আল কুরআন


সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 229)

সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 229)



হরকত ছাড়া:

الطلاق مرتان فإمساك بمعروف أو تسريح بإحسان ولا يحل لكم أن تأخذوا مما آتيتموهن شيئا إلا أن يخافا ألا يقيما حدود الله فإن خفتم ألا يقيما حدود الله فلا جناح عليهما فيما افتدت به تلك حدود الله فلا تعتدوها ومن يتعد حدود الله فأولئك هم الظالمون ﴿٢٢٩﴾




হরকত সহ:

اَلطَّلَاقُ مَرَّتٰنِ۪ فَاِمْسَاکٌۢ بِمَعْرُوْفٍ اَوْ تَسْرِیْحٌۢ بِاِحْسَانٍ ؕ وَ لَا یَحِلُّ لَکُمْ اَنْ تَاْخُذُوْا مِمَّاۤ اٰتَیْتُمُوْهُنَّ شَیْئًا اِلَّاۤ اَنْ یَّخَافَاۤ اَلَّا یُقِیْمَا حُدُوْدَ اللّٰهِ ؕ فَاِنْ خِفْتُمْ اَلَّا یُقِیْمَا حُدُوْدَ اللّٰهِ ۙ فَلَا جُنَاحَ عَلَیْهِمَا فِیْمَا افْتَدَتْ بِهٖ ؕ تِلْکَ حُدُوْدُ اللّٰهِ فَلَا تَعْتَدُوْهَا ۚ وَ مَنْ یَّتَعَدَّ حُدُوْدَ اللّٰهِ فَاُولٰٓئِکَ هُمُ الظّٰلِمُوْنَ ﴿۲۲۹﴾




উচ্চারণ: আত্তালা-কুমার রাতা-নি ফাইমছা-কুম বিমা‘রূফিন আও তাছরীহুম বিইহছা-নিওঁ ওয়ালা-ইয়াহিল্লুলাকুম আন তা’খুযূমিম্মা আ-তাইতুমূহুন্না শাইআন ইল্লাআইঁ ইয়াখাফা আল্লা-ইউকীমা-হুদূদাল্লা-হি ফাইন খিফতুম আল্লা-ইউকীমা-হুদাল্লা-হি ফালা-জুনা-হা ‘আলাইহিমা-ফীমাফতাদাতবিহী তিলকা হুদূদুল্লা-হি ফালা-তা‘তাদূ হা-ওয়ামাইইয়াতা‘আদ্দা হুদূদাল্লা-হি ফাউলাইকা হুমুজ্জা-লিমূন।




আল বায়ান: তালাক দু’বার। অতঃপর বিধি মোতাবেক রেখে দেবে কিংবা সুন্দরভাবে ছেড়ে দেবে। আর তোমাদের জন্য হালাল নয় যে, তোমরা তাদেরকে যা দিয়েছ, তা থেকে কিছু নিয়ে নেবে। তবে উভয়ে যদি আশঙ্কা করে যে, আল্লাহর সীমারেখায় তারা অবস্থান করতে পারবে না। সুতরাং তোমরা যদি আশঙ্কা কর যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা কায়েম রাখতে পারবে না তাহলে স্ত্রী যা দিয়ে নিজকে মুক্ত করে নেবে তাতে কোন সমস্যা নেই। এটা আল্লাহর সীমারেখা। সুতরাং তোমরা তা লঙ্ঘন করো না। আর যে আল্লাহর সীমারেখাসমূহ লঙ্ঘন করে, বস্তুত তারাই যালিম।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২২৯. তালাক দু’বার। অতঃপর (স্ত্রীকে) হয় বিধিমত রেখে দেওয়া, নতুবা সদয়ভাবে মুক্ত করে দেওয়া। আর তোমরা তোমাদের স্ত্রীদেরকে যা প্রদান করেছ তা থেকে কোন কিছু গ্রহণ করা তোমাদের পক্ষে হালাল নয়(১)। অবশ্য যদি তাদের উভয়ের আশংকা হয় যে, তারা আল্লাহ্‌র সীমারেখা রক্ষা করে চলতে পারবে না, তারপর যদি তোমরা আশংকা কর যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা রক্ষা করে চলতে পারবে না, তবে স্ত্রী কোন কিছুর বিনিময়ে নিস্কৃতি পেতে চাইলে তাতে তাদের কারো কোন অপরাধ নেই(২)। এ সব আল্লাহর সীমারেখা সুতরাং তোমরা এর লংঘন করো না। আর যারা আল্লাহর সীমারেখা লংঘন করে তারাই যালিম।




তাইসীরুল ক্বুরআন: তালাক দুই দফা, অতঃপর হয় ভালভাবে পুনঃ গ্রহণ কিংবা সদ্ব্যবহার সহকারে বিদায় দান এবং তোমাদের পক্ষে তাদেরকে দেয়া মালের কিছুই ফিরিয়ে নেয়া জায়িয হবে না, কিন্তু যদি তারা উভয়ে আশঙ্কা করে যে তারা আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা রক্ষা করে চলতে পারবে না (তাহলে অন্য ব্যবস্থা)। অতঃপর যদি তোমরা (উভয় পক্ষের শালিসগণ) আশঙ্কা কর যে উভয়পক্ষ আল্লাহর আইনসমূহ ঠিক রাখতে পারবে না, তাহলে উভয়ের প্রতি কোন গুনাহ নেই যদি কোন কিছুর বিনিময়ে স্ত্রী নিজেকে মুক্ত করতে চায়। এগুলো আল্লাহর আইন, কাজেই তোমরা এগুলোকে লঙ্ঘন করো না, আর যারা আল্লাহর আইনসমূহ লঙ্ঘন করবে, তারাই যালিম।




আহসানুল বায়ান: (২২৯) এ তালাক দু’বার,[1] অতঃপর স্ত্রীকে হয় বিধিসম্মতভাবে রাখবে[2] অথবা সদ্ভাবে বিদায় দেবে।[3] আর স্ত্রীগণকে দেওয়া কোন কিছু ফেরৎ নেওয়া তোমাদের পক্ষে বৈধ নয়; তবে যদি তাদের উভয়ের আশংকা হয় যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা রক্ষা করে চলতে পারবে না। সুতরাং তোমরা যদি আশংকা কর যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা (বাস্তবিকই) রক্ষা করে চলতে পারবে না, তাহলে (সে অবস্থায়) স্ত্রী কোন কিছুর বিনিময়ে (স্বামী থেকে) নিক্ককৃতি পেতে চাইলে তাতে (স্বামী-স্ত্রীর) ‎কারো কোন পাপ নেই।[4] এ সব আল্লাহর সীমারেখা। অতএব তা তোমরা লংঘন করো না। আর যারা আল্লাহর (নির্দিষ্ট) সীমারেখা লংঘন করে, তারাই অত্যাচারী।



মুজিবুর রহমান: তালাক দুইবার; অতঃপর (স্ত্রীকে) হয় বিহিতভাবে রাখতে হবে অথবা সদ্ভাবে পরিত্যাগ করতে হবে; আর নিজেদের দেয় সম্পদ থেকে কিছু ফিরিয়ে নেয়া তোমাদের জন্য জায়েয নয় স্ত্রীদের কাছ থেকে, যদি উভয়ে আশংকা করে যে, তারা আল্লাহর সীমা স্থির রাখতে পারবেনা। অনন্তর তোমরা যদি আশংকা কর যে, আল্লাহর নির্দেশ ঠিক রাখতে পারবেনা, সেই অবস্থায় স্ত্রী নিজের মুক্তি লাভের জন্য কিছু বিনিময় দিলে তাতে উভয়ের কোন দোষ নেই; এগুলি হচ্ছে আল্লাহর সীমাসমূহ। অতএব তা অতিক্রম করনা এবং যারা আল্লাহর সীমা অতিক্রম করে বস্তুতঃ তারাই অত্যাচারী।



ফযলুর রহমান: (বিধানসম্মত) তালাক হল দুইবার। এরপর (স্ত্রীকে) হয় যথোচিতভাবে ধরে রাখতে হবে, না হয় ভালোয় ভালোয় ছেড়ে দিতে হবে। আর তোমরা তাদেরকে যা যা দিয়েছো তা থেকে কিছুই নিয়ে নেওয়া তোমাদের জন্য বৈধ নয়; তবে যদি (স্বামী-স্ত্রী) দুজনে আল্লাহর সীমারেখা (বিধান) ঠিক রাখতে না পারার আশঙ্কা করে তাহলে ভিন্ন কথা। তাই তোমরা যদি আশঙ্কা করো যে, তারা দুজনে আল্লাহর সীমারেখা ঠিক রাখতে পারবে না তাহলে স্ত্রী নিজেকে মুক্ত করতে (স্বামীকে) কিছু বিনিময় দিলে তাতে দুজনের কারো পাপ হবে না। এগুলো আল্লাহর সীমারেখা; তোমরা এগুলো লংঘন করো না। যারা আল্লাহর সীমারেখা লংঘন করে তারাই জালেম।



মুহিউদ্দিন খান: তালাকে-‘রাজঈ’ হ’ল দুবার পর্যন্ত তারপর হয় নিয়মানুযায়ী রাখবে, না হয় সহৃদয়তার সঙ্গে বর্জন করবে। আর নিজের দেয়া সম্পদ থেকে কিছু ফিরিয়ে নেয়া তোমাদের জন্য জায়েয নয় তাদের কাছ থেকে। কিন্তু যে ক্ষেত্রে স্বামী ও স্ত্রী উভয়েই এ ব্যাপারে ভয় করে যে, তারা আল্লাহর নির্দেশ বজায় রাখতে পারবে না, অতঃপর যদি তোমাদের ভয় হয় যে, তারা উভয়েই আল্লাহর নির্দেশ বজায় রাখতে পারবে না, তাহলে সেক্ষেত্রে স্ত্রী যদি বিনিময় দিয়ে অব্যাহতি নিয়ে নেয়, তবে উভয়ের মধ্যে কারোরই কোন পাপ নেই। এই হলো আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সীমা। কাজেই একে অতিক্রম করো না। বস্তুতঃ যারা আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করবে, তারাই জালেম।



জহুরুল হক: তালাক দুইবার, তারপর পুরোদস্তুর রক্ষণ নয়ত সুন্দরভাবে বিদায় দান। আর তোমাদের জন্য বৈধ নয় তাদের যা দিয়েছ তা থেকে কিছু ফিরিয়ে নেয়া, যদি না দুজনেই আশঙ্কা করে যে আল্লাহ্‌র নির্দেশিত সীমা কায়েম রাখা তাদের পক্ষে সম্ভবপর নয়। কিন্তু তোমরা যদি আশঙ্কা কর যে তারা আল্লাহ্‌র গন্ডির ভেতরে কায়েম থাকতে পারবে না, তা হলে তাদের জন্যে অপরাধ হবে না যার বিনিময়ে সে মুক্ত হতে চায়। এইসব হচ্ছে আল্লাহ্‌র নির্দেশিত গন্ডি, অতএব এ-সব লঙ্ঘন করো না, আর যারা আল্লাহ্‌র গন্ডি লঙ্ঘন করে তারা নিজেরাই হচ্ছে অন্যায়কারী।



Sahih International: Divorce is twice. Then, either keep [her] in an acceptable manner or release [her] with good treatment. And it is not lawful for you to take anything of what you have given them unless both fear that they will not be able to keep [within] the limits of Allah. But if you fear that they will not keep [within] the limits of Allah, then there is no blame upon either of them concerning that by which she ransoms herself. These are the limits of Allah, so do not transgress them. And whoever transgresses the limits of Allah - it is those who are the wrongdoers.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ২২৯. তালাক দু’বার। অতঃপর (স্ত্রীকে) হয় বিধিমত রেখে দেওয়া, নতুবা সদয়ভাবে মুক্ত করে দেওয়া। আর তোমরা তোমাদের স্ত্রীদেরকে যা প্রদান করেছ তা থেকে কোন কিছু গ্রহণ করা তোমাদের পক্ষে হালাল নয়(১)। অবশ্য যদি তাদের উভয়ের আশংকা হয় যে, তারা আল্লাহ্–র সীমারেখা রক্ষা করে চলতে পারবে না, তারপর যদি তোমরা আশংকা কর যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা রক্ষা করে চলতে পারবে না, তবে স্ত্রী কোন কিছুর বিনিময়ে নিস্কৃতি পেতে চাইলে তাতে তাদের কারো কোন অপরাধ নেই(২)। এ সব আল্লাহর সীমারেখা সুতরাং তোমরা এর লংঘন করো না। আর যারা আল্লাহর সীমারেখা লংঘন করে তারাই যালিম।


তাফসীর:

(১) অর্থাৎ তালাকের পরিবর্তে তোমাদের দেয়া অর্থ-সম্পদ বা মাহর ফেরত নেয়া হালাল নয়। কোন কোন অত্যাচারী স্বামী স্ত্রীকে রাখতেও চায় না, আবার তার অধিকার আদায় করারও কোন চিন্তা করে না, আবার তালাকও দেয় না। এতে স্ত্রী যখন অতিষ্ট হয়ে পড়ে, সেই সুযোগ নিয়ে স্ত্রীর নিকট থেকে কিছু অর্থকড়ি আদায় করার বা মাহর মাফ করিয়ে নেয়ার বা ফেরত নেয়ার দাবী করে বসে। কুরআনুল কারীম এ ধরনের কাজকে হারাম ঘোষণা করেছে।


(২) অবশ্য একটি ব্যাপারে তা থেকে স্বতন্ত্র্য ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যাতে মাহর ফেরত নেয়া বা ক্ষমা করিয়ে নেয়া যেতে পারে। তা হচ্ছে এই যে, যদি স্ত্রী এমন অনুভব করে যে, মনের গরমিলের দরুন আমি স্বামীর হক আদায় করতে পারিনি এবং স্বামী যদি তাই বুঝে, তবে এমতাবস্থায় মাহর ফেরত নেয়া বা ক্ষমা করিয়ে নেয়া এবং এর পরিবর্তে তালাক নেয়া জায়েয হবে। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বর্ণিত যে, সাবেত ইবনে কাইসের স্ত্রী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বললঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! সাবেত ইবনে কাইসের দ্বীনদারী এবং চরিত্রের উপর আমার কোন অভিযোগ নেই; কিন্তু আমি মুসলিম হয়ে কুফরী করাটা মোটেও পছন্দ করি না। (তাদের উভয়ের সম্পর্কে অমিল ছিল) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তুমি কি তাকে (স্বামীকে)-মাহর হিসেবে তোমাকে যে বাগান দিয়েছিল-তা ফিরিয়ে দেবে? সে বলল, হ্যাঁ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাবেত রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে বললেন, বাগানটি ফেরত নিয়ে তাকে এক তালাক দিয়ে দাও। [বুখারীঃ ৫২৭৩]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (২২৯) এ তালাক দু’বার,[1] অতঃপর স্ত্রীকে হয় বিধিসম্মতভাবে রাখবে[2] অথবা সদ্ভাবে বিদায় দেবে।[3] আর স্ত্রীগণকে দেওয়া কোন কিছু ফেরৎ নেওয়া তোমাদের পক্ষে বৈধ নয়; তবে যদি তাদের উভয়ের আশংকা হয় যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা রক্ষা করে চলতে পারবে না। সুতরাং তোমরা যদি আশংকা কর যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা (বাস্তবিকই) রক্ষা করে চলতে পারবে না, তাহলে (সে অবস্থায়) স্ত্রী কোন কিছুর বিনিময়ে (স্বামী থেকে) নিক্ককৃতি পেতে চাইলে তাতে (স্বামী-স্ত্রীর) কারো কোন পাপ নেই।[4] এ সব আল্লাহর সীমারেখা। অতএব তা তোমরা লংঘন করো না। আর যারা আল্লাহর (নির্দিষ্ট) সীমারেখা লংঘন করে, তারাই অত্যাচারী।


তাফসীর:

[1] অর্থাৎ, সেই তালাক, যে তালাকে স্বামীর (ইদ্দতের মধ্যে) স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়ার অধিকার থাকে, তার সংখ্যা হল দুই। প্রথমবার তালাক দেওয়ার পর এবং দ্বিতীয়বার তালাক দেওয়ার পরও ফিরিয়ে নেওয়া যায়। তৃতীয়বার তালাক দেওয়ার পর ফিরিয়ে নেওয়ার অনুমতি নেই। জাহেলিয়াতে তালাকের ও ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে কোন নির্ধারিত সময়-সীমা ছিল না। ফলে নারীর উপর বড়ই যুলুম হত। মানুষ বার বার স্বীয় স্ত্রীকে তালাক দিয়ে আবার ফিরিয়ে নিত। এইভাবে না তাকে নিয়ে সঠিকভাবে সংসার করত, আর না তাকে মুক্ত করত। মহান আল্লাহ এই যুলুমের পথ বন্ধ করে দিলেন। পরন্তু প্রথমবার ও দ্বিতীয়বারে চিন্তা-ভাবনা করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করেননি। তা না হলে যদি প্রথম তালাকেই চির দিনের জন্য বিচ্ছেদের নির্দেশ দিতেন, তাহলে এ থেকে পারিবারিক যে সব সমস্যার সৃষ্টি হত, তা কল্পনাতীত। তাছাড়া মহান আল্লাহ (طَلْقَتَانِ) (দু’তালাক) বলেননি, বরং বলেছেন, (الطَّلاَقُ مَرَّتَانِ) (তালাক দু’বার)। এ থেকে ইঙ্গিত করেছেন যে, একই সময়ে দুই বা তিন তালাক দেওয়া এবং তা কার্যকরী করা আল্লাহর হিকমতের পরিপন্থী। আল্লাহর হিকমতের দাবী হল, একবার তালাক দেওয়ার পর (তাতে ‘তালাক’ শব্দ একবার প্রয়োগ করুক বা একাধিকবার করুক) এবং অনুরূপ দ্বিতীয়বার তালাক দেওয়ার পর (তাতে ‘তালাক’ শব্দ একবার প্রয়োগ করুক বা একাধিকবার করুক) স্বামীকে চিন্তা-ভাবনা করার এবং ত্বরান্বিত ও রাগান্বিত অবস্থায় কৃত কর্ম সম্বন্ধে পুনর্বিবেচনা করার সুযোগ দেওয়া। আর এই হিকমত (যৌক্তিকতা) এক মজলিসে তিন তালাককে এক তালাক গণ্য করার মধ্যেই বিদ্যমান থাকে। একই সময়ে দেওয়া তিন তালাককে কার্যকরী করে দিয়ে চিন্তা-বিবেচনা করা ও ভুল সংশোধনের সুযোগ দেওয়া থেকে বঞ্চিত করে দিলে সেই হিকমত অবশিষ্ট থাকে না। (আরো বিস্তারিত জানার জন্য নিম্নের বইগুলো দ্রষ্টব্যঃ ‘মাজমূআহ মাক্বালাত ইলমিয়াহ’-এক মজলিসে তিন তালাক- এবং ‘ইখতিলাফে উম্মাহ আওর সিরাতে মুস্তাক্বীম’) এ কথাও জেনে রাখা দরকার যে, বহু উলামা এক মজলিসে দেওয়া তিন তালাককে কার্যকরী হয়ে যাওয়ার ফতওয়া দিয়ে থাকেন।

[2] অর্থাৎ, তালাক প্রত্যাহার করে নিয়ে তার সাথে ভালভাবে সাংসারিক জীবন-যাপন করবে।

[3] অর্থাৎ, তৃতীয়বার তালাক দেওয়ার পর।

[4] এখানে খুলা’ (খোলা তালাকের) কথা বলা হচ্ছে। অর্থাৎ, স্ত্রী স্বামী থেকে পৃথক হতে চাইলে, স্বামী তার স্ত্রীকে দেওয়া মোহরানা ফিরিয়ে নিতে পারে। স্বামী যদি স্ত্রীকে পৃথক করে দিতে না চায়, তাহলে আদালত স্বামীকে তালাক দেওয়ার নির্দেশ দেবে। এতেও যদি সে না মানে, তবে আদালত তাদের বিবাহ বানচাল ঘোষণা করবে। অর্থাৎ, খুলা’ তালাকের মাধ্যমেও হতে পারে এবং বিবাহ বানচালের মাধ্যমেও হতে পারে। উভয় অবস্থাতেই স্ত্রীর ইদ্দত কেবল এক মাসিক। (আবূ দাউদ, তিরমিযী, নাসায়ী, হাকেম, ফাতহুল ক্বাদীর) মহিলাকে এই অধিকার দেওয়ার সাথে সাথে এ কথার উপরেও শক্ত তাকীদ করা হয়েছে যে, কোন উপযুক্ত কারণ ছাড়া সে যেন তার স্বামীর কাছে তালাক কামনা না করে। যদি সে এ রকম (অকারণে তালাক কামনা) করে, তাহলে নবী করীম (সাঃ) এই ধরনের নারীর জন্য কঠিন শাস্তির কথা ঘোষণা করে বলেছেন যে, সে জান্নাতের সুগন্ধও পাবে না। (ইবনে কাসীর ইত্যাদি)


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ২২৯ ও ২৩০ নং আয়াতের তাফসীর:



তালাকের পরিচয়:



তালাক অর্থ বন্ধন মুক্ত করা, ছেড়ে দেয়া। শরীয়তের পরিভাষায় তালাক বলা হয়- তালাক ও অনুরূপ শব্দ দ্বারা বিবাহ বন্ধন ছিন্ন করা।



তালাকের শর্তসমূহ:



প্রাপ্ত বয়স্ক স্বামী তার বৈধ স্ত্রীকে সুস্থ বিবেকে তালাক ও অনুরূপ শব্দ দ্বারা বিবাহ বিচ্ছেদ করবে। স্বামীকে যদি তালাক দিতে বাধ্য করা হয় অথবা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় তালাক দেয় তাহলে তালাক হবে না।



তালাক দু’প্রকার:



(১) স্ত্রীর সাথে দৈহিক সম্পর্ক হয়েছে এমন স্ত্রীকে ঐ পবিত্র অবস্থায় তালাক দেয়া যে পবিত্র অবস্থায় দৈহিক সম্পর্ক হয়নি। এটাই হলো সুন্নাতী পদ্ধতি।



(২) যে পবিত্র অবস্থায় দৈহিক সম্পর্ক হয়েছে অথবা ঋতু অবস্থায় তালাক দেয়াকে বিদআতী তালাক বলা হয়। এরূপ অবস্থায় তালাক দিলে তালাক কার্যকর হবে না। (সহীহ বুখারী হা: ৫২৫১)



(الطَّلَاقُ مَرَّتَانِ)



‘তালাক দু’বার’বলতে সে তালাককে বুঝানো হয়েছে যে তালাকে স্বামী ইদ্দতের মধ্যে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়ার অধিকার রাখে। আর তার সংখ্যা দু’টি। প্রথমবার এবং দ্বিতীয়বার তালাক দেয়ার পরও স্বামী তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারবে। তবে তৃতীয়বার তালাক দিলে ফিরিয়ে নেয়ার সুযোগ থাকে না।



জাহিলী যুগে তালাক দেয়া ও ফিরিয়ে নেয়ার কোন নির্ধারিত সময়সীমা ছিল না। ফলে নারীর ওপর অত্যাচার করা হত। মানুষ বার বার স্ত্রীকে তালাক দিত আবার মন চাইলে ফিরিয়ে নিত। এভাবে না তাকে রাখত, না ছেড়ে দিত।



আল্লাহ তা‘আলা নারীদের ওপর জুলুমের এ পথ বন্ধ করে দিলেন। অপর পক্ষে প্রথমবার ও দ্বিতীয়বারে চিন্তা-ভাবনা করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করেননি। তা না হলে যদি প্রথম তালাকেই চির দিনের জন্য বিচ্ছেদের নির্দেশ দিতেন, তাহলে এ থেকে পারিবারিক যেসব সমস্যার সৃষ্টি হত তা কল্পনাতীত। অনেক স্বামী রাগবশতঃ তালাক দিয়ে দেয়, পরে অনুধাবন করতে পারে। সেজন্য আল্লাহ তা‘আলা দ্বিতীয়বার পর্যন্ত স্বামীদের চিন্তা করার সুযোগ দিয়েছেন।



তাছাড়া আল্লাহ তা‘আলা (طلقتان) (দু’তালাক) বলেননি বরং বলেছেন:



(الطَّلَاقُ مَرَّتَانِ)



তালাক দুইবার। এর দ্বারা বুঝা যায়, একই সময়ে দুই বা তিন তালাক দেয়া এবং তা কার্যকরী করা আল্লাহ তা‘আলার হিকমতের পরিপন্থী। আল্লাহ তা‘আলার হিকমতের দাবি হল- একবার তালাক দেয়ার পর প্রথম মাসিক ইদ্দত পূর্ণ করবে এমতাবস্থায় চিন্তা-ভাবনা করবে ফিরিয়ে নেয়া যায় কিনা। যদি ফিরিয়ে না নেয় তারপর অনুরূপ দ্বিতীয় তালাক দেয়ার পর স্বামী চিন্তা ভাবনা করার এবং ত্বরান্বিত ও রাগান্বিত অবস্থায় কৃতকর্ম সম্বন্ধে পুনর্বিবেচনা করার সুযোগ পাবে। আর এ হিকমত এক মজলিসে তিন তালাককে এক তালাক গণ্য করার মধ্যেও বিদ্যমান থাকে। একই সময়ে দেয়া তিন তালাককে কার্যকরী করে দিলে চিন্তা-ভাবনা করার এবং ভুল সংশোধনের সুযোগ দেয়া থেকে বঞ্চিত করা হয় এবং হিকমাতও অবশিষ্ট থাকে না।



তারপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন- হয় তালাক প্রত্যাহার করে নিয়ে তার সাথে ভালভাবে সাংসারিক জীবন-যাপন করবে অথবা তৃতীয়বার তালাক দিয়ে সুন্দরভাবে বিদায় করে দেবে।



অতঃপর খোলা তালাকের কথা বলা হচ্ছে- খোলা তালাক হল স্ত্রী স্বামী থেকে পৃথক হতে চাইলে স্ত্রী তার স্বামী কর্তৃক প্রদত্ত মোহরানা ফিরিয়ে দেবে। তবে তা অবশ্যই শরীয়তসম্মত কোন কারণ থাকতে হবে। যেমন স্বামী সালাত আদায় করে না, স্ত্রীকে বেপর্দা হয়ে চলতে বাধ্য করে ইত্যাদি। এমতাবস্থায় স্বামী যদি স্ত্রীকে পৃথক করে দিতে না চায়, তাহলে আদালত স্বামীকে তালাক দিতে বাধ্য করবে। যদি তালাক না দেয় তাহলে বিবাহ বিচ্ছেদ করে দেবে। অর্থাৎ খোলা তালাকের মাধ্যমে হতে পারে বা বিবাহ বিচ্ছেদ করার মাধ্যমেও হতে পারে। উভয় অবস্থায় ইদ্দত হল এক মাস। (তিরমিযী হা: ১১৮৫, আবূ দাঊদ হা: ২২৩৯, সহীহ)



মহিলাকে এ অধিকার দেয়ার সাথে সাথে এ কথার ওপর শক্ত তাকীদ দেয়া হয়েছে যে, কোন উপযুক্ত কারণ ছাড়া সে যেন তার স্বামীর কাছে তালাক কামনা না করে। যদি সে রকম হয় তাহলে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:



أَيُّمَا امْرَأَةٍ سَأَلَتْ زَوْجَهَا طَلاَقًا فِي غَيْرِ مَا بَأْسٍ فَحَرَامٌ عَلَيْهَا رَائِحَةُ الْجَنَّةِ



যে মহিলা তার স্বামীর কাছে কোন সমস্যা ছাড়া তালাক চাইবে তার জন্য জান্নাতের সুগন্ধি পর্যন্ত হারাম। (তিরমিযী হা: ১১৮৭, আবূ দাঊদ হা: ২২২৬, সহীহ)



তারপর ২৩০ নং আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা তৃতীয় তালাকের আলোচনা করেছেন। তৃতীয় তালাক দেয়ার পর স্বামী স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনতে পারবে না, আর পুনরায় বিবাহও করতে পারবে না। তবে হ্যাঁ, স্ত্রী যদি অন্য কোন পুরুষের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়, সে পুরুষ স্বেচ্ছায় তাকে তালাক দেয় অথবা স্বামী মারা যায় আর মহিলা যদি প্রথম স্বামীর কাছে ফিরে যেতে চায় তাহলে ঐ প্রথম স্বামী বিবাহ করতে পারবে।



কিন্তু আমাদের দেশে তথাকথিত এক বৈঠকে তিন তালাককে তিন তালাক গণ্য করতঃ হারাম কৌশলের (হিল্লা পদ্ধতির) আশ্রয় গ্রহণ করে প্রথম স্বামীর জন্য বৈধ করে দেয়ার অপচেষ্টা চালায়। এ প্রথা সম্পূর্ণ হারাম। ইবনু মাসউদ (রাঃ) বলেন:



لَعَنَ رَسُوْلُ اللّٰهِ صَلَّي اللّٰهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْمُحَلَّ والمُحَلَلَ لَهُ



রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) লা‘নত করেছেন হিল্লাকারী ও যার জন্য হিল্লা করা হয় উভয় ব্যক্তিকে। (তিরমিযী হা: ৮৯৩-৯৪, মিশকাত হা: ৩২৯৬-৯৭, সহীহ)



এ পরিকল্পিত অবৈধ বিবাহের মাধ্যমে মহিলা প্রথম স্বামীর জন্য বৈধ হবে না। এসব আল্লাহ তা‘আলার নির্ধারিত সীমারেখা; অতএব কেউ যেন সীমালঙ্ঘন না করে।



আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. এক শব্দে বা এক বৈঠকে তিন তালাক দেয়া বিদআত, যা বৈধ নয়।

২. এক বৈঠকে তিন তালাক দিলে এক তালাক বলে গণ্য হবে।

৩. তিন তুহুরে অর্থাৎ তিন পবিত্রাবস্থায় সঠিকভাবে তিন তালাক দিলে স্ত্রী স্বামীর জন্য হারাম।

৪. খোলা তালাক শরীয়তসম্মত। তবে তা ন্যায়সঙ্গত কারণে হতে হবে।

৫. হিল্লা বিবাহ হারাম, যে করে এবং যার জন্য করা হয় উভয়ে অভিশপ্ত।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ২২৯-২৩০ নং আয়াতের তাফসীর

ইসলামের পূর্বে প্রথা ছিল এই যে, স্বামী যত ইচ্ছা স্ত্রীকে তালাক দিতো এবং ইদ্দতের মধ্যে ফিরিয়ে নিতো। ফলে স্ত্রীগণ সংকটপূর্ণ অবস্থায় পতিত হয়েছিল। স্বামী তাদেরকে তালাক দিতো এবং ইদ্দত অতিক্রান্ত হওয়ার নিকটবর্তী হতেই ফিরিয়ে নিতো। পুনরায় তালাক দিতো। কাজেই স্ত্রীদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। ইসলাম এই সীমা নির্ধারণ করে দেয় যে, এভাবে মাত্র দু'টি তালাক দিতে পারবে। তৃতীয় তালাকের পর ফিরিয়ে নেয়ার আর কোন অধিকার থাকবে না। সুনান-ই-আবু দাউদের মধ্যে এই অধ্যায় রয়েছে যে, তিন তালাকের পর স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়া রহিত হয়ে গেছে।

অতঃপর এই বর্ণনাটি উদ্ধৃত করা হয়েছে যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এটাই বলেন। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতীম' গ্রন্থে রয়েছে যে, এক ব্যক্তি স্বীয় স্ত্রীকে বলে-“আমি তোমাকে রাখবোও না এবং ছেড়েও দেবো না। স্ত্রী বলে : ‘কিরূপে:' সে বলে : তোমাকে তালাক দেবো এবং ইদ্দত শেষ হওয়ার সময় হলেই ফিরিয়ে নেবো। আবার তালাক দেবো এবং ইদ্দত শেষ হওয়ার পূর্বেই পুনরায় ফিরিয়ে নেবো। এরূপ করতেই থাকবো। ঐ স্ত্রীলোকটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে তার এই দুঃখের কথা বর্ণনা করে। তখন এই পবিত্র আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পর ঐলোকগুলো তালাকের প্রতি লক্ষ্য রাখতে আরম্ভ করে এবং শুধরে যায়। তৃতীয় তালাকের পর স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়ার স্বামীর কোন অধিকার থাকলো না এবং তাদেরকে বলা হলো দুই তালাক পর্যন্ত তোমাদের অধিকার রয়েছে যে, সংশোধনের উদ্দেশ্যে তোমরা তোমাদের স্ত্রীদেরকে ফিরিয়ে নেবে যদি তারা ইদ্দতের মধ্যে থাকে এবং তোমাদের এও অধিকার রয়েছে যে, তোমরা তাদের ইদ্দত অতিক্রান্ত হতে দেবে এবং তাদেরকে ফিরিয়ে নেবে না, যেন তারা নতুনভাবে বিয়ের যোগ্য হয়ে যায়। আর যদি তৃতীয় তালাক দেবারই ইচ্ছে কর তবে সত্তাবে তালাক দেবে। তাদের কোন হক নষ্ট করবে না, তাদের। উপর অত্যাচার করবে না এবং তাদের কোন ক্ষতি করবে না।

এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) ! এই আয়াতে দুই তালাকের কথাতো বর্ণিত হয়েছে, তৃতীয় তালাকের বর্ণনা কোথায় রয়েছে:' তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ(আরবি) অর্থাৎ ‘অথবা সভাবে পরিত্যাগ করতে হবে এর মধ্যে রয়েছে।' (২:২২৯) যখন তৃতীয় তালাক দেয়ার ইচ্ছে করবে তখন স্ত্রীকে তালাক গ্রহণে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে তার জীবন সংকটময় করা এবং তার প্রতি কঠোরতা অবলম্বন করা স্বামীর জন্যে একেবারে হারাম। যেমন কুরআন মাজীদের মধ্যে অন্য জায়গায় রয়েছে : ‘স্ত্রীদেরকে সংকটময় অবস্থায় নিক্ষেপ করো না এই উদ্দেশ্যে যে, তোমরা তাদেরকে প্রদত্ত্ব বস্তু হতে কিছু গ্রহণ করবে। তবে স্ত্রী যদি খুশী মনে কিছু দিয়ে তালাক প্রার্থনা করে তবে সেটা অন্য কথা। যেমন অন্যস্থানে রয়েছে।(আরবি)

অর্থাৎ “যদি তারা খুশী মনে তোমাদের জন্যে কিছু ছেড়ে দেয় তবে তা তোমরা বেশ তৃপ্তির সাথে ভক্ষণ কর।' (৪:৪) আর যখন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মতানৈক্য বেড়ে যায় এবং স্ত্রী স্বামীর প্রতি সন্তুষ্ট না থাকে ও তার হক আদায় করে, এরূপ অবস্থায় যদি সে তার স্বামীকে কিছু প্রদান করতঃ তালাক গ্রহণ করে তবে তার দেয়ায় এবং এর নেয়ায় কোন পাপ নেই। এটাও মনে রাখার বিষয় যে, যদি স্ত্রী বিনা কারণে তার স্বামীর নিকট ‘খোলা’ তালাক প্রার্থনা করে তবে সে অত্যন্ত পাপীনী হবে।

জামেউত্ তিরমিযী প্রভৃতির হাদীসে রয়েছে যে, যে স্ত্রী বিনা কারণে তার স্বামীর নিকট তালাক প্রার্থনা করে অর উপর বেহেশতের সুগন্ধিও হারাম। আর একটি বর্ণনায় রয়েছে-‘অথচ বেহেশতের সুগন্ধি চল্লিশ বছরের পথের দূরত্ব হতেও এসে থাকে। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, এরূপ স্ত্রী বিশ্বাসঘাতিনী। পূর্ববর্তী ও পরবর্তী ইমামগণের একটা বিরাট দলের ঘোষণা এই যে, ‘খোলা’ শুধুমাত্র ঐ অবস্থায় রয়েছে যখন অবাধ্যতা ও দুষ্টামি স্ত্রীর পক্ষ থেকে হবে। ঐ সময় স্বামী মুক্তিপণ নিয়ে ঐ স্ত্রীকে পৃথক করে দিতে পারে। যেমন কুরআন পাকের এই। আয়াতটির মধ্যে রয়েছে। এই অবস্থা ছাড়া অন্য কোন অবস্থায় ‘ভোলা’ বৈধ নয়। এমন কি হযরত ইমাম মালিক (রঃ) বলেন যে, যদি স্ত্রীকে কষ্ট দিয়ে এবং তার হক কিছু নষ্ট করে স্বামী তাকে বাধ্য করতঃ তার নিকট হতে কিছু গ্রহণ করে তবে তা ফিরিয়ে দেয়া ওয়াজিব। ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেন যে, মতানৈক্যের সময় যখন কিছু গ্রহণ করা বৈধ তখন মতৈক্যের সময় বৈধ হওয়ায় কোন অসুবিধার কারণ থাকতে পারে না।

বাকর বিন আব্দুল্লাহ (রঃ) বলেন যে, কুরআন মাজীদের নিম্নের আয়াতটি দ্বারা ‘খোলা' রহিত হয়ে গেছে। (আরবি) অর্থাৎ “তোমরা যদি তাদের কাউকে ধনভাণ্ডারও দিয়ে থাকো তথাপি তা হতে কিছু গ্রহণ করো না (৪:২০)।' কিন্তু এই উক্তিটি দুর্বল ও বর্জনীয়। আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার কারণ এই যে, মুআত্তা-ই-ইমাম মালিকের মধ্যে রয়েছেঃ ‘হাবীবা বিনতে সাহল আনসারিয়া’ (রাঃ) হযরত সাবিত বিন কায়েস বিন শামাসের (রাঃ) স্ত্রী ছিলেন। একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) ফজরের নামাযের জন্য অন্ধকার থাকতেই বের হন। দরজার উপর হযরত হাবীবা বিনতে সাহলকে (রাঃ) দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করেন, কে তুমি: তিনি বলেনঃ “আমি সাহলের কন্যা হাবীবা'। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন ‘খবর কি: তিনি বলেনঃ “আমি সাবিত বিন কায়েসের (রাঃ) স্ত্রী রূপে থাকতে পারি না।' একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) নীরব হয়ে যান। অতঃপর তার স্বামী হযরত সাবিত বিন কায়েস (রাঃ) আগমন করলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ ‘হাবীবা বিনতে সাহল (রাঃ) কিছু বলেছে।' হযরত হাবীবা (রাঃ) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তিনি আমাকে যা কিছু দিয়েছেন তা সবই আমার নিকট বিদ্যমান রয়েছে এবং আমি ফিরিয়ে দিতে প্রস্তুত রয়েছি।' তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত সাবিত (রাঃ)-কে বলেন, ‘ঐগুলো গ্রহণ কর।' হযরত সাবিত বিন কায়েস (রাঃ) তখন সেগুলো গ্রহণ করেন এবং হযরত হাবীবা (রাঃ) মুক্ত হয়ে যান। অন্য একটি হাদীসে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত হাবীবা বিনতে সাহল (রাঃ) হযরত সাবিত বিন কায়েস বিন শামাসের (রাঃ) স্ত্রী ছিলেন। হযরত সাবিত (রাঃ) তাঁকে প্রহার করেন, ফলে তাঁর কোন একটি হাড় ভেঙ্গে যায়। তখন তিনি ফজরের পরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত সাবিত (রাঃ)-কে ডেকে পাঠিয়ে বলেন, “তোমার স্ত্রীর কিছু মাল গ্রহণ কর এবং তাকে পৃথক করে দাও।' হযরত সাবিত (রাঃ) বলেন হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটা আমার জন্যে বৈধ হবে কি:' তিনি বলেন ‘হাঁ'। হযরত সাবিত (রাঃ) বলেন, আমি তাকে দু'টি বাগান দিয়েছি এবং ও দু’টো তার মালিকানাধীনেই রয়েছে।' তখন নবী (সঃ) বলেন, তুমি ঐ দু’টো গ্রহণ করে তাকে পৃথক করে দাও।' তিনি তাই করেন।

অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত সাবিত (রাঃ) এই কথাও বলেছিলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আমি তাকে চরিত্র ও ধর্মভীরুতার ব্যাপারে দোষারোপ করছি না, কিন্তু আমি ইসলামের মধ্যে কুফরকে অপছন্দ করি।' অতঃপর মাল নিয়ে হযরত সাবিত (রাঃ) তাকে তালাক দিয়ে দেন। কোন কোন বর্ণনায় তাঁর নাম জামিলাও এসেছে। কোন বর্ণনায় এও রয়েছে যে, তিনি বলেন, এখন আমার ক্রোধ সম্বরণের শক্তি নেই। একটি বর্ণনায় এটাও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত সাবিত (রাঃ)-কে বলেন, 'যা দিয়েছে, তাই নাও, বেশী নিও না। একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত হাবীবা (রাঃ) বলেছিলেন, তিনি দেখতেও সুন্দর নন।' অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, তিনি আবদুল্লাহ বিন উবাই এর ভগ্নী ছিলেন ও ইসলামে এটাই সর্বপ্রথম ‘খোলা ছিল।

হযরত হাবীবা (রাঃ) এর একটি কারণ এও বর্ণনা করেছেন, একদা আমি তাঁবুর পর্দা উঠিয়ে দেখতে পাই যে, আমার স্বামী কয়েকজন লোকের সাথে আসছেন। এদের মধ্যে তিনিই ছিলেন সর্বাপেক্ষা কালো, বেঁটে ও কুৎসিৎ। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ‘তাকে তার বাগান ফিরিয়ে দাও।' এই নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে হযরত হাবীবা (রাঃ) বলেছিলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি বললে আমি আরও কিছু দিতে প্রস্তুত রয়েছি। আর একটি বর্ণনায় রয়েছে, হযরত হাবীবা (রাঃ) এই কথাও বলেছিলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহর ভয় না থাকলে আমি তার মুখে থুথু দিতাম। জমহুরে মাযহাব এই যে, ‘খোলা তালাকে স্বামী তার প্রদত্ত মাল হতে বেশী নিলেও বৈধ হবে। কেননা, কুরআন মাজীদে(আরবি) অর্থাৎ ‘সে মুক্তি লাভের জন্যে যা কিছু বিনিময় দেয়' বলা হয়েছে। (২:২২৯)

একজন স্ত্রীলোক স্বামীর সাথে মনোমালিন্য হয়ে হযরত উমারের (রাঃ) নিকট আগমন করে। হযরত উমার (রাঃ) তাকে আবর্জনাযুক্ত একটি ঘরে বন্দী করার নির্দেশ দেন। অতঃপর তাকে কয়েদখানা হতে ডেকে পাঠিয়ে জিজ্ঞেস করেন, অবস্থা কিরূপ:' সে বলে, 'আমার জীবনে আমি এই একটি রাত্রি আরামে কাটিয়েছি তখন তিনি তার স্বামীকে বলেন, তার কানের বিনিময়ে হলেও তার সাথে ভোলা করে নাও।' একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, তাকে তিন দিন পর্যন্ত কয়েদখানায় রাখা হয়েছিল। আর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, তিনি তাঁর স্বামীকে বলেছিলেন, একগুচ্ছ চুলের বিনিময়ে হলেও তুমি তা গ্রহণ করতঃ তাকে পৃথক করে দাও।' হযরত উসমান (রাঃ) বলেন-চুলের গুচ্ছ ছাড়া সব কিছু নিয়েই খোলা তালাক হতে পারে।

রাবী' বিনতে মুআওয়াজ বিন আফরা (রাঃ) বলেন, “আমার স্বামী বিদ্যমান থাকলেও আমার সাথে আদান-প্রদানে ত্রুটি করতেন এবং বিদেশে চলে গেলে তো সম্পূর্ণ রূপেই বঞ্চিত করতেন। একদিন ঝগড়ার সময় আমি বলে ফেলিআমার অধিকারে যা কিছু রয়েছে সবই নিয়ে নিন এবং আমাকে খোলা তালাক প্রদান করুন। তিনি বলেন ঠিক আছে, এটাই ফয়সালা হয়ে গেল। কিন্তু আমার চাচা মুয়ায বিন আফরা (রাঃ) এই ঘটনাটি হযরত উসমানের (রাঃ) নিকট বর্ণনা করেন। হযরত উসমান (রাঃ) ওটাই ঠিক রাখেন এবং বলেন, চুলের খোপা ছাড়া সব কিছু নিয়ে নাও।' কোন কোন বর্ণনায় এও রয়েছে যে, ওর চেয়ে ছোট জিনিসও। মোট কথা সব কিছুই নিয়ে নাও। এসব ঘটনা দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, স্ত্রীর নিকট যা কিছু রয়েছে সব দিয়েই সে ‘খোলা’ করিয়ে নিতে পারে এবং স্বামী তার প্রদত্ত মাল হতে বেশী নিয়েও ভোলা করতে পারে। হযরত ইবনে উমার (রাঃ), ইবনে আব্বাস (রাঃ), মুজাহিদ (রাঃ), ইকরামা (রঃ), ইবরাহীম নাখঈ (রঃ), কাবীসা বিন যাবীব (রঃ), হাসান বিন সালিহ (রঃ) এবং উসমানও (রঃ) এটাই বলেন। ইমাম মালিক (রঃ), লায়েস (রঃ) এবং আবু সাউরেরও (রঃ) মাযহাব এটাই। ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) এটাই পছন্দ করেন।

ইমাম আবু হানীফার (রঃ) সহচরদের উক্তি এটাই যে, যদি অন্যায় ও ত্রুটি স্ত্রীর পক্ষ হতে হয় তবে স্বামী তাকে যা দিয়েছে তা ফিরিয়ে নেয়া তার জন্যে বৈধ। কিন্তু তার চেয়ে বেশী নেয়া জায়েয নয়। আর বাড়াবাড়ি যদি পুরুষের পক্ষ হতে হয় তবে তার জন্যে কিছুই নেয়া বৈধ নয়। ইমাম আহমাদ (রঃ), উবাইদ (রঃ), ইসহাক (রঃ) এবং রাহুইয়াহ (রঃ) বলেন যে, স্বামীর জন্যে তার প্রদত্ত বস্তু হতে অতিরিক্ত নেয়া কোন ক্রমেই বৈধ নয়। সাঈদ বিন মুসাইয়াব (রঃ), আতা (রঃ), আমর বিন শুয়াইব (রঃ), যুহরী (রঃ), তাউস (রঃ), হাসান বসরী (রঃ), শাবী (রঃ), হাম্মাদ বিন আবূ সুলাইমান (রঃ) এবং রাবী' বিন আনাসেরও (রঃ) এটাই মাযহাব। মুআম্মার (রঃ) এবং হাকিম (রঃ) বলেন যে, হযরত আলীরও (রাঃ) ফায়সালা এটাই। আওযায়ীর (রঃ) ঘোষণা এই যে, কাযীগণ স্বামীর প্রদত্ত বস্তু হতে বেশী গ্রহণ করা তার জন্যে বৈধ মনে করেন। এই মাযহাবের দলীল ঐ হাদীসটিও যা উপরে বর্ণিত হয়েছে। তাতে রয়েছে, তোমার বাগান নিয়ে নাও কিন্তু বেশী নিও না।'

‘মুসনাদ-ই-আবদ বিন হামীদ' নামক গ্রন্থেও একটি মারফু হাদীস রয়েছে যে, নবী (সঃ) খোলা গ্রহণ কারিণী স্ত্রীকে প্রদত্ত বস্তু হতে বেশী গ্রহণ করাকে খারাপ মনে করেছেন। ঐ অবস্থায় যা কিছু মুক্তির বিনিময়ে সে দেবে কুরআন মাজীদের এই কথার অর্থ হবে এই যে, প্রদত্ত বস্তু হতে যা কিছু দেবে। কেননা, এর পূর্বে ঘোষণা বিদ্যমান রয়েছে যে, তোমরা তাদেরকে যা দিয়েছ তা হতে কিছুই গ্রহণ করো না। রাবী'র (রঃ) (আরবি) পঠনে শব্দের পরে (আরবি) শব্দটিও রয়েছে। অতঃপর বলা হচ্ছে-এগুলো আল্লাহর সীমাসমূহ। তোমরা এই সীমাগুলো অতিক্রম করো না, নতুবা পাপী হয়ে যাবে।

পরিচ্ছেদ

কোন কোন মনীষী খোলাকে তালাকের মধ্যে গণ্য করেন না। তারা বলেন যে, যদি এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে দু'তালাক দিয়ে দেয়, অতঃপর ঐ স্ত্রী ‘খোলা’ করিয়ে নেয় তবে ঐ স্বামী ইচ্ছে করলে পুনরায় ঐ স্ত্রীকে বিয়ে করতে পারে। তারা দলীল রূপে এই আয়াতটিকেই এনে থাকেন। এটা হচ্ছে হযরত ইবনে আব্বাসের (রাঃ) উক্তি। হযরত ইকরামাও (রঃ) বলেন যে, এটা তালাক নয়। দেখা যাচ্ছে যে, আয়াতটির প্রথমে তালাকের বর্ণনা রয়েছে। প্রথমে দু’তালাকের, শেষে তৃতীয় তালাকের এবং মধ্যে খেলার কথা বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং জানা যাচ্ছে যে, খোলা তালাক নয়। এবং এটা দ্বারা বিয়ে বাতিল করা হয়। আমীরুল মু'মেনীন হযরত উসমান বিন আফফান (রাঃ), হযরত ইবনে উমার (রাঃ), তাউস (রঃ), ইকরামা (রঃ), আহমাদ (রঃ), ইসহাক বিন রাহুইয়াহ্ (রঃ), আবু সাউর (রঃ) এবং দাউদ বিন আলী যাহিরীরও (রঃ) মাযহাব এটাই। এটাই ইমাম শাফিঈরও (রঃ) পূর্ব উক্তি। আয়াতটিরও প্রকাশ্য শব্দ এটাই।

অন্যান্য কয়েকজন মনীষী বলেন যে, খোলা হচ্ছে তালাক-ই-বায়েন এবং একাধিক তালাকের নিয়্যাত করলেও তা বিশ্বাসযোগ্য। একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, উম্মে বাকর আসলামিয়া (রাঃ) নাম্নী একটি স্ত্রীলোক তাঁর স্বামী হযরত আবদুল্লাহ বিন খালিদ (রাঃ) হতে খোলা গ্রহণ করেন এবং হযরত উসমান (রাঃ) ওটাকে এক তালাক হওয়ার ফতওয়া দেন। সঙ্গে সঙ্গে এটা বলে দেন যে, যদি কিছু নাম নিয়ে থাকে তবে যা নাম নিয়েছে তাই হবে। কিন্তু এই বর্ণনাটি দুর্বল। হযরত উমার (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত ইবনে উমার (রাঃ), হযরত সাঈদ বিন মুসাইয়াব (রঃ), হযরত হাসান বসরী (রঃ), হযতর শুরাইহ (রঃ), হযরত শাবী (রঃ), হযরত ইবরাহীম (রঃ), হযরত জাবির বিন যায়েদ (রঃ), হযরত ইমাম আবু হানীফা (রঃ), তাঁর সাথী ইমাম সাওরী (রঃ), আওযায়ী (রঃ) এবং আবু উসমান বাত্তীরও (রঃ) এটাই উক্তি যে, খোলা তালাকই বটে। ইমাম শাফিঈর (রঃ) নতুন উক্তি এটাই। তবে হানাফীগণ বলেন যে, ভোলা প্রদানকারী যদি দু’তালাকের নিয়্যাত করে তবে দু'টোই হয়ে যাবে। আর যদি কোনই শব্দ উচ্চারণ না করে এবং সাধারণ খোলা হয় তবে একটি তালাক-ই-বায়েন হবে। যদি তিনটির নিয়ত করে তবে তিনটিই হয়ে যাবে। ইমাম শাফিঈর (রঃ) অন্য একটি উক্তিও রয়েছে যে, যদি তালাকের শব্দ না থাকে এবং কোন দলীল প্রমাণও না হয় তবে কোন কিছুই হবে না।

জিজ্ঞাস্যঃ

ইমাম আবু হানীফা (রঃ), ইমাম শাফিঈ (রঃ), ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইসহাক বিন রাহুইয়াহ (রঃ)-এর মাযহাব এই যে, তালাকের ইদ্দত হচ্ছে খোলার ইদ্দত। হযরত উমার (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), সাঈদ বিন মুসাইয়াব (রঃ), সুলাইমান বিন ইয়াসার (রঃ), উরওয়া (রঃ), সালেম (রঃ), আবু সালমা (রঃ), উমার বিন আবদুল আযীয (রঃ), ইবনে শিহাব (রঃ), হাসান বসরী (রঃ) শাবী (রঃ), ইবরাহীম নাখঈ (রঃ), আবু আইয়া (রঃ), খালাস বিন আমর (রঃ), কাতাদাহ (রঃ), সুফইয়ান সাওরী (রঃ), আওযায়ী (রঃ), লায়েস বিন সা'দ (রঃ) এবং আবূ উবাইদাহ (রঃ) -এরও এটাই উক্তি।

ইমাম তিরমিযী (রঃ) বলেন যে, অধিকাংশ আলেম এদিকেই গিয়েছেন। তারা বলেন, যেহেতু খোলোও তালাক, সুতরাং ওর ইদ্দত তালাকের ইদ্দতের মতই। দ্বিতীয় উক্তি এই যে, ওর ইদ্দত শুধুমাত্র একটি ঋতু। হযরত উসমান (রাঃ)-এর এটাই ফায়সালা। ইবনে উমার (রাঃ) তিন ঋতুর ফতওয়া দিতেন বটে কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তিনি বলতেন, হযরত উসমান (রাঃ) আমাদের অপেক্ষা উত্তম এবং আমাদের চেয়ে বড় আলেম।' হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে একটি ঋতুর ইদ্দতও বর্ণিত আছে। ইবনে আব্বাস (রাঃ), ইকরামা (রঃ), আব্বান বিন উসমান (রঃ) এবং ঐ সমস্ত লোক যাদের নাম উপরে বর্ণিত হয়েছে, তাদেরও সবারই এই উক্তি হওয়াই বাঞ্ছণীয়।

সুনানে আবু দাউদ এবং জামেউত তিরমিযীর হাদীসেও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাবিত বিন কায়েসের (রাঃ) স্ত্রীকে ঐ অবস্থায় এক হায়েয ইদ্দত পালনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। জামেউত্ তিরযিমীর মধ্যে রয়েছে যে, রাবী বিনতে মুআওয়ায (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ (সঃ) খোলার পর একটি ঋতুই ইদ্দত রূপে পালন করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। হযরত উসমান (রাঃ) খোলা গ্রহণকারী স্ত্রীলোকটিকে বলেছিলেন : তোমার উপরে কোন ইদ্দতই নেই। তবে যদি খোলা গ্রহণের পূর্বক্ষণেই স্বামীর সাথে মিলিত হয়ে থাকো তবে একটি ঋতু আসা পর্যন্ত তার নিকটেই অবস্থান কর` মরইয়াম মুগালাবার (রাঃ) সম্বন্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যা ফায়সালা ছিল হযরত উসমান (রাঃ) তারই অনুসরণ করেন।

জিজ্ঞাস্যঃ জমহুর উলামা এবং ইমাম চতুষ্টয়ের মতে খোলা গ্রহণকারী স্ত্রীকে স্বামীর ফিরিয়ে নেয়ার অধিকার নেই। কেননা, সে মাল দিয়ে নিজেকে মুক্ত করেছে। আবদ বিন উবাই, আওফা, মাহানুল হানাফী, সাঈদ এবং যুহরীর (আল্লাহ তাদের প্রতি সহায় হউন) উক্তি এই যে, স্বামী তার নিকট হতে যা গ্রহণ করেছে তা তাকে ফিরিয়ে দিলে স্ত্রীকে রাজ'আত করতে পারবে। স্ত্রীর সম্মতি ছাড়াও ফিরিয়ে নিতে পারবে। সুফইয়ান সাওরী (রঃ) বলেন যে, যদি খোলার মধ্যে তালাকের শব্দ না থাকে তবে ওটা শুধু বিচ্ছেদ। সুতরাং ফিরিয়ে নেয়ার অধিকার নেই। আর যদি তালাকের নাম নেয় তবে অবশ্যই ফিরিয়ে নেয়ার তার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। দাউদ যাহেরীও (রঃ) এ কথাই বলেন। তবে সবাই এর উপর এক মত যে, যদি দু'জনই সম্মত থাকে তবে ইদ্দতের মধ্যে নতুনভাবে বিয়ে করতে পারবে। ইবনে আবদুল বার (রাঃ) একটি দলের এই উক্তিও বর্ণনা করেন যে, ইদ্দতের মধ্যে যখন অন্য কেউ তাকে বিয়ে করতে পারবে না, তেমনই স্বামীও পারবে না। কিন্তু এই উক্তিটি বিরল ও বর্জনীয়।

জিজ্ঞাস্যঃ

ঐ স্ত্রীর উপর ইদ্দতের মধ্যেই দ্বিতীয় তালাক পড়তে পারে কি না এ ব্যাপারে আলেমদের তিনটি উক্তি রয়েছে। প্রথম এই যে, ইদ্দতের মধ্যে দ্বিতীয় তালাক পতিত হবে না। কেননা, স্ত্রীটি নিজের অধিকারিণী এবং সে তার স্বামী হতে পৃথক হয়ে গেছে। ইবনে আব্বাস (রাঃ), ইবনে যুবাইর (রাঃ), ইকরামা (রঃ), জাবির বিন যায়েদ (রঃ), হাসান বসরী (রঃ), ইমাম শাফিঈ (রঃ), ইমাম আহমাদ (রঃ), ইসহাক (রঃ) এবং আবু সাউরের (রঃ) উক্তি এটাই। দ্বিতীয় হচ্ছে ইমাম মালিকের (রঃ) উক্তি। তা এই যে, খোলার সঙ্গে সঙ্গেই যদি নীরব না থেকে তালাক দিয়ে দেয় তবে তালাক হয়ে যাবে, নচেৎ হবে না। এই দৃষ্টান্ত হচ্ছে যা হযরত উসমান (রা) হতে বর্ণিত আছে। তৃতীয় উক্তি এই যে, ইদ্দতের মধ্যে তালাক হয়ে যাবে। ইমাম আবু হানীফা (রঃ), তাঁর সহচর ইমাম সাওরী (রঃ), আওযায়ী (রঃ), সাঈদ বিন মুসাইয়াব (রঃ), শুরাইহ্ (রাঃ), তাউস (রঃ), ইবরাহীম (রঃ), যুহরী (রঃ), হাকীম (রঃ), হাকাম (রঃ) এবং হাম্মাদেরও (রঃ) উক্তি এটাই। ইবনে মাসউদ (রাঃ) এবং আব দারদা (রাঃ) হতেও এটা বর্ণিত হলেও তা প্রমাণিত নয়।

এর পরে বলা হচ্ছে-‘এগুলো আল্লাহর সীমাসমূহ। সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা আল্লাহর সীমাগুলো অতিক্রম করো না, তাঁর ফরযসমূহ বিনষ্ট করো না, তার নিষিদ্ধ বিষয়সমূহের অসম্মান করো, শরীয়তে যেসব বিষয়ের উল্লেখ নেই, তোমরাও সেগুলো সম্পর্কে নীরব থাকবে, কেননা আল্লাহ তা'আলা ভুল-ত্রুটি হতে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র।' এই আয়াত দ্বারা ঐসব মনীষীগণ দলীল গ্রহণ করেছেন যাঁরা বলেন যে, একই সময়ে তিন তালাক দেয়াই হারাম। ইমাম মালিক ও তাঁর অনুসারীদের এটাই মাযহাব। তাদের মতে সুন্নাত পন্থা এই যে, তালাক একটি একটি করে দিতে হবে। কেননা, আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তালাক দু'বার। ‘এগুলো আল্লাহর সীমা, অতএব সেগুলো অতিক্রম করো না। আল্লাহ তা'আলার এই নির্দেশকে সুনানে নাসাঈর মধ্যে বর্ণিত নিম্নের হাদীস দ্বারা জোরদার করা হয়েছে।

হাদীসটি এই যে, কোন এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে একই সাথে তিন তালাক দিয়ে দেয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এই সংবাদ পৌছলে তিনি অত্যন্ত রাগান্বিত হয়ে দাঁড়িয়ে যান এবং বলেনঃ “আমি তোমাদের মধ্যে বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও কি আল্লাহর কিতাবের সাথে খেল-তামাশা শুরু হয়ে গেল:' শেষ পর্যন্ত একটি লোক দাড়িয়ে গিয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি কি তাকে হত্যা করবো না: কিন্তু এর সনদের মধ্যে ইনকিতা' (বর্ণনাকারীদের যোগসূত্র ছিন্ন) রয়েছে।

তার পরে বলা হচ্ছে-যখন কোন ব্যক্তি তার স্ত্রীকে দু’তালাক দেয়ার পরে তৃতীয় তালাক দিয়ে ফেলবে তখন সে তার উপর হারাম হয়ে যাবে। যে পর্যন্ত অন্য কেউ নিয়মিতভাবে তাকে বিয়ে করতঃ সহবাস করার পর তালাক দেবে। বিয়ে না করে যদি তাকে দাসী করে নিয়ে তার সাথে সহবাসও করে তথাপি সে তার পূর্ব স্বামীর জন্যে হালাল হবে না। অনুরূপভাবে যদি নিয়মিত বিয়েও হয় কিন্তু দ্বিতীয় স্বামীর সাথে সহবাস না করে থাকে তাহলেও পূর্ব স্বামীর জন্যে সে হালাল হবে না। অধিকাংশ ফকীহগণের মধ্যে এটা প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছে যে, হযরত সাঈদ বিন মুসাইয়াবের (রঃ) মতে দ্বিতীয় বিয়ের পর দ্বিতীয় স্বামী সহবাস না করেই তালাক দিলেও সে তার পূর্ব স্বামীর জন্য হালাল হয়ে যাবে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটা সাঈদ বিন মুসাইয়াবের (রঃ) উক্তি রূপে প্রমাণিত হয়।

একটি হাদীসে রয়েছে যে, নবী (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয় ও একটি লোকে একটি স্ত্রী লোককে বিয়ে করলো এবং সহবাসের পূর্বেই তালাক দিয়ে দিল। অতঃপর সে অন্য স্বামীর সাথে বিবাহিতা হলো, সেও তাকে সহবাসের পূর্বে তালাক দিয়ে দিল। এখন কি তাকে বিয়ে করা তার পূর্ব স্বামীর জন্যে হালাল হবে।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, না, না। যে পর্যন্ত না তারা একে অপরের মধুর স্বাদ গ্রহণ করে। মুসনাদ-ই-আহমাদ, সুনানে ইবনে মাজাহ ইত্যাদি। এই বর্ণনাটি স্বয়ং ইমাম সাঈদ বিন মুসাইয়াব (রঃ) হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন। সুতরাং এটা কিরূপে সম্ভব যে তিনি বর্ণনাও করবেন আবার নিজে বিরোধিতাও করবেন-তাও আবার বিনা দলীলে।

একটি বর্ণনায় এও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞাসিত হন, একটি লোক তার স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়েছিলো। অতঃপর সে অন্যের সাথে বিবাহিতা হলো। এরপর দরজা বন্ধ করে ও পর্দা ঝুলিয়ে দিয়ে যৌন মিলন না করেই দ্বিতীয় স্বামী তাকে তালাক দিয়ে দিল। এখন কি স্ত্রীটি তার পূর্ব স্বামীর জন্য হালাল হবে:' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, না, যে পর্যন্ত না সে মধুর স্বাদ গ্রহণ করে' (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)।

একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত রিফা'আ কারামী (রাঃ) তাঁর স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়ে দেন। হযরত আবদুর রহমান বিন যুবাইরের (রাঃ) সাথে তার বিয়ে হয়। কিন্তু তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গিয়ে অভিযোগ করেন, “তিনি (আমার স্বামী আবদুর রহমান বিন যুবাইর) স্ত্রীর আকাংখা পূরণের যোগ্য নন।` রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাকে বলেন, সম্ভবত তুমি রিফাআর (তার পূর্ব স্বামী) নিকট ফিরে যেতে চাও। এটা হবে না যে পর্যন্ত না তুমি তার মধুর স্বাদ গ্রহণ করবে এবং সে তোমার মধুর স্বাদ গ্রহণ করবে।' এই হাদীসগুলোর বহু সনদ রয়েছে এবং বিভিন্ন শব্দে বর্ণিত হয়েছে।

(পরিচ্ছেদ)-এটা মনে রাখতে হবে যে, দ্বিতীয় স্বামী গ্রহণ করার ভাবার্থ হচ্ছে ঐ স্ত্রীর প্রতি দ্বিতীয় স্বামীর আগ্রহ থাকতে হবে এবং চিরস্থায়ীভাবে তাকে। স্ত্রী রূপে রাখার উদ্দেশ্যে হতে হবে। শুধুমাত্র প্রথম স্বামীর জন্যে তাকে হালাল করার জন্যে নয়। এমনকি ইমাম মালিকের মতে এও শর্ত রয়েছে যে, এই সহবাস বৈধ পন্থায় হতে হবে। যেমন স্ত্রী যেন রোযার অবস্থায়, ইহরামের অবস্থায়, ইতেকাফের অবস্থায় এবং হায়েয ও নিফালের অবস্থায় না থাকে। অনুরূপভাবে স্বামীও যেন রোযা, ইহরাম ও ইতেকাকের অবস্থায় না থাকে। যদি স্বামী-স্ত্রীর কোন একজন উল্লিখিত কোন এক অবস্থায় থাকে এবং এই অবস্থায় সহবাসও হয়ে যায় তথাপিও সে তার পূর্ব মুসলমান স্বামীর জন্যে হালাল হবে না। কেননা, ইমাম মালিকের মতে কাফিরদের পরস্পরের বিয়ে বাতিল।

ইমাম হাসান বসরী (রঃ) তো এই শর্তও আরোপ করেন যে, বীর্যও নির্গত হতে হবে। কেননা, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ‘যে পর্যন্ত না সে তোমার এবং তুমি তার মধুর স্বাদ গ্রহণ করবে এই কথার দ্বারা এটাই বুঝা যাচ্ছে। হাসান বসরী (রঃ) যদি এই হাদীসটিকে সামনে রেখেই এই শর্ত আরোপ করে থাকেন তবে স্ত্রীর ব্যাপারেও এই শর্ত হওয়া উচিত। কিন্তু হাদীসের (আরবি) শব্দটির ভাবার্থ বীর্য নয়। কেননা, মুসনাদ-ই-আহমাদ ও সুনান-ই-নাসাঈর মধ্যে হাদীস রয়েছে যে, (আরবি) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে সহবাস। যদি এই বিয়ের দ্বারা প্রথম স্বামীর জন্যে ঐ স্ত্রীকে হালাল করাই দ্বিতীয় স্বামীর উদ্দেশ্য হয় তবে এইরূপ লোক যে নিন্দনীয় এমনকি অভিশপ্ত তা হাদীসসমূহে স্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে।

মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে, যে স্ত্রী লোক উলকী করে এবং যে স্ত্রী লোক উলকী করিয়ে নেয়, যে স্ত্রী লোক চুল মিলিয়ে দেয় এবং যে মিলিয়ে নেয়, যে ‘হালালা’ করে এবং যার জন্যে হালালা’ করা হয়, যে সুদ প্রদান করে এবং যে সুদ গ্রহণ করে এদের উপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) অভিশাপ দিয়েছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ) বলেন যে, সাহাবীদের (রাঃ) আমল এর উপরেই রয়েছে। হযরত উমার (রাঃ), হযরত উসমান (রাঃ) এবং হযরত ইবনে উমারের (রাঃ) এটাই মাযহাব। তাবেঈ ধর্ম শাস্ত্রবিদগণও এটাই বলেন। হযরত আলী (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) এবং হযরত ইবনে আব্বাসেরও (রাঃ) এটাই উক্তি। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, সুদের সাক্ষ্যদানকারী এবং লিখকের প্রতিও অভিসম্পাত। যারা যাকাত প্রদান করে না এবং যারা যাকাত গ্রহণে বাড়াবাড়ি করে তাদের উপরও অভিসম্পাত। হিযরতের পর ধর্মত্যাগীদের উপরও অভিসম্পাত। বিলাপ করাও নিষিদ্ধ।

একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, ধার করা যাড় কে তা কি আমি তোমাদেরকে বলবো:' জনগণ বলেন, হ্যা বলুন।' তিনি বলেন, যে ‘হালালা করে অর্থাৎ যে তালাক প্রাপ্তা নারীকে এজন্যে বিয়ে করে যেন সে তার পূর্ব স্বামীর জন্যে হালাল হয়ে যায়। যে ব্যক্তি এরূপ কাজ করে তার উপরও আল্লাহর লানত এবং যে ব্যক্তি নিজের জন্যে এটা করিয়ে নেয় সেও অভিশপ্ত (সুনানে ইবনে মাজাহ)। একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, এরূপ বিয়ে সম্বন্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞাসিত হয়ে বলেন, “এটা বিয়েই নয় যাতে উদ্দেশ্য থাকে এক এবং বাহ্যিক হয় অন্য এবং যাতে আল্লাহর কিতাবকে নিয়ে খেল-তামাশা করা হয়। বিয়ে তো শুধুমাত্র ওটাই যা আগ্রহের সাথে হয়ে থাকে।

মুসতাদরিক-ই-হাকিমের মধ্যে রয়েছে যে, এক ব্যক্তি হযরত আবদুল্লাহ বিন উমারকে জিজ্ঞেস করেন : ‘একটি লোক তার স্ত্রীকে তৃতীয় তালাক দিয়ে দেয়। এর পর তার ভাই তাকে এই উদ্দেশ্যে বিয়ে করে যে, সে যেন তার ভাই এর জন্যে হালাল হয়ে যায়। এই বিয়ে কি শুদ্ধ হয়েছে।' তিনি উত্তরে বলেনঃ ‘কখনও নয়। আমরা এটাকে নবী (সঃ)-এর যুগে ব্যভিচারের মধ্যে গণ্য করতাম। বিয়ে ওটাই যাতে আগ্রহ থাকে। এ হাদীসটি মাওকুফ হলেও এর শেষের বাক্যটি একে মারফুর পর্যায়ে এনে দিয়েছে। এমন কি অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, আমীরুল মুমেনীন হযরত উমার ফারূক (রাঃ) বলেছেনঃ যদি কেউ এই কাজ করে বা করায় তবে আমি উভয়কে ব্যভিচারের শাস্তি দেবো অর্থাৎ রজম করে দেবো। হযরত উসমান (রাঃ) স্বীয় খিলাফতকালে এরূপ বিয়ের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা আনয়ন করেন। এ রকমই হযরত আলী (রাঃ), হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রভৃতি বহু সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে।

তারপর ঘোষণা হচ্ছে-দ্বিতীয় স্বামী যদি বিয়ে ও সহবাসের পর তালাক দিয়ে দেয় তবে পূর্ব স্বামী পুনরায় ঐ স্ত্রীকে বিয়ে করলে কোন পাপ নেই, যদি তারা সদ্ভাবে বসবাস করে এবং এটাও জেনে নেয় যে, ঐ দ্বিতীয় বিয়ে শুধু প্রতারণা ও প্রবঞ্চনা ছিল না, বরং প্রকৃতই ছিল। এটাই হচ্ছে আল্লাহর বিধান যা তিনি জ্ঞানীদের জন্যে প্রকাশ করে দিয়েছেন। ইমামগণের এই বিষয়েও মতবিরোধ রয়েছে যে, একটি লোক তার স্ত্রীকে একটি বা দুটি তালাক দিয়েছিল। অতঃপর তাকে ছেড়েই থাকলো। শেষ পর্যন্ত স্ত্রীটির ইদ্দত অতিক্রান্ত হয়ে গেল এবং সে অন্য স্বামী গ্রহণ করলো। দ্বিতীয় স্বামী তার সাথে সহবাসও করলো। অতঃপর সে তাকে তালাক দিয়ে দিল এবং তার ইদ্দত শেষ হয়ে গেল। তখন তার পূর্ব স্বামী তাকে পুনরায় বিয়ে করলো। এখন প্রশ্ন হচ্ছে যে, এই স্বামী কি তিন তালাকের মধ্যে যে একটি বা দুটি তালাক বাকি রয়েছে শুধু ওরই অধিকারী হবে, না পূর্বের তিন তালাক গণনার মধ্যে হবে না, বরং সে নতুনভাবে তিন তালাকের মালিক হবে : প্রথমটি হচ্ছে ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম শাফিঈ (রঃ), ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রঃ), এবং সাহাবীগণের একটি দলের মাযহাব। এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে ইমাম আবূ হানীফা (রঃ) এবং তাঁর সহচরদের মাযহাব। এঁদের দলীল এই যে, এভাবে তৃতীয় তালাকই যখন গণনায় আসছে তখন প্রথম ও দ্বিতীয় তালাক কিভাবে আসতে পারে।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।