তু সহবাস হয়নি, তাকে অর্ধেক মোহর দেওয়া জরুরী। (উভয়ের ব্যাখ্যা ২৩৬-২৩৭ নং আয়াতে বিদ্যমান।) (ঘ) মোহর নির্ধারিত নেই, কিন্তু সহবাস করা হয়েছে, তার জন্য রয়েছে মোহরে মিসল। অর্থাৎ, এই মহিলার সমাজে যে পরিমাণ মোহরের প্রচলন আছে অথবা তার মত মহিলাদের সাধারণতঃ যে পরিমাণ মোহর দেওয়া হয়, তাকেও সে পরিমাণ মোহর দিতে হবে। (নাইনুল আওত্বার ও আ’উনুল মা’বুদ)


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ২৩৬-২৩৭ নং আয়াতের তাফসীর:



দৈহিক সম্পর্ক ও মোহরানা ধার্য করার পূর্বে স্ত্রীকে তালাক দেয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে। দৈহিক সম্পর্ক ও মোহরানা ধার্য করার পূর্বে স্ত্রীকে তালাক দিলে তার কোন মোহর দিতে হবে না। শুধু কিছু খরচ দিলেই চলবে। এ খরচ প্রত্যেক স্বামী তার সামর্থ্য অনুযায়ী প্রদান করবে।



সকল প্রকার তালাকপ্রাপ্তা নারীকে কি খরচ দিতে হবে? না শুধু যে স্ত্রীর সাথে দৈহিক সম্পর্ক হয়নি এবং মোহরানাও ধার্য করা হয়নি তাকে দিতে হবে। এ বিষয়ে তিনটি মত পাওয়া যায়। ইবনু কাসীর (রহঃ) স্বীয় তাফসীরে এ তিনটি মত উল্লেখ করেছেন। (তাফসীর ইবনে কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর)। সঠিক কথা হলো: কেবল সেসব স্ত্রীদের খরচ দিতে হবে, যাদের মোহরানা ধার্য করা হয়নি এবং দৈহিক সম্পর্কও হয়নি। তবে কতক আলেম সকল তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীদেরকে খরচ দেয়া মুস্তাহাব বলেছেন।



পরের আয়াতে সেসব স্ত্রীদের কথা বলা হয়েছে যাদের সাথে দৈহিক সম্পর্ক হয়নি কিন্তু মোহর ধার্য করা হয়েছে। এমতাবস্থায় তাদেরকে তালাক দিলে ধার্যকৃত মোহরের অর্ধেক দিতে হবে। যদি স্ত্রী মাফ করে দেয় তাহলে স্বামী দিতে বাধ্য নয়।



(بِیَدِھ۪ عُقْدَةُ النِّکَاحِ)



‘যার হাতে বিয়ের বন্ধন’দ্বারা স্বামী উদ্দেশ্য, না স্ত্রীর অভিভাবক উদ্দেশ্য- এ নিয়ে দু’টি মত পাওয়া যায়। তবে সঠিক কথা হলো স্বামী উদ্দেশ্য। কারণ বিবাহ বিচ্ছিন্ন করতে পারে একমাত্র স্বামী, স্ত্রীর অভিভাবকরা নয়। এ ছাড়াও স্ত্রীর অভিভাবকরা স্ত্রীর কোন সম্পদ কাউকে দান বা মাফ করে দেয়ার অধিকার রাখেনা।



তালাকপ্রাপ্তা মহিলা চার প্রকার:



১. যার মোহর নির্ধারিত, স্বামী তার সাথে দৈহিক সম্পর্কও করেছে, তাকে ধার্যকৃত সম্পূর্ণ মোহর দিতে হবে।

২. যার মোহর নির্ধারিত হয়নি এবং তার সাথে দৈহিক সম্পর্কও হয়নি তাহলে তাকে কেবল কিছু খরচ দিলেই হবে।

৩. যার মোহর নির্ধারিত, কিন্তু দৈহিক সম্পর্ক হয়নি তাহলে তাকে অর্ধেক মোহর দিতে হবে।

৪. যার মোহর নির্ধারিত করা হয়নি। কিন্তু দৈহিক সম্পর্ক হয়েছে তার জন্য মোহর মিসাল দিতে হবে।



আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. তালাকপ্রাপ্তা চার প্রকার মহিলার অবস্থা জানতে পারলাম।

২. মহিলা স্বামীর কাছ থেকে প্রাপ্ত মোহর মাফ করে দিতে পারে। কিন্তু জোর করে মাফ করে নেয়া যাবে না।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: এই পবিত্র আয়াতের মধ্যে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়েছে যে, পূর্ব আয়াতে যে সব নারীর জন্যে মাতআ' নির্দিষ্ট করা হয়েছিল তারা শুধুমাত্র ঐসব নারী যাদের বর্ণনা ঐ আয়াতে ছিল। কেননা, এই আয়াতে এই বর্ণনা রয়েছে যে, সহবাসের পূর্বে যখন তালাক দেয়া হবে এবং মোহর নির্দিষ্ট থাকবে, তখন তাদেরকে অর্ধেক মোহর দিতে হবে। যদি এখানেও এই অর্ধেক মোহর ছাড়া কোন মাতআ ওয়াজিব হতো তবে অবশ্যই তা বর্ণনা করা হতো। কেননা, দু’টি আয়াতের দু'টি অবস্থাকে একের পর এক বর্ণনা করা হচ্ছে। এই আয়াতে বর্ণিত অবস্থার উপর ভিত্তি করে অর্ধমোহরের উপর আলেমদের ইজমা হয়েছে। কিন্তু তিনজনের মতে পূর্ণ মোহর ঐ সময় দিতে হবে যখন খালওয়াত’ হবে। অর্থাৎ যখন স্বামী-স্ত্রী কোন নির্জন ঘরে একত্রিত হয়েছে। এই অবস্থায় সহবাস না হলেও পূর্ণ মোহরই দিতে হবে। ইমাম শাফিঈরও (রঃ) প্রথম উক্তি এটাই। কিন্তু ইমাম শাফিঈ (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, এই অবস্থাতেও শুধু অর্ধ মোহরই দিতে হবে।

ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেনঃ “আমিও এটাই বলি এবং আল্লাহর কিতাবের প্রকাশ্য শব্দ দ্বারাও এটাই বুঝা যায়।' ইমাম বায়হাকী (রঃ) বলেনঃ “এই বর্ণনার একজন বর্ণনাকারী লায়েস বিন আবি সালেমের বর্ণনা গ্রহণযোগ্য নয়। বটে, কিন্তু ইবনে আবি তালহা (রঃ) হতে হযরত ইবনে আব্বাসের (রাঃ) এই বর্ণনাটি বর্ণিত আছে। এর দ্বারা বুঝা যায় যে, এটা তারই উক্তি।'

অতঃপর আল্লাহ পাক বলেন-এই অবস্থায় যদি স্ত্রীরা স্বেচ্ছায় তাদের অর্ধেক মোহর মাফ করে দেয় তবে এটা অন্য কথা। এই স্বামীর সবই মাফ হয়ে যাবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ সায়্যেবা' (যার কুমারীত্ব নষ্ট হয়ে গেছে) স্ত্রী যদি নিজের প্রাপ্য ছেড়ে দেয় তবে এ অধিকার তার রয়েছে।' এটাই বহু তাবেঈ তাফসীরকারীর উক্তি। মুহাম্মদ বিন কা'ব কারাযী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ স্ত্রীদের মাফ করে দেয়া নয়, বরং পুরুষদের মাফ করে দেয়া। অর্থাৎ পুরুষ তাদের অর্ধেক অংশ ছেড়ে দিয়ে যদি পূর্ণ মোহরই দিয়ে দেয় তবে তারও এ অধিকার রয়েছে। কিন্তু এ উক্তিটি খুবই বিরল। এই উক্তি আর কারও নেই।

এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-বা ঐ ব্যক্তি ক্ষমা করবে যার হাতে বিবাহ বন্ধন রয়েছে। একটি হাদীসে রয়েছে যে, এর দ্বারা স্বামীকে বুঝানো হয়েছে। হযরত আলী (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়ঃ এর দ্বারা কি স্ত্রীদের অভিভাবকগণকে বুঝানো হয়েছে: তিনি বলেনঃ না, বরং এর দ্বারা স্বামীকে বুঝানো হয়েছে। আরও বহু মুফাসসির হতে এটাই বর্ণিত হয়েছে। ইমাম শাফিঈর (রঃ) নতুন উক্তি এটাই। এটাই ইমাম আবু হানীফা (রঃ) প্রভৃতি মনীষীরও মাযহাব। কেননা, প্রকৃতপক্ষে বিয়ে ঠিক রাখা বা ভেঙ্গে দেয়া ইত্যাদি সবকাজই স্বামীর অধিকারে রয়েছে। তা ছাড়া অভিভাবক যার অভিভাবকত্ব করছে তার সম্পদ কাউকে প্রদান করা যেমন তার জন্যে বৈধ নয়, অনুরূপভাবে তার মোহর মাফ করে দেয়ারও তার অধিকার নেই। এব্যাপারে দ্বিতীয় উক্তি এই যে, এর দ্বারা স্ত্রীর পিতা, ভ্রাতা এবং ঐসব লোককে বুঝানো হয়েছে যাদের অনুমতি ছাড়া তার বিয়ে হতে পারে না। ইবনে আব্বাস (রাঃ), আলকামা (রাঃ), হাসান বসরী (রঃ), আতা’ (রঃ) তাউস (রঃ), যুহরী (রঃ), রাবী'আ (রঃ), যায়েদ বিন আসলাম (রঃ), ইবরাহীম নাখঈ (রঃ), ইকরামা (রঃ) এবং মুহাম্মদ বিন সিরীন (রঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে।

ইমাম মালিক (রঃ) এবং ইমাম শাফিঈরও (রঃ) পূর্ব উক্তি এটাই। তাদের দলীল এই যে, ওলীই তো তাকে ঐ হকের হকদার করেছে। সুতরাং ঐ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করার তার পূর্ণ অধিকার রয়েছে, যদিও অন্য মালে হেরফের করার তার অধিকার নেই। ইকরামা (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা ক্ষমা করার অধিকার স্ত্রীকে দিয়েছেন। সে যদি কার্পণ্য ও মনের সংকীর্ণতা প্রকাশ করে তবে তার অভিভাবক ক্ষমা করতে পারে যদিও স্ত্রী বুদ্ধিমতী হয়। হযরত শুরাইহও (রঃ) এই কথাই বলেন। কিন্তু শাবী (রঃ) যখন অস্বীকার করেন তখন তিনি ঐ উক্তি হতে প্রত্যাবর্তন করেন এবং বলেন যে, সেটার ভাবার্থ স্বামী। এমন কি তিনি ঐ কথার উপর মুবাহালা করতেও প্রস্তুত ছিলেন।

অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“তোমাদের ক্ষমা করে দেয়াই ধর্মপ্রাণতার অতি নিকটবর্তী।' এর দ্বারা স্বামী স্ত্রী দু'জনকেই বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ উভয়ের মধ্যে উত্তম সেই যে নিজের প্রাপ্য ছেড়ে দেয় অর্থাৎ হয় স্ত্রীই তার অর্ধেক প্রাপ্যও তার স্বামীকে ছেড়ে দেবে অথবা স্বামী তার স্ত্রীর প্রাপ্য অর্ধেক মোহরের পরিবর্তে পূর্ণ মোহরই দিয়ে দেবে। অতঃপর বলা হচ্ছে-“তোমরা পরস্পরের উপকারকে যেন ভুলে যেও না। অর্থাৎ তাকে অকর্মণ্যরূপে ছেড়ে দিও না, বরং তার কার্যের সংস্থান করে দাও।

‘তাফসীরে ইবনে মিরদুওয়াই’-এর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জনগণের উপর এমন এক দংশনকারী যুগ আসবে যে, মু'মিনও তার হাতের জিনিস দাঁত দিয়ে ধরে নেবে এবং পরস্পরের অনুগ্রহের কথা ভুলে যাবে। অথচ আল্লাহ তা'আলার ঘোষণা রয়েছে- “তোমরা পরস্পরের অনুগ্রহের কথা ভুলে যেও না। নিকৃষ্টতম ঐ সমুদয় লোক যারা মুসলমানের অসহায়তা ও অভাবের সময় তার জিনিস সস্তা মূল্যে কিনে নেয়।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই ক্রয়-বিক্রয় নিষেধ করেছেন। তোমার কাছে মঙ্গল কিছু থাকলে তোমার ভাইকেও সেই মঙ্গল পৌছাও এবং তার ধ্বংসের কাজে অংশ নিও না। এক মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই। না তাকে কষ্ট দেবে, না তাকে মঙ্গল। হতে বঞ্চিত করবে।

হযরত আউন (রাঃ) হাদীসগুলো বর্ণনা করতেন এবং ক্রন্দন করতে থাকতেন। এমনকি তাঁর চোখের অশ্রুতে দাড়ি সিক্ত হয়ে যেতো। তিনি বলতেন : যখন আমি ধনীদের স্পর্শে থাকি তখন সদা মনে দুঃখ অনুভব করি। কেননা, যে দিকেই দৃষ্টি নিক্ষেপ করি সে দিকেই সবাইকে আমার চাইতে উত্তম পোষাকে, ভাল সুগন্ধিতে এবং চমৎকার সোয়ারীতে দেখতে পাই। তবে গরীবদের মজলিসে মনে বড় আনন্দ পাই। আল্লাহ পাকও ঐ কথাই বলেন যে, তোমরা একে অপরের উপকারের কথা ভুলে যেও না। কারও কাছে কোন ভিক্ষুক আসলে তাকে কিছু দিতে না পারলেও অন্ততঃ তার মঙ্গলের জন্যে প্রার্থনা করবে। জেনে রেখো যে, আল্লাহ তা'আলা তোমাদের কার্যাবলী প্রত্যক্ষ করছেন। তার কাছে তোমাদের কাজও তোমাদের অবস্থা উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে এবং অতি সত্ত্বরই তিনি প্রত্যেক অমঙ্গলকারীকে তার আমলের পূর্ণ প্রতিদান প্রদান করবেন।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।