আল কুরআন


সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 130)

সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 130)



হরকত ছাড়া:

ومن يرغب عن ملة إبراهيم إلا من سفه نفسه ولقد اصطفيناه في الدنيا وإنه في الآخرة لمن الصالحين ﴿١٣٠﴾




হরকত সহ:

وَ مَنْ یَّرْغَبُ عَنْ مِّلَّۃِ اِبْرٰهٖمَ اِلَّا مَنْ سَفِهَ نَفْسَهٗ ؕ وَ لَقَدِ اصْطَفَیْنٰهُ فِی الدُّنْیَا ۚ وَ اِنَّهٗ فِی الْاٰخِرَۃِ لَمِنَ الصّٰلِحِیْنَ ﴿۱۳۰﴾




উচ্চারণ: ওয়া মাইঁ ইয়ারগাবু‘আম মিল্লাতি ইবরা-হীমা ইল্লা-মান ছাফিহা নাফছাহু ওয়ালাকাদিসতাফাইনা-হু ফিদ্দুনইয়া-ওয়া ইন্নাহূ ফিল আ-খিরাতি লামিনাসসা-লিহীন।




আল বায়ান: আর যে নিজকে নির্বোধ বানিয়েছে, সে ছাড়া কে ইবরাহীমের আদর্শ থেকে বিমুখ হতে পারে? আর অবশ্যই আমি তাকে দুনিয়াতে বেছে নিয়েছি এবং নিশ্চয় সে আখিরাতে নেককারদের অন্তর্ভুক্ত থাকবে।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৩০. আর যে নিজেকে নির্বোধ করেছে সে ছাড়া ইবরাহীমের মিল্লাত হতে আর কে বিমুখ হবে! দুনিয়াতে তাকে আমরা মনোনীত করেছি; আর আখেরাতেও তিনি অবশ্যই সৎকর্মশীলদের অন্যতম।




তাইসীরুল ক্বুরআন: সেই নির্বোধ ছাড়া অন্য এমন কে আছে যে মিল্লাতে ইব্রাহীম হতে ফিরে যাবে এবং নিশ্চয় আমি তাকে পছন্দ করেছি এবং আখেরাতেও সে নেককারদের অন্তর্গত হবে।




আহসানুল বায়ান: ১৩০। যে নিজেকে নির্বোধ করেছে সে ছাড়া ইব্রাহীমের ধর্মাদর্শ হতে আর কে বিমুখ হবে? পৃথিবীতে তাকে আমি মনোনীত করেছি; পরকালেও সে সৎ কর্মপরায়ণদের অন্যতম। [1]



মুজিবুর রহমান: এবং যে নিজকে নির্বোধ করে তুলেছে সে ব্যতীত কে ইবরাহীমের ধর্ম হতে বিমুখ হবে? এবং নিশ্চয়ই আমি তাকে এই পৃথিবীতে মনোনীত করেছিলাম, নিশ্চয়ই সে সৎ কর্মশীলগণের অন্তর্ভুক্ত ছিল।



ফযলুর রহমান: আত্মবিস্মৃত ব্যক্তি ছাড়া আর কে ইবরাহীমের ধর্ম থেকে বিমুখ হতে পারে? আমিই তো তাকে পৃথিবীতে মনোনীত করেছিলাম। আর পরকালেও সে অবশ্যই সৎ লোকদের মধ্যে গণ্য হবে।



মুহিউদ্দিন খান: ইব্রাহীমের ধর্ম থেকে কে মুখ ফেরায়? কিন্তু সে ব্যক্তি, যে নিজেকে বোকা প্রতিপন্ন করে। নিশ্চয়ই আমি তাকে পৃথিবীতে মনোনীত করেছি এবং সে পরকালে সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত।



জহুরুল হক: আর যে ইব্রাহীমের ধর্মমত থেকে অপসৃত হয় সে ছাড়া আর কে নিজেকে নির্বোধ বানায়? আর অবশ্যই আমরা তাঁকে এই দুনিয়াতে মনোনীত করেছিলাম, আর নিঃসন্দেহে তিনি আখেরাতে হবেন ধার্মিকদের অন্যতম।



Sahih International: And who would be averse to the religion of Abraham except one who makes a fool of himself. And We had chosen him in this world, and indeed he, in the Hereafter, will be among the righteous.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১৩০. আর যে নিজেকে নির্বোধ করেছে সে ছাড়া ইবরাহীমের মিল্লাত হতে আর কে বিমুখ হবে! দুনিয়াতে তাকে আমরা মনোনীত করেছি; আর আখেরাতেও তিনি অবশ্যই সৎকর্মশীলদের অন্যতম।


তাফসীর:

-


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: ১৩০। যে নিজেকে নির্বোধ করেছে সে ছাড়া ইব্রাহীমের ধর্মাদর্শ হতে আর কে বিমুখ হবে? পৃথিবীতে তাকে আমি মনোনীত করেছি; পরকালেও সে সৎ কর্মপরায়ণদের অন্যতম। [1]


তাফসীর:

[1] আরবী ভাষায় رَغِبَ শব্দের সাথে عَنْ অব্যয় যুক্ত হলে তার অর্থ দাঁড়ায় মুখ ফিরিয়ে নেওয়া বা বিমুখ হওয়া। এখানে মহান আল্লাহ ইবরাহীম (আঃ)-এর মর্যাদা ও তাঁর বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করছেন, যা তিনি তাঁকে দুনিয়া ও আখেরাতে দান করেছেন এবং এ কথাও পরিষ্কার করে দিচ্ছেন যে, ইবরাহীম (আঃ)-এর ধর্ম থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া বোকামি ছাড়া কিছুই নয়। কোন জ্ঞানীজন থেকে এটা কল্পনাও করা যায় না।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ১৩০ থেকে ১৩৪ নং আয়াতের তাফসীর:



এ আয়াতগুলোতে মুশরিকদের দাবি খণ্ডন করা হয়েছে। তারা নিজেদেরকে ইবরাহীম (আঃ)-এর ধর্মের অনুসারী বলে দাবি করত। অথচ তারা পূর্ণ মুশরিক ছিল। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: ইবরাহীম (আঃ) তো তাওহীদ মান্যকারীদের ইমাম ছিলেন। তিনি তাওহীদকে শির্ক হতে পৃথককারী ছিলেন। বরং তিনি প্রত্যেক অংশীবাদীকে ও শির্ককে এবং কৃত্রিম মা‘বূদকে আন্তরিকভাবে ঘৃণা করতেন এবং তাদের প্রতি অসস্তুষ্ট ছিলেন। আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:



(قُلْ اِنَّنِیْ ھَدٰنِیْ رَبِّیْٓ اِلٰی صِرَاطٍ مُّسْتَقِیْمٍﹰ دِیْنًا قِیَمًا مِّلَّةَ اِبْرٰھِیْمَ حَنِیْفًاﺆ وَمَا کَانَ مِنَ الْمُشْرِکِیْنَ)



“বল, ‘আমার প্রতিপালক তো আমাকে সৎপথে পরিচালিত করেছেন। তা সুপ্রতিষ্ঠিত দীন, ইবরাহীমের ধর্মাদর্শ, সে ছিল একনিষ্ঠ এবং সে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না।”(সূরা আন‘আম ৬:১৬১)



অত্র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বর্ণনা করে দিলেন, মিল্লাতে ইবরাহীম হল দীন ইসলাম যা দিয়ে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে প্রেরণ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(ثُمَّ أَوْحَيْنَآ إِلَيْكَ أَنِ اتَّبِعْ مِلَّةَ إِبْرَاهِيمَ)



“এখন আমি তোমার প্রতি প্রত্যাদেশ করলাম, ‘তুমি একনিষ্ঠ ইব্রাহীমের ধর্মাদর্শ অনুসরণ কর। (সূরা নাহল ১৬:১২৩)



সুতরাং যারা ইবরাহীম (আঃ)-এর এ তাওহীদী মিল্লাত থেকে বিমুখ হবে তারা নির্বোধ ছাড়া কিছুই নয়।



রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইবরাহীম (আঃ)-এর শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ব বর্ণনা করেছেন যে, তাকে দুনিয়াতে নির্বাচিত বান্দাদের আর আখিরাতে সৎ বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।



আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে যখনই আনুগত্যের নির্দেশ দিয়েছেন তখনই তিনি তা যথাযথভাবে পালন করেছেন।



ইবরাহীম (আঃ) ও ইয়াকুব (আঃ) তাদের পরবর্তী বংশধরদের যে দীনের ওসীয়ত করে গেছেন তা কোন ইয়াহূদী ধর্ম নয়, কোন নাসরানী ধর্মও নয়। তা হল একমাত্র ইসলাম। এ ব্যাপারে কুরআনে অনেক আয়াত বিদ্যমান। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(اِنَّ الدِّیْنَ عِنْدَ اللہِ الْاِسْلَامُﺤ وَمَا اخْتَلَفَ الَّذِیْنَ اُوْتُوا الْکِتٰبَ اِلَّا مِنْۭ بَعْدِ مَا جَا۬ءَھُمُ الْعِلْمُ بَغْیًۭا بَیْنَھُمْﺚ وَمَنْ یَّکْفُرْ بِاٰیٰتِ اللہِ فَاِنَّ اللہَ سَرِیْعُ الْحِسَابِ)



“নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে মনোনীত জীবন-বিধান হচ্ছে ইসলাম। আর আহলে কিতাবরা তাদের কাছে জ্ঞান আসার পর কেবল পরস্পরে বিদ্বেষবশতঃ মতভেদ করেছে। আর যে আল্লাহর আয়াতকে অস্বীকার করবে, (তার জেনে রাখা উচিত) আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী।”(সূরা আল ইমরান ৩:১৯)



অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَمَنْ یَّبْتَغِ غَیْرَ الْاِسْلَامِ دِیْنًا فَلَنْ یُّقْبَلَ مِنْھُﺆ وَھُوَ فِی الْاٰخِرَةِ مِنَ الْخٰسِرِیْنَ)



“আর যে কেউ ইসলাম বাদ দিয়ে অন্য কোন জীবন ব্যবস্থা তালাশ করবে তার কাছ থেকে কিছুই কবূল করা হবে না এবং সে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।”(সূরা আল ইমরান ৩:৮৫)



আল্লাহ তা‘আলা ইয়াহূদীদেরকে তিরস্কার ও ভর্ৎসনা করে বলেন- তোমরা দাবি কর যে, ইবরাহীম ও ইয়াকুব (আঃ) পরবর্তী বংশধরকে ইয়াহূদী ধর্মে প্রতিষ্ঠিত থাকার অসিয়ত করেছেন। তোমরা কি অসিয়তের সময় উপস্থিত ছিলে? যদি তা না হয় তাহলে তোমাদের দাবি মিথ্যা ও অহেতুক। বরং সকলেই একটাই দীনের অসিয়ত করেছেন তা হল ইসলাম। যদিও বিধি-বিধানে কিছু পার্থক্য ছিল। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:



وَالْأَنْبِيَاءُ إِخْوَةٌ لِعَلَّاتٍ أُمَّهَاتُهُمْ شَتَّي وَدِينُهُمْ وَاحِدٌ



নাবীরা সকলে বৈমাত্রেয় ভাই, মাতা ভিন্ন কিন্তু সকলের দীন একটাই। (সহীহ বুখারী হা: ৩৪৪৩)



আল্লাহ তা‘আলা ইয়াহূদীদের লক্ষ করে আরো বলেন, তোমরা যারা বাপ-দাদার দোহাই দিয়ে নিজেদের সঠিক ধর্মের অনুসারী দাবি করছ, তোমাদের ঐ দোহাই দিয়ে লাভ নেই। তারা যা কিছু করেছে তা নিয়ে চলে গেছে। সুতরাং তাদের দোহাই দিয়ে কোন লাভ নেই, প্রকৃত জামিন হল সঠিক ঈমান ও সৎ আমল। যারা এ দু’টি নিয়ে আসবে তারাই সফলকাম হবে।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. ইসলাম বর্জন করে অন্য ধর্ম অন্বেষণ করা বোকামির পরিচয়।

২. মৃত্যুর পূর্বে ওসিয়ত করা শরীয়তসম্মত। তবে তা যেন কোন জুলুম না হয়।

৩. ইয়াহূদীদের ভ্রান্ত দাবি সম্পর্কে অবগত হলাম।

৪. সকল নাবীর ধর্ম ছিল ইসলাম এবং এর দিকেই তারা স্বীয় জাতিকে আহ্বান করেছেন।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ১৩০-১৩২ নং আয়াতের তাফসীর

এই আয়াতসমূহেও মুশরিকদের দাবী খণ্ডন করা হয়েছে। তারা নিজেদেরকে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ধর্মের অনুসারী বলে দাবী করতো, অথচ তারা পূর্ণ মুশরিক ছিল। আর হযরত ইবরাহীম (আঃ) তো একত্ববাদীদের ইমাম ছিলেন। তিনি তাওহীদকে শিরক হতে পৃথককারী ছিলেন। সারা জীবনে চক্ষুর পলক পরিমাণও আল্লাহ তাআলার সাথে কাউকে শরীক করেননি। বরং তিনি প্রত্যেক অংশীবাদীকে প্রত্যেক প্রকারের শিককে এবং কৃত্রিম মাবুদকে অন্তরের সাথে ঘৃণা করতেন এবং তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলেন। এই কারণেই তিনি স্বীয় সম্প্রদায় হতে পৃথক হয়ে যান, স্বদেশ ত্যাগ করেন, এমন কি পিতার বিরুদ্ধাচরণ করতেও দ্বিধাবোধ করেননি। তিনি পরিষ্কারভাবে বলে দেনঃ ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা যে অংশী স্থির করছে আমি তা থেকে বিমুক্ত। নিশ্চয় আমি সুদৃঢ়ভাবে তাঁরই দিকে স্বীয় আনন স্থাপন করলাম যিনি নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল সৃষ্টি করেছেন, এবং আমি অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত নই। অন্য জায়গায় রয়েছে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) তার সম্প্রদায়কে স্পষ্টভাবে বলেছেনঃ আমি তোমাদের উপাস্যগণ হতে বিমুক্ত রয়েছি, আমি আমার সৃষ্টিকর্তারই বশ্য, তিনিই আমাকে সুপথ প্রদর্শন করবেন।

অন্যস্থানে রয়েছেঃ 'হযরত ইবরাহীম (আঃ) তার জন্যেও শুধুমাত্র একটি অঙ্গীকারের কারণে ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন। কিন্তু যখন তিনি জানতে পারেন যে, সে আল্লাহর শত্রু, তখন তিনি তার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে যান, ইবরাহীম বড়ই তওবাকারী ও সহিষ্ণু। অন্যত্র রয়েছেঃ ইবরাহীম খাটিও অনুগত বান্দা ছিল, কখনও মুশরিক ছিল না; প্রভুর নিয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞ ছিল, আল্লাহর নিকট পছন্দনীয় ছিল, সঠিক পথের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল, পৃথিবীর উত্তম লোকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং পরকালেও সে সৎ লোকদের অন্তর্ভুক্ত হবে। এই আয়াতসমূহের ন্যায় এখানেও আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, নিজেদের জীবনের উপর অত্যাচারকারী ও পথভ্রষ্ট ব্যক্তিরাই শুধু হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ধর্মকে ত্যাগ করে থাকে। কেননা হযরত ইবরাহীম (আঃ) কে আল্লাহ্ তা'আলা হিদায়াতের জন্যে মনোনীত করেছিলেন। এবং বাল্যকাল হতেই তাঁকে সত্য অনুধাবনের তওফীক দান করেছিলেন। খালীল’-এর ন্যায় সম্মানিত উপাদি। একমাত্র তাকেই দান করেছিলেন। আখেরাতেও তিনি ভাগ্যবান লোকদের অন্তর্ভুক্ত হবেন। তাঁর পথ ও ধর্মকে ছেড়ে দিয়ে যারা ভ্রান্ত পথ ধারণ করে, তাদের মত নির্বোধ ও অত্যাচারী আর কে হতে পারে? এই আয়াতে ইয়াহুদীদের দাবীকেও খণ্ডন করা হয়েছে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ ‘ইবরাহীম ইয়াহূদীও ছিল না, খ্রীষ্টানও ছিল না, মুশরিকও ছিল না, বরং একত্ববাদী মুসলমান এবং খাটি বান্দা ছিল। তার নিকটবর্তী তারাই যারা তাকে মানে এবং এই নবী (সঃ) ও মু'মিনগণ, আর আল্লাহ তা'আলাও মু'মিনদের অভিভাবক।

যখন তার প্রভু তাকে বলেছিলেন, আত্মসমর্পন কর, তখন সে বলেছিল আমি বিশ্ব জগতের প্রতিপালকের নিকট আত্মসমর্পণ করলাম। এই একত্ববাদের মিল্লাতের উপদেশই হযরত ইবরাহীম (আঃ) ইয়াকুব (আঃ) তাদের সন্তানগণকে দিয়েছিল (আরবি) সর্বনামটির (আরবি) হয়তো বা (আরবি) হবে কিংবা হবে। (আরবি)-এর ভাবার্থ হচ্ছে ইসলাম এবং (আরবি)-এর ভাবার্থ (আরবি)
হবে। ইসলামের প্রতি তাঁদের প্রেম ও ভালবাসা কত বেশী ছিল যে, তারা নিজেরাতো সারা জীবন তার উপর অটল ছিলেনই, আবার সন্তানদেরকেও তার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবার উপদেশ দিচ্ছেন। অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবি) অর্থাৎ আমি তা তাদের সন্তানদের মধ্যেও বাকী রেখেছি। (৪৩:২৮) কোন কোন মনীষী এরকমও পড়েছেন। তখন ওটার সংযোগ হবে (আরবি)-এর সঙ্গে। তা হলে অর্থ হবেঃ ইবরাহীম (আঃ) তার সন্তানদেরকে এবং সন্তানদের সন্তান ইয়াকুব (আঃ) কে ইসলামের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার উপদেশ দিয়েছিল। কুশাইরী (রঃ) বলেন যে, হযরত ইয়াকুব (আঃ) হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর মৃত্যুর পর জন্মগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু তার এ দাবী ভিত্তিহীন, এর উপর কোন বিশুদ্ধ দলীল নেই। বরং স্পষ্টতঃ জানা যাচ্ছে যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর জীবদ্দশাতেই হযরত ইয়াকুব (আঃ) হযরত ইসহাক (আঃ)-এর ঔরসে জন্মগ্রহণ করেন। কেননা, কুরআন পাকের আয়াতে রয়েছে (আরবি) অর্থাৎ আমি তাকে (হযরত ইবরাহীম আঃ-এর স্ত্রী সারাকে) ইসহাক ও ইসহাকের পরে ইয়াকুবের সুসংবাদ দিয়েছি।' (১১:৭১) তাহলে যদি হযরত ইয়াকুব (আঃ) হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর জীবদ্দশায় বিদ্যমান না থাকতেন তবে তার নাম নেয়ার কোন প্রয়োজন থাকতো না। সূরা-ই-আনকাবুতের মধ্যেও রয়েছেঃআমি ইবরাহীম (আঃ)-এর প্রতি ইসহাক (আঃ) ও ইয়াকুব (আঃ)কে দান করেছি এবং তার সন্তানদের মধ্যে আমি নবুওয়াত ও কিতাব দিয়েছি। অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “আমি তাকে ইসহাককে দিয়েছি এবং অতিরিক্ত হিসেবে ইয়াকুবকে দান করেছি। এই সব আয়াত দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, হযরত ইয়াকুব (আঃ) হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর জীবদ্দশায় বিদ্যমান ছিলেন। পূর্বের কিতাবসমূহেও রয়েছে যে, তিনি বায়তুল মুকাদ্দাসে’ আগমন করবেন।

সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে হযরত আবু যার (রাঃ) হতে একটি হাদীস বর্ণিত আছে। তিনি বলেনঃ “আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কোন মসজিদটি সর্বপ্রথম নির্মিত হয়?' তিনি বলেনঃ ‘মসজিদ-ই- হারাম। আমি বলি- তার পরে কোনটি?' তিনি বলেনঃ বায়তুল মুকাদ্দাস। আমি বলি, ‘এদুটির মধ্যে সময়ের ব্যবধান`কত?' তিনি বলেনঃ চল্লিশ বছর। ইবনে হিব্বান (রঃ) বলেন যে, এ ব্যবধান হচ্ছে হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও হযরত সুলাইমান (আঃ) -এর মধ্যে। অথচ এটা সম্পূর্ণ বিপরীত কথা। এই দুই নবীর মধ্যে হাজার বছরেরও বেশী ব্যবধান ছিল। বরং হাদীসটির ভাবার্থ অন্য কিছু হবে। হযরত সুলাইমান (আঃ) তো ছিলেন বায়তুল মুকাদ্দাসের মেরামতকারী, তিনি ওর নির্মাতা ছিলেন না। এরকমই হযরত ইয়াকুব (আঃ) উপদেশ দিয়েছিলেন, যেমন অতিসত্বরই এর আলোচনা আসছে। তাদের ওসিয়তের ভাবার্থ হচ্ছে এইঃ ‘তোমরা তোমাদের জীবদ্দশায় সৎ কর্মশীল হও এবং ওর উপরেই প্রতিষ্ঠিত থাক, যেন মৃত্যুও ওর উপরেই হয়। সাধারণতঃ যে ইহলৌকিক জীবনে যার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে মৃত্যু ওর উপরই হয়ে থাকে, এবং যার উপরে মৃত্যুবরণ করে ওর উপরেই কিয়ামতের দিন তার উত্থান হবে। মহান আল্লাহর বিধান এই যে, যে ব্যক্তি ভাল কাজের ইচ্ছে পোষণ করে, তিনি তাকে সেই কাজের তাওফীক প্রদান করে থাকেন এবং ঐ কাজ তার জন্য সহজ করে দেয়া হয় ও তাকে ওরই উপর অটল রাখা হয়। নিঃসন্দেহে এটাও হাদীসে এসেছে যে, মানুষ বেহেশতের কাজ করতে করতে বেহেশত হতে মাত্র এক হাত দূরে থাকে। অতঃপর তার ভাগ্য তার উপর বিজয় লাভ করে। ফলে সে দুখের কাজ করতঃ দুখী হয়ে যায়। আবার কখনও এর বিপরীত হয়ে থাকে। কিন্তু এর ভাবার্থ এই যে, এই ভাল বা মন্দ বাহ্যিক হয়, প্রকৃত পক্ষে তা হয়। কেননা, এই হাদীসের কোন কোন বর্ণনায় আছেঃ সে বেহেশতের কাজ করে যা মানুষের নিকট প্রকাশ পায় এবং সে দুযখের কাজ করে যা লোকের নিকট প্রকাশ পায়। কুরআন মাজীদ ঘোষণা করেঃ “যে ব্যক্তি দান করেছে, ভয় করেছে এবং ভাল কথার সত্যতা স্বীকার করেছে আমি তাকে শান্তির উপকরণ (বেহেশত) প্রদান করবো। আর যে কার্পণ্য করেছে এবং বেপরোয়া হয়েছে, আর ভাল কথাকে (সত্য ধর্মকে) অবিশ্বাস করেছে, আমি তাকে ক্লেশদায়ক বস্তু (জাহান্নাম)-এর জন্যে আসবাব প্রদান করবো।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।