সূরা আল-বাকারা (আয়াত: 116)
হরকত ছাড়া:
وقالوا اتخذ الله ولدا سبحانه بل له ما في السماوات والأرض كل له قانتون ﴿١١٦﴾
হরকত সহ:
وَ قَالُوا اتَّخَذَ اللّٰهُ وَلَدًا ۙ سُبْحٰنَهٗ ؕ بَلْ لَّهٗ مَا فِی السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضِ ؕ کُلٌّ لَّهٗ قٰنِتُوْنَ ﴿۱۱۶﴾
উচ্চারণ: ওয়াকা-লুত্তাখাযাল্লা-হু ওয়ালাদান ছুবহা-নাহূ বাল লাহূ মা-ফিছছামা-ওয়া-তি ওয়াল আরদিকুল্লুল লাহূকা-নিতূন।
আল বায়ান: আর তারা বলে, আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন। তিনি পবিত্র মহান; বরং আসমানসমূহ ও যমীনে যা কিছু আছে তা তাঁরই । সব তাঁরই অনুগত।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১১৬. আর তারা বলে, ‘আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন’। তিনি (তা থেকে) অতি পবিত্র।(১) বরং আসমান ও যমীনে যা কিছু আছে সবই আল্লাহর। সবকিছু তারই একান্ত অনুগত।
তাইসীরুল ক্বুরআন: তারা বলে যে, আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন, তিনি অতি পবিত্র, বরং যা কিছু আকাশসমূহে এবং ভূ-মন্ডলে আছে সমস্তই তাঁর, সকলই তাঁর অনুগত।
আহসানুল বায়ান: ১১৬। তারা বলে, ‘আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন।’ তিনি (আল্লাহ) মহান পবিত্র। বরং আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সব আল্লাহরই। সবকিছু তাঁরই একান্ত অনুগত।
মুজিবুর রহমান: এবং তারা বলে, আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন। তিনি পরম পবিত্র! বরং যা কিছু আসমানে ও ভূমন্ডলে রয়েছে তা তাঁরই জন্য; সবই তাঁর আজ্ঞাধীন।
ফযলুর রহমান: তারা বলেছে, “আল্লাহ একজন সন্তান গ্রহণ করেছেন।” (এই অপবাদ থেকে) তিনি পবিত্র। বরং আসমান-জমিনে যা কিছু আছে সবই তাঁর। সবাই তাঁর অনুগত।
মুহিউদ্দিন খান: তারা বলে, আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন। তিনি তো এসব কিছু থেকে পবিত্র, বরং নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলে যা কিছু রয়েছে সবই তার আজ্ঞাধীন।
জহুরুল হক: আর তারা বলে -- “আল্লাহ্ একটি ছেলে গ্রহণ করেছেন” । তাঁরই মহিমা হোক! বরং মহাকাশমন্ডলে ও পৃথিবীতে যা-কিছু আছে সে-সব তাঁরই, সবাই তাঁর আজ্ঞা পালনকারী।
Sahih International: They say, "Allah has taken a son." Exalted is He! Rather, to Him belongs whatever is in the heavens and the earth. All are devoutly obedient to Him,
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১১৬. আর তারা বলে, ‘আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন’। তিনি (তা থেকে) অতি পবিত্র।(১) বরং আসমান ও যমীনে যা কিছু আছে সবই আল্লাহর। সবকিছু তারই একান্ত অনুগত।
তাফসীর:
(১) নাসারারা বলে থাকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সন্তান গ্রহণ করেছেন। অথচ এটা সম্পূর্ণ একটি অপবাদ। কুরআনের অন্যত্র এসেছে, তারা দয়াময়ের প্রতি সন্তান আরোপ করে। অথচ সন্তান গ্রহণ করা দয়াময়ের শোভন নয়! আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে এমন কেউ নেই, যে দয়াময়ের কাছে বান্দারূপে উপস্থিত হবে না। [সূরা মারইয়ামঃ ৯১-৯৩] এ সম্পর্কে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “আল্লাহ বলেন, মানুষ আমার উপর মিথ্যারোপ করে, অথচ তাদের এটা উচিত নয়। মানুষ আমাকে গালি দেয়, অথচ তাও তাদের জন্য উচিত নয়। মিথ্যারোপ করার অর্থ হলো, তারা বলে, আমি তাদের মৃত্যুর পর জীবিত করে পূর্বের ন্যায় করতে সক্ষম নই। আর গালি দেয়ার অর্থ হলো, তারা বলে যে, আমার পুত্র আছে। অথচ স্ত্রী বা সন্তান গ্রহণ করা থেকে আমি পবিত্র।” [বুখারীঃ ৪৪৮২] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেছেন, “কষ্টদায়ক কথা শুনার পর আল্লাহর চেয়ে বেশী ধৈর্যশীল আর কেউ নেই, মানুষ তার জন্য সন্তান সাব্যস্ত করে, তারপরও তিনি তাদেরকে নিরাপদে রাখেন ও রিযিক দেন।” [বুখারী: ৭৩৭৮, মুসলিম: ২৮০৪]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: ১১৬। তারা বলে, ‘আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন।’ তিনি (আল্লাহ) মহান পবিত্র। বরং আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সব আল্লাহরই। সবকিছু তাঁরই একান্ত অনুগত।
তাফসীর:
-
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১১৬ ও ১১৭ নং আয়াতের তাসফীর:
এ আয়াত দ্বারা ইয়াহূদী, খ্রিস্টান ও মুশরিকদের কথার প্রতিবাদ করা হয়েছে। তাদের কথা আল্লাহ তা‘আলার সন্তান আছে। যেমন অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা তাদের কথা তুলে ধরেছেন-
(وَقَالَتِ الْیَھُوْدُ عُزَیْرُ اۨبْنُ اللہِ وَقَالَتِ النَّصٰرَی الْمَسِیْحُ ابْنُ اللہِﺚ ذٰلِکَ قَوْلُھُمْ بِاَفْوَاھِھِمْﺆ یُضَاھِئُوْنَ قَوْلَ الَّذِیْنَ کَفَرُوْا مِنْ قَبْلُﺚ قٰتَلَھُمُ اللہُﺇ اَنّٰی یُؤْفَکُوْنَ)
“ইয়াহূদীগণ বলে, ‘উযায়ের আল্লাহর পুত্র’, এবং খ্রিস্টানগণ বলে, ‘মাসীহ আল্লাহর পুত্র।’সেটা তাদের মুখের কথা। পূর্বে যারা কুফরী করেছিল তারা তাদের মতো কথা বলে। আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করুন। আর কোন্ দিকে তাদেরকে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে!” (সূরা তাওবাহ ৯:৩০)
তিনি আরো বলেন:
(وَيَجْعَلُونَ لِلّٰهِ الْبَنَاتِ)
“তারা নির্ধারণ করে আল্লাহর জন্য কন্যা সন্তান।” (সূরা নাহ্ল ১৬:৫৭)
আল্লাহ তা‘আলা সবকিছুর একচ্ছত্র মালিক। তিনি সৃষ্টিকর্তা, রিযিকদাতা, সবকিছুর নিয়ন্ত্রণকারী ইত্যাদি। সবকিছু তাঁরই মুখাপেক্ষী। তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন। আল্লাহ তা‘আলার সমতুল্য কেউ নেই, কোন দৃষ্টান্ত নেই। তাই কিভাবে তাঁর সন্তান বা স্ত্রী থাকতে পারে?
এদের প্রতিবাদে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(بَلْ لَّه۫ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ)
“বরং আসমান ও জমিনে যা আছে সবই তাঁর জন্য।” (সূরা বাকারাহ ২:১১৬)
তিনি আরো বলেন:
(وَمَا یَنْۭبَغِیْ لِلرَّحْمٰنِ اَنْ یَّتَّخِذَ وَلَدًاﮫﺚاِنْ کُلُّ مَنْ فِی السَّمٰوٰتِ وَالْاَرْضِ اِلَّآ اٰتِی الرَّحْمٰنِ عَبْدًا)
“আর সন্তান গ্রহণ করা দয়াময়ের জন্য শোভন নয়! আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে এমন কেউ নেই, যে দয়াময়ের নিকট বান্দারূপে উপস্থিত হবে না।”(সূরা মারইয়াম ১৯:৯২-৯৩)
ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন: আদম সন্তান আমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে। অথচ এটা তার উচিত নয়। আদম সন্তান আমাকে গালি দেয়, অথচ তা উচিত নয়। আমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা হল- তাদের বিশ্বাস তারা যেমন ছিল সেরূপ ফিরিয়ে আনতে আমি সক্ষম নই, আর আমাকে গালি দেয়া হল- তারা বলে আমার সন্তান আছে। আমি পবিত্র কোন স্ত্রী বা সন্তান গ্রহণ করা থেকে। (সহীহ বুখারী হা: ৪৪৮২)
তাই কেউ আল্লাহ তা‘আলার সন্তান নয়, স্ত্রী নয় বরং সবাই তাঁর বান্দা, সবাই তাঁর কাছে আনুগত্যশীল, বিনয়ী-নম্র। আল্লাহ তা‘আলা আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা। যখন তিনি কোন কিছু করার ইচ্ছা পোষণ করেন তখন শুধু বলেন: “হয়ে যাও”সাথে সাথে তা হয়ে যায়।
অনুরূপ সূরা ইয়াসীনের ৮২ নং আয়াত, সূরা আল-ইমরানের ৫৯ নং আয়াতেও বলা হয়েছে। ==
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. আল্লাহ তা‘আলা স্ত্রী-সন্তান গ্রহণ করা থেকে পুত-পবিত্র। তিনি একক, তাঁর কোন দ্বিতীয় নেই।
২. আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া যা কিছু আছে সবই তাঁর বান্দা ও মাখলুক।
৩. আল্লাহ তা‘আলার সাথে শরীক নির্ধারণ করা তাঁকে কষ্ট দেয়ার শামিল।
৪. আল্লাহ তা‘আলা ত‘আলার মহত্ব ও বড়ত্ব জানলাম। তিনি কোন ফায়সালা করার ইচ্ছা করলে শুধু ‘হও’বললেই তা হয়ে যায়।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১১৬-১১৭ নং আয়াতের তাফসীর
মহান আল্লাহর সন্তান-সন্ততি নেই একথার যথার্থতার
উপর কতকগুলো দলীল। এ আয়াত দ্বারা এবং এর সঙ্গীয় আয়াতগুলো দ্বারা খ্রীষ্টান, ইয়াহুদী ও মুশরিকদের কথাকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে যারা আল্লাহ তাআলার সন্তানাদি সাব্যস্ত করেছিল। তাদেরকে বলা হচ্ছে যে, আকাশ, পৃথিবী ইত্যাদি সমুদয় বস্তুর তিনি মালিক তো বটেই, ওগুলোর সৃষ্টিকর্তা, আহার দাতা, তাদের ভাগ্য, নির্ধারণকারী, তাদেরকে স্বীয় কর্তৃত্বাধীন আনয়নকারী, তাদের মধ্যে হেরফেরকারী একমাত্র তিনিই। তাহলে তাঁর সৃষ্টজীবের মধ্যে কেউ কেউ তাঁর সন্তান কিরূপে হতে পারে? হযরত ঈসা (আঃ) আল্লাহ তা'আলার পুত্র হতে পারেন না, যেমন ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানেরা ধারণা করতো। ফেরেশতাগণও আল্লাহ তাআলার কন্যা হতে পারে না, যেমন আরবের মুশরিকরা মনে করতো। কেননা, পরস্পর সমান সম্বন্ধযুক্ত দু’টি বস্তু থেকে সন্তান হতে পারে; কিন্তু আল্লাহ তাবারাকা ওয়াতাআলা তো তুলনা বিহীন। মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বে তাঁর সমকক্ষ কেউই নেই। তিনিই তো আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা, সুতরাং তার সন্তান হবে কি রূপে? তার কোন সহধর্মিনীও নেই। তিনিই প্রত্যেক জিনিসের সৃষ্টিকর্তা এবং তিনিই প্রত্যেক জিনিসের পরিচয় অবগত আছেন।
আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তারা বলে- আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন, তোমরা এটা একটা গুরুতর বিষয় উদ্ভাবন করেছে, যদ্দরুণ অসম্ভব নয় যে, আকাশ ফেটে যাবে এবং যমীন খণ্ড বিখণ্ড হয়ে উড়ে যাবে, আর পর্বত ভেঙ্গে পড়বে-এজন্যে যে, তারা আল্লাহর প্রতি সন্তানের সম্বন্ধ আরোপ করেছে, অথচ আল্লাহর শান এ নয় যে, তিনি সন্তান গ্রহণ করেন। আকাশসমূহে ও পৃথিবীতে যত কিছুই আছে, সমস্তই আল্লাহর সম্মুখে দাসরূপে উপস্থিত হবে। তিনি সকলকে বেষ্টন করে আছেন এবং সকলকে গণনা করে রেখেছেন। কিয়ামতের দিন তারা সবাই তার সমীপে একা একা উপস্থিত হবে। সুতরাং দাস সন্তান হতে পারে না। মনিব ও সন্তান এ দুটো বিপরীত মুখী ও পরস্পর বিরোধী। অন্য স্থানে একটি পূর্ণ সূরায় আল্লাহ তা'আলা একে নাকচ করে দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তাদেরকে তুমি বলে দাও যে, তিনি (আল্লাহ) এক। আল্লাহ অমুখাপেক্ষী। তাঁর কোন সন্তান-সন্ততি নেই এবং তিনিও কারও সন্তান নন। তাঁর সমতুল্য কেউই নেই। এই আয়াতসমূহে এবং এরকম আরও বহু আয়াতে সেই বিশ্ব প্রভু স্বীয় পবিত্রতা বর্ণনা করেছেন, তিনি যে তুলনা ও নবীর বিহীন এবং অংশীদার বিহীন তা সাব্যস্ত করেছেন, আর মুশরিকদের এ জঘন্য বিশ্বাসের মূলে কুঠারাঘাত করেছেন। তিনি তো সবারই সৃষ্টিকর্তা ও সবারই প্রভু। সুতরাং তার সন্তান-সন্ততি ও ছেলে-মেয়ে হবে কোথেকে?
সূরা বাকারার এ আয়াতের তাফসীরে সহীহ বুখারীর একটি হাদীস-ইকুদসীতে আছে যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ‘আদম সন্তান আমাকে মিথ্যা প্রতিপাদন করে, অথচ এটা তাদের জন্য উচিত ছিল না, তারা আমাকে গালি দেয় তাদের জন্যে এটা শোভনীয় ছিল না। তাদের মিথ্যা প্রতিপাদন তো এটাই যে, তাদের ধারণায় আমি তাদেরকে মেরে ফেলার পর পুনরায় জীবিত করতে সক্ষম নই; এবং তাদের গালি দেয়া এই যে, তারা আমার সন্তান গ্রহণ করা সাব্যস্ত করে, অথচ আমার স্ত্রী ও সন্তানাদি হওয়া থেকে আমি সম্পূর্ণ পবিত্র ও তা হতে বহু ঊর্ধে। এই হাদীসটিই অন্য সনদে এবং অন্যান্য কিতাবেও শব্দের বিভিন্নতার সাথে বর্ণিত হয়েছে।
সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘মন্দ কথা শ্রবণ করে বেশী ধৈর্য ধারণকারী আল্লাহ তা'আলা অপেক্ষা আর কেউ নেই। মানুষ তার সন্তান সাব্যস্ত করছে, অথচ তিনি তাদেরকে আহার্য দিচ্ছেন। এবং নিরাপদে রাখছেন। অতঃপর তিনি বলেনঃ প্রত্যেক জিনিসই তার অনুগত, তাঁকে খাটি অন্তরে মেনে থাকে, কিয়ামতের দিন সবই তাঁর সামনে হাত জোড় করে দাঁড়াবে, দুনিয়ার সবাই তার উপাসানায়রত আছে। যাকে তিনি বলেন এ রকম হও, এভাবে নির্মিত হও তা ঐ রকমই হয়ে যায় এবং ঐভাবেই নির্মিত হয়। এরকমই প্রত্যেকে তাঁর সামনে বিনীত ও বাধ্য। কাফিরদের ইচ্ছা না থাকলেও তাদের ছায়া আল্লাহ তাআলার সামনে ঝুঁকেই থাকে। কুরআন মাজীদের মধ্যে আল্লাহ তাআলা অন্য জায়গায় বলেছেনঃ ‘আকাশ ও পৃথিবীর প্রতিটি জিনিস ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক আল্লাহকে সিজদাহ করে থাকে, সকাল সন্ধ্যায় তাদের ছায়া ঝুঁকে থাকে। একটি হাদীসে বর্ণিত আছে যে, কুরআন কারীমের মধ্যে যেখানেই (আরবি) শব্দ রয়েছে সেখানেই ভাবার্থ হচ্ছে আনুগত্য। কিন্তু এর মারফু হওয়া সঠিক নয়। সম্ভবত এটা কোন সাহাবী (রাঃ) বা অন্য কারও কথা হবে। এ সনদে অন্যান্য আয়াতের তাফসীরও মারফু রূপে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু স্মরণ রাখা উচিত যে, এটা দুর্বল। কোন ব্যক্তি যেন এতে প্রতারণায় না পড়ে।
পূর্বে আকাশ ও পৃথিবীর কোন নমুনা ছিল না
এরপর আল্লাহ পাক বলেন যে, পূর্বে আকাশ ও পৃথিবীর কোন নমুনা ছিল , প্রথম বারই তিনি এই দুই এর সৃষ্টিকর্তা। (আরবি)-এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে নতুন সৃষ্টি করা।' হাদীসে রয়েছেঃ প্রত্যেক নব-সৃষ্টি হচ্ছে বিদআত এবং প্রত্যেক বিদআতই পথভ্রষ্টতা।' এততা হলো শরীয়তের পরিভাষায় বিদআত। কখনো কখনো (আরবি) শব্দের প্রয়োগ শুধুমাত্র আভিধানিক অর্থেই হয়ে থাকে। তখন শরীয়তের ‘বিদআত বুঝায় না। হযরত উমার (রাঃ) জনগণকে তারাবীর নামাযে একত্রিত করে বলেনঃ “এটা ভাল বিদআত।” (আরবি) শব্দটি (আরবি) শব্দ হতে ফিরানো হয়েছে। যেমন (আরবি) হতে (আরবি) এবং (আরবি) হতে (আরবি) ইত্যাদি। -এর অর্থ হচ্ছে নতুন সৃষ্টিকারী। অর্থাৎ বিনা দৃষ্টান্তে বিনা নমুনায় এবং পূর্বের সৃষ্টি ছাড়াই সৃষ্টিকারী।
বিদআত পন্থীদেরকে ‘বিদআতী' বলার কারণও এই যে, তারাও আল্লাহ তা'আলার দ্বীনের মধ্যে ঐ কাজ বা নিয়ম আবিষ্কার করে যা তার পূর্বে শরীয়তের মধ্যে ছিল না। অনুরূপভাবে কোন নতুন কথা উদ্ভাবনকারীকে আরবের লোকেরা (আরবি) বলে থাকে। ইমাম ইবনে জারীরের (রঃ) মতে এর ভাবার্থ এই যে, মহান আল্লাহ সন্তানাদি হতে পবিত্র। তিনি গগন ও ভূবনের সমস্ত জিনিসের মালিক। প্রত্যেক জিনিসই তাঁর একত্ববাদের সাক্ষ্য বহন করে। সব কিছুই তাঁর অনুগত। সব কিছুরই সৃষ্টিকর্তা, নির্মাতা, স্থপয়িতা, মূল ও নমুনা ছাড়াই ঐ সবকে অস্তিত্বে আনয়নকারী একমাত্র সেই বিশ্বভু আল্লাহ তা'আলাই। স্বয়ং হযরত ঈসা (আঃ) এর সাক্ষী ও বর্ণনাকারী। যে প্রভু এসব জিনিস বিনা মূলে ও নমুনায় সৃষ্টি করেছেন। তিনিই হযরত ঈসা (আঃ) কে পিতা ব্যতিরেকেই সৃষ্টি করেছেন। সেই আল্লাহর ক্ষমতা ও প্রভাব প্রতিপত্তি এতো বেশী যে, তিনি যে জিনিসকে যে প্রকারের সৃষ্টি ও নির্মাণ করতে চান তাকে বলেন- ‘এভাবে হও এবং এরকম হও' আর তেমনই সঙ্গে সঙ্গেই হয়ে যায়। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ যখন তিনি কোন জিনিসের (সৃষ্টি করার) ইচ্ছে করেন, তখন তাঁর রীতি এই যে, ঐ বস্তুকে বলেন- 'হও' আর তেমনই হয়ে যায়।' (৩৬:৮২) অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যখন আমি কোন বস্তু (সৃষ্টির) ইচ্ছে করি তখন আমার কথা এই যে, আমি তাকে বলি- 'হও' আর তেমনই হয়ে যায়।” (১৬:৪০) অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “চোখের উঁকি দেয়ার মত আমার একটি আদেশ মাত্র।` (৫৪:৫০) কবি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যখন আল্লাহ তা'আলা কোন বস্তুর (সৃষ্টির) ইচ্ছে করেন তখন তাকে বলেন- 'হও' তেমনই হয়ে যায়।”
উপরোল্লিখিত আয়াতসমূহ দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, হযরত ঈসা (আঃ) কেও আল্লাহ তা'আলা শব্দের দ্বারাই সৃষ্টি করেছেন। এক জায়গায় আল্লাহ পাক স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “নিশ্চয় ঈসার (আঃ) আশ্চর্যজনক অবস্থা আল্লাহর নিকট আদমের (আঃ) আশ্চর্যজনক অবস্থার ন্যায়, তাকে তিনি মাটির দ্বারা সৃষ্টি করেন, তৎপর তাকে (তার কালকে) বলেন-“হও’ তখনই সে (সজীব) হয়ে যায়।” (৩:৫৯)
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।