আল কুরআন


সূরা আল-আনকাবূত (আয়াত: 56)

সূরা আল-আনকাবূত (আয়াত: 56)



হরকত ছাড়া:

يا عبادي الذين آمنوا إن أرضي واسعة فإياي فاعبدون ﴿٥٦﴾




হরকত সহ:

یٰعِبَادِیَ الَّذِیْنَ اٰمَنُوْۤا اِنَّ اَرْضِیْ وَاسِعَۃٌ فَاِیَّایَ فَاعْبُدُوْنِ ﴿۵۶﴾




উচ্চারণ: ইয়া-‘ইবা-দিয়াল্লাযীনা আ-মানূইন্না আরদী ওয়া-ছি‘আতুন ফাইইয়া-ইয়া ফা‘বুদূন।




আল বায়ান: হে আমার বান্দারা যারা ঈমান এনেছে, নিশ্চয় আমার যমীন প্রশস্ত, সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদাত কর।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৫৬. হে আমার মুমিন বান্দাগণ! নিশ্চয় আমার যমীন প্রশস্ত; কাজেই তোমরা আমারই ইবাদত কর।(১)




তাইসীরুল ক্বুরআন: হে আমার বান্দারা! যারা ঈমান এনেছ, আমার যমীন প্রশস্ত, কাজেই তোমরা একমাত্র আমারই ‘ইবাদাত কর।




আহসানুল বায়ান: (৫৬) হে আমার বিশ্বাসী বান্দাগণ! আমার পৃথিবী প্রশস্ত; সুতরাং তোমরা আমারই উপাসনা কর।[1]



মুজিবুর রহমান: হে আমার মু’মিন বান্দারা! আমার পৃথিবী প্রশস্ত; সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদাত কর।



ফযলুর রহমান: হে আমার ঈমানদার বান্দারা! আমার জমিন তো প্রশস্ত; অতএব, তোমরা আমারই ইবাদত কর।



মুহিউদ্দিন খান: হে আমার ঈমানদার বান্দাগণ, আমার পৃথিবী প্রশস্ত। অতএব তোমরা আমারই এবাদত কর।



জহুরুল হক: হে আমার বান্দারা যারা ঈমান এনেছ! আমার পৃথিবী আলবৎ প্রশস্ত, সুতরাং কেবলমাত্র আমারই তবে তোমরা উপাসনা করো।



Sahih International: O My servants who have believed, indeed My earth is spacious, so worship only Me.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৫৬. হে আমার মুমিন বান্দাগণ! নিশ্চয় আমার যমীন প্রশস্ত; কাজেই তোমরা আমারই ইবাদত কর।(১)


তাফসীর:

(১) আলোচ্য আয়াতে মুসলিমগণের জন্যে কাফেরদের অনিষ্ট থেকে আত্মরক্ষা করা, সত্য প্রচার করা এবং দুনিয়াতে ন্যায় ও সুবিচার প্রতিষ্ঠা করার একটি কৌশল বর্ণনা করা হয়েছে। এই কৌশলের নাম ‘হিজরত’ তথা দেশত্যাগ। অথাৎ যে দেশে সত্যের বিরুদ্ধে কথা বলতে ও কাজ করতে বাধ্য হতে হয়, সেই দেশ পরিত্যাগ করা। আল্লাহ বলেছেন, আমার পৃথিবী প্রশস্ত। কাজেই কারও এই ওযর গ্রহণ করা হবে না যে, অমুক শহরে অথবা দেশে কাফেররা প্রবল ছিল বিধায় আমরা তাওহীদ ও ইবাদাত পালনে অপারগ ছিলাম। তাদের উচিত, যে দেশে কুফর ও অবাধ্যতা করতে বাধ্য করা হয়, আল্লাহর জন্যে সেই দেশ ত্যাগ করা এবং এমন কোন স্থান তালাশ করা, যেখানে স্বাধীন ও মুক্ত পরিবেশে আল্লাহর নির্দেশাবলী নিজেরাও পালন করতে পারে এবং অপরকেও উদ্বুদ্ধ করতে পারে। আর এজন্যই সাহাবায়ে কিরাম হাবশায় হিজরত করেছিলেন। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও অন্য সাহাবীগণ মদীনায় হিজরত করেছিলেন। [দেখুন: ইবন কাসীর; ফাতহুল কাদীর]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৫৬) হে আমার বিশ্বাসী বান্দাগণ! আমার পৃথিবী প্রশস্ত; সুতরাং তোমরা আমারই উপাসনা কর।[1]


তাফসীর:

[1] এখানে এমন জায়গা থেকে হিজরত (স্বদেশ ত্যাগ) করার আদেশ দেওয়া হয়েছে, যেখানে আল্লাহর ইবাদত করা কষ্টকর হয়ে পড়ে এবং দ্বীনের উপর অটল থাকা দুঃসাধ্য হয়। যেমন মুসলিমগণ প্রথমে মক্কা থেকে হাবশায় এবং পরে মদীনায় হিজরত করেছিলেন।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৫৬-৬০ নং আয়াতের তাফসীর:



সূরার প্রথম থেকে এ পর্যন্ত মুসলিমদের প্রতি কাফিরদের শত্র“তা, তাওহীদ ও রিসালাত অস্বীকার এবং সত্য ও সত্যপন্থীদের পথে নানা রকম বাধা-বিঘœ ইত্যাদি বর্ণিত হয়েছে। আলোচ্য আয়াতে মুসলিমদের জন্য কাফিরদের অনিষ্ট থেকে আত্মরক্ষা করা, সত্য প্রচার করা এবং আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করতে কোন বাধা বিঘœ থাকবে না এমন একটি কৌশল বর্ণনা করা হয়েছে। এ কৌশলের নাম হিজরত।



(يَا عِبَادِيَ الَّذِيْنَ اٰمَنُوْآ.....)



উক্ত আয়াতে মূলত আল্লাহ তা‘আলা মু’মিন বান্দাদেরকে হিজরত করার প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছেন। অর্থাৎ যদি মু’মিনরা এমন এলাকায় বাস করে যেখানে আল্লাহ তা‘আলার দীন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হচ্ছে না, অথবা কাফিররা প্রতিনিয়ত তাদের কষ্ট দিচ্ছে, যথাযথভাবে আল্লাহ র ইবাদত করা যাচ্ছে না তাহলে জেনে রাখ হে মু’মিনগণ, আল্লাহ তা‘আলার জমিন প্রশস্ত। যে জায়গায় গেলে আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠা করতে পারবে, কাফিরদের নির্যাতন থেকে রেহাই পাবে এবং আল্লাহার ইবাদত করতে কোন বাধা থাকবে না সেখানে হিজরত করবে। যেমন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও সাহাবীগণ হিজরত করেছেন। এ অর্থে কুরআনে অনেক আয়াত রয়েছে, তন্মধ্যে অন্যতম হল: আল্লাহ বলেন:



(إِنَّ الَّذِيْنَ تَوَفّٰهُمُ الْمَلٰٓئِكَةُ ظَالِمِيْٓ أَنْفُسِهِمْ قَالُوْا فِيْمَ كُنْتُمْ ط قَالُوْا كُنَّا مُسْتَضْعَفِيْنَ فِي الْأَرْضِ ط قَالُوْآ أَلَمْ تَكُنْ أَرْضُ اللّٰهِ وَاسِعَةً فَتُهَاجِرُوْا فِيْهَا)



“যারা নিজেদের ওপর জুলুম করে তাদের প্রাণ গ্রহণের সময় ফেরেশতাগণ বলে, ‘তোমরা কী অবস্থায় ছিলে? তারা বলে ‘দুনিয়ায় আমরা অসহায় ছিলাম।’ তারা বলে, ‘আল্লাহর জমিন কি প্রশস্ত ছিল না যেখানে তোমরা হিজরত করতে?’’ (সূরা নিসা ৪:৯৭)



সুতরাং কোথাও ইসলামের বিধান পালন করতে গিয়ে যদি বাধা আসে আর ঐ বাধা প্রতিহত করার ক্ষমতা না থাকে তাহলে সেখানের চেয়ে এমন উত্তম স্থান যদি থাকে যেখানে হিজরত করলে যাবতীয় ইবাদত পালনে কোন বাধা থাকবে না তখন সেখানে হিজরত করা আবশ্যক।



স্বদেশ পরিত্যাগ করে অন্যত্র যাওয়ার মধ্যে মানুষ স্বভাবত ভয় করতে পারে যে, হয়তো পথিমধ্যে স্থানীয় কাফিররা বাধা দেবে এবং প্রাণে মেরে ফেলবে। তাই পরের আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন: জীবন মাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। কেউ পৃথিবীতে স্থায়ী হবে না। সে জন্য প্রাণের ভয়ে মু’মিন কখনো আল্লাহ তা‘আলার বিধান পালন করা থেকে বিরত থাকতে পারে না। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(كُلُّ نَفْسٍ ذَا۬ئِقَةُ الْمَوْتِ ط وَإِنَّمَا تُوَفَّوْنَ أُجُوْرَكُمْ يَوْمَ الْقِيٰمَةِ)



“সকল আত্মাই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণকারী এবং নিশ্চয়ই কিয়ামত দিবসে তোমাদেরকে পূর্ণ প্রতিদান দেয়া হবে।” (সূরা আলি ইমরান ৩:১৮৫)



বিশেষতঃ আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশাবলী পালন করা অবস্থায় মৃত্যু হলে অনেক মর্যাদা রয়েছে। সেজন্য পরের আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলেনন যারা সৎ আমল করবে, ধৈর্য ধারণ করবে ও আল্লাহ তা‘আলার ওপর ভরসা করবে তারাই মৃত্যুর পর তলদেশে নহর প্রবাহিত হয় এমন জান্নাতে বসবাস করবে। যেখানে থাকবে শুধু আরাম-আয়েশ, কোন দুঃখ-কষ্ট সেখানে তাদেরকে স্পর্শ করবে না।



অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন, পৃথিবীর স্থলে ও জলে এমন কতক জীবজন্তু আছে যারা নিজেদের খাদ্য বহন করে নিয়ে চলে না এবং মজুত করে রাখে না। আল্লাহ তা‘আলাই তাদের রিযিকের ব্যবস্থা করে থাকেন। তারা সকালে খালি পেটে বাসা থেকে বের হয়ে যায় আবার সন্ধ্যায় ভরা পেটে ফিরে আসে। তাদের জীবিকার জন্য কোনই চিন্তা করতে হয় না। অথচ তাদের কী পরিমাণ খাদ্যের প্রয়োজন হয় যার ব্যবস্থা করেন একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَمَا مِنْ دَآبَّةٍ فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَي اللّٰهِ رِزْقُهَا وَيَعْلَمُ مُسْتَقَرَّهَا وَمُسْتَوْدَعَهَا ط كُلٌّ فِيْ كِتٰبٍ مُّبِيْنِ)



“ভূ-পৃষ্ঠে বিচরণকারী সকলের জীবিকার দায়িত্ব একমাত্র আল্লাহ তা‘আলারই। তিনি তাদের স্থায়ী ও অস্থায়ী অবস্থিতি সম্বন্ধে অবহিত; সুস্পষ্ট কিতাবে (লাওহে মাহফূজ) সব কিছুই লিপিবদ্ধ আছে।” (সূরা হূদ ১১:৬)



মানুষও যদি আল্লাহ তা‘আলার ওপর সত্যিকার ভরসা করে, তাহলে তাদেরকে এভাবেই রিযিক দেবেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:



لَوْ أَنَّكُمْ كُنْتُمْ تَوَكَّلُونَ عَلَي اللَّهِ حَقَّ تَوَكُّلِهِ لَرُزِقْتُمْ كَمَا يُرْزَقُ الطَّيْرُ تَغْدُو خِمَاصًا وَتَرُوحُ بِطَانًا



তোমরা যদি আল্লাহ তা‘আলার ওপর যথাযথ ভরসা কর যেমন ভরসা করা উচিত তাহলে তোমাদেরকে তেমনভাবে রিযিক দেবেন যেমনভাবে পাখিদেরকে রিযিক দিয়ে থাকেন। পাখিরা খালি পেটে সকালে বের হয় আর ভরা পেটে বাসায় ফিরে আসে। (তিরমিযী হা: ২৩৪৪, সহীহ)



অতএব সকল প্রাণীর রিযিকের মালিক একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা, সৃষ্টি করার পূর্বেই আল্লাহ তা‘আলা রিযিক নির্ধারণ করে রেখেছেন। তাই রিযিকের চিন্তা না করে আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করে দীনের সকল বিধি বিধান যথাযথভাবে পালন করলে আল্লাহ তা‘আলা কোথা থেকে রিযিক দেবেন তা বুঝতেও পারবে না।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. মানুষের রিযিকের মালিক একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা।

২. জীব মাত্রই মৃত্যুবরণ করতে হবে।

৩. বিপদে ধৈর্যধারণ করতে হবে, অধৈর্য হওয়া যাবে না।

৪. কোথাও আল্লাহ তা‘আলার বিধান পালন করতে বাধাগ্রস্ত হলে সেখান থেকে উত্তম স্থান পেলে সেখানে হিজরত করতে হবে।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৫৬-৬০ নং আয়াতের তাফসীর

এখানে আল্লাহ্ তা'আলা মুমিনদেরকে হিজরত করার নির্দেশ দিচ্ছেন যে, যেখানে তারা দ্বীনকে কায়েম রাখতে পারবে না সেখান থেকে তাদেরকে এমন জায়গায় চলে যেতে হবে যেখানে তারা দ্বীনের কাজ স্বাধীনভাবে চালিয়ে যেতে পারবে। আল্লাহর যমীন খুব প্রশস্ত। সুতরাং যেখানে তারা আল্লাহর নির্দেশ মুতাবেক তাঁর ইবাদতে লেগে থেকে তাঁর একত্ববাদ ঘোষণা করতে পারবে সেখানেই তাকে হিজরত করতে হবে।

হযরত যুবাইর ইবনে আওয়াম (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “সমস্ত শহর আল্লাহর শহর এবং সমস্ত বান্দা আল্লাহর দাস। যেখানে তুমি কল্যাণ লাভ করবে সেখানেই অবস্থান করবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

সাহাবায়ে কিরামের জন্যে মক্কায় অবস্থান যখন কষ্টকর হয়ে গেল তখন তাঁরা। হিজরত করে হাবশায় চলে গেলেন, যাতে শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে আল্লাহর দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারেন। তথাকার বুদ্ধিমান ও দ্বীনদার বাদশাহ্ সাহমাহ্ নাজ্জাশী (রঃ) পূর্ণভাবে তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতা ও সহযোগিতা করেন। সেখানে তাঁরা মর্যাদা ও পরম আনন্দের সাথে বসবাস করতে থাকেন। এরপর আল্লাহ তা'আলার অনুমতিক্রমে অন্যান্য সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) ও স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ) মদীনায় হিজরত করেন।

অতঃপর মহান আল্লাহ বলেনঃ জীবমাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণকারী, অতঃপর তোমরা আমারই নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে। তোমরা যেখানেই থাকো না কেন তোমাদের সবকেই মৃত্যুবরণ করতে হবে এবং আমার সামনে তোমাদেরকে হাযির হতে হবে। কাজেই তোমাদের জীবন আল্লাহর আনুগত্যের কাজে ও তাকে সন্তুষ্ট করার কাজে কাটিয়ে দেয়া উচিত যাতে মৃত্যুর পর আল্লাহর কাছে গিয়ে বিপদে পড়তে না হয়। মুমিন ও সৎ লোকদেরকে আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে আদনের সুউচ্চ প্রসাদে পৌঁছিয়ে দিবেন, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত। সেখানে তারা স্থায়ী হবে। সকর্মশীলদের প্রতিদান কতই না উত্তম! সেখান হতে তাদেরকে কখনো বের করা হবে না। না থাকার নিয়ামতরাজি কখনো শেষ হবে, না কিছু হ্রাস পাবে। মুমিনদের সত্ত্বার্যের বিনিময়ে তাদেরকে যে জান্নাতী প্রাসাদ দেয়া হবে তা সত্যিই পরম আরামদায়ক। যারা ধৈর্য অবলম্বন করে ও তাদের প্রতিপালকের উপর নির্ভর করে এবং আল্লাহর পথে হিজরত করে। যারা আল্লাহর শত্রুদেরকে পরিত্যাগ করে এবং তাঁর পথে নিজেদের আত্মীয়-স্বজন ও পরিবারবর্গকে বিসর্জন দেয় এবং তাঁর নিয়ামত ও পুরস্কারের আশায় পার্থিব সুখ-শান্তির উপর লাথি মারে।

আবু মালিক আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতে এমন অট্টালিকা রয়েছে যার বাইরের দিক ভিতরের দিক হতে এবং ভিতরের দিক বাইরের দিক হতে স্পষ্টভাবে দেখা যায়। আল্লাহ তা'আলা তা এমন লোকদের জন্যে বানিয়েছেন যারা (মানুষকে) খাদ্য খেতে দেয়, ভাল কথা বলে, নিয়মিতভাবে নামায পড়ে ও রোযা রাখে এবং রাত্রে দাঁড়িয়ে ইবাদত করে যখন লোকেরা ঘুমিয়ে থাকে। আর তারা পার্থিব ও পারলৌকিক সর্বক্ষেত্রে তাদের প্রতিপালকের উপর নির্ভর করে থাকে। (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ খবর দিচ্ছেন যে, রিযিক কোন জায়গার সাথে নির্দিষ্ট নয়। বরং আল্লাহর বন্টনকৃত রিযিক সাধারণভাবে সর্বজায়গায় বিদ্যমান রয়েছে। যে যেখানে থাকে সেখানেই তার রিযিক পৌঁছে যায়। মুহাজিরদের (রাঃ) হিজরতের পর তাঁদের রিযিকের মধ্যে আল্লাহ তা'আলা এত বরকত দেন যে, তারা দুনিয়ার দূর দূর প্রান্তের মালিক হয়ে যান। তাই আল্লাহ পাক বলেনঃ এমন কত জীবজন্তু আছে যারা নিজেদের খাদ্য জমা রাখার ক্ষমতা রাখে না। আল্লাহ তাআলাই ওগুলোকে খাদ্য দান করে থাকেন এবং মানুষেরও খাদ্যের ব্যবস্থা তিনিই করে থাকেন। তিনি কোন সৃষ্টজীবকে কখনো ভুলে যান না। পিঁপড়াকে ওর গর্তে, পাখীকে আসমান ও যমীনের ফাঁকা জায়গায় এবং মাছকে পানির মধ্যেই তিনি খাদ্য পৌছিয়ে থাকেন। মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ “ভূ-পৃষ্ঠে বিচরণকারী সবারই জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহরই; তিনি ওদের স্থায়ী ও অস্থায়ী অবস্থিতি সম্বন্ধে অবহিত; সুস্পষ্ট কিতাবে সবকিছুই আছে।` (১১:৬)

হযরত ইবনে উমার (রাঃ) বলেনঃ “একদা আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে চলছিলাম। মদীনার বাগানসমূহের একটি বাগানে তিনি গেলেন এবং মাটিতে পড়ে থাকা খারাপ খেজুরগুলো পরিষ্কার করে করে তিনি খেতে লাগলেন এবং আমাকেও খেতে বললেন। আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এই (খারাপ) খেজুরগুলো খেতে আমার মন চায় না। তিনি বললেনঃ আমার তো এগুলো খেতে খুব ভাল লাগছে। কেননা, আজ চতুর্থ দিনের সকাল, এ পর্যন্ত আমি কিছুই খাইনি এবং না খাওয়ার কারণ এই যে, আমার খাবার জুটেনি। আমি যদি আমার প্রতিপালকের নিকট প্রার্থনা জানাতাম তবে তিনি আমাকে কিসরা (পারস্য সম্রাট) এবং কায়সারের (রোমক সম্রাট) মালিক করে দিতেন। হে ইবনে উমার (রাঃ)! তোমার কি অবস্থা হবে যখন তুমি এমন লোকদের মধ্যে অবস্থান করবে যারা কয়েক বছরের খাদ্য জমা করে রাখবে এবং আল্লাহর উপর ভরসা করা সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করবে। আমি তো ঐ অবস্থাতেই রয়েছি এমন সময় (আারবি) এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ মহিমান্বিত আল্লাহ আমাকে দুনিয়ার ধন-ভাণ্ডার জমা করার এবং কু-প্রবৃত্তির পিছনে লেগে পড়ার নির্দেশ দেননি। যে ব্যক্তি দুনিয়ার ধন-ভাণ্ডার জমা করে এবং এর দ্বারা চিরস্থায়ী জীবন কামনা করে, তার বুকে নেয়া উচিত যে, চিরস্থায়ী জীবন তো আল্লাহর হাতে। জেনে রেখো যে, না আমি দীনার (স্বর্ণমুদ্রা) বা দিরহাম (রৌপ্যমুদ্রা) জমা করবো, না কালকের জন্যে আজ খাদ্যপ জমা রাখবো।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এটা গারীব হাদীস। এর বর্ণনাকারী আবুল আতৃক জারী দুর্বল)

বর্ণনা করা হয় যে, কাকের ডিম হতে যখন বাচ্চা বের হয়, তখন বাচ্চাগুলোর পালক ও ললাম সাদা হয়। এই দেখে কাক ওগুলোকে ঘৃণা করে পালিয়ে যায়। কিছুদিন পর ঐ শাবকগুলোর পালক কালো বর্ণ ধারণ করে। তখন ওদের মা-বাপ ওদের কাছে ফিরে আসে এবং আহার দেয়। প্রাথমিক অবস্থায় যখন ওদের বাপমা ওদেরকে ঘৃণা করে ছেড়ে পালিয়ে যায় এবং কাছেও আসে না তখন আল্লাহ তাআলা ঐ ছোট ছোট মশাগুলো ঐ বাচ্চাগুলোর নিকট পাঠিয়ে দেন এবং ঐ মশাগুলোই ওদের খাদ্য হয়ে যায় ।

নবী (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা সফর কর, তোমাদের স্বাস্থ্য ভাল থাকবে এবং রিযিক প্রাপ্ত হবে।”
হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা সফর কর, তাহলে তোমাদের স্বাস্থ্য ভাল থাকবে এবং তোমরা গনীমত (যুদ্ধলব্ধ মাল) লাভ করবে।” (এ হাদীসটি ইমাম বায়হাকী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা সফর কর, তাহলে তোমরা লাভবান হবে, রোযা রাখা, তোমরা সুস্থ থাকবে এবং যুদ্ধ কর, গনীমত লাভ করবে। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) আর একটি রিওয়াইয়াতে রয়েছেঃ “তোমরা ভাগ্যবান ও স্বচ্ছলদের সাথে সফর কর।”

মহান আল্লাহর উক্তিঃ তিনি সর্বশ্রোতা অর্থাৎ তিনি স্বীয় বান্দাদের কথাগুলো শ্রবণকারী এবং তিনি সর্বজ্ঞ, অর্থাৎ বান্দাদের অঙ্গভঙ্গী সম্পর্কে তিনি পূর্ণ ওয়াকিফহাল।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।