সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 183)
হরকত ছাড়া:
يا أيها الذين آمنوا كتب عليكم الصيام كما كتب على الذين من قبلكم لعلكم تتقون ﴿١٨٣﴾
হরকত সহ:
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا کُتِبَ عَلَیْکُمُ الصِّیَامُ کَمَا کُتِبَ عَلَی الَّذِیْنَ مِنْ قَبْلِکُمْ لَعَلَّکُمْ تَتَّقُوْنَ ﴿۱۸۳﴾ۙ
উচ্চারণ: ইয়াআইয়ুহাল্লাযীনা আ-মানূ কুতিবা ‘আলাইকুমসসিয়া-মু কামা-কুতিবা ‘আলাল্লাযীনা মিন কাবলিকুম লা‘আল্লাকুম তাত্তাকূন।
আল বায়ান: হে মুমিনগণ, তোমাদের উপর সিয়াম ফরয করা হয়েছে, যেভাবে ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর। যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৮৩. হে মুমিনগণ! তোমাদের জন্য সিয়ামের(১) বিধান দেয়া হল, যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববতীদেরকে দেয়া হয়েছিল(২), যাতে তোমরা তাকওয়ার অধিকারী হতে পারত(৩)।
তাইসীরুল ক্বুরআন: হে ঈমানদারগণ! তোমাদের প্রতি রোযা ফরয করা হয়েছে, যেমন তোমাদের আগের লোকেদের প্রতি ফরয করা হয়েছিল, যাতে তোমরা মুত্তাকী হতে পার।
আহসানুল বায়ান: (১৮৩) হে বিশ্বাসিগণ! তোমাদের জন্য সিয়ামের (রোযার) বিধান দেওয়া হল, যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যাতে তোমরা সংযমশীল হতে পার। [1]
মুজিবুর রহমান: হে বিশ্বাস স্থাপনকারীগণ! তোমাদের পূর্ববতী লোকদের ন্যায় তোমাদের উপরও সিয়ামকে অপরিহার্য কর্তব্য রূপে নির্ধারণ করা হল যেন তোমরা সংযমশীল হতে পারো।
ফযলুর রহমান: হে ঈমানদারগণ! তোমাদের পূর্ববর্তীদের জন্য যেমন রোযা ফরয করা হয়েছিল, তেমনি তোমাদের জন্যও তা ফরয করা হল, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।
মুহিউদ্দিন খান: হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরয করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা পরহেযগারী অর্জন করতে পার।
জহুরুল হক: ওহে যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের উপরে রোযা বিধিবদ্ধ করা গেল যেমন বিধান করা হয়েছিল যারা তোমাদের আগে এসেছে তাদের উপরে, যাতে তোমরা ধর্মভীরুতা অবলন্বন করো, --
Sahih International: O you who have believed, decreed upon you is fasting as it was decreed upon those before you that you may become righteous -
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১৮৩. হে মুমিনগণ! তোমাদের জন্য সিয়ামের(১) বিধান দেয়া হল, যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববতীদেরকে দেয়া হয়েছিল(২), যাতে তোমরা তাকওয়ার অধিকারী হতে পারত(৩)।
তাফসীর:
(১) صوم এর শব্দিক অর্থ বিরত থাকা। শরীআতের পরিভাষায় আল্লাহর ইবাদতের উদ্দেশ্যে পানাহার এবং স্ত্রী সহবাস থেকে বিরত থাকার নাম ‘সাওম’। তবে সুবহে সাদিক উদয় হওয়ার পূর্ব থেকে শুরু করে সূর্যস্ত পর্যন্ত সিয়ামের নিয়াতে একাধারে এভাবে বিরত থাকলেই তা সিয়াম বলে গণ্য হবে। সূর্যাস্তের এক মিনিট আগেও যদি কোন কিছু খেয়ে ফেলে, পান করে কিংবা সহবাস করে, তবে সিয়াম হবে না। অনুরূপ উপায়ে সবকিছু থেকে পূর্ণ দিবস বিরত থাকার পরও যদি সিয়ামের নিয়্যত না থাকে, তবে তাও সিয়াম পালন হবে না। সিয়াম ইসলামের মূল ভিত্তি বা আরকানের অন্যতম। সিয়ামের অপরিসীম ফযীলত রয়েছে।
(২) মুসলিমদের প্রতি সিয়াম ফরয হওয়ার নির্দেশটি একটি বিশেষ নযীর উল্লেখসহ দেয়া হয়েছে। নির্দেশের সাথে সাথে এটাও উল্লেখ করা হয়েছে যে, সিয়াম শুধুমাত্র তোমাদের প্রতিই ফরয করা হয়নি, তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতগণের উপরও ফরয করা হয়েছিল। এর দ্বারা যেমন সিয়ামের বিশেষ গুরুত্ব বোঝানো হয়েছে, তেমনি মুসলিমদের এ মর্মে একটি সান্ত্বনাও দেয়া হয়েছে যে, সিয়াম একটা কষ্টকর ইবাদাত সত্য, তবে তা শুধুমাত্র তোমাদের উপরই ফরয করা হয়নি, তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলোর উপরও ফরয করা হয়েছিল। কেননা, সাধারণতঃ দেখা যায়, কোন একটা কষ্টকর কাজে অনেক লোক একই সাথে জড়িত হয়ে পড়লে তা অনেকটা স্বাভাবিক এবং সাধারণ বলে মনে হয়।
আয়াতের মধ্যে শুধু বলা হয়েছে যে, “সিয়াম যেমন মুসলিমদের উপর ফরয করা হয়েছে, তেমনি পূর্ববর্তী উম্মতগণের উপরও ফরয করা হয়েছিল”; এ কথা দ্বারা এ তথ্য বুঝায় না যে, আগেকার উম্মতগণের সিয়াম সমগ্র শর্ত ও প্রকৃতির দিক দিয়ে মুসলিমদের উপর ফরযকৃত সিয়ামেরই অনুরূপ ছিল। যেমন, সিয়ামের সময়সীমা, সংখ্যা এবং কখন তা রাখা হবে, এসব ব্যাপারে আগেকার উম্মতদের সিয়ামের সাথে মুসলিমদের সিয়ামের পার্থক্য হতে পারে, বাস্তব ক্ষেত্রে হয়েছেও তাই। বিভিন্ন সময়ে সিয়ামের সময়সীমা এবং সংখ্যার ক্ষেত্রে পার্থক্য হয়েছে। [মা'আরিফুল কুরআন]
(৩) এ বাক্যে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, তাকওয়া শক্তি অর্জন করার ব্যাপারে সিয়ামের একটা বিশেষ ভূমিকা বিদ্যমান। কেননা, সিয়ামের মাধ্যমে প্রবৃত্তির তাড়না নিয়ন্ত্রণ করার ব্যাপারে বিশেষ শক্তি অর্জিত হয়। প্রকৃত প্রস্তাবে সেটাই তাকওয়ার ভিত্তি।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১৮৩) হে বিশ্বাসিগণ! তোমাদের জন্য সিয়ামের (রোযার) বিধান দেওয়া হল, যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যাতে তোমরা সংযমশীল হতে পার। [1]
তাফসীর:
[1] صوم صيام এর (মাসদার/ক্রিয়ামূল)। এর শরীয়তী অর্থ হল, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে ফজর উদিত হওয়ার পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার এবং যৌনবাসনা পূরণ করা থেকে বিরত থাকা। এই ইবাদতটা যেহেতু আত্মাকে পবিত্র ও শুদ্ধি করণের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তাই তা তোমাদের পূর্বের উম্মতের উপরেও ফরয করা হয়েছিল। এই রোযার সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হল তাকওয়া, পরহেযগারী তথা আল্লাহভীরুতা অর্জন। আর আল্লাহভীরুতা মানুষের চরিত্র ও কর্মকে সুন্দর করার জন্য মৌলিক ভূমিকা পালন করে থাকে।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১৮৩ ও ১৮৪ নং আয়াতের তাফসীর:
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করার পর শরীয়তের বিধি-বিধান পালনের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হলে তখন শরীয়তের বিধি-বিধান ধারাবাহিকভাবে অবতীর্ণ হতে লাগল।
পূর্বের আয়াতগুলোতে কিসাস, অসিয়ত ইত্যাদি বিধি-বিধান নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
অত্র আয়াতে মু’মিনদের তাকওয়া অর্জনের মাধ্যম সিয়াম সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। হিজরী দ্বিতীয় সনে সিয়াম (রোযা) ফরয হয়। এ সিয়াম পূর্ববর্তীদের ওপরও ফরয ছিল কিন্তু তা ছিল ভিন্নভাবে।
আয়াতের শেষাংশে সিয়াম ফরযের কারণ উল্লেখ করেছেন। তা হল তাকওয়াবান হওয়া। তাকওয়ার পরিচয় মুত্তাকীর গুণাবলী ও ফলাফল অত্র সূরার ২ নং আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইসলামী শরীয়তে আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে ইবাদতের নিয়্যতে রমযান মাসে সুবহে সাদিক হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও যৌন মিলন হতে বিরত থাকাকে সিয়াম বলা হয়। অবশ্য এ সংজ্ঞায় মিথ্যা, অশ্লীল ও বেহায়াপনাপূণ্য কথা-কাজ থেকে বিরত থাকাও শামিল। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও কাজ বর্জন করল না তার পানাহার বর্জন করায় আল্লাহ তা‘আলার কোন প্রয়োজন নেই। (সহীহ বুখারী হা: ৫৯২৭, সহীহ মুসলিম হা: ১১৫১) অন্যত্র তিনি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: কেবল পানাহার থেকে বিরত থাকার নামই সিয়াম নয়; বরং অসারতা ও অশ্লীলতা থেকে বিরত থাকার নামই (প্রকৃত) সিয়াম। সুতরাং যদি তোমাকে কেউ গালিগালাজ করে অথবা তোমার প্রতি মূর্খতা প্রদর্শন করে, তাহলে তুমি (তার প্রতিশোধ না নিয়ে) তাকে বল যে, আমি সিয়াম পালন করছি। (সহীহুল জামে আস সাগীর হা: ৫৩৭৬)
(أَيَّامًا مَّعْدُوْدٰتٍ)
‘(সিয়াম) নির্দিষ্ট কয়েক দিনের জন্য’সে নির্দিষ্ট কয়েকটি দিন হলো রমাযান মাস।
যারা রমযান মাসে অসুস্থ বা সফরে থাকবে তাদের জন্য ছাড় রয়েছে। অসুস্থ বা সফরে থাকার কারণে ছুটে যাওয়া সিয়ামগুলো অন্য মাসে পালন করে নেবে। আর মহিলাগণ তাদের ঋতুকালীন দিনগুলোতে সিয়াম রাখবে না, অন্য মাসে পালন করবে। তবে এক্ষেত্রে বিলম্ব না করাই উত্তম, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তা পালন করে নেবে।
(وَعَلَي الَّذِيْنَ يُطِيْقُوْنَه۫)
‘আর যারা সিয়াম রাখতে সক্ষম (কিন্তু রাখতে চায় না)’সিয়ামের তিনটি পরিবর্তন হয়েছে যেমন সালাতের তিনটি পরিবর্তন হয়েছে। (তাফসীর ইবনে কাসীর ১ম খণ্ড, পৃঃ ৪৫৮)
তার মধ্যে এটি একটি পরিবর্তন: ইসলামের প্রাথমিক যুগে সুস্থ-সবল মানুষ রোযা না রাখতে চাইলে মিসকীনকে খাওয়ানোর মাধ্যমে ফিদিয়া দিয়ে দিত। অতঃপর তা ১৮৫ নং আয়াত দ্বারা মানসূখ হয়ে গেছে। অর্থাৎ প্রত্যেক সুস্থ-সবল প্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তি যদি নিজ বাড়িতে অবস্থান করে তাহলে তাকে অবশ্যই সিয়াম পালন করতে হবে।
(فِدْيَةٌ طَعَامُ مِسْکِیْنٍ)
“তারা মিসকিন খাওয়ানোর মাধ্যমে ফিদইয়া দেবে” অর্থাৎ অতি বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, যারা সিয়াম পালন করতে সক্ষম নয় তারা প্রত্যেক দিনের বদলে একজন করে মিসকীনকে খাদ্য দান করবে। (সহীহ বুখারী হা: ৪৫০৫)
খাদ্য দানের দু’টি নিয়ম: প্রথম হলো: এক দিন খাবার তৈরি করে সিয়াম সংখ্যা হিসেবে মিসকিন ডেকে খাওয়াবে। আনাস (রাঃ) বৃদ্ধ অবস্থায় এরূপ করতেন। তিনি এক অথবা দু’বছর সিয়াম রাখতে না পারায় প্রত্যেক মিসকিনকে গোশত-রুটি খাওয়াতেন। (সহীহ বুখারী হা: ৯২৮-৯২৯)
দ্বিতীয় হলো: দেশের প্রধান খাদ্য থেকে প্রত্যেক দিনের পরিবর্তে প্রত্যেক মিসকিনকে সোয়া এক কেজি করে খাদ্য দান করবে। যেহেতু কাব বিন উজরার ইহরাম অবস্থায় মাথায় উকুন হলে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে বলেন: তোমার মাথা মুণ্ডন করে ফেল এবং তিন দিন রোযা রাখ, কিংবা প্রত্যেক মিসকিনকে মাথাপিছু অর্ধ সা’(প্রায় সোয়া এক কেজি) করে ছয়জন মিসকিনকে খাদ্য দান কর, কিংবা একটি ছাগল কুরবানী কর। (সহীহ বুখারী হা: ১৮১৬, সহীহ মুসলিম হা: ১২০১)
আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. রমাযান মাসে প্রত্যেক সক্ষম মুকিম মুসলিমের জন্য সিয়াম পালন করা ফরয।
২. সিয়াম মু’মিনের তাকওয়ার বিকাশ ঘটায়।
৩. রমাযানের সিয়াম মু’মিনের সকল সগীরাহ গুনাহ মোচন করে দেয়।
৪. মুসাফির ও অসুস্থ ব্যক্তির রমযানের সিয়াম পালনে ছাড় রয়েছে। তবে অবশ্যই পরে তা আদায় করতে হবে।
৫. অনুরূপভাবে গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারিণী মা সিয়াম ছাড়তে পারবে এবং প্রতি সিয়ামের বিনিময়ে একজন মিসকিনকে খাওয়াবে।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১৮৩-১৮৪ নং আয়াতের তাফসীর
আল্লাহ তা'আলা এই উম্মতের ঈমানদারগণকে সম্বোধন করে বলেছেন যে, তারা যেন রোযাব্রত পালন করে। রোযার অর্থ হচ্ছে আল্লাহ্ পাকের নির্দেশ পালনের খাটি নিয়তে পানাহার ও স্ত্রী সহবাস হতে বিরত থাকা। এর উপকারিতা এই যে, এর ফলে মানবাত্মা পাপ ও কালিমা থেকে সম্পূর্ণ রূপে পরিষ্কার ও পবিত্র হয়ে যায়। এর সাথে সাথেই আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, এই রোযার হুকুম শুধুমাত্র তাদের উপরেই হচ্ছে না বরং তাদের পূর্ববর্তী উম্মতের প্রতিও রোযার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। এই বর্ণনার উদ্দেশ্য এটাও যে, উম্মতে মুহাম্মদী (সঃ) যেন এই কর্তব্য পালনে পূর্বের উম্মতদের পিছনে না পড়ে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে প্রত্যেকের জন্যে একটা পন্থা ও রাস্তা রয়েছে, আল্লাহ চাইলে তোমাদের সকলকেই একই উম্মত করে দিতেন; কিন্তু তিনি তোমাদেরকে পরীক্ষা করছেন, তোমাদের উচিত যে তোমরা পুণ্যের কাজে অগ্রগামী থাকবে। এই বর্ণনাই এখানেও হচ্ছে যে এই রোযা তোমাদের উপর ঐ রকমই ফরয, যেমন ফরয ছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপরে। রোযার দ্বারা শরীরের পবিত্রতা লাভ হয় এবং শয়তানের পথে বাধার সৃষ্টি হয়।
সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হে যুবকবৃন্দ! তোমাদের মধ্যে যার বিয়ে করার সামর্থ রয়েছে সে বিয়ে করবে, আর যার ক্ষমতা নেই সে রোযা রাখবে, এটাই তার জন্যে অণ্ডকোষ কর্তিত হওয়া। অতঃপর রোযার জন্যে দিনের সংখ্যা বর্ণনা করা হচ্ছে যে, এটা কয়েকটি দিন মাত্র যাতে কারও উপর ভারী না হয় এবং কেউ আদায়ে অসমর্থ না হয়ে পড়ে; বরং আগ্রহের সাথে তা পালন করে। প্রথমে প্রতি মাসে তিনটি রোযা রাখার নির্দেশ ছিল। অতঃপর রমযানের রোযার নির্দেশ হয় এবং পূর্বের নির্দেশ উঠে যায়। এর বিস্তারিত বিবরণ ইনশাআল্লাহ আসছে। হযরত মু'আয (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত আতা’ (রাঃ), হযরত কাতাদাহ (রাঃ)-এবং হযরত যহ্হাক (রাঃ)-এর উক্তি এই যে, হযরত নূহ (আঃ)-এর যুগে প্রতি মাসে তিনটি রোযার নির্দেশ ছিল, যা হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর উম্মতের জন্যে পরিবর্তিত হয় এবং তাদের উপর এই বরকতময় মাসে রোযা ফরয করা হয়।
হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, পূর্ববর্তী উম্মতদের উপরও পূর্ণ একমাস রোযা ফরয ছিল। একটি মারফু হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ রমযানের রোযা তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতের উপর ফরয ছিল। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) বলেনঃ “পূর্ববর্তী উম্মতের প্রতি এই নির্দেশ ছিল যে, এশার নামায আদায় করার পর যখন তারা শুয়ে যেত তখন তাদের উপর পানাহার ও স্ত্রী সহবাস হারাম হয়ে যেতো। পূর্ববর্তী’ হতে ভাবার্থ হচ্ছে আহলে কিতাব। এর পরে বলা হচ্ছে-‘রামযান মাসে যে ব্যক্তি রুগ্ন হয়ে পড়ে ঐ অবস্থায় তাকে কষ্ট করে রোযা করতে হবে না। পরে যখন সে সুস্থ হবে তখন তা আদায় করে নেবে। তবে ইসলামের প্রাথমিক যুগে যে ব্যক্তি সুস্থ থাকতে এবং মুসাফিরও হতো না তার জন্যেও এই অনুমতি ছিল যে, হয় সে রোযা রাখবে বা রোযার পরিবর্তে একজন মিসকীনকে ভোজ্য দান করবে এবং একজনের বেশী মিসকীনকে খাওয়ানো উত্তম ছিল। কিন্তু মিসকীনকে ভোজ্য দান অপেক্ষা রোযা রাখাই বেশী মঙ্গলজনক কাজ ছিল। হযরত ইবনে মাসউদ (রঃ), হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত তাউস (রঃ), হযরত মুকাতিল (রঃ) প্রমুখ মনীষীগণ এটাই বলে থাকেন।
মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে, হযরত মুআয বিন জাবাল (রাঃ) বলেনঃ নামায ও রোযা তিনটি অবস্থায় পরিবর্তিত হয়। নামাযের তিনটি অবস্থা হচ্ছেঃ (১) মদীনায় এসে মোল সতেরো মাস ধরে বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামায আদায় করা; অতঃপর আল্লাহর নির্দেশক্রমে মক্কা শরীফের দিকে মুখ করা হয়। (২) পূর্বে নামাযের জন্যে একে অপরকে ডাকতেন এবং একত্রিত হতেন; অবশেষে এতে তারা অসমর্থ হয়ে পড়েন। অতঃপর হযরত আবদুল্লাহ বিন যায়েদ বিন আবদ-ই-রব্বিহী (রাঃ) নামক একজন আনসারী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে আরয করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! নিদ্রিত ব্যক্তির স্বপ্ন দেখার মতই আমি স্বপ্ন দেখেছি; কিন্তু যদি বলি যে, আমি নিদ্রিত ছিলাম না তবে আমার সত্য কথাই বলা হবে। (স্বপ্ন) এই যে, সবুজ রঙ্গের হুল্লা (লুঙ্গি ও চাদর) পরিহিত এক ব্যক্তি কিবলার দিকে মুখ করে বলছেন (আরবি) দু’বার। এভাবে তিনি আযান শেষ করেন। ক্ষণেক বিরতির পর তিনি পূর্বের কথাগুলো আবার উচ্চারণ করেন কিন্তু এবারে (আরবি) কথাটি দু’বার অতিরিক্ত বলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন-‘বেলালকে (রাঃ) এটা শিখিয়ে দাও। সে আযান দেবে। সুতরাং সর্বপ্রথম হযরত বেলাল (রাঃ) আযান দেন।
অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত উমার (রাঃ) এসে এই স্বপ্ন বর্ণনা করেছিলেন। কিন্তু তার পূর্বেই হযরত যায়েদ (রাঃ) এসে গিয়েছিলেন। (৩) পূর্বে প্রচলন এই ছিল যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) নামায পড়াচ্ছেন, তার কয়েক রাকআত পড়া হয়ে গেছে এমন সময় কেউ আসছেন। কয় রাক'আত পড়া হয়েছে এটা তিনি ইঙ্গিতে কাউকে জিজ্ঞেস করছেন। তিনি বলছেন-“এক রাক'আত বা দু'রাকআত ।তিনি তখন ঐ রাকআতগুলো পড়ে নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে মিলিত হচ্ছেন। একদা হযরত মুআয (রাঃ) আসছেন এবং বলছেন-“আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে যে অবস্থাতেই পাবো সেই অবস্থাতেই তার সাথে মিলিত হয়ে যাবে এবং যে নামায ছুটে গেছে তা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সালাম ফেরাবার পর পড়ে নেবো। সুতরাং তিনি তাই করেন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) সালাম ফেরানোর পর তাঁর ছুটে যাওয়া রাকআতগুলো আদায় করার জন্য দাঁড়িয়ে যান। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, মুআয (রাঃ) তোমাদের জন্যে উত্তম পন্থা বের করেছেন। তোমরাও এখন হতে এরূপই করবে। এই তো হলো নামাযের তিনটি পরিবর্তন।
রোযার তিনটি পরিবর্তন এইঃ (১) যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) মদীনায় আগমন করেন তখন তিনি প্রতি মাসে তিনটি রোযা রাখতেন এবং আশূরার রোযা রাখতেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা (আরবি)
অবতীর্ণ করে রমযানের রোযা ফরয করেন।
(২) প্রথমতঃ এই নির্দেশ ছিল যে, যে চাইবে রোযা রাখবে এবং যে চাইবে রোযার পরিবর্তে মিসকীনকে ভোজ্য দান করবে। অতঃপর (আরবি) এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ ‘তোমাদের মধ্যকার যে ব্যক্তি ঐ মাসে (নিজ আবাসে) উপস্থিত থাকে সে যেন তাতে রোযা পালন করে। সুতরাং যে ব্যক্তি বাড়ীতে অবস্থানকারী হয় এবং মুসাফির না হয়, সুস্থ হয় রুগ্ন না হয়, তার উপর রোযা বাধ্যতামূলক হয়ে যায়। তবে রুগ্ন ও মুসাফিরের জন্যে অবকাশ থাকে। আর এমন বৃদ্ধ, যে রোযা রাখার ক্ষমতাই রাখে না সে ‘ফিদইয়াহ' দেয়ার অনুমতি লাভ করে।
(৩) পূর্বে রাত্রে দ্রিা যাওয়ার আগে আগে পানাহার ও স্ত্রী সহবাস বৈধ ছিল বটে; কিন্তু ঘুমিয়ে যাবার পর রাত্রির মধ্যেই জেগে উঠলেও পানাহার ও সহবাস তার জন্যে নিষিদ্ধ ছিল। অতঃপর একদা সরমা’ নামক একজন আনসারী (রাঃ) সারাদিন কাজ কর্ম করে ক্লান্ত অবস্থায় রাত্রে বাড়ী ফিরে আসেন এবং এশার নামায আদায় করেই তার ঘুম চলে আসে। পরদিন কিছু পানাহার ছাড়া তিনি রোযা রাখেন। কিন্তু তাঁর অবস্থা অত্যন্ত সঙ্গীন হয়ে পড়ে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ ব্যাপার কি:' তখন তিনি সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করেন। এদিকে তার ব্যাপারে তো এই ঘটনা ঘটে আর ওদিকে হযরত উমার (রাঃ) ঘুমিয়ে যাওয়ার পর জেগে উঠে স্ত্রী সহবাস করে বসেন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করতঃ অত্যন্ত দুঃখ ও পরিতাপের সাথে এই দোষ স্বীকার করেন। ফলে (আরবি) (২:১৮৭) পর্যন্ত আয়াত অবতীর্ণ হয় এবং মাগরিব থেকে নিয়ে সুবহে সাদেক পর্যন্ত রমযানের রাত্রে পানাহার ও স্ত্রী সহবাসের অনুমতি দেয়া হয়।
সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, পূর্বে আশূরার রোযা রাখা হতো। যখন রমযানের রোযা ফরয করে দেয়া হয় তখন আর আশূরার রোযা বাধ্যতামূলক থাকে না; বরং যিনি ইচ্ছা করতেন, রাখতেন এবং যিনি চাইতেন না, রাখতেন না।
(আরবি) (২:১৭৪)-এর ভাবার্থ হযরত মু'আয (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, ইসলামের প্রাথমিক যুগে ইচ্ছে করলে কেউ রোযা রাখতেন আবার কেউ রাখতেন না। বরং মিসকীনকে ভোজ্য দান করতেন। হযরত সালমা বিন আকওয়া (রাঃ) হতে সহীহ বুখারী শরীফে একটি বর্ণনা এসেছে` যে, এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার সময় যে ব্যক্তি ইচ্ছে করতো রোযা ছেড়ে দিয়ে ‘ফিদইয়া দিয়ে দিতে। অতঃপর তার পরবর্তী আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং এটা ‘মানসূখ’ (রহিত) হয়ে যায়। হযরত উমার (রাঃ) ও এটাকে মানসূখ বলেছেন। হযরত ইবনে আববাস (রাঃ) বলেন যে, এটা মানসূখ নয় বরং এর ভাবার্থ হচ্ছে বৃদ্ধ পুরুষ বা বৃদ্ধা নারী, যারা রোযা রাখার ক্ষমতা রাখে না। ইবনে আবি লাইলা (রঃ) বলেনঃ “আমি আতা (রঃ)-এর নিকট রমযান মাসে আগমন করি। দেখি যে, তিনি খানা খাচ্ছেন। আমাকে দেখে তিনি বলেনঃ হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তি আছে যে, এই আয়াতটি পর্বের আয়াতটিকে মানসূখ করে দিয়েছে। এখন এই হুকুম শুধুমাত্র শক্তিহীন, অচল বৃদ্ধদের জন্যে রয়েছে। মোট কথা এই যে, যে ব্যক্তি নিজ আবাসে আছে এবং সুস্থ ও সবল অবস্থায় রয়েছে তার জন্যে এই নির্দেশ নয়। বরং তাকে রোযাই রাখতে হবে। হাঁ, তবে খুবই বয়স্ক, বৃদ্ধ এবং দুর্বল লোক যাদের রোযা রাখার ক্ষমতা নেই, তারা রোযাও রাখবে না এবং তাদের উপর রোযা কাযাও জরুরী নয়। কিন্তু যদি সে ধনী হয় তবে তাকে কাফফারাও আদায় করতে হবে কি হবে না, এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে।
ইমাম শাফিঈ (রঃ)-এর একটি উক্তি তো এই যে, যেহেতু তার রোযা করার শক্তি নেই, সুতরাং সে নাবালক ছেলের মতই। তার উপর যেমন কাফফারা নেই তেমনই এর উপরও নেই। কেননা, আল্লাহ তা'আলা কাউকেও ক্ষমতার অতিরিক্ত কষ্ট দেন না। ইমাম শাফিঈ (রঃ)-এর দ্বিতীয় উক্তি এই যে, তার দায়িত্বে কাফফারা রয়েছে। অধিকাংশ আলেমেরও সিদ্ধান্ত এটাই। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ মনীষীগণের তাফসীর হতেও এটাই সাব্যস্ত হচ্ছে। হযরত ইমাম বুখারী (রঃ)-এর এটাই পছন্দনীয় মত। তিনি বলেন যে, খুব বেশী বয়স্ক বৃদ্ধ যার রোযা রাখার শক্তি নেই সে ‘ফিদইয়াই দিয়ে দেবে। যেমন হযরত আনাস বিন মালিক (রাঃ) শেষ বয়সে অত্যন্ত বার্ধক্য অবস্থায় দু'বছর ধরে রোযা রাখেননি এবং প্রত্যেক রোযার বিনিময়ে একটি মিসকীনকে গোশত-রুটি আহার করাতেন।
মুসনাদ-ই-আবূ ইয়ালা' গ্রন্থে রয়েছে যে, যখন হযরত আনাস (রাঃ) রোযা রাখতে অসমর্থ হয়ে পড়েন তখন রুটি ও গোশত তৈরি করে ত্রিশ জন মিসকীনকে আহার করিয়ে দেন। অনুরূপভাবে গর্ভবতী ও দুগ্ধবতী স্ত্রীলোকেরা যখন তাদের নিজেদের ও সন্তানদের জীবনের ভয় করবে এদের ব্যাপারেও ভীষণ মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, তারা রোযা রাখবে না, বরং ফিদইয়া’ দেবে এবং যখন ভয় দূর হয়ে যাবে তখন রোযাও কাযা করে নেবে। আবার কেউ কেউ বলেন যে, শুধু ফিদইয়া যথেষ্ট, কাযা করার প্রয়োজন নেই। কেউ কেউ আবার বলেন যে, রোযাই রাখবে, ফিদইয়া’ বা কাযা নয়। আমি (ইবনে কাসীর) এই মাসআলাটি স্বীয় পুস্তক কিতাবুস সিয়াম এর মধ্যে বিস্তারিতভাবে লিখেছি।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।