সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 167)
হরকত ছাড়া:
وقال الذين اتبعوا لو أن لنا كرة فنتبرأ منهم كما تبرءوا منا كذلك يريهم الله أعمالهم حسرات عليهم وما هم بخارجين من النار ﴿١٦٧﴾
হরকত সহ:
وَ قَالَ الَّذِیْنَ اتَّبَعُوْا لَوْ اَنَّ لَنَا کَرَّۃً فَنَتَبَرَّاَ مِنْهُمْ کَمَا تَبَرَّءُوْا مِنَّا ؕ کَذٰلِکَ یُرِیْهِمُ اللّٰهُ اَعْمَالَهُمْ حَسَرٰتٍ عَلَیْهِمْ ؕ وَ مَا هُمْ بِخٰرِجِیْنَ مِنَ النَّارِ ﴿۱۶۷﴾
উচ্চারণ: ওয়া কা-লাল্লাযীনাত্তাবা‘ঊ লাও আন্না লানা-কাররাতান ফানাতাবাররাআ মিনহুম কামা-তাবাররাঊ মিন্না-কাযা-লিকা ইউরীহিমুল্লা-হু আ‘মা-লাহুম হাছারা-তিন ‘আলাইহিম; ওয়ামা-হুম বিখা-রিজীনা মিনান্না-র।
আল বায়ান: আর যারা অনুসরণ করেছে, তারা বলবে, ‘যদি আমাদের ফিরে যাওয়ার সুযোগ হত, তাহলে আমরা তাদের থেকে আলাদা হয়ে যেতাম, যেভাবে তারা আলাদা হয়ে গিয়েছে’। এভাবে আল্লাহ তাদেরকে তাদের আমলসমূহ দেখাবেন, তাদের জন্য আক্ষেপস্বরূপ। আর তারা আগুন থেকে বের হতে পারবে না।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৬৭.আর যারা অনুসরণ করেছিল তারা বলবে, ‘হায়! যদি একবার আমাদের ফিরে যাওয়ার সুযোগ হতো তবে আমরাও তাদের থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করতাম যেমন তারা আমাদের থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে’(১)। এভাবে আল্লাহ তাদের কার্যাবলী তাদেরকে দেখাবেন, তাদের জন্য আক্ষেপস্বরূপ(২)। আর তারা কখনো আগুন থেকে বহির্গমণকারী নয়।
তাইসীরুল ক্বুরআন: অনুসরণকারীরা বলবে, যদি কোনও প্রকারে আমাদের ফিরে যাবার সুযোগ ঘটত, তাহলে আমরাও তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতাম যেমনভাবে তারা সম্পর্ক ছিন্ন করল। এভাবে আল্লাহ তাদেরকে তাদের কাজগুলো দেখাবেন তাদের জন্য আক্ষেপরূপে এবং জাহান্নাম হতে তারা বের হতে পারবে না।
আহসানুল বায়ান: (১৬৭) অনুসারীরা বলবে, ‘হায়! যদি একটিবার (পৃথিবীতে) ফিরে যাবার সুযোগ আমাদের ঘটত, তাহলে আমরাও তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতাম যেমন তারা আমাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করল!’ এভাবে আল্লাহ তাদের কার্যাবলীকে তাদের পরিতাপরূপে দেখাবেন। আর তারা কখনও আগুন হতে বের হতে পারবে না।[1]
মুজিবুর রহমান: অনুসরণকারীরা বলবেঃ যদি আমরা ফিরে যেতে পারতাম তাহলে তারা যেরূপ আমাদেরকে প্রত্যাখ্যান করেছে আমরাও তদ্রুপ তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করতাম। এভাবে আল্লাহ তাদের কৃতকর্মের পরিণাম দুঃখজনকভাবে প্রদর্শন করবেন এবং তারা অগ্নি হতে উদ্ধার পাবেনা।
ফযলুর রহমান: আর অনুসারীরা বলবে, “হায়! আমরা যদি একবার (দুনিয়ায়) ফিরে যেতে পারতাম তাহলে তারা (অনুসৃত নেতারা) যেভাবে আমাদের দায় অস্বীকার করেছে তেমনি আমরাও তাদের দায় অস্বীকার করতাম। এভাবেই আল্লাহ তাদের কাজসমূহকে তাদের জন্যই আক্ষেপে পরিণত করবেন। তারা জাহান্নাম থেকে কখনো বের হবে না।
মুহিউদ্দিন খান: এবং অনুসারীরা বলবে, কতইনা ভাল হত, যদি আমাদিগকে পৃথিবীতে ফিরে যাবার সুযোগ দেয়া হত। তাহলে আমরাও তাদের প্রতি তেমনি অসন্তুষ্ট হয়ে যেতাম, যেমন তারা অসন্তুষ্ট হয়েছে আমাদের প্রতি। এভাবেই আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে দেখাবেন তাদের কৃতকর্ম তাদেরকে অনুতপ্ত করার জন্যে। অথচ, তারা কস্মিনকালেও আগুন থেকে বের হতে পারবে না।
জহুরুল হক: আর যারা অনুসরণ করেছিল তারা বলবে -- "হায়, আমরা যদি ফেরত পালা পেতাম তাহলে আমরা তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন করতাম, যেমন তারা আমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে।" এইভাবে আল্লাহ্ তাদের ক্রিয়াকলাপ তাদের দেখান তাদের জন্য তীব্র আক্ষেপরূপে। আর তারা আগুন থেকে বহিষ্কৃত হবে না।
Sahih International: Those who followed will say, "If only we had another turn [at worldly life] so we could disassociate ourselves from them as they have disassociated themselves from us." Thus will Allah show them their deeds as regrets upon them. And they are never to emerge from the Fire.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১৬৭.আর যারা অনুসরণ করেছিল তারা বলবে, ‘হায়! যদি একবার আমাদের ফিরে যাওয়ার সুযোগ হতো তবে আমরাও তাদের থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করতাম যেমন তারা আমাদের থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে’(১)। এভাবে আল্লাহ তাদের কার্যাবলী তাদেরকে দেখাবেন, তাদের জন্য আক্ষেপস্বরূপ(২)। আর তারা কখনো আগুন থেকে বহির্গমণকারী নয়।
তাফসীর:
(১) এ আয়াতে জাহান্নামবাসীদের মধ্যে নেতারা ও তাদের অনুসারীদের মধ্যে যে সমস্ত ঝগড়া-বিবাদ হবে সেটার কিছু কথোপকথন ও তাদের অনুতাপের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। পবিত্র কুরআনের অন্যান্য স্থানে এ বিষয়টি আরও বেশী করে বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন বলা হয়েছে, “আর যারা কুফরী করেছে তারা বলে, “আমরা এ কুরআনে কখনো বিশ্বাস করব না, এর পূর্ববতী কিতাবসমূহেও নয়। হায়! আপনি যদি দেখতেন যালিমদেরকে যখন তাদের রবের সামনে দাঁড় করানো হবে তখন তারা পরস্পর বাদ-প্রবিবাদ করতে থাকবে, যাদেরকে দুর্বল মনে করা হত তারা ক্ষমতাদর্পীদেরকে বলবে, তোমরা না থাকলে আমরা অবশ্যই মুমিন হতাম।
যারা ক্ষমতাদর্পী ছিল তারা, যাদেরকে দুর্বল মনে করা হত তাদের বলবে, ‘তোমাদের কাছে সৎপথের দিশা আসার পর আমরা কি তোমাদেরকে তা থেকে নিবৃত্ত করেছিলাম? বরং তোমরাই ছিলে অপরাধী। যাদেরকে দুর্বল মনে করা হত তারা ক্ষমতাদর্পীদেরকে বলবে, প্রকৃত পক্ষে তোমরাই তো দিনরাত চক্রান্তে লিপ্ত ছিলে, যখন তোমরা আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলে যেন আমরা আল্লাহর সাথে কুফর করি এবং তার জন্য সমকক্ষ (শির্ক) স্থাপন করি। আর যখন তারা শাস্তি দেখতে পাবে তখন তারা অনুতাপ গোপন রাখবে এবং যারা কুফরী করেছে আমরা তাদের গলায় শৃংখল পরাব। তাদেরকে তারা যা করত তারই প্রতিফল দেয়া হবে।” [সূরা সাবা: ৩১-৩৩]
(২) আবুল আলীয়াহ বলেন, তাদের খারাপ আমলসমূহ কিয়ামতের দিন তাদের জন্য আফসোস ও পরিতাপের কারণ হবে। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “সেদিন প্রত্যেকেই জান্নাতে তাদের ঘর এবং জাহান্নামে তাদের ঘরের দিকে তাকাবে। সেদিন হচ্ছে আফসোসের দিন। তিনি বলেন, জাহান্নামীরা জান্নাতে তাদের জন্য নির্দিষ্ট ঘরের দিকে তাকাবে তারপর তাদের বলা হবে, হায় যদি তোমরা এর জন্য আমল করতে। তখন তাদেরকে আফসোস পেয়ে বসবে। আর জান্নাতীরা জাহান্নামে তাদের জন্য নির্দিষ্ট তাদের ঘরের দিকে তাকাবে, তখন তাদের বলা হবে, যদি আল্লাহ তোমাদের উপর তার দয়া না করতেন তবে তো তোমরা সেখানকার অধিবাসীই হতে।” [মুস্তাদরাকে হাকিম: ৪/৪৯৬-৪৯৭]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১৬৭) অনুসারীরা বলবে, ‘হায়! যদি একটিবার (পৃথিবীতে) ফিরে যাবার সুযোগ আমাদের ঘটত, তাহলে আমরাও তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতাম যেমন তারা আমাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করল!’ এভাবে আল্লাহ তাদের কার্যাবলীকে তাদের পরিতাপরূপে দেখাবেন। আর তারা কখনও আগুন হতে বের হতে পারবে না।[1]
তাফসীর:
[1] আখেরাতে পীর ও গদিনশীন মাজারীদের অপারগতা ও বিশ্বাসঘাতকতা দেখে মুশকিরা আফসোস করবে, কিন্তু সেখানে তখন সে আফসোস ও অনুতাপের কোন ফল হবে না। হায়! দুনিয়াতেই যদি তারা শিরক থেকে তওবা করত! (তাহলে তারা মুক্তি পেয়ে যেত।)
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১৬৫ থেকে ১৬৭ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তা‘আলা নিজের এককত্বের অকাট্য দলিল পেশ করার পরও এক শ্রেণির মানুষ রয়েছে যারা তাঁর সাথে মনগড়া মা‘বূদের শরীক স্থাপন করে। তাদের সাথে ঐরূপ ভালবাসা পোষণ করে যেমন ভালবাসা আল্লাহ তা‘আলার সাথে হওয়া উচিত। এখানে তাদের কথাই তুলে ধরেছেন।
এ শির্কের ছড়াছড়ি কেবল তৎকালীন আরব সমাজেই বিদ্যমান ছিল না বরং বর্তমানেও অনেক নামধারী মুসলিম এ রোগে আক্রান্ত। গায়রুল্লাহ, পীর, ফকীর, মাজারগুলোকে কেবল নিজেদের ইবাদতখানা বানিয়েই নিয়ে ক্ষান্ত হয়নি, বরং তাদেরকে আল্লাহ তা‘আলার চেয়ে বেশি ভালবাসে। সেই সাথে তাদের সম্মান ও আনুগত্য এমনভাবে করে- যা আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া অন্য কেউ পাওয়ার হকদার নয়।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَاِذَا ذُکِرَ اللہُ وَحْدَھُ اشْمَاَزَّتْ قُلُوْبُ الَّذِیْنَ لَا یُؤْمِنُوْنَ بِالْاٰخِرَةِﺆ وَاِذَا ذُکِرَ الَّذِیْنَ مِنْ دُوْنِھ۪ٓ اِذَا ھُمْ یَسْتَبْشِرُوْنَ)
“এক আল্লাহর কথা বলা হলে যারা আখিরাতকে বিশ্বাস করে না তাদের অন্তর ঘৃণায় ভরে যায় এবং আল্লাহর পরিবর্তে (তাদের দেবতাগুলোর) উল্লেখ করা হলে তারা আনন্দিত হয়।” (সূরা যুমার ৩৯:৪৫)
কিন্তু মু’মিনদের অবস্থা সম্পূর্ণ বিপরীত। তারা আল্লাহ তা‘আলা-কে সর্বাধিক ভালবাসে।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
(ثَلَاثٌ مَنْ كُنَّ فِيهِ وَجَدَ بِهِنَّ حَلَاوَةَ الْإِيمَانِ، أَنْ يَكُونَ اللّٰهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا)
যে ব্যক্তির মাঝে তিনটি গুণ রয়েছে সে ব্যক্তি ঈমানের স্বাদ পেয়েছে, তার মধ্যে একটি হল- কেবল আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূল তার নিকট সবচেয়ে বেশি ভালবাসার পাত্র হওয়া। (সহীহ বুখারী হা: ১৬)
নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: যে ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত অন্যকে তাঁর সমকক্ষ হিসেবে আহ্বান করা অবস্থায় মারা যায়, সে জাহান্নামে যাবে। ইবনু মাসউদ (রাঃ) বলেন: আমি বললাম, আর যে ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলার সাথে কাউকে সমকক্ষ হিসেবে আহ্বান না করে মারা যায় সে জান্নাতে যাবে। (সহীহ বুখারী হা: ৪৪৯৭, সহীহ মুসলিম হা: ৯২)
(الَّذِیْنَ ظَلَمُوْٓا)
‘এবং যারা যুলুম করেছে’আয়াতে “যালিম” হল কাফিরগণ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَالْكَافِرُونَ هُمُ الظَّالِمُونَ)
কাফিররাই হলো যালেম। (সূরা বাকারাহ ২:২৫৪) [আযওয়াউল বায়ান ১ম খণ্ড, ৯২]
লুকমান (আঃ) তাঁর ছেলেকে বলেন-
(لَا تُشْرِكْ بِاللّٰهِ إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ)
“আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করো না। নিশ্চয়ই শির্ক তো মহা জুলুম।” (সূরা লুকমান ৩১:১৩)
যারা শির্ক করে নিজেদের প্রতি জুলুম করেছে তারা যদি জানত যখন শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে, আল্লাহ তা‘আলা সর্বশক্তিমান ও কঠোর শাস্তিদাতা তাহলে আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত অন্যান্য বাতিল মা‘বূদের ইবাদত করত না।
(إِذْ تَبَرَّأَ الَّذِينَ اتُّبِعُوْا)
অত্র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা জাহান্নামীদের পরস্পরে বিবাদের বিষয়ের দিকে ইশারা করেছেন। অন্যত্র তাদের বিবরণ তুলে ধরে বলেন:
(وَلَوْ تَرٰٓی اِذِ الظّٰلِمُوْنَ مَوْقُوْفُوْنَ عِنْدَ رَبِّھِمْﺊ یَرْجِعُ بَعْضُھُمْ اِلٰی بَعْضِ اۨلْقَوْلَﺆ یَقُوْلُ الَّذِیْنَ اسْتُضْعِفُوْا لِلَّذِیْنَ اسْتَکْبَرُوْا لَوْلَآ اَنْتُمْ لَکُنَّا مُؤْمِنِیْنَﭮقَالَ الَّذِیْنَ اسْتَکْبَرُوْا لِلَّذِیْنَ اسْتُضْعِفُوْٓا اَنَحْنُ صَدَدْنٰکُمْ عَنِ الْھُدٰی بَعْدَ اِذْ جَا۬ءَکُمْ بَلْ کُنْتُمْ مُّجْرِمِیْنَﭯوَقَالَ الَّذِیْنَ اسْتُضْعِفُوْا لِلَّذِیْنَ اسْتَکْبَرُوْا بَلْ مَکْرُ الَّیْلِ وَالنَّھَارِ اِذْ تَاْمُرُوْنَنَآ اَنْ نَّکْفُرَ بِاللہِ وَنَجْعَلَ لَھ۫ٓ اَنْدَادًا)
“তুমি যদি দেখতে যালিমদেরকে যখন তাদের প্রতিপালকের সামনে দণ্ডায়মান করা হবে, তখন তারা পরস্পর বাদ-প্রতিবাদ করতে থাকবে, দুর্বলেরা অহংকারীদেরকে বলবেঃ তোমরা না থাকলে আমরা অবশ্যই মু’মিন হতাম। অহংকারীরা দুর্বলদেরকে বলবেঃ তোমাদের নিকট সৎ পথের দিশা আসার পর আমরা কি তোমাদেরকে ওটা হতে নিবৃত্ত করেছিলাম? বস্তুতঃ তোমরাই তো ছিলে অপরাধী। দুর্বলেরা অহংকারীদেরকে বলবেঃ প্রকৃতপক্ষে তোমরাই তো দিবা-রাত্র চক্রান্তে লিপ্ত ছিলে, আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলে যেন আমরা আল্লাহকে অমান্য করি এবং তাঁর শরীক স্থাপন করি।”(সূরা সাবা ৩৪:৩১-৩৩) [আযওয়াউল বায়ান ১ম খণ্ড, ৯২]
আর সেদিন কারো সাথে কোন সম্পর্ক বহাল থাকবেনা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(یَوْمَ یَفِرُّ الْمَرْئُ مِنْ اَخِیْھِﭱﺫ وَاُمِّھ۪ وَاَبِیْھِﭲﺫ وَصَاحِبَتِھ۪ وَبَنِیْھِ)
“সেদিন মানুষ পলায়ন করবে তাঁর নিজের ভাই হতে, এবং তার মাতা, পিতা, স্ত্রী ও সন্তান হতে।”(সূরা আবাসা ৮০:৩৪-৩৬)
তবে যারা দুনিয়াতে আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করে চলত তাদের সম্পর্ক বহাল থাকবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(اَلْاَخِلَّا۬ئُ یَوْمَئِذٍۭ بَعْضُھُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ اِلَّا الْمُتَّقِیْنَ)
“বন্ধুরা সে দিন হয়ে যাবে একে অপরের শত্র“, তবে মুত্তাকীরা ব্যতীত।”(সূরা যুখরুফ ৪৩:৬৭)
কিয়ামত দিবসে খাজা, পীর, ফকীর ও কবরপূজারীদের অপারগতা ও বিশ্বাসঘাতকতা দেখে মুশরিকরা আফসোস করবে, কিন্তু সে আফসোস ও অনুতাপ কোন কাজে আসবে না। সকল আমল বরবাদ হয়ে যাবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(مَثَلُ الَّذِیْنَ کَفَرُوْا بِرَبِّھِمْ اَعْمَالُھُمْ کَرَمَادِ اۨشْتَدَّتْ بِھِ الرِّیْحُ فِیْ یَوْمٍ عَاصِفٍ)
“যারা তাদের প্রতিপালককে অস্বীকার করে তাদের কর্মসমূহের উপমা ভস্মসদৃশ যা ঝড়ের দিনের বাতাস প্রচণ্ড বেগে উড়িয়ে নিয়ে যায়।”(সূরা ইবরাহীম ১৪:১৮)
আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. উম্মাতে মুহাম্মাদীর কিছু লোক মূর্তিপূজায় লিপ্ত হয়ে যাবে।
২. আল্লাহ তা‘আলার ভালবাসা অন্যকে দেয়া শির্ক।
৩. কিয়ামাতের দিন অমুসলিমদের কোন সম্পর্ক উপকারে আসবে না।
৪. যারা শির্কযুক্ত আমল করবে তাদের আমল বিফলে যাবে।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১৬৫-১৬৭ নং আয়াতের তাফসীর
এই আয়াতসমূহে মুশরিকদের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক অবস্থা বর্ণনা করা হচ্ছে। তারা আল্লাহ তা'আলার অংশীদার স্থাপন করে থাকে এবং অন্যদেরকে তার সদৃশ স্থির করে থাকে। অতঃপর তাদের সাথে এমন আন্তরিক ভালবাসা স্থাপন করে যেমন ভালবাসা আল্লাহ তা'আলার সাথে স্থাপন করা উচিত ছিল। অথচ তিনিই প্রকৃত উপাস্য এবং তিনি এক। তিনি অংশীদার হতে সম্পূর্ণ রূপে পবিত্র। সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে রয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “আমি জিজ্ঞেস করি-হে আল্লাহর রাসূল! সবচেয়ে বড় পাপ কিতিনি বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলার সঙ্গে শিরক করা, অথচ সৃষ্টি তিনি একাই করেছেন। অতঃপর আস্লাহ বলেনঃ ‘আল্লাহ তা'আলার প্রতি মু'মিনদের প্রেম দৃঢ়তর হয়ে থাকে, অর্থাৎ তাদের অন্তর আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বের বিশ্বাসে পরিপূর্ণ থাকে। মহান আল্লাহ ছাড়া আর কারও সাথে তাদের এরূপ ভালবাসাও নেই এবং তারা আর কারও কাছে প্রার্থনাও করে না। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও কাছে তারা মস্তক অবনত করে -তার সাথে অন্য কাউকে অংশীদারও করে না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা ঐসব লোককে শাস্তির সংবাদ দিচ্ছেন যারা শিবুকের মাধ্যমে তাদের আত্মার উপর অত্যাচার করতেছে। যদি তারা শাস্তি অবলোকন করতো তবে তাদের অবশ্যই বিশ্বাস হতো যে, মহা ক্ষমতাবান তো একমাত্র আল্লাহ তা'আলাই। সমস্ত জিনিস তার অধীনস্থ এবং তাঁরই আজ্ঞাধীন। তার শাস্তিও খুব কঠিন। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “সেই দিন তার শাস্তির মত কেউ শাস্তিও দিতে পারে না এবং তাঁর পাকড়াও এর মত কেউ পাকড়াও করতে পারে না।
দ্বিতীয় ভাবার্থ এও হতে পারে যে, যদি ঐ দৃশ্য সম্বন্ধে তাদের জ্ঞান থাকতো তবে কখনও তারা ‘শিরক ও কুফর'কে আঁকড়ে থাকতো না। দুনিয়ায় যাদেরকে তারা তাদের নেতা মনে করে রেখেছিল, কিয়ামতের দিন ঐ নেতারা তাদের থেকে পৃথক হয়ে যাবে। ফেরেশতাগণ বলবেনঃ “হে আমাদের প্রভু! আমরা এদের প্রতি অসন্তুষ্ট। এরা আমাদের উপাসনা করতো না। হে আল্লাহ! আপনি পবিত্র এবং আপনিই আমাদের অভিভাবক। বরং এৱা জ্বিনদের উপাসনা করতো। এদের অধিকাংশই ওদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারী ছিল। অনুরূপভাবে জ্বিনরাও তাদের প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করবে এবং পরিষ্কারভাবে তাদের শত্রু হয়ে যাবে এবং তাদের ইবাদতকে অস্বীকার করবে। কুরআন মাজীদের মধ্যে অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)
অর্থাৎ ‘অতিসত্ত্বরই তারা তাদের ইবাদতকে অস্বীকার করবে এবং তারা তাদের শক্ত হয়ে যাবে।' (১৯৮২) হযরত ইবরাহীম (আঃ) কাফিরদের প্রতি যে উক্তি করেছিলেন কুরআন মাজীদে তা নকল করা হয়েছেঃ “তোমরা আল্লাহকে ছেড়ে মূর্তির ভালবাসা তোমাদের অন্তরে স্থান দিয়েছে এবং তাদের পূজা অর্চনা শুরু করে দিয়েছো অথচ কিয়ামতের দিন তারা তোমাদের উপাসনাকে অস্বীকার করে বসবে এবং তোমরা একে অপরের প্রতি লা'নত বর্ষণ করবে। তোমাদের ঠিকানা হবে জাহান্নাম এবং তোমাদের কোন সাহায্যকারী হবে না। এভাবেই অন্য জায়গায় রয়েছেঃ ‘অত্যাচারিরা তাদের প্রভুর সামনে দণ্ডায়মান অবস্থায় তাদের পরিচালকদেরকে বলবে-তোমরা না হলে আমরা ঈমানদার হয়ে যেতাম। তারা তখন উত্তরে বলবে আমরা কি তোমাদেরকে আল্লাহর ইবাদত হতে বিরত রেখেছিলাম। প্রকৃত ব্যাপার তো এই যে, তোমরা নিজেরাই পাপী ছিলে। তারা বলবে-তোমাদের রাত দিনের প্রতারণা, তোমাদের কুফরীপূর্ণ নির্দেশাবলী এবং তোমাদের শিরকের শিক্ষা আমাদেরকে প্রতারিত করেছে। এখন তারা শাস্তি দেখার পরে সবাই ভিতরে ভিতরে লজ্জিত হবে এবং তাদের কৃতকর্মের ফল স্বরূপ তাদের গলদেশে গলাবন্ধ পরিয়ে দেয়া হবে। অন্য স্থানে রয়েছেঃ ‘সেই শয়তানও বলবে, “নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের সঙ্গে সত্য অঙ্গীকার করেছিলেন। আর আমি তোমাদের সাথে অঙ্গীকার করেছি অতঃপর অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছি, তোমাদের উপর আমার কোন প্রভাবই ছিল না, বরং আমি তোমাদেরকে আহ্বান করেছি আর তোমরা তাতে সাড়া দিয়েছো। সুতরাং তোমরা আমাকে তিরস্কার করো না, বরং নিজেদেরকে তিরস্কার কর; না আমি তোমাদের সাহায্যকারী হতে পারি, না তোমরা আমার সাহায্যকারী হতে পার; আমি নিজেও তোমাদের এ কাজে অসন্তুষ্ট যে, তোমরা ইতিপূর্বে আমাকে (আল্লাহ) অংশীদার সাব্যস্ত করতে; নিশ্চয়ই অত্যাচারিদের জন্যে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি রয়েছে। তারপরে আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তারা শাস্তি দেখে নেবে এবং সমস্ত সম্বন্ধ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। পলায়নেরও কোন জায়গা থাকবে না এবং মুক্তিরও কোন পথ চোখে পড়বে না। বন্ধুত্ব কেটে যাবে এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন হবে। বিনা প্রমাণে যারা তাদের পরিচালকদের কথামত চলতো, তাদের প্রতি বিশ্বাস রাখতো এবং তাদের আনুগত্য স্বীকার করত, পূজা অর্চনা করতো, তারা যখন তাদের পরিচালক ও নেতাদেরকে দেখবে যে, তারা তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান করেছে, তখন তারা অত্যন্ত দুঃখ ও নৈরাশ্যের সাথে বলবে-যদি আমরা পুনরায় পৃথিবীতে ফিরে যেতে পারতাম তবে আমরাও ওদেরকে প্রত্যাখ্যান করতাম যেমন এরা আমাদেরকে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং আমরা এদের প্রতি কোন ক্ৰক্ষেপ করতাম না, এদের কথা মানতাম না এবং এদেরকে আল্লাহর অংশীদার সাব্যস্ত করতাম না। বরং খাটি অন্তরে এক আল্লাহর ইবাদত করতাম। অথচ প্রকৃতই যদি ফিরিয়ে দেয়া হয় তবুও তারা পূর্বে যা করেছিল তাই করবে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন (আরবি) অর্থাৎ যদি তাদেরকে ফিরিয়ে দেয়া হয় তবে অবশ্যই তারা ঐ কাজই করবে যা থেকে তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে।' (৬:২৮) এজন্যেই বলা হয়েছে তাদের কৃতকর্মসমূহ আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে দুঃখজনকভাবে প্রদর্শন করবেন। অর্থাৎ তাদের ভাল কর্ম যা কিছু ছিল সেগুলোও নষ্ট হয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা অন্যত্র বলেনঃ তাদের কৃতকর্মের অবস্থা ঐ ছাই এর মত যাঁকে ভীষণ ঝড়ের দিন বায়ু প্রবল বেগে উড়িয়ে নিয়ে যায়। অন্য স্থানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যারা কাফির হয়েছে তাদের কার্যাবলী যেন মরুভূমির মরীচিকা-পিপাসার্ত লোক যাকে পানি বলে মনে করে, কিন্তু ওর নিকটে গিয়ে কিছুই পায় না। তারপরে আল্লাহ তাআলা বলেন যে, তারা জাহান্নামের অগ্নি হতে উদ্ধার পাবে না। বরং তথায় তারা চিরকাল অবস্থান করবে।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।