সূরা আল-কাসাস (আয়াত: 77)
হরকত ছাড়া:
وابتغ فيما آتاك الله الدار الآخرة ولا تنس نصيبك من الدنيا وأحسن كما أحسن الله إليك ولا تبغ الفساد في الأرض إن الله لا يحب المفسدين ﴿٧٧﴾
হরকত সহ:
وَ ابْتَغِ فِیْمَاۤ اٰتٰىکَ اللّٰهُ الدَّارَ الْاٰخِرَۃَ وَ لَا تَنْسَ نَصِیْبَکَ مِنَ الدُّنْیَا وَ اَحْسِنْ کَمَاۤ اَحْسَنَ اللّٰهُ اِلَیْکَ وَ لَا تَبْغِ الْفَسَادَ فِی الْاَرْضِ ؕ اِنَّ اللّٰهَ لَا یُحِبُّ الْمُفْسِدِیْنَ ﴿۷۷﴾
উচ্চারণ: ওয়াবতাগি ফিমাআ-তা-কাল্লা-হুদ্দা-রাল আ-খিরাতা ওয়ালা-তানছা নাসীবাকা মিনাদদুনইয়া-ওয়া আহছিন কামাআহছানাল্লা-হু ইলাইকা ওয়ালা তাবগিল ফাছা-দা ফিল আরদি ইন্নাল্লা-হা লা-ইউহিব্বুল মুফছিদীন।
আল বায়ান: আর আল্লাহ তোমাকে যা দান করেছেন তাতে তুমি আখিরাতের নিবাস অনুসন্ধান কর। তবে তুমি দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলে যেয়ো না। তোমার প্রতি আল্লাহ যেরূপ অনুগ্রহ করেছেন তুমিও সেরূপ অনুগ্রহ কর। আর যমীনে ফাসাদ করতে চেয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ ফাসাদকারীদের ভালবাসেন না’।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৭৭. আর আল্লাহ যা তোমাকে দিয়েছেন তা দ্বারা আখেরাতের আবাস অনুসন্ধান কর এবং দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলো না(১); তুমি অনুগ্রহ কর যেমন আল্লাহ্ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং যমীনের বুকে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চেয়ে না। নিশ্চয় আল্লাহ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদেরকে ভালবাসেন না।
তাইসীরুল ক্বুরআন: আল্লাহ তোমাকে যা দিয়েছেন তা দিয়ে তুমি আখিরাতে (স্থায়ী সুখভোগের) আবাস অনুসন্ধান কর, আর দুনিয়ায় তোমার অংশের কথা ভুলে যেও না, (মানুষের) কল্যাণ সাধন কর, যেমন আল্লাহ তোমার কল্যাণ করেছেন, দেশে বিপর্যয় সৃষ্টির কামনা কর না, নিশ্চয় আল্লাহ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের ভালবাসেন না।
আহসানুল বায়ান: (৭৭) আল্লাহ যা তোমাকে দিয়েছেন তার মাধ্যমে পরলোকের কল্যাণ অনুসন্ধান কর।[1] আর তুমি তোমার ইহলোকের অংশ ভুলে যেয়ো না।[2] তুমি (পরের প্রতি) অনুগ্রহ কর, যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন [3] এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চেয়ো না।[4] আল্লাহ অবশ্যই বিপর্যয় সৃষ্টিকারীকে ভালবাসেন না।’
মুজিবুর রহমান: আল্লাহ তোমাকে যা দান করেছেন তদ্বারা আখিরাতের আবাস অনুসন্ধান কর। আর দুনিয়া হতে তোমার অংশ ভুলে যেওনা; এবং পরোপকার কর যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, আর পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চেওনা। নিশ্চয়ই আল্লাহ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীকে ভালবাসেন না ।
ফযলুর রহমান: “আল্লাহ তোমাকে যা দান করেছেন তা দিয়ে পরকালের (সুখের) আবাস সন্ধান কর। দুনিয়ায় তোমার অংশ (বৈধ ভোগের পরিমাণ) ভুলে যেয়ো না। আল্লাহ তোমার প্রতি যেমন অনুগ্রহ করেছেন তুমিও (মানুষের প্রতি) তেমন অনুগ্রহ কর। আর জমিনে গোলযোগ সৃষ্টি করতে চেয়ো না। আল্লাহ গোলযোগ সৃষ্টিকারীদের পছন্দ করেন না।”
মুহিউদ্দিন খান: আল্লাহ তোমাকে যা দান করেছেন, তদ্বারা পরকালের গৃহ অনুসন্ধান কর, এবং ইহকাল থেকে তোমার অংশ ভূলে যেয়ো না। তুমি অনুগ্রহ কর, যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করতে প্রয়াসী হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ অনর্থ সৃষ্টিকারীদেরকে পছন্দ করেন না।
জহুরুল হক: আর আল্লাহ্ তোমাকে যা দিয়েছেন তা দিয়ে তুমি পরকালের আবাস অণ্বেষণ করো, আর ইহকালে তোমার ভাগ ভুলে যেয়ো না, আর ভাল কর যেমন আল্লাহ্ তোমার ভাল করেছেন, আর দুনিয়াতে ফেসাদ বাধাতে চেয়ো না। নিঃসন্দেহ আল্লাহ্ ফেসাদে লোকদের ভালবাসেন না।
Sahih International: But seek, through that which Allah has given you, the home of the Hereafter; and [yet], do not forget your share of the world. And do good as Allah has done good to you. And desire not corruption in the land. Indeed, Allah does not like corrupters."
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৭৭. আর আল্লাহ যা তোমাকে দিয়েছেন তা দ্বারা আখেরাতের আবাস অনুসন্ধান কর এবং দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলো না(১); তুমি অনুগ্রহ কর যেমন আল্লাহ্– তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং যমীনের বুকে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চেয়ে না। নিশ্চয় আল্লাহ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদেরকে ভালবাসেন না।
তাফসীর:
(১) অর্থাৎ ঈমানদারগণ কারূনকে এই উপদেশ দিল যে, আল্লাহ তোমাকে যে ধন-সম্পদ দান করেছেন তা দ্বারা আখেরাতের শান্তির ব্যবস্থা কর এবং দুনিয়াতে তোমার যে অংশ আছে তা ভুলে যেয়ো না। তবে এখানে দুনিয়ার অংশ বলে কি উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছেঃ
কোন কোন মুফাসসিরের মতে, এর অর্থঃ মানুষের বয়স এবং এ বয়সের মধ্যে করা হয় এমন কাজকর্ম, যা আখেরাতে কাজে আসতে পারে। সাদকাহ দানসহ অন্যান্য সব সৎকর্ম এর অন্তর্ভুক্ত। এমতাবস্থায় দ্বিতীয় বাক্য প্রথম বাক্যের তাগিদ ও সমর্থন হবে। প্রথম বাক্যে বলা হয়েছে, তোমাকে আল্লাহ যা কিছু দিয়েছেন অর্থাৎ টাকা-পয়সা, বয়স, শক্তি, স্বাস্থ্য ইত্যাদি-এগুলোকে আখেরাতের কাজে লাগাও। প্রকৃতপক্ষে দুনিয়াতে তোমার অংশ ততটুকুই যতটুকু আখেরাতের কাজে লাগবে। অবশিষ্টাংশ তো ওয়ারিশদের প্রাপ্য।
কোন কোন তাফসীরকারের মতে, দ্বিতীয় বাক্যের উদ্দেশ্য এই যে, তোমাকে আল্লাহ যা কিছু দিয়েছেন, তদ্বারা আখেরাতের ব্যবস্থা কর, কিন্তু নিজের সাংসারিক প্রয়োজনও ভুলে যেয়ো না যে, সবকিছু দান করে নিজে কাঙ্গাল হয়ে যাবে। বরং যতটুকু প্রয়োজন, নিজের জন্যে রাখো। এই তাফসীর অনুযায়ী দুনিয়ার অংশ বলে জীবন ধারণের উপকরণ বোঝানো হয়েছে।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৭৭) আল্লাহ যা তোমাকে দিয়েছেন তার মাধ্যমে পরলোকের কল্যাণ অনুসন্ধান কর।[1] আর তুমি তোমার ইহলোকের অংশ ভুলে যেয়ো না।[2] তুমি (পরের প্রতি) অনুগ্রহ কর, যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন [3] এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চেয়ো না।[4] আল্লাহ অবশ্যই বিপর্যয় সৃষ্টিকারীকে ভালবাসেন না।”
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, নিজের মাল এমন জায়গায় খরচ কর, যেখানে খরচ করা মহান আল্লাহ পছন্দ করেন।
[2] অর্থাৎ, পৃথিবীর বৈধ জিনিসেও মধ্যপন্থায় খরচ কর। পৃথিবীর বৈধ জিনিস বলতে কি? খাদ্য, পানি, পোশাক ও বিবাহ ইত্যাদি। এর অর্থ হল, যেমন তোমার উপর তোমার প্রভুর হক রয়েছে, তেমনি তোমার উপর তোমার নিজের, তোমার স্ত্রী-সন্তান এবং মেহমানেরও হক রয়েছে। তুমি তাদের প্রত্যেকের হক আদায় কর।
[3] অর্থাৎ, আল্লাহ তোমাকে সম্পদ দিয়ে তোমার উপর অনুগ্রহ করেছেন। অতএব তুমি তা অন্যদের জন্য খরচ করে তাদের উপর অনুগ্রহ কর।
[4] অর্থাৎ, তোমার উদ্দেশ্য যেন পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করা না হয়। যেমন সৃষ্টির সাথে সদ্ব্যবহারের পরিবর্তে অসৎ ব্যবহার করো না এবং পাপাচারে লিপ্ত হয়ো না; কারণ, এ সবে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়ে থাকে।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৭৬-৮২ নং আয়াতের তাফসীর:
আলোচ্য আয়াতগুলোতে কারূনের গর্ব অহঙ্কার ও তার শেষ পরিণতির কথা বলা হয়েছে।
সূরার শুরু থেকে এ পর্যন্ত মূসা (عليه السلام), ফির‘আউন ও ফির‘আউনের বংশধরদের সাথে মূসা (عليه السلام)-এর একক ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। এখানে তাঁরই সম্প্রদায়ভুক্ত বিশিষ্ট সম্পদশালী কারূনের অর্থ সম্পদের অহঙ্কার ও তার শেষ পরিণতি সম্পর্কে তুলে ধরা হয়েছে। পূর্ববর্তী আয়াতসমূহের সাথে এর সম্পর্ক হলন পূর্ববর্তী আয়াতে বলা হয়েছিল দুনিয়ার ধন-সম্পদ ক্ষণস্থায়ী। সুতরাং দুনিয়ার সম্পদের মোহে পড়ে আখিরাতের কথা ভুলে যাওয়া যাবে না। কারূন এমনই করেছিল। দুনিয়ার সম্পদ পেয়ে আল্লাহ তা‘আলাকে ভুলে গিয়েছিল, সম্পদের অহঙ্কার করত। ফলে আল্লাহ তা‘আলা তাকে ধ্বংস করে দেন। তাছাড়া আরো একটি সম্পর্ক হলন মুশরিকদেরকে লক্ষ্য করে বলা হচ্ছে যে, হে মুশরিকরা! তোমরা কারূন ও ফির‘আউনের চেয়ে অধিক সম্পদশালী ও ক্ষমতাবান নও, তাদের অনেক সম্পদ ও ক্ষমতা ছিল কিন্তু আল্লাহ তা‘আলার সাথে নাফরমানী করার কারণে তাদের এসব সম্পদ ও ক্ষমতা কোন কাজে আসেনি। সুতরাং তোমাদেরকে হুশিয়ার করছি, তোমরাও যদি তাদের মত আচরণ কর তাহলে তোমাদের পরিণতি তাদের মতই হবে।
কারূন ছিল মূসা (عليه السلام)-এর সম্প্রদায়ভুক্ত। কাতাদাহ বলেন: সে ছিল মূসা (عليه السلام)-এর চাচাত ভাই। এছাড়াও আরো অনেক উক্তি রয়েছে (কুরতুবী)।
(فَبَغٰي عَلَيْهِمْ) -بغي
কয়েকটি অর্থে ব্যবহৃত হয়। একটি অর্থ হল জুলুম করা, অত্যাচার করা। অর্থাৎ সে ধন-সম্পদের নেশায় মানুষের প্রতি জুলুম করত। সাঈদ বিন মুসাইয়্যেব বলেন: কারূন ছিল বিত্তশালী। ফির‘আউন তাকে বানী ইসরাঈলের দেখাশোনার কাজে নিযুক্ত করেছিল। এ পদে থাকা অবস্থায় সে বানী ইসরাঈলের ওপর জুলুম করত।
এর অপর একটি অর্থ অহঙ্কার করা। অনেকে এ অর্থ ধরে বলেছেন: কারূন ধন-দৌলতের নেশায় বিভোর হয়ে বানী ইসরাঈলদের কাছে অহঙ্কার করত। তাদেরকে হেয় প্রতিপন্ন করত।
- (وَاٰتَيْنٰهُ مِنَ الْكُنُوْزِ) كنوز
শব্দটি كنز এর বহুবচন। এর অর্থ ভূগর্ভস্থ ধন-সম্পদ। শরীয়তের পরিভাষায় كنز বলা হল এমন সম্পদকে যার যাকাত দেয়া হয়নি।
(لَتَنُوْ۬ءُ بِالْعُصْبَةِ) ناء-
শব্দের অর্থ বোঝার ভারে ঝুঁকিয়ে দেয়া। عصبة শব্দের অর্থ দল, অর্থাৎ তার সম্পদ এত বেশি পরিমাণ ছিল যে, সম্পদের চাবি বহন করতে একটি শক্তিশালী দলের কষ্টসাধ্য হয়ে যেত
(لَا تَفْرَحْ) এর শাব্দির অর্থ আনন্দ, উল্লাস। কুরআনের অনেক আয়াত এ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। তবে এখানে অহঙ্কার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। তার এ গর্ব অহঙ্কার দেখে তার সম্প্রদায়ের সৎ লোকেরা বলেছিল, অহঙ্কার কর না। আল্লাহ তা‘আলা অহঙ্কারীকে ভালবাসেন না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَلَا تُصَعِّرْ خَدَّكَ لِلنَّاسِ وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا ط إِنَّ اللّٰهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُوْرٍ)
“আর তুমি অহঙ্কারবশে মানুষকে অবহেলা কর না এবং পৃথিবীতে গর্বভরে বিচরণ কর না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা কোন দাম্ভিক, অহঙ্কারীকে ভালোবাসেন না।” (সূরা লুকমান ৩১:১৮)
বরং এ সব গর্ব অহঙ্কার ভুলে গিয়ে আল্লাহ তা‘আলা তোমাকে যা দান করেছেন তা দ্বারা আখিরাতের আবাস অনুসন্ধান কর। এর মানে এটি নয় যে, তুমি দুনিয়াকে ভুলে যাও, সব কিছু আল্লাহ তা‘আলার রাস্তায় ব্যয় করে দাও। বরং তুমি দুনিয়াতে ভাল নেয়ামত দ্বারা উপকৃত হও ও তোমার সম্পদ দ্বারা উপকৃত হও, তবে যেন তা দীনের ওপর প্রাধান্য না পায়। বরং দুনিয়া অর্জনের সাথে সাথে আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি অন্বেষণ কর। আল্লাহ তা‘আলা যেমন তোমাকে ধন-সম্পদ দান করে তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন তেমনি তুমিও তার সৃষ্টি জীবের প্রতি অনুগ্রহ কর। আর পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি কর না। তাদের এ সকল উপদেশ বাণী শুনে কারূন বলল,
(إِنَّمَآ أُوْتِيْتُه۫ عَلٰي عِلْمٍ عِنْدِيْ)
আমি এ সম্পদ আমার জ্ঞান দ্বারা প্রাপ্ত হয়েছি। এটা মূলত আল্লাহ তা‘আলার নেয়ামতকে অস্বীকার করা, সে স্বীকার করতে চায় না এগুলো আল্লাহ তা‘আলার দান, তার প্রতি অনুগ্রহ করা হয়েছে। বরং সে বলছে, আমার জ্ঞান দ্বারা তা উপার্জন করেছি। এরূপ বলা আল্লাহ তা‘আলার নেয়ামতের সাথে কুফরী করা। সুতরাং বলতে হবে এসবই আল্লাহ তা‘আলার অনুগ্রহ, তিনি আমাকে দান করেছেন। তিনি ইচ্ছা করলে তা নিয়ে নিতে পারেন। তাই আল্লাহ তা‘আলার শুকরিয়া আদায়ার্থে তার হক আদায় করতে হবে এবং উপযুক্ত অংশ ব্যবহার করতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(فَإِذَا مَسَّ الْإِنْسَانَ ضُرٌّ دَعَانَا ز ثُمَّ إِذَا خَوَّلْنٰهُ نِعْمَةً مِّنَّا لا قَالَ إِنَّمَآ أُوْتِيْتُه۫ عَلٰي عِلْمٍ)
“মানুষকে দুঃখ-কষ্ট স্পর্শ করলে সে আমাকে ডাকে, অতঃপর যখন আমি তার প্রতি অনুগ্রহ প্রদান করি আমার পক্ষ থেকে তখন সে বলে: আমাকে এটা দেয়া হয়েছে আমার জ্ঞানের বিনিময়ে।” (সূরা যুমার ৩৯:৪৯)
(أَوَلَمْ يَعْلَمْ أَنَّ اللّٰهَ)
অর্থাৎ কারূন ভুলে গিয়েছে যে, তার পূর্বে আরো বহু শক্তিশালী জনগোষ্ঠিকে তাদের এ সকল গর্ব অহঙ্কারের কারণে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে । তাই পূর্ববর্তীদের অবস্থার মত তারও অশুভ পরিণতি হল।
অতঃপর সে একদা গর্ব অহঙ্কারবশত জাঁকজমক পোশাক পরিধান করে তার সম্প্রদায়ের লোকদের নিকট গিয়েছিল। তখন যারা দুনিয়া কামনা করত তারা বলল, যদি আমাদেরকে কারূনের মত ধন-সম্পদ দেয়া হত। আর যারা ছিল ঈমানদার তারা বলেছিল, তার নিকট যা আছে তা অপেক্ষা আল্লাহ তা‘আলার নিকট যা আছে তা অধিক উত্তম। আর তা প্রাপ্ত হবে যারা ঈমান আনে, সৎ আমল করে এবং ধৈর্য ধারণ করে তারাই। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন: আমি আমার বান্দাদের জন্য এমন কিছু প্রস্তুত করে রেখেছি যা কোন চক্ষু দেখেনি, কোন কান শ্রবণ করেনি এবং কোন মানুষের অন্তর কল্পনাও করেনি। (সহীহ বুখারী হা: ৪৭৭৯)
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা কারূন ও তার প্রাসাদকে তার গর্ব অহঙ্কারের কারণে ভূগর্ভে প্রোথিত করে দিলেন। যা থেকে তাকে কেউ রক্ষা করতে পারেনি। তার এ অবস্থা দেখে গতকাল যারা তার মত হবার কামনা করেছিল তারা অনুতপ্ত হল।
সুতরাং আমাদের উচিত কারূনের মত না হয়ে আল্লাহ তা‘আলা প্রদত্ত সম্পদের যথাযথ ব্যবহার করা, তাঁর দেয়া নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা এবং সম্পদের হক আদায় করা।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. সম্পদ একটি নেয়ামত, আল্লাহ তা‘আলা যাকে ইচ্ছা তাকেই তা দান করেন, তাই তার সদ্ব্যবহার করতে হবে।
২. কোন নেয়ামত পেয়ে গর্ব-অহঙ্কার করা যাবে না।
৩. পার্থিব সম্পদের প্রতি লোভ-লালসায় আখিরাত ভুলে যাওয়া যাবে না।
৪. মানুষের সাথে নম্র-ভদ্র ব্যবহার করতে হবে।
৫. ফেতনা-ফাসাদ সৃষ্টি করা যাবে না।
৬. শুধু আখিরাতের আশায় দুনিয়ার প্রাপ্য বা অংশ গ্রহণ করা শরীয়তসম্মত।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৭৬-৭৭ নং আয়াতের তাফসীর
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, কারূন ছিল হযরত মূসা (আঃ)-এর চাচাতো ভাই। ইবনে জুরায়েজ (রঃ) বলেন যে, তার নসবনামা (বংশ তালিকা) হলো: কারূন ইবনে ইয়াসহাব ইবনে কাহিস। ইবনে ইসহাক (রঃ)-এর মতে কারূন ছিল হযরত মূসা ইবনে ইমরান (আঃ)-এর চাচা। কিন্তু অধিকাংশ আলেম তাকে তার চাচাতো ভাই বলে থাকেন। কারূনের গলার স্বর ছিল খুবই সুমিষ্ট। সুমিষ্ট সুরে তাওরাত পাঠ করতো। কিন্তু সামেরী যেমন মুনাফিক ছিল, অনুরূপভাবে আল্লাহর এই শত্রুও মুনাফিক হয়ে গিয়েছিল। সে বড় সম্পদশালী ছিল বলে সম্পদের গর্বে গর্বিত হয়েছিল এবং আল্লাহকে ভুলে গিয়েছিল। তার কওমের মধ্যে সাধারণভাবে যে পোশাক প্রচলিত ছিল, সে ওর চেয়ে অর্ধহাত নীচু করে বানিয়েছিল, যাতে তার গর্ব ও ঐশ্বর্য প্রকাশ পায়। তার এতো বেশী ধন-সম্পদ ছিল যে, তার কোষাগারের চাবিগুলো উঠাবার জন্যে শক্তিশালী লোকদের একটি দল নিযুক্ত ছিল। তার অনেকগুলো কোষাগার ছিল এবং প্রত্যেক কোষাগারের চাবি ছিল পৃথক পৃথক, যা ছিল অর্ধহাত করে লম্বা। যখন ঐ চাবিগুলো তার সওয়ারীর সাথে খচ্চরগুলোর উপর বোঝাই করা হতো তখন এর জন্যে কপাল ও চারটি পা সাদা চিহ্নযুক্ত ষাটটি খচ্চর নির্ধারিত থাকতো। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। তার কওমের সম্মানিত, সৎ ও আলেম লোকেরা যখন তার দম্ভ এবং ঔদ্ধত্য চরম সীমায় পৌঁছতে দেখলেন তখন তারা তাকে উপদেশ দিলেনঃ “এতো দাম্ভিকতা প্রকাশ করো না, আল্লাহর অকৃতজ্ঞ বান্দা হয়ো না, অন্যথায় তুমি তার কোপানলে পতিত হবে। জেনে রেখো যে, আল্লাহ দাম্ভিকদেরকে পছন্দ করেন না।” উপদেশদাতাগণ তাকে আরো বলতেনঃ “আল্লাহর দেয়া নিয়ামত যে তোমার নিকট রয়েছে। তদৃদ্বারা তার সন্তুষ্টি অনুসন্ধান কর এবং তার পথে ওগুলো হতে কিছু কিছু খরচ কর যাতে তুমি আখিরাতের অংশও লাভ করতে পার। আমরা একথা বলছি না যে, দুনিয়ায় তুমি সুখ ভোগ মোটেই করবে না। বরং আমরা বলি যে, তুমি দুনিয়াতেও ভাল খাও, ভাল পান কর, ভাল পোশাক পরিধান কর, বৈধ নিয়ামত দ্বারা উপকৃত হও এবং ভাল বিবাহ দ্বারা যৌন ক্ষুধা নিবারণ কর। কিন্তু নিজের চাহিদা পূরণ করার সাথে সাথে তুমি আল্লাহর হক ভুলে যেয়ো না। তিনি যেমন তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন তেমনি তুমি তাঁর সৃষ্টজীবের প্রতি অনুগ্রহ করো। জেনে রেখো যে, তোমার সম্পদে দরিদ্রদেরও হক রয়েছে। সুতরাং প্রত্যেক হকদারের হক তুমি আদায় করতে থাকো। আর তুমি পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না। মানুষকে কষ্ট দেয়া হতে বিরত থাকো এবং জেনে রেখো যে, যারা আল্লাহর মাখলুককে কষ্ট দেয় এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে তাদেরকে আল্লাহ ভালবাসেন না।”
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।