আল কুরআন


সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 141)

সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 141)



হরকত ছাড়া:

تلك أمة قد خلت لها ما كسبت ولكم ما كسبتم ولا تسألون عما كانوا يعملون ﴿١٤١﴾




হরকত সহ:

تِلْکَ اُمَّۃٌ قَدْ خَلَتْ ۚ لَهَا مَا کَسَبَتْ وَ لَکُمْ مَّا کَسَبْتُمْ ۚ وَ لَا تُسْـَٔلُوْنَ عَمَّا کَانُوْا یَعْمَلُوْنَ ﴿۱۴۱﴾




উচ্চারণ: তিলকা উম্মাতুন কাদ খালাত লাহা-মা-কাছাবাত ওয়া লাকুম মা-কাছাব তুম ওয়ালা-তুছআলূনা ‘আম্মা-কা-নূ ইয়া‘মালূন।




আল বায়ান: সেটা ছিল একটি উম্মত, যারা বিগত হয়েছে। তারা যা অর্জন করেছে, তা তাদের জন্য আর তোমরা যা অর্জন করেছ তা তোমাদের জন্য। আর তারা যা করত, সে সম্পর্কে তোমাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে না।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৪১. তারা এমন এক উম্মাত, যারা অতীত হয়ে গেছে। তারা যা অর্জন করেছে তা তাদের। আর তোমরা যা অর্জন করেছে তা তোমাদের। তারা যা করত সে সম্পর্কে তোমাদেরকে কোন প্রশ্ন করা হবে না।




তাইসীরুল ক্বুরআন: এ সব লোক যারা ছিল, তারা গত হয়ে গেছে, তাদের জন্য তাদের কামাই আর তোমাদের জন্য তোমাদের কামাই আর তারা যা করত সে সম্পর্কে তোমাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে না।




আহসানুল বায়ান: ১৪১। সে এক উম্মত (দল) ছিল, যা অতীত হয়ে গেছে। তারা যা অর্জন করেছে তা তাদের, তোমরা যা অর্জন করেছ, তা তোমাদের। তারা যা করত, সে সম্বন্ধে তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে না। [1]



মুজিবুর রহমান: ওটা একটি জামা‘আত ছিল যা বিগত হয়েছে; তারা যা অর্জন করেছে তা তাদের জন্য এবং তোমরা যা অর্জন করেছ তা তোমাদের জন্য, এবং তারা যা করে গেছে তদ্বিষয়ে তোমরা জিজ্ঞাসিত হবেনা।



ফযলুর রহমান: এরা ছিল এক জাতি যারা অতিক্রান্ত হয়েছে। তারা যা উপার্জন করেছে তা তাদের, আর তোমরা যা উপার্জন করছ তা তোমাদের। তারা যা করত সে সম্পর্কে তোমাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে না।



মুহিউদ্দিন খান: তার চাইতে অত্যাচারী কে, যে আল্লাহর পক্ষ থেকে তার কাছে প্রমাণিত সাক্ষ্যকে গোপন করে? আল্লাহ তোমাদের কর্ম সম্পর্কে বেখবর নন। সে সম্প্রদায় অতীত হয়ে গেছে। তারা যা করেছে, তা তাদের জন্যে এবং তোমরা যা করছ, তা তোমাদের জন্যে। তাদের কর্ম সম্পর্কে তোমাদের জিজ্ঞেস করা হবে না।



জহুরুল হক: এরা ঐসব লোক যারা গত হয়ে গেছে। তাদের জন্য আছে যা তারা অর্জন করেছিল, আর তোমাদের জন্য যা তোমরা অর্জন করছ, আর তোমাদের জবাবদিহি করতে হবে না ওরা যা করছিল সে-সন্বন্ধে।



Sahih International: That is a nation which has passed on. It will have [the consequence of] what it earned, and you will have what you have earned. And you will not be asked about what they used to do.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১৪১. তারা এমন এক উম্মাত, যারা অতীত হয়ে গেছে। তারা যা অর্জন করেছে তা তাদের। আর তোমরা যা অর্জন করেছে তা তোমাদের। তারা যা করত সে সম্পর্কে তোমাদেরকে কোন প্রশ্ন করা হবে না।


তাফসীর:

-


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: ১৪১। সে এক উম্মত (দল) ছিল, যা অতীত হয়ে গেছে। তারা যা অর্জন করেছে তা তাদের, তোমরা যা অর্জন করেছ, তা তোমাদের। তারা যা করত, সে সম্বন্ধে তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে না। [1]


তাফসীর:

[1] এই আয়াতে আবারও আমলের গুরুত্ব বর্ণনা করে বলা হয়েছে যে, বুযুর্গদের সাথে সম্পর্ক জুড়ে এবং তাঁদের উপর ভরসা করে কোন লাভ নেই। কারণ, (وَمَنْ بَطَّأَ بِهِ عَمَلُهُ لَمْ يُسْرِعْ بِهِ نَسَبُهُ ) যার কার্যকলাপ তাকে পিছিয়ে দেয়, তার বংশমর্যাদা তাকে এগিয়ে দিতে পারবে না। (মুসলিম, অধ্যায়ঃ যিকর ও দু'আ, পরিচ্ছেদঃ তেলাঅতে কুরআনের জন্য একত্রিত হওয়ার ফযীলত) অর্থাৎ, পূর্বপুরুষদের নেকী দ্বারা তোমাদের কোন লাভ হবে না এবং তাঁদের পাপের কারণে তোমাদেরকে পাকড়াও হবে না। তাঁদের কৃতকর্মের কারণে তোমাদেরকে এবং তোমাদের কৃতকর্মের জন্য তাঁদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না।

{وَلا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى} কেউ অপরের বোঝা বহন করবে না। (সূরা ফাত্বির ১৮ আয়াত) {وَأَنْ لَيْسَ لِلْإِنْسَانِ إِلَّا مَا سَعَى} আর মানুষ তাই পায়, যা সে করে। (সূরা নাজম ৩৯ আয়াত)


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ১৩৯ থেকে ১৪১ নং আয়াতের তাফসীর:



المحاجة বলা হয় المجادلة বা বাদানুবাদ। যা দু’বা তার বেশি লোকের মাঝে হয়ে থাকে। যেখানে কোন মতবিরোধপূর্ণ মাসআলা নিয়ে উভয় দলে বিবাদ হলে একপক্ষ বিরোধী পক্ষকে পরাজিত করার জন্য নিজের দলীল ও মতামতকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার আপ্রাণ প্রয়াস চালায়।



অত্র আয়াতে এমনি একটি বিষয় আলোচনা করা হয়েছে, আহলে কিতাবগণ বিশ্বাস করে যে, আমরাই মুসলিমদের থেকে আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্য অর্জনে বেশি হকদার। তিনি আমাদেরই প্রতিপালক।



আল্লাহ তা‘আলা তাদের দাবি খণ্ডন করে রাসূলুলাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলেন যে, বল: তিনি তোমাদের প্রতিপালক এবং আমাদেরও প্রতিপালক। অতএব এতে ঝগড়া করার কিছুই নেই। কিন্তু তোমরা যা কিছু কর তার ফলাফল তোমরাই পাবে আর আমরা যা কিছু করছি তারও ফলাফল আমরাই পাব। আমরা এক আল্লাহ তা‘আলার ওপর বিশ্বাসী, তাঁর সাথে কোন অংশী স্থাপন করি না।



১৪০ নং আয়াত এটা তাদের আরেকটি দাবি যে, ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়া‘কূব ও অন্যান্য নাবীগণ সবাই ইয়াহূদী বা খ্রিস্টান ছিলেন। আল্লাহ তা‘আলা তাদের প্রতিবাদে উত্তর দিচ্ছেন,



(مَا کَانَ اِبْرٰھِیْمُ یَھُوْدِیًّا وَّلَا نَصْرَانِیًّا وَّلٰکِنْ کَانَ حَنِیْفًا مُّسْلِمًاﺚ وَمَا کَانَ مِنَ الْمُشْرِکِیْنَ)



“ইবরাহীম ইয়াহূদী বা খ্রিস্টান ছিলেন না, বরং তিনি একনিষ্ঠ মুসলিম ছিলেন। আর তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্তও ছিলেন না।”(সূরা আল ইমরান ৩:৬৭)



যাদের ন্যূনতম জ্ঞান রয়েছে তারাও জানে যে, ইবরাহীম (আঃ) ও অন্যান্য নাবীরা ইয়াহূদী বা খ্রিস্টান ছিলেন না। তারা এ জ্ঞান ও সাক্ষ্য গোপন করেছে। তাই আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنْ كَتَمَ شَهَادَةً عِنْدَه۫ مِنَ اللّٰهِ) “আল্লাহর নিকট হতে প্রাপ্ত সাক্ষ্য যে ব্যক্তি গোপন করছে তার চেয়ে বেশি অত্যাচারী আর কে আছে?” (সূরা বাকারাহ ২:১৪০) তাই তাদের দাবি প্রত্যাখ্যাত। তারা যা কিছু করে আল্লাহ তা‘আলা সকল বিষয়ে অবগত আছেন। ১৪১ নং আয়াতের তাফসীর ১৩৪ নং আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. ইবাদতের ক্ষেত্রে ইখলাস তথা একনিষ্ঠতার ফযীলত অপরিসীম।

২. প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার আমলের প্রতিদান দেয়া হবে, অন্যের আমলের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে না, যদি না সে অন্যের আমলের কারণ হয়ে থাকে।

৩. ইয়াহূদীবাদ ও খ্রিস্টবাদ তাদের নিজেদের তৈরি করা মতবাদ।

৪. কোন প্রকার সাক্ষ্য বিশেষ করে আল্লাহ তা‘আলার ব্যাপারে সাক্ষ্য গোপন করা হারাম।

৫. ইবরাহীম (আঃ)-সহ সকল নাবী ইসলাম ধর্মের অনুসারী ছিলেন।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ১৩৯-১৪১ নং আয়াতের তাফসীর

বিশ্ব প্রভু স্বীয় নবী (সঃ)কে মুশরিকদের ঝগড়া বিদুরিত করতে নির্দেশ দিচ্ছেন। আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবী (সঃ)কে বলছেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি মুশরিকদেরকে বলঃ “হে মুশরিকের দল! তোমরা আমাদের সাথে আল্লাহ তা'আলার একত্ববাদ, অকৃত্রিমতা, আনুগত্য ইত্যাদির ব্যাপারে বিবাদ করছে। কেন? তিনি তো শুধু আমাদের প্রভু নন বরং তোমাদেরও প্রভু। তিনি তো আমাদের ও তোমাদের উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান এবং তিনি আমাদের সবারই ব্যবস্থাপক। আমাদের কাজের প্রতিদান আমাদেরকে দেয়া হবে। আমরা তোমাদের প্রতি এবং তোমাদের শিকের প্রতি অসন্তুষ্ট।' কুরআন মাজীদের অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “এরা যদি তোমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে তবে বলে দাওআমার জন্যে আমার কাজ এবং তোমাদের জন্যে তোমাদের কাজ, তোমরা আমার (সৎ) কাজের প্রতি অসন্তুষ্ট এবং আমিও তোমাদের (অসৎ) কাজের প্রতি অসন্তুষ্ট।' অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “এরা যদি তোমার সঙ্গে ঝগড়া করে তবে তাদেরকে বলে দাও-আমি ও আমার অনুসারীরা আমাদের মুখমণ্ডল আল্লাহর দিকে ঝুঁকিয়ে দিলাম।' হযরত ইবরাহীম (আঃ)ও তার গোত্রের লোককে এ কথাই বলেছিলেনঃ “তোমরা কি আমার সঙ্গে আল্লাহ তা'আলার ব্যাপারে ঝগড়া করছো?' অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “হে নবী (সঃ!) তুমি কি তাকে দেখনি যে ইবরাহীম (আঃ)-এর সঙ্গে তার প্রভুর ব্যাপারে ঝগড়া করছিল? সুতরাং এখানে ঐ বিবাদীদেরকে বলা হচ্ছেঃ আমাদের কাজ আমাদের জন্যে এবং তোমাদের কাজ তোমাদের জন্যে। আমরা তোমাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে তোমাদের হতে পৃথক হয়ে গেলাম। আমরা একাগ্রচিত্তে আল্লাহর ইবাদতে লিপ্ত হয়ে পড়বো।' অতঃপর ঐ সব লোকের দাবী খণ্ডন করা হচ্ছে যে, ইবরাহীম (আঃ) ইয়াহূদীও ছিলেন না এবং খ্রীষ্টানও ছিলেন না। কাজেই হে ইয়াহুদী ও খৃষ্টানের দল! তোমরা এসব কথা বানিয়ে বলছো কেন? বলা হচ্ছে যে, তোমাদের জ্ঞান কি আল্লাহ তাআলার চেয়েও বেড়ে গেল? আল্লাহ তাআলা তো পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করছেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ হযরত ইবরাহীম (আঃ) ইয়াহুদীও ছিল না এবং খ্রীষ্টানও ছিল না। বরং সুদৃঢ় মুসলমান ছিল এবং সে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না।' (৩:৬৭) আল্লাহ্ তা'আলার সাক্ষ্যকে গোপন করে তাদের বড় অত্যাচার করা এই ছিল যে, তাদের নিকট আল্লাহ তা'আলা যে কিতাব অবতীর্ণ করেছিলেন তা তারা পড়েছিল এবং জানতে পেরেছিল যে, ইসলামই প্রকৃত ধর্ম ও মুহাম্মদ (সঃ) তাঁর সত্য রাসূল। এটা জেনেও তারা তা গোপন করেছিল। ইবরাহীম (আঃ), ইসমাঈল (আঃ), ইসহাক (আঃ), ইয়াকুব (আঃ) প্রভৃতি সবাই ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টান ধর্ম হতে সম্পূর্ণরূপে পৃথক ছিলেন। কিন্তু তারা তা স্বীকার করেনি। শুধু তাই নয়, বরং এই কথাকেই তারা গোপন করেছিল। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তাদের কাজ তার নিকট গোপন নেই। তার ইলম' সব জিনিসকেই ঘিরে রয়েছে। তিনি প্রত্যেক ভাল ও মন্দ কাজের পূর্ণ প্রতিদান দেবেন।

এই ধমক দেয়ার পর আল্লাহ বলেন যে, ঐ সব মহা মানব তো তাঁর নিকট পৌছে গেছে। এখন যদি তোমরা তাদের পদাংক অনসুরণ না কর, তবে তোমরা তাঁদের বংশধর হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ তা'আলার নিকট তোমাদের কোনই সম্মান নেই। আর তোমাদের অসৎ কাজের বোঝাও তাদেরকে বইতে হবে না। তোমরা যখন এক নবীকে অস্বীকার করছে তখন যেন সমস্ত নবীকেই অস্বীকার করছে। বিশেষ করে তোমরা শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সঃ)-এর যুগে বাস করেও তাকে অস্বীকার করছে। যিনি হচ্ছেন সমস্ত নবীর নেতা। যাকে সমস্ত দানবও মানবের নিকট নবী করে পাঠানো হয়েছে। সুতরাং তার রিসালাতকে মেনে নেয়া প্রত্যেকের উপর বাধ্যতামূলক করে দেয়া হয়েছে। তাঁর উপর ও অন্যান্য সমস্ত নবীর উপরও আল্লাহ তা'আলার দুরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।