সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 222)
হরকত ছাড়া:
ويسألونك عن المحيض قل هو أذى فاعتزلوا النساء في المحيض ولا تقربوهن حتى يطهرن فإذا تطهرن فأتوهن من حيث أمركم الله إن الله يحب التوابين ويحب المتطهرين ﴿٢٢٢﴾
হরকত সহ:
وَ یَسْـَٔلُوْنَکَ عَنِ الْمَحِیْضِ ؕ قُلْ هُوَ اَذًی ۙ فَاعْتَزِلُوا النِّسَآءَ فِی الْمَحِیْضِ ۙ وَ لَا تَقْرَبُوْهُنَّ حَتّٰی یَطْهُرْنَ ۚ فَاِذَا تَطَهَّرْنَ فَاْتُوْهُنَّ مِنْ حَیْثُ اَمَرَکُمُ اللّٰهُ ؕ اِنَّ اللّٰهَ یُحِبُّ التَّوَّابِیْنَ وَ یُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِیْنَ ﴿۲۲۲﴾
উচ্চারণ: ওয়া ইয়াছআলূনাকা ‘আনিল মাহীদি কুল হুওয়া আযান ফা‘তাযিলুন্নিছাআ ফিল মাহীদি ওয়ালা-তাকরাবূহুন্না হাত্তা-ইয়াতহুরনা ফাইযা-তাতাহহারনা ফা’তূহুন্না মিন হাইছুআমারাকুমুল্লা-হু ইন্নাল্লাহা ইউহিব্বুত্তাওওয়া-বীনা ওয়াইউহিব্বুল মুতাতাহহিরীন।
আল বায়ান: আর তারা তোমাকে হায়েয সম্পর্কে প্রশ্ন করে। বল, তা কষ্ট। সুতরাং তোমরা হায়েযকালে স্ত্রীদের থেকে দূরে থাক এবং তারা পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত তাদের নিকটবর্তী হয়ো না। অতঃপর যখন তারা পবিত্র হবে তখন তাদের নিকট আস, যেভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন। নিশ্চয় আল্লাহ তাওবাকারীদেরকে ভালবাসেন এবং ভালবাসেন অধিক পবিত্রতা অর্জনকারীদেরকে।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২২২. আর তারা আপনাকে রজঃস্রাব (হায়েয) সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করে। বলুন, তা ‘অশুচি’(১)। কাজেই তোমরা রজঃস্রাবকালে স্ত্রী-সংগম থেকে বিরত থাক এবং পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত(২) (সংগমের জন্য) তাদের নিকটবর্তী হবে না(৩)। তারপর তারা যখন উত্তমরূপে পরিশুদ্ধ হবে তখন তাদের নিকট ঠিক সেভাবে গমন করবে, যেভাবে আল্লাহ্ তোমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তাওবাকারীকে ভালবাসেন এবং তাদেরকেও ভালবাসেন যারা পবিত্র থাকে।
তাইসীরুল ক্বুরআন: লোকেরা তোমাকে ঋতু সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করছে। বল, ‘তা অশুচি’। কাজেই ঋতুকালে স্ত্রী-সহবাস হতে বিরত থাক এবং যে পর্যন্ত পবিত্র না হয়, তাদের নিকটবর্তী হয়ো না। তারপর যখন পবিত্র হবে, তখন তাদের সঙ্গে সহবাস কর, যেভাবে আল্লাহ অনুমতি দিয়েছেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাহ্কারীদেরকে ভালবাসেন আর পবিত্রতা অবলম্বীদেরকেও ভালবাসেন।
আহসানুল বায়ান: (২২২) লোকে রজঃস্রাব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। তুমি বল, তা অশুচি। সুতরাং তোমরা রজঃস্রাবকালে স্ত্রীসঙ্গ বর্জন কর[1] এবং যতদিন না তারা পবিত্র হয়, (সহবাসের জন্য) তাদের নিকটবর্তী হয়ো না। অতঃপর যখন তারা পবিত্র হয়,[2] তখন তাদের নিকট ঠিক সেই পথে গমন কর, যে পথে আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন। [3] নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমা প্রার্থিগণকে এবং যারা পবিত্র থাকে তাদেরকে পছন্দ করেন।
মুজিবুর রহমান: এবং তারা তোমাকে (স্ত্রীলোকদের) ঋতু সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করছে; তুমি বলঃ ওটা হচ্ছে অশুচি। অতএব ঋতুকালে স্ত্রীলোকদেরকে অন্তরাল কর এবং উত্তম রূপে শুদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত তাদের নিকটে যেওনা; অতঃপর যখন তারা পবিত্র হবে তখন আল্লাহর নির্দেশ মত তোমরা তাদের নিকট গমন কর, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাহকারীদেরকে ভালবাসেন এবং যারা পবিত্র থাকে তাদেরকেও ভালবাসেন।
ফযলুর রহমান: তারা তোমার কাছে হায়েয (মহিলাদের ঋতুস্রাব) সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে। তুমি বল, সেটা (সঙ্গমের জন্য) ক্ষতিকর। অতএব, হায়েযের সময় তোমরা নারীদের থেকে আলাদা থাক (সঙ্গম থেকে বিরত থাক) এবং তারা পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত তাদের কাছে যেয়ো না (তাদের সাথে সঙ্গম করো না)। যখন তারা পবিত্র হয়ে যাবে তখন আল্লাহ যেভাবে তোমাদের নির্দেশ দিয়েছেন সেভাবে তাদের কাছে যেতে পারবে (সঙ্গম করতে পারবে)। নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের ভালবাসেন, আর যারা পাক-সাফ থাকে তিনি তাদেরকেও ভালবাসেন।
মুহিউদ্দিন খান: আর তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে হায়েয (ঋতু) সম্পর্কে। বলে দাও, এটা অশুচি। কাজেই তোমরা হায়েয অবস্থায় স্ত্রীগমন থেকে বিরত থাক। তখন পর্যন্ত তাদের নিকটবর্তী হবে না, যতক্ষণ না তারা পবিত্র হয়ে যায়। যখন উত্তম রূপে পরিশুদ্ধ হয়ে যাবে, তখন গমন কর তাদের কাছে, যেভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে হুকুম দিয়েছেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারী এবং অপবিত্রতা থেকে যারা বেঁচে থাকে তাদেরকে পছন্দ করেন।
জহুরুল হক: তারা তোমাকে ঋতুস্রাব সন্বন্ধে জিজ্ঞাসা করছে। বলো -- "ইহা অনিষ্টকর, কাজেই ঋতুকালে স্ত্রীদের থেকে আলাদা থাকবে, এবং তাদের নিকটবর্তী হয়ো না যে পর্যন্ত না তারা পরিস্কার হয়ে যায়। তারপর যখন তারা নিজেদের পরিস্কার করে নেয় তখন তাদের সঙ্গে মিলিত হও যেভাবে আল্লাহ্ তোমাদের আদেশ দিয়েছেন।" নিঃসন্দেহ আল্লাহ্ ভালোবাসেন তাদের যারা তাঁর দিকে ফেরে, আর তিনি ভালবাসেন পরিচ্ছন্নতা রক্ষাকারীদের।
Sahih International: And they ask you about menstruation. Say, "It is harm, so keep away from wives during menstruation. And do not approach them until they are pure. And when they have purified themselves, then come to them from where Allah has ordained for you. Indeed, Allah loves those who are constantly repentant and loves those who purify themselves."
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ২২২. আর তারা আপনাকে রজঃস্রাব (হায়েয) সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করে। বলুন, তা ‘অশুচি’(১)। কাজেই তোমরা রজঃস্রাবকালে স্ত্রী-সংগম থেকে বিরত থাক এবং পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত(২) (সংগমের জন্য) তাদের নিকটবর্তী হবে না(৩)। তারপর তারা যখন উত্তমরূপে পরিশুদ্ধ হবে তখন তাদের নিকট ঠিক সেভাবে গমন করবে, যেভাবে আল্লাহ্– তোমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ্– তাওবাকারীকে ভালবাসেন এবং তাদেরকেও ভালবাসেন যারা পবিত্র থাকে।
তাফসীর:
(১) আয়াতে বর্ণিত مَحِيْضٌ অর্থ দুটি। ১. হয়েযের স্থান ২. হয়েযের সময়। অর্থাৎ তারা আপনাকে হায়েয এর ব্যাপারে অথবা হয়েযের স্থান অথবা হয়েযের সময়ের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করে। তারা হয়েযের সময়ে সে স্থানে কি করতে পারে, আর কি করতে পারবে না এ প্রশ্ন করছে। বলুন যে, সেটা أذى - এর এক অর্থ, কষ্ট। আরেক অর্থ, অপবিত্রতা, অশুচি। দুটি অর্থই শুদ্ধ। [তাফসীরে কুরতুবী] হয়েয অবস্থায় স্ত্রীদের সাথে কতটুকু মেলামেশা করা যাবে, তা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “হায়েযের স্থানে সঙ্গম ব্যতীত আর সবই করতে পার”। [মুসলিম: ৩০২] উম্মুল মুমিনীন মায়মূনাহ রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, “রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন হায়েয অবস্থায় কোন স্ত্রীর সাথে মেলামেশা করতে চাইতেন তখন তাকে হয়েযের স্থানে কাপড় পরিধান করে নিতে বলতেন।” [বুখারী: ৩০৩, মুসলিম: ২৯৪]
(২) চরম যৌন উত্তেজনা বশতঃ ঋতুকালীন অবস্থায় সহবাস অনুষ্ঠিত হয়ে গেলে খুব ভাল করে তাওবা করে নেয়া ওয়াজিব। তার সাথে সাথে কিছু দান-সদকা করে দিলে তা উত্তম। [মুস্তাদরাকে হাকিম: ১/১৭১, ১৭২, তিরমিযী: ১৩৭] তবে মনে রাখতে হবে যে, পশ্চাদ পথে (অর্থাৎ যোনিপথ ছাড়া গুহ্যদ্বার দিয়ে) নিজের স্ত্রীর সাথে সহবাস করাও হারাম।
(৩) স্ত্রীদের হায়েয অবস্থায় সংগম ক্রিয়া ব্যতীত তাদের সাথে সর্বপ্রকার মেলামেশাই জায়েয। স্ত্রীর যৌনাঙ্গ ছাড়া অন্যান্য অংশে মেলামেশা জায়েয।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (২২২) লোকে রজঃস্রাব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। তুমি বল, তা অশুচি। সুতরাং তোমরা রজঃস্রাবকালে স্ত্রীসঙ্গ বর্জন কর[1] এবং যতদিন না তারা পবিত্র হয়, (সহবাসের জন্য) তাদের নিকটবর্তী হয়ো না। অতঃপর যখন তারা পবিত্র হয়,[2] তখন তাদের নিকট ঠিক সেই পথে গমন কর, যে পথে আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন। [3] নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমা প্রার্থিগণকে এবং যারা পবিত্র থাকে তাদেরকে পছন্দ করেন।
তাফসীর:
[1] সাবালিকা হওয়ার পর প্রত্যেক নারীর লজ্জাস্থান থেকে মাসে একবার নিয়মিত যে রক্ত আসে, তাকে হায়েয (মাসিক, ঋতু বা রজঃস্রাব) বলা হয়। আবার কখনো কখনো কোন রোগের কারণে বাঁধা নিয়মের অতিরিক্তও আসে; তাকে ইস্তিহাযা বলে। ইস্তিহাযার বিধান হায়েযের থেকে ভিন্ন। মাসিকের দিনগুলোতে নামায মাফ এবং রোযা রাখা নিষেধ। পরে রোযা কাযা করা আবশ্যক। পুরুষের জন্য কেবল সঙ্গম করা নিষেধ, তবে চুম্বন ও আলিঙ্গন করা জায়েয। অনুরূপ মহিলা এই দিনগুলোতে রান্না সহ সংসারের অন্য সব কাজই করতে পারে। কিন্তু ইয়াহুদীদের মধ্যে এই দিনগুলোতে মহিলাকে সম্পূর্ণ অপবিত্র গণ্য করা হত। তারা তার সাথে মেলামেশা এবং খাওয়া-দাওয়া বৈধ মনে করত না। সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। এতে কেবল সহবাস করা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। নিকটবর্তী না হওয়া বা দূরে থাকার অর্থঃ কেবল সঙ্গম করা নিষেধ। (ইবনে কাসীর ইত্যাদি)
[2] ‘যখন তারা পবিত্র হয়’ এর দু’টি অর্থ বলা হয়েছে। (ক) যখন রক্ত আসা বন্ধ হয়। অর্থাৎ, গোসল ছাড়াই সে পবিত্র হয়ে যাবে। এমতাবস্থায় পুরুষের জন্য তার সাথে (গোসলের পূর্বে) সহবাস করা জায়েয। ইবনে হায্ম এবং অন্য কিছু ইমামগণ এরই সমর্থক। আল্লামা আলবানীও এই মতের সমর্থন করেছেন। (আদাবুয্ যিফাফ ৪৭ পৃষ্ঠা) (খ) রক্ত বন্ধ হওয়ার পর গোসল করে পবিত্র হয়। দ্বিতীয় অর্থানুযায়ী স্ত্রী যতক্ষণ না গোসল করেছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তার সাথে সহবাস করা হারাম থাকবে। ইমাম শাওকানী এটাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। (ফাতহুল ক্বাদীর) আমাদের নিকট দু’টোই আমলযোগ্য, তবে দ্বিতীয়টি প্রাধান্য পাওয়ার অধিক যোগ্য।
[3] ‘যে পথে-- নির্দেশ দিয়েছেন।’ অর্থাৎ, যোনিপথে। কারণ, মাসিক অবস্থায় এই যোনিপথই ব্যবহার করতে নিষেধ করা হয়েছিল। তাই এখন পবিত্র হওয়ার পর যার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে, সেটা এই যোনিপথ ব্যবহার করারই অনুমতি, কোন অন্য পথের নয়। এ থেকে দলীল গ্রহণ করা হয়েছে যে, মহিলার পায়ুপথ (মলদ্বার) ব্যবহার করা হারাম। যেমন হাদীসে এ বিষয়কে আরো পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ২২২ ও ২২৩ নং আয়াতের তাফসীর:
শানে নুযূল:
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, ইয়াহূদীরা ঋতুবতী স্ত্রীলোকদেরকে তাদের সাথে খেতে দিত না এবং তাদের পার্শ্বে রাখত না। সাহাবীগণ এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞাসা করলে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। তখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, স্ত্রীদের সাথে সহবাস ছাড়া সবকিছু করতে পার। (সহীহ মুসলিম হা: ৩০২)
ইকরিমা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কোন এক স্ত্রী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যদি তাঁর ঋতুবর্তী স্ত্রীর সাথে থাকতে চাইতেন তাহলে স্ত্রীর নিম্নার্ধে ভাল ভাবে কাপড় বেঁধে নিতেন। (আবূ দাঊদ হা: ২৭২, সহীহ)
আয়িশাহ (রাঃ) বলেন: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে তাঁর মাথা ধৌত করে দিতে বললেন- আমি তার মাথা ধৌত করে দিলাম তখন আমি ঋতুবতী ছিলাম এবং আমার ঋতুকালীন অবস্থায় তিনি আমার কোলে মাথা রেখে শুয়ে কুরআন তেলাওয়াত করতেন। (সহীহ বুখারী হা: ২৯৫, ২৯৭)
মেয়েদের ঋতুস্রাব তিন প্রকার:
১. হায়িয: মেয়েরা সাবালিকা হলে তাদের জরায়ু হতে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট কয়েকদিন স্বাভাবিকভাবে যে রক্তস্রাব হয় তাকে হায়িয বলে। এর নিম্ন সময় ও উর্ধ্ব সময় সহীহ হাদীসে নির্দিষ্ট করে উল্লেখ নেই। তবে অধিকাংশদের ছয় বা সাত দিন হয়ে থাকে।
২. নিফাস: সন্তান প্রসবের পর যে রক্তস্রাব হয় তাকে নিফাস বলে। এর নিম্ন কোন সময় নেই তবে ঊর্ধ্ব সময় হলো ৪০দিন। (ফিকহুস সুন্নাহ ১/১১২ -১১৩)
হায়িয ও নিফাস চলাকালীন সময় সালাত পড়া যাবে না এবং তা পরে আদায়ও করতে হবে না। রোযা রাখা যাবে না, তবে পবিত্র হয়ে আদায় করতে হবে। কাবায় তাওয়াফ করা যাবে না। মাসজিদে অবস্থান করা যাবে না। কুরআন মাজিদ গিলাফ ছাড়া স্পর্শ করা যাবে না। স্বামী-স্ত্রীর সহবাস করা যাবে না।
৩. ইস্তিহাযা: হায়িয ও নিফাস এর নির্দিষ্ট সময় অতিবাহিত হওয়ার পরেও যে রক্তস্রাব হতে থাকে তাকে ইস্তিহাযা বলা হয়। এমন অবস্থায় প্রতি ওয়াক্তে গুপ্তাঙ্গ ধৌত করে নতুনভাবে ওযূ করে সালাত আদায় করবে এবং রোযাও রাখবে। স্বামী-স্ত্রী সহবাসও করতে পারবে।
(قُلْ هُوَ أَذًي)
‘তুমি বল, তা কষ্টদায়ক’অর্থাৎ ঋতুস্রাব মহিলাদের জন্য কষ্টদায়ক। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: এটা আল্লাহ তা‘আলা আদম (আঃ)-এর কন্যাদের ওপর আবশ্যক করে দিয়েছেন। (সুনান ইবনু মাযাহ হা: ৬৩৭ হাসান)
(فَاِذَا تَطَھَّرْنَ)
‘পবিত্র হওয়ার’দু’টি অর্থ হতে পারে: ১. রক্ত আসা বন্ধ হয়ে গেছে কিন্তু গোসল করেনি। কারো কারো মতে এ অবস্থায় সহবাস জায়েয তবে সঠিক কথা হল নাজায়েয।
হাফিজ ইবনু কাসীর (রহঃ) বলেন: এ ব্যাপারে আলেমগণ এক মত পোষণ করেছেন যে, ঋতুর রক্ত আসা বন্ধ হওয়ার পর গোসলের পূর্বে সহবাস করা বৈধ হবে না। (তাফসীর ইবনে কাসীর, ১/৫৬৫)
২. গোসল করার পর পবিত্র হওয়া।
(مِنْ حَيْثُ أَمَرَكُمُ اللّٰهُ)
‘আল্লাহর নির্দেশিত পন্থায়’অর্থাৎ যোনি পথে। কারণ মাসিক অবস্থায় এ যোনি পথই ব্যবহার করা নিষেধ করা হয়েছে। তাই পবিত্র হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
لَا يَنْظُرُ اللّٰهُ إِلَي رَجُلٍ جَامَعَ اِمْرَأَتَهُ فِيْ دُبُرِهَا
আল্লাহ তা‘আলা ঐ ব্যক্তির দিকে দয়ার দৃষ্টিতে তাকাবেন না, যে কুকর্ম করার জন্য কোন পুরুষের কাছে যায় বা স্ত্রীর পিছনদ্বার ব্যবহার করে। (তিরমিযী হা: ১১৬৫, নাসাঈ হা: ৯০১১, সহীহ)
আল্লাহ তা‘আলা তাওবাকারী ও পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালবাসেন।
(نِسَآؤُكُمْ حَرْثٌ لَّكُمْ)
শানে নুযূল:
জাবের (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, ইয়াহূদীরা বলত- যদি কেউ তার স্ত্রীর সাথে পিছন দিক থেকে সহবাস করে তাহলে সন্তান টেরা হবে। তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। (সহীহ বুখারী হা: ৪৫২৮, সহীহ মুসলিম হা: ১৪৩৫)
অন্য বর্ণনায় ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: একদা উমার (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! আমি ধ্বংস হয়ে গেছি। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, কিসে তোমাকে ধ্বংস করল? তিনি বলেন, রাতে আমি আমার সোয়ারী উল্টা করেছি অর্থাৎ পিছন দিক থেকে সহবাস করেছি। তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (তিরমিযী হা: ২৯৮০, হাসান)
(اَنّٰی شِئْتُمْ) ‘যেভাবে ইচ্ছা’অর্থাৎ যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে স্ত্রীদের সাথে দৈহিক মিলন কর। কোন বিধি-নিষেধ নেই তবে শর্ত হল পথ একটাই হবে আর তা হল যোনিপথ। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
مُقْبِلَةً وَمُدْبِرَةً إِذَا كَانَ ذَلِكَ فِي الْفَرْجِ. وفي رواية: إِذَا كَانَ ذَلِكَ فِي صِمَامٍ وَاحِدٍ
সামনের দিক থেকে সহবাস কর বা পিছন দিক থেকে সহবাস কর তবে যোনিপথে হতে হবে। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, যখন স্থান হবে একটিই। (তাফসীর ইবনে কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর, ইমাম হাকেম সহীহ বলেছেন ২/১৯৫)
এছাড়াও অনেক সহীহ হাদীস রয়েছে যেখানে স্ত্রীর পিছনদ্বার ব্যবহার করা হারাম করা হয়েছে।
আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. মাসিক বা ঋতু অবস্থায় স্ত্রী সহবাস হারাম।
২. মাসিক বা ঋতু থেকে মুক্ত হয়ে গোসল না করা পর্যন্ত স্ত্রী সহবাস নিষেধ।
৩. স্ত্রীর পিছনদ্বার ব্যবহার হারাম।
৪. সর্বদা সর্বক্ষেত্রে আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করা আবশ্যক।
৫. সকলকে আল্লাহ তা‘আলার কাছে ফিরে যেতে হবে।
৬. আল্লাহ তা‘আলা “ভালবাসেন’’- এ গুণের প্রমাণ পেলাম।
৭. হায়িয, নিফাস ও ইস্তিহাযা অবস্থায় কঅ করণীয় তা জানতে পেলাম।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ২২২-২২৩ নং আয়াতের তাফসীর
হযরত আনাস (রাঃ) বলেন যে, ইয়াহূদীরা ঋতুবর্তী স্ত্রীলোকদেরকে তাদের সাথে খেতেও দিতো না এবং তাদের পার্শ্বে রাখতো না। সাহাবীগণ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে এই সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলে তারই উত্তরে এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন যে, সহবাস ছাড়া অন্যান্য সবকিছু বৈধ। একথা শুনে ইয়াহুদীরা বলেঃ “আমাদের বিরুদ্ধাচরণই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উদ্দেশ্য।” হযরত উসায়েদ বিন হুযায়ের (রাঃ) এবং হযরত ইবাদ বিন বাশার (রাঃ) ইয়াহুদীদের এই কথা নকল করে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদেরকে তাহলে সহবাস করারও অনুমতি দিন।' এই কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখমণ্ডল (এর-রং) পরিবর্তিত হয়। অন্যান্য সাহাবীগণ (রাঃ) ধারণা করেন যে, তিনি তাদের প্রতি রাগান্বিত হয়েছেন। অতঃপর এই মহান ব্যক্তিদ্বয় যেতে থাকলে রাসূলুল্লাহর (সঃ) নিকট কোন এক ব্যক্তি উপঢৌকন স্বরূপ কিছু দুধ নিয়ে আসেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের পিছনে লোক। পাঠিয়ে তাদেরকে ডেকে পাঠান এবং ঐ দুধ তাদেরকে পান করান। তখন জানা যায় যে ঐ ক্রোধ প্রশমিত হয়েছে (সহীহ মুসলিম)।
সুতরাং ‘ঋতুর অবস্থায় স্ত্রীদের হতে পৃথক থাকো’-এর ভাবার্থ হচ্ছে ‘সহবাস করো না। কারণ, এ ছাড়া অন্যান্য সবকিছুই বৈধ। অধিকাংশ আলেমের মাযহাব এই যে, সহবাস বৈধ নয় বটে, কিন্তু প্রেমালাপ করা বৈধ। হাদীসসমূহেও রয়েছে যে, এরূপ অবস্থায় স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-ও সহধর্মিণীদের সাথে মেলামেশা করতেন, কিন্তু তারা গুপ্ত স্থান কাপড়ে বেঁধে রাখতেন (সুনান-ই-আবু দাউদ)।
হযরত আম্মারার ফুফু (রাঃ) হযরত আয়েশাকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করেন, যদি স্ত্রী হায়েযের অবস্থায় থাকে এবং স্বামী-স্ত্রীর একই বিছানা হয় তবে তারা কি করবে:' অর্থাৎ এই অবস্থায় তার স্বামী তার পাশে শুতে পারে কি-না:' হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “আমি তোমাকে সংবাদ দিচ্ছি যা রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বয়ং করেছেন। একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) বাড়িতে এসেই তার নামাযের জায়গায় চলে যান এবং নামাযে লিপ্ত হয়ে পড়েন। অনেক বিলম্ব হয়ে যায়। ইতিমধ্যে আমি ঘুমিয়ে পড়ি। তিনি শীত অনুভব করে আমাকে বলেনঃ এখানে এসো। আমি বলি : আমি ঋতুবতী।' তিনি আমাকে আমার জানুর উপর হতে কাপড় সরাতে বলেন। অতঃপর তিনি আমার উরু ও গণ্ড দেশের উপর বক্ষ রেখে শুয়ে পড়েন। আমিও তার উপর ঝুঁকে পড়ি। ফলে ঠাপ কিছু প্রশমিত হয় এবং সেই গরমে তিনি ঘুমিয়ে যান।'
হযরত মাসরূক (রঃ) একদা হযরত আয়েশার (রাঃ) নিকট গমন করেন এবং বলেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ নবী (সঃ) ও তাঁর পরিবারের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। উত্তরে হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ ‘মারহাবা, মারহাবা! অতঃপর তাঁকে ভিতরে প্রবেশের অনুমতি দেন। হযরত মাসরূক (রঃ) বলেনঃ আমি আপনাকে একটি বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে চাচ্ছি কিন্তু লজ্জাবোধ করছি।' তিনি বলেনঃ “আমি তোমার মা এবং তুমি আমার ছেলে (সুতরাং যা জিজ্ঞেস করতে চাও কর)।' তিনি বলেনঃ (আচ্ছা বলুন তো) ঋতুবতী স্ত্রীর সাথে তার স্বামীর কি করা কর্তব্য:' তিনি বলেন ‘লজ্জা স্থান ছাড়া সবই জায়েয (তাফসীর-ই-ইবনে জারীর)।' অন্য সনদেও বিভিন্ন শব্দে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে এ উক্তি বর্ণিত আছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) মুজাহিদ (রঃ), হাসান বসরী (রঃ) এবং ইকরামা (রঃ)-এর ফতওয়া এটাই। ভাবার্থ এই যে, ঋতুবতী স্ত্রীর সাথে উঠা-বসা, খাওয়া ও পান করা ইত্যাদি সবই সর্বসম্মতিক্রমে জায়েয।।
হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে,তিনি বলেনঃ “আমি ঋতুর অবস্থায় নবী (সঃ)-এর মস্তক ধৌত করতাম, তিনি আমার ক্রোড়ে হেলান দিয়ে শুয়ে কুরআন মাজীদ পাঠ করতেন। আমি হাড় চুষতাম এবং তিনিও ওখানেই মুখ দিয়ে চুষতেন। আমি পানি পান করে তাঁকে গ্লাস দিতাম এবং তিনিও ওখানেই মুখ দিয়ে ঐ গ্লাস হতেই ঐ পানিই পান করতেন। সেই সময় আমি ঋতুবতী থাকতাম। সুনান-ই- আবু দাউদের মধ্যে বর্ণিত আছে, হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “আমার ঋতুর অবস্থায় আমি ও রাসূলুল্লাহ (সঃ) একই বিছানায় শয়ন করতাম। তাঁর কাপড়ের কোন জায়গা খারাপ হয়ে গেলে তিনি শুধু ঐটুকু জায়গাই ধুয়ে ফেলতেন, শরীরের কোন জায়গায় কিছু লেগে গেলে ঐ জায়গাটুকুও ধুয়ে ফেলতেন এবং ঐ কাপড়েই নামায পড়তেন। তবে সুনানে আবূ দাউদের একটি বর্ণনায় এও রয়েছে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ ‘আমি ঋতুর অবস্থায় বিছানা হতে নেমে গিয়ে মাদুরের উপরে চলে আসতাম। আমি পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার নিকট আসতেন না। তাহলে এই বর্ণনাটির ভাবার্থ এই যে, তিনি সতর্কতামূলকভাবে এর থেকে বেঁচে থাকতেন, নিষিদ্ধতার জন্যে নয়।
কোন কোন মনীষী এ কথাও বলেন যে, কাপড় বাঁধানো অবস্থায় উপকার গ্রহণ করেছেন। হযরত হারিস হেলালিয়াহর (রাঃ) কন্যা মায়মুনা (রাঃ) বলেনঃ ‘নবী (সঃ) যখন তাঁর কোন সহধর্মিণীর সাথে মিলনের ইচ্ছে করতেন তখন তিনি তাকে কাপড় বেঁধে দেয়ার নির্দেশ দিতেন (সহীহ বুখারী)। এই রকমই সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে এই হাদীসটি হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “আমার স্ত্রীর ঋতুর অবস্থায় তার সাথে আমার কোন কিছু বৈধ আছে কি:' তিনি বলেন কাপড়ের উপরের সব কিছুই বৈধ (সুনান-ই-আবু দাউদ ইত্যাদি)। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, এটা হতে বেঁচে থাকাও উত্তম। হযরত আয়েশা (রাঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হযরত সাঈদ বিন মুসাইয়াব (রাঃ) এবং হযরত শুরাইহের (রাঃ) মাযহাবও এটাই। এই ব্যাপারে ইমাম শাফিঈর (রাঃ) দু'টি উক্তি রয়েছে, তন্মধ্যে এটাও একটি। অধিকাংশ ইরাকী প্রভৃতি মনীষীরও এটাই মাযহাব। তাঁরা বলেন যে, সহবাস যে হারাম এটাতো সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত। কাজেই এর আশপাশ হতেও বেঁচে থাকা উচিত যাতে হারামের মধ্যে পতিত হওয়ার সম্ভাবনা না থাকে। ঋতুর অবস্থায় সহবাসের নিষিদ্ধতা এবং যে ব্যক্তি। এই কার্যে পতিত হবে তার পাপী হওয়া, এটা তো নিশ্চিত কথা। তাকে অবশ্যই ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে।
কিন্তু তাকে কাফ্ফারাও দিতে হবে কি-না এ বিষয়ে আলেমদের দু'টি উক্তি রয়েছে। প্রথম উক্তি এই যে, তাকে কাফফারাও দিতে হবে। মুসনাদ-ইআহমাদ ও সুনানের মধ্যে রয়েছে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি তার ঋতুবতী স্ত্রীর সাথে সহবাস করে সে যেন একটি স্বর্ণ মুদ্রা বা অর্ধ স্বর্ণ মুদ্রা দান করে।' জামেউত্ তিরমিযী শরীফের মধ্যে রয়েছে যে, যদি রক্ত লাল হয় তবে একটা স্বর্ণ মুদ্রা আর যদি রক্ত হলদে বর্ণের হয় তবে অর্ধস্বর্ণ মুদ্রা। মুসনাদ-ই-আহমদের মধ্যে রয়েছে যে, যদি রক্ত শেষ হয়ে গিয়ে থাকে এবং এখন পর্যন্ত স্ত্রী গোসল না করে থাকে, এই অবস্থায় যদি স্বামী তার স্ত্রীর সাথে মিলিত হয় তবে অর্ধ দীনার, নচেৎ এক দীনার। দ্বিতীয় উক্তি এই যে, কাফফারা কিছুই নেই। শুধুমাত্র আল্লাহ তাআলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করলেই চলবে। ইমাম শাফিঈ (রঃ) এ কথাই বলেন। অধিকতর সঠিক মাযহাবও এটাই এবং জমহুর ওলামাও এই মতই পোষণ করেন। যে হাদীসগুলো উপরে বর্ণিত হয়েছে সেই সম্পর্কে এঁদের কথা এ যে, এগুলোর মারফ হওয়া সঠিক কথা নয়, রবং সঠিক কথা এ যে, এলো। মাওকুফ হাদীস বর্ণনা হিসেবে এগুলো মারফু ও মাওকুফ উভয় রূপে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ হাদীসশাস্ত্রবিদের মতে সঠিক কথা এই যে, এগুলো মাওকুফ হাদীস। তাদের নিকটে যেও না' এটা তাফসীর হচ্ছে এ নির্দেশের যে, ঋতুর অবস্থায় স্ত্রীগণ হতে তোমরা পৃথক থাকবে। এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, ঋতু শেষ হয়ে গেলে তাদের নিকট যাওয়া বৈধ।
হযরত ইমাম আবু আবদিল্লাহ আহমাদ বিন মুহাম্মদ বিন হাম্বল (রঃ) বলেনঃ পবিত্রতা বলে দিচ্ছে যে, এখন তার নিকটে যাওয়া জায়েয। হযরত মায়মুনা (রাঃ) এবং হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “আমাদের মধ্যে যখন কেউ ঋতুবতী হতেন তখন তিনি কাপড় বেঁধে দিতেন এবং নবী (সঃ)-এর সাথে তার চাদরে শুয়ে যেতেন। এর দ্বারা এটাই সাব্যস্ত হচ্ছে যে, নিকটে যাওয়া হতে নিষেধ করার অর্থ সহবাস হতে নিষেধ করা। এ ছাড়া তার সাথে শয়ন, উপবেশন ইত্যাদি সবই বৈধ।
এরপরে ইরশাদ হচ্ছে-তারা যখন পবিত্র হয়ে যাবে তখন তাদের সাথে সহবাস কর। ইমাম ইবনে হাযাম (রঃ) বলেন যে, প্রত্যেক হায়েযের পবিত্রতার উপর সহবাস করা ওয়াজিব। তার দলীল হচ্ছে (আরবি) অর্থাৎ তাদের নিকটে এসো' এই শব্দটি। কিন্তু এটা কোন শক্ত দলীল নয়। এটা শুধু অবৈধতা সরিয়ে দেয়ার ঘোষণা। এছাড়া অন্য কোন দলীল তার কাছে নেই। উসুল’ শাস্ত্রের আলেমগণের মধ্যে কেউ কেউ বলেন যে, আমর’ অর্থাৎ নির্দেশ সাধারণভাবে অবশ্যকরণীয়রূপে এসে থাকে। তাদের পক্ষে ইমমি ইবনে হাযামের কথার উত্তর দেয়া খুব কঠিন। আবার কেউ কেউ বলেন যে, এই নির্দেশ শুধু অনুমতির জন্য। এর পূর্বে নিষিদ্ধতার কথা এসেছে বলে এটা এরই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এখানে আমর’ অবশ্য করণীয়ের জন্যে নয়। কিন্তু এটা বিবেচ্য বিষয়। দলীল দ্বারা যা সাব্যস্ত হয়েছে তা এই যে, এরূপ স্থলে অর্থাৎ পূর্বে নিষিদ্ধ এবং পরে নির্দেশ, এ অবস্থায় নির্দেশ স্বীয় মূলের উপরেই বিদ্যমান থাকে। অর্থাৎ যা নিষিদ্ধ হওয়ার পূর্বে যেমন ছিল এখন তেমনই হয়ে যাবে। অর্থাৎ নিষিদ্ধ হওয়ার পূর্বে যদি কাজটি ওয়াজিব থেকে থাকে তবে এখনও ওয়াজিবই থাকবে। যেমন কুরআন মাজীদের মধ্যে রয়েছে (আরবি) অর্থাৎ যখন নিষিদ্ধ মাসগুলো অতীত হয়ে যাবে তখন তোমরা মুশরিকদের হত্যা কর।' (৯:৫) আর যদি নিষিদ্ধতার পূর্বে তা বৈধ থেকে থাকে তবে তা বৈধই থাকবে। যেমন কুরআন পাকের (আরবি) অর্থাৎ যখন তোমরা ইহরাম খুলে দেবে তখন তোমরা শিকার কর।' (৫২) অন্য স্থানে রয়েছেঃ (আরবি)
অর্থাৎ যখন নামায পুরো করা হয়ে যাবে তখন তোমরা পৃথিবীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়।' (৬২:১০) ঐ আলেমদের এই সিদ্ধান্ত ঐ বিভিন্ন উক্তিগুলোকে একত্রিত করে দেয় যা ‘আমরে’র অবশ্যকরণীয় ইত্যাদি সম্বন্ধে রয়েছে। ইমাম গাযযালী (রঃ) প্রভৃতি মনীষীও এটা বর্ণনা করেছেন। পরবর্তী কতকগুলো ইমাম এটাও পছন্দ করেছেন। এটাই সঠিকও বটে। এই জিজ্ঞাস্য বিষয়টিও স্মরণীয় যে, যখন হায়েযের রক্ত আসা বন্ধ হয়ে যাবে এবং সময় অতিক্রান্ত হয়ে যাবে, ওর পরেও স্ত্রীর সাথে স্বামীর সহবাস হালাল হবে না যে পর্যন্ত না সে গোসল করবে। হাঁ, তবে যদি তার কোন ওজর থাকে এবং গোসলের পরিবর্তে যদি তার জন্যে তায়াম্মুম করা যায়েয হয় তবে তায়াম্মুমের পর তার কাছে স্বামী আসতে পারে। এতে সমস্ত আলেমের মতৈক্য রয়েছে। তবে ইমাম আবু হানিফা (রঃ) এ সমস্ত আলেমের বিপরীত মত পোষণ করেন। তিনি বলেন যে, যদি হায়েয় শেষ সময়কাল অর্থাৎ দশ দিন পর্যন্ত থেকে বন্ধ হয়ে যায় তবে সে গোসল না করলেও তার স্বামী তার সাথে সহবাস করতে পারে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, একবার তো (আরবি) শব্দ রয়েছে; এর ভাবার্থ হচ্ছে হায়েযের রক্ত বন্ধ হওয়া এবং তাত্বাহহারনা' শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে গোসল করা। হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত ইকরামা (রঃ), হযরত হাসান বসরী (রঃ), হযরত মুকাতিল বিন হিববান (রঃ) হযরত শায়েস বিন সা'দ (রঃ) প্রভৃতি মহান ব্যক্তিও এটাই বলেন।
অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে-তোমরা ঐ জায়গা দিয়ে এসো, আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে যার নির্দেশ দিচ্ছেন। এর ভাবার্থ হচ্ছে সম্মুখের স্থান। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ) প্রভৃতি অনেক মুফাসসিরও এই অর্থই বর্ণনা করেছেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে শিশুদের জন্মগ্রহণের জায়গা। এছাড়া অন্য স্থান অর্থাৎ পায়খানার স্থানে যাওয়া নিষিদ্ধ। এই রকম কাজ যারা করে তারা সীমা অতিক্রমকারী। সাহাবা (রাঃ) এবং তাবেঈন (রঃ) হতে এর ভাবার্থ এরূপ বর্ণিত হয়েছেঃ ‘হায়েযের অবস্থায় যে স্থান হতে তোমাদেরকে বিরত রাখা হয়েছিল এখন ঐ স্থান তোমাদের জন্যে হালাল হয়ে গেল। এর দ্বারা পরিষ্কারভাবে বুঝা গেল যে, পায়খানার জায়গায় সহবাস করা হারাম। এর বিস্তারিত বর্ণনাও ইনশাআল্লাহ আসছে। পবিত্রতার অবস্থায় এসে যখন সে হায়েয হতে বেরিয়ে আসে’এ অর্থও নেয়া হয়েছে। এজন্যেই এর পরবর্তী বাক্যে পাপ কার্য হতে প্রত্যাবর্তনকারী ও হায়েযের অবস্থায় স্ত্রী সহবাস হতে দূরে অবস্থানকারীকে আল্লাহ তা'আলা ভালবাসেন। অনুরূপভাবে (প্রস্রাবের স্থান ছাড়া) অন্য স্থান হতে যারা বিরত থাকে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকেও অলবাসেন।
এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-তোমাদের স্ত্রীগুলো তোমাদের ক্ষেত্র বিশেষ। অর্থাৎ সন্তান বের হওয়ার স্থানে তোমরা যেভাবেই চাও তোমাদের ক্ষেত্রে এসো। নিয়ম ও পদ্ধতি পখক হলেও স্থান একই। অর্থাৎ সম্মুখে করে অথবা তার বিপরীত। সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে রয়েছে : ইয়াহূদীরা বলতো যে, স্ত্রীর সঙ্গে সম্মুখের দিক দিয়ে সহবাস না করে যদি স্ত্রী গর্ভবতী হয়ে যায় তবে টেরা চক্ষু বিশিষ্ট সন্তান জন্মলাভ করবে। তাদের এ কথার খগুনে এই বাক্যটি অবতীর্ণ হয়। এতে বলা হয় যে, স্বামীর এই ব্যাপারে স্বাধীনতা রয়েছে। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতীম' গ্রন্থে রয়েছে যে, ইয়াহুদীরা এই কথাটিই মুসলমানদেরকেও বলেছিল। ইবনে জুরাইজ (রঃ) বলেন যে, এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই স্বাধীনতা দিয়েছেন যে, সম্মুখের দিক দিয়ে আসতে পারে এবং পিছনের দিক দিয়েও আসতে পারে। কিন্তু স্থান একটিই হবে।
অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করেঃ “আমরা আমাদের স্ত্রীদের নিকট কিরূপে আসবো এবং কিরূপে ছাড়বো:” তিনি উত্তরে বলেন, তারা তোমাদের ক্ষেত্র বিশেষ, যেভাবেই চাও এসো। হাঁ, তবে তাদের মুখের উপরে মেরো না, তাদেরকে খুব মন্দ বলো না, ক্রোধ বশতঃ তাদের হতে পৃথক হয়ে যেয়ো না। একই ঘরে অবস্থান কর (আহমাদ ও সুনান)।' (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতীমের মধ্যে রয়েছে যে, হামীর গোত্রের এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করে, আমার স্ত্রীদের সাথে আমার খুব ভালবাসা রয়েছে। সুতরাং তাদের সম্বন্ধে যে নির্দেশাবলী রয়েছে তা আমাকে বলে দিন।'তখন এই নির্দেশ অবতীর্ণ হয়। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে যে, কয়েকজন আনসারী সাহাবী (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এটা জিজ্ঞেস করেছিলেন। তাহাবীর (রঃ) মুশকিলুল হাদীস গ্রন্থে রয়েছে যে, এক ব্যক্তি তার স্ত্রীর সাথে উল্টোভাবে সহবাস করেছিল। এতে মানুষ তার সমালোচনা করলে এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।
‘তাফসীর-ই-ইবনে জারীরের মধ্যে রয়েছে যে, হযরত আবদুল্লাহ বিন সাবেতাহ (রাঃ) হযরত আবদুর রহমান বিন আবু বকরের (রাঃ) কন্যা হযরত হাফসার (রাঃ) নিকটে এসে বলেন, আমি একটি জিজ্ঞাস্য সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করতে চাই, কিন্তু লজ্জাবোধ করছি।' তিনি বলেন, হে ভ্রাতুস্পুত্র! লজ্জা করো, যা জিজ্ঞেস করতে চাও জিজ্ঞেস কর।' তিনি বলেন, আচ্ছা বলুন তো, স্ত্রীদের সাথে পিছনের দিক দিয়ে সহবাস করা বৈধ কি:' তিনি বলেন, হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) আমাকে বলেছেন যে, আনসারগণ (রাঃ) স্ত্রীদেরকে উল্টো করে শোয়ায়ে দিতেন এবং ইয়াহূদীরা বলতো যে, এভাবে সহবাস করলে সত্তন টেরা হয়ে থাকে। অতঃপর যখন মুহাজিরগণ (রাঃ) মদীনায় আগমন করেন এবং এখানকার স্ত্রী লোকদের সাথে তাদের বিয়ে হয়, তখন তারাও এরূপ করতে চাইলে একজন স্ত্রীলোক তার স্বামীর এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করতঃ বলেন, 'আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এ সম্বন্ধে জিজ্ঞেস না করা পর্যন্ত আপনার কথা মানতে পারি না। সুতরাং তিনি নবীর (সঃ) দরবারে উপস্থিত হন। হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) তাঁকে বসিয়ে দিয়ে বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এখনই এসে যাবেন।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) আগমন করলে ঐ আনসারিয়া স্ত্রী লোকটি তো লজ্জায় জিজ্ঞেস করতে না পেরে ফিরে যান। কিন্তু হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) তাঁকে জিজ্ঞেস করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, ‘আনসারিয়া স্ত্রী লোকটিকে ডেকে পাঠাও।' তিনি তাঁকে ডেকে আনলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে এই আয়াতটি পাঠ করে শুনান এবং বলেন, স্থান একটিই হবে।
মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে যে, একদা হযরত উমার বিন খাত্তাব (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি তো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছি। তিনি বলেন, ব্যাপার কি: হযরত উমার (রাঃ) বলেন, রাত্রে আমি আমার সোয়ারী উল্টো করেছি।' তিনি কোন উত্তর দিলেন না। সেই সময়ই এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং তিনি বলেন, 'তুমি সম্মুখের দিক হতে বা পিছনের দিক হতে এসো, তোমার দু'টোরই অধিকার রয়েছে। কিন্তু ঋতুর অবস্থায় এসো না। আনসারীর ঘটনা সম্বলিত হাদীসটি। কিছু বিস্তারিতভাবেও বর্ণিত হয়েছে এবং তাতে এও রয়েছে যে,হযরত আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ)-কে আল্লাহ ক্ষমা করুন,তিনি কিছু সন্দেহের মধ্যে পতিত হয়েছেন। কথা এই যে, আনসারদের দল প্রথমে মূর্তি পূজক ছিলেন এবং ইয়াহুদীরা আহলে কিতাব ছিল। মূর্তি পূজকেরা কিতাবীদের মর্যাদা ও বিদ্যার কথা স্বীকার করতো। ইয়াহূদীরা একই প্রকারে তাদের স্ত্রীদের সাথে সহবাস করতো। আনসারদেরও এই অভ্যাসই ছিল। পক্ষান্তরে মক্কাবাসীরা কোন নির্দিষ্ট নিয়মের অনুসারী ছিল না। তারা যথেচ্ছা স্ত্রীদের সাথে মিলিত হতো।
ইসলাম গ্রহণের পর মক্কাবাসী মুহাজিরগণ (রাঃ) যখন মদীনায় আগমন করেন তখন মক্কা হতে আগত একজন মুহাজির পুরুষ মদীনার একজন আনসারিয়াহু মহিলাকে বিয়ে করেন এবং মনোমত পন্থায় স্ত্রীর সাথে সহবাসের ইচ্ছে প্রকাশ করেন। মহিলাটি অস্বীকার করে বসেন এবং স্পষ্ট ভাষায় বলে দেন, ‘আমি ঐ একই নিয়ম ছাড়া অনুমতি দেবো না। কথা বাড়তে বাড়তে রাসূলুল্লাহ (সঃ) পর্যন্ত পৌছে যায়। অতঃপর এই নির্দেশ অবতীর্ণ হয়। সুতরাং সামনে বা পিছনে যেভাবে ইচ্ছা সহবাসের অধিকার রয়েছে, তবে স্থান একটিই হবে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন, 'আমি হযরত ইবনে আব্বাসের (রাঃ) নিকট কুরআন মাজীদ শিক্ষা করেছি। প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত তাকে শুনিয়েছি। এক একটি আয়াতের তাফসীর ও ভাবার্থ তাকে জিজ্ঞেস করেছি। এই আয়াতে পৌছে যখন আমি তাঁকে এই আয়াতের ভাবার্থ জিজ্ঞেস করি তখন তিনি এটাই বর্ণনা করেন যা উপরে বর্ণিত হয়েছেঃ হযরত ইবনে উমারের (রাঃ) সন্দেহ ছিল এই যে, কতকগুলো বর্ণনায় রয়েছেঃ তিনি কুরআন মাজীদ পাঠের সময় কাউকেও বলতেন না। কিন্তু একদিন পাঠের সময় যখন এই আয়াতে পৌছেন তখন তিনি হযরত নাফে' (রঃ) নামক তাঁর একজন ছাত্রকে জিজ্ঞেস করেন, এই আয়াতটি কি সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল তা তুমি জান কি:' তিনি বলেন, ‘না’। তখন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, এটা স্ত্রী লোকদের অন্য জায়গায় সহবাস সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল।' একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, তিনি (ইবনে উমার রাঃ) বলেন, একটি লোকে তার স্ত্রীর সাথে পিছন দিক দিয়ে সহবাস করেছিল। ফলে এই আয়াতটি ঐ কাজের অনুমতি প্রদান হিসেবে অবতীর্ণ হয়। কিন্তু প্রথমতঃ হাদীস শাস্ত্রবিদগণ এতে কিছুটা ক্রটি বর্ণনা করেছেন। দ্বিতীয়তঃ এর অর্থও এই হতে পারে যে, পিছনের দিক দিয়ে সম্মুখের স্থানে করেছিলেন এবং উপরের বর্ণনাগুলোও সনদ হিসেবে সহীহ নয়। বরং ঐ হযরত নাফে' (রঃ) হতেই বর্ণিত আছে যে,তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়, আপনি কি একথা বলেন যে, হযরত ইবনে উমার (রাঃ) গুহ্যদ্বারে সহবাস জায়েয বলেছেন:' তিনি বলেন, 'মানুষ মিথ্যা বলে থাকে। অতঃপর তিনি ঐ আনসারিয়াহ মহিলা ও মুহাজির পুরুষটির ঘটনাটাই বর্ণনা করেন এবং বলেন যে, হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) তো এই আয়াতের এই ভাবার্থ বর্ণনা করতেন। এই বর্ণনার ইসনাদও সম্পূর্ণরূপেই সঠিক এবং এর বিপরীত সনদ সঠিক নয়। ভাবার্থও অন্যরূপ হতে পারে। স্বয়ং হযরত ইবনে উমার (রাঃ)। হতেও এর বিপরীত বর্ণিত হয়েছে। ঐ বর্ণনাগুলো ইনশাআল্লাহ অতিসত্বরই। বর্ণিত হচ্ছে। ওগুলোর মধ্যে রয়েছে যে, হযরত ইবনে উমার (রাঃ) বলেন, 'না এটা মুবাহ্, না হালাল, বরং হারাম। যদিও বৈধতার উক্তির সম্বন্ধ মদীনার কোন কোন ফকীহ প্রভৃতি মনীষীর দিকে লাগানো হয়েছে এবং কেউ কেউ তো ইমাম মালিকের (রঃ) দিকেও সম্বন্ধ লাগিয়েছেন, কিন্তু অধিকাংশ লোক এটা অস্বীকার করেছেন এবং বলেছেন যে, এটা কখনও ইমাম মালিকের (রঃ) কথা নয়। বহু সহীহ হাদীস দ্বারা এ কাজের অবৈধতা প্রমাণিত হয়েছে।
একটি বর্ণনায় রয়েছে-‘হে জনমণ্ডলী! তোমরা লজ্জাবোধ কর। আল্লাহ তা'আলা সত্য কথা বলতে লজ্জাবোধ করেন না। স্ত্রীদের গুহ্যদ্বারে সহবাস করো না’। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ কার্য হতে মানুষকে নিষেধ করেছেন (মুসনাদ-ই-আহমাদ) আরও একটি বর্ণনায় রয়েছে, “যে ব্যক্তি কোন স্ত্রী বা পুরুষের সঙ্গে একাজ করে, তার দিকে আল্লাহ তা'আলা করুণার দৃষ্টিতে দেখবেন না। (জামেউত্ তিরমিযী) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে এক ব্যক্তি এই সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, 'তুমি কি কুফরী করা সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করছে। এক ব্যক্তি তার নিকট এসে বলেন, (আরবি)-এর এই অর্থ বুঝেছি এবং এর উপর আমল করেছি। তখন তিনি অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হন, তাকে ভৎর্সনা করেন এবং বলেন, 'ভাবার্থ এই যে, দাড়িয়ে কর অথবা পেটের ভরে শোয়া। অবস্থায় কর, কিন্তু জায়গা একটিই হবে। অন্য এইটি মারফু হাদীসে রয়েছে যে, যে ব্যক্তি তার স্ত্রীর গুহ্যদ্বারে সহবাস করে সে ছোট ‘লুতী (হযরত লুত আঃ -এর সম্প্রদায়ভুক্ত)-মুসনাদ-ই-আহমাদ। হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) বলেন যে, এটা কাফিরদের কাজ। হযরত আবদুল্লাহ বিন আমর বিন আল-আস (রাঃ) হতেও এটা নকল করা হয়েছে এবং অধিকতর এটাই সঠিক।
রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘সাত প্রকার লোক রয়েছে যাদের দিকে আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন করুণার দৃষ্টিতে দেখবেন না এবং তাদেরকে পবিত্র করবেন না। এবং তাদেরকে বলে দেবেনঃ ‘দোযখীদের সাথে দোযখে চলে যাও।' (১) ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিণী (২) হস্ত মৈথুনকারী (৩) চতুষ্পদ জন্তুর সাথে এই কার্যকারী (৪) স্ত্রীর গুহ্যদ্বারে সহবাসকারী (৫) স্ত্রী ও তার মেয়েকে বিয়েকারী। (৬) প্রতিবেশির স্ত্রীর সাথে ব্যভিচারকারী এবং (৭) প্রতিবেশীকে এমনভাবে শাসন গর্জনকারী যে, শেষ পর্যন্ত সে তাকে অভিশাপ দেয়। কিন্তু এর সনদের মধ্যে লাহীআহ এবং তার শিক্ষক দু’জনই দুর্বল। মুসনাদ-ই-আহমাদের একটি হাদীসে রয়েছে যে, যে ব্যক্তি তার স্ত্রীর সাথে অন্য পথে সহবাস করে তাকে আল্লাহ দয়ার দৃষ্টিতে দেখেন না। মুসনাদ-ই-আহমাদ এবং সনানের মধ্যে বর্ণিত আছে যে, যে ব্যক্তি ঋতুবতী স্ত্রীর সাথে সহবাস করে অথবা অন্য পথে সহবাস করে কিংবা যাদুকরের নিকট গমন করে এবং তাকে সত্যবাদী মনে করে সে ঐ জিনিসকে অস্বীকার করলো যা মুহাম্মদ (সঃ)-এর উপর অবতীর্ণ হয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) বলেন যে, ইমাম বুখারী (রঃ) এই হাদীসকে দুর্বল বলেছেন।
জামেউত্ তিরমিযীর মধ্যে বর্ণিত আছে যে, গুহ্যদ্বারে সহবাস করাকে হযরত আবু সালমাও (রাঃ) হারাম বলতেন। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ ‘লোকদের স্ত্রীদের সাথে এই কাজ করা কুফরী (সুনান-ই-নাসাঈ)। এই অর্থের একটি মারফু হাদীসও বর্ণিত আছে। কিন্তু হাদীসটির মাওকুফ হওয়াই অধিকরত সঠিক কথা। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, এই স্থানটি হারাম। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) এই কথাই বলেন। হযরত আলী (রাঃ) এই সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হলে তিনি বলেনঃ ‘সেই ব্যক্তি অত্যন্ত বর্বর। তুমি আল্লাহর কালাম শুননি: কুরআন পাকের মধ্যে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যখন লুতের (আঃ) কওমকে বলা হলো-তোমরা কি এমন নির্লজ্জতার কাজ করছে যা তোমাদের পূর্বে সারা বিশ্বে কেউ কোনদিন করেনি: সুতরাং বিশুদ্ধ হাদীসসমূহ হতে এবং সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ) হতে বহু বর্ণনা ও সনদ দ্বারা এই কার্যের নিষিদ্ধতা বর্ণিত আছে। এই কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, হযরত আবদুল্লাহ্ বিন উমারও (রাঃ) এই কাজকে অবৈধই বলেছেন। যেহেতু দারেমী’র মধ্যে রয়েছে যে, একবার তিনি এই সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হয়ে বলেছিলেনঃ মুসলমানও এই কাজ করতে পারে: এর ইসনাদ সঠিক এবং এর দ্বারা এই কার্যের অবৈধতাও পরিষ্কারভাবে বুঝা যাচ্ছে। সুতরাং অশুদ্ধ ও বিভিন্ন অর্থ বিশিষ্ট বর্ণনাগুলোর পিছনে পড়ে এরূপ একজন মর্যাদা সম্পন্ন সাহাবীর (রাঃ) দিকে এরূপ জঘন্য মাসআলার সম্বন্ধ লাগানো মোটেই ঠিক নয়। এই প্রকারের বর্ণনাগুলো পাওয়া গেলেও ঐগুলো সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাজ্য। এখন রইলেন ইমাম মালিক (রঃ)। তাঁর দিকেও এই কার্যের বৈধতার সম্বন্ধ লাগানো উচিত হবে না।
হযরত মুআম্মার বিন ঈসা (রঃ) বলেন যে, হযরত ইমাম মালিক (রঃ) এই কার্যকে হারাম বলতেন। ইসরাঈল বিন রাওহ্ (রঃ) একদা তাঁকে এই প্রশ্নই করলে তিনি বলেন, তুমি কি নির্বোধ: বীজ বপন তো ক্ষেত্রেই করতে হয়। সাবধান! লজ্জা স্থান ছাড়া অন্য জায়গা হতে বেঁচে থাকবে। প্রশ্নকারী বলেন, ‘জনাব! জনগণ তো একথাই বলে থাকে যে, আপনি এই কাজকে বৈধ বলেন। তখন তিনি বলেন, তারা মিথ্যাবাদী। আমার উপর তারা অপবাদ দিচ্ছে।' সুতরাং ইমাম মালিক (রঃ) হতেও এর অবৈধতা সাব্যস্ত হচ্ছে। ইমাম আবু হানীফা (রঃ), ইমাম শাফিঈ (রঃ) ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রঃ) এবং তাদের সমস্ত ছাত্র ও সহচর যেমন সাঈদ বিন মুসাইয়াব (রঃ), আবু সালমা (রঃ) ইকরামা (র), তাউস (রঃ), আতা (রঃ) সাঈদ বিন যুবাইর (রঃ) উরওয়া বিন যুবাইর (রঃ), মুজাহিদ (রঃ) এবং হাসান বসরী (রঃ) প্রভৃতি মনীষীগণ সবাই এই কাজকে অবৈধ বলেছেন এবং এ বিষয়ে অত্যন্ত কঠোরতা অবলম্বন করেছেন। এমনকি তাদের মধ্যে কেউ কেউ এ কার্যকে কুফরী পর্যন্ত বলেছেন। এর অবৈধতায় জমহুর উলামারও ইজমা রয়েছে। যদিও কতকগুলো লোক মদীনার ফকীহগণ হতে এমন কি ইমাম মালিক (রঃ) হতেও এর বৈধতা নকল করেছেন কিন্তু এগুলো সঠিক নয়।
আবদুর রহমান বিন কাসিম (রঃ) বলেন, কোন ধর্মভীরু লোককে আমি এর অবৈধতা সম্বন্ধে সন্দেহ করতে দেখিনি। অতঃপর তিনি (আরবি) পাঠ করে বলেন, স্বয়ং (আরবি) অর্থাৎ ক্ষেত্র শব্দটিই এর অবৈধতা প্রকাশ করার জন্যে যথেষ্ট। কেননা, অন্য জায়গা ক্ষেত্র নয়। ক্ষেত্রে যাবার পদ্ধতির স্বাধীনতা রয়েছে। বটে কিন্তু ক্ষেত্র পরিবর্তনের স্বাধীনতা নেই। ইমাম মালিক (রঃ) হতে এটা বৈধ হওয়ার বর্ণনাসমূহ নকল করা হলেও সেগুলোর ইসনাদের মধ্যে অত্যন্ত দুর্বলতা রয়েছে। অনুরূপভাবে ইমাম শাফিঈ (রঃ) হতেও লোকেরা একটি বর্ণনা বানিয়ে নিয়েছে। অথচ তিনি তার ছয়খানা গ্রন্থে স্পষ্ট ভাষায় এটাকে হারাম লিখেছেন।
এরপর আল্লাহ তাআলা বলেন-নিজেদের জন্যে তোমরা অর্থেই কিছু পাঠিয়ে দাও। অর্থাৎ নিষিদ্ধ বস্তুসমূহ হতে বিরত থাক এবং সত্যার্যাবলী সম্পাদন কর, যেন পুণ্য অগ্রে চলে যায়। আল্লাহকে ভয় কর এবং বিশ্বাস রেখো যে, তার সাথে তোমাদেরকে সাক্ষাৎ করতে হবে ও তিনি পুঙ্খানুপুঙখরূপে তোমাদের হিসাব নেবেন। ঈমানদারগণ সদা আনন্দিত থাকবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ ভাবার্থ এও হতে পারে যে, সহবাসের ইচ্ছে করলে নিম্নের দুআটি পাঠ করবে। (আরবি) অর্থাৎ হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে ও আমাদের সন্তানদেরকে শয়তান হতে রক্ষা করুন।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ যদি এই সহবাস দ্বারা শুক্র ধরে যায় তবে শয়তান ঐ সন্তানের কোনই ক্ষতি করতে পারবে না।'
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।