সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 151)
হরকত ছাড়া:
كما أرسلنا فيكم رسولا منكم يتلو عليكم آياتنا ويزكيكم ويعلمكم الكتاب والحكمة ويعلمكم ما لم تكونوا تعلمون ﴿١٥١﴾
হরকত সহ:
کَمَاۤ اَرْسَلْنَا فِیْکُمْ رَسُوْلًا مِّنْکُمْ یَتْلُوْا عَلَیْکُمْ اٰیٰتِنَا وَ یُزَکِّیْکُمْ وَ یُعَلِّمُکُمُ الْکِتٰبَ وَ الْحِکْمَۃَ وَ یُعَلِّمُکُمْ مَّا لَمْ تَکُوْنُوْا تَعْلَمُوْنَ ﴿۱۵۱﴾ؕۛ
উচ্চারণ: কামাআরছালনা-ফীকুম রাছূলাম মিনকুম ইয়াতলূ‘আলাইকুম আ-য়া-তিনা-ওয়া ইউযাক্কীকুম ওয়া ইউ‘আলিলমুকুমুল কিতা-বা ওয়াল হিকমাতা ওয়া ইউ‘আলিলমুকুম মা-লাম তাকূনূতা‘লামূন।
আল বায়ান: যেভাবে আমি তোমাদের মধ্যে একজন রাসূল প্রেরণ করেছি তোমাদের মধ্য থেকে, যে তোমাদের কাছে আমার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করে, তোমাদেরকে পবিত্র করে এবং কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেয়। আর তোমাদেরকে শিক্ষা দেয় এমন কিছু যা তোমরা জানতে না।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৫১. যেমন আমরা তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের কাছে রাসূল পাঠিয়েছি(১) যিনি তোমাদের কাছে আমাদের আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করেন, তোমাদেরকে পরিশুদ্ধ করেন এবং কিতাব ও হেকমত শিক্ষা দেন। আর তা শিক্ষা দেন যা তোমরা জানতে না।
তাইসীরুল ক্বুরআন: যেমন (তোমরা আমার একটি অনুগ্রহ লাভ করেছ যে) আমি তোমাদেরই মধ্য হতে তোমাদের কাছে একজন রসূল পাঠিয়েছি, যে আমার আয়াতগুলো তোমাদেরকে পড়ে শুনায়, তোমাদেরকে শুদ্ধ করে, তোমাদেরকে কিতাব ও জ্ঞান-বিজ্ঞান (সুন্নাত) শিক্ষা দেয় এবং তোমাদেরকে এমন সব বিষয় শিক্ষা দেয় যা তোমরা জানতে না।
আহসানুল বায়ান: (১৫১) যেভাবে[1] আমি তোমাদের মধ্য হতে তোমাদেরই একজনকে রসূল করে পাঠিয়েছি, যে আমার আয়াত (বাক্য)সমূহ তোমাদের কাছে পাঠ করে, তোমাদেরকে (শিরক হতে) পবিত্র করে এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষা দেয়।
মুজিবুর রহমান: আমি তোমাদের মধ্য হতে এরূপ রাসূল প্রেরণ করেছি যে তোমাদের নিকট আমার নিদর্শনাবলী পাঠ করে এবং তোমাদেরকে পবিত্র করে, তোমাদেরকে গ্রন্থ ও বিজ্ঞান শিক্ষা দেয় এবং তোমরা যা অবগত ছিলেনা তা শিক্ষা দান করে।
ফযলুর রহমান: যেমন আমি তোমাদের মাঝে তোমাদের থেকেই একজন রসূল পাঠিয়েছি, যে তোমাদেরকে আমার আয়াতসমূহ পাঠ করে শোনায়, তোমাদেরকে পরিশুদ্ধ করে, তোমাদেরকে কিতাবের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা শিক্ষা দেয় এবং তোমরা যা জানতে না তোমাদেরকে তা জানিয়ে দেয়।
মুহিউদ্দিন খান: যেমন, আমি পাঠিয়েছি তোমাদেরই মধ্য থেকে তোমাদের জন্যে একজন রসূল, যিনি তোমাদের নিকট আমার বাণীসমুহ পাঠ করবেন এবং তোমাদের পবিত্র করবেন; আর তোমাদের শিক্ষা দেবেন কিতাব ও তাঁর তত্ত্বজ্ঞান এবং শিক্ষা দেবেন এমন বিষয় যা কখনো তোমরা জানতে না।
জহুরুল হক: যেমন, আমরা তোমাদের কাছে তোমাদের মধ্যে থেকে একজন রসূল পাঠিয়েছি, যিনি আমাদের বাণী তোমাদের কাছে তিলাওত করছেন, আর তোমাদের পবিত্র করছেন, আর তোমাদের ধর্মগ্রন্থ ও জ্ঞানবিজ্ঞান শিক্ষা দিচ্ছেন, আর তোমাদের শেখাচ্ছেন যা তোমরা জানতে না।
Sahih International: Just as We have sent among you a messenger from yourselves reciting to you Our verses and purifying you and teaching you the Book and wisdom and teaching you that which you did not know.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১৫১. যেমন আমরা তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের কাছে রাসূল পাঠিয়েছি(১) যিনি তোমাদের কাছে আমাদের আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করেন, তোমাদেরকে পরিশুদ্ধ করেন এবং কিতাব ও হেকমত শিক্ষা দেন। আর তা শিক্ষা দেন যা তোমরা জানতে না।
তাফসীর:
(১) এ পর্যন্ত কেবলা পরিবর্তন সংক্রান্ত আলোচনা চলে আসছিল। এখানে বিষয়টিকে এমন এক পর্যায়ে এনে সমাপ্ত করা হয়েছে, যাতে বিষয়টির ভূমিকায় কা’বা নির্মাতা ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর দো'আর বিষয়টিও প্রাসঙ্গিকভাবে আলোচিত হয়ে গেছে। অর্থাৎ ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর বংশধরদের মধ্যে এক বিশেষ মর্যাদায় মহানবী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আবির্ভাব। এতে এ বিষয়েও ইংগিত করা হয়েছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আবির্ভাবে কা'বা নির্মাতার দো'আরও একটা প্রভাব রয়েছে। কাজেই তার কেবলা যদি কা'বা শরীফকে সাব্যস্ত করা হয়, তাহলে তাতে বিস্ময়ের কিংবা অস্বীকারের কিছু নেই।
(كَمَا أَرْسَلْنَاكَ) বাক্যে উদাহরণসূচক যে ‘কাফ (ك) বর্ণটি ব্যবহার করা হয়েছে, তার একটি ব্যাখ্যা তো উল্লেখিত তাফসীরের মাধ্যমেই বুঝা গেছে। এছাড়াও আরেকটি বিশ্লেষণ রয়েছে, যা কুরতুবী গ্রহণ করেছেন। তা হলো এই যে, ‘কাফ’ এর সম্পর্ক হলো পরবর্তী আয়াত (فَاذْكُرُونِي) এর সাথে। অর্থাৎ আমি যেমন তোমাদের প্রতি কেবলাকে একটি নেয়ামত হিসাবে দান করেছি অতঃপর দ্বিতীয় নেয়ামত দিয়েছি রাসূলের আবির্ভাবের মাধ্যমে, তেমনি আল্লাহর যিকরও আরেকটি নেয়ামত। সুতরাং এসব নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় কর, যাতে এসব নেয়ামতের অধিকতর প্রবৃদ্ধি হতে পারে। [তাফসীরে মা'আরিফুল কুরআন]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১৫১) যেভাবে[1] আমি তোমাদের মধ্য হতে তোমাদেরই একজনকে রসূল করে পাঠিয়েছি, যে আমার আয়াত (বাক্য)সমূহ তোমাদের কাছে পাঠ করে, তোমাদেরকে (শিরক হতে) পবিত্র করে এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষা দেয়।
তাফসীর:
[1] كَمَا (যেভাবে) এর সম্পর্ক পূর্বের বক্তব্যের সাথে। অর্থাৎ, উক্ত অনুগ্রহের পরিপূর্ণতা এবং হিদায়াতের তওফীক তোমরা ঐভাবেই পেয়েছ, যেভাবে এর আগে তোমাদের মধ্য থেকে একজন রসূল প্রেরণ করা হয়েছে, যে তোমাদেরকে পবিত্র করে, তোমাদেরকে কিতাব ও প্রজ্ঞা শিক্ষা দেয় এবং এমন বিষয়ও শিক্ষা দেয় যা তোমরা জানতে না।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১৫১ ও ১৫২ নং আয়াতের তাফসীর:
১২৯ নং আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইবরাহীম (আঃ) দু‘আ করেছিলেন যাতে মক্কায় ইসমাঈলের বংশে একজন রাসূল আগমন করে। যিনি আল্লাহ তা‘আলার আয়াতসমূহ তেলাওয়াত করবেন, মানুষকে কুরআন ও সুন্নাহ শিক্ষা দেবেন এবং শির্ক ও অশালীন আচরণ থেকে পবিত্র করবেন। সে কথাই এ আয়াতে বলা হয়েছে। তারপর আল্লাহ তা‘আলা বলছেন, তোমরা আমাকে স্মরণ কর, আমি তোমাদেরকে স্মরণ করব। পবিত্র কুরআনে অনেক জায়গায় আল্লাহ তা‘আলার যিকির বা তাঁর স্মরণের কথা বলা হয়েছে।
তন্মধ্যে অন্যতম যেমন-
১. সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহ তা‘আলার যিকির বা স্মরণের কথা বলছেন-
(وَاذْكُرِ اسْمَ رَبِّكَ بُكْرَةً وَّأَصِيلًا)
“এবং তোমাদের প্রতিপালকের নাম স্মরণ কর সকাল-সন্ধ্যায়।”(সূরা দাহার ৭৬:২৫)
২. বেশি বেশি তাঁর যিকির বা স্মরণের কথা বলেন:
(وَاذْكُرْ رَبَّكَ كَثِيرًا وَّسَبِّحْ بِالْعَشِيِّ وَالْإِبْكَارِ)
“আর খুব বেশি করে তোমার রবের যিকির কর এবং সকাল-সন্ধ্যায় তার পবিত্রতা বর্ণনা কর।”(সূরা আলি-ইমরান ৩:৪১)
এরূপ অনেক আয়াত রয়েছে যেখানে আল্লাহ তা‘আলার যিকির বা স্মরণের কথা বলা হয়েছে।
তবে যিকির অর্থ এই নয় যে, কিছু লোক একত্রিত হয়ে সমস্বরে উচ্চকণ্ঠে হেলেদুলে এমনভাবে আওয়াজ করা যাতে মানুষ পাগল বলে। যেমন এ ব্যাপারে একটি বানোয়াট হাদীস উল্লেখ করা হয়:
أَكْثِرُوا ذِكْرَ اللّٰهِ حَتَّي يَقُولُوا مَجْنُونٌ
বেশি বেশি আল্লাহ তা‘আলার যিকির কর যেন মানুষ তোমাকে পাগল বলে। (সিলসিলা যঈফাহ হা: ৫১৭)
বরং সালাত একটি যিকির, সিয়াম একটি যিকির, তাসবীহ, তাহলীল, তাহমীদ ইত্যাদিসহ শরীয়তের সকল ইবাদত আল্লাহ তা‘আলার যিকির। এবং যিকির যে কিছুক্ষণের সাথে সম্পৃক্ত তা নয় বরং সর্বক্ষণ আল্লাহ তা‘আলার যিকির বা স্মরণ আবশ্যক। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(الَّذِیْنَ یَذْکُرُوْنَ اللہَ قِیٰمًا وَّقُعُوْدًا وَّعَلٰی جُنُوْبِھِمْ)
যারা দণ্ডায়মান, উপবেশন ও শায়িত অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে। (সূরা আলি-ইমরান ৩:১৯১)
এ যিকিরের ফযীলত সম্পর্কে সহীহ হাদীস রয়েছে। যেমন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন যে, আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
أَنَا عِنْدَ ظَنِّ عَبْدِي بِي، وَأَنَا مَعَهُ حِينَ يَذْكُرُنِي فَإِنْ ذَكَرَنِي فِي نَفْسِهِ ذَكَرْتُهُ فِي نَفْسِي، وَإِنْ ذَكَرَنِي فِي مَلَأٍ ذَكَرْتُهُ فِي مَلَأٍ خَيْرٍ مِنْهُ
আমি আমার বান্দার নিকট তেমন, যেমন সে আমাকে মনে করে এবং আমি তার সাথে থাকি যখন সে আমাকে স্মরণ করে। যদি আমাকে একাকি স্মরণ করে আমিও তাকে একাকি স্মরণ করি। আর যদি কোন সমাবেশে স্মরণ করে আমিও তাকে তার চেয়ে উত্তম সমাবেশে স্মরণ করি। (সহীহ বুখারী হা: ৭৪০৫)
আল্লাহ তা‘আলার স্মরণ করার অর্থ হল আল্লাহ তা‘আলা ক্ষমা করে দেবেন, উত্তম প্রতিদান দেবেন। (তাফসীর মুয়াসসার পৃঃ ২৩)
সাঈদ বিন যুবাইর বলেন: এর অর্থ হল আমার আনুগত্য ও ইবাদাতের মাধ্যমে স্মরণ কর আমি আমার ক্ষমার মাধ্যমে তোমাদের স্মরণ করব। অন্য বর্ণনায় রয়েছে রহমাতের মাধ্যমে স্মরণ করব। (তাফসীর ইবনে কাসীর ১/৪১৯)
এরপর আল্লাহ তা‘আলা তাঁর শুকরিয়া আদায় করার কথা বললেন আর কুফরী করতে নিষেধ করলেন। শুকরিয়া আদায় করার ফলাফল হল- আল্লাহ তা‘আলা অধিক বরকত দান করবেন:
(لَئِنْ شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ وَلَئِنْ كَفَرْتُمْ إِنَّ عَذَابِي لَشَدِيدٌ)
‘তোমরা কৃতজ্ঞ হলে তোমাদেরকে অবশ্যই বৃদ্ধি করে দেব, আর অকৃতজ্ঞ হলে অবশ্যই আমার শাস্তি হবে কঠোর।’(সূরা ইবরাহীম ১৪:৭)
আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের মত মাটির তৈরি মানুষ, নূরের তৈরি নন।
২. যতটুকু না জানলে ফরয ইবাদত করা যায় না কমপক্ষে ততটুকু জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেকের জন্য ফরয।
৩. সর্বাবস্থায় আল্লাহ তা‘আলাকে স্মরণ করা উচিত।
৪. নেয়ামতের কুফরী করা হারাম।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১৫১-১৫২ নং আয়াতের তাফসীর
এখানে আল্লাহ তাআলা তাঁর বিরাট দানের বর্ণনা দিচ্ছেন। সেই দান হচ্ছে এই যে, তিনি আমাদের মধ্যে আমাদেরই শ্রেণীভুক্ত এমন একজন নবী পাঠিয়েছেন যিনি আল্লাহ তা'আলার উজ্জ্বল গ্রন্থের নিদর্শনাবলী আমাদের সামনে পাঠ করে শুনাচ্ছেন, আমাদেরকে ঘৃণ্য অভাস, আত্মার দুষ্টামি এবং বর্বরোচিত কাজ হতে বিরত রাখছেন। আর আমাদেরকে কুফরের অন্ধকার হতে বের করে ঈমানের আলোকের পথে নিয়ে যাচ্ছেন। তিনি আমাদেরকে গ্রন্থ ও জ্ঞান বিজ্ঞান অর্থাৎ কুরআন ও হাদীস শিক্ষা দিচ্ছেন। তিনি আমাদের নিকট ঐ সব গুঢ় রহস্য প্রকাশ করে দিচ্ছেন যা আজ পর্যন্ত আমাদের নিকট প্রকাশ পায়নি। সুতরাং তারই কারণে ঐ সমুদয় লোক, যাদের উপর অজ্ঞতা ছেয়ে ছিল, বহু শতাব্দী ধরে যাদেরকে অন্ধকারে ঘিরে রেখেছিল, যাদের উপর দীর্ঘ দিন ধরে মঙ্গলের ছায়া পর্যন্ত পড়েনি, তারাই বড় বড় আল্লামা বনে গেছে। তারা জ্ঞানের গভীরতায়, কৃত্রিমতার স্বল্পতায়, অন্তরের পবিত্রতায় এবং কথার সত্যতায় তুলনা বিহীন খ্যাতি অর্জন করেছে। অন্য জায়গায় ইরশাদ হচ্ছেঃ (আরবি) অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা মুমিনদের উপর বিশেষ অনুগ্রহ করেছেন যে, তাদের মধ্যে এমন একজন রাসূল পাঠিয়েছেন যে তাদের নিকট তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করে থাকেন এবং তাদেরকে পবিত্র করে থাকেন।' (৩:১৬৪) অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ হে নবী (সঃ) তুমিও কি ওদেরকে দেখনি যারা আল্লাহর নিয়ামতের শুকরিয়া জ্ঞাপনের পরিবর্তে কুফরী করেছে এবং স্বীয় গোত্রকে ধ্বংসের গর্তে নিক্ষেপ করেছে ?' (১৪:২৮) এখানে আল্লাহর নিয়ামত'-এর ভাবার্থে হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। এজন্যেই এই আয়াতের মধ্যেও আল্লাহ তাআলা তাঁর নিয়ামতের বর্ণনা দিয়ে মু'মিনদেরকে তাঁর স্মরণের ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন এক জায়গায় তিনি বলেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ ‘তোমরা আমাকে স্মরণ কর, আমিও তোমাদেরকে স্মরণ করবো এবং তোমরা আমার প্রতি অকৃতজ্ঞ হয়ো না।' হযরত মূসা (আঃ) মহান আল্লাহর নিকট আরয করছেনঃ “হে আমার প্রভু! কিভাবে আমি আপনার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবো?' উত্তর হচ্ছেঃ ‘আমাকে স্মরণ রেখো, ভুলে যেও না, আমাকে স্মরণ করাই হচ্ছে আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা এবং আমাকে ভুলে যাওয়াই আমার সঙ্গে কুফরী করা। হযরত হাসান বসরী (রঃ) প্রভৃতি মনীষীর উক্তি এই যে, আল্লাহকে যে স্মরণ করে আল্লাহও তাকে স্মরণ করেন। তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারীকে তিনি আরও বেশী দান করেন এবং তাঁর প্রতি অকৃতজ্ঞকে তিনি শাস্তি দিয়ে থাকেন। পূর্বের মনীষীগণ হতে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহকে পূর্ণ ভয় করার অর্থ হচ্ছে তাঁর আনুগত্য স্বীকার করা, তাঁর বিরুদ্ধাচরণ না করা, তাঁকে ভুলে না যাওয়া, তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া এবং অকৃতজ্ঞ না হওয়া। হযরত আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) জিজ্ঞাসিত হচ্ছেনঃ “ব্যভিচারী, মদখোর, চোর এবং আত্মহত্যাকারীকেও কি আল্লাহ তাআলা স্মরণ করে থাকেন?” তিনি উত্তরে বলেনঃ হ’ অভিশাপের সাথে স্মরণ করেন।
হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, আমাকে স্মরণ কর’ অর্থাৎ আমার জরুরী নির্দেশাবলী পালন কর। আমি তোমাকে স্মরণ করবো।' অর্থাৎ আমার নিয়ামতসমূহ তোমাকে দান করবো। হযরত সাঈদ বিন যুবাইর (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে ‘আমি তোমাকে ক্ষমা করবো। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “তোমাদের আল্লাহকে স্মরণ করার চাইতে আল্লাহর তোমাদেরকে স্মরণ করা অনেক বড়। একটি কুদসী হাদীসে আছে যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যে আমাকে তার অন্তরে স্মরণ করে, আমিও তাকে আমার অন্তরে স্মরণ করি এবং যে আমাকে কোন দলের মধ্যে স্মরণ করে, আমিও তাকে ওর চেয়ে উত্তম দলের মধ্যে স্মরণ করি।'
মুসনাদে আহমাদের মধ্যে রয়েছে যে, ঐটি হচ্ছে ফেরেশতাদের দল। হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে আদমের সন্তান! যদি তুমি আমার দিকে কনিষ্ঠাঙ্গুলি পরিমিত স্থান অগ্রসর হও তবে আমি তোমার দিকে এক হাত অগ্রসর হবো। যদি তুমি আমার দিকে এক হাত অগ্রসর হও তবে আমি তোমার দিকে দুই হাত অগ্রসর হবো, আর যদি তুমি আমার দিকে হেঁটে হেঁটে আস তবে আমি তোমার দিকে দৌড়িয়ে আসবো। সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যেও এ হাদীসটি হযরত কাতাদাহ। (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন যে, আল্লাহ তা'আলার দয়া এর চেয়েও অধিক নিকটে রয়েছে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর, অকৃতজ্ঞ হয়ো না। অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)
অর্থাৎ “তোমাদের প্রভু সাধারণভাবে সংবাদ দিয়েছেন যে, যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর তবে তোমাদেরকে আরো বেশী দেবো, আর যদি কৃতঘ্ন হও তবে জেনে রেখো যে, নিশ্চয় আমার শাস্তি অত্যন্ত কঠিন।' (১৪:৭) মুসনাদে আহমাদের মধ্যে রয়েছে যে, হযরত ইমরান বিন হোসাইন (রাঃ) একদা অতি মূল্যবান ‘হুল্লা” অর্থাৎ লুঙ্গি ও চাদর পরিধান করে আসেন এবং বলেনঃ যখন আল্লাহ তা'আলা কাউকে কোন পুরস্কার দেন তখন তিনি ওর চিহ তার নিকট দেখতে চান।'
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।