আল কুরআন


সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 126)

সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 126)



হরকত ছাড়া:

وإذ قال إبراهيم رب اجعل هذا بلدا آمنا وارزق أهله من الثمرات من آمن منهم بالله واليوم الآخر قال ومن كفر فأمتعه قليلا ثم أضطره إلى عذاب النار وبئس المصير ﴿١٢٦﴾




হরকত সহ:

وَ اِذْ قَالَ اِبْرٰهٖمُ رَبِّ اجْعَلْ هٰذَا بَلَدًا اٰمِنًا وَّ ارْزُقْ اَهْلَهٗ مِنَ الثَّمَرٰتِ مَنْ اٰمَنَ مِنْهُمْ بِاللّٰهِ وَ الْیَوْمِ الْاٰخِرِ ؕ قَالَ وَ مَنْ کَفَرَ فَاُمَتِّعُهٗ قَلِیْلًا ثُمَّ اَضْطَرُّهٗۤ اِلٰی عَذَابِ النَّارِ ؕ وَ بِئْسَ الْمَصِیْرُ ﴿۱۲۶﴾




উচ্চারণ: ওয়াইযকা-লা ইবরা-হীমু রাব্বিজ‘আল হা-যা-বালাদান আ-মিনাওঁ ওয়ারযুকআহলাহূ মিনাছছামারা-তি মান আ-মানা মিনহুম বিল্লা-হি ওয়াল ইয়াওমিল আ-খিরি কা-লা ওয়ামান কাফারা ফাইমাত্তি‘উহূ কালীলান ছুম্মা আদতাররুহূইলা-‘আযা-বিন্না-রি ওয়াবি’ছাল মাসীর।




আল বায়ান: আর স্মরণ কর, যখন ইবরাহীম বলল, ‘হে আমার রব, আপনি একে নিরাপদ নগরী বানান এবং এর অধিবাসীদেরকে ফল-মুলের রিয্ক দিন যারা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান এনেছে’। তিনি বললেন, ‘যে কুফরী করবে, তাকে আমি স্বল্প ভোগোপকরণ দিব। অতঃপর তাকে আগুনের আযাবে প্রবেশ করতে বাধ্য করব। আর তা কত মন্দ পরিণতি’।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১২৬. আর স্মরণ করুন, যখন ইবরাহীম বলেছিলেন, হে আমার রব! এটাকে নিরাপদ শহর করুন এবং এর অধিবাসীদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান আনে(১) তাদেরকে ফলমূল হতে জীবিকা প্রদান করুন। তিনি (আল্লাহ) বললেন, যে কুফরী করবে তাকেও কিছু কালের জন্য জীবনোপভোগ করতে দিব, তারপর তাকে আগুনের শাস্তি ভোগ করতে বাধ্য করব। আর তা কত নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তনস্থল!




তাইসীরুল ক্বুরআন: স্মরণ কর যখন ইবরাহীম প্রার্থনা করেছিল, ‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি এ শহরকে নিরাপদস্থল কর এবং এর অধিবাসীদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও পরকালের উপর ঈমান আনে, তাদেরকে ফলমূল হতে জীবিকা প্রদান কর’। নির্দেশ হল, ‘যে কেউ কুফরী করবে তাকেও আমি কিছু দিনের জন্য উপকার লাভ করতে দেব এবং তারপর তাকে জাহান্নামের আগুনে দাখিল করব, আর কতই না নিকৃষ্ট তাদের ফেরার জায়গা’!




আহসানুল বায়ান: ১২৬। স্মরণ কর, যখন ইব্রাহীম বলেছিল, ‘হে আমার প্রতিপালক! এ (মক্কা)কে নিরাপদ শহর কর, আর এর অধিবাসীদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করবে, তাদেরকে রুযীস্বরূপ ফলমূল দান কর।’ [1] তিনি বললেন, ‘যে কেউ অবিশ্বাস করবে, তাকেও আমি কিছুকালের জন্য জীবনোপভোগ করতে দেব, অতঃপর তাকে দোযখের শাস্তি ভোগ করতে বাধ্য করব। আর তা কত নিকৃষ্ট পরিণাম (বাসস্থান)।



মুজিবুর রহমান: যখন ইবরাহীম বললঃ হে আমার রাব্ব! এ স্থানকে আপনি নিরাপত্তাময় শহরে পরিণত করুন এবং এর অধিবাসীদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস স্থাপন করেছে তাদেরকে উপজীবিকার জন্য ফল-শষ্য প্রদান করুন। (আল্লাহ) বলেনঃ যারা কুফরী করে তাদেরকে আমি অল্প কিছু দিন জীবনোপভোগ করতে দিব, অতঃপর তাদেরকে অগ্নির শাস্তি ভোগ করতে বাধ্য করব, ঐ গন্তব্য স্থান নিকৃষ্টতম।



ফযলুর রহমান: (স্মরণ করো) যখন ইবরাহীম বলেছিল, “হে প্রভু! একে (মক্কা নগরীকে) একটি নিরাপদ শহর বানিয়ো এবং এর অধিবাসীদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও শেষ দিন (পরকাল) বিশ্বাস করবে, ফল-ফলাদি দ্বারা তাদের জীবিকার ব্যবস্থা করে দিও।” তিনি বলেছিলেন, “আর যে অবিশ্বাস করবে তাকেও কিছুদিনের জন্য (এ সব) উপভোগ করতে দেব, তারপর তাকে জাহান্নামের শাস্তির দিকে ঠেলে দেব; সেটা কত খারাপ গন্তব্যস্থল!”



মুহিউদ্দিন খান: যখন ইব্রাহীম বললেন, পরওয়ারদেগার! এ স্থানকে তুমি শান্তিধান কর এবং এর অধিবাসীদের মধ্যে যারা অল্লাহ ও কিয়ামতে বিশ্বাস করে, তাদেরকে ফলের দ্বারা রিযিক দান কর। বললেনঃ যারা অবিশ্বাস করে, আমি তাদেরও কিছুদিন ফায়দা ভোগ করার সুযোগ দেব, অতঃপর তাদেরকে বলপ্রয়োগে দোযখের আযাবে ঠেলে দেবো; সেটা নিকৃষ্ট বাসস্থান।



জহুরুল হক: আর স্মরণ করো! ইব্রাহীম বললেন -- “আমার প্রভু! এটিকে তুমি নিরাপদ নগর বানাও, আর এর লোকদের ফলফসল দিয়ে জীবিকা দান করো -- তাদের যারা আল্লাহ্‌তে ও আখেরাতের দিনে ঈমান এনেছে।” তিনি বললেন -- “আর যে অবিশ্বাস পোষণ করবে তাকে আমি ক্ষণেকের জন্য ভোগ করতে দেব, তারপর তাড়িয়ে নেব আগুনের শাস্তির দিকে, আর নিকৃষ্ট গন্তব্যস্থল।”



Sahih International: And [mention] when Abraham said, "My Lord, make this a secure city and provide its people with fruits - whoever of them believes in Allah and the Last Day." [Allah] said. "And whoever disbelieves - I will grant him enjoyment for a little; then I will force him to the punishment of the Fire, and wretched is the destination."



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১২৬. আর স্মরণ করুন, যখন ইবরাহীম বলেছিলেন, হে আমার রব! এটাকে নিরাপদ শহর করুন এবং এর অধিবাসীদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান আনে(১) তাদেরকে ফলমূল হতে জীবিকা প্রদান করুন। তিনি (আল্লাহ) বললেন, যে কুফরী করবে তাকেও কিছু কালের জন্য জীবনোপভোগ করতে দিব, তারপর তাকে আগুনের শাস্তি ভোগ করতে বাধ্য করব। আর তা কত নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তনস্থল!


তাফসীর:

(১) আলোচ্য আয়াতে মুমিন ও কাফের নির্বিশেষে সমগ্র মক্কাবাসীর জন্য শান্তি ও সুখস্বাচ্ছন্দ্যের দোআ করা হয়েছে। ইতঃপূর্বে এক দোআয় যখন ইবরাহীম আলাইহিস সালাম স্বীয় বংশধরের মুমিন ও কাফের নির্বিশেষে সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন, তখন আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল যে, মুমিনদের পক্ষে এ দোআ কবুল হল, যালিম ও মুশরিকদের জন্য নয়। সে দোআটি ছিল নেতৃত্ব লাভের দোআ। খলীল আলাইহিস সালাম ছিলেন আল্লাহর বন্ধুত্বের মহান মর্যাদায় উন্নীত ও আল্লাহভীতির প্রতীক। তাই এ ক্ষেত্রে সে কথাটি মনে পড়ে গেল এবং তিনি দোআর শর্ত যোগ করলেন যে, আর্থিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও শান্তির এ দোআ শুধু মুমিনদের জন্য করেছি। আল্লাহর পক্ষ থেকে এ ভয় ও সাবধানতার মূল্য দিয়ে বলা হয়েছে (وَمَنْ كَفَرَ) অর্থাৎ পার্থিব সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য আমি সমস্ত মক্কাবাসীকেই দান করব, যদিও তারা কাফের মুশরিক হয়। তবে মুমিনদেরকে দুনিয়া ও আখেরাত সর্বত্রই তা দান করব, কিন্তু কাফেররা আখেরাতে শাস্তি ছাড়া আর কিছুই পাবে না। [মাআরিফুল কুরআন]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: ১২৬। স্মরণ কর, যখন ইব্রাহীম বলেছিল, ‘হে আমার প্রতিপালক! এ (মক্কা)কে নিরাপদ শহর কর, আর এর অধিবাসীদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করবে, তাদেরকে রুযীস্বরূপ ফলমূল দান কর।’ [1] তিনি বললেন, ‘যে কেউ অবিশ্বাস করবে, তাকেও আমি কিছুকালের জন্য জীবনোপভোগ করতে দেব, অতঃপর তাকে দোযখের শাস্তি ভোগ করতে বাধ্য করব। আর তা কত নিকৃষ্ট পরিণাম (বাসস্থান)।


তাফসীর:

[1] মহান আল্লাহ ইবরাহীম (আঃ)-এর এই দু’আ কবুল করেন। এই শহর এখন নিরাপত্তার কেন্দ্র এবং অনাবাদ ভূমি হওয়া সত্ত্বেও সারা পৃথিবীর ফলমূল এবং সব রকমের শস্যাদি এমন পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া যায় যে, তা দেখে মানুষ বিস্ময়ে হতবাক হয়!


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ১২৬ থেকে ১২৯ নং আয়াতের তাফসীর:



ইবরাহীম (আঃ) দু‘আ করেছেন মক্কা নগরীর জন্য আর আমাদের নাবী দু‘আ করেছেন মদীনার জন্য। অত্র আয়াতে ইবরাহীম (আঃ) মক্কাবাসীদের জন্য দু‘আ করে বলেছেন, এ শহরের যারা আল্লাহ তা‘আলা ও পরকালের প্রতি ঈমান এনেছে তাদেরকে রিযিক দিন এবং শহরকে নিরাপদ করে দিন।



আল্লাহ তা‘আলা দু‘আ কবূল করতঃ কাফিরদের জন্য কিছু ভোগ করার সুযোগ রেখে দিলেন কিন্তু পরকালে তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।



১২৬-১২৯ নং আয়াতে ইবরাহীম (আঃ)-এর চারটি দু‘আ রয়েছে:

১২৬ নং আয়াতে মক্কার জন্য ও তার মু’মিন অধিবাসীদের জন্য।

১২৭ নং আয়াতে নিজের ও পুত্রের কাবা নির্মাণের সৎ আমল কবূল করার জন্য।

১২৮ নং আয়াতে নিজেদেরকে ও পরবর্তী বংশধরকে আনুগত্যশীল বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করার এবং তাদের তাওবাহ কবূল করার জন্য।



১২৯ নং আয়াতে ইসমাঈল (আঃ)-এর বংশধরে যাতে একজন রাসূল প্রেরণ করেন যিনি কিতাব ও হিকমাত শিক্ষা দেবেন। কিতাব হল কুরআন, আর হিকমাত হল সুন্নাহ। (তাফসীর মুয়াসসার, পৃঃ ২০)



আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সব দু‘আ কবূল করেছিলেন। তাঁর বংশধরে নাবীও প্রেরণ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(ھُوَ الَّذِیْ بَعَثَ فِی الْاُمِّیّ۪نَ رَسُوْلًا مِّنْھُمْ یَتْلُوْا عَلَیْھِمْ اٰیٰتِھ۪ وَیُزَکِّیْھِمْ وَیُعَلِّمُھُمُ الْکِتٰبَ وَالْحِکْمَةَﺠ وَاِنْ کَانُوْا مِنْ قَبْلُ لَفِیْ ضَلٰلٍ مُّبِیْنٍ)



“তিনিই উম্মীদের (নিরক্ষর জাতির) মধ্যে তাদের একজনকে পাঠিয়েছেন রাসূলরূপে, যিনি তাদের নিকট আবৃত্তি করেন তাঁর আয়াতসমূহ, তাদেরকে পবিত্র করেন এবং শিক্ষা দেন কিতাব ও হেকমত (সুন্নাত); যদিও ইতোপূর্বে তারা ছিল স্পষ্ট গোমরাহীতে।” (সূরা জুমুআহ ৬২:২)



الْعَزِیْزُ অর্থ পরাক্রমশালী, সবকিছুর উপর বিজয়ী, যার ওপর কেউ জয় লাভ করতে পারে না। الْعَزِیْزُ শব্দটি عَزَّ -يَعِزُّ থেকে গঠিত, এর মূল অর্থ হল সম্মান, ইজ্জত। মূলত ইজ্জত-সম্মান হল বিজয়। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَلِلَّهِ الْعِزَّةُ وَلِرَسُولِهِ وَلِلْمُؤْمِنِينَ)



“ইজ্জত-সম্মান আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও মু’মিনদের জন্য”(সূরা মুনাফিকুন ৬৩:৮)



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. কোন কাফির তার কুফরীর কারণে দুনিয়াতে রিযিক থেকে বঞ্চিত হবে না বরং তারা ইসলাম বা মুসলিমদের কোন ক্ষতি করলে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হবে।

২. মাসজিদ নির্মাণে নিজেকে সম্পৃক্ত করার ফযীলত জানলাম।

৩. আল্লাহ তা‘আলার নাম ও গুণাবলীর ওসিলায় দু‘আ করলে দু‘আ কবূল হওয়ার আশা করা যায়।

৪. ইবাদতকারীকে ইবাদত করার পূর্বে অবশ্যই ইবাদত সম্পর্কে জ্ঞান রাখতে হবে।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ওটা প্রথম আল্লাহর ঘরঃ (আরবি)-এর ভাবার্থ হচ্ছে বার বার আগমন করা। হজ্বব্রত পালন করে বাড়ী ফিরে গেলেও অন্তর তার সাথে লেগেই থাকে। প্রত্যেক জায়গা হতে লোক দলে দলে এ ঘরের দিকে এসে থাকে। এটাই একত্রিত হবার স্থান, অর্থাৎ সবারই মিলন কেন্দ্র। এটা নিরাপদ জায়গা। এখানে অস্ত্র শস্ত্র উঠানো হয় না। অজ্ঞতার যুগেও এর আশে পাশে লুটতরাজ হতো বটে; কিন্তু এখানে নিরাপত্তা বিরাজ করতো। কাউকে কেউ গালিও দিত না। এ স্থান সদা বরকতময় ও মর্যাদাপূর্ণ থেকেছে। সৎ আত্মাগুলো সদা এর দিকে উৎসুক নেত্রে চেয়ে থাকে। প্রতি বছর পরিদর্শন করলেও এর প্রতি লোকের আগ্রহ থেকেই যায়। এটা হযরত ইবরাহীমে (আঃ)-এর প্রার্থনারই ফল। তিনি আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা জানিয়েছিলেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ হে আল্লাহ! আপনি জনগণের অন্তর ওদিকে ঝুঁকিয়ে দিন।' (১৪:৩৭) এখানে কেউ তার ভ্রাতার হন্তাকে দেখলেও নীরব থাকে। সুরা-ই-মায়েদার মধ্যে রয়েছে যে, এটা মানুষের অবস্থান স্থল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, মানুষ যদি হজ্ব করা ছেড়ে দেয় তবে আকাশকে পৃথিবীর উপর নিক্ষেপ করা হবে। এ ঘরের মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য করলে এর প্রথম নির্মাতা হযরত ইবরাহীম (আঃ) এর কথা স্মরণ হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ যখন আমি ইবরাহীম (আঃ)-এর জন্যে বায়তুল্লাহ শরীফের স্থান ঠিক করে দিলাম, (এবং বলেছিলাম) আমার সাথে কাউকেও অংশীদার স্থাপন করবে।' (২২ ২৬) অন্য জায়গায় আল্লাহ তাআলা বলেন (আরবি)

অর্থাৎ-আল্লাহ তা'আলার প্রথম ঘর রয়েছে মক্কায়, যা বরকতময় ও সারা বিশ্বের হিদায়াত স্বরূপ। তাতে কতকগুলো প্রকাশ্য নিদর্শন রয়েছে যেমন, মাকামে ইবরাহীম (আঃ), যে কেউ তাতে প্রবেশ করবে সে নিরাপত্তা লাভ করবে।' (৩:৯৬) মাকামে ইবরাহীম বলতে সম্পূর্ণ বায়তুল্লাহ শরীফও বুঝায় বা হযরত ইব্রাহীম (আঃ)-এর বিশিষ্ট স্থানও বুঝায়। আবার হজ্বের সমুদয় করণীয় কাজের স্থানকেও বুঝায়। যেমন-আরাফাত, মাশআরে হারাম, মিনা, পাথর নিক্ষেপ, সাফা-মারওয়ার তওয়াফ ইত্যাদি। মাকামে ইবরাহীম প্রকৃতপক্ষে ঐ পাথরটি যা হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর সহধর্মিনী হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর মান কার্য সম্পাদনের জন্যে তাঁর পায়ের নীচে রেখেছিলেন। কিন্তু হযরত সাঈদ বিন যুবাইর (রঃ) বলেন যে, এটা ভুল কথা। প্রকৃত পক্ষে এটা ঐ প্রস্তর যার উপরে দাড়িয়ে হযরত ইবরাহীম (আঃ) কাবা ঘর নির্মাণ করতেন। হযরত জাবির (রাঃ)-এর একটি সুদীর্ঘ হাদীসে রয়েছে যে, যখন নবী (সঃ) তওয়াফ করেন তখন হযরত উমার (রাঃ) মাকামে ইবরাহীমের (আঃ) দিকে ইঙ্গিত করে বলেন ‘এটাই কি আমাদের পিতা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর মাকাম?' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন- হাঁ'। তিনি বলেনঃ তাহলে আমরা এটাকে কিবলাহ বানিয়ে নেই না কেন? তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত উমারের (রাঃ) প্রশ্নের অল্প দিন পরেই এ নির্দেশ অবতীর্ণ হয়। অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, মক্কা বিজয়ের দিন মাকামে ইবরাহীমের (আঃ) পাথরের দিকে ইঙ্গিত করে হযরত উমার (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটাই কি মাকামে ইবরাহীম যাকে কিবলাহ্ বানানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ হাঁ এটাই।

সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে হযরত আনাস বিন মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত উমার বিন খাত্তাব (রাঃ) বলেনঃ “তিনটি বিষয়ে আমি আমার প্রভুর আনুকূল্য স্বীকার করেছি, অথবা বলেন- তিনটি বিষয়ে আমার প্রভু আমার আনুকূল্য করেছেন অর্থাৎ আল্লাহ যা চেয়েছিলেন তাই তাঁর মুখ দিয়ে বের হয়েছিল। হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ আমি বললাম যে, হে আল্লাহর রাসূল! যদি আমরা মাকামে ইবরাহীমকে নামাযের স্থান করে নিতাম! তখন (আরবি) (২:১২৫) অবতীর্ণ হয়। আমি বললাম-হে আল্লাহর রাসূল! সৎ ও অসৎ সবাই আপনার নিকট এসে থাকে, সুতরাং যদি আপনি মু'মিনদের জননীগণকে নিবী (সঃ)-এর সহধর্মিনীগণকে] পর্দার নির্দেশ দিতেন! তখন পর্দার আয়াত অবতীর্ণ হয়। যখন আমি অবগত হই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর কোনও কোনও স্ত্রীর প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছেন, আমি তখন তাদের নিকট গিয়ে বলি- যদি আপনারা বিরত না হন (রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে দুঃখ দেয়া হতে] তবে আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবীকে (সঃ) আপনাদের চেয়ে উত্তম স্ত্রী প্রদান করবেন। তখন মহান আল্লাহ নিম্নের আয়াত অবতীর্ণ করেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ যদি মুহাম্মদ (সঃ) তোমাদেরকে পরিত্যাগ করে তবে অতি সত্বরই আল্লাহ তা'আলা তাকে তোমাদের পরিবর্তে তোমাদের অপেক্ষা উত্তম স্ত্রী দান করবেন।' (৬৬:৫) এ হাদীসটির বহু ইসনাদ রয়েছে এবং বহু কিতাবে বর্ণিত হয়েছে। একটি বর্ণনায় বদরের বন্দীদের ব্যাপারেও হযরত উমারের (রাঃ) আনুকূল্যের কথা বর্ণিত আছে। তিনি বলেছিলেন যে, বন্দীদের নিকট হতে মুক্তিপণ না নিয়ে বরং তাদেরকে হত্যা করা হোক। আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছাও তাই ছিল। হযরত উমার (রাঃ) বলেন যে, আবদুল্লাহ বিন উবাই বিন সালুল নামক মুনাফিক যখন মারা যায় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার জানাযার নামায আদায় করার প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। তখন আমি বলি আপনি কি এই মুনাফিক কাফিরের জানাযার নামায আদায় করবেন? তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে ধমক দিলে আল্লাহ তা'আলা নিম্নের আয়াত অবতীর্ণ করেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তাদের মধ্যে যে মৃত্যু বরণ করেছে তুমি কখনও তার জন্যে নামায পড়বে না এবং তার সমাধি পার্শ্বে দাঁড়াবে না। (৯:৮৪)

হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাবা শরীফ সদর্প পদক্ষেপে তিনবার প্রদক্ষিণ করেন এবং চারবার স্বাভাবিক পদক্ষেপে প্রদক্ষিণ করেন। অতঃপর মাকামে ইব্রাহীমের (আঃ) পিছনে এসে দু’রাকায়াত নামায আদায় করেন এবং (আরবি) পাঠ করেন।' হযরত জাবিরের (রাঃ) হাদীসে রয়েছে রাসূলুল্লাহ (সঃ) মাকামে ইব্রাহীমকে (আঃ) তাঁর ও বায়তুল্লাহ শরীফের মধ্যে করেছিলেন। এ হাদীসসমূহের দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, মাকামে ইব্রাহীমের (আঃ) ভাবার্থ ঐ পাথরটি যার উপর দাঁড়িয়ে হযরত ইবরাহীম (আঃ) কা'বা ঘর নির্মাণ করতেন। হযরত ইসমাঈল (আঃ) তাঁকে পাথর এনে দিতেন এবং তিনি কা'বা ঘরের ভিত্তি স্থাপন করে যেতেন। যেখানে প্রাচীর উঁচু করার প্রয়োজন হতো সেখানে পাথরটি সরিয়ে নিয়ে যেতেন।এভাবে কা'বার প্রাচীর গাঁথার কাজ সমাপ্ত করেন। এর পূর্ণ বিবরণ ইনশাআল্লাহ হযরত ইবরাহীমের (আঃ) ঘটনায় আসবে। ঐ পাথরে হ্যরত ইব্রাহীমের (আঃ) পদদ্বয়ের চিহ্ন পরিস্ফুট হয়েছিল। আরবের অজ্ঞতার যুগের লোকেরা তা দেখেছিল। আবু তালিব তার প্রশংসাসূচক কবিতায় বলেছিলেন ? (আরবি)

অর্থাৎ ‘ঐ পাথরের উপর হযরত ইব্রাহীমের (আঃ) পদদ্বয়ের চিহ্ন নতুন হয়ে রয়েছে, পদদ্বয় জুতো শূন্য ছিল। হযরত আনাস বিন মালিক (রাঃ) বলেনঃ “আমি মাকামে ইবরাহীমের (আঃ) উপর হযরত খলীলুল্লাহর (আঃ) পায়ের অঙ্গুলির ও পায়ের পাতার চিহ্ন দেখেছিলাম। অতঃপর জনগণের স্পর্শের কারণে তা মুছে গেছে। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, বরকত লাভের উদ্দেশ্যে মাকামে ইবুরাহীমের (আঃ) দিকে মুখ করে নামায পড়ার নির্দেশ রয়েছে, তাকে স্পর্শ করার নির্দেশ নেই। এ উম্মতের লোকেরাও পূর্বের উম্মতের ন্যায় আল্লাহর নির্দেশ ছাড়াই কতকগুলো কাজ নিজেদের উপর ফর করে নিয়েছে, যা পরিণামে তাদের ক্ষতির কারণ। হবে। মানুষের স্পর্শের কারণেই ঐ পাথরের পদ চিহ্ন হারিয়ে গেছে।

এই মাকামে ইবরাহীম পূর্বে কাবার প্রাচীরের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। কাবার দরজার দিকে হাজরে আসওয়াদ’র পার্শ্বে দরজা দিয়ে যেতে ডান দিকে একটি স্থায়ী জায়গায় বিদ্যমান ছিল যা আজও লোকের জানা আছে। খলীলুল্লাহ (আঃ) হয়তো বা ওটাকে এখানেই রেখেছিলেন কিংবা বাইতুল্লাহ বানানো অবস্থায় শেষ অংশ হয়তো এটাই নির্মাণ করে থাকবেন এবং পাথরটি এখানেই থেকে গেছে। হযরত উমার বিন খাত্তাব (রাঃ) স্বীয় খিলাফতের যুগে ওটাকে পিছনে সরিয়ে দেন। এর প্রমাণ রূপে বহু বর্ণনা রয়েছে। অতঃপর একবার বন্যার পানিতে এ পাথরটি এখান হতেও সরে গিয়েছিল। দ্বিতীয় খলিফা পুনরায় একে পূর্বস্থানে রেখে দেন। হযরত সুফইয়ান (রঃ) বলেনঃ “আমার জানা নেই যে, এটাকে মূল স্থান হতে সরানো হয়েছে এবং এর পূর্বে কা'বার প্রাচীর হতে কত দূরে ছিল।” একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ পাথরটি তার মূল স্থান হতে সরিয়ে ওখানে রেখেছিলেন যেখানে এখন রয়েছে। কিন্তু এ বর্ণনাটি মুরসাল। সঠিক কথা এই যে, হযরত উমার (রাঃ) এটা পিছনে রেখেছিলেন।

এখানে (আরবি)-এর অর্থ হচ্ছে নির্দেশ। অর্থাৎ আমি ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে নির্দেশ দিয়েছি।' পবিত্র রেখো’ অর্থাৎ কা'বা শরীফকে ময়লা, বিষ্ঠা এবং জঘন্য জিনিস হতে পবিত্র রেখো। (আরবি)-এর (আরবি) যদি (আরবি) দ্বারা হয় তবে অর্থ দাঁড়াবে ‘আমি ওয়াহী অবতীর্ণ করেছি এবং প্রথমেই বলে দিয়েছি যে, তোমরা উভয়ে ‘বায়তুল্লাহূকে প্রতিমা থেকে পবিত্র রাখবে, তথায় আল্লাহ ছাড়া অন্যের ইবাদত হতে দেবে না, বাজে কাজ,অপ্রয়োজনীয় ও মিথ্যে কথা, শিরক , কুফর হাসি রহস্য ইত্যাদি হতে ওকে রক্ষা করবে।' শব্দের একটি অর্থ হচ্ছে প্রদক্ষিণকারী। দ্বিতীয় অর্থ হচ্ছে ‘বাহির হতে আগমনকারী’। এ হিসেবে (আরবি) শব্দের অর্থ হবে মক্কার অধিবাসী।' হযরত সাবিত (রঃ) বলেনঃ “আমরা হযরত আবদুল্লাহ বিন উবাইদ বিন উমাইর (রঃ) কে বলি যে, আমাদের কর্তব্য হবে বাদশাহুকে এ পরামর্শ দেয়া, তিনি যেন জনগণকে বায়তুল্লাহ শরীফে শয়ন করতে নিষেধ করে দেন। কেননা,এমতাবস্থায় অপবিত্র হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। রয়েছে, এবং এরও সম্ভাবনা আছে যে, তারা পরস্পরে বাজে কথা বলতে আরম্ভ করে দেয়। তখন তিনি বলেনঃ এরূপ করো না। কেননা, হযরত ইবনে উমার (রাঃ) তাদের সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হয়ে বলেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ তারা ওরই অধিবাসী।' একটি হাদীসে রয়েছে যে,হযরত উমার ফারূকের (রাঃ) ছেলে হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) মসজিদে নববীতে (সঃ) শুয়ে থাকতেন, এবং তিনি যুবকও কুমার ছিলেন (আরবি) দ্বারা নামাযীদেরকে বুঝানো হয়েছে। এটা পবিত্র রাখার নির্দেশ দেয়ার কারণ এই যে, তখনও মূর্তি পূজা চালু ছিল। বায়তুল্লাহর নামায উত্তম কি তওয়াফ উত্তম এ বিষয়ে ধর্ম শাস্ত্রবিদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। ইমাম মালিকের (রঃ) মতে বাইরের লোকদের জন্যে তওয়াফ উত্তম এবং জামহুরের মতে প্রত্যেকের জন্যে নামায উত্তম। তাফসীর এর ব্যাখ্যার জায়গা নয়। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে মুশরিকদেরকে জানিয়ে দেয়া এবং তাদের দাবী খণ্ডন করা যে, বায়তুল্লাহ' তো খাস করে আল্লাহ তাআলার ইবাদতের জন্যেই নির্মিত হয়েছে। ওর মধ্যে অন্যদের পূজা করা এবং খাটি আল্লাহর পূজারীদেরকে ঐ ঘরে ইবাদত করা হতে বিরত রাখা সরাসরি অন্যায় ও আবচারপূণ কাজ। এজন্যেই কুরআন মাজীদে অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ এরূপ অত্যাচারীদেরকে আমি যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করাবো। এভাবে মুশরিকদের দাবীকে স্পষ্টভাবে খণ্ডন করার সাথে সাথে ইয়াহূদী ও খ্রীষ্টানদের দাবীও খণ্ডন করা হয়ে গেল। তারা যখন হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর মর্যাদা শ্রেষ্ঠত্ব ও নবুওয়াতের সমর্থক, তারা যখন জানে ও স্বীকার করে যে, এই মর্যাদাপূর্ণ ঘর এসব পবিত্র হস্ত দ্বারাই নির্মিত হয়েছে, তারা যখন একথারও সমর্থক যে, এ ঘরটি শুধুমাত্র নামায, তওয়াফ, প্রার্থনা এবং আল্লাহর উপাসনার জন্যেই নির্মিত হয়েছে, হজ্ব, উমরাহ, ইতিকাফ ইত্যাদির জন্যে বিশিষ্ট করা হয়েছে, তখন এই নবীগণের অনুসরণ দাবী সত্ত্বেও কেন তারা হজ্ব ও উমরা করা হতে বিরত রয়েছে? বায়তুল্লাহ শরীফে তারা উপস্থিত হয় না কেন? বরং স্বয়ং হযরত মূসা (আঃ) তো এই ঘরের হজ্ব করেছেন, যেমন হাদীসে পরিষ্কারভাবে বিদ্যমান রয়েছে। যেমন কুরআন মাজীদের অন্য জায়গায় আছে (আরবি)

অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা মসজিদগুলো উঁচু করার অনুমতি দিয়েছেন। ওর মধ্যে তাঁর নামের যিক্র করা হবে, ওর মধ্যে সকাল-সন্ধায় তার সৎ বান্দাগণ তাঁর নামের তাসবিহু পাঠ করে থাকে। (২৪:৩৬) হাদীস শরীফে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ মসজিদসমূহ যে কাজের জন্যে তা ঐ জন্যেই নির্মিত হয়েছে। আরও বহু হাদীসে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে মসজিদসমূহ পবিত্র রাখার নির্দেশ রয়েছে।

বায়তুল্লাহ শরীফের নির্মাণ ও এর সর্বপ্রথম নির্মাতা

কেউ কেউ বলেন যে, কাবা শরীফ ফেরেশতাগণ নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু এ কথাটি নির্ভরযোগ্য নয়। কেউ কেউ বলেন যে, হযরত আদম (আঃ) সর্বপ্রথম পাঁচটি পর্বত দ্বারা কা'বা শরীফ নির্মাণ করেন। পর্বত পাঁচটি হচ্ছেঃ (১) হেরা, (২) তুরে সাইনা, (৩) ভূরে যীতা, (৪) জাবাল-ই-লেবানন এবং (৫) জুদী। কিন্তু একথাটিও সঠিক নয়। কেউ বলেন যে, হযরত শীষ (আঃ) সর্বপ্রথম নির্মাণ করেন। কিন্তু এটাও আহলে কিতাবের কথা। হাদীস শরীফে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ হযরত ইব্রাহীম (আঃ) মক্কাকে হারাম বানিয়েছিলেন। আমি মদীনাকে হারাম করলাম। এর শিকার খাওয়া হবে না, এখানকার বৃক্ষ কর্তন করা হবে না, এখানে অস্ত্র শস্ত্র উঠানো নিষিদ্ধ।

সহীহ মুসলিম শরীফে একটি হাদীস রয়েছে যে, জনগণ টাটকা খেজুর নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে হাযির হলে তিনি আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা জানিয়ে বলতেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি আমাদের খেজুরে, আমাদের শহরে এবং আমাদের ওজনে বরকত দান করুন। হে আল্লাহ! ইব্রাহীম (আঃ) আপনার বান্দা, আপনার দোস্ত এবং আপনার রাসূল ছিলেন। আমিও আপনার বান্দা ও আপনার রাসূল। তিনি আপনার নিকট মক্কার জন্যে প্রার্থনা জানিয়েছিলেন। আমিও আপনার নিকট মদীনার জন্যে প্রার্থনা জানাচ্ছি। যেমন তিনি মক্কার জন্যে প্রার্থনা জানিয়েছিলেন, বরং এরকমই আরও একটি। অতঃপর কোন ছোট ছেলেকে ডেকে ঐ খেজুর তাকে দিয়ে দিতেন। হযরত আনাস বিন মালিক (রাঃ) বর্ণনা করেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) একবার আবূ তালহা (রাঃ) কে বলেনঃ ‘তোমাদের ছোট ছোট বালকদের মধ্যে একটি বালককে আমার খিদমতের জন্যে অনুসন্ধান কর। আবূ আলহা (রাঃ) আমাকেই নিয়ে যান। তখন আমি বিদেশে ও বাড়ীতে তাঁর খিদমতেই অবস্থান করতে থাকি। একদা তিনি বিদেশ হতে আসছিলেন। সম্মুখে উহুদ পর্বত দৃষ্টিগোচর হলে তিনি বলেনঃ ‘এ পর্বত আমাকে ভালবাসে এবং আমিও এ পর্বতকে ভালবাসি'। মদীনা চোখের সামনে পড়লে তিনি বলেনঃ “আল্লাহ! আমি এর দু'ধারের মধ্যবর্তী স্থানকে ‘হারাম’ রূপে নির্ধারণ করছি, যেমন হযরত ইবরাহীম (আঃ) মক্কাকে হারাম’ রূপে নির্ধারণ করেছিলেন। হে আল্লাহ! এর মুদ্দ’, ‘সা’ এবং ওজনে বরকত দান করুন।

হযরত আনাস (রাঃ) হতেই আর একটি হাদীস বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ হে আল্লাহ! মক্কায় আপনি যে বরকত দান করেছেন তার দ্বিগুণ বরকত মদীনায় দান করুন। আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহ! ইবরাহীম (আঃ) মক্কাকে হারাম’ বানিয়েছিলেন, আমিও মদীনাকে হারাম’ বানালাম। এখানে কাউকেও হত্যা করা হবে না এবং চারা (পশুর খাদ্য ) ছাড়া বৃক্ষাদির পাতাও ঝরানো হবে না। এ বিষয়ের আরও বহু হাদীস রয়েছে যদ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, মক্কার মত মদীনাও হারাম শরীফ। এখানে এসব হাদীস বর্ণনা করায় আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে মক্কা শরীফের মর্যাদা ও এখানকার নিরাপত্তার বর্ণনা দেয়া। কেউ কেউতো বলেন যে, প্রথম হতেই এটা মর্যাদাপূর্ণ ও নিরাপদ স্থান। আবার কেউ কেউ বলেন যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর আমল হতে এর মর্যাদা ও নিরাপত্তা সূচীত হয়। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই বেশী স্পষ্ট।

সহীহ বুখারী ও মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মক্কা বিজয়ের দিন বলেছেনঃ 'যখন হতে আল্লাহ তা'আলা নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল সৃষ্টি করেন তখন থেকেই এই শহরকে মর্যাদাপূর্ণরূপে বানিয়েছেন। এখন কিয়ামত পর্যন্ত এর মর্যাদা অক্ষুন্নই থাকবে। এখানে যুদ্ধ বিগ্রহ কারও জন্যে বৈধ নয়। আমার জন্যেও শুধুমাত্র আজকের দিনে ক্ষণেকের জন্যে বৈধ ছিল। এর অবৈধতা রয়েই গেল। জেনে রেখো এর কাটা কাটা হবে না। এর শিকার তাড়া করা হবে না। এখানে কারও পতিত হারানো জিনিস উঠিয়ে নেয়া হবে না, কিন্তু যে ওটা (মালিকের নিকট ) পৌছিয়ে দেবে তার জন্যে জায়েযু। এর ঘাস কেটে নেয়া হবে না। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, তিনি এ হাদীসটি খুত্বায় বর্ণনা করেছিলেন এবং হযরত আব্বাসের (রাঃ) প্রশ্নের কারণে তিনি ইযখার’ নামক ঘাস কাটার অনুমতি দিয়েছিলেন।

হযরত আমর বিন সাঈদ (রাঃ) যখন মক্কার দিকে সেনাবাহিনী প্রেরণ করছিলেন সেই সময়ে হযরত ইবনে শুরাইহ্ আদভী (রাঃ) তাকে বলেনঃ “হে আমীর! মক্কা বিজয়ের দিন অতি প্রত্যুষে রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে খুত্ব দেন তা আমি নিজ কানে শুনেছি, মনে রেখেছি এবং সেই সময় আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)কে স্বচক্ষে দেখেছি- আল্লাহ তাআলার প্রশংসার পর তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তাআলাই মক্কাকে হারাম করেছেন, মানুষ করেনি। কোন মুমিনের জন্যে এখানে রক্ত প্রবাহিত করা এবং বৃক্ষাদি কেটে নেয়া বৈধ নয়। যদি কেউ আমার এই যুদ্ধকে প্রমাণরূপে গ্রহণ করতে চায় তবে তাকে বলবে যে, আমার জন্যে শুধুমাত্র আজকের দিন এই মুহূর্তের জন্যেই যুদ্ধ বৈধ ছিল। অতঃপর পুনরায় এ শহরের মর্যাদা ফিরে এসেছে যেমন কাল ছিল। সাবধান! তোমরা যারা উপস্থিত রয়েছ, তাদের নিকট অঅবশ্যই এ সংবাদ পৌঁছিয়ে দেবে যারা আজ এ সাধারণ জনসমাবেশে নেই। কিন্তু আমার এ হাদীসটি শুনে পরিষ্কারভাবে উত্তর দেনঃ ‘আমি তোমার চেয়ে এ হাদীসটি বেশী জানি। 'হারাম শরীফ অবাধ্য রক্ত পিপাসুকে এবং ধ্বংসকারীকে রক্ষা করে না।” (বুখারী ও মুসলিম)। কেউ যেন এ দুটো হাদীসকে পরস্পর বিরোধী মনে না করেন। এ দুটোর মধ্যে সাদৃশ্য এভাবে হবে যে, মক্কা প্রথম দিন হতেই মর্যাদাপূর্ণ তো ছিলই, কিন্তু হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সম্মান ও মর্যাদার কথা প্রচার করেন। যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তো রাসূল তখন হতেই ছিলেন যখন হযরত আদম (আঃ) এর খামির প্রস্তুত হয়েছিল, বরং সেই সময় হতেই তার নাম শেষ নবী রূপে লিখিত ছিল। কিন্তু তথাপিও হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর নবুওয়াতের জন্যে আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা জানিয়ে বলেছিলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! তাদের মধ্যে হতেই একজন রাসূল তাদের মধ্যে প্রেরণ করুন। (২:১২৯) এ প্রার্থনা আল্লাহ কবুল করেন এবং তকদীরে লিখিত ঐ কথা প্রকাশিত হয়। একটি হাদীসে রয়েছে যে, জনগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বলেন ? ‘আপনার নবুওয়াতের সূত্রের কথা কিছু আলোচনা করুন। তখন তিনি বলেনঃ ‘আমার পিতা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর প্রার্থনা, হযরত ঈসা (আঃ)-এর সংবাদ এবং আমার মায়ের স্বপ্ন। তিনি স্বপ্নে দেখেন যে, তার মধ্য হতে যেন একটি নূর বেরিয়ে গেল যা সিরিয়ার প্রাসাদগুলোকে আলোকিত করে দিলো এবং তা দৃষ্টিগোচর হতে থাকলো।

মক্কা ও মদীনার মধ্যে বেশী উত্তম কোনটি?

জামহুরের মতে মদীনার চেয়ে মক্কা বেশী উত্তম। ইমাম মালিক ও তাঁর অনুসারীদের মাযহাব অনুসারে মক্কা অপেক্ষা মদীনা বেশী উত্তম। এ দু'দলেরই প্রমাণাদি সত্বরই ইনশাআল্লাহ আমরা বর্ণনা করবো। হযরত ইবরাহীম (আঃ) প্রার্থনা করেছেনঃ “হে আল্লাহ! এই স্থানকে নিরাপদ শহর করে দিন।” অর্থাৎ এখানে অবস্থানকারীদেরকে ভীতি শূন্য রাখুন। আল্লাহ তাআলা তা কবুল করে নেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ যে কেউ তার মধ্যে প্রবেশ করলো সে নিরাপদ হয়ে গেলো। (৩:৯৭) অন্য জায়গায় আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ তারা কি দেখে না যে, আমি হারাম’কে নিরাপত্তা দানকারী করেছি? ওর আশ পাশ হতে মানুষকে ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এবং এখানে তারা পূর্ণ নিরপত্তা লাভ করছে।' (২৯:৬৭) এ প্রকারের আরও বহু আয়াত রয়েছে এবং এ সম্পর্কীয় বহু হাদীসও উপরে বর্ণিত হয়েছে যে, মক্কা শরীফে যুদ্ধ বিগ্রহ হারাম। হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন-আমি রাসূলুল্লাহ
(সঃ) কে বলতে শুনেছিঃ মক্কায় অস্ত্র শস্ত্র উঠাননা কারও জন্যে বৈধ নয়। (সহীহ মুসলিম)' তাঁর এ প্রার্থনা কাবা শরীফ নির্মাণের পূর্বে ছিল, এ জন্যেই বলেছেন, হে আল্লাহ! এই স্থানকে নিরাপত্তা দানকারী শহর বানিয়ে দিন। সূরা-ই- ইব্রাহীমের মধ্যে এ প্রার্থনাই এভাবে রয়েছেঃ (আরবি) (২:১২৬) সম্ভবতঃ এটা দ্বিতীয় বারের প্রার্থনা ছিল, যখন বায়তুল্লাহ শরীফ নির্মিত হয়ে যায় ও শহর বসে যায় এবং হযরত ইসহাক (আঃ) জন্মগ্রহণ করেন, যিনি হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর তিন বছরের ছোট ছিলেন। এজন্যেই এ প্রার্থনার শেষে তার জন্ম লাভের জন্যেও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলার কথা। কেউ কেউ এটাকেও প্রার্থনার অন্তর্ভুক্ত করেছেন।

তখন ভাবার্থ হবে এইঃ কাফিরদেরকেও অল্প দিন শান্তিতে রাখুন, অতঃপর তাদেরকে শাস্তিতে জড়িত করে ফেলুন। আর একে আল্লাহ তা'আলার কালাম বললে ভাবার্থ হবে এই যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) যখন তাঁর সন্তানাদির জন্যে ইমামতির প্রার্থনা জানালেন এবং অত্যাচারীদের বঞ্চিত হওয়ার ঘোষণা শুনলেন। ও বুঝতে পারলেন যে, তার পরে আগমনকারীদের মধ্যে অনেকে অবাধ্যও হবে, তখন তিনি ভয়ে শুধুমাত্র মুমিনদের জন্যেই আহার্যের প্রার্থনা জানালেন। কিন্তু আল্লাহ পাক জানিয়ে দিলেন যে, তিনি ইহলৌকিক সুখ সম্ভোগ কাফিরদেরকেও দেবেন। যেমন অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ আমি তোমার প্রভুর দান এদেরকেও দেবো এবং ওদেরকেও দেবো, তোমার প্রভুর দান কারও জন্যে নিষিদ্ধ নয়। (১৭:২০) অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “নিশ্চয় যারা আল্লাহর উপর মিথ্যা অপবাদ দেয় তারা মুক্তি পায় না, তারা দুনিয়ায় কিছুদিন লাভবান হলেও আমার নিকট যখন তারা ফিরে আসবে তখন আমি তাদেরকে কুফরীর প্রতিফল স্বরূপ কঠিন শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করাবো।

অন্যস্থানে বলেনঃ “কাফিরদের কুফরী যেন তোমাকে দুঃখিত না করে, আমার নিকট তাদেরকে ফিরে আসতে হবে, অতঃপর যে কাজ তারা করেছে তার সংবাদ আমি তাদেরকে দেবো, নিশ্চয় আল্লাহ অন্তর্নিহিত বিষয়সমূহ পূর্ণ অবগত আছেন। আমি তাদেরকে সামান্য সুখ দেয়ার পর ভীষণ শাস্তির মধ্যে জড়িয়ে ফেলবো।” অন্যস্থানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “যদি এটা না হতো যে, (প্রায়) সমস্ত মানুষ একই পথাবলম্বী (কাফির) হয়ে যাবে, তাহলে যারা দয়াময় (আল্লাহ)-এর সাথে কুফরী করে, আমি তাদের জন্য তাদের গৃহসমূহের ছাদ। রৌপ্যের করে দিতাম এবং সিঁড়িগুলোও (রৌপ্যের করে দিতাম), যার উপর দিয়ে তারা আরোহণ করে; এবং তাদের গৃহের দরজাগুলো ও আসনগুলোও (রৌপ্যের করে দিতাম), যার উপর তারা হেলান দিয়ে বসে আর (এসব) স্বর্ণের ও (করে দিতাম), এবং এগুলো শুধুমাত্র পার্থিব জীবনের ক্ষণস্থায়ী ভোগ বিলাসের উপকরণ ছাড়া কিছুই নয়, (শেষে সবই বিলীন হয়ে যাবে) এবং আখেরাত তোমার প্রভুর সমীপে মুত্তাকির জন্যে রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা আরও বলেছেন :অতঃপর আমি তাদেরকে জাহান্নামের শাস্তির মধ্যে জড়িত করে ফেলবো এবং ওটা জঘন্য অবস্থান স্থল। অর্থাৎ তাদেরকে অস্থায়ী জগতে সুখে শান্তিতে রাখার পর ভীষণ শাস্তির দিকে টেনে আনবো। এবং এটা অত্যন্ত জঘন্য অবস্থান স্থল।' এর ভাবার্থ এই যে, আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে দেখছেন এবং অবকাশ দিচ্ছেন, অতঃপর তিনি তাদেরকে কঠিনভাবে পাকড়াও করবেন। যেমন তিনি বলেছেন। (আরবি) অর্থাৎ বহু অত্যাচারী গ্রামবাসীকে আমি অবকাশ দিয়েছি, অতঃপর পাকড়াও করেছি, শেষে তো তাদেরকে আমারই নিকট প্রত্যাবর্তন করতে হবে। (২২:৪৮)

সহীহ বুখারী ও মুসলিমে রয়েছে যে, কষ্টদায়ক কথা শুনে আল্লাহ অপেক্ষা বেশী ধৈর্য ধারণকারী আর কেউই নেই। তারা তার সন্তানাদি সাব্যস্ত করছে অথচ তিনি তাদেরকে আহার্যও দিচ্ছেন এবং নিরাপত্তাও দান করেছেন। অন্য সহীহ হাদীসেও রয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা অত্যাচারীকে ঢিল দেন, তৎপর হঠাৎ তাদেরকে ধরে ফেলেন। তারপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিম্নের আয়াতটি পাঠ করেন- (আরবি)

অর্থাৎ তোমার প্রভুর পাকড়াও এরকমই যে, যখন তিনি কোন অত্যাচারী গ্রামবাসীকে পাকড়াও করেন, তখন নিশ্চয়ই তার পাকড়াও কঠিন যন্ত্রণাদায়ক। (১১:১০২) এই বাক্যকে হ্যরত ইবরাহীম (আঃ)-এর প্রার্থনার অন্তর্ভুক্ত করার পঠন খুবই বিরল এবং তা সপ্ত পাঠকের পঠনের বিপরীত। রচনা। রীতিরও এটা উল্টো। কেননা (আরবি) ক্রিয়া পদের (আরবি) টি আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তিত হচ্ছে, কিন্তু এ বিরল পঠনে এর কর্তা ও উক্তিকারী হযরত ইবরাহীমই (আঃ), হচ্ছেন এবং এটা বাক্যরীতির সম্পূর্ণ উল্টো (আরবি) শব্দটি এর বহুবচন (আরবি) এর অর্থ হচ্ছে থামের নিম্নতল এবং ভিত্তি। আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবীকে (সঃ) বলেনঃ “হে মুহাম্মদ (সঃ)! তুমি তোমার কওমকে হযরত ইবরাহীমের (আঃ) ভিত্তির সংবাদ দিয়ে দাও।' একটি কিরআতে (আরবি)-এর পরে (আরবি) ও রয়েছে। ওরই প্রমাণ রূপে পরে (আরবি) শব্দটিও এসেছে।

আন্তরিক প্রার্থনা

হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও ইসমাঈল (আঃ) শুভ কাজে লিপ্ত রয়েছেন এবং তা গৃহীত হয় কি না এ ভয়ও তাঁদের রয়েছে। এ জন্যেই তারা মহান আল্লাহর নিকট এটা কবুল করার প্রার্থনা জানাচ্ছেন। হযরত অহীব বিন অরদ (রঃ) এ আয়াতটি পাঠ করে খুব ক্রন্দন করতেন এবং বলতেন :‘হায়! আল্লাহ তা'আলার প্রিয় বন্ধু এবং গৃহীত নবী হযরত ইবরাহীম (আঃ) আল্লাহর কাজ তাঁর হুকুমেই করছেন, তাঁর ঘর তাঁরই হুকুমে নির্মাণ করছেন, তথাপি ভয় করছেন যে, না জানি আল্লাহর নিকট এটা না মঞ্জুর হয়। মহান আল্লাহ মু'মিনদের অবস্থা এরকমই বর্ণনা করেছেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ তারা সৎ কার্যাবলী সম্পাদন করে এবং দান খয়রাত করে অথচ তাদের অন্তর আল্লাহর ভয়ে কম্পিত থাকে (এই ভয়ে যে, না-জানি আল্লাহর দরবারে গৃহীত হয় কি না!)' (২৩:৬০) যেমন সহীহ হাদীসে এসেছে, যা হযরত আয়েশা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে বর্ণনা করেছেন, অতি সত্বরই তা নিজ স্থানে আসছে। কোন কোন মুফাসির বলেছেন যে, ভিত্তি উত্তোলন করতেন হযরত ইবরাহীম (আঃ) এবং প্রার্থনা করতেন হযরত ইসমাইল (আঃ)। কিন্তু সঠিক কথা এই যে, উভয়ই উভয় কাজে অংশীদার ছিলেন। সহীহ বুখারী শরীফের একটি বর্ণনা এবং অন্যান্য আরও কয়েকটি হাদীসও এ ঘটনা সম্পর্কে এখানে বর্ণনা করা যেতে পারে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, স্ত্রী লোকেরা কোমর বন্ধনী বাধার নিয়ম হযরত ইসমাঈলের (আঃ) মাতার নিকট হতেই শিখেছে। তিনি ওটা বেঁধে ছিলেন যাতে তার পদচিহ্ন মিটিয়ে যায়, ফলে যেন হযরত শারিয়া (রাঃ) তার পদচিহ্ন দেখতে না পান। হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁকে এবং তার কলিজার টুকরা একটি মাত্র সন্তান হযরত ইসমাঈল (আঃ) কে নিয়ে বের হন। সেই সময় এই প্রাণপ্রিয় শিশু দুধ পান করতো। এখন যেখানে বায়তুল্লাহ শরীফ নির্মিত রয়েছে সে সময় তথায় একটি পাহাড় ছিল এবং বিজন মরুভূমি রূপে পড়েছিল। তখন তথায় কেউই বাস করতো না। এখানে মা ও শিশুকে বসিয়ে তাদের পার্শ্বে সামান্য খেজুর ও এক মশক পানি রেখে যখন হযরত ইবরাহীম (আঃ) পিট ফিরিয়ে চলে যেতে আরম্ভ করেন, তখন হযরত হাজেরা (রাঃ) তাঁকে ডাক দিয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহর বন্ধু! এরকম ভীতিপ্রদ বিজন মরুভূমির মধ্যে যেখানে আমাদের কোন বন্ধু ও সাথী নেই, আমাদেরকে ফেলে আপনি কোথায় যাচ্ছেন? কিন্তু হযরত ইবরাহীম (আঃ) কোন উত্তর দেননি, এমনকি ঐ দিকে ফিরেও তাকাননি। হযরত হাজেরা (রাঃ) বারবার বলার পরেও যখন তিনি কোন ক্ষেপ না করেন তখন তিনি বলেন, হে আল্লাহর প্রিয়! আমাদেরকে আপনি কার নিকট সমর্পণ করে গেলেন?' হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেন, আল্লাহ তা'আলার নিকট।' তিনি বলেন, হে আল্লাহর দোস্ত! এটা কি আপনার উপর আল্লাহর নির্দেশ?' হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেন, 'হা, আমার উপর আল্লাহ তাআলার এটাই নির্দেশ। একথা শুনে হযরত হাজেরা (রাঃ) সান্ত্বনা লাভ করেন এবং বলেন ? তাহলে আপনি যান। আল্লাহ আমাদেরকে কখনও ধ্বংস করবেন না। তাঁরই উপর আমরা নির্ভর করছি এবং তিনিই আমাদের আশ্রয়স্থল।' হযরত হাজেরা (রাঃ) ফিরে আসেন এবং স্বীয় প্রাণের মণি, চক্ষের জ্যোতি, আল্লাহর নবীর পুত্র হযরত ইসমাঈল (আঃ) কে ক্রোড়ে ধারণ করে ঐ জনহীন প্রান্তরে, সেই আল্লাহর জগতে বাধ্য ও নিরুপায় হয়ে বসে পড়েন। হযরত

ইবরাহীম (আঃ) যখন সানিয়া নামক স্থানে পৌঁছেন এবং অবগত হন যে, হযরত হাজেরা (রাঃ) পিছনে নেই এবং ওখান হতে এখন পর্যন্ত তার দৃষ্টিশক্তি কাজ করবে না, তখন তিনি বায়তুল্লাহ শরীফের দিকে মুখ করে আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা করেন :“হে আমার প্রভু! আমার সন্তানাদিকে আপনার পবিত্র ঘরের পার্শ্বে একটি অনাবাদী ভূমিতে ছেড়ে এসেছি। যেন তারা নামায প্রতিষ্ঠিত করে, আপনি মানুষের অন্তর ওদের দিকে ঝুঁকিয়ে দিন এবং ওদেরকে ফলের আহার্য দান করুন। সম্ভবতঃ তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। হযরত ইবরাহীম (আঃ) তো প্রার্থনা করে আল্লাহ তাআলার নিদের্শ পালন করতঃ স্বীয় সহধর্মিনী ও ছেলেকে আল্লাহর নিকট সমর্পণ করে চলে যান, আর এদিকে হযরত হাজেরা (রাঃ) ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতার সাথে শিশুকে নিয়েই মনে তৃপ্তি লাভ করছিলেন। ঐ অল্প খেজুর ও সামান্য পানি শেষ হয়ে গেল। এখন কাছে না আছে এক গ্রাস আহার্য বা না আছে এক ঢাকে পানি। নিজেও ক্ষুধা ও পিপাসায় কাতর এবং শিশুও ভুক ও তৃষ্ণায় ওষ্ঠাগত প্রাণ। এমন কি সেই নিস্পাপ নবী পুত্রের ফুলের ন্যায় চেহারা মলিন হতে থাকে। মা কখনও নিজের একাকিত্বের ও আশ্রয় হীনতার কথা চিন্তা করছিলেন, আবার কখনও নিজের একমাত্র অবুঝ শিশুর অবস্থা দুশ্চিন্তার সাথে লক্ষ্য করছিলেন এবং সহ্য করে চলছিলেন। এটা জানা ছিল যে, এরকম ভয়াবহ জঙ্গলের ভিতর দিয়ে মানুষের গমনাগমন অসম্ভব। বহু মাইল পর্যন্ত আবাদী ভূমির চিহ্নমাত্র নেই। খাবার তো দূরের কথা এক ফোঁটা পানিরও ব্যবস্থা হতে পারে না। তিনি উঠে চলে যান। নিকটবর্তী, সাফা পাহাড়ের উপর আরোহণ করেন এবং প্রান্তরের এ নিক্ষেপ করেন যে, কোন লোককে যেতে আসতে দেখা যায় কি না। কিন্তু দৃষ্টি নিরাশ হয়ে ফিরে আসে। সুতরাং তিনি সেই পাহাড় হতে নেমে পড়েন এবং অঞ্চল উঁচু করে মারওয়া পাহাড়ের দিকে দৌড়াতে আরম্ভ করেন। ওর উপর চড়েও চতুর্দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন। কিন্তু কাউকে না দেখে পুনরায় সেখান হতে অবতরণ করেন। এভাবেই মধ্যবর্তী সামান্য অংশ দৌড়িয়ে অবশিষ্ট অংশ তাড়াতাড়ি অতিক্রম করেন। আবার সাফা পাহাড়ের উপর চড়েন। এভাবে সাতবার দৌড়াদৌড়ি করেন, প্রত্যেক বার শিশুকে দেখেন যে, তার অবস্থা ক্রমে ক্রমেই মন্দের দিকে যাচ্ছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, হাজীরা যে, ‘সাফা' ও মারওয়া পাহাড়ে দৌড়িয়ে থাকেন তার সূচনা এখান থেকেই হয়। সপ্তম বারে যখন হাজেরা (রাঃ) মারওয়ার উপর আসেন তখন একটা শব্দ তার কানে আসে। অত্যন্ত সতর্কতার সাথে তিনি এই শব্দের দিকে মনোযোগ দেন। আবার শব্দ তার কানে আসে এবং এবারে স্পষ্টভাবে শুনা যায়। সুতরাং তিনি শব্দের দিকে এগিয়ে যান এবং এখন যেখানে যমযম কূপ রয়েছে তথায় হযরত জিবরাঈল (আঃ) কে দেখতে পান। হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ আপনি কে? তিনি উত্তর দেনঃ আমি হাজেরা, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ছেলের মা। ফেরেশতা জিজ্ঞেস করেনঃ হযরত ইবরাহীম (আঃ) আপনাকে এই নির্জন মরুপ্রান্তরে কার নিকট সপর্দ করেছেন?' তিনি বলেনঃ আল্লাহ তা'আলার নিকট। তখন ফেরেশতা বলেনঃ “তা হলে তিনিই যথেষ্ট। হযরত হাজেরা (রাঃ) বলেন, “হে অদৃশ্য ব্যক্তি! শব্দ তো আমি শুনলাম। এটা আমার কোন কাজে আসবে তো?'

যমযম্ কূপ

হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাঁর পায়ের গোড়ালি দিয়ে মাটির উপর ঘর্ষণ করা মাত্রই তথায় মাটি হতে একটি ঝরণা বইতে থাকে। হযরত হাজেরা (রাঃ) তার হাত দ্বারা পানি উঠিয়ে তার মশক ভর্তি করে নেন। পানি চতুর্দিকে ব্যাপ্ত হয়ে পড়বে এ চিন্তা করে ঝরণার চার দিকে মাটির বেষ্টনি দিয়ে দেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর মায়ের উপর সদয় হউন, যদি তিনি এভাবে পানি আটকিয়ে না রাখতেন তবে যম কূপের আকার বিশিষ্ট হতো না, বরং প্রবাহিত নদীর রূপ ধারণ করতো। তখন হযরত হাজেরা (রাঃ) নিজেও পানি পান করেন এবং শিশুকেও পান করিয়ে দেন। অতঃপর শিশুকে দুধ পান করাতে থাকেন। ফেরেশতা তা





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।