আল কুরআন


সূরা আল-আনকাবূত (আয়াত: 48)

সূরা আল-আনকাবূত (আয়াত: 48)



হরকত ছাড়া:

وما كنت تتلو من قبله من كتاب ولا تخطه بيمينك إذا لارتاب المبطلون ﴿٤٨﴾




হরকত সহ:

وَ مَا کُنْتَ تَتْلُوْا مِنْ قَبْلِهٖ مِنْ کِتٰبٍ وَّ لَا تَخُطُّهٗ بِیَمِیْنِکَ اِذًا لَّارْتَابَ الْمُبْطِلُوْنَ ﴿۴۸﴾




উচ্চারণ: ওয়ামা-কুনতা তাতলূমিন কাবলিহী মিন কিতা-বিওঁ ওয়ালা-তাখুত্তুহূবিয়ামীনিকা ইযাল লারতা-বাল মুবতিলূন।




আল বায়ান: আর তুমি তো এর পূর্বে কোন কিতাব তিলাওয়াত করনি এবং তোমার নিজের হাতে তা লিখনি যে, বাতিলপন্থীরা এতে সন্দেহ পোষণ করবে।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৪৮. আর আপনি তো এর আগে কোন কিতাব পড়েননি এবং নিজ হাতে কোন কিতাবও লেখেননি যে, বাতিলপন্থীরা সন্দেহ পোষণ করবে।(১)




তাইসীরুল ক্বুরআন: তুমি তো এর পূর্বে কোন কিতাব পাঠ করনি, আর তুমি নিজ হাতে কোন কিতাব লেখনি, এমন হলে মিথ্যাবাদীরা সন্দেহ পোষণ করত।




আহসানুল বায়ান: (৪৮) তুমি তো এর পূর্বে কোন গ্রন্থ পাঠ করতে না[1] এবং তা নিজ হাতে লিখতেও না[2] যে, মিথ্যাবাদীরা (তা দেখে) সন্দেহ পোষণ করবে।[3]



মুজিবুর রহমান: তুমিতো এর পূর্বে কোন কিতাব পাঠ করনি এবং স্বহস্তে কোন দিন কিতাব লিখনি যে, মিথ্যাচারীরা সন্দেহ পোষণ করবে।



ফযলুর রহমান: তুমি তো এর (এই কোরআনের) আগে কোন কিতাব পাঠ করনি। নিজের হাতেও তুমি তা লিখছ না। তেমন হলে না হয় বাতিলপন্থীরা সন্দেহ পোষণ করতে পারত। (যেহেতু তেমন নয়, তাই তাদের সন্দেহপোষণ একেবারেই অযৌক্তিক।)



মুহিউদ্দিন খান: আপনি তো এর পূর্বে কোন কিতাব পাঠ করেননি এবং স্বীয় দক্ষিণ হস্ত দ্বারা কোন কিতাব লিখেননি। এরূপ হলে মিথ্যাবাদীরা অবশ্যই সন্দেহ পোষণ করত।



জহুরুল হক: আর তুমি তো এর আগে কোনো গ্রন্থ থেকে পাঠ কর নি, আর তোমার ডান হাত দিয়ে তা লেখও নি, তেমন হলে ঝুটা আখ্যাদাতারা সন্দেহ করতে পারত।



Sahih International: And you did not recite before it any scripture, nor did you inscribe one with your right hand. Otherwise the falsifiers would have had [cause for] doubt.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৪৮. আর আপনি তো এর আগে কোন কিতাব পড়েননি এবং নিজ হাতে কোন কিতাবও লেখেননি যে, বাতিলপন্থীরা সন্দেহ পোষণ করবে।(১)


তাফসীর:

(১) অর্থাৎ আপনি কুরআন নাযিল হওয়ার পূর্বে কোন কিতাব পাঠ করতেন না এবং কোন কিতাব লিখতেও পারতেন না; বরং আপনি ছিলেন নিরক্ষর। আল্লাহ্ তাআলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুওয়ত প্রমাণ করার জন্যে যেসব সুস্পষ্ট মু'জিযা প্রকাশ করেছেন, তন্মধ্যে তাকে পূর্ব থেকে নিরক্ষর রাখাও অন্যতম। এটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াতের সপক্ষে একটি যুক্তি। তার স্বদেশবাসী ও আত্মীয়-বান্ধবগন, যাদের মধ্যে তিনি শৈশব থেকে প্রৌঢ়ত্ব পর্যন্ত জীবনকাল অতিবাহিত করেছিলেন, সবাই ভালভাবে জানতো তিনি সারা জীবন কখনো কোন বই পড়েননি এবং কলম হাতে ধরেননি। [দেখুন: ইবন কাসীর]

এ সত্য ঘটনাটি পেশ করে মহান আল্লাহ বলছেন, এটি একথার সুস্পষ্ট প্রমাণ যে, আসমানী কিতাবসমূহের শিক্ষাবলী, পূর্ববর্তী নবীগণের অবস্থা, বিভিন্ন ধর্ম ও দ্বীনের আকীদা-বিশ্বাস, প্রাচীন জাতিসমূহের ইতিহাস এবং সভ্যতা, সংস্কৃতি ও মানবিক জীবন যাপনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলী সম্পর্কে যে গভীর ও ব্যাপক জ্ঞানের প্রকাশ ও নিরক্ষর নবীর কণ্ঠ থেকে হচ্ছে তা তিনি অহী ছাড়া আর অন্য কোন উপায়ে অর্জন করতে পারতেন না। [দেখুন: ফাতহুল কাদীর]। যদি তিনি লেখাপড়া জানতেন তবে হয়ত কেউ বলতে পারত যে, তিনি আগেকার নবীদের কোন কিতাব থেকে শিখে নিয়ে তা মানুষদের মধ্যে প্রচার করছেন। তবে মক্কার কিছু লোক রাসূলের নিরক্ষর হওয়া সত্বেও একথা বলতে ছাড়েনি যে, তিনি কারও কাছ থেকে লিখে নিয়ে তা সকাল বিকাল পড়ে শোনাচ্ছেন। যেমন তারা বলেছিল, “তারা আরও বলে, “এগুলো তো সে কালের উপকথা, যা সে লিখিয়ে নিয়েছে; তারপর এগুলো সকাল-সন্ধ্যা তার কাছে পাঠ করা হয়।” [সূরা আল-ফুরকান: ৫] এর জওয়াবে আল্লাহ বলেন, “বলুন, এটা তিনিই নাযিল করেছেন যিনি আসমানসমূহ ও যমীনের সমুদয় রহস্য জানেন; নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [সূরা আল-ফুরকান: ৬]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৪৮) তুমি তো এর পূর্বে কোন গ্রন্থ পাঠ করতে না[1] এবং তা নিজ হাতে লিখতেও না[2] যে, মিথ্যাবাদীরা (তা দেখে) সন্দেহ পোষণ করবে।[3]


তাফসীর:

[1] কারণ, তিনি নিরক্ষর ছিলেন।

[2] কারণ, লেখার জন্যও শিক্ষা আবশ্যিক, যা তিনি কারোর নিকট থেকে অর্জন করেননি।

[3] অর্থাৎ, যদি তিনি শিক্ষিত ব্যক্তি হতেন বা কোন শিক্ষকের নিকট কিছু শিখতেন, তাহলে লোকে বলত যে, কুরআন মাজীদ অমুকের সাহায্যে (রচিত গ্রন্থ) বা অমুকের নিকট শিক্ষার ফল।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৪৭-৪৯ নং আয়াতের তাফসীর:



আল্লাহ তা‘আলা যেমন পূর্ববর্তী আসমানী কিতাব নাযিল করেছেন তেমনি এ কুরআন আল্লাহ তা‘আলাই তাঁর নাবীর প্রতি নাযিল করেছেন। পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছিল তথা আহলে কিতাবের মধ্য থেকে ঐ সকল ব্যক্তিরা কুরআনের প্রতি ঈমান এনেছে যারা তাদের নাবীর ওপর নাযিলকৃত কিতাবের প্রতি ঈমান এনেছিল এবং স্বধর্ম থেকে বিচ্যুত হয়নি। যেমন আবদুল্লাহ বিন সালাম, সালমান ফারসী। যারা কাফির কেবল তারাই আল্লাহ তা‘আলার নিদর্শনসমূহকে অস্বীকার করে।



(وَمَا كُنْتَ تَتْلُوْا مِنْ قَبْلِه)



‘তুমি তো পূর্বে কোন কিতাব পাঠ করনি’ অর্থাৎ হে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! তুমি তো নিরক্ষর, লিখতে, পড়তে জানোনা; পূর্বে কোন কিতাব পড়ওনি এবং লেখওনি। তারপরেও কেন মিথ্যুকরা সন্দেহ করে যে, তুমি এ কিতাব নিজে রচনা করেছো। যেমন কুরআনে বর্ণিত হয়েছে:



(وَقَالُوْآ أَسَاطِيْرُ الْأَوَّلِيْنَ اكْتَتَبَهَا فَهِيَ تُمْلٰي عَلَيْهِ بُكْرَةً وَّأَصِيْلًا)‏



“তারা বলে: ‘এগুলো তো সেকালের উপকথা, যা সে লিখিয়ে নিয়েছে; এগুলো সকাল-সন্ধ্যা তার নিকট পাঠ করা হয়।’’ (সূরা ফুরকান ২৫:৫) তাদের একথার উত্তরে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(قُلْ أَنْزَلَهُ الَّذِيْ يَعْلَمُ السِّرَّ فِي السَّمٰوٰتِ وَالْأَرْضِ ط إِنَّه۫ كَانَ غَفُوْرًا رَّحِيْمًا)‏



“বল:‎ ‘এটা তিনিই অবতীর্ণ করেছেন যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সমুদয় অদৃশ্যের রহস্য অবগত আছেন; নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’’ (সূরা ফুরকান ২৫:৬)



নিরক্ষর হওয়া নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর জন্য একটি বড় মু‘জিযাহ। আল্লাহ তা‘আলা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নবুওয়াতের সপ্রমাণ করার জন্য যেসকল মু‘জিযাহ প্রদান করেছেন তার মধ্যে অন্যতম একটি হল পূর্ব থেকেই নিরক্ষর। তিনি লেখতে জানতেন না এবং পড়তেও জানতেন না। এ অবস্থাতেই মক্কায় চল্লিশটি বছর অতিবাহিত করেন। তিনি কোন কিতাবধারীদের কাছেও যাননি যে, তাদের কাছ থেকে কিছু শুনে নেবেন। চল্লিশ বছর পর হঠাৎ তাঁর পবিত্র মুখ থেকে এমন কালাম উচ্চারিত হতে থাকে যা বিষয়বস্তু ও অর্থের দিক দিয়ে ছিল মু‘জিযাহ, তেমনি শাব্দিক বিশুদ্ধতা ও ভাষালঙ্কারের দিক দিয়েও ছিল অতুলনীয়।



সুতরাং যারা মনে করবে যে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এটা নিজে রচনা করেছে সে নির্বোধ ব্যতীত আর কিছুই নয় এবং সে একজন জালিম। কেননা যে কোনদিন কোন গ্রন্থ পাঠ করেনি এবং যে লেখতেও জানে না তার ব্যাপারে যদি বলা হয়, সে এ গ্রন্থ রচনা করেছে এটা যারা বলবে তারা নির্বোধ ও মূর্খ ব্যতীত আর কিছুই হতে পারে না।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. নিশ্চয়ই কুরআন আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে নাযিলকৃত কিতাব।

২. রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ছিলেন নিরক্ষর, তিনি লেখতে পড়তে জানতেন না।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৪৭-৪৯ নং আয়াতের তাফসীর

মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ হে নবী (সঃ)! আমি যেমন পূর্ববর্তী নবীদের (আঃ) কিতাবসমূহ অবতীর্ণ করেছিলাম, অনুরূপভাবে এই কিতাব অর্থাৎ কুরআন কারীম তোমার উপর অবতীর্ণ করেছি। আহলে কিতাবের মধ্যে এমন লোকও রয়েছে যারা আমার এই কিতাবের মর্যাদা দিয়ে থাকে এবং সঠিকভাবে এটা পাঠ করে। সুতরাং যেমন তারা তাদের প্রতি অবতারিত কিতাবের উপর ঈমান এনেছে, অনুরূপভাবেই এই পবিত্র কিতাবকেও তারা মেনে চলে। যেমন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ), হযরত সালমান ফারসী (রাঃ) প্রমুখ। আর ঐ লোকেরাও অর্থাৎ কুরায়েশ প্রভৃতি গোত্রের মধ্য হতেও কতকগুলো লোক এর উপর ঈমান এনে থাকে। হ্যা, তবে যারা বাতিল দ্বারা হককে গোপন করে এবং সূর্যের আলো হতে চক্ষু বন্ধ করে নেয় তারা তো এই কিতাবকেও অস্বীকারকারী।

এরপর মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তোমার উপর এই কিতাব অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে তুমি তো তোমার বয়সের একটা বড় অংশ এই কাফিরদের মধ্যে অতিবাহিত করেছে। সুতরাং তারা তো ভালরূপেই জানে যে, তুমি লেখা পড়া জানতে না। সমস্ত গোত্র ও সারা দেশবাসী এ খবর রাখে যে, তোমার কোন আক্ষরিক জ্ঞান ছিল না। এতদসত্ত্বেও যখন তুমি এক চারুবাক সম্পন্ন ও জ্ঞানপূর্ণ কিতাব পাঠ করছো তখন তো তা প্রকাশ্য ব্যাপার যে, এটা আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতেই এসেছে। তুমি তো একটি অক্ষরও কারো কাছে শিখখানি, অতএব কি করে তুমি এত বড় একটা কিতাব রচনা করতে পার?

রাসূলুল্লাহ (সঃ) সম্পর্কে এই কথাটিই পূর্ববর্তী কিতাবসমূহেও ছিল। যেমন কুরআন কারীমে ঘোষিত হয়েছেঃ (আরবি)

অর্থাৎ “যারা আক্ষরিক জ্ঞান বিহীন রাসূল ও নবী (সঃ)-এর অনুসরণ করে, যার গুণাবলী তারা তাদের কাছে বিদ্যমান তাওরাত ও ইঞ্জীলে পেয়ে থাকে, যে তাদেরকে ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধ করে।” (৭:১৫৭)

বড় মজার কথা এই যে, আল্লাহর নিস্পাপ নবী (সঃ)-কে সব সময়ের জন্যে লিখা হতে দূরে রাখা হয়। একটি অক্ষরও তিনি লিখতে পারতেন না। তিনি লেখক নিযুক্ত করেছিলেন, যারা আল্লাহর অহী লিখতেন। প্রয়োজনের সময় দুনিয়ার বাদশাহদের নিকট চিঠি-পত্র তারাই লিখতেন। পরবর্তী ফকীহদের মধ্যে কাযী আবুল ওয়ালীদ বাজী প্রমুখ গুরুজন বলেছেন যে, হুদায়বিয়ার সন্ধির দিন নিম্নলিখিত বাক্যটি রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বহস্তে লিখেছিলেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ “এ হচ্ছে ঐ শর্তসমূহ যেগুলোর উপর মুহাম্মাদ ইবনে আবদিল্লাহ (সঃ) ফায়সালা করেছেন। কিন্তু তাঁর এ উক্তি সঠিক নয়। কাযী সাহেবের মনে এধারণা জন্মেছে সহীহ বুখারীর ঐ রিওয়াইয়াত হতে যাতে রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) ওটা নিলেন ও লিখলেন।” কিন্তু এর ভাবার্থ (আরবি) অর্থাৎ “অতঃপর তিনি হুকুম করলেন তখন লিখা হলো।” পূর্ব ও পশ্চিমের সমস্ত আলেমের এটাই মাযহাব। এমন কি তারা বাজী (রঃ) প্রমুখ গুরুজনের উক্তিকে কঠিনভাবে খণ্ডন করেছেন এবং তাঁদের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাঁরা তাঁদের কবিতা ও ভাষণেও এঁদের উক্তি খণ্ডন করেছেন। কিন্তু এটাও স্মরণ রাখার বিষয় যে, কাযী সাহেব প্রমুখ মনীষীদের এটা ধারণা মমাটেই নয় যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ভালরূপে লিখতে পারতেন। বরং তারা বলতেন যে, সন্ধিপত্রে তার উপরোক্ত বাক্যটি লিখে নেয়া তাঁর একটি মু'জিযা ছিল। যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন যে, দাজ্জালের দু’চক্ষুর মাঝে কাফির’ লিখা থাকবে এবং অন্য এক রিওয়াইয়াতে আছে যে, কুফর’ লিখিত থাকবে, যা প্রত্যেক মুমিন পড়তে পারবেন। অর্থাৎ লেখা পড়া না জানলেও সবাই পড়তে সক্ষম হবে। এটা মুমিনের একটা কারামাত হবে। অনুরূপভাবে উপরোক্ত বাক্য লিখে ফেলা আল্লাহর নবী (সঃ)-এর একটি মু'জিযা ছিল। এর ভাবার্থ এটা মোটেই নয় যে, তিনি লেখাপড়া জানতেন।

কোন কোন লোক এই রিওয়াইয়াত পেশ করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ইন্তেকাল হয়নি যে পর্যন্ত না তিনি কিছু শিখেছেন। কিন্তু এ রিওয়াইয়াতটি সম্পূর্ণ দুর্বল, এমন কি ভিত্তিহীনও বটে। কুরআন কারীমের এ আয়াতটির প্রতি লক্ষ্য করলেই বুঝা যায় যে, কত জোরের সাথে এটা আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর লেখাপড়া জানার কথা অস্বীকার করছে এবং কত জোরালো ভাষায় এটাও অস্বীকার করছে যে, তিনি লিখতে পারতেন।

এখানে যে ডান হাতের কথা বলা হয়েছে তা প্রায় বা অধিকাংশ ক্ষেত্র হিসেবে। নতুবা লিখী তো ডান হাতেই হয়। যেমন মহান আল্লাহর উক্তিঃ (আরবি) অর্থাৎ “না কোন পাখী যা ডানার সাহায্যে উড়ে।” (৬:৩৮) কেননা, প্রত্যেক পাখীই তো ডানার সাহায্যেই উড়ে।

রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিরক্ষরতার বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তুমি লেখাপড়া জানলে মিথ্যাচারীরা তোমার সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করার সুযোগ পেতো যে, তুমি পূর্ববর্তী কিতাবসমূহ পড়ে, লিখে বর্ণনা করছে। কিন্তু এখানে তো এরূপ হচ্ছে না। এতদসত্ত্বেও এই লোকগুলো আল্লাহর নবী (আঃ)-এর উপর এই অপবাদ দিচ্ছে যে, তিনি তাদের পূর্ববর্তীদের কাহিনী বর্ণনা করছেন, যা তাদের সামনে সকাল-সন্ধ্যায় পাঠ করা হয়। অথচ তারা ভালরূপেই জানে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) লেখাপড়া জানেন না।

তাদের কথার উত্তরে মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তুমি বলে দাওঃ এটা তিনিই নাযিল করেছেন যিনি আসমান ও যমীনের গোপনীয় বিষয় সম্যক অবগত আছেন।” (২৫:৬)

এখানে আল্লাহ পাক বলেনঃ বস্তত যাদেরকে জ্ঞান দেয়া হয়েছে তাদের অন্তরে এটা স্পষ্ট নিদর্শন। অর্থাৎ এই কুরআনের আয়াতগুলো সুস্পষ্ট ভাষায় অবতীর্ণ করা হয়েছে। আলেমদের পক্ষে এগুলো বুঝ, মুখস্থ করা এবং জনগণের কাছে পৌঁছিয়ে দেয়া খুবই সহজ। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ “কুরআন আমি সহজ করে দিয়েছি উপদেশ গ্রহণের জন্যে, কে আছে উপদেশ গ্রহণের জন্যে?” (৫:৪০)

রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক নবী (আঃ)-কে এমন একটি জিনিস দেয়া হয়েছে যা দেখে লোকে ঈমান আনে। অনুরূপভাবে আল্লাহ আমার প্রতি একটি জিনিস অহী করেছেন। আমি আশা করি যে, সব নবী (আঃ)-এর অনুসারীদের চেয়ে আমার অনুসারীদের সংখ্যা বেশী হবে।”

সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা (স্বীয় নবীকে সঃ) বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! আমি তোমাকে পরীক্ষা করবো এবং তোমার কারণে জনগণকেও পরীক্ষা করবো। আমি তোমার উপর এমন একটি কিতাব অবতীর্ণ করবো যা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলা যাবে না। তুমি তা ঘুমন্ত ও জাগ্রত সর্বাবস্থায় পাঠ করতে থাকবে!” অর্থাৎ এটা পানিতে ধুলেও নষ্ট হবে না। যেমন অন্য হাদীসে এসেছেঃ “কুরআন চামড়ার মধ্যে থাকলেও তা আগুনে পুড়বে না। কেননা, তা বক্ষে রক্ষিত থাকবে। পুস্তকটি মুখে পড়তে খুব সহজ। এটা অন্তরে সদা গাঁথা থাকে। শব্দ ও অর্থের দিক দিয়েও এটি একটি জীবন্ত মু'জিযা। এ কারণেই পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে এই উম্মতের একটি বিশেষণ এও বর্ণনা করা হয়েছেঃ (আরবি)

অর্থাৎ তাদের কিতাব তাদের বক্ষে থাকবে।” ইমাম ইবনে জারীর কথাটি খুব পছন্দ করেছেন যে, আল্লাহ পাকের (আরবি)-এই উক্তির ভাবার্থ হচ্ছেঃ হে নবী (সঃ)! তুমি এই কিতাবের পূর্বে কোন কিতাব পড়তে না এবং নিজের হাতে কিছু লিখতে না। এই সুস্পষ্ট আয়াতগুলো আহলে কিতাবের জ্ঞানী ও বিদ্বান লোকদের বক্ষে বিদ্যমান রয়েছে। কাতাদা (রঃ) ও ইবনে জুরায়েয (রঃ) হতেও এটা বর্ণিত আছে। প্রথমটি হাসান বসরী (রঃ)-এর উক্তি। আওফীও (রঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এটা বর্ণনা করেছেন। যহ্হাকও (রঃ) এ কথাই বলেছেন। এটাই বেশী প্রকাশমান। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।

এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ যালিমরাই আমার নিদর্শন অস্বীকার করে থাকে। যারা সত্যকে বুঝেও না এবং ওদিকে আকৃষ্টও হয় না। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ “নিশ্চয়ই যাদের উপর তোমার প্রতিপালকের বাণী বাস্তবায়িত হয়েছে। তারা ঈমান আনবে না যদিও তাদের কাছে সমস্ত আয়াত এসে যায়, যে পর্যন্ত না তারা বেদনাদায়ক শাস্তি অবলোকন করে।` (১০:৯৬-৯৭)





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।