সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 186)
হরকত ছাড়া:
وإذا سألك عبادي عني فإني قريب أجيب دعوة الداع إذا دعان فليستجيبوا لي وليؤمنوا بي لعلهم يرشدون ﴿١٨٦﴾
হরকত সহ:
وَ اِذَا سَاَلَکَ عِبَادِیْ عَنِّیْ فَاِنِّیْ قَرِیْبٌ ؕ اُجِیْبُ دَعْوَۃَ الدَّاعِ اِذَا دَعَانِ ۙ فَلْیَسْتَجِیْبُوْا لِیْ وَ لْیُؤْمِنُوْا بِیْ لَعَلَّهُمْ یَرْشُدُوْنَ ﴿۱۸۶﴾
উচ্চারণ: ওয়া ইযা-ছাআলাকা ‘ইবা-দী ‘আন্নী ফাইন্নী কারীবুন উজীবুদা‘ওয়াতাদ্দা-‘ই ইযা-দা‘আ-নি ফালইয়াছতাজীবূলী ওয়াল ইউ’মিনূ বী লা‘আল্লাহুম ইয়ারশুদূন।
আল বায়ান: আর যখন আমার বান্দাগণ তোমাকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবে, আমি তো নিশ্চয় নিকটবর্তী। আমি আহবানকারীর ডাকে সাড়া দেই, যখন সে আমাকে ডাকে। সুতরাং তারা যেন আমার ডাকে সাড়া দেয় এবং আমার প্রতি ঈমান আনে। আশা করা যায় তারা সঠিক পথে চলবে।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৮৬. আর আমার বান্দাগণ যখন আমার সম্পর্কে আপনাকে জিজ্ঞেস করে, (তখন বলে দিন যে) নিশ্চয় আমি অতি নিকটে। আহবানকারী যখন আমাকে আহবান করে আমি তার আহবানে সাড়া দেই। কাজেই তারাও আমার ডাকে সাড়া দিক এবং আমার প্রতি ঈমান আনুক, যাতে তারা সঠিক পথে চলতে পারে।(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: যখন আমার বান্দাগণ আমার সম্পর্কে তোমার নিকট জিজ্ঞেস করে, আমি তো (তাদের) নিকটেই, আহবানকারী যখন আমাকে আহবান করে আমি তার আহবানে সাড়া দেই; সুতরাং তাদের উচিত আমার নির্দেশ মান্য করা এবং আমার প্রতি ঈমান আনা, যাতে তারা সরলপথ প্রাপ্ত হয়।
আহসানুল বায়ান: (১৮৬) আর আমার দাসগণ যখন আমার সম্বন্ধে তোমাকে জিজ্ঞাসা করে, তখন তুমি বল, আমি তো কাছেই আছি। যখন কোন প্রার্থনাকারী আমাকে ডাকে, তখন আমি তার ডাকে সাড়া দিই।[1] অতএব তারাও আমার ডাকে সাড়া দিক এবং আমাতে বিশ্বাস স্থাপন করুক, যাতে তারা ঠিক পথে চলতে পারে।
মুজিবুর রহমান: এবং যখন আমার সেবকবৃন্দ (বান্দা) আমার সম্বন্ধে তোমাকে জিজ্ঞেস করে তখন তাদেরকে বলে দাওঃ নিশ্চয়ই আমি সন্নিকটবর্তী। কোন আহবানকারী যখনই আমাকে আহবান করে তখনই আমি তার আহবানে সাড়া দিই; সুতরাং তারাও যেন আমার ডাকে সাড়া দেয় এবং আমাকে বিশ্বাস করে - তাহলেই তারা সঠিক পথপ্রাপ্ত হতে পারবে।
ফযলুর রহমান: (হে রসূল!) আমার বান্দারা যখন তোমার কাছে আমার (অবস্থান) সম্বন্ধে জানতে চায় (তখন তাদের জানিয়ে দাও), আমি তো কাছেই আছি। কেউ যখন আমাকে ডাকে আমি তখন তার ডাকে সাড়া দেই; অতএব, তারাও আমার ডাকে সাড়া দিক এবং আমাকে (যথার্থভাবে) বিশ্বাস করুক যাতে তারা ঠিক পথে থাকতে পারে।
মুহিউদ্দিন খান: আর আমার বান্দারা যখন তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে আমার ব্যাপারে বস্তুতঃ আমি রয়েছি সন্নিকটে। যারা প্রার্থনা করে, তাদের প্রার্থনা কবুল করে নেই, যখন আমার কাছে প্রার্থনা করে। কাজেই আমার হুকুম মান্য করা এবং আমার প্রতি নিঃসংশয়ে বিশ্বাস করা তাদের একান্ত কর্তব্য। যাতে তারা সৎপথে আসতে পারে।
জহুরুল হক: আর যখন আমার বান্দারা আমার সন্বন্ধে তোমাকে জিজ্ঞাসা করে, তখন -- "দেখো! আমি নিঃসন্দেহ অতি নিকটে।" আমি প্রার্থনাকারীর প্রার্থনার জবাব দিই যখনি সে আমাকে আহ্বান করে। কাজেই তারা আমার প্রতি সাড়া দিক আর আমাতে ঈমান আনুক, -- যাতে তারা সুপথে চলতে পারে।
Sahih International: And when My servants ask you, [O Muhammad], concerning Me - indeed I am near. I respond to the invocation of the supplicant when he calls upon Me. So let them respond to Me [by obedience] and believe in Me that they may be [rightly] guided.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১৮৬. আর আমার বান্দাগণ যখন আমার সম্পর্কে আপনাকে জিজ্ঞেস করে, (তখন বলে দিন যে) নিশ্চয় আমি অতি নিকটে। আহবানকারী যখন আমাকে আহবান করে আমি তার আহবানে সাড়া দেই। কাজেই তারাও আমার ডাকে সাড়া দিক এবং আমার প্রতি ঈমান আনুক, যাতে তারা সঠিক পথে চলতে পারে।(১)
তাফসীর:
(১) পূর্ববতী আয়াতগুলোতে রামাদানের হুকুম-আহকাম বর্ণনা করা হয়েছে। তারপর একটি সুদীর্ঘ আয়াতে সাওম ও ইতিকাফের বিবরণ বর্ণিত হয়েছে। এখানে মাঝখানে বর্তমান সংক্ষিপ্ত আয়াতটিকে বান্দাদের অবস্থার প্রতি মহান রব-এর অনুগ্রহ এবং তাদের প্রার্থনা শ্রবণ ও কবুল করার বিষয় আলোচনা করে নির্দেশ পালনে উৎসাহিত করা হচ্ছে। কারণ, সাওম সংক্রান্ত ইবাদাতে অবস্থাবিশেষে অব্যাহতি দান এবং বিভিন্ন সহজতা সত্বেও কিছু কষ্ট বিদ্যমান রয়েছে। এ কষ্টকে সহজ করার উদ্দেশ্যে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে, আমি আমার বান্দাদের সন্নিকটে রয়েছি, যখনই তারা আমার কাছে কোন বিষয়ে দো'আ করে, আমি তাদের সে দোআ কবুল করে নেই এবং তাদের বাসনা পূরণ করে দেই। এমতাবস্থায় আমার হুকুম-আহকাম মেনে চলা বান্দাদেরও একান্ত কর্তব্য। তাতে কিছুটা কষ্ট হলেও তা সহ্য করা উচিত।
ইমাম ইবনে কাসীর দো'আর প্রতি উৎসাহ দান সংক্রান্ত এই মধ্যবর্তী বাক্যটির তাৎপর্য বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেছেন যে, এ আয়াতের দ্বারা সাওম রাখার পর দোআ কবুল হওয়ার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। সে জন্যই সাওমের ইফতারের পর দোআর ব্যাপারে বিশেষ তৎপরতা অবলম্বন করা উচিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেনঃ “সিয়াম পালনকারীর দো'আ ফিরিয়ে দেয়া হয় না অর্থাৎ কবুল হয়ে থাকে।” [ইবনে মাজাহ ১৭৫৩] সে জন্যই আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা ইফতারের সময় পরিবার পরিজনকে ডাকতেন এবং দো'আ করতেন। [ইবনে কাসীর]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১৮৬) আর আমার দাসগণ যখন আমার সম্বন্ধে তোমাকে জিজ্ঞাসা করে, তখন তুমি বল, আমি তো কাছেই আছি। যখন কোন প্রার্থনাকারী আমাকে ডাকে, তখন আমি তার ডাকে সাড়া দিই।[1] অতএব তারাও আমার ডাকে সাড়া দিক এবং আমাতে বিশ্বাস স্থাপন করুক, যাতে তারা ঠিক পথে চলতে পারে।
তাফসীর:
[1] বরকতময় রমযান মাসের বিধি-বিধান ও মসলা-মাসায়েলের সাথে দুআর কথা উল্লেখ করে এ কথা পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে যে, রমযান মাসে দুআরও বড় ফযীলত রয়েছে। অতএব এ মাসে দুআর প্রতি খুব যত্ন নেওয়া উচিত। বিশেষ করে রোযা থাকা অবস্থায়। কেননা, রোযাদারের দুআ কবুল হয়।
(প্রকাশ থাকে যে, বিশেষ করে ইফতারীর সময় দুআ কবুল হওয়ার হাদীস সহীহ নয়। -সম্পাদক) অবশ্য দুআ কবুল হওয়ার জন্য অত্যাবশ্যক হল, সেই সব আদবসমূহ ও শর্তাবলীর খেয়াল রাখা, যা কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। আর এই শর্তাবলীর দুটি এখানে বর্ণিত হয়েছে। একঃ আল্লাহর উপর সত্যিকারের ঈমান রাখা এবং দুইঃ তাঁর আনুগত্য ও অনুসরণ করা। অনুরূপ হাদীসসমূহে হারাম খাদ্য থেকে বেঁচে থাকতে এবং কাকুতি-মিনতির প্রতি যত্ন নেওয়ার উপর তাকীদ করা হয়েছে।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১৮৬ নং আয়াতের তাফসীর:
রবকতময় রমাযান মাসের বিধি-বিধান আলোচনা করার পর দু‘আ বিষয়ক আলোচনা স্থান পেয়েছে, কারণ রমাযান মাসে দু‘আর অনেক ফযীলত রয়েছে। তাই এ মাসে বেশি বেশি দু‘আর প্রতি যতœবান হওয়া উচিত।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে আল্লাহ তা‘আলা বলছেন, আমার বান্দারা যদি আমার সম্বন্ধে তোমাকে জিজ্ঞাসা করে তাহলে বলে দাও আমি তাদের নিকটেই রয়েছি। যখন তারা আমাকে ডাকে আমি তাদের ডাকে সাড়া দেই। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ)
“আমি তার ঘাড়ের শাহ রগ অপেক্ষাও নিকটতর।”(সূরা কাফ ৫০:১৬)
আবূ মূসা আল-আশআরী (রাঃ) বলেন: আমরা এক যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে ছিলাম। আমরা প্রত্যেক উঁচু স্থানে ওঠার সময় এবং উপত্যকায় অবতরণের সময়ে উচ্চৈঃস্বরে তাকবীর ধ্বনি দিতে দিতে যাচ্ছিলাম। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের নিকট এসে বললেন- হে জনমণ্ডলী! নিজেদের প্রতি দয়া প্রদর্শন কর। তোমরা শ্রবণশক্তিহীন ও দূরে অবস্থানকারী কাউকে (মা‘বূদকে) ডাকছ না। তোমরা ডাকছ একজন শ্রবণকারী ও সর্বদ্রষ্টাকে। নিশ্চয় তিনি তোমাদের বাহনের স্কন্ধ অপেক্ষা নিকটে রয়েছেন। (সহীহ বুখারী হা: ২৯৯২) এরূপ অনেক আয়াত ও সহীহ হাদীস রয়েছে যাতে বলা হয়েছে আল্লাহ তা‘আলা আমাদের খুবই নিকটে রয়েছেন। কিন্তু স্ব-স্বত্ত্বায় নন বরং শ্রবণ, দর্শন, ক্ষমতা ও জ্ঞানের দিক থেকে তিনি আমাদের অতি নিকটে রয়েছেন, আর স্ব-স্বত্ত্বায় আরশের ওপর রয়েছেন।
তাফসীরে সা‘দীতে উল্লেখ করা হয়েছে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দার নিকটবর্তী হওয়াটা দু’প্রকার। যথা:
১. আল্লাহ তা‘আলার জ্ঞান, দর্শন, শ্রবণ ও বেষ্টন করার দিক দিয়ে সকল বান্দার নিকটে রয়েছেন।
২. বান্দার দু‘আ কবূল ও সাড়া দেয়ার দিক দিয়ে নিকট রয়েছে। তাই একজন বান্দা যখন একাগ্রচিত্তে শরয়ী পন্থায় দু‘আ করবে আল্লাহ তা‘আলা তার ডাকে সাড়া দেয়ার অঙ্গিকার করেছেন।
আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. আল্লাহ তা‘আলা আরশের ওপর থেকেই তাঁর বান্দার অতি নিকটে। তিনি সবকিছু জানেন, দেখেন ও শোনেন।
২. উচ্চৈঃস্বরে শরীয়তসিদ্ধ ইবাদত ব্যতীত অন্যান্য ইবাদত নিরবে করাই উত্তম।
৩. একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার আনুগত্যে মুক্তি নিহিত।
৪. আল্লাহ তা‘আলার কাছে অবশ্যই দু‘আ করতে হবে, তবে শরীয়তসম্মত পদ্ধতি অনুযায়ী।
৫. উক্ত হাদীস থেকে এটাও জানতে পারলাম যে, উচ্চ আওয়াজে প্রচলিত হালকায়ে যিকির করা শরীয়তসম্মত নয়।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: একজন পল্লীবাসী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের প্রভু কি নিকটে আছেন, না দূরে আছেন: যদি নিকটে থাকেন তবে চুপে চুপে ডাকবো আর যদি দূরে থাকেন তবে উচ্চৈঃস্বরে ডাকবো। এতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) নীরব হয়ে যান। তখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় (মুসনাদ -ই-ইবনে আবি হাতিম)। একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, সাহাবীদের (রাঃ) ‘আমাদের প্রভু কোথায় রয়েছেন এই প্রশ্নের উত্তরে এটা অবতীর্ণ হয় (ইবনে জারীর)। হযরত আতা (রঃ) বলেন যে, যখন (আরবি) (৪০:৬০) এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় অর্থাৎ তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেবো।' তখন জনগণ জিজ্ঞেস করে, “আমরা কোন সময় প্রার্থনা। করবো:' তখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় (ইবনে জুরাইজ)। হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) বর্ণনা করেনঃ “আমরা এক যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে ছিলাম। আমরা প্রত্যেকে উঁচু স্থানে উঠার সময় এবং উপত্যকায় অবতরণের সময়ে উচ্চৈঃস্বরে তাকবীর ধ্বনি করতে করতে যাচ্ছিলাম। নবী (সঃ) আমাদের নিকট এসে বলেনঃ “হে জনমণ্ডলী! নিজেদের প্রতি দয়া প্রদর্শন কর। তোমরুকোন কম শ্রবণকারী ও দূরে অবস্থানকারীকে ডাকছো না। যাকে সব ডাকতে রয়েছে তিনি তোমাদের যানবাহনের স্কন্ধ অপেক্ষাও নিকটে রয়েছেন। হে আবদুল্লাহ বিন কায়েস! তোমাকে কি আমি বেহেশতের কোষাগারসমূহের সংবাদ দেবো না: তা হচ্ছে (আরবি) এই কলেমাটি (মুসনাদই-আহমাদ)।
হযরত আনাস (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমার বান্দা আমার উপর যেরূপ বিশ্বাস রাখে আমিও তার সাথে ঐরূপ ব্যবহার করে থাকি। যখন সে আমার নিকট প্রার্থনা জানায়, আমি তার সঙ্গেই থাকি' (মুসনাদ-ই-আহমাদ)।' হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ 'আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমার বান্দা যখন আমাকে স্মরণ করে এবং আমার যিক্রে তার ওষ্ঠ নড়ে উঠে, তখন আমি তার সাথেই থাকি' (ইমাম আহমাদ (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন)। এই বিষয়ের আয়াত কুরআন পাকের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। ঘোষণা হচ্ছে (আরবি)
অর্থাৎ যারা খোদাভীরু ও সৎ কর্মশীল নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সঙ্গে রয়েছেন।' (৩০ ১২৮) হযরত মূসা (আঃ) ও হযরত হারূন (আঃ)-কে আল্লাহ তা'আলা বলেন (আরবি) অর্থাৎ ‘আমি তোমাদের দুজনের সাথে রয়েছি, আমি শুনছি ও দেখছি।' উদ্দেশ্য এই যে, মহান আল্লাহ প্রার্থনাকারীদের প্রার্থনা ব্যর্থ করেন না। এরকমও হয় না যে, তিনি বান্দাদের প্রার্থনা হতে উদাসীন থাকেন বা শুনেন না। এর দ্বারা আল্লাহ তাআলা প্রার্থনা করার জন্যে তাঁর বান্দাদেরকে উৎসাহ দিয়েছেন এবং তাদের প্রার্থনা ব্যর্থ না করার অঙ্গীকার করেছেন। হযরত সালমান ফারসী (রাঃ) বলেন যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ বান্দা যখন আল্লাহ তা'আলার কাছে হাত উঁচু করে প্রার্থনা জানায় তখন সেই দয়ালু আল্লাহ তার হাত দু'খানা শূন্য ফিরিয়ে দিতে লজ্জাবোধ করেন (মুসনাদ-ই-আহমাদ)।
হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, ‘যে বান্দা আল্লাহ তা'আলার নিকট এমন প্রার্থনা করে যার মধ্যে পাপও নেই এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নতাও নেই, তাহলে আল্লাহ তা'আলা তাকে তিনটি জিনিসের মধ্যে যে কোন একটি দান করে থাকেন। হয়তো বা তার প্রার্থনা তৎক্ষণাৎ কবুল করে নিয়ে তার প্রার্থিত উদ্দেশ্য পুরো করেন, কিংবা তা জমা করে রেখে দেন, এবং পরকালে দান করেন বা ওরই কারণে এমন কোন বিপদ কাটিয়ে দেন, যে বিপদ তার প্রতি আপতিত হতো।' একথা শুনে জনসাধারণ বলেঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা যখন প্রার্থনা খুব বেশী করে করবো: তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলার নিকট খুবই বেশী রয়েছে। (মুসনাদ-ই-আহমাদ)। হযরত ওবাদাহ বিন সামিত (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ভূ-পৃষ্ঠের যে মুসলমান মহা সম্মানিত ও মর্যাদাবান আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা জানায় তা আল্লাহ তা'আলা গ্রহণ করে থাকেন, হয় সে তার প্রার্থিত উদ্দেশ্য লাভ করে অথবা ঐ রকমই তার কোন বিপদ কেটে যায় যে পর্যন্ত না কোন পাপের কাজে বা আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নতার কাজে সে প্রর্থনা করে। (মুসনাদ-ই-আহমাদ)।
হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘যে পর্যন্ত না কোন ব্যক্তি প্রার্থনায় তাড়াতাড়ি করে, তার প্রার্থনা অবশ্যই কবুল হয়। তাড়াতাড়ি করার অর্থ এই যে, সে বলতে আরম্ভ করে-‘আমি সদা প্রার্থনা করতে রয়েছি, কিন্তু আল্লাহ তা'আলা কবুল করছেন না (তাফসীর-ই-মুআত্তা মালিক)। সহীহ বুখারী শরীফের বর্ণনায় এটাও আছে যে,প্রতিদান স্বরূপ তাকে বেহেশত দান করা হয়। সহীহ মুসলিমের মধ্যে এও রয়েছে যে, ককূল না হওয়ার ধারণা করে নৈরাশ্যের সাথে সে প্রার্থনা করা পরিত্যাগ করে, এটাই হচ্ছে তাড়াতাড়ি করা। হযরত আবু জাফর তাবারীর (রঃ) তাফসীরে এই উক্তিটি হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণনা করা হয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ বিন আমর (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘অন্তর বরতনসমূহের ন্যায়, একে অপর হতে বেশী পর্যবেক্ষণকারী হয়ে থাকে। হে জনমণ্ডলী! আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করবে তো ককূল হওয়ার বিশ্বাস রেখে কর। জেনে রেখো যে, উদাসীনদের প্রার্থনা আল্লাহ তা'আলা কবুল করেন না (তাফসীরে মুসনাদ-ই-আহমদ)। হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ) একবার রাসূলুল্লাহকে (সঃ) এই আয়াত সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করেন। তখন তিনি আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা জানিয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহ! আয়েশার (রাঃ) এই প্রশ্নের উত্তর কি হবে: তখন জিবরাঈল (আঃ) আগমন করেন এবং বলেনঃ “আল্লাহ আপনাকে সালাম দিয়েছেন এবং বলেছেন-এর উদ্দেশ্য ঐ ব্যক্তি যে সৎ কার্যাবলী সম্পাদনকারী হয় এবং খাঁটি নিয়ত ও আন্তরিকতার সাথে আমাকে ডেকে থাকে, তখন আমি তার ডাকে সাড়া দিয়ে তার প্রয়োজন পুরো করে থাকি। (তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই)। এই হাদীসটি ইসনাদ হিসাবে গরীব দুর্বল বা অসহায়)।
অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই আয়াতটি পাঠ করেন। অতঃপর বলেনঃ হে আল্লাহ! আপনি প্রার্থনার নির্দেশ দিয়েছেন এবং ককূলের অঙ্গীকার করেছেন। আমি হাজির হয়েছি, হে আমার মা'বুদ আমি হাজির হয়েছি, আমি হাজির আছি। হে অংশীদার বিহীন আল্লাহ! আমি উপস্থিত রয়েছি। হামদ, নিয়ামত এবং রাজ্য আপনারই জন্যে। আপনার কোন অংশীদার নেই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি এক ও অদ্বিতীয়। আপনি অতুলনীয়। আপনি এক ও পবিত্র। আপনি স্ত্রী ও সন্তানাদি হতে দূরে রয়েছেন। না আপনার কেউ সঙ্গী রয়েছে। না আপনার কেউ সমকক্ষ রয়েছে, না আপনার মত কেউ রয়েছে। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনার ওয়াদা সত্য, আপনার সাক্ষ্য সত্য (তাফসীর -ই-ইবনে মিরদুওয়াই)। হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলার ইরশাদ হচ্ছে- হে ইবনে আদম! একটি জিনিস তো তোমার আর একটি জিনিস আমার এবং একটি জিনিস তোমার ও আমার মধ্যস্থলে রয়েছে। খাটি আমার হক তো এটাই যে, তুমি শুধুমাত্র আমারই ইবাদত করবে এবং আমার সাথে আর কাউকেও অংশীদার করবে না। তোমার জন্যে নির্দিষ্ট এই যে, তোমার প্রতিটি কাজের পূর্ণ প্রতিদান আমি তোমাকে অবশ্যই দেবো। তোমার কোন পুণ্যই আমি নষ্ট করবো না। মধ্যবর্তী জিনিসটি এই যে, তুমি প্রার্থনা করবে আর আমি কবুল করবো। তোমার একটি কাজ হচ্ছে প্রার্থনা করা আর আমার একটি কাজ হচ্ছে তা কবুল করা (তাফসীর-ই-বাযযার)। প্রার্থনার এই আয়াতটিকে রোযার নির্দেশাবলীর আয়াতসমূহের মধ্যস্থলে আনয়নের নিপুণতা এই যে, যেন রোযা শেষ করার প্রার্থনার প্রতি মানুষের আগ্রহ জন্মে এবং তারা যেন প্রত্যহ ইফতারের সময় অত্যধিক দু'আ করতে থাকে।
রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ রোযাদার ইফতারের সময় যে দু'আ করে আল্লাহ তা'আলা তা কবুল করে থাকেন। হযরত আবদুল্লাহ বিন আমর (রাঃ) ইফতারের সময় স্বীয় পরিবারের লোককে এবং শিশুদেরকে ডেকে নিতেন ও তাদের সকলকে নিয়ে প্রার্থনা করতেন (সুনান-ই-আবু দাউদ, তায়ালেসী)। সুনান-ই-ইবনে মাজাহর মধ্যেও এই বর্ণনাটি রয়েছে এবং ওর মধ্যে সাহাবীদের (রাঃ) নিম্নের এই দু'আটি নকল করা হয়েছেঃ (আরবি)
অর্থাৎ হে আল্লাহ! আপনার যে দয়া প্রত্যেক জিনিসকে ঘিরে রয়েছে তা আপনাকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে আপনার নিকট প্রার্থনা জানাচ্ছি যে, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন!' অন্য হাদীসে রয়েছে যে, তিন ব্যক্তির প্রার্থনা অগ্রাহ্য। হয় না। (১) ন্যায় বিচারক বাদশাহ্ (২) রোযাদার ব্যক্তি যে পর্যন্ত না সে ইফতার করে এবং (৩) অত্যাচারিত ব্যক্তির দু’আ। আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তাহার মর্যাদা উচ্চ করিবেন। অত্যাচারিত ব্যক্তির বদ দু'আর কারণে আকাশসমূহের দরজাগুলো খুলে দেয়া হবে এবং আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ ‘আমার সম্মান ও মর্যাদার শপথ! বিলম্বে হলেও আমি তোমাকে অবশ্যই সাহায্য করবো। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) জামেউত তিরমিযী, সুনানই-নাসায়ী ও ইবনে মাযাহ)।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।