আল কুরআন


সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 173)

সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 173)



হরকত ছাড়া:

إنما حرم عليكم الميتة والدم ولحم الخنزير وما أهل به لغير الله فمن اضطر غير باغ ولا عاد فلا إثم عليه إن الله غفور رحيم ﴿١٧٣﴾




হরকত সহ:

اِنَّمَا حَرَّمَ عَلَیْکُمُ الْمَیْتَۃَ وَ الدَّمَ وَ لَحْمَ الْخِنْزِیْرِ وَ مَاۤ اُهِلَّ بِهٖ لِغَیْرِ اللّٰهِ ۚ فَمَنِ اضْطُرَّ غَیْرَ بَاغٍ وَّ لَا عَادٍ فَلَاۤ اِثْمَ عَلَیْهِ ؕ اِنَّ اللّٰهَ غَفُوْرٌ رَّحِیْمٌ ﴿۱۷۳﴾




উচ্চারণ: ইন্নামা-হাররামা ‘আলাইকুমুল মাইতাতা ওয়াদ্দামা ওয়া লাহমাল খিনযীরি ওয়ামা উহিল্লা বিহী লিগাইরিল্লা-হি ফামানিদতুররা গাইরা বা-গিওঁ ওয়ালা-‘আ-দিন ফালা-ইছমা ‘আলাইহি ইনাল্লা-হা গাফূরুর রাহীম।




আল বায়ান: নিশ্চয় তিনি তোমাদের উপর হারাম করেছেন মৃত জন্তু, রক্ত, শূকরের গোশ্ত এবং যা গায়রুল্লাহর নামে যবেহ করা হয়েছে। সুতরাং যে বাধ্য হবে, অবাধ্য বা সীমালঙ্ঘনকারী না হয়ে, তাহলে তার কোন পাপ নেই। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৭৩. তিনি আল্লাহ তো কেবল তোমাদের উপর হারাম করেছেন মৃত জন্তু(১), রক্ত(২), শূকরের গোশত(৩) এবং যার উপর আল্লাহর নাম ছাড়া অন্যের নাম উচ্চারিত হয়েছে(৪), কিন্তু যে নিরূপায় অথচ নাফরমান এবং সীমালংঘনকারী নয় তার কোন পাপ হবে না(৫)। নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।




তাইসীরুল ক্বুরআন: নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি হারাম করেছেন মৃত-জীব, রক্ত এবং শূকরের মাংস এবং সেই জন্তু যার প্রতি আল্লাহ ছাড়া অন্যের নাম নেয়া হয়েছে, তবে যে ব্যক্তি নিরুপায় হয়ে পড়ে কিন্তু সে নাফরমান ও সীমালঙ্ঘনকারী নয়, তার উপর কোন গুনাহ নেই, নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু।




আহসানুল বায়ান: (১৭৩) নিশ্চয় (আল্লাহ) তোমাদের জন্য শুধু মৃত জীব, রক্ত, শূকরের গোশত এবং যে সব জন্তুর উপরে (যবেহ কালে) আল্লাহ ছাড়া অন্যের নাম উচ্চারণ করা হয়ে থাকে, তা তোমাদের জন্য অবৈধ করেছেন। [1] কিন্তু যে অনন্যোপায় অথচ অন্যায়কারী কিংবা সীমালংঘনকারী নয়, তার কোন পাপ হবে না। আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল পরম দয়ালু।



মুজিবুর রহমান: তিনি শুধু তোমাদের জন্য মৃত জীব, রক্ত, শুকরের মাংস এবং যা আল্লাহ ব্যতীত অপরের উদ্দেশে নিবেদিত - তদ্ব্যতীত অবৈধ করেননি; বস্তুতঃ যে ব্যক্তি নিরূপায়, কিন্তু সীমা লংঘনকারী নয়, তার জন্য পাপ নেই; এবং নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, করুণাময়।



ফযলুর রহমান: আল্লাহ তোমাদের জন্য মৃতদেহ, রক্ত, শূকরের মাংস এবং আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্য উৎসর্গীকৃত (অথবা জবাইকালে আল্লাহর নাম না নিয়ে দেব-দেবীর নামে জবাইকৃত) প্রাণীর মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ করেছেন। তবে কেউ যদি অবাধ্য কিংবা সীমালঙ্ঘনকারী না হয়ে একান্ত নিরুপায় হয়ে (এগুলোর মধ্যে কোনটি) খায়, তাহলে তার কোন পাপ হবে না। আল্লাহ অবশ্যই ক্ষমাশীল, দয়ালু।



মুহিউদ্দিন খান: তিনি তোমাদের উপর হারাম করেছেন, মৃত জীব, রক্ত, শুকর মাংস এবং সেসব জীব-জন্তু যা আল্লাহ ব্যাতীত অপর কারো নামে উৎসর্গ করা হয়। অবশ্য যে লোক অনন্যোপায় হয়ে পড়ে এবং নাফরমানী ও সীমালঙ্ঘনকারী না হয়, তার জন্য কোন পাপ নেই। নিঃসন্দেহে আল্লাহ মহান ক্ষমাশীল, অত্যন্ত দয়ালু।



জহুরুল হক: তিনি তোমাদের কারণে নিষেধ করেছেন কেবল যা নিজে মারা গেছে, আর রক্ত, আর শূকরের মাংস, আর যার উপরে আল্লাহ্ ছাড়া অন্য নাম উচ্চারিত হয়েছে। কিন্তু যে চাপে পড়েছে, অবাধ্য হয় নি বা মাত্রা ছাড়ায় নি, তার উপরে কোনো পাপ হবে না। নিঃসন্দেহ আল্লাহ্ ত্রাণকর্তা, অফুরন্ত ফলদাতা!



Sahih International: He has only forbidden to you dead animals, blood, the flesh of swine, and that which has been dedicated to other than Allah. But whoever is forced [by necessity], neither desiring [it] nor transgressing [its limit], there is no sin upon him. Indeed, Allah is Forgiving and Merciful.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১৭৩. তিনি আল্লাহ তো কেবল তোমাদের উপর হারাম করেছেন মৃত জন্তু(১), রক্ত(২), শূকরের গোশত(৩) এবং যার উপর আল্লাহর নাম ছাড়া অন্যের নাম উচ্চারিত হয়েছে(৪), কিন্তু যে নিরূপায় অথচ নাফরমান এবং সীমালংঘনকারী নয় তার কোন পাপ হবে না(৫)। নিশ্চয়ই আল্লাহ্– অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।


তাফসীর:

(১) অর্থাৎ যেসব প্রাণী হালাল করার জন্য শরীআতের বিধান অনুযায়ী যবেহ্ করা জরুরী, সেসব প্রাণী যদি যবেহ ব্যতীত অন্য কোন উপায়ে যেমন, আঘাত প্রাপ্ত হয়ে, অসুস্থ হয়ে কিংবা দম বন্ধ হয়ে মারা যায়, তবে সেগুলোকে মৃত বলে গণ্য করা হবে এবং সেগুলোর গোশত খাওয়া হারাম হবে। তবে অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, তোমাদের জন্য সামুদ্রিক শিকার হালাল করা হল। [সূরা আল-মায়িদাহঃ ৯৬] এ আয়াতের মর্মানুযায়ী সামুদ্রিক জীব-জন্তুর বেলায় যবেহ করার শর্ত আরোপিত হয়নি। ফলে এগুলো যবেহ ছাড়াই খাওয়া হালাল। অনুরূপ এক হাদীসে মাছ এবং টিড্ডি নামক পতঙ্গকে মৃত প্রাণীর তালিকা থেকে বাদ দিয়ে এ দুটির মৃতকেও হালাল করা হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “আমাদের জন্য দুটি মৃত হালাল - মাছ এবং টিড্ডি (এক জাতীয় ফড়িং)। [বাগভীঃ শরহুস-সুন্নাহঃ ২৮০৩, সুনানে ইবনে মাজাহঃ ৩২১৮]

সুতরাং বোঝা গেল যে, জীব-জন্তুর মধ্যে মাছ এবং ফড়িং মৃতের পর্যায়ভুক্ত হবে না, এ দুটি যবেহ না করেও খাওয়া যাবে। অনুরূপ যেসব জীব-জন্তু ধরে যবেহ্ করা সম্ভব নয়, সেগুলোকে বিসমিল্লাহ বলে তীর কিংবা অন্য কোন ধারালো অস্ত্র দ্বারা আঘাত করে যদি মারা হয়, তবে সেগুলোও হালাল হবে, এমতাবস্থায়ও শুধু আঘাত দিয়ে মারলে চলবে না, কোন ধারালো অস্ত্রের সাহায্যে আঘাত করা শর্ত। আজকাল একরকম চোখা গুলী ব্যবহার হয়, এ ধরণের গুলী সম্পর্কে কেউ কেউ মনে করতে পারে যে, এসব ধারালো গুলীর আঘাতে মৃত জন্তুর হুকুম তীরের আঘাতে মৃতের পর্যায়ভুক্ত। কিন্তু আলেমগণের সম্মিলিত অভিমত অনুযায়ী বন্দুকের গুলী চোখা এবং ধারালো হলেও তা তীরের পর্যায়ভুক্ত হয় না। কেননা, তীরের আঘাত ছুরির আঘাতের ন্যায়, অপরদিকে বন্দুকের গুলী চোখা হলেও গায়ে বিদ্ধ হয়ে গায়ে বিস্ফোরণ ও দাহিকা শক্তির প্রভাবে জন্তুর মৃত্যু ঘটায়। সুতরাং এরূপ গুলী দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত জানোয়ার যবেহ্ করার আগে মারা গেলে তা খাওয়া হালাল হবে না। এক্ষেত্রে গুলী দ্বারা শিকার করা হলে তা আবার যবেহ্ করতে হবে।

এখানে আরও জানা আবশ্যক যে, আয়াতে তোমাদের জন্য মৃত হারাম বলতে মৃত জানোয়ারের গোশত খাওয়া যেমন হারাম, তেমনি এগুলোর ক্রয়-বিক্রয়ও হারাম হিসেবে বিবেচিত হবে। যাবতীয় অপবিত্র বস্তু সম্পর্কে সেই একই বিধান প্রযোজ্য। অর্থাৎ মৃত জানোয়ারের গোশ্‌ত ব্যবহার যেমন হারাম, তেমনি এগুলো ক্রয়-বিক্রয় কিংবা অন্য কোন উপায়ে এগুলো থেকে যেকোনভাবে লাভবান হওয়াও হারাম। এমনকি মৃত জীব-জন্তুর গোশত নিজ হাতে কোন গৃহপালিত জন্তুকে খাওয়ানোও জায়েয নয়।

তাছাড়া আয়াতে ‘মৃত’ শব্দটির অন্য কোন বিশেষণ ছাড়া সাধারণভাবে ব্যবহার করাতে প্রতীয়মান হয় যে, হারামের হুকুমও ব্যাপক এবং তন্মধ্যে মৃত জন্তুর সমুদয় অংশই শামিল। কিন্তু অন্য এক আয়াতে (عَلَىٰ طَاعِمٍ يَطْعَمُهُ) [সূরা আল-আন’আম: ১৪৫] শব্দ দ্বারা এ বিষয়টিও ব্যাখ্যা করে দেয়া হয়েছে। এতে বোঝা যায় যে, মৃত জন্তুর শুধু সে অংশই হারাম যেটুকু খাওয়ার যোগ্য। সুতরাং মৃত জন্তুর হাড়, পশম প্রভৃতি যেসব অংশ খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয় না, সেগুলোর ব্যবহার করা হারাম নয়; সম্পূর্ণ জায়েয। কেননা, কুরআনের অন্য এক আয়াতে আছে, (وَمِنْ أَصْوَافِهَا وَأَوْبَارِهَا وَأَشْعَارِهَا أَثَاثًا وَمَتَاعًا إِلَىٰ حِينٍ) [সূরা আন-নাহলঃ ৮০] এতে হালাল জানোয়ারসমূহের পশম প্রভৃতির দ্বারা ফায়দা গ্রহণ করার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু এখানে যবেহ্ করার শর্ত আরোপ করা হয়নি। চামড়ার মধ্যে যেহেতু রক্ত প্রভৃতি নাপাকীর সংমিশ্রণ থাকে, সেজন্য মৃত জানোয়ারের চামড়া শুকিয়ে পাকা না করা পর্যন্ত নাপাক এবং ব্যবহার হারাম। কিন্তু পাকা করে নেয়ার পর ব্যবহার করা সম্পূর্ণ জায়েয। সহীহ হাদীসে এ সম্পর্কিত আরও বিস্তারিত ব্যাখ্যা রয়েছে। অনুরূপভাবে মৃত জানোয়ারের চর্বি এবং তদ্বারা তৈরী যাবতীয় সামগ্রীই হারাম। এসবের ব্যবহার কোন অবস্থাতেই জায়েয নয়। এমনকি এসবের ক্রয়-বিক্রয়ও হারাম। [মাআরিফুল কুরআন]


(২) আয়াতে যেসব বস্তু-সামগ্রীকে হারাম করা হয়েছে, তার দ্বিতীয়টি হচ্ছে রক্ত। এ আয়াতে শুধু রক্ত উল্লেখিত হলেও অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, (أَوْ دَمًا مَسْفُوحًا) [সূরা আল-আন’আম: ১৪৫] অর্থাৎ ‘প্রবাহমান রক্ত’ উল্লেখিত রয়েছে। রক্তের সাথে প্রবাহমান শব্দ সংযুক্ত করার ফলে শুধু সে রক্তকেই হারাম করা হয়েছে, যা যবেহ করলে বা কেটে গেলে প্রবাহিত হয়। এ কারণেই কলিজা এবং এরূপ জমাট বাঁধা রক্তে গঠিত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ফেকাহবিদগণের সর্বসম্মত অভিমত অনুযায়ী পাক ও হালাল। আর যেহেতু শুধুমাত্র প্রবাহমান রক্তই হারাম ও নাপাক, কাজেই যবেহ্ করা জন্তুর গোশতের সাথে রক্তের যে অংশ জমাট বেঁধে থেকে যায়, সেটুকু হালাল ও পাক৷ ফেকাহবিদ সাহাবী ও তাবেয়ীসহ সমগ্র আলেম সমাজ এ ব্যাপারে একমত। এখানে আরও একটি বিষয় জানা আবশ্যক যে, রক্ত খাওয়া যেমন হারাম, তেমনি অন্য কোন উপায়ে তা ব্যবহার করাও হারাম। অন্যান্য নাপাক রক্তের ন্যায় রক্তের ক্রয়-বিক্রয় এবং তা দ্বারা অর্জিত লাভালাভও হারাম।


(৩) আলোচ্য আয়াতে তৃতীয় যে বস্তুটি হারাম করা হয়েছে, সেটি হলো শূকরের গোশত। এখানে শূকরের সাথে লাহম’ বা গোশ্বত শব্দসংযুক্ত করে দেয়া হয়েছে ইমাম কুরতুবী বলেন, এর দ্বারা শুধু গোশত হারাম এ কথা বোঝানো উদ্দেশ্য নয়। বরং শূকরের সমগ্র অংশ অর্থাৎ হাড়, গোশত, চামড়া, চর্বি, রগ, পশম প্রভৃতি সর্বসম্মতিক্রমেই হারাম। তবে লাহম তথা গোশত যোগ করে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, শূকর অন্যান্য হারাম জন্তুর ন্যায় নয়, তাই এটি যবেহ্ করলেও পাক হয় না। কেননা, গোশত খাওয়া হারাম এমন অনেক জন্তু রয়েছে যাদের যবেহ করার পর সেগুলোর হাড়, চামড়া প্রভৃতি পাক হতে পারে। কিন্তু যবেহ্ করার পরও শূকরের গোশ্‌ত হারাম তো বটেই, নাপাকও থেকে যায়। কেননা, এটি একাধারে যেমনি হারাম তেমনি ‘নাজাসে আইন’ বা অপবিত্র বস্তু। [মাআরিফুল কুরআন, সংক্ষেপিত]


(৪) আয়াতে উল্লেখিত চতুর্থ হারাম বস্তু হচ্ছে সেসব জীব-জন্তু, যা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে যবেহ বা উৎসর্গ করা হয়। সাধারণত এর তিনটি উপায় প্রচলিত রয়েছে। প্রথমতঃ আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন কিছুর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে যা উৎসর্গ করা হয় এবং যবেহ্ করার সময়ও সে নাম নিয়েই যবেহ করা হয়, যে নামে তা উৎসর্গিত হয়। এমতাবস্থায় যবেহকৃত জন্তু সমস্ত মত-পথের আলেম ও ফেকাহবিদগণের দৃষ্টিতেই হারাম ও নাপাক। এর কোন অংশের দ্বারাই ফায়দা গ্রহণ জায়েয হবে না। (وَمَا أُهِلَّ بِهِ لِغَيْرِ اللَّهِ) আয়াতে যে অবস্থার কথা বোঝানো হয়েছে এ অবস্থা এর সরাসরি নমুনা, যে ব্যাপারে কারো কোন মতভেদ নেই।

দ্বিতীয় অবস্থা হচ্ছে, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন কিছুর সন্তুষ্টি বা নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে যা যবেহ্ করা হয়, তবে যবেহ্ করার সময় তা আল্লাহর নাম নিয়েই যবেহ্ করা হয়। যেমন অনেক অজ্ঞ মুসলিম পীর, কবরবাসী বা জীনের সন্তুষ্টি অর্জনের মানসে গরু, ছাগল, মুরগী ইত্যাদি মানত করে তা যবেহ করে থাকে। কিন্তু যবেহ্ করার সময় আল্লাহর নাম নিয়েই তা যবেহ করা হয়। এ সুরতটিও ফকীহগণের সর্বসম্মত অভিমত অনুযায়ী হারাম এবং যবেহকৃত জন্তু মৃতের শামিল। দুররে মুখতার কিতাবুয-যাবায়েহ অধ্যায়ে বলা হয়েছেঃ যদি কোন আমীরের আগমন উপলক্ষে তারই সম্মানার্থে কোন পশু যবেহ্ করা হয়, তবে যবেহকৃত সে পশুটি হারাম হয়ে যাবে। কেননা, এটাও তেমনি, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন কিছুর নামে যা যবেহ্ করা হয় - এ আয়াতের নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত; যদিও যবেহ্ করার সময় আল্লাহর নাম নিয়েই তা যবেহ্ করা হয়। আল্লামা শামীও এ অভিমত সমর্থন করেছেন।

তৃতীয় সুরত হচ্ছে পশুর কান কেটে অথবা শরীরের অন্য কোথাও কোন চিহ্ন অঙ্কিত করে কোন দেব-দেবী বা পীর-ফকীরের নামে ছেড়ে দেয়া হয়। সেগুলো দ্বারা কোন কাজ নেয়া হয় না, যবেহ করাও উদ্দেশ্য থাকে না। বরং যবেহ্ করাকে হারাম মনে করে। এ শ্রেণীর পশু আলোচ্য দু’আয়াতের কোনটিরই আওতায় পড়ে না। এ শ্রেণীর পশুকে কুরআনের ভাষায় ‘বহীরা’ বা ‘সায়েবা’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। এ ধরনের পশু সম্পর্কে হুকুম হচ্ছে যে, এ ধরনের কাজ অর্থাৎ কারো নামে কোন পশু প্রভৃতি জীবন্ত উৎসর্গ করে ছেড়ে দেয়া কুরআনের সরাসরি নির্দেশ অনুযায়ী হারাম। যেমন বলা হয়েছেঃ (مَا جَعَلَ اللَّهُ مِنْ بَحِيرَةٍ وَلَا سَائِبَةٍ) “আল্লাহ তা'আলা বহীরা ও সায়েবা সম্পর্কে কোন বিধান দেননি।” (সূরা আল-মায়িদাহ ১০৩]

তবে এ ধরনের হারাম আমল কিংবা সংশ্লিষ্ট পশুটিকে হারাম মনে করার ভ্রান্ত বিশ্বাসের কারণেই সেটি হারাম হয়ে যাবে না। বরং হারাম মনে করাতেই তাদের একটা বাতিল মতবাদকে সমর্থন এবং শক্তি প্রদান করা হয়। তাই এরূপ উৎসর্গকৃত পশু অন্যান্য সাধারণ পশুর মতই হালাল। শরীআতের বিধান অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট পশুর উপর তার মালিকের মালিকানা বিনষ্ট হয় না, যদিও সে ভ্রান্ত বিশ্বাসের ভিত্তিতে এরূপ মনে করে যে, এটি আমার মালিকানা থেকে বের হয়ে যে নামে উৎসর্গ করা হয়েছে তারই মালিকানায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু শরীআতের বিধানমতে যেহেতু তার সে উৎসর্গীকরণই বাতিল, সুতরাং সে পশুর উপর তারই পূর্ণ মালিকানা কায়েম থাকে। [মা'আরিফুল কুরআন]


(৫) এ ক্ষেত্রে কুরআনুল কারীম মরণাপন্ন অবস্থায়ও হারাম বস্তু খাওয়াকে হালাল ও বৈধ বলেনি; বলেছে, “তাতে তার কোন পাপ নেই”। এর মর্ম এই যে, এসব বস্তু তখনো যথারীতি হারামই রয়ে গেছে, কিন্তু যে লোক খাচ্ছে তার অনোন্যপায় অবস্থার প্রেক্ষিতে হারাম খাদ্য গ্রহণের পাপ থেকে তাকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। এ আয়াতে অনোন্যপায় হওয়ার কারণ উল্লেখ করা হয়নি। অন্য আয়াতে তা বর্ণিত হয়েছে। বলা হয়েছে, “তবে কেউ পাপের দিকে না ঝুঁকে ক্ষুধার তাড়নায় বাধ্য হলে তখন আল্লাহ নিশ্চয় ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [সূরা আল-মায়েদাহ: ৩] অর্থাৎ ক্ষুধার কারণেই শুধু হারাম বস্তু গ্রহণ করা যেতে পারে।


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (১৭৩) নিশ্চয় (আল্লাহ) তোমাদের জন্য শুধু মৃত জীব, রক্ত, শূকরের গোশত এবং যে সব জন্তুর উপরে (যবেহ কালে) আল্লাহ ছাড়া অন্যের নাম উচ্চারণ করা হয়ে থাকে, তা তোমাদের জন্য অবৈধ করেছেন। [1] কিন্তু যে অনন্যোপায় অথচ অন্যায়কারী কিংবা সীমালংঘনকারী নয়, তার কোন পাপ হবে না। আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল পরম দয়ালু।


তাফসীর:

[1] এই আয়াতে চারটি হারামকৃত জিনিসের উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এখানে إنما শব্দ দ্বারা সীমিতকরণে এই সন্দেহের সৃষ্টি হয় যে, হারাম কেবল এই চারটি জিনিসই। অথচ এ ছাড়াও আরো অনেক জিনিস হারাম আছে। তাই প্রথমতঃ এটা বুঝে নেওয়া উচিত যে, এই সীমিতকরণ বিশেষ কথা প্রসঙ্গে এসেছে। অর্থাৎ, মুশরিকরা হালাল জানোয়ারকেও হারাম করে নিত। তাই মহান আল্লাহ বললেন, হারাম শুধুমাত্র এইগুলো। কাজেই এই সীমিতকরণ তুলনামূলক। অর্থাৎ, এ ছাড়াও আরো হারাম জিনিস আছে যা এখানে উল্লিখিত হয়নি।

দ্বিতীয়তঃ হাদীসে প্রাণীর হালাল-হারাম সংক্রান্ত দু’টি মূলনীতি বলে দেওয়া হয়েছে। সেটাকে আয়াতের সঠিক তাফসীর হিসেবে সামনে রাখা উচিত। হিংস্র পশুর মধ্যে শিকারী দাঁত বিশিষ্ট পশু এবং পাখীর মধ্যে শিকারী নখ বিশিষ্ট পাখী হারাম। তৃতীয়তঃ যেসব পশুর হারাম হওয়ার কথা হাদীস দ্বারা প্রমাণিত; যেমন গাধা, কুকুর ইত্যাদি, সেগুলোও হারাম। এ থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, হাদীসও কুরআনের মত দ্বীনের উৎস এবং শরীয়তের দলীল। দুটোকে মেনে নিলেই দ্বীন পরিপূর্ণ হবে, শুধু কুরআন মানলে ও হাদীসকে প্রত্যাখ্যান করলে দ্বীন পরিপূর্ণ হবে না। ‘মৃত’ বলতে, এমন হালাল পশু যা যথানিয়মে যবেহ ছাড়াই স্বাভাবিকভাবে অথবা কোন দুর্ঘটনায় (বিস্তারিত আলোচনা সূরা মায়েদাহ ৩নং আয়াতে আছে) মারা গেছে কিংবা শরীয়তের তরীকার পরিপন্থী নিয়মে যাকে যবেহ করা হয়েছে; যেমন, গলা টিপে অথবা পাথর ও লাঠির আঘাত ইত্যাদি দ্বারা মারা হয়েছে কিংবা বর্তমানের যান্ত্রিক যবেহ দ্বারা মারা হয়েছে যা আসলে আঘাত দিয়ে হত্যা করার শামিল (তা আসলে মৃত এবং হারাম)। তবে হাদীসে দু’টো মৃত প্রাণী বৈধ করা হয়েছে। আর তা হল, মাছ ও পঙ্গপাল। এ দু’টো মৃত হারাম হওয়ার বিধান থেকে স্বতন্ত্র। ‘রক্ত’ বলতে প্রবাহিত রক্ত। অর্থাৎ, যবেহ করার পর যে রক্ত বের হয়ে বয়ে যায়। গোশতের সাথে যে রক্ত লেগে থাকে, তা হালাল। এছাড়াও দু’টো রক্তকে হাদীসে বৈধ বলা হয়েছেঃ কলিজা (লিভার) এবং তিল্লী (প্লীহা)।

শুয়োর নিকৃষ্ট জানোয়ার; বিধায় আল্লাহ তাকে হারাম করেছেন। শরীয়তে এমন জানোয়ারও হারাম, যাকে গায়রুল্লাহর নামে যবেহ করা হয়েছে। যেমন, আরবের মুশরিকরা লাত এবং উয্যা ইত্যাদির নামে এবং অগ্নিপূজকরা আগুনের নামে (বা উদ্দেশ্যে) যবেহ করত। আর এরই আওতাভুক্ত হল সেই পশু, যাকে অজ্ঞ মুসলিমরা মৃত ওলীদের ভালবাসায়, তাদের সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে অথবা তাদের ভয়ে এবং তাদের নিকট (কোন কিছু পাওয়ার) আশায় কবর ও আস্তানাসমূহে যবেহ করে বা আস্তানার খাদেমকে ওলীর নামে দান করে আসে। (যেমন, অনেক আউলিয়ার কবরে সাইনবোর্ড লাগানো আছে যে, ‘দাতা’ সাহেবের নামে দান করার জন্য গরু-ছাগল এখানে জমা করুন।) ওলীর নামে উৎসর্গীকৃত এই পশুগুলো আল্লাহর নামে যবেহ করা হলেও তা হারাম। কারণ, এ থেকে উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ নয়, বরং কবরবাসীর সন্তুষ্টি লাভ, গায়রুল্লাহর প্রতি সম্মান প্রদর্শন অথবা তার (অতিপ্রাকৃত) ভয়ে বা তার নিকট (কিছু পাওয়ার) আশা করে করা হয়; যা শিরক।

অনুরূপ পশু ছাড়াও যেসব জিনিস গায়রুল্লাহর নামে মানত ও দান করা হয়, তা সবই হারাম। যেমন, কবরে নিয়ে গিয়ে অথবা সেখান থেকেই ক্রয় করে সেখানে উপস্থিত ফকীর-মিসকীনদের মাঝে ডেগচির খয়রাতী খাবার কিংবা মিষ্টি ও টাকা-পয়সা বণ্টন কিংবা নযরানার বাট্টে মানত ও দানের টাকা-পয়সা দেওয়া অথবা উরসের সময় সেখানে দুধ ইত্যাদি খাদ্য পাঠানো; এ সমস্ত কার্যকলাপ হারাম ও অবৈধ। কেননা, এ সবই গায়রুল্লাহর নামে মানত ও দান করা বিবেচিত হয়। মানত করাও নামায-রোযা ইত্যাদি ইবাদতের মত একটি ইবাদত। আর সর্বপ্রকার ইবাদত কেবল আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট। এ জন্যই হাদীসে এসেছে যে, ‘‘সে অভিশপ্ত, যে গায়রুল্লাহর নামে যবেহ করে।’’ (সহীহুল জা’মে আলবানী ২/১০২৪) তাফসীরে নিশাপুরীর হাওয়ালায় তাফসীরে আযিযীতে উল্লেখ হয়েছে যে, (أَجْمَعَ الْعُلَمَاءُ لَو أَنَّ مُسْلِمًا ذَبَحَ ذَبِيْحَةً يُرِيْدُ بِذَبْحِهَا التَّقَرُّبَ إِلَى غَيْرِ اللهِ، صَارَ مُرْتَدًّا وَذَبِيْحَتُهُ ذَبِيْحَةً مُرْتَدٍّ) ‘আলেমগণ এ ব্যাপারে ঐক্যমত পোষণ করেন যে, যদি কোন মুসলিম গায়রুল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে যবেহ করে, তাহলে সে মুরতাদ (দ্বীন থেকে খারিজ) হয়ে যাবে এবং তার যবেহ করা পশু একজন মুর্তাদ্দের যবেহকৃত পশুর মত হবে। (তাফসীরে আযিযী ৬১১ পৃষ্ঠা আশরাফুল হাওয়াশীর বরাতে)


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ১৭২ ও ১৭৩ নং আয়াতের তাফসীর:



১৬৮ নং আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা সমগ্র মানব জাতিকে হালাল খাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। অত্র আয়াতেও বিশেষভাবে মু’মিনদেরকে গুরুত্ব দিয়ে বলেছেন। তারপর এসব নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করার নির্দেশ দিচ্ছেন।



১৭৩ নং আয়াতে হালাল খাওয়ার নির্দেশের সাথে সাথে বর্জনীয় হারামগুলোর বর্ণনাও আল্লাহ তা‘আলা দিয়েছেন। এ আয়াতের তাফসীরস্বরূপ সূরা মায়িদার ৩ নং আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



“তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত জন্তু, রক্ত, শূকরের-মাংস, আল্লাহ ব্যতীত অপরের নামে যবেহকৃত পশু আর শ্বাসরোধে মৃত জন্তু, প্রহারে মৃত জন্তু এবং হিংস্র পশুতে খাওয়া জন্তু; তবে যা তোমরা যবেহ করতে পেরেছ তা ছাড়া, আর যা মূর্তি পূজার বেদীর ওপর বলি দেয়া হয় তা এবং তীর দ্বারা ভাগ্য নির্ণয় করা- এসব পাপ কাজ। আজ কাফিররা তোমাদের দীনের বিরুদ্ধাচরণে হতাশ হয়েছে; সুতরাং তাদেরকে ভয় কর। আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দীন পূর্ণাঙ্গ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দীন মনোনীত করলাম। তবে কেউ পাপের দিকে না ঝুঁকে ক্ষুধার তাড়নায় বাধ্য হলে তখন আল্লাহ তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”(সূরা মায়িদাহ ৫:৩)



الْمَیْتَةَ ‘মৃত’মৃত দ্বারা সেসব জন্তুকে বুঝানো হয়েছে যা শরীয়তসম্মতভাবে জবেহ করা হয়নি যদিও তা হালাল প্রাণী হয়, তবে মাছ মৃত হলেও তা হালাল। (আবূ দাঊদ হা: ৮৩, সহীহ)



الدَّمَ ‘রক্ত’রক্ত দ্বারা ঐ রক্ত হারাম বুঝানো হয়েছে যা জবেহ করার সময় প্রবাহিত হয়।



(وَلَحْمَ الْخِنْزِيرِ)



‘শুকরের গোশত’শুকরের গোশত, তা থেকে উপকার নেয়াসহ তার সব কিছু হারাম।



(وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللّٰهِ بِهِ)



‘যা আল্লাহ ব্যতীত অপরের উদ্দেশ্যে উৎসর্গিত’অর্থাৎ যেসব প্রাণী আল্লাহ তা‘আলার নাম ছাড়া অন্যের নামে জবেহ করা হয়। চাই মূর্তি হোক, ওয়ালী-আওলিয়া হোক।



যে ব্যক্তি নিরুপায় অথচ অন্যায়কারী কিংবা সীমালংঘনকারী নয় তার কোন পাপ হবে না। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(فَمَنِ اضْطُرَّ فِیْ مَخْمَصَةٍ غَیْرَ مُتَجَانِفٍ لِّاِثْمٍﺫ فَاِنَّ اللہَ غَفُوْرٌ رَّحِیْمٌ)



“তবে কেউ পাপের দিকে না ঝুঁকে ক্ষুধার তাড়নায় বাধ্য হলে তখন আল্লাহ তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা মায়িদাহ ৫:৩) অর্থাৎ হারাম প্রাণী বা খাদ্য ছাড়া কোন কিছু না পেলে প্রাণ রক্ষার্থে ততটুকু বৈধ যতটুকু হলে জীবন বাঁচানো যাবে।



আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. হালাল রিযিক খাওয়ার ব্যাপারে উৎসাহ প্রদান করা হচ্ছে।

২. আল্লাহ তা‘আলার নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা ওয়াজিব।

৩. বর্ণিত হারাম প্রাণী ও খাদ্য খেতে কেউ বাধ্য হলে প্রাণ রক্ষার্থে খাওয়া জায়েয।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ১৭২-১৭৩ নং আয়াতের তাফসীর

এই আয়াতে আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাদেরকে নির্দেশ প্রদান পূর্বক বলছেন-“তোমরা পবিত্র ও উত্তম দ্রব্য ভক্ষণ কর এবং আমার নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।হালাল গ্রাস দু'আ ও ইবাদত গৃহীত হওয়ার কারণ এবং হারাম গ্রাস তা কবুল না হওয়ার কারণ। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে হাদীস রয়েছে, হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হে মানব মণ্ডলী! আল্লাহ পবিত্র এবং তিনি পবিত্র জিনিসই গ্রহণ করে থাকেন। তিনি নবীগণকে ও মুমিনদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তারা যেন পবিত্র জিনিস ভক্ষণ করেন এবং সৎ কার্যাবলী সম্পাদন করেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ “হে রাসূলগণ! তোমরা হালাল দ্রব্য ভক্ষণ কর এবং ভাল কাজ কর, নিশ্চয় তোমরা যা করছে আমি তা জানি।' অন্য জায়গায় বলেছেনঃ “হে মু'মিনগণ! আমি তোমাদেরকে যা উপজীবিকা স্বরূপ দান করেছি, সেই পবিত্র বস্তুসমূহ ভক্ষণ কর এবং আল্লাহর নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।' অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘একটি লোক দীর্ঘ সফরে রয়েছে। তার চুলগুলো বিক্ষিপ্ত এবং সে ধূলো-বালিতে আচ্ছন্ন রয়েছে। সে আকাশের দিকে হাত উঠিয়ে প্রার্থনা করছে এবং অত্যন্ত বিনীতভাবে আল্লাহকে ডাকছে। কিন্তু তার আহার্য, পানীয়, পোষাক-পরিচ্ছদ ও খাদ্য সবই হারাম। এই জন্যেই তার এই সময়ের প্রার্থনাও গৃহীত হয় না।' হালাল জিনিসের বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ তা'আলা হারাম জিনিসের বর্ণনা দিচ্ছেন। বলা হচ্ছে যে, যে হালাল প্রাণী আপনা আপনিই মরে গেছে এবং শরীয়তের বিধান অনুসারে যবাহ করা হয়নি তা হারাম। হয় ওকে কেউ গলা টিপে মেরে ফেলুক বা লাঠির আঘাতেই মরে যাক, বা কোথাও হতে পড়ে গিয়ে মারা যাক, বা অন্যান্য জন্তু তাকে শিং এর আঘাতে মেরে ফেলুক, এসবগুলোই মৃত এবং হারাম। কিন্তু পানির প্রাণীর ব্যাপারে এর ব্যতিক্রম হয়ে থাকে। পানির প্রাণী নিজে নিজেই মরে গেলেও হালাল। এর পূর্ণ বর্ণনা (আরবি) (৫:৯৬) এই আয়াতের তাফসীরে দেয়া হবে। সাহাবীদের (রাঃ) আম্বার’ নামক পানির প্রাণীটি মৃত অবস্থায় প্রাপ্তি, তাদের তা ভক্ষণ করা, পরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এই সংবাদ পৌছে যাওয়া এবং তার একে জায়েয বলা ইত্যাদি সব কিছুই হাদীসের মধ্যে রয়েছে। অন্য একটি হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ সমুদ্রের পানি হালাল এবং ওর মৃত প্রাণীও . হালাল।' আরও একটি হাদীসে আছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দুই মৃত ও দুই রক্ত হালাল। মাছ, ফড়িং, কলিজা ও প্লীহা।' সূরা-ই-মায়েদা'য় ইনশাআল্লাহ এর বিস্তারিত বিবরণ আসবে।

জিজ্ঞাস্য

মৃত জন্তুর দুধ ও তার মধ্যস্থিত ডিম অপবিত্র। ইমাম শাফিঈ (রঃ)-এর এটাই মাযহাব। কেননা ওগুলো মৃতেরই এক একটি অংশ বিশেষ। ইমাম মালিক (রঃ)-এর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, ওটা পবিত্র তো বটে; কিন্তু মৃতের সঙ্গে মিলিত হওয়ার ফলে অপবিত্র হয়ে থাকে। অনুরূপভাবে মৃতের দাঁতও প্রসিদ্ধ মাযহাবে ঐ গুরুজনদের নিকট অপবিত্র। তবে তাতে মতভেদও রয়েছে। সাহাবীগণের (রাঃ) মাজুসদের ' পনীর ভক্ষণ এখানে প্রতিবাদ রূপে আসতে পারে; কিন্তু কুরতুবী (রঃ) এর উত্তরে বলেছেন যে, দুধ খুবই কম হয়ে থাকে আর এরূপ তরল জাতীয় কোন অপবিত্র জিনিস অল্প পরিমাণে যদি অধিক পরিমাণ যুক্ত কোন পবিত্র জিনিসে পড়ে যায় তবে তাতে কোন দোষ নেই। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঘি, পনীর এবং বন্য গর্দভ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হলে তিনি বলেনঃ ‘হালাল ঐ জিনিস যা আল্লাহ তাআলা স্বীয় কিতাবে হালাল করেছেন এবং হারাম ঐ জিনিস যা তিনি স্বীয় কিতাবে হারাম করেছেন আর যেগুলোর বর্ণনা নেই সেগুলো ক্ষমার্হ।

অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, শূকরের মাংসও হারাম। হয় তাকে যবাহ করা হোক বা নিজেই মরে যাক। শূকরের চর্বিরও এটাই নির্দেশ। কেননা, ওর অধিকাংশ মাংসই হয় এবং চর্বি মাংসের সাথেই থাকে। কাজেই মাংস যখন হারাম তখন চর্বিও হারাম। দ্বিতীয়তঃ এই জন্যেও যে, কিয়াসের দাবী এটাই। অতঃপর বলা হচ্ছে যে, যা আল্লাহ ছাড়া অপরের উদ্দেশ্যে নিবেদিত ওটাও হারাম। অজ্ঞতার যুগে কাফিরেরা তাদের বাতিল উপাস্যদের নামে পশু যবাহ করতো। আল্লাহ তা'আলা ওটাকে হারাম বলে ঘোষণা করেন। একবার একজন স্ত্রীলোক কাপড়ের স্ত্রী-পুতুলের বিয়েতে একটি পশু যবাহ করে। হযরত হাসান বসরী (রঃ) ফতওয়া দেন যে, ওটা খাওয়া উচিত নয়। কেননা ওটা একটা ছবির জন্যে যবাহ করা হয়েছে। হযরত আয়েশা (রাঃ) জিজ্ঞাসিতা হন যে, আযমী বা অনাররা তাদের ঈদে পশু যবাহ করে থাকে এবং তা হতে মুসলমানদের নিকটও হাদিয়া স্বরূপ কিছু পাঠিয়ে থাকে। তাদের ঐ গোত খাওয়া যায় কি? তিনি বলেনঃ “ঐ দিনের সম্মানার্থে যে জীব যবাহ করা হয় তোমরা তা খেয়ো না। তবে তাদের গাছের ফল খেতে পার।

এর পরে আল্লাহ তাআলা অভাব ও প্রয়োজনের সময় যখন খাওয়ার জন্যে অন্য কিছুই পাওয়া যায় না তখন ঐ হারাম বস্তুগুলোও খেয়ে নেয়া বৈধ করেছেন এবং বলেছেন যে, যে ব্যক্তি নিরুপায় হয়ে যাবে এবং অবাধ্য-উচ্ছংখল ও সীমা অতিক্রমকারী না হবে তার জন্যে এই সব জিনিস খাওয়ায় কোন পাপ নেই। আল্লাহ তা'আলা ক্ষমাশীল, করুণাময় (আরবি) ও (আরবি) শব্দ দুটির তাফসীরে হযরত মুজাহিদ (রাঃ) বলেনঃ “এর ভাবার্থ হচ্ছে দস্যু, মুসলমান বাদশাহর উপর আক্রমণকারী, ইসলামী সাম্রাজ্যের বিরোধী এবং আল্লাহর অবাধ্যতায় ভ্রমণকারী। এদের জন্যে এই রকম নিরুপায় অবস্থাতেও হারাম বস্তু হারামই থাকবে। হযরত মুকাতিল বিন হিব্বান (রঃ) (আরবি)-এর তাফসীর এটাও করে থাকেন যে, সে ওকে হালাল মনে করে না এবং মনে ওর স্বাদ ও মজা গ্রহণের বাসনা রাখে না। ওকে মুখ রোচক রূপে ভাল করে রেধে খায় না। বরং যেন তেন করে শুধু প্রাণ বাঁচানোর জন্যেই খেয়ে থাকে। আর যদি সঙ্গে বেঁধে নেয়। তবে ততক্ষণ রাখতে পারে যতক্ষণ হালাল আহার্য প্রাপ্ত না হয়। যখনই হালাল আহার্য পেয়ে যাবে তখনই ওগুলোকে ফেলে দিতে হবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ওগুলো খুব পেট পুরে খাওয়া চলবে না। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, যে ব্যক্তিকে ওটা খাওয়ার জন্য বাধ্য করা হয় এবং তার স্বাধীন ক্ষমতা লোপ পায় তার জন্যেই এই হুকুম।

জিজ্ঞাস্য

একটি লোকে ক্ষুধার জ্বালায় খুবই কাতর হয়ে পড়েছে। এমন সময় সে একটি মৃত জীব দেখতে পেয়েছে এবং তার সম্মুখে অপরের একটি হালাল বস্তুও রয়েছে। যেখানে আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নতারও ভয় নেই এবং কোন কষ্টও নেই, এই অবস্থায় তাকে অপরের জিনিসটিই খেয়ে নিতে হবে, মৃত জীবটি খেতে হবে না। এবারে প্রশ্ন হচ্ছে এই যে, তাকে ঐ জিনিসটির মূল্য আদায় করতে হবে কি হবে না বা ঐ জিনিসটি তার দায়িত্বে থাকবে কি থাকবে? এই ব্যাপারে দু'টো উক্তি রয়েছে। একটি উক্তি হচ্ছে দায়িত্বে থাকা এবং অপরটি হচ্ছে দায়িত্বে না থাকা। ইবনে মাজাহর মধ্যে একটি হাদীস রয়েছে, হযরত আব্বাদ বিন শারজাবীল আনাযী (রাঃ) বর্ণনা করেনঃ ‘এক বছর আমাদের দেশে দুর্ভিক্ষ হয়। আমি মদীনা গমন করি এবং একটি ক্ষেতে ঢুকে কিছু শিষ ভেঙ্গে নেই ও ছিলে খেতে আরম্ভ করি। আর কিছু শিষ চাদরে বেঁধে নিয়ে চলতে থাকি। ক্ষেতের মালিক দেখে আমাকে ধরে নেয় এবং মেরে পিটে আমার চাদর কেড়ে নেয়। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে হাজির হয়ে তাকে আমার সমস্ত ঘটনা খুলে বলি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ লোকটিকে বলেনঃ তুমি এই ক্ষুধার্তকে খেতে দিলে, না তার জন্যে অন্য কোন চেষ্টা করলে, না তুমি তাকে বুঝালে বা শেখালে! এই বেচারা তো ক্ষুধার্ত ও মুর্থ ছিল। যাও, তার কাপড় তাকে ফিরিয়ে দাও এবং এক ওয়াসাক বা অধওয়াসাক (এক ওয়াসাকে প্রায় ৪মণ হয়) শস্য দিয়ে দাও।' গাছে লটকে থাকা খেজুর সম্বন্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞাসিত হলে তিনি বলেনঃ ‘অভাবী লোক যদি এখানে কিছু খায় কিন্তু বাড়ী নিয়ে না যায় তবে তার কোন অপরাধ নয়।' এও বর্ণিত আছে। যে, তিন গ্রাসের চেয়ে যেন বেশী না খায়। মোট কথা, এই অবস্থায় আল্লাহ , পাকের দয়া ও মেহেরবানীর কারণেই তার জন্যে এই হারামকে হালাল করা হয়েছে। হযরত মাসরূক (রঃ) বলেছেন যে, যে ব্যক্তি নিরুপায় হয়ে যায় অথচ হারাম জিনিস ভক্ষণ বা পান করে না, অতঃপর মারা-যায় সে দোযখী। এর দ্বারা জানা গেল যে, এরূপ অবস্থায় এরকম জিনিস খাওয়া অবশ্য কর্তব্য, শুধু যে খাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে তা নয়; এটাই সঠিক কথা। যেমন রুগ্ন ব্যক্তির রোযা ছেড়ে দেয়া ইত্যাদি।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।