সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 196)
হরকত ছাড়া:
وأتموا الحج والعمرة لله فإن أحصرتم فما استيسر من الهدي ولا تحلقوا رءوسكم حتى يبلغ الهدي محله فمن كان منكم مريضا أو به أذى من رأسه ففدية من صيام أو صدقة أو نسك فإذا أمنتم فمن تمتع بالعمرة إلى الحج فما استيسر من الهدي فمن لم يجد فصيام ثلاثة أيام في الحج وسبعة إذا رجعتم تلك عشرة كاملة ذلك لمن لم يكن أهله حاضري المسجد الحرام واتقوا الله واعلموا أن الله شديد العقاب ﴿١٩٦﴾
হরকত সহ:
وَ اَتِمُّوا الْحَجَّ وَ الْعُمْرَۃَ لِلّٰهِ ؕ فَاِنْ اُحْصِرْتُمْ فَمَا اسْتَیْسَرَ مِنَ الْهَدْیِ ۚ وَ لَا تَحْلِقُوْا رُءُوْسَکُمْ حَتّٰی یَبْلُغَ الْهَدْیُ مَحِلَّهٗ ؕ فَمَنْ کَانَ مِنْکُمْ مَّرِیْضًا اَوْ بِهٖۤ اَذًی مِّنْ رَّاْسِهٖ فَفِدْیَۃٌ مِّنْ صِیَامٍ اَوْ صَدَقَۃٍ اَوْ نُسُکٍ ۚ فَاِذَاۤ اَمِنْتُمْ ٝ فَمَنْ تَمَتَّعَ بِالْعُمْرَۃِ اِلَی الْحَجِّ فَمَا اسْتَیْسَرَ مِنَ الْهَدْیِ ۚ فَمَنْ لَّمْ یَجِدْ فَصِیَامُ ثَلٰثَۃِ اَیَّامٍ فِی الْحَجِّ وَ سَبْعَۃٍ اِذَا رَجَعْتُمْ ؕ تِلْکَ عَشَرَۃٌ کَامِلَۃٌ ؕ ذٰلِکَ لِمَنْ لَّمْ یَکُنْ اَهْلُهٗ حَاضِرِی الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ ؕ وَ اتَّقُوا اللّٰهَ وَ اعْلَمُوْۤا اَنَّ اللّٰهَ شَدِیْدُ الْعِقَابِ ﴿۱۹۶﴾
উচ্চারণ: ওয়া আতিম্মুল হাজ্জা ওয়াল ‘উমরাতা লিল্লা-হি ফাইন উহসিরতুম ফামাছ তাইছারা মিনাল হাদয়ি ওয়ালা-তাহলিকূরুঊছাকুম হাত্তা-ইয়াবলুগাল হাদইউ মাহিল্লা-হূ ফামান কা-না মিনকুম মারীদান আও বিহীআযাম মির রা’ছিহী ফাফিদইয়াতুম মিন সিয়া-মিন আও সাদাকাতিন আও নুছুকিন ফাইযা-আমিনতুম ফামান তামাত্তা‘আ বিল ‘উমরাতি ইলাল হাজ্জি ফামাছতাইছারা মিনাল হাদয়ি ফামাল্লাম ইয়াজিদ ফাসিয়া-মু ছালা-ছাতি আইয়া-মিন ফিল হাজ্জি ওয়া ছাব‘আতিন ইযা-রাজা‘তুম তিলকা ‘আশারাতুন কা-মিলাতুন যা-লিকা লিমাল্লাম ইয়াকুন আহলুহূহা-দিরিল মাছজিদিল হারা-মি ওয়াত্তাকূল্লা-হা ওয়া‘লামূআন্নাল্লা-হা শাদীদুল ‘ইকা-ব।
আল বায়ান: আর হজ ও উমরা আল্লাহর জন্য পূর্ণ কর। অতঃপর যদি তোমরা আটকে পড় তবে যে পশু সহজ হবে (তা যবেহ কর)। আর তোমরা তোমাদের মাথা মুন্ডন করো না, যতক্ষণ না পশু তার যথাস্থানে পৌঁছে। আর তোমাদের মধ্যে যে অসুস্থ কিংবা তার মাথায় যদি কোন কষ্ট থাকে তবে সিয়াম কিংবা সদাকা অথবা পশু যবেহ এর মাধ্যমে ফিদয়া দেবে। আর যখন তোমরা নিরাপদ হবে তখন যে ব্যক্তি উমরার পর হজ সম্পাদনপূর্বক তামাত্তু করবে, তবে যে পশু সহজ হবে, তা যবেহ করবে। কিন্তু যে তা পাবে না তাকে হজে তিন দিন এবং যখন তোমরা ফিরে যাবে, তখন সাত দিন সিয়াম পালন করবে। এই হল পূর্ণ দশ। এই বিধান তার জন্য, যার পরিবার মাসজিদুল হারামের অধিবাসী নয়। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ আযাবদানে কঠোর।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৯৬. আর তোমরা হজ ও উমরা পূর্ণ কর(১) আল্লাহর উদ্দেশ্যে। অতঃপর যদি তোমরা বাধা প্রাপ্ত হও তাহলে সহজলভ্য হাদঈ(২) প্রদান করো। আর তোমরা মাথা মুন্ডন করো না(৩) যে পর্যন্ত হাদঈ তার স্থানে না পৌছে। অতঃপর তোমাদের মধ্যে যদি কেউ অসুস্থ হয় বা মাথায় কষ্টদায়ক কিছু হয় তবে সিয়াম কিংবা সাদাকা অথবা পশু যবেহ দ্বারা তার ফিদইয়া দিবে(৪)। অতঃপর যখন তোমরা নিরাপদ হবে তখন তোমাদের মধ্যে যে কেউ উমরাকে হজের সঙ্গে মিলিয়ে লাভবান হতে চায়(৫) সে সহজলভ্য হাদঈ যবাই করবে। কিন্তু যদি কেউ তা না পায়, তবে তাকে হজের সময় তিন দিন এবং ঘরে ফিরার পর সাত দিন এ পূর্ণ দশ দিন সিয়াম পালন করতে হবে। এটা তাদের জন্য, যাদের পরিজনবর্গ মসজিদুল হারামের বাসিন্দা নয়। আর তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর এবং জেনে রাখ যে, নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি দানে কঠোর।(৬)
তাইসীরুল ক্বুরআন: আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হাজ্জ ও ‘উমরাহকে পূর্ণ কর, কিন্তু যদি তোমরা বাধাগ্রস্ত হও, তবে যা সম্ভব কুরবানী দিবে এবং কুরবানী যথাস্থানে না পৌঁছা পর্যন্ত নিজেদের মস্তক মুন্ডন করো না, তবে তোমাদের মধ্যে যে পীড়িত কিংবা মাথায় যন্ত্রণাগ্রস্ত, সে রোযা কিংবা সদাক্বাহ বা কুরবানী দ্বারা ফিদইয়া দিবে এবং যখন তোমরা নিরাপদ থাক, তখন যে কেউ ‘উমরাহকে হাজ্জের সঙ্গে মিলিয়ে উপকার লাভ করতে ইচ্ছুক, সে যেমন সম্ভব কুরবানী দিবে এবং যার পক্ষে সম্ভব না হয়, সে ব্যক্তি হাজ্জের দিনগুলোর মধ্যে তিনদিন এবং গৃহে ফেরার পর সাতদিন, এই মোট দশদিন রোযা পালন করবে। এটা সেই লোকের জন্য, যার পরিবারবর্গ মাসজিদে হারামের বাসিন্দা নয়। আল্লাহকে ভয় কর আর জেনে রেখ, নিশ্চয়ই আল্লাহ শাস্তিদানে কঠোর।
আহসানুল বায়ান: (১৯৬) আর আল্লাহর উদ্দেশ্যে হজ্জ্ব ও উমরাহ পূর্ণভাবে সম্পাদন কর,[1] কিন্তু (ইহরাম বাঁধার পর) যদি তোমরা বাধাপ্রাপ্ত হও, তাহলে সহজলভ্য (পশু) কুরবানী কর[2] এবং যে পর্যন্ত কুরবানীর (পশু) তার যবেহস্থলে উপস্থিত না হয়, তোমরা মস্তক মুন্ডন করো না (হালাল হয়ো না)।[3] অতএব তোমাদের মধ্যে কেউ পীড়িত হলে, অথবা মাথায় কোন ব্যাধি থাকলে (এবং তার জন্য মস্তক মুন্ডন করতে হলে তার পরিবর্তে) সে রোযা রাখবে কিংবা সাদকাহ করবে, কিংবা কুরবানী দ্বারা তার ফিদ্ইয়া (বিনিময়) দেবে।[4] অতঃপর যখন তোমরা নিরাপদ হবে, তখন তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি হজ্জ্বের পূর্বে উমরাহ দ্বারা লাভবান হতে চায়, সে সহজলভ্য কুরবানী করবে। কিন্তু যদি কেউ কুরবানী না পায় (বা দিতে অক্ষম হয়), তাহলে তাকে হজ্জের সময় তিন দিন এবং গৃহে প্রত্যাবর্তনের পর সাত দিন [5] -- এই পূর্ণ দশ দিন রোযা পালন করতে হবে। এই নিয়ম সেই ব্যক্তির জন্য, যার পরিবার-পরিজন পবিত্র কা’বার নিকটে (মক্কায়) বাস করে না।[6] আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং জেনে রাখ যে, আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা।
মুজিবুর রহমান: তোমরা আল্লাহর উদ্দেশে হাজ্জ ও ‘ওমরাহ সম্পূর্ণ কর; কিন্তু তোমরা যদি বাধাপ্রাপ্ত হও তাহলে যা সহজ প্রাপ্র তাই উৎসর্গ কর এবং কুরবানীর জন্তুগুলি স্বস্থানে না পৌঁছা পর্যন্ত তোমাদের মস্তক মুন্ডন করনা। কিন্তু কেহ যদি তোমাদের মধ্যে পীড়িত হয়, অথবা তার মস্তিস্ক যন্ত্রনাগ্রস্ত হয় তাহলে সে সিয়াম কিংবা সাদাকাহ অথবা কুরবানী দ্বারা ওর বিনিময় করবে, অতঃপর যখন তোমরা শান্তিতে থাকো তখন যে ব্যক্তি ওমরাহ্ ও হাজ্জ একত্রে কামনা করে তাহলে যা সহজ প্রাপ্য তা’ই উৎসর্গ করবে। কিন্তু কেহ যদি তা প্রাপ্ত না হয় তাহলে হাজ্জের সময় তিন দিন এবং যখন তোমরা প্রত্যাবর্তিত হও তখন সাত দিন - এই পূর্ণ দশ দিন সিয়াম পালন করবে; এটা তারই জন্য - যার পরিজন পবিত্রতম মাসজিদে উপস্থিত না থাকে এবং আল্লাহকে ভয় কর ও জেনে রেখ যে, আল্লাহ কঠিন শাস্তি দাতা।
ফযলুর রহমান: তোমরা আল্লাহর জন্য হজ্জ ও ওমরা যথাযথভাবে সম্পন্ন কর। তবে যদি (তা করতে) বাধাপ্রাপ্ত হও তাহলে যেমনটি পাওয়া যায় একটি পশু কোরবানি দেবে। কোরবানির পশুটি তার (জবাইয়ের) জায়গায় না পৌঁছা পর্যন্ত মাথা মুণ্ডন করো না। আর তোমাদের মধ্যে যদি কেউ অসুস্থ হয় কিংবা কারো মাথায় (মাথার ত্বক বা চুলে) কোন সমস্যা থাকে (যে কারণে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই চুল মুণ্ডন করতে হয়) তাহলে সে রোযা কিংবা ছদকা অথবা কোরবানি দ্বারা ফিদিয়া (ক্ষতিপূরণ) দেবে। তারপর তোমাদের নিরাপত্তা ফিরে এলে যে ওমরা করে একত্রে হজ্জ করবে সে যেমনটি পাওয়া যায় একটি পশু কোরবানি দেবে। যদি তা না পায় তাহলে হজ্জের সময়ে তিনদিন এবং হজ্জ থেকে ফিরে সাতদিন এই মোট দশদিন রোযা রাখবে। যার পরিবার মসজিদে হারামের (মক্কার) বাসিন্দা নয় এমন ব্যক্তির জন্য এই বিধান। তোমরা আল্লাহকে ভয় করো আর জেনে নাও, আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা।
মুহিউদ্দিন খান: আর তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে হজ্জ্ব ওমরাহ পরিপূর্ণ ভাবে পালন কর। যদি তোমরা বাধা প্রাপ্ত হও, তাহলে কোরবানীর জন্য যাকিছু সহজলভ্য, তাই তোমাদের উপর ধার্য। আর তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত মাথা মুন্ডন করবে না, যতক্ষণ না কোরবাণী যথাস্থানে পৌছে যাবে। যারা তোমাদের মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়বে কিংবা মাথায় যদি কোন কষ্ট থাকে, তাহলে তার পরিবর্তে রোজা করবে কিংবা খয়রাত দেবে অথবা কুরবানী করবে। আর তোমাদের মধ্যে যারা হজ্জ্ব ওমরাহ একত্রে একই সাথে পালন করতে চাও, তবে যাকিছু সহজলভ্য, তা দিয়ে কুরবানী করাই তার উপর কর্তব্য। বস্তুতঃ যারা কোরবানীর পশু পাবে না, তারা হজ্জ্বের দিনগুলোর মধ্যে রোজা রাখবে তিনটি আর সাতটি রোযা রাখবে ফিরে যাবার পর। এভাবে দশটি রোযা পূর্ণ হয়ে যাবে। এ নির্দেশটি তাদের জন্য, যাদের পরিবার পরিজন মসজিদুল হারামের আশে-পাশে বসবাস করে না। আর আল্লাহকে ভয় করতে থাক। সন্দেহাতীতভাবে জেনো যে, আল্লাহর আযাব বড়ই কঠিন।
জহুরুল হক: আর আল্লাহ্র জন্য সম্পূর্ণ করো হজ এবং উমরাহ। কিন্তু যদি বাধা পাও, তবে কুরবানির যা-কিছু পাওয়া যায় তাই, আর তোমাদের মাথা কামাবে না যতক্ষণ না কুরবানি তার গন্তব্যস্থানে পৌঁছেছে কিন্তু তোমাদের মধ্যে যদি কেউ অসুস্থ হয় অথবা তার মাথায় রোগ থাকে, তবে প্রতিবিধান হচ্ছে রোযা রেখে বা সদকা দিয়ে বা কুরবানি ক’রে। কিন্তু যখন তোমরা নিরাপদ বোধ করবে তখন যে উমরাহ্কে হজের সঙ্গে সংযোজন ক’রে লাভবান হতে চায়, সে যেন কুরবানির যা-কিছু পায় তাই। কিন্তু যে পায় না, রোযা হচ্ছে হজের সময়ে তিনদিন আর তোমরা যখন ফিরে এস তখন সাত, -- এই হলো পুরো দশ। এটা তার জন্য যার পরিবার পবিত্র- মজজিদে হাজির থাকে না। আর আল্লাহ্কে ভয়-ভক্তি করো, আর জেনে রেখো যে নিঃসন্দেহ আল্লাহ্ প্রতিফলদানে কঠোর।
Sahih International: And complete the Hajj and 'umrah for Allah. But if you are prevented, then [offer] what can be obtained with ease of sacrificial animals. And do not shave your heads until the sacrificial animal has reached its place of slaughter. And whoever among you is ill or has an ailment of the head [making shaving necessary must offer] a ransom of fasting [three days] or charity or sacrifice. And when you are secure, then whoever performs 'umrah [during the Hajj months] followed by Hajj [offers] what can be obtained with ease of sacrificial animals. And whoever cannot find [or afford such an animal] - then a fast of three days during Hajj and of seven when you have returned [home]. Those are ten complete [days]. This is for those whose family is not in the area of al-Masjid al-Haram. And fear Allah and know that Allah is severe in penalty.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১৯৬. আর তোমরা হজ ও উমরা পূর্ণ কর(১) আল্লাহর উদ্দেশ্যে। অতঃপর যদি তোমরা বাধা প্রাপ্ত হও তাহলে সহজলভ্য হাদঈ(২) প্রদান করো। আর তোমরা মাথা মুন্ডন করো না(৩) যে পর্যন্ত হাদঈ তার স্থানে না পৌছে। অতঃপর তোমাদের মধ্যে যদি কেউ অসুস্থ হয় বা মাথায় কষ্টদায়ক কিছু হয় তবে সিয়াম কিংবা সাদাকা অথবা পশু যবেহ দ্বারা তার ফিদইয়া দিবে(৪)। অতঃপর যখন তোমরা নিরাপদ হবে তখন তোমাদের মধ্যে যে কেউ উমরাকে হজের সঙ্গে মিলিয়ে লাভবান হতে চায়(৫) সে সহজলভ্য হাদঈ যবাই করবে। কিন্তু যদি কেউ তা না পায়, তবে তাকে হজের সময় তিন দিন এবং ঘরে ফিরার পর সাত দিন এ পূর্ণ দশ দিন সিয়াম পালন করতে হবে। এটা তাদের জন্য, যাদের পরিজনবর্গ মসজিদুল হারামের বাসিন্দা নয়। আর তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর এবং জেনে রাখ যে, নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি দানে কঠোর।(৬)
তাফসীর:
(১) হজ সর্বসম্মতভাবে ইসলামের আরকানসমূহের মধ্যে একটি রুকন এবং ইসলামের ফরযসমূহ বা অবশ্যকরণীয় বিষয়সমূহের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ফরয। কুরআনের বহু আয়াত এবং অসংখ্য হাদীসের মাধ্যমে এর প্রতি তাকিদ ও গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
(২) হাদঈ বলতে এমন জানোয়ার বুঝায় যা মীকাতের বাইরের লোকদের মধ্য থেকে যারা হজ ও উমরা একই সফরে আদায় করবে, তাদের উপর আল্লাহর জন্য যবেহ করা ওয়াজিব হয়। যার রক্ত হারাম এলাকায় পড়তে হয়। মনে রাখাতে হবে যে, তা সাধারণ কুরবানী নয়।
(৩) আয়াতে মাথা মুণ্ডনকে ইহরাম ভঙ্গ করার নিদর্শন বলে সাব্যস্ত করা হয়েছে। এতেই প্রমাণিত হয় যে, ইহরাম অবস্থায় চুল ছাটা বা কাটা অথবা মাথা মুণ্ডন করা নিষিদ্ধ।
(৪) যদি কোন অসুস্থতার দরুন মাথা বা শরীরের অন্য কোন স্থানের চুল কাটতে হয় অথবা মাথায় উকুন হওয়াতে বিশেষ কষ্ট পায়, তবে এমতাবস্থায় মাথার চুল বা শরীরের অন্য কোন স্থানের লোম কাটা জায়েয। কিন্তু এর ফিদইয়া বা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। আর তা হচ্ছে সাওম পালন করা বা সদকা দেয়া বা যবেহ্ করা। ফিদইয়া যবেহ করার জন্য হারামের সীমারেখা নির্ধারিত রয়েছে। কিন্তু সাওম পালন বা সদকা দেয়ার জন্য কোন বিশেষ স্থান নির্ধারিত নেই। তা যে কোন স্থানে আদায় করা চলে। কুরআনের শব্দের মধ্যে সাওমের কোন সংখ্যা নির্ধারিত নেই এবং সদকারও কোন পরিমাণ নির্দেশ করা হয়নি। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবী কাব ইবনে উজরার এমনি অবস্থার প্রেক্ষিতে এরশাদ করেছেনঃ তিন দিন সাওম অথবা ছয়জন মিসকীনকে খাবার দাও, প্রত্যেক মিসকীনকে মাথাপিছু অর্ধ সা খাবার দাও এবং তোমার মাথা মুণ্ডন করে ফেল। [বুখারীঃ ৪৫১৭]
(৫) হজের মাসে হজের সাথে উমরাকে একত্রিকরণের দুটি পদ্ধতি রয়েছে। একটি হচ্ছে, মীকাত হতে হজ ও উমরাহর জন্য একত্রে এহরাম করা। শরীআতের পরিভাষায় একে হজে-কেরান’ বলা হয়। এর এহরাম হজের এহরামের সাথেই ছাড়তে হবে, হজের শেষদিন পর্যন্ত তাকে এহরাম অবস্থায়ই কাটাতে হয়। দ্বিতীয় পদ্ধতি হচ্ছে এই যে, মীকাত হতে শুধু উমরার এহরাম করবে। মক্কায় আগমনের পর উমরার কাজ-কর্ম শেষ করে এহরাম খুলবে এবং ৮ই জিলহজ তারিখে মীনা যাওয়ার প্রাক্কালে স্ব স্ব স্থান থেকে এহরাম বেঁধে নেবে। শরীআতের পরিভাষায় একে ‘হজে-তামাতু’ বলা হয়।
(৬) আয়াতটিতে প্রথমে তাকওয়া অবলম্বন করার আদেশ দেয়া হয়েছে; যার অর্থ এসব নির্দেশের বিরুদ্ধাচরণ থেকে বিরত, সতর্ক ও ভীত থাকা বুঝায়। যে ব্যক্তি জেনে-বুঝে আল্লাহ্র নির্দেশাবালীর বিরুদ্ধাচরন করে, তার জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি। আজকাল হজ্ব ও উমরাকারীগণের অধিকাংশই এ সম্পর্কে অসতর্ক। তারা প্রথমতঃ হজ্ব ও উমরার নিয়মাবলী জানতেই চেষ্টা করে না। আর যদিওবা জেনে নেয়, অনেকেই তা যথাযথভাবে পালন করে না। অনেকে ওয়াজিবও পরিত্যাগ করে। আর সুন্নাত ও মুস্তাহাবের তো কথাই নেই। আল্লাহ সবাইকে নিজ নিজ আমল যথাযথভাবে পালন করার তৌফিক দান করুন।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১৯৬) আর আল্লাহর উদ্দেশ্যে হজ্জ্ব ও উমরাহ পূর্ণভাবে সম্পাদন কর,[1] কিন্তু (ইহরাম বাঁধার পর) যদি তোমরা বাধাপ্রাপ্ত হও, তাহলে সহজলভ্য (পশু) কুরবানী কর[2] এবং যে পর্যন্ত কুরবানীর (পশু) তার যবেহস্থলে উপস্থিত না হয়, তোমরা মস্তক মুন্ডন করো না (হালাল হয়ো না)।[3] অতএব তোমাদের মধ্যে কেউ পীড়িত হলে, অথবা মাথায় কোন ব্যাধি থাকলে (এবং তার জন্য মস্তক মুন্ডন করতে হলে তার পরিবর্তে) সে রোযা রাখবে কিংবা সাদকাহ করবে, কিংবা কুরবানী দ্বারা তার ফিদ্ইয়া (বিনিময়) দেবে।[4] অতঃপর যখন তোমরা নিরাপদ হবে, তখন তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি হজ্জ্বের পূর্বে উমরাহ দ্বারা লাভবান হতে চায়, সে সহজলভ্য কুরবানী করবে। কিন্তু যদি কেউ কুরবানী না পায় (বা দিতে অক্ষম হয়), তাহলে তাকে হজ্জের সময় তিন দিন এবং গৃহে প্রত্যাবর্তনের পর সাত দিন [5] -- এই পূর্ণ দশ দিন রোযা পালন করতে হবে। এই নিয়ম সেই ব্যক্তির জন্য, যার পরিবার-পরিজন পবিত্র কা’বার নিকটে (মক্কায়) বাস করে না।[6] আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং জেনে রাখ যে, আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা।
তাফসীর:
[1] হজ্জ ও উমরার ইহরাম বেঁধে নেওয়ার পর তা পূর্ণ করা ওয়াজিব, যদিও তা (হজ্জ ও উমরাহ) নফল হয়। (আইসারুত তাফাসীর)
[2] অর্থাৎ, যদি পথে শত্রু অথবা কঠিন অসুস্থতার কারণে বাধাপ্রাপ্ত হও, তাহলে একটি পশু, উট অথবা গরু (গোটা অথবা এক সপ্তমাংশ) অথবা ছাগল বা ভেড়া সেখানেই যবেহ করে মাথা নেড়া করে হালাল হয়ে যাও। যেমন, নবী করীম (সাঃ) এবং তাঁর সাহাবীগণ হুদাইবিয়্যাতে কুরবানী যবেহ করেছিলেন। আর হুদাইবিয়্যা হারাম সীমানার বাইরে। (ফাতহুল ক্বাদীর) অতঃপর আগামী বছরে তার কাযা কর। যেমন, নবী করীম (সাঃ) সন ৬ হিজরীর উমরার কাযা সন ৭ হিজরীতে করেছিলেন।
[3] এর সংযোগ {وَاَتِمُّوا الْحَجَّ} (আর তোমরা হজ্জ--- সম্পাদন কর)এর সাথে। আর এর সম্পর্ক হল নিরাপদ পরিস্থিতির সাথে। অর্থাৎ, নিরাপদ অবস্থায় ততক্ষণ পর্যন্ত মাথা নেড়া করবে না (ইহরাম খুলে হালাল হবে না), যতক্ষণ না হজ্জের সমস্ত কার্যাদি পূরণ করেছ।
[4] অর্থাৎ, সে যদি এমন কষ্টে পতিত হয়ে পড়ে যে, তাকে মাথার চুল কাটতেই হবে, তাহলে তাকে ফিদ্ইয়া (বিনিময়) অবশ্যই দিতে হবে। হাদীস অনুযায়ী এ রকম (অসুবিধাগ্রস্ত) ব্যক্তি ছ’জন মিসকীনকে খাদ্য দান করবে অথবা একটি ছাগল যবেহ করবে কিংবা তিন দিন রোযা রাখবে। রোযা ব্যতীত অন্য দু’টি ফিদ্ইয়ার স্থানের ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেছেন, খাদ্য দান ও ছাগল যবেহ করার কাজ মক্কাতে করতে হবে। আবার কেউ বলেছেন, রোযার মতই এর জন্য কোন নির্দিষ্ট স্থান নেই। ইমাম শাওকানী এই মতেরই সমর্থন করেছেন। (ফাতহুল ক্বাদীর)
[5] হজ্জ তিন প্রকার; ইফরাদঃ কেবল হজ্জের নিয়তে ইহরাম বাঁধা। ক্বিরানঃ হজ্জ ও উমরার এক সাথে নিয়ত করে ইহরাম বাঁধা। এই উভয় অবস্থায় হজ্জের সমস্ত কার্যাদি সুসম্পন্ন না করে ইহরাম খোলা বৈধ নয়। তামাত্তুঃ এতেও হজ্জ ও উমরার নিয়ত হয়। তবে প্রথমে উমরার নিয়তে ইহরাম বাঁধা হয় এবং উমরাহ সম্পূর্ণ করে ইহরাম খুলে দেওয়া হয় এবং যুল-হজ্জ মাসের ৮ তারীখে হজ্জের জন্য মক্কা থেকেই দ্বিতীয়বার ইহরাম বাঁধা হয়। ‘তামাত্তু’র অর্থ লাভবান হওয়া। অর্থাৎ, উমরাহ ও হজ্জের মাঝে ইহরাম খুলে লাভবান হওয়া হয়। হজ্জে ক্বিরান এবং হজ্জে তামাত্তু’তে একটি হাদ্ই (অর্থাৎ, একটি ছাগল বা ভেড়া কিংবা উট বা গরুর এক সপ্তমাংশ) কুরবানী দিতে হবে। যদি কেউ কুরবানী দিতে না পারে, তাহলে সে হজ্জের দিনগুলোতে তিনটি এবং বাড়ি ফিরে সাতটি রোযা রাখবে। হজ্জের দিনগুলোতে যে রোযা রাখবে, তা হয় ৯ই যুল-হজ্জের (আরাফার দিনের) আগে রাখবে অথবা তাশরীকের দিনগুলোতে রাখবে।
[6] অর্থাৎ, তামাত্তু’ হজ্জ ও কুরবানী বা রোযা রাখা কেবল তাদের জন্য বিধেয়, যারা মসজিদে হারামের বাসিন্দা নয়। অর্থাৎ, হারাম সীমানার অথবা তার এত কাছের বাসিন্দা নয় যে, তাদের সফরে নামায কসর করা যায়। (ইবনে কাসীর, ইবনে জারীর)
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১৯৬ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তা‘আলা সিয়াম ও জিহাদের বিধি-বিধান আলোচনা করার পর হজ্জের বিধি-বিধান সম্পর্কে আলোচনা শুরু করেছেন। তিনি হজ্জ ও উমরা উভয়টি পরিপূর্ণভাবে একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার জন্য আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন।
শানে নুযূল:
সফওয়ান বিন উমাইয়া (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা জনৈক ব্যক্তি জাফরান রঙ্গে রঞ্জিত জুুব্বা পরিহিত অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট আগমন করে বলল, হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে কিভাবে উমরা করার নির্দেশ দিচ্ছেন তখন এ আয়াত নাযিল হয়:
(وَأَتِمُّوا الْحَجَّ وَالْعُمْرَةَ لِلّٰهِ....)
তারপর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: উমরা সম্পর্কে প্রশ্নকারী কোথায়? তিনি বললেন, এইতো আমি। তিনি [রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)] বললেন, তোমার পোশাক খুলে ফেল। অতঃপর গোসল করে যথাসম্ভব অপবিত্রতা পরিস্কার কর। তারপর তোমার হজ্জ সম্পাদনে যা কর উমরা সম্পদানে তাই কর। (সহীহ মুসলিম হা: ১১৮০)
আবদুল্লাহ বিন ‘মাকাল (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একদা কুফার মাসজিদে কাব বিন উজরার পাশে বসেছিলাম। তাঁকে আমি
(فَفِدْیَةٌ مِّنْ صِیَامٍ)
এ আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করি। তিনি বললেন- আমাকে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট নিয়ে যাওয়া হল তখন আমার মুখের ওপর দিয়ে উকুন বয়ে পড়ছিল। আমাকে দেখে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন- তোমার অবস্থা এতদূর পৌঁছে যাবে আমি তা ধারণাই করতে পারিনি। তুমি কি একটি ছাগল কুরবানী দিতে সক্ষম হবে? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, যাও মাথা মুণ্ডন কর এবং তিনটি রোযা রাখ অথবা ছয়জন মিসকিনকে অর্ধ সা‘ করে খাদ্য দিয়ে দাও। আয়াতটি বিশেষ করে আমার ব্যাপারে অবতীর্ণ হলেও সকলের জন্য প্রযোজ্য। (সহীহ বুখারী হা: ৪৫১৭)
এছাড়া অত্র আয়াত অবতীর্ণের বিষয়ে আরো বর্ণনা পাওয়া যায়। (তাফসীর ইবনে কাসীর ১ম খণ্ড, পৃঃ ৫০৪-৫)
(وَاَتِمُّوا الْحَجَّ وَالْعُمْرَةَ لِلہِ)
‘তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে হজ্জ ও উমরা সম্পূর্ণ কর’এ আয়াত দ্বারা অনেকে বলে থাকেন হজ্জের মত উমরা করাও ফরয। তবে সঠিক কথা হলো হজ্জ ও উমরার ইহরাম বেঁধে নেয়ার পর তা পূর্ণ করা ওয়াজিব, যদিও তা (হজ্জ ও উমরা) নফল হয়।
اِحْصَارٌ - এর দু’টি অর্থ: ১. ইহরাম অবস্থায় শত্র“ দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হওয়া। ২. অসুস্থ ও এরূপ সমস্যায় বাধাগ্রস্ত হওয়া।
আল্লামা শানকীতি (রহঃ) বলেন, পূর্বকার আয়াত দ্বারা বুঝা যায় যে, এখানে শত্র“ দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হওয়া উদ্দেশ্য। তবে অধিকাংশ আলেমগণ বলেন: শত্র“ ও অসুস্থতাসহ সকল সমস্যা এখানে শামিল। আর এটাই সঠিক মত। (আযওয়াউল বায়ান ১ম খণ্ড, পৃঃ ১১৫)
যদি কেউ মক্কায় গিয়ে হজ্জ বা উমরা সম্পাদন করতে শত্র“ বা অসুস্থতার কারণে বাধাপ্রাপ্ত হয় তাহলে যেখানে বাধাপ্রাপ্ত হবে সেখানেই সে গরু বা ছাগল বা ভেড়া বা উট যা তার জন্য সহজ হবে তা আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্য হাসিলের জন্য জবেহ করবে।
অতঃপর ইহরামের পোশাক খুলে মাথা মুণ্ডন করে ইহরাম মুক্ত হয়ে যাবে। যেমন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হুদায়বিয়ার বছর শত্র“ কর্তৃক বাধাপ্রাপ্ত হয়ে সেখানে মাথা মুণ্ডন করে হালাল হয়ে ছিলেন। যদি কারো নিকট হাদী বা কুরবানীর জন্তু না থাকে তাহলে ১০ দিন রোযা রাখবে যেমন হজ্জে তামাত্তুর ক্ষেত্রে করা হয়।
(حَتّٰی یَبْلُغَ الْھَدْیُ مَحِلَّھ۫)
‘কুরবানীর জন্তুগুলো যথাস্থানে না পৌঁছা পর্যন্ত’অর্থাৎ যদি কেউ কোন কারণে বাধাপ্রাপ্ত হয় তাহলে বাধাপ্রাপ্ত ব্যক্তি স্বস্থানে কুরবানীর হাদী জবেহ না করা পর্যন্ত মাথা মুণ্ডন করবে না। জবেহ করে পরে মাথা মুণ্ডন করবে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যেমন হুদায়বিয়ার বছর করেছেন।
যদি বাধাপ্রাপ্ত না হয় তাহলে মক্কা ছাড়া অন্য কোথাও জবেহ করতে পারবে না। অবশ্য তা জবেহ করতে হবে ঈদের দিন ১০ই জুলহজ্জে ও তার পরবর্তী আইয়ামে তাশরীকের দিনগুলোর কোন একদিন।
(فَمَنْ كَانَ مِنْكُمْ مَّرِيْضًا)
‘তোমাদের মধ্যে কেউ যদি রোগাক্রান্ত হয়’অর্থাৎ যদি কেউ ইহরাম অবস্থায় অসুস্থ হয় বা কষ্টে পতিত হয় যার কারণে মাথা মুণ্ডন করতে বাধ্য হয়। তাহলে সে মাথা মুণ্ডন করে নেবে। আর তার ফিদইয়া বা বিনিময়স্বরূপ-
১. তিন দিন সিয়াম পালন করবে অথবা ২. ছয়জন মিসকীনকে খাওয়াবে অথবা ৩. হারামের ফকিরদের জন্য ১টি ছাগল জবেহ করে দেবে। যেমন এ আয়াতের শানে নুযূলে আলোচনা করা হয়েছে।
এ তিনটির যেকোন একটি আদায় করলেই চলবে। (তাফসীর ইবনে কাসীর ১ম খণ্ড, পৃঃ ৫০৬)
(فَمَنْ تَمَتَّعَ بِالْعُمْرَةِ اِلَی الْحَجِّ)
‘যে ব্যক্তি হজ্জ্বের সাথে উমরাও করতে চায়’যদি শত্র“দের বাধা বা অসুস্থতার আশঙ্কা থেকে মুক্ত হয়ে হজ্জ আদায় করতে সক্ষম হয় আর হজ্জে তামাত্তু আদায় করতে চায় তাহলে যথাসাধ্য একটি পশু কুরবানী করবে।
উল্লেখ্য: হজ্জ তিন প্রকার:
১. হজ্জে ইফরাদ- বল হজ্জের নিয়তে ইহরাম বাঁধা ও হজ্জ সম্পন্ন করা।
২. হজ্জে কিরান: হজ্জ ও উমরার এক সাথে নিয়ত করে ইহরাম বাঁধা ও মাঝে হালাল না হয়ে হজ্জ ও ওমরা সম্পন্ন করা।
এ উভয় অবস্থায় হজ্জের কার্যাবলী সুসম্পন্ন না করে ইহরাম খোলা বৈধ নয়।
৩. হজ্জে তামাত্তু: এতেও হজ্জ ও উমরার নিয়ত করবে তবে প্রথমে উমরার নিয়তে ইহরাম বেঁধে উমরার কাজ সম্পূর্ণ করে ইহরাম খুলে ফেলবে। তারপর ৮ই যুলহজ্জ দ্বিতীয় বার হজ্জের জন্য ইহরাম বেঁধে হজ্জ সম্পাদন করবে। তিন প্রকারের মধ্যে এটা উত্তম ও সহজ।
হজ্জে কিরান ও তামাত্তুর জন্য একটি হাদী (অর্থাৎ ছাগল বা ভেড়া বা উট বা গরু) একাকী বা উট ও গরুতে অংশীদারে কুরবানী করলেই হবে। যদি কেউ কুরবানী না করতে পারে তাহলে সে হজ্জের দিনগুলোতে তিনটি এবং বাড়ি ফিরে সাতটি রোযা রাখবে। হজ্জের দিনগুলোতে যে রোযা রাখবে তা অবশ্যই ৯ই যুলহজ্জের আগে অথবা আইয়ামে তাশরীকের পরে হতে হবে।
(ذٰلِکَ لِمَنْ لَّمْ یَکُنْ اَھْلُھ۫ حَاضِرِی الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ)
‘এটা তারই জন্য যে মাসজিদে হারামের বাসিন্দা নয়’হজ্জে তামাত্তু কাদের জন্য এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তবে সঠিক কথা হল, কেবল তাদের জন্য যাদের পরিবার মাসজিদে হারামের বাসিন্দা নয়। (তাফসীর ইবনে কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর)
সবশেষে আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করার নির্দেশ দিয়ে জানিয়ে দিচ্ছেন যে, তিনি শাস্তি দানে কঠোর। অতএব তার বিধান পালনে যেন কোন গাফলতি প্রকাশ না পায়।
আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. হজ্জ ও উমরার নিয়ত করলে তা আদায় ওয়াজিব।
২. হজ্জ আদায় করতে গিয়ে বাধাগ্রস্থ হলে কী করতে হবে তা জানা গেল।
৩. হজ্জে কোন নিষিদ্ধ কাজে জড়িত হলে কি কাফফারা দিতে হবে তা জানলাম।
৪. তিন প্রকার হজ্জের মধ্যে তামাত্তু উত্তম।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: পূর্বে যেহেতু রোযার বর্ণনা হয়েছিল অতঃপর জিহাদের বর্ণনা হয়েছে এখানে হজ্বের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে এবং নির্দেশ দেয়া হচ্ছে-‘তোমরা হজ্ব ও উমরাহকে পূর্ণ কর।' বাহ্যিক শব্দ দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, হজ্ব ও উমরাহ আরম্ভ করার পর সে গুলো পূর্ণ করা উচিত। সমস্ত আলেম এ বিষয়ে একমত যে, হজ্বব্রত ও উমরাহ ব্রত আরম্ভ করার পর ওগুলো পূর্ণ করা অবশ্য কর্তব্য যদিও উমরাহব্রত ওয়াজিব ও মুস্তাহাব হওয়ার ব্যাপারে তাঁদের মধ্যে দু'টি উক্তি রয়েছে, যেগুলো আমি ‘কিতাবুল আহকামের মধ্যে পূর্ণভাবে বর্ণনা করেছি। হযরত আলী (রাঃ) বলেন, ‘পূর্ণ করার অর্থ এই যে, তোমরা নিজ নিজ বাড়ী হতে ইহরাম বাঁধবে। হযরত সুফইয়ান সাওরী (রঃ) বলেন, এগুলো পূর্ণ করার অর্থ এই যে, তোমরা নিজ নিজ বাড়ী হতে ইহরাম বাঁধবে। তোমাদের এই সফর হবে হজ্ব ও উমরাহর উদ্দেশ্যে। মীকাতে' (যেখান হতে ইহরাম বাঁধতে হয়) পৌছে উচ্চৈঃস্বরে ‘লাব্বায়েক পাঠ আরম্ভ করবে। তোমাদের অভিপ্রায় ব্যবসা বাণিজ্য বা অন্য কোন ইহলৌকিক কার্য সাধনের জন্যে হবে না। তোমরা হয়তো বেরিয়েছো নিজের কাজে মক্কার নিকটবর্তী হয়ে তোমাদের খেয়াল হলো যে, এসো আমরা হজ্ব ও উমরাহব্রত পালন করে নেই। এভাবেও হজ্ব ও উমরাহ আদায় হয়ে যাবে বটে কিন্তু পূর্ণ হবে না। পূর্ণ করা এই যে, শুধুমাত্র এই উদ্দেশ্যেই বাড়ী হতে বের হবে। হযরত মাকহুল (রঃ) বলেন যে, ওগুলো পূর্ণ করার অর্থ হচ্ছে ওগুলো মীকাত’ হতে আরম্ভ করা।
হযরত উমার (রাঃ) বলেন যে, ওগুলো পূর্ণ করার অর্থ হচ্ছে ওদুটো পৃথক পৃথকভাবে আদায় করা এবং উমরাহকে হজ্বের মাসে আদায় না করা। কেননা কুরআন মাজীদের মধ্যে রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ হজ্বের মাসগুলো নির্দিষ্ট।' (২:১৯৭) হ্যরত কাসিম বিন মুহাম্মদ (রঃ) বলেন যে, হজ্বের মাস গুলোতে উমরাহ পালন করা পূর্ণ হওয়া নয়। তিনি জিজ্ঞাসিত হন যে, মুহাররম মাসে উমরাহ করা কিরূপ: তিনি উত্তরে বলেনঃ ‘মানুষ ওকেতো পূর্ণই বলতেন। কিন্তু এই উক্তিটি সমালোচনার যোগ্য। কেননা,এটা প্রমাণিত বিষয়। যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) চারটি উমরাহ করেন এবং চারটিই করেন যুকিাদা মাসে। প্রথমটি হচ্ছে ‘উমরাতুল হুদায়বিয়া' হিজরী ৬ষ্ঠ সনের যু’কাদা মাসে। দ্বিতীয়টি হচ্ছে ‘উমরাতুল কাযা' হিজরী সপ্তম সনের যু'কাদা মাসে। তৃতীয়টি হচ্ছে ‘উমরাতুল জা'আররানা’ হিজরী অষ্টম সনের যু'কাদা মাসে এবং চতুর্থটি হচ্ছে ঐ উমরাহ যা তিনি হিজরী দশম সনে বিদায় হজ্বের সাথে যুকাদা মাসে আদায় করেন। এই চারটি উমরাহ ছাড়া হিজরতের পরে রাসূলুল্লাহ' (সঃ) আর কোন উমরাহ পালন করেননি। হাঁ, তবে তিনি হযরত উম্মে হানী (রাঃ)-কে বলেছিলেনঃ রমযান মাসে উমরাহ করা আমার সাথে হজ্ব করার সমান (পুণ্য)। একথা তিনি তাঁকে এজন্যেই বলেছিলেন যে, তাঁর সাথে হজে যাওয়ার তিনি ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ) যানবাহনের অভাবে তাঁকে সাথে নিতে পারেননি। যেমন সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে এই ঘটনাটি পূর্ণভাবে নকল করা হয়েছে। হযরত সাঈদ বিন যুবাইর (রঃ) তো পরিষ্কারভাবে বলেন যে, এটা হযরত উম্মে হানীর (রাঃ) জন্যে বিশিষ্ট ছিল।
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, হজ্ব ও উমরাহর ইহরাম বাঁধার পর ওদু’টো পূর্ণ না করেই ছেড়ে দেয়া জায়েয নয়। হজ্ব ঐ সময় পূর্ণ হয় কুরবানীর দিন (দশই জিলহজ্বে) যখন জামারা-ই-উকবাকে পাথর মারা হয়, বায়তুল্লাহ শরীফের তাওয়াফ করা হয় এবং সাফা ও মারওয়া পর্বতদ্বয়ের মধ্যস্থলে দৌড়ান হয়। এখন হজ্ব পূর্ণ হয়ে গেল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, হজ ‘আরাফার নাম এবং উমরাহ হচ্ছে তাওয়াফের নাম। হযরত আবদুল্লাহর (রঃ) কিরআত হচ্ছে নিম্নরূপঃ (আরবি)
অর্থাৎ তোমরা হজ্ব ও উমরাহকে বায়তুল্লাহ পর্যন্ত পূর্ণ কর।' সুতরাং বায়তুল্লাহ পর্যন্ত গেলেই উমরাহ পূর্ণ হয়ে যায়। হযরত সাঈদ বিন যুবাইরের (রঃ) নিকট এটা আলোচিত হলে তিনি বলেন হযরত ইবনে আব্বাসের (রাঃ) কিরআতও এটাই ছিল। হযরত শা’বীর (রঃ) পঠনে ‘ওয়াল উমরাতু’ রয়েছে। তিনি বলেন যে, উমরাহ ওয়াজিব নয়। তবে তিনি এর বিপরীতও বর্ণনা করেছেন। বহু হাদীসে কয়েকটি সনদসহ হযরত আনাস (রাঃ) প্রভৃতি সাহাবীদের (রাঃ) একটি দল হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হজ্ব ও উমরাহ এ দু'টোকেই একত্রিত করেছেন এবং বিশুদ্ধ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর সাহাবীগণকে (রাঃ) বলেছেনঃ যার নিকট কুরবানীর জন্তু রয়েছে সে যেন হজ্ব ও উমরাহর একই সাথে ইহরাম বাঁধে। অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, কিয়ামত পর্যন্ত উমরাহ হজ্বের মধ্যে প্রবেশ লাভ করেছে। আবু মুহাম্মদ বিন আবি হাতীম (রঃ) স্বীয় কিতাবের মধ্যে একটি বর্ণনা এনেছেন যে, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করে। তার নিকট হতে যাফরানের সুগন্ধি আসছিল। সে জুব্বা পরিহিত ছিল। সে জিজ্ঞেস করে ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমার ইহরামের ব্যাপারে নির্দেশ কি:' তখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ ‘প্রশ্নকারী কোথায়: সে বলে-“হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি বিদ্যমান রয়েছি।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেন, 'যাফরানযুক্ত কাপড় খুলে ফেলল এবং শরীরকে খুব ভাল করে ঘর্ষণ করে গগাসল করে এসো ও যা তুমি তোমার হজ্বের জন্যে করে থাকো তাই উমরাহর জন্যেও কর।' এই হাদীসটি গরীব। কোন কোন বর্ণনায় গোসল করার ও এ আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার উল্লেখ নেই। একটি বর্ণনায় তার নাম লায়লা বিন উমাইয়া (রাঃ) এসেছে। অন্য বর্ণনায় সাফওয়ান বিন উমাইয়া (রাঃ) রয়েছে।
অতঃপর বলা হচ্ছে-‘তোমরা যদি বাধা প্রাপ্ত হও তবে যা সহজ প্রাপ্য হয় তাই উৎসর্গ কর। মুফাসসিরগণ বর্ণনা করেছেন যে,এই আয়াতটি হিজরী ষষ্ঠ সনে হুদায়বিয়ার প্রান্তরে অবতীর্ণ হয়, যখন মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে মক্কা যেতে বাধা দিয়েছিল এবং ঐ সম্বন্ধেই পূর্ণ একটি সূরা আল ফাত্হ্ অবতীর্ণ হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীগণ (রাঃ) অনুমতি লাভ করেন যে, তারা যেন সেখানেই তাদের কুরবানীর জন্তুগুলো যবাহ্ করে দেন। ফলে সত্তরটি উষ্ট্র যবাহ করা হয়, মস্তক মুণ্ডন করা হয় এবং ইহরাম ভেঙ্গে দেয়া হয়। রাসূলুল্লাহর (সঃ) নির্দেশ শুনে সাহাবীগণ (রাঃ) প্রথমে কিছুটা সংকোচবোধ করেন। তাঁরা অপেক্ষা করছিলেন যে, সম্ভবতঃ এই নির্দেশকে রহিতকারী কোন নির্দেশ অবতীর্ণ হবে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বয়ং বাইরে এসে মস্তক মুণ্ডন করেন, তার দেখাদেখি সবাই এ কাজে অগ্রসর হন। কতকগুলো লোক মস্তক মুণ্ডন করেন এবং কতকগুলো লোক চুল ছেঁটে ফেলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ মস্তক মুণ্ডনকারীদের উপর আল্লাহ তা'আলা করুণা বর্ষণ করুন। জনগণ বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যারা চুল হেঁটেছেন তাদের জন্যেও প্রার্থনা করুন।' তিনি পুনরায় মুণ্ডনকারীদের জন্যে ও প্রার্থনা করেন। তৃতীয়বারে চুল ছোটকারীদের জন্যেও তিনি প্রার্থনা করেন। এক একটি উষ্ট্রে সাতজন করে লোক অংশীদার ছিলেন। সাহাবীদের (রাঃ) মোট সংখ্যা ছিল চৌদ্দশো। তাঁরা হুদায়বিয়া প্রান্তরে অবস্থান করেছিলেন যা হারাম শরীফের সীমা বহির্ভূত ছিল। তবে এটাও বর্ণিত আছে যে, ওটা হারাম শরীফের সীমান্তে অবস্থিত ছিল।
আলেমদের মধ্যে এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে যে, যারা শত্রু কর্তৃক বাধা প্রাপ্ত হবে শুধু তাদের জন্যেই কি এই নির্দেশ, না যারা রোগের কারণে বাধ্য হয়ে পড়েছে তাদের জন্যেও এই অনুমতি রয়েছে যে, তারা ঐ জায়গাতেই ইহরাম ভেঙ্গে দেবে, মস্তক মুণ্ডন করবে এবং কুরবানী করবে: হযরত ইবনে আব্বাসের (রাঃ) মতে তো শুধুমাত্র প্রথম প্রকারের লোকদের জন্যেই এই অনুমতি রয়েছে। হযরত ইবনে উমার (রাঃ), তাউস (রঃ), যুহরী (রঃ) এবং যায়েদ বিন আসলামও (রঃ) এ কথাই বলেন। কিন্তু মুসনাদ-ই-আহমাদের একটি মার’ হাদীসে রয়েছে যে, যে ব্যক্তির হাত পা ভেঙ্গে গেছে কিংবা সে রুগ্ন হয়ে পড়েছে। বা খোড়া হয়ে গেছে সে ব্যক্তি হালাল হয়ে গেছে। সে আগামী বছর হজ্ব করে নেবে। হাদীসের বর্ণনাকারী বলেনঃ “আমি এটা হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত আবু হুরাইরার (রাঃ) নিকটও বর্ণনা করেছি। তারাও বলেছেন-এটা সত্য।' সুনান-ই-আরবা'আর মধ্যেও এ হাদীসটি রয়েছে। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত ইবনে যুবাইর (রাঃ), আলকামা (রাঃ), সাঈদ বিন মুসাইয়াব (রঃ), উরওয়া বিন যুবাইর (রঃ), মুজাহিদ (রঃ), ইবরাহীম নাখঈ (রঃ), আতা (রঃ) এবং মুকাতিল বিন হিব্বান (রঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে যে, রুগ্ন হয়ে পড়া এবং খোড়া হয়ে যাওয়াও এ রকমই ওজর। হযরত সুফইয়ান সাওরী (রঃ) প্রত্যেক বিপদ ও কষ্টকেই এ রকমই ওজর বলে থাকেন।
সহীহ বুখারী ও মুসলিমের একটি হাদীসে রয়েছে যে, হযরত যুবাইর বিন আবদুল্লাহর (রাঃ) কন্যা যবাআহ্ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন,-“হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার হজ্ব করবার ইচ্ছে হয়; কিন্তু আমি রুগ্ন থাকি। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ হজ্বে চলে যাও এবং শর্ত কর যে, (তোমার) ইহরাম সমাপনের ওটাই স্থান যেখানে তুমি রোগের কারণে থেমে যেতে বাধ্য হয়ে পড়বে। এই হাদীসের উপর ভিত্তি করেই কোন কোন আলেম বলেন যে, হজ্ব শর্ত করা জায়েয। ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেন, 'যদি এই হাদীসটি সঠিক হয় তবে আমারও উক্তি তাই।' ইমাম বায়হাকী (রঃ) ও হাফিযদের মধ্যে অন্যান্যগণ বলেন যে, এই হাদীসটি সম্পূর্ণরূপে সঠিক। অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে-যা সহজ প্রাপ্য হয় তাই কুরবানী করবে।' হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন, উষ্ট্র-উষ্ট্ৰী, বলদ-গাভী, ছাগ-ছাগী এবং ভেড়া-ভেড়ী এই আট প্রকারের মধ্য হতে ইচ্ছে মত যবাহ করবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে শুধু ছাগীও বর্ণিত আছে এবং আরও বহু মুফাসসিরও এটাই বলেছেন। ইমাম চতুষ্টয়েরও এটাই মাযহাব। হযরত আয়েশা (রাঃ) এবং হযরত ইবনে উমার (রাঃ) প্রভৃতি মনীষী বলেন যে, এর ভাবার্থ শুধুমাত্র উষ্ট্র ও গাভী। খুব সম্ভব তাদের দলীল হুদায়বিয়ার ঘটনাই হবে। তথায় কোন সাহাবী হতে ছাগ-ছাগী যবাহ করা বর্ণিত হয়নি। তারা একমাত্র গরু ও উটই কুরবানী দিয়েছিলেন।
সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে তাঁরা বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, আমরা সাত জন করে মানুষ এক একটি গরু ও উটে শরীক হয়ে যাবো।' হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এটাও বর্ণিত আছে যে, যার যে জন্তু যবাহ করার ক্ষমতা রয়েছে সে তাই যবাহ করবে। যদি ধনী হয় তবে উট, যদি এর চেয়ে কম ক্ষমতাবান হয় তবে গরু, এর চেয়েও কম ক্ষমতা রাখলে ছাগল যবাহ করবে। হযরত উরওয়া (রঃ) বলেন যে, এটা মূল্যের আধিক্য ও স্বল্পতার উপর নির্ভর করে। জমহুরের কথা মত ছাগ-ছাগী দেয়াই যথেষ্ট। তাদের দলীল হচ্ছে এই যে, কুরআন মাজীদের মধ্যে সহজলভ্যের কথা বর্ণিত হয়েছে। অর্থাৎ কমপক্ষে ঐ জিনিষ যাকে কুরবানী বলা যেতে পারে। আর কুরবানীর জন্তু হচ্ছে উট, গরু, ছাগল ও ভেড়া। যেমন জ্ঞানের সমুদ্র কুরআন পাকের ব্যাখ্যাতা এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পিতৃব্য পুত্র আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসের (রাঃ) উক্তি রয়েছে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একবার ছাগলের কুরবানী দিয়েছিলেন।
অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“যে পর্যন্ত কুরবানীর জন্তু তার স্বস্থানে না পৌছে সে পর্যন্ত তোমরা তোমাদের মস্তক মুণ্ডন করো না। এর সংযোগ। (আরবি)-এর সঙ্গে রয়েছে, (আরবি)-এর সঙ্গে নয়। ইবনে জারিরের (রঃ) এখানে ত্রুটি হয়ে গেছে। কারণ এই যে, হুদায়বিয়ায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে ও তাঁর সহচরবৃন্দকে যখন হারাম শরীফে যেতে বাধা প্রদান করা হয়, তখন তারা সবাই হারামের বাইরেই মস্তক মুণ্ডন এবং কুরবানীও করেন কিন্তু শান্তি ও নিরাপত্তার সময় এটা জায়েয নয়। যে পর্যন্ত না কুরবানীর প্রাণী যবাহর স্থানে পৌছে যায় এবং হাজীগণ তাদের হজ্ব ও উমরাহর যাবতীয় কার্য হতে অবকাশ লাভ করেন-যদি তারা একই সাথে দুটোরই ইহরাম বেঁধে থাকেন। কিংবা ঐ দুটোর একটি কার্য হতে অবকাশ লাভ করেন, যদি তারা শুধুমাত্র হজ্বেরই। ইহরাম বেঁধে থাকেন বা হজ্বে তামাত্তোর নিয়্যাত করে থাকেন। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে রয়েছে যে, হযরত হাফসা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন,-“হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সবাই তো ইহরাম ভেঙ্গে দিয়েছে; কিন্তু আপনি যে ইহরামের অবস্থাতেই রয়েছেন:' রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ হাঁ, আমি আমার মাথাকে আঠা যুক্ত করেছি এবং আমার কুরবানীর প্রাণীর গলদেশে চিহ্ন ঝুলিয়ে দিয়েছি। সুতরাং যে পর্যন্ত না এটা যবাহ্ করার স্থানে পৌছে যায় সে পর্যন্ত আমি ইহরাম ভেঙ্গে দেবো না।'
এরপরে নির্দেশ হচ্ছে যে, রুগ্ন ও মস্তক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি ‘ফিদিয়া দেবে। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ বিন মাকাল (রঃ) বলেনঃ “আমি কুফার মসজিদে হযরত কা'ব বিন আজরার (রাঃ) পাশে বসে ছিলাম। তাকে আমি এই আয়াতটি সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করি। তিনি বলেন, ‘আমাকে রাসূলুল্লাহর (সঃ) নিকট উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়, সেই সময় আমার মুখের উপর উকুন বয়ে চলছিল। আমাকে দেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘তোমার অবস্থা যে এতোদূর পর্যন্ত পৌছে যাবে আমি তা ধারণাই করিনি। তুমি কি একটি ছাগী যবাহ করারও ক্ষমতা রাখো না:' আমি বলি-আমি তো দরিদ্র লোক। তিনি বলেনঃ যাও মস্তক মুণ্ডন কর এবং তিনটি রোযা রাখ বা ছ’জন মিসকীনকে অর্ধ সা' (প্রায় সোয়া সের সোয়া ছটাক) করে খাদ্য দিয়ে দাও।' '
সুতরাং এই আয়াতটি আমারই সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয় এবং নির্দেশ হিসেবে এ রকম প্রত্যেক ওজরযুক্ত লোকের জন্যেই প্রযোজ্য।' অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে, হযরত কা'ব বিন আজরা (রাঃ) বলেনঃ “আমি হাঁড়ির নীচে জ্বাল দিচ্ছিলাম। এমন সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার নিকট আগমন করেন। সে সময় আমার মুখের উপর দিয়ে উকুন বয়ে চলছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে এ অবস্থায় দেখে এ মাসআলাটি আমাকে বলে দেন। অন্য আর একটি বর্ণনায় রয়েছে, হযরত কা'ব বিন আজরা (রাঃ) বর্ণনা করেনঃ ‘আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ) -এর সাথে হুদায়বিয়ায় ছিলাম। সে সময় আমরা ইহরামের অবস্থায় ছিলাম এবং মুশরিকরা আমাদেরকে বাধা প্রদান করেছিল। আমার মাথায় বড় বড় চুল ছিল যাতে অত্যধিক উকুন হয়ে গিয়েছিল। উকুনগুলো আমার মুখের উপর দিয়ে বয়ে চলছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার পার্শ্ব দিয়ে গমন করার সময় আমাকে বলেন-“উকুন কি তোমাকে কষ্ট দিচ্ছে, না তোমার মাথাকে: অতঃপর তিনি মস্তক মুণ্ডনের নির্দেশ দেন। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই এর বর্ণনায় রয়েছে, ‘অতঃপর আমি মস্তক মুণ্ডন করি ও একটি ছাগী কুরবানী দেই।
অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন (আরবি) অর্থাৎ কুরবানী হচ্ছে একটি ছাগী। আর রোযা রাখলে তিন দিন এবং সাদকা করলে এক ফরক (পায়মান বা পরিমাপ যন্ত্র) মিসকীনদের মধ্যে বন্টন করা।' হযরত আলী (রাঃ), মুহাম্মদ বিন কা'ব (রঃ), আলকামা (রঃ), ইবরাহীম (রঃ), মুজাহিদ (রঃ), আতা (রঃ), সুদ্দী (রঃ) এবং রাবী বিন আনাসেরও (রঃ) ফতওয়া এটাই। তাফসীর-ই-ইবনে আবি হাতিমের হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত কা'ব বিন আজরাকে (রঃ) তিনটি মাসআলা জানিয়ে দিয়ে বলেছিলেনঃ ‘এ তিনটির মধ্যে যে কোন একটির উপর তুমি আমল করলেই যথেষ্ট হবে।' হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যেখানে , শব্দ দিয়ে দু-তিনটি রূপ বর্ণনা করা হয় সেখানে যে কোন একটিকে গ্রহণ করার অধিকার থাকে। হযরত মুজাহিদ (রঃ), ইকরামা (রঃ), আতা' (রঃ), তাঊস (রঃ), হাসান বসরী (রঃ), হামিদ আ'রাজ (রঃ), ইবরাহীম নাখঈ (রঃ) এবং যহাক (রঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে। ইমাম চতুষ্টয় এবং অধিকাংশ আলেমেরও এটাই মাযহাব যে, ইচ্ছে করলে এক ফরক অর্থাৎ তিন সা' (সাড়ে সাত সের) ছ’জন মিসকীনের মধ্যে বন্টন করতে হবে এবং কুরবানী করলে। একটি ছাগী কুরবানী করতে হবে। এই তিনটির মধ্যে যেটি ইচ্ছে হয় পালন করতে হবে।
পরম করুণাময় আল্লাহ এখানে যেহেতু অবকাশ দিতেই চান এজন্যেই সর্বপ্রথম রোযার বর্ণনা দিয়েছেন, যা সর্বাপেক্ষা সহজ। অতঃপর সাদকার কথা বলেছেন এবং সর্বশেষে কুরবানীর বর্ণনা দিয়েছেন। আর রাসূলুল্লাহর (সঃ) যেহেতু সর্বোত্তমের উপর আমল করবার ইচ্ছা, তাই তিনি সর্বপ্রথম ছাগল কুরবানীর বর্ণনা দিয়েছেন, অতঃপর ছ'জন মিসকীনকে খাওয়ানোরে কথা বলেছেন এবং সর্বশেষে তিনটি রোযার উল্লেখ করেছেন। সুতরাং শৃংখলা হিসেবে দু’টোরই অবস্থান অতি চমৎকার। হযরত সাঈদ বিন যুবাইর (রঃ) এই আয়াতের ভাবার্থ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হলে তিনি বলেনঃ তার উপর খাদ্যের নির্দেশ দেয়া হবে। যদি তার কাছে তা বিদ্যমান থাকে তবে তা দিয়ে একটি ছাগল ক্রয় করবে। নচেৎ রৌপ্য মুদ্রা দ্বারা ছাগলের মূল্য নির্ণয় করবে এবং তা দিয়ে খাদ্য ক্রয় করবে, অতঃপর তা সাদকা করে দেবে। নতুবা অর্ধ সা এর পরিবর্তে একটা রোযা রাখবে। হযরত হাসান বসরীর (রঃ) মতে যখন মুহরিমের মস্তকে কোন রোগ হয় তখন সে মস্তক মুণ্ডন করবে এবং নিম্নলিখিত তিনটির মধ্যে যে কোন একটি দ্বারা ফিদইয়াহ আদায় করবেঃ (১) রোযা দশদিন। (২) দশজন মিসকীনকে আহার করান, প্রত্যেক মিসকীনকে এক ‘মাকুক’ খেজুর ও এক মাকুক’ গম দিতে হবে। (৩) একটি ছাগল কুরবানী করা। হযরত ইকরামাও (রঃ) দশ মিসকীনকে খানা খাওয়ানোর কথাই বলেন। কিন্তু এই উক্তিটি সঠিক নয়। কেননা, মারফু হাদীসে এসেছে যে, রোযা তিনটি, ছ’জন মিসকীনকে খানা খাওয়ানো ও একটি ছাগল কুরবানী করা। এই তিনটির যে কোন একটি গ্রহণ করার ব্যাপারে স্বাধীনতা রয়েছে। বলা হচ্ছে যে, ছাগল কুরবানী করবে বা তিনটি রোযা রাখবে অথবা ছ’জন মিসকীনকে আহার করাবে। হাঁ, এই শৃংখলা রয়েছে ইহরামের অবস্থায় শিকারকারীর জন্যেও। যেমন কুরআন কারীমের শব্দ রয়েছে এবং ধর্মশাস্ত্রবিদগণের ইজমাও রয়েছে। কিন্তু এখানে শৃংখলার প্রয়োজন নেই। বরং ইচ্ছাধীন রাখা হয়েছে। তাউস (রঃ) বলেন যে, এই কুরবানী ও সাদকা মক্কাতেই করতে হবে। তবে রোযা যেখানে। ইচ্ছা সেখানেই করতে পারে। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত ইবনে জাফরের (রাঃ) গোলাম হযরত আবু আসমা (রাঃ) বলেনঃ হযরত উসমান বিন আফফান (রাঃ)হজে বের হন। তার সাথে হযরত আলী (রাঃ) এবং হযরত হুসাইন (রাঃ) ছিলেন। আমি ইবনে জাফরের সঙ্গে ছিলাম। আমরা দেখি যে, একটি লোক ঘুমিয়ে রয়েছেন এবং তার উস্ত্রী তার শিয়রে বাঁধা রয়েছে। আমি তাঁকে জাগিয়ে দেখি যে, তিনি হযরত হুসাইন বিন আলী (রাঃ)। হযরত ইবনে জাফর (রাঃ) তাঁকে উঠিয়ে নেন। অবশেষে আমরা সাকিয়া নামক স্থানে পৌছি। তথায় আমরা বিশ দিন পর্যন্ত তার সেবায় নিয়োজিত থাকি। একদা হযরত আলী (রাঃ) তাকে জিজ্ঞেস করেন, অবস্থা কেমন:' হযরত হুসাইন (রাঃ) তাঁর মস্তকের প্রতি ইঙ্গিত করেন। হযরত আলী (রাঃ তাকে মস্তক মুণ্ডনের নির্দেশ দেন। অতঃপর উট যবাহ করেন। তাহলে যদি তাঁর এই উট কুরবানী করা ইহরাম হতে হালাল হওয়ার জন্যে হয়ে থাকে তবে তো ভাল কথা। আর যদি এটা ফিদইয়ার জন্যে হয়ে থাকে তবে এটা স্পষ্ট কথা যে, এই কুরবানী মক্কার বাইরে করা হয়েছিল।
এরপরে ইরশাদ হচ্ছে যে,যে ব্যক্তি হজ্বে তামাত্তু করে সেও কুরবানী করবে, সে হজ্ব ও উমরাহর ইহরাম এক সাথে বেঁধে থাকুক অথবা প্রথমে উমরাহর ইহরাম বেঁধে ওর কার্যাবলী শেষ করার পর হজের ইহরাম বেঁধে থাকুক। শেষেরটাই প্রকৃত ‘তামাতু এবং ধর্মশাস্ত্রবিদদের উক্তিতে এটাই প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছে। তবে সাধারণ তামাত্তু বলতে দু’টোকেই বুঝায়। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। কোন কোন বর্ণনাকারী তো বলেন যে, স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ও (সঃ) হজে তামাত্ত করেছিলেন। অন্যান্যগণ বলেন যে, তিনি হজ্ব ও উমরাহর ইহরাম এক সাথে বেঁধে ছিলেন। তাঁরা সবাই বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর সাথে কুরবানীর জন্তু ছিল। সুতরাং আয়াতটিতে এই নির্দেশ রয়েছে যে, হজ্বে তামাতুকারী যে কুরবানীর উপর সক্ষম হবে তাই করবে। এর সর্বনিম্ন পর্যায় হচ্ছে একটি ছাগল কুরবানী করা। গরুর কুরবানীও করতে পারে। স্বয়ং রাসূলুল্লাহও (সঃ) তাঁর সহধর্মিণীগণের পক্ষ হতে গরু কুরবানী করেছিলেন, তাঁরা সবাই হজ্বে তামাত্তু করেছিলেন। (তাফসীর -ই-ইবনে মিরদুওয়াই)। এর দ্বারা সাব্যস্ত হচ্ছে তামাতুর ব্যবস্থা শরীয়তে রয়েছে।
হযরত ইমরান বিন হুসাইন (রাঃ) বলেন, কুরআন মাজীদে তামাতুর আয়াতও অবতীর্ণ হয়েছে এবং আমরা রাসূলুল্লাহর (সঃ) সাথে হজ্বে তামাত্ত্ব করেছি। অতঃপর কুরআন কারীমেও এর নিষেধাজ্ঞা সম্বলিত আয়াত অবতীর্ণ হয়নি এবং রাসূলুল্লাহও (সঃ) এটা হতে বাধা দান করেননি। জনগণ নিজেদের মতানুসারে এটাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।' ইমাম বুখারী (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা হযরত উমার (রাঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। মুহাদ্দিসগণের মতে ইমাম বুখারীর এই কথা সম্পূর্ণরূপেই সঠিক। হযরত উমার (রাঃ) হতে নকল করা হয়েছে যে, তিনি জনগণকে এটা হতে বাধা দিতেন এবং বলতেন, “আমরা যদি আল্লাহ তা'আলার কিতাবকে গ্রহণ করি তবে ওর মধ্যে হজ্ব ও উমরাহকে পুরো করার নির্দেশ বিদ্যমান রয়েছে। যেমন বলা হয়েছে (আরবি) অর্থাৎ “তোমরা হজ্ব ও উমরাহকে আল্লাহর জন্যে পুরো কর।' (২:১৯৬) তবে এটা মনে রাখা দরকার যে, হযরত উমারের (রাঃ) এই বাধা প্রদান হারাম হিসেবে ছিল না। বরং এ জন্যেই ছিল যে, যেন মানুষ খুব বেশী করে হজ্ব ও উমরাহর উদ্দেশ্যে বায়তুল্লাহ শরীফের যিয়ারত করে।
এরপরে বলা হচ্ছে-যে ব্যক্তি প্রাপ্ত না হয় সে হজ্বের মধ্যে তিনটি রোযা রাখবে এবং হজ্বব্রত সমাপ্ত করে প্রত্যাবর্তনের সময় আর সাতটি রোযা রাখবে। সুতরাং পূর্ণ দশটি রোযা হয়ে যাবে। অর্থাৎ যে ব্যক্তি কুরবানীর উপর সক্ষম না হবে সে রোযা রাখবে। তিনটি রোযা হজ্বের দিনগুলোতে রাখবে। আলেমদের মতে এই রোযাগুলো আরাফার দিনের অর্থাৎ ৯ই জিল হজ্ব তারিখের পূর্ববর্তী দিনগুলোতে রাখাই উত্তম। হযরত আতা (রঃ)-এর উক্তি এটাই। কিংবা ইহরাম বাঁধা মাত্রই রাখবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রভৃতি মনীষীর উক্তি এটাই। কেননা, কুরআন মাজীদে (আরবি) শব্দ রয়েছে। হযরত তাউস (রঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ) প্রভৃতি মনীষী এটাও বলেন যে, শাওয়াল মাসের প্রথম দিকেই এই রোযাগুলো রাখা বৈধ। হযরত শা'বী (রঃ) প্রভৃতি মনীষী বলেন যে, এই রোযাগুলোর মধ্যে যদি আরাফার দিনের রোযা সংযোজিত করে শেষ করে তবুও চলবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এটাও নকল করা হয়েছে যে, আরাফার দিনের পূর্বে যদি দু’দিনের দু’টো রোযা রাখে এবং তৃতীয় দিন আরাফার দিন হয় তবে এও জায়েয হবে। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) একথাই বলেন। হযরত আলীরও (রাঃ) উক্তি এটাই।
যদি কোন ব্যক্তির এই তিনটি রোযা বা দু'একটি রোযা ছুটে যায় এবং ‘আইয়্যামে তাশরীক' অর্থাৎ ঈদুল আযহার পরবর্তী তিনদিন এসে পড়ে তবে হযরত আয়েশা (রাঃ) এবং হযরত ইবনে উমারের (রাঃ) উক্তি এই যে, এই ব্যক্তি এ দিনগুলোতেও এই রোযাগুলো রাখতে পারে (সহীহ বুখারী)। ইমাম শাফিঈরও (রাঃ) প্রথম উক্তি এটাই। হযরত আলী (রাঃ) হতেও এটা বর্ণিত আছে। হযরত ইকরামা (রঃ), হযরত হাসান বসরী (রঃ) এবং হযরত উরওয়া বিন যুবাইর (রঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে। তাদের দলীল এই যে, (আরবি) শব্দটি সাধারণ। সুতরাং এই দিনগুলো এর অন্তর্ভুক্ত। কেননা, সহীহ মুসলিমের মধ্যে হাদীস রয়েছে যে, আইয়্যামে তাশরীক’ হচ্ছে খাওয়া, পান করা ও আল্লাহ তাআলার যিকির করার দিন।
অতঃপর সাতটি রোযা রাখতে হবে হজ্ব হতে প্রত্যাবর্তনের পর। এর ভাবার্থ এক তো এই যে, ফিরে যখন স্বীয় অবস্থান স্থলে পৌছে যাবে। সুতরাং ফিরবার সময় পথেও এই রোযাগুলো রাখতে পারে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) ও হযরত আতা' (রাঃ) একথাই বলেন। কিংবা এর ভাবার্থ হচ্ছে স্বদেশে পৌঁছে যাওয়া। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) এটাই বলেন। আরও বহু তাবেঈনের মাযহাব এটাই। এমনকি হযরত ইবনে জাবিরের (রঃ) মতে এর উপরে ইজমা হয়েছে। সহীহ বুখারী শরীফের একটি সুদীর্ঘ হাদীসের মধ্যে রয়েছে যে, ‘হাজ্বাতুল বিদা’য় রাসূলুল্লাহ (সঃ) উমরার সাথে হজ্বে তামাতু’ করেন এবং যুলহুলায়ফায়’ কুরবানী দেন। তিনি কুরবানীর জন্তু সাথে নিয়েছিলেন। তিনি উমরাহ করেন অতঃপর হজ্ব করেন। জনগণও তাঁর সাথে হজ্বে তামাত্ত্ব করেন। কতকগুলো লোক কুরবানীর জন্তু সাথে নিয়েছিলেন; কিন্তু কতকগুলো লোকের সাথে কুরবানীর জন্তু ছিল না। মক্কায় পৌঁছে রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঘোষণা করেন, যাদের নিকট কুরবানীর জন্তু রয়েছে তারা হজ্ব শেষ না হওয়া পর্যন্ত ইহরামের অবস্থাতেই থাকবে। আর যাদের কাছে কুরবানীর জন্তু নেই তারা বায়তুল্লাহ শরীফের তাওয়াফ করতঃ সাফা ও মারওয়া পর্বতদ্বয়ের মধ্যবর্তী স্থানে দৌড়িয়ে ইহরাম ভেঙ্গে দেবে। মস্তক মুন্ডন করবে অথবা হেঁটে দেবে।' অতঃপর হজ্বের ইহরাম বেঁধে নেবে। কুরবানী দেয়ার ক্ষমতা না থাকলে হজ্বের মধ্যে তিনটি রোযা রাখবে এবং সাতটি রোযা স্বদেশে ফিরে গিয়ে রাখবে।' (সহীত বুখারী ও মুসলিম)। এর দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, এই সাতটি রোযা স্বদেশে ফিরে গিয়ে রাখতে হবে। অতঃপর বলা হচ্ছে-‘এই পূর্ণ দশ দিন।' এই কথাটি জোর দেয়ার জন্যে বলা হয়েছে। যেমন আরবী ভাষায় বলা হয়ে থাকে, ‘আমি স্বচক্ষে দেখেছি, কানে শুনেছি এবং হাতে লিখেছি।
কুরআন মাজীদের মধ্যেও রয়েছে (আরবি) অর্থাৎ না কোন পাখী যা তার দু'পাখার সাহায্যে উড়ে থাকে।' (৬:৩৮) অন্য স্থানে রয়েছে। (আরবি) অর্থাৎ “(হে নবী সঃ) তুমি, তোমার ডান হাত দ্বারা লিখ না।' (২৯:৪৮) আর এক জায়গায় রয়েছে-‘আমি মূসার (আঃ) সঙ্গে ত্রিশ রাত্রির ওয়াদা করেছি এবং আরও দশ দিয়ে তা পূর্ণ করেছি। অতঃপর তার প্রভুর নির্দিষ্ট চল্লিশ রাত্রি পূর্ণ হলো। অতএব এসব জায়গায় যেমন শুধু জোর দেয়ার জন্যেই এই শব্দগুলো ব্যবহৃত হয়েছে তেমনই এই বাক্যটিও জোর দেয়ার জন্যেই আনা হয়েছে। আবার এও বলা হয়েছে যে, এটা হচ্ছে পূর্ণ করার নির্দেশ। (আরবি) শব্দটির ভাবার্থ এও বর্ণনা করা হয়েছে যে, এটা কুরবানীর পরিবর্তে যথেষ্ট। এরপরে বলা হচ্ছে যে, এই নির্দেশ ঐসব লোকের জন্যে যাদের পরিবার পরিজন ‘মসজিদে হারামে’ অবস্থানকারী না হয়। হারামবাসী যে হজ্বে তামাত্ত্ব করতে পারে না এর উপর তো ইজমা রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) একথাই বলেছেন।
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এটাও বর্ণিত আছে যে, তিনি বলতেন“হে মক্কাবাসী! তোমরা হজ্বে তামাতু করতে পার না। তামাতু বিদেশী লোকদের জন্যে বৈধ করা হয়েছে। তোমাদেরকে তো সামান্য দূর যেতে হয়। অল্প দূর গিয়েই তোমরা উমরাহর ইহরাম বেঁধে থাকো।' হযরত তাউসেরও (রঃ) ব্যাখ্যা এটাই। কিন্তু হযরত আতা' (রঃ) বলেন যে, যারা মীকাতের (ইহরাম বাঁধার স্থানসমূহ) মধ্যে রয়েছে তাদের জন্যেও এই নির্দেশ। তাদের জন্যেও তামাত্ত জায়েয নয়। মাকহুলও (রাঃ) একথাই বলেন। তাহলে আরাফা, মুদালাফা, আরনা এবং রাজী’র অধিবাসীদের জন্যেও এই নির্দেশ। যুহরী (রঃ) বলেন যে, যারা মক্কা শরীফ হতে একদিনের পথের বা তার চেয়ে কম পথের ব্যবধানের উপর রয়েছে, তারা হজ্বে তামাত্ত্ব করতে পারে, অন্যেরা পারে না। হযরত আতা (রঃ) দু’দিনের কথাও বলেছেন।
ইমাম শাফিঈর (রঃ) মাযহাব এই যে, হারামের অধিবাসী এবং যারা এরূপ দূরবর্তী জায়গায় রয়েছে যেখানে মক্কাবাসীদের জন্যে নামায কসর করা জায়েয নয় এদের সবারই জন্যেই এই নির্দেশ। কেননা, এদেরকেও মক্কার অধিবাসীই বলা হবে। এদের ছাড়া অন্যান্য সবাই মুসাফির। সুতরাং তাদের সবারই জন্যে হজ্বের মধ্যে তামাত্তু করা জায়েয। অতঃপর বলা হচ্ছে-“আল্লাহ তা'আলাকে ভয় কর। তাঁর নির্দেশাবলী মেনে চল এবং যেসব কাজের উপর তিনি নিষেধাজ্ঞা জারী করেছেন তা থেকে বিরত থাক। জেনে রেখো যে, তার অবাধ্যদেরকে তিনি কঠিন শাস্তি দিয়ে থাকেন।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।