আল কুরআন


সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 19)

সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 19)



হরকত ছাড়া:

أو كصيب من السماء فيه ظلمات ورعد وبرق يجعلون أصابعهم في آذانهم من الصواعق حذر الموت والله محيط بالكافرين ﴿١٩﴾




হরকত সহ:

اَوْ کَصَیِّبٍ مِّنَ السَّمَآءِ فِیْهِ ظُلُمٰتٌ وَّ رَعْدٌ وَّ بَرْقٌ ۚ یَجْعَلُوْنَ اَصَابِعَهُمْ فِیْۤ اٰذَانِهِمْ مِّنَ الصَّوَاعِقِ حَذَرَ الْمَوْتِ ؕ وَ اللّٰهُ مُحِیْطٌۢ بِالْکٰفِرِیْنَ ﴿۱۹﴾




উচ্চারণ: আও কাসাইয়িবিম মিনাছছামাই ফীহি জুলুমা-তুওঁ ওয়া রা‘দুওঁ ওয়া বারকুইঁ ইয়াজ‘আলূনা আসা-বি‘আহুম ফীআ-যা-নিহিম মিনাসসাওয়া-‘ইকিহাযারাল মাওতি ওয়াল্লা-হু মুহীতূম বিলকা-ফিরীন।




আল বায়ান: কিংবা আকাশের বর্ষণমুখর মেঘের ন্যায়, যাতে রয়েছে ঘন অন্ধকার, বজ্রধ্বনি ও বিদ্যুৎচমক। বজ্রের গর্জনে তারা মৃত্যুর ভয়ে তাদের কানে আঙুল দিয়ে রাখে। আর আল্লাহ কাফিরদেরকে পরিবেষ্টন করে আছেন।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৯. কিংবা আকাশ হতে মুষলধারে বৃষ্টির ন্যায়, যাতে রয়েছে ঘোর অন্ধকার, বজ্রধ্বনি(১) ও বিদ্যুৎচমক বজ্রধ্বনিতে মৃত্যুভয়ে তাদের কানে আঙ্গুল দেয়। আর আল্লাহ কাফেরদেরকে পরিবেষ্টন করে রয়েছেন(২)।




তাইসীরুল ক্বুরআন: অথবা যেমন আকাশের বর্ষণমুখর মেঘ, যাতে আছে গাঢ় অন্ধকার, বজ্রধ্বনি ও বিদ্যুৎ চমক, বজ্রধ্বনিতে মৃত্যু ভয়ে তারা তাদের কানে আঙ্গুল ঢুকিয়ে দেয়। আল্লাহ কাফেরদেরকে পরিবেষ্টন করে আছেন।




আহসানুল বায়ান: ১৯। কিংবা যেমন আকাশের মুষলধারা বৃষ্টি, যাতে রয়েছে ঘোর অন্ধকার বজ্রধ্বনি ও বিদ্যুৎ-চমক। বজ্রধ্বনিতে তারা মৃত্যুভয়ে তাদের কানে আঙ্গুল দেয়। আল্লাহ অবিশ্বাসীদের পরিবেষ্টন করে রয়েছেন।



মুজিবুর রহমান: অথবা আকাশ হতে বারি বর্ষণের ন্যায় যাতে অন্ধকার, গর্জন ও বিদ্যুৎ রয়েছে, তারা বজ্রধ্বনি বশতঃ মৃত্যুভয়ে তাদের কর্ণসমূহে স্ব স্ব অঙ্গুলী গুজে দেয়, এবং আল্লাহ অবিশ্বাসীদের পরিবেষ্টনকারী।



ফযলুর রহমান: অথবা (তাদের উপমা:) যেন আকাশের বৃষ্টিবাহী মেঘ, যার মধ্যে রয়েছে অন্ধকার ও বজ্র-বিদ্যুৎ; তারা মৃত্যুর ভয়ে বজ্রপাতের শব্দ প্রতিরোধের জন্য কানে আঙ্গুল দিয়ে রাখছে। বস্তুত আল্লাহ কাফেরদের ঘেরাও করে রেখেছেন।



মুহিউদ্দিন খান: আর তাদের উদাহরণ সেসব লোকের মত যারা দুর্যোগপূর্ণ ঝড়ো রাতে পথ চলে, যাতে থাকে আঁধার, গর্জন ও বিদ্যুৎচমক। মৃত্যুর ভয়ে গর্জনের সময় কানে আঙ্গুল দিয়ে রক্ষা পেতে চায়। অথচ সমস্ত কাফেরই আল্লাহ কর্তৃক পরিবেষ্ঠিত।



জহুরুল হক: অথবা আকাশ থেকে আসা ঝড় বৃষ্টির মতো -- তার মাঝে আছে গাঢ় অন্ধকার এবং বজ্রপাত ও বিদ্যুতের ঝলকানি। তারা তাদের গোটা আঙ্গুলগুলো চেপে ধরে তাদের কানের ভেতরে বজ্রের শব্দে মরার ভয়ে। কিন্তু আল্লাহ্ অবিশ্বাসীদের ঘিরে ফেলেন।



Sahih International: Or [it is] like a rainstorm from the sky within which is darkness, thunder and lightning. They put their fingers in their ears against the thunderclaps in dread of death. But Allah is encompassing of the disbelievers.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১৯. কিংবা আকাশ হতে মুষলধারে বৃষ্টির ন্যায়, যাতে রয়েছে ঘোর অন্ধকার, বজ্রধ্বনি(১) ও বিদ্যুৎচমক বজ্রধ্বনিতে মৃত্যুভয়ে তাদের কানে আঙ্গুল দেয়। আর আল্লাহ কাফেরদেরকে পরিবেষ্টন করে রয়েছেন(২)।


তাফসীর:

১. হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ইয়াহুদীরা জিজ্ঞেস করলো যে  رَعْدٌ কি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এটা আল্লাহর ফেরেশতাদের মধ্য হতে এক ফেরেশতা। যাকে মেঘ-মালা সঞ্চালনের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তার হাতে আগুনের চাবুক। সে এটা দিয়ে মেঘকে যেখানে আল্লাহর নির্দেশ হয় সেখানে ধমকিয়ে ও হাঁকিয়ে নিয়ে যায়। তারা বলল, তাহলে যে আওয়াজ শুনা যায় সেটা কি? তিনি বললেন, সেটা তার গর্জন। তারা বললঃ আপনি সত্য বলেছেন। [তিরমিযী: ৩১১৭, মুসনাদে আহমদ ১/২৭৪]

ইবনে কাসীর বলেন, আয়াতে ظُلْمَاتٌ বা ‘অন্ধকার’ বলে তাদের সংশয়, অবিশ্বাস, দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ও নিফাক বোঝানো হয়েছে। আর رَعْدٌ বা বজ্রধ্বনি বলে এমন গর্জন বোঝানো হয়েছে, যা তাদের অন্তরে ভয়ের উদ্রেক করে। মুনাফিকদের জন্য তা অত্যধিক শংকাগ্রস্ত ও কম্পন সৃষ্টিকারী। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা বলেন, “তারা যে কোন আওয়াজকেই তাদের বিরুদ্ধে মনে করে [সূরা আল-মুনাফিকুন: ৪] অন্যত্র বলেন, “ওরা আল্লাহর নামে শপথ করে যে, ওরা তোমাদেরই অন্তর্ভুক্ত, কিন্তু ওরা তোমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়, বস্তুত ওরা এমন এক সম্প্রদায় যারা ভয় করে থাকে। ওরা কোন আশ্রয়স্থল, কোন গিরিগুহা অথবা কোন প্রবেশস্থল পেলে ওদিকেই দ্রুত পালিয়ে যাবে।” [সূরা আত-তাওবাহ ৫৬-৫৭]


২. ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, এর অর্থ আল্লাহ কাফেরদের উপর আযাব নাযিল করবেন। সে জন্য তারা তার বেষ্টনী থেকে বের হতে পারবে না। মুজাহিদ বলেন, বেষ্টন করার অর্থ, তিনি তাদেরকে (কিয়ামতের দিন) একত্রিত করবেন। [আত-তাফসীরুস সহীহ] ইবনে কাসীর বলেন, অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা কাফের-মুনাফিকদের সকল দিক থেকেই ঘিরে রেখেছেন। তার অসীম ক্ষমতা ও ইচ্ছার বাইরে যাওয়ার কোন ক্ষমতাই তাদের নেই। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা অন্যত্র বলেছেন, “আপনার কাছে কি পৌছেছে সৈন্যবাহিনীর বৃত্তান্ত--- ফিরআউন ও সামূদের? তবু কাফিররা মিথ্যা আরোপ করায় রত, আর আল্লাহ তাদের অলক্ষ্যে তাদেরকে পরিবেষ্টন করে রয়েছেন [সূরা আল-বুরুজ ১৭-২০]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: ১৯। কিংবা যেমন আকাশের মুষলধারা বৃষ্টি, যাতে রয়েছে ঘোর অন্ধকার বজ্রধ্বনি ও বিদ্যুৎ-চমক। বজ্রধ্বনিতে তারা মৃত্যুভয়ে তাদের কানে আঙ্গুল দেয়। আল্লাহ অবিশ্বাসীদের পরিবেষ্টন করে রয়েছেন।


তাফসীর:

-


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ১৯ ও ২০ নং আয়াতের তাফসীর:



শানে নুযূল:



ইবনু আব্বাস, ইবনু মাসউদ ও আরো কয়েকজন সাহাবী (রাঃ) হতে বর্ণিত তারা বলেন: মদীনাবাসীদের মধ্যে দু’জন মুনাফিক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট থেকে পলায়ন করে মুশরিকদের কাছে চলে যায়। তখন পথিমধ্যে তাদেরকে বিদ্যুৎ ও প্রকট বজ্রধ্বনিসহ বৃষ্টি পেয়ে বসল, আল্লাহ তা‘আলা যে বৃষ্টির কথা এখানে উল্লেখ করেছেন। যখন তাদেরকে বজ্রাঘাত করত তখনই তারা উভয়ে তাদের কানের ছিদ্রে আঙ্গুল ঢুকিয়ে দিত। যাতে তাদের কানের ভেতরে বজ্রধ্বনি প্রবেশ করে তাদের মৃত্যুর কারণ না হয়। যখন বিদ্যুৎ চমকাত তখন উভয়ে আলো দেখে দেখে পথ চলত আর যখন বিুদ্যৎ চমকাত না তখন কিছুই দেখতে পেত না। এভাবে তারা হেঁটে তাদের স্বস্থানে ফিরে আসল এবং উভয়ে বলতে লাগল যদি আমরা সকাল করতে পারি তাহলে মুহাম্মাদের কাছে এসে আমরা তার হাতে আমাদের হাত রাখব।



পরদিন সকালে তারা মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট এলো। অতঃপর ইসলাম গ্রহণ করল, তাঁর হাতের ওপর হাত রাখল (বাইয়াত গ্রহণ করল) এবং তারা ইসলাম মেনে নিল। আল্লাহ তা‘আলা এ দু’জন মুনাফিকের দৃষ্টান্ত মদীনাবাসীর সকল মুনাফিকদের জন্য পেশ করেছেন। (মদীনার) মুনাফিকরা যখন নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মজলিসে উপস্থিত হত তখন নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কথা না শোনার জন্য তারা তাদের কানে আঙ্গুল ঢুকিয়ে দিত এ আশঙ্কায় যে, তাদের ব্যাপারে কোন কিছু নাযিল হয়ে যাবে। অথবা তাদের ব্যাপারে এমন কিছু উল্লেখ করবে ফলে তারা নিহত হয়ে যাবে। যেমন ঐ দু’জন মুনাফিক মৃত্যু ভয়ে তাদের কানে আঙ্গুল ঢুকিয়ে দিয়েছিল। (লুবাবুন নুকূল ফী আসবাবিন নুযূল, ১৭-১৮, ইবনু জারীর আত্ব-তাবারী, ১ম খণ্ড, ২২১, বর্ণনাটি হাসান)



(كُلَّمَآ أَضَا۬ءَ لَهُمْ مَّشَوْا فِيْهِ)



“তখন তাতে তারা চলতে থাকে যখন তিনি তাদের জন্য একটু আলো (বিদ্যুৎ) প্রজ্জ্বলিত করেন” অর্থাৎ যখন তাদের ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি অধিক হত এবং প্রচুর পরিমাণ গনীমত লাভ করত তখন দীন-ইসলামের ওপর তারা বহাল থাকত এবং বলত: মুহাম্মাদের দীন সত্য। যেমন ঐ দু’জন মুনাফিক বিদ্যুতের আলোতে পথ চলত।



(وَإِذَآ أَظْلَمَ عَلَيْهِمْ قَامُوْا)



“এবং যখন তাদের ওপর অন্ধকার আচ্ছন্ন করেন তখন তারা দাঁড়িয়ে থাকে।”অর্থাৎ যখন তাদের এ ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি ধ্বংস হয়ে যেত এবং বালা-মুসিবত তাদের ওপর আপতিত হত তখন তারা বলত, এসব মুহাম্মাদের কারণেই। আর তারা মুরতাদ হয়ে যেত। যেমন ঐ দু’জন মুনাফিক অন্ধকারে আচ্ছন্ন অবস্থায় বলেছিল।



الصيب- (اَوْ کَصَیِّبٍ)



(আস-সায়্যিবু)-এর অর্থ বৃষ্টি। নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যে হিদায়াত ও জ্ঞান নিয়ে এসেছেন আল্লাহ তা‘আলা তা এ আয়াতে বৃষ্টির সাথে তুলনা করেছেন। কেননা হিদায়াত ও জ্ঞান হল আত্মার জীবন। যেমন বৃষ্টি হল শরীরের জীবন। উদাহরণের দিকে ঈঙ্গিত করে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَالْبَلَدُ الطَّيِّبُ يَخْرُجُ نَبَاتُه۫ بِإِذْنِ رَبِّه۪ وَالَّذِي خَبُثَ لَا يَخْرُجُ إِلَّا نَكِدًا)



“এবং উৎকৃষ্ট ভূমির ফসল তার প্রতিপালকের আদেশে উৎপন্ন হয় এবং যা নিকৃষ্ট তাতে কঠোর পরিশ্রম না করলে কিছুই জন্মায় না।”(সূরা আ‘রাফ ৭:৫৮)



এ দিকে ইঙ্গিত করে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, আল্লাহ তা‘আলা আমাকে যে হিদায়াত ও জ্ঞান দিয়ে প্রেরণ করেছেন তার উদাহরণ হল বৃষ্টির মত। কোন একস্থানে বর্ষণ হল অতঃপর তার কিছু উর্বর জায়গা পানি ধারণ করল। ফলে প্রচুর পরিমাণে ঘাস জন্মাল। মানুষরা তাত্থেকে পান করল, পশু-পাখিদের পান করাল এবং শস্য উৎপন্ন করল। এটাই হল ঐ ব্যক্তির উপমা যে ব্যক্তি দীনের গভীর জ্ঞান অর্জন করে এবং আল্লাহ তা‘আলা আমাকে যা দিয়ে প্রেরণ করেছেন তা দ্বারা সে নিজে উপকৃত হয়। ফলে সে নিজে ইলম অর্জন করে এবং অন্যদেরকে শিক্ষা দেয়। আর তার কিছু অংশ রয়েছে যা পানিও ধরে রাখতে পারে না এবং ঘাসও উৎপন্ন করে না। (সহীহ মুসলিম হা: ২২৮২)



(فِيْهِ ظُلُمَاتٌ)



‘যাতে রয়েছে অন্ধকার’আল্লাহ তা‘আলা অত্র আয়াতে বৃষ্টির অন্ধকার দ্বারা কাফির ও মুনাফিকদের সম্পর্কে দৃষ্টান্ত পেশ করছেন। তারা কুরআন সম্পর্কে যে সন্দেহ-সংশয় পোষণ করে, সে জন্য তাদের কষ্টে নিপতিত করা। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বর্ণনা করেছেন, এটা তাদের কাছে অন্ধকারের মত। কেননা তা তাদের অন্ধত্বই বৃদ্ধি করে দেয়।



رَعْدٌ ‘গর্জন’আল্লাহ তা‘আলা বজ্রধ্বনি দ্বারা মুনাফিকদের উদাহরণ দিয়েছেন। কেননা কুরআনে তাদেরকে এমন ধমক দেয়া হয়েছে যা কানকে ছিদ্র করে দেয় এবং অন্তরকে ফাটিয়ে দেয়।



وَّبَرْقٌ ‘বিদ্যুৎ চমক’ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন: এর ভাবার্থ এই যে, কুরআন মাজীদের মজবুত আয়াতগুলো এসব মুনাফিকদের প্রকৃত অবস্থা খুলে দেবে ও তাদের গোপনীয় দোষ প্রকাশ করবে এবং আপন উজ্জ্বলতার দ্বারা তাদেরকে হতভম্ব করে দিবে। যখন তাদের ওপর অন্ধকার ছেয়ে যায় তখন তারা দাঁড়িয়ে যায়। অর্থাৎ যখন তাদের ঈমান প্রকাশ পায় তখন তাদের অন্তর কিছু উজ্জ্বল হয়ে ওঠে এবং তারা এর অনুসরণ করতে থাকে। কিন্তু যখনই সন্দেহ ও সংশয়ের উদ্রেক হয় তখনই অন্তরের মধ্যে অন্ধকার ছেয়ে যায়, তখন সে হয়রান পেরেশান হয়ে যায়। অথবা এর ভাব এও হতে পারে যে, যখন ইসলামের কিছুটা উন্নতি সাধিত হয়, তখন তাদের মনে কিছুটা স্থিরতা আসে, কিন্তু যখনই তার বিপরীত পরিলক্ষিত হয় তখনই তারা কুফরীর দিকে ফিরে যায়।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَمِنَ النَّاسِ مَنْ یَّعْبُدُ اللہَ عَلٰی حَرْفٍﺆ فَاِنْ اَصَابَھ۫ خَیْرُ اۨطْمَاَنَّ بِھ۪ﺆ وَاِنْ اَصَابَتْھُ فِتْنَةُ اۨنْقَلَبَ عَلٰی وَجْھِھ۪ﺥ خَسِرَ الدُّنْیَا وَالْاٰخِرَةَﺚ ذٰلِکَ ھُوَ الْخُسْرَانُ الْمُبِیْنُ)



“মানুষের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহর ‘ইবাদত করে দ্বিধার সাথে; তার মঙ্গল হলে তাতে তার চিত্ত প্রশান্ত হয় এবং কোন বিপর্যয় ঘটলে সে তার পূর্বাবস্থায় ফিরে যায়। সে ক্ষতিগ্রস্ত হয় দুনিয়াতে ও আখিরাতে; এটা তো সুস্পষ্ট ক্ষতি।”(সূরা হাজ্জ ২২:১১)



সাহাবী ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: তাদের আলোতে চলার অর্থ হচ্ছে সত্যকে জেনে ইসলামের কালিমা পাঠ করা এবং অন্ধকারে থেমে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে কুফরীর দিকে ফিরে যাওয়া। অধিকাংশ আলেমদের এটাই মত, আর এটাই সবচেয়ে সঠিক কথা। (তাফসীর ইবনে কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর)



কিয়ামাতের দিনও তাদের এ অবস্থা হবে যখন ঈমানদারদেরকে তাদের ঈমানের পরিমাণ অনুযায়ী নূর দেয়া হবে, কেউ পাবে বহু মাইল পর্যন্ত আলো, কেউ পাবে তারও বেশি, কেউ তার চেয়ে কম, এমনকি শেষ পর্যন্ত কেউ এতটুকু পাবে যে, কখনো আলোকিত হবে আবার কখনো অন্ধকার হয়ে যাবে। কিছু লোক এমনও হবে যে, তারা একটু দূরে গিয়েই থেমে যাবে, আবার কিছুদূর পর্যন্ত আলো পাবে, আবার নিভে যাবে। আবার এমন দুর্ভাগা লোক হবে তাদের কোন আলোই থাকবে না। এরাই হল প্রকৃত মুনাফিক। এদের ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(یَوْمَ یَقُوْلُ الْمُنٰفِقُوْنَ وَالْمُنٰفِقٰتُ لِلَّذِیْنَ اٰمَنُوا انْظُرُوْنَا نَقْتَبِسْ مِنْ نُّوْرِکُمْﺆ قِیْلَ ارْجِعُوْا وَرَا۬ءَکُمْ فَالْتَمِسُوْا نُوْرًا)



“সেদিন মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারী মু’মিনদেরকে বলবেঃ তোমরা আমাদের জন্য একটু অপেক্ষা কর, যাতে আমরা তোমাদের নূর হতে কিছু গ্রহণ করতে পারি। বলা হবে: তোমরা তোমাদের পেছনে ফিরে যাও ও আলোর সন্ধান কর।”(সূরা হাদীদ ৫৭:১৩)



আবার মু’মিনদের ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(یَوْمَ تَرَی الْمُؤْمِنِیْنَ وَالْمُؤْمِنٰتِ یَسْعٰی نُوْرُھُمْ بَیْنَ اَیْدِیْھِمْ وَبِاَیْمَانِھِمْ بُشْرٰٿکُمُ الْیَوْمَ جَنّٰتٌ)



“সেদিন (কিয়ামতের দিন) তুমি দেখবে মু’মিন নর-নারীদের সম্মুখভাগে ও ডান পার্শ্বে তাদের জ্যোতি প্রবাহিত হবে। (বলা হবে) আজ তোমাদের জন্য সুসংবাদ জান্নাতের।” (সূরা হাদীদ ৫৭:১২) অনুরূপ সূরা তাহরীমের ৮ নং আয়াতে এ সম্পর্কে বর্ণনা এসেছে।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. কোন বিষয় বুঝানোর জন্য উদাহরণ পেশ করা বৈধ, তবে তা বাস্তবতা ও সত্যার ভিত্তিতে হতে হবে।

২. বাতিলদের অপচেষ্টা যতই হোক না কেন এর পরিণতি খুবই ভয়াবহ।

৩. কুরআন মু’মিনদের অন্তরকে এমনভাবে জীবিত করে বৃষ্টি যেমন মাটিকে জীবিত করে।

৪. কিয়ামত দিবসে মু’মিনরা তাদের ঈমান ও আমল অনুযায়ী নূর পাবে, যার দ্বারা তারা পথ চলবে। কিন্তু মুনাফিকদের প্রকৃতপক্ষে ঈমান না থাকায় তারা কোন নূর পাবে না।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ১৯-২০ নং আয়াতের তাফসীর

এটা দ্বিতীয় উদাহরণ যা দ্বিতীয় প্রকারের মুনাফিকদের জন্যে বর্ণনা করা হয়েছে। এরা সেই সম্প্রদায় যাদের নিকট কখনও সত্য প্রকাশ পেয়ে থাকে। এবং কখনও সন্দেহে পতিত হয়। সন্দেহের সময় তাদের দৃষ্টান্ত বৃষ্টির মত (আরবি)-এর অর্থ হচ্ছে বৃষ্টিপাত ও বর্ষণ। কেউ কেউ এর অর্থ মেঘও বর্ণনা করেছেন। কিন্তু খুব প্রসিদ্ধ অর্থ হচ্ছে বৃষ্টি বা অন্ধকারে বর্ষে। (আরবি)-এর ভাবার্থ হচ্ছে সন্দেহ, কুফর ও নিফাক। (আরবি)-এর অর্থ হচ্ছে বজ্র, যা ভয়ংকর শব্দের দ্বারা অন্তর কাঁপিয়ে তোলে। মুনাফিকের অবস্থাও ঠিক এইরূপ। সব সময় তার মনে ভয়, সন্ত্রাস ও উদ্বেগ থাকে। যেমন কুরআন মজীদের এক জায়গায় আছেঃ (আরবি)

অর্থাৎ প্রত্যেক শব্দকে তারা নিজেদের উপরই মনে করে থাকে।' (৬৩:৪) অন্যত্র আল্লাহ পাক বলেনঃ “এই মুনাফিকরা শপথ করে বলে থাকে যে, তারা তোমাদেরই অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা ভীত লোক, যদি তারা কোন আশ্রয়স্থল পথ পায় তবে নিশ্চয়ই কুঞ্চিত হয়ে সেখানেই প্রবেশ করবে। বিদ্যুতের সঙ্গে সেই ঈমানের আলোর তুলনা করা হয়েছে যা কখনও কখনও তাদের অন্তরে উজ্জ্বল হয়ে উঠে, সে সময়ে তারা মরণের ভয়ে তাদের অঙ্গুলিগুলো কানের মধ্যে ভরে দেয়, কিন্তু ওটা তাদের কোন উপকারে আসে। এরা আল্লাহ তাআলার ক্ষমতা ও ইচ্ছার অধীন রয়েছে। সুতরাং এরা বাঁচতে পারে না। আল্লাহ তাআলা এক জায়গায় বলেছেনঃ তোমাদের নিকট কি ঐ সেনাবাহিনীর কাহিনী পৌঁছেছে, অর্থাৎ ফিরআউন ও সামূদের? বরং কাফিরেরা অবিশ্বাস করার মধ্যে রয়েছে। আর আল্লাহ তাদেরকে চারদিক থেকে ঘিরে রয়েছেন।

বিদ্যুতের চক্ষুকে কেড়ে নেয়ার অর্থ হচ্ছে তার শক্তি ও কাঠিন্য এবং ঐ মুনাফিকদের দৃষ্টি শক্তিতে দুর্বলতার অর্থ হচ্ছে তাদের ঈমানের দুর্বলতা।

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে তিনি বলেনঃ এর ভাবার্থ এই যে, কুরআন মাজীদের মজবুত আয়াতগুলো ঐ মুনাফিকদের প্রকৃত অবস্থা খুলে দেবে ও তাদের গোপনীয় দোষ প্রকাশ করবে এবং আপন ঔজ্জ্বল্যের দ্বারা তাদেরকে হতভম্ব করে দেবে। যখন তাদের উপর অন্ধকার ছেয়ে যায় তখন তারা দাড়িয়ে যায়, অর্থাৎ যখন তাদের ঈমান প্রকাশ পায় তখন তাদের অন্তর কিছু উজ্জ্বল হয়ে ওঠে এবং তারা এর অনুসরণ করতে থাকে। কিন্তু যেমনই সংশয় ও সন্দেহের উদ্রেক হয় তেমনই অন্তরের মধ্যে অন্ধকার ছেয়ে যায় এবং তখন সে হয়রান পেরেশান হয়ে যায়। এর ভাব এও হতে পারে যে, যখন ইসলামের কিছুটা উন্নতি সাধিত হয়, তখন তাদের মনে কিছুটা স্থিরতা আসে, কিন্তু যখনই ওর বিপরীত পরিলক্ষিত হয় তখনই তারা কুফরীর দিকে ফিরে যায়। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ কতকগুলো লোক এমনও আছে যারা প্রান্তে দাঁড়িয়ে আল্লাহর ইবাদত করতে থাকে অতঃপর মঙ্গল পৌছলে স্থির থাকে এবং অমঙ্গল পৌছলে তৎক্ষণাৎ ফিরে যায়।

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, তাদের আলোতে চলার অর্থ হচ্ছে সত্যকে জেনে ইসলামের কালেমা পাঠ করা এবং অন্ধকারে থেমে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে কুফরীর দিকে ফিরে যাওয়া। আরও বহু মুফাসসিরেরও এটাই মত আর সবচেয়ে বেশী সঠিক ও স্পষ্টও হচ্ছে এটাই। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।

কিয়ামতের দিনেও তাদের এই অবস্থা হবে যে, যখন লোকদেরকে তাদের ঈমানের পরিমাপ অনুযায়ী আলো দেয়া হবে, কেউ পাবে বহু মাইল পর্যন্ত, কেউ কেউ তারও বেশী, কেউ তার চেয়ে কম, এমনকি শেষ পর্যন্ত কেউ এতটুকু পাবে যে, কখনও আলোকিত হবে এবং কখনও অন্ধকার। কিছু লোকে এমনও হবে যে, তারা একটু দূরে গিয়েই থেমে যাবে, আবার কিছু দূর পর্যন্ত আলো পাবে, আবার নিবে যাবে। আবার কতকগুলো এমন দুর্ভাগা লোকও হবে যে, তাদের আলো সম্পূর্ণ রূপে নিভে যাবে। এরাই হবে পূর্ণ মুনাফিক, যাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলার ফরমান রয়েছেঃ “যেদিন মুনাফিক নর ও নারী ঈমানদারগণকে ডাক দিয়ে বলবে-একটু থামো, আমাদেরকেও আসতে দাও যেন আমরাও তোমাদের আলো দ্বারা উপকৃত হই,তখন বলা হবে, তোমাদের পিছনে ফিরে যাও এবং আলো অনুসন্ধান কর।' মুমিন নারী ও পুরুষের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন, সেইদিন তুমি মুমিন পুরুষ ও নারীর সামনে ও ডানে আলো দেখতে পাবে এবং তাদেরকে বলা হবে-আজকে তোমাদের জন্য বেহেশতের সুসংবাদ, যার তলদেশ দিয়ে নদী প্রবাহিত হচ্ছে। আল্লাহ পাক আরও বলেনঃ “যেদিন আল্লাহ তা'আলা নবী (সঃ) কে, মুমিনগণকে অপমানিত করবেন না। তাদের সামনে ও ডানে আলো থাকবে এবং তারা বলতে থাকবে-হে আমাদের প্রভু! আমাদের আলো পূর্ণ করে দিন এবং আমাদেরকে ক্ষমা করুন! নিশ্চয়ই আপনি প্রত্যেক জিনিসের উপর ক্ষমতাবান। এই আয়াতসমূহের পর নিম্নের এ বিষয়ের হাদীসগুলিও উল্লেখযোগ্যঃ

নবী (সঃ) বলেছেন, মুমিনদের কেউ কেউ মদীনা হতে আদন পর্যন্ত আলো পাবে। কেউ কেউ তার চেয়ে কম পাবে। এমনকি কেউ কেউ এত কম পাবে যে, শুধুমাত্র পা রাখার জায়গা পর্যন্ত আলোকিত হবে। তাফসীর-ই-ইবনে জারীর) হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ মুমিনগণকে তাদের আমলের পরিমাপ অনুযায়ী আলো দেয়া হবে। কেউ কেউ পাবে খেজুর গাছের সমান জায়গা ব্যাপী, কেউ পাবে হযরত আদমের (আঃ) পায়ের সমান স্থান ব্যাপী, কেউ কেউ শুধু এতটুকু পাবে যে, তার বৃদ্ধাঙ্গুলি মাত্র আলোকিত হবে কখনও জ্বলে উঠবে আবার কখনও নিবে যাবে। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম)। হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, আমল অনুযায়ী তারা আলো পাবে, সেই আলোতে তারা পুলসিরাত অতিক্রম করবে। কোন কোন লোকের নূর পাহাড়ের সমান হবে, কারও হবে খেজুর গাছের সমান, আর সবচেয়ে ছোট নূর ঐ লোকটার হবে, যার শুধু বৃদ্ধাঙ্গুলির উপর নূর থাকবে। ওটা কখনও জ্বলে উঠবে এবং কখনও নিভে যাবে। (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম)

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, কিয়ামতের দিন সমস্ত একত্ববাদীকে নূর দেয়া হবে। যখন মুনাফিকদের নূর নিভে যাবে তখন একত্ববাদীরা ভয় পেয়ে বলবেঃ “ হে আল্লাহ! আমাদের নরকে পূর্ণ করে দিন। (মুসনাদ-ই- ইবনে আবি হাতিম)। যহহাক বিন মাযাহিমেরও (রঃ) এটাই মত। এ হাদীসসমূহ দ্বারা বুঝা যায় যে, কিয়ামতের দিন কয়েক প্রকারের লোক হবেঃ (১) খাটি মুমিন যাদের বর্ণনা পূর্বের চারটি আয়াতে হয়েছে। (২) আঁটি কাফির, যার বর্ণনা তার পরবর্তী দু'টি আয়াতে হয়েছে। (৩) মুনাফিক-এদের আবার দু'টি ভাগ আছে। প্রথম হচ্ছে খাঁটি মুনাফিক যাদের উপমা আগুনের আলো দিয়ে দেয়া হয়েছে। দ্বিতীয় হচ্ছে সেই মুনাফিক যারা সন্দেহের মধ্যে আছে। কখনও ঈমানের আলো জ্বলে, কখনও নিভে যায়। তাদের উপমা বৃষ্টির সঙ্গে দেয়া হয়েছে। এরা প্রথম প্রকারের মুনাফিক হতে কিছু কম দোষী। ঠিক এই ভাবেই সূরা-ই নূরের মধ্যেও আল্লাহ তা'আলা মুমিনের ও তার অন্তরের আলোর উপমা সেই উজ্জ্বল প্রদীপের সঙ্গে দিয়েছেন যা উজ্জ্বল চিমনীর মধ্যে থাকে এবং স্বয়ং চিমনিও উজ্জ্বল তারকার মত হয়। যেহেতু একেতো স্বয়ং ঈমানদারের অন্তর উজ্জ্বল, দ্বিতীয়তঃ খাটি শরীয়ত দিয়ে তাকে সাহায্য করা হয়েছে। সুতরাং এ হচ্ছে নূরের উপর নূর। এভাবেই অন্য স্থানে কাফেরদের উপমাও তিনি বর্ণনা করেছেন যারা মূর্খতা বশতঃ নিজেদেরকে অন্য কিছু একটা মনে করে, অথচ প্রকৃতপক্ষে তারা কিছুই নয়। তিনি বলেছেনঃ “ঐ কাফিরদের কার্যাবলীর দৃষ্টান্ত সেই মরীচিকার ন্যায় যাকে তৃষ্ণার্ত ব্যক্তি পানি মনে করে। শেষ পর্যন্ত কাছে এসে দেখে, কিন্তু কিছুই পায় না। অন্যস্থানে ঐ কাফিরদের দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন যারা খাঁটি মূর্খতায় জড়িত হয়ে পড়েছে। বলছেন যে, তারা গভীর সমুদ্রের তলদেশের অন্ধকারের মত যে সমুদ্রে ঢেউ এর পর ঢেউ খেলছে আবার আকাশ মেঘে ঢাকা রয়েছে এবং অন্ধকার ছেয়ে গেছে, এমনকি নিজের হাত পর্যন্ত দেখা যায় না। আসল কথা এই যে, যার জন্যে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে নূর থাকে না সে নুর পাবে কোথায়? সুতরাং কাফেরদেরও দুটি ভাগ হলো। প্রথম হলো ওরাই যারা অন্যদেরকে কুফরীর দিকে আহ্বান করে এবং দ্বিতীয় হচ্ছে যারা তাদেরকে অনুকরণ করে থাকে। যেমন সূরা-ই-হজ্জের প্রথমে রয়েছেঃ কতক লোকে এমন আছে যারা অজ্ঞানতা সত্ত্বেও আল্লাহ সম্বন্ধে ঝগড়া করে এবং প্রত্যেক দুষ্ট শয়তানের অনুকরণ করে থাকে। আর এক জায়গায় আছেঃ কতকগুলো লোক জ্ঞান, সঠিক পথ এবং উজ্জ্বল কিতাব ছাড়াই আল্লাহ সম্বন্ধে ঝগড়া করে থাকে। সূরাই ওয়াকিয়ার প্রথমে ও শেষে এবং সূরা-ই নিসার মধ্যে মুমিনদেরও দুই প্রকার বর্ণনা করা হয়েছে। তারা হচ্ছে সাবেকিন ও আসহাব-ই ইয়ামীন অর্থাৎ আল্লাহর নৈকট্য লাভকারী এবং পরহেযগার ও সৎ ব্যক্তিগণ। সুতরাং এ আয়াতসমূহ দ্বারা জানা গেল যে, মুমিনদের দু’টি দল-আল্লাহর নৈকট্য লাভকারী ও সৎ। কাফিরদেরও দু’টি দল-কুফরের দিকে আহ্বানকারী ও তাদের অনুসরণকারী। মুনাফিকদেরও দু'টি ভাগ-খাঁটি ও পাকা মুনাফিক এবং সেই মুনাফিক যাদের মধ্যে নিফাকের এক আধটি শাখা আছে।

সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ বিন আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যার মধ্যে তিনটি অভ্যাস আছে সে পাকা মুনাফিক। আর যার মধ্যে একটি আছে তার মধ্যে নিফাকের একটি অভ্যাস আছে যে পর্যন্ত না সে তা পরিত্যাগ করে। (তিনটি অভ্যাস হচ্ছে কথা বলার সময় মিথ্যাবলা, অঙ্গীকার ভঙ্গ করা এবং গচ্ছিত দ্রব্য আত্মসাৎ করা)। এর দ্বারা সাব্যস্ত হলো যে, কখনও কখনও মানুষের মধ্যে নিফাকের কিছু অংশ থাকে। তা কার্য সম্বন্ধীয়ই হোক বা বিশ্বাস সম্বন্ধীয়ই থাকে। যেমন আয়াত ও হাদীস দ্বারা জানা গেল। পূর্ববর্তী একটি জামা'আত এবং উলামা-ই-কিরামের একটি দলেরও এটাই মাযহাব। এর বর্ণনা পূর্বে হয়ে গেছে এবং আগামীতে হবে ইনশাআল্লাহ।

মুসনাদ-ই-আহমাদে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘অন্তর চার প্রকারঃ (১) সেই পরিষ্কার অন্তর যা উজ্জ্বল প্রদীপের মত ঝলমল করে। (২) ঐ অন্তর যা পর্দায় ঢাকা থাকে। (৩) উল্টো অন্তর এবং (৪) মিশ্রিত অন্তর। প্রথমটি হচ্ছে মুমিনের অন্তর যা পূর্ণভাবে উজ্জ্বল। দ্বিতীয়টা কাফিরের অন্তর যার উপর পর্দা পড়ে রয়েছে। তৃতীয়টি খাঁটি মুনাফিকের অন্তর যা জেনে শুনে অস্বীকার করে এবং ৪র্থটি হচ্ছে মুনাফিকের অন্তর যার মধ্যে ঈমান ও নিফাক। এ দুটোর সংমিশ্রণ রয়েছে। ঈমানের দৃষ্টান্ত সেই সবুজ উদ্ভিদের মত যা নির্মল পানি দ্বারা বেড়ে ওঠে। নিফাকের উপমা ঐ ফোড়ার ন্যায় যার মধ্যে রক্ত ও পুঁজ বাড়তে থাকে। এখন যে মূল বেড়ে যায়, তার প্রভাব অন্যের উপর পড়ে থাকে। এই হাদীসটি সনদ হিসেবে খুবই মজবুত।

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাদের কান ও চক্ষু ধ্বংস করে দেবেন। ভাবার্থ এই যে, তারা যখন সত্যকে জেনে ছেড়ে দিয়েছে, তাহলে তাদের জেনে রাখা উচিত যে, আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক জিনিসের উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান। অর্থাৎ তিনি ইচ্ছে করলে শাস্তি দেবেন বা ক্ষমা করে দেবেন।

এখানে আল্লাহ তা'আলা মুনাফিকদেরকে তার শাস্তি ও মহা শক্তির ভয় দেখাবার জন্যেই কাদীর' শব্দ ব্যবহার করেছেন। এখানে (আরবি)-এর অর্থে (আরবি)শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, যেমন (আরবি)-এর অর্থে (আরবি)শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ইমাম ইবনে জারীর বলেন যে, এই দু’টি উদাহরণ হচ্ছে একই প্রকারের মুনাফিকের জন্যে (আরবি) এখানে (আরবি)-এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ ‘এবং অর্থে। যেমন আল্লাহ পাক বলেছেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ তাদের অন্তর্গত কোন ফাসিক ও কাফির ব্যক্তির অনুসরণ করো না। (৭৬:২৪) কিংবা (আরবি) শব্দটি ইখতিয়ার’ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, অর্থাৎ এই দৃষ্টান্ত বর্ণনা কর অথবা ঐ দৃষ্টান্ত বর্ণনা কর। কুরতুবী (রঃ) বলেন যে, (আরবি)এখানে সমান অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন আরবী বাক পদ্ধতি আছেঃ (আরবি)

যামাখশারী (রঃ) এই ব্যাখ্যাই দিয়েছেন। তাহলে অর্থ হবে যে, দৃষ্টান্তসমূহের মধ্যে যা চাও তাই বর্ণনা কর, দুটোই তাদের অবস্থার অনুরূপ হবে। কিন্তু আমাদের ধারণা এই যে, এটা মুনাফিকদের শ্রেণী হিসেবে এসেছে, তাদের অবস্থা ও বিশেষণ বিভিন্ন প্রকারের। যেমন সূরা-ই-বারাআতের মধ্যে (আরবি) এবং (আরবি) করে করে তাদের অনেক শ্রেণী অনেক কাজ এবং অনেক কথার বর্ণনা দেয়া হয়েছে। দুটি দৃষ্টান্ত হচ্ছে দু’প্রকার মুনাফিকের যা তাদের অবস্থা ও গুণাবলীর সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যেমন সূরা-ই-নূরের মধ্যে দুই প্রকারের কাফিরের দৃষ্টান্ত বর্ণনা করা হয়েছে। প্রথম প্রকার হচ্ছে কুফরীর দিকে আহ্বানকারী এবং দ্বিতীয় প্রকার হচ্ছে তাদের অনুসরণকারী। আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে বেশী জানেন।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।