আল কুরআন


সূরা আল-কাসাস (আয়াত: 37)

সূরা আল-কাসাস (আয়াত: 37)



হরকত ছাড়া:

وقال موسى ربي أعلم بمن جاء بالهدى من عنده ومن تكون له عاقبة الدار إنه لا يفلح الظالمون ﴿٣٧﴾




হরকত সহ:

وَ قَالَ مُوْسٰی رَبِّیْۤ اَعْلَمُ بِمَنْ جَآءَ بِالْهُدٰی مِنْ عِنْدِهٖ وَ مَنْ تَکُوْنُ لَهٗ عَاقِبَۃُ الدَّارِ ؕ اِنَّهٗ لَا یُفْلِحُ الظّٰلِمُوْنَ ﴿۳۷﴾




উচ্চারণ: ওয়া কা-লা মূছা-রাববীআ‘লামুবিমান জাআ বিলহুদা-মিন ‘ইনদিহী ওয়া মান তাকূনুলাহূ ‘আ-কিবাতুদ দা-রি ইন্নাহূলা-ইউফলিহুজ্জা-লিমূন।




আল বায়ান: আর মূসা বলল, ‘আমার রব সম্যক অবগত আছেন, কে তাঁর কাছ থেকে হিদায়াত নিয়ে এসেছে এবং আখিরাতে কার পরিণাম শুভ হবে। নিশ্চয় যালিমরা সফল হবে না’।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩৭. আর মূসা বললেন, আমার রব সম্যক অবগত, কে তার কাছ থেকে পথনির্দেশ এনেছে এবং আখেরাতে কার পরিণাম শুভ হবে। যালিমরা তো কখনো সফলকাম হবে না।(১)




তাইসীরুল ক্বুরআন: মূসা বলল- ‘আমার প্রতিপালক বেশ ভাল ক’রেই জানেন কে তাঁর নিকট থেকে পথ নির্দেশ নিয়ে এসেছে এবং কার পরিণাম আখিরাতে শুভ হবে। যালিমরা কক্ষনো সাফল্য লাভ করবে না।’




আহসানুল বায়ান: (৩৭) মূসা বলল, আমার প্রতিপালক সম্যক অবগত, কে তাঁর নিকট থেকে পথনির্দেশ এনেছে[1] এবং (পরকালে) কার পরিণাম শুভ হবে।[2] নিশ্চয় সীমালংঘনকারীরা সফলকাম হবে না। [3]



মুজিবুর রহমান: মূসা বললঃ আমার রাব্ব সম্যক অবগত, কে তাঁর নিকট হতে পথ নির্দেশ নিয়ে এসেছে, এবং আখিরাতে কার পরিণাম শুভ হবে। নিশ্চয়ই যালিমরা সফলকাম হবেনা।



ফযলুর রহমান: মূসা বলল, “আমার প্রভু সবচেয়ে ভাল জানেন, কে তাঁর কাছ থেকে হেদায়েত নিয়ে এসেছে এবং পরকালে কার পরিণতি ভাল হবে। নিশ্চয়ই জালেমরা সফল হবে না।”



মুহিউদ্দিন খান: মূসা বলল, আমার পালনকর্তা সম্যক জানেন যে তার নিকট থেকে হেদায়েতের কথা নিয়ে আগমন করেছে এবং যে প্রাপ্ত হবে পরকালের গৃহ। নিশ্চয় জালেমরা সফলকাম হবে না।



জহুরুল হক: আর মূসা বললেন -- "আমার প্রভু ভাল জানেন কে তাঁর কাছ থেকে পথনির্দেশ নিয়ে এসেছে আর কার জন্য হবে চরমোৎকর্ষ আবাস। এটি নিশ্চিত যে অত্যাচারীদের সফলকাম করা হবে না।"



Sahih International: And Moses said, "My Lord is more knowing [than we or you] of who has come with guidance from Him and to whom will be succession in the home. Indeed, wrongdoers do not succeed."



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৩৭. আর মূসা বললেন, আমার রব সম্যক অবগত, কে তার কাছ থেকে পথনির্দেশ এনেছে এবং আখেরাতে কার পরিণাম শুভ হবে। যালিমরা তো কখনো সফলকাম হবে না।(১)


তাফসীর:

(১) অর্থাৎ আমার রব আমার অবস্থা ভালো জানেন। তিনি জানেন তাঁর পক্ষ থেকে যাকে রাসূল নিযুক্ত করা হয়েছে সে কেমন লোক। পরিণামের ফায়সালা তাঁরই হাতে রয়েছে। তিনিই তোমাদের ও আমাদের মাঝে ফায়সালা করে দেবেন। তিনিই জানেন কার জন্য তিনি আখেরাতের সুন্দর পরিণাম নির্দিষ্ট করে রেখেছেন। [ইবন কাসীর]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৩৭) মূসা বলল, আমার প্রতিপালক সম্যক অবগত, কে তাঁর নিকট থেকে পথনির্দেশ এনেছে[1] এবং (পরকালে) কার পরিণাম শুভ হবে।[2] নিশ্চয় সীমালংঘনকারীরা সফলকাম হবে না। [3]


তাফসীর:

[1] অর্থাৎ, তোমার ও আমার চেয়ে আল্লাহই হিদায়াতের ব্যাপারে অধিক জ্ঞাত। অতএব যে কথা আল্লাহর পক্ষ হতে আসবে সে কথা সত্য হবে, নাকি তোমাদের ও তোমাদের বাপ-দাদাদের কথা?

[2] শুভ-পরিণাম বলতে পরকালে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তাঁর দয়া এবং ক্ষমার যোগ্য হওয়া। আর এ যোগ্যতা একমাত্র তওহীদপন্থীদেরই লাভ হবে।

[3] ظَالِم (সীমালংঘনকারী) বলতে কাফের ও মুশরিকদেরকে বুঝানো হয়েছে। কারণ আরবীতে ظلم এর অর্থ وضع الشيء في غير محله কোন জিনিসকে তার নিজের জায়গায় না রেখে অন্য জায়গায় রাখা। মুশরিক যেহেতু আল্লাহর জায়গায় এমন কিছুকে মাবূদ বানিয়ে দেয় যারা ইবাদতের যোগ্য নয়। অনুরূপ কাফেররাও প্রতিপালকের আসল স্থান সম্বন্ধে অনভিজ্ঞ থাকে। সেই জন্য এরাই সব থেকে বড় সীমালংঘনকারী, অনাচারী ও অত্যাচারী। আর এরা পরকালে সফলতা হতে; অর্থাৎ, আল্লাহর অনুগ্রহ, দয়া ও ক্ষমা হতে বঞ্চিত হবে। এই আয়াত থেকেও জানা গেল যে, সব চেয়ে বড় সফলতা পরকালের সফলতা। পৃথিবীর সুখ-শান্তি, ধন-সম্পদের আধিক্য সত্যিকার সফলতা নয়। কারণ, এ সাময়িক সফলতা পৃথিবীতে মুশরিক-কাফের সকলের ভাগ্যেই জোটে। কিন্তু মহান আল্লাহ তাদের সফলতার কথা খন্ডন করেছেন, যাতে এ কথা স্পষ্ট হয় যে, সত্যিকার সফলতা পরকালের চিরস্থায়ী সফলতা; পৃথিবীর কয়েক দিনের অস্থায়ী সুখ-শান্তি এবং ধন-সম্পদ প্রকৃত সফলতা নয়।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: সূরার নামকরণ:



কাসাস শব্দটি কিস্সা এর বহুবচন। কিস্সা অর্থ ঘটনা, কাহিনী ইত্যাদি। এ সূরাতে একাধিক নাবীর কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে, তাই এ নামে সূরার নামকরণ করা হয়েছে। মক্কায় অবতীর্ণ সূরাসমূহের মধ্যে সূরা কাসাস সর্বশেষ সূরা। হিজরতের সময় মক্কা ও জুহফা এর মাঝখানে এ সূরা অবতীর্ণ হয়। কোন কোন বর্ণনায় রয়েছে, হিজরতের সফরে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন জুহফায় পৌঁছেন, তখন জিবরীল (عليه السلام) আগমন করেন এবং রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলেন: হে মুহাম্মাদ, আপনার মাতৃভূমির কথা আপনার মনে পড়ে কি? তিনি বললেন: হ্যাঁ। অতঃপর জিবরীল (عليه السلام) তাঁকে এ সূরা শুনালেন। এ সূরার শেষভাগে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সুসংবাদ দেয়া হয়েছে যে, আপনাকে মক্কা থেকে বের করে দেয়ার পরিণামে মক্কা বিজিত হয়ে আপনার অধিকারভুক্ত হবে, যেমনটি উল্লেখ করে আল্লাহ তা‘আলা অত্র সূরার ৮৫ নং আয়াতে বলেনন



(إِنَّ الَّذِيْ فَرَضَ عَلَيْكَ الْقُرْاٰنَ لَرَآدُّكَ إِلٰي مَعَادٍ)



“যিনি তোমার জন্য কুরআনকে করেছেন বিধান তিনি তোমাকে অবশ্যই ফিরিয়ে আনবেন জন্মভূমিতে।”



সূরা কাসাসে সর্বপ্রথম মূসা (عليه السلام)-এর কাহিনী সংক্ষেপে ও পরে বিস্তারিত বর্র্ণিত হয়েছে। অর্ধেক সূরা পর্যন্ত মূসা (عليه السلام)-এর কাহিনী ফির‘আউনের সাথে এবং শেষভাগে কারূনের সাথে উল্লেখ করা হয়েছে। মূসা (عليه السلام)-এর কাহিনী সমগ্র কুরআনে কোথাও সংক্ষেপে আবার কোথাও বিস্তারিত আকারে বার বার উল্লেখ করা হয়েছে। সূরা কাহফে খাজির (عليه السلام)-এর সাথে তাঁর কাহিনী বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর সূরা ত্বা-হা-য় বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে এবং এরই কিছু বিবরণ সূরা আন-নামলে অতঃপর সূরা কাসাসে এর পুনরালোচনা রয়েছে।



১-৪৩ নং আয়াতের তাফসীর:



طٰس۬مّ۬ (ত্বা-সীন-মীম) এ জাতীয় “হুরূফুল মুক্বাত্বআত” বা বিচ্ছিন্ন অক্ষর সম্পর্কে সূরা বাকারার শুরুতে আলোচনা করা হয়েছে। এগুলোর প্রকৃত উদ্দেশ্য একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই ভাল জানেন।



এরপর বলেন, এগুলো সুস্পষ্ট কিতাবের আয়াত, এ সম্পর্কে সূরা শুআরার প্রথমে অর্থাৎ ২ নং আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।



এরপর আল্লাহ তা‘আলা মূসা (عليه السلام)-এর জীবন বৃত্তান্তের বর্ণনা দিচ্ছেন।



(وَأَوْحَيْنَآ إِلٰٓي أُمِّ مُوْسٰٓي)



‘আমি মূসার মায়ের কাছে ওয়াহী করেছি’ এখানে ওয়াহী শব্দটি পারিভাষিক অর্থে ব্যবহার হয়নি। বরং শাব্দিক অর্থে স্বভাবগত ইলহাম যা মানুষকে করা হয়। এখানে এটাই উদ্দেশ্য, অর্থাৎ মূসা (عليه السلام)-এর মায়ের মনের মাঝে একটি ইলহাম করে দিয়েছিলেন যেন তিনি তার ছেলে মূসা (عليه السلام)-কে বুকের দুধ পান করান। আর যদি ভয় হয় নিজের কাছে থাকলে ফির‘আউন হত্যা করবে তাহলে একটি বাক্সে করে সাগরে ভাসিয়ে দেবে।



الْيَمِّ শব্দের অর্থ সাগর, অর্থাৎ নীল নদে ভাসিয়ে দাও, মারা যাবে বা হারিয়ে যাবে এ ভয় বা আশঙ্কা করবে না। আমি তাকে তোমার কাছে ফিরিয়ে দেব এবং আমি তাকে রাসূল বানাবো।



(فَالْتَقَطَه۫ٓ اٰلُ فِرْعَوْنَ)



অর্থাৎ মূসা (عليه السلام)-কে নীল নদে ভাসিয়ে দিলে ভেসে ভেসে ফির‘আউনের প্রাসাদের কাছে চলে যায়, ফির‘আউনের পরিবার তাকে তুলে নিল এবং ফির‘আউনের স্ত্রী আসিয়া বললন এ শিশু আমাদের নয়ণমনি হবে অতএব তাকে হত্যা করো না। এভাবে আপন গৃহে শত্র“ লালিত পালিত হল কিন্তু তারা বুঝতেও পারল না।



(وَأَصْبَحَ فُؤَادُ أُمِّ مُوْسٰي فٰرِغًا)



অর্থাৎ মূসা (عليه السلام)-কে হারিয়ে ফেলে মায়ের মন অস্থির। কিনা কী হয়, মূসা (عليه السلام) যে তার সন্তান এ কথা প্রকাশ করেই দিতেন যদি আল্লাহ তা‘আলা তার অন্তর ঈমানের বন্ধনে আবদ্ধ না করে দিতেন, যাতে তার এ বিশ্বাস বদ্ধমূল থাকে যে, আল্লাহ তা‘আলা তাকে ফিরিয়ে দেয়ার যে প্রতিশ্র“তি দিয়েছেন তা অবশ্যই সত্যে পরিণত হবে। فٰرِغًا অর্থন কেউ বলেছেন: দুনিয়ার সব কিছু থেকে তার মাতা চিন্তামুক্ত, কেবল চিন্তা একটাই মূসা। কেউ বলেছেন: সকল দুশ্চিন্তা থেকে তিনি মুক্ত কারণ তিনি জানেন আল্লাহ তা‘আলা তাকে ফেরত দেবেন, সে ডুবে যাবে না। তারপর মূসা (عليه السلام)-এর বোনকে তার মা বললেন সে যেন তাকে দূর থেকে দেখে দেখে রাখে, কোথা থেকে কোথায় যায়।



(وَحَرَّمْنَا عَلَيْهِ الْمَرَاضِعَ)



অর্থাৎ ফির‘আউনের বাড়িতে মূসা (عليه السلام)-কে নিয়ে যাওয়ার পর দুধ পান করাতে চাইলে কেউ দুধ পান করাতে পারে না। উদ্দেশ্য হল যাতে দুধ পান করানোর জন্য মূসার মায়ের কাছে নিয়ে যেতে হয়। যা আয়াতেই উল্লেখ রয়েছে।



(وَلَمَّا بَلَغَ أَشُدَّه)



অর্থাৎ যখন শক্তি, জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তায় পূর্ণ যৌবনে উপনিত হল তখন আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে নবুওয়াত দিলেন। অধিকাংশদের ক্ষেত্রে এ পূর্ণতা চল্লিশ বছর বয়সে হয়ে থাকে। তাই দেখা যায় অধিকাংশ নাবীদেরকে এ বয়সে নবুওয়াত দেয়া হয়েছে যেমন আমাদের নাবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)।



(عَلٰي حِيْنِ غَفْلَةٍ)



‘অধিবাসীরা ছিল অসতর্ক’ হয় তা দুপুরের সময় যখন মানুষ বিশ্রাম নেয় অথবা অন্য কোন সময় যখন মানুষ বিভিন্ন জায়গাতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হতে বিরত থাকে।



(هٰذَا مِنْ شِيْعَتِه۪)



‘একজন তার নিজ দলের’ অর্থাৎ বানী-ইসরাঈলের অন্তর্ভুক্ত, (وَهٰذَا مِنْ عَدُوِّه۪) ‘এবং অপর জন তার শত্র“দলের’ অর্থাৎ কিবতী বংশের।



(فَقَضٰي عَلَيْهِ)



অর্থাৎ মূসা (عليه السلام)-এর ঘুষিতে সে মারা যায়। মূসা (عليه السلام) তাকে মেরে ফেলার জন্য ঘুষি দেননি, কিন্তু ঘটনাক্রমে সে আঘাতে মারা যায়। ফলে মূসা (عليه السلام) অনুতপ্ত হন এবং বলেন, নিশ্চয়ই এটা শয়তানের কাজ, তাই তিনি আল্লাহ তা‘আলার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন, আল্লাহ তা‘আলা ক্ষমা করে দেন।



(فَأَصْبَحَ فِي الْمَدِيْنَةِ خَا۬ئِفًا)



মূসা (عليه السلام) খুব ভীত-শঙ্কিত অবস্থায় তথায় সকাল করলেন আর খুব খেয়াল করছেন যে, ফির‘আউনের পারিষদের কেউ জানতে পারে কি না; কারণ ফির‘আউন ভাল করেই জানে এ কাজ মূসা (عليه السلام) ছাড়া কেউ করার দুঃসাহস রাখে না। এমন সময় মূসা (عليه السلام) শুনতে পেলেন, যে বানী-ইসরাঈলের লোকটাকে গতকাল সাহায্য করেছিল সে আরেকজন কিবতীকে হত্যা করবে বলে চিৎকার করছে। তখন মূসা (عليه السلام) তাকে তিরস্কার করে আয়াতে উল্লিখিত কথা বললেন।



(فَلَمَّآ أَنْ أَرَادَ أَنْ يَّبْطِشَ بِالَّذِيْ هُوَ عَدُوٌّ لَّهُمَا)



অর্থাৎ যখন লোকটি এরূপ চিৎকার করল তখন মূসা ইচ্ছা করলেন তাকে ধরে শাস্তি দেবেন। যখন লোকটি বুঝল তাকে মূসা (عليه السلام) মারবে তখন সে বলল: ‘হে মূসা! তুমি যেমন গতকাল এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছ, সেভাবে আমাকেও কি হত্যা করতে চাও? তুমি তো পৃথিবীতে স্বেচ্ছাচারী হতে চাচ্ছ, শান্তি স্থাপনকারী হতে চাও না।’



(هُوَ عَدُوٌّ لَّهُمَا)



অর্থাৎ সে বানী ইসরাঈলের লোকটি মূসা (عليه السلام) ও যে কিবতী লোকটিকে মূসা (عليه السلام) হত্যা করেছেন তাদের দুজনেরই শত্র“ হয়ে গেল।



(وَجَا۬ءَ رَجُلٌ) কেউ বলেছেন, লোকটির নাম হিজকিল; কেউ বলেছেন, শামউন।



(وَلَمَّا تَوَجَّهَ تِلْقَا۬ءَ مَدْيَنَ)



শামদেশের একটি শহরের নাম মাদইয়ান। মাদইয়ান ইবনু ইবরাহীম (عليه السلام)-এর নামে এর নামকরণ করা হয়েছে। এ এলাকা ফির‘আউনের ক্ষমতার বাইরে ছিল। মিশর থেকে এর দূরত্ব ছিল আট মনযিল। মূসা (عليه السلام) ফির‘আউন ও তার বাহিনীকে ভয় করে মিশর থেকে মাদইয়ানে চলে আসার ইচ্ছা করলেন। এখানে একটি বিষয় লক্ষ্যণীয়ন মানুষকে যে বিষয়ে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে সে বিষয়ে ভয় করা তাওয়াক্কুল ও ঈমানের পরিপন্থী নয়। যেমন নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে হত্যা করে ফেলবে এ ভয়ে তিনি মক্কা ছেড়ে মদীনায় চলে গেলেন। মূসা (عليه السلام) নিঃসম্বল অবস্থায় মিসর ত্যাগ করলেন। তাঁর সাথে পাথেয় বলতে কিছু ছিল না এবং তিনি রাস্তাও চিননে না। আল্লাহ তা‘আলার ওপর ভরসা করে রওনা দিলেন এবং বললেন ‘আশা করি আমার প্রতিপালক আমাকে সরল পথ প্রদর্শন করবেন।’



(وَلَمَّا وَرَدَ مَا۬ءَ مَدْيَنَ) مَا۬ءَ مَدْيَنَ



বলতে একটি কুপকে বুঝানো হয়েছে। অত্র এলাকাবাসীরা এখান থেকে তাদের জন্তুদের পানি পান করাতো। অর্থাৎ দু’জন মহিলা বলতে শু‘আইব (عليه السلام)-এর কন্যাদ্বয়।



(قَالَ مَا خَطْبُكُمَا)



অর্থাৎ মূসা (عليه السلام) তাদের দাঁড়ানো দেখে বললেন; আপনারা দাঁড়িয়ে আছেন কেন? তারা বলল, পুরুষেরা পানি পান করিয়ে নিয়ে গেলে তারপর আমরা পানি পান করাই। পুরুষদের ভিড়ে পান করাতে পারি না। আমাদের বাবা বৃদ্ধ মানুষ তাই তিনি আসতে পারেন না।



এ ঘটনা থেকে কয়েকটি শিক্ষান ১. দুর্বলদের সাহায্য করা নাবী-রাসূলদের স্ন্নুাত। ২. বেগানা নারীর সাথে প্রয়োজনে কথা বলায় দোষ নেই, যদি কোন ফেতনার আশঙ্কা না থাকে। ৩. প্রয়োজনে নারীরাও বাইরে যেতে পারে তবে অবশ্যই শালিনতা বজায় রাখতে হবে।



(ثُمَّ تَوَلّٰيٓ إِلَي الظِّلِّ)



অর্থাৎ মূসা (عليه السلام) অনাহারে ও ক্লান্ত হয়ে গাছের ছায়াতলে বিশ্রাম নিলেন এবং এক আল্লাহ তা‘আলার কাছে নিজের দূরবস্থা ও অভাব পেশ করলেন। এটা দু‘আ করার অন্যতম একটি আদব, আল্লাহ তা‘আলার কাছে নিজেকে অতি তুচ্ছ ও নগন্য করে তুলে ধরা।



(تَمْشِيْ عَلَي اسْتِحْيَا۬ءٍ)



অর্থাৎ কন্যাদ্বয় বাড়িতে ফিরে গিয়ে শু‘আইব (عليه السلام)-কে ঘটনা খুলে বললে তিনি মূসা (عليه السلام)-কে আমন্ত্রণ জানিয়ে মেয়েকে পাঠান যেন তাকে ডেকে নিয়ে আসে। মেয়েটি লজ্জাজড়িত পদক্ষেপে সেখানে পৌঁছল এবং পিতার আমন্ত্রণের কথা জানাল।



(إِنَّ خَيْرَ مَنِ اسْتَأْجَرْتَ الْقَوِيُّ الْأَمِيْنُ)



অর্থাৎ শু‘আইব (عليه السلام)-এর এক কন্যা তার পিতাকে বলল: গৃহের কাজের জন্য আপনার একজন কর্মচারীর প্রয়োজন আছে, তাহলে তাকেই নিযুক্ত করে দিন। কারণ তার মাঝে আমরা দুটি গুণ লক্ষ্য করেছি। এক. সে শক্তিশালী, দুই. বিশ্বস্ত। আমরা পানি পান করাতে গিয়ে তার শক্তি এবং পথিমধ্যে আমাদেরকে পশ্চাতে রেখে পথচলা দ্বারা তার বিশ্বস্ততার অভিজ্ঞতা লাভ করেছি।



(قَالَ إِنِّيْٓ أُرِيْدُ أَنْ أُنْكِحَكَ)



অর্থাৎ শু‘আইব (عليه السلام) নিজেই নিজের পক্ষ থেকে কন্যাকে মূসা (عليه السلام)-এর সাথে বিবাহ দানের প্রস্তাব করলেন। এ থেকে জানা যায়, উপযুক্ত পাত্র পেলে পাত্রীর অভিভাবকের উচিত পাত্রের প্রস্তাবের অপেক্ষায় না থেকে নিজেই প্রস্তাব দেয়া। যেমন উমার (رضي الله عنه) নিজ কন্যা হাফসা বিধবা হলে আবূ বকর ও উসমান (رضي الله عنهما) এর কাছে প্রস্তাব দেন। (কুরতুবী)



(فَلَمَّا قَضٰي مُوْسَي الْأَجَلَ)



অর্থাৎ যখন মূসা (عليه السلام) নির্দিষ্ট সময় পূর্ণ করলেন তখন পরিবার নিয়ে মিসরের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন।



মূসা (عليه السلام) আট বছর কাজ করেছেন নাকি দশ বছর কাজ করেছেন? ইবনু আব্বাস (رضي الله عنه) বলেন: অধিক মেয়াদকাল পূর্ণ করেছিলেন। নাবীরা যা বলেন তা পূর্ণ করেন।



এ সম্পর্কে পূর্বে সূরা ত্বা-হা-র ৯ নং আয়াত থেকে ৯৩ নং আয়াতসহ আরো একাধিক স্থানে আলোচনা করা হয়েছে।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১। মিথ্যার পরাজয় অবশ্যই হবে, তা রক্ষা করার যতই কৌশল করা হোক না কেন।

২। আল্লাহ তা‘আলা যা ইচ্ছা করেন তাই হয়, তাঁর ইচ্ছার কোন প্রতিরোধক নেই।

৩। মানুষ স্বভাবতই সন্তানের প্রতি দয়াপরায়ণ, বিশেষ করে যাদের সন্তান নেই তাদের আগ্রহ আরো বেশি।

৪। পুরুষ মহিলাদের পেছনে চলবে না, এতে পর্দা লংঘন হয়। বরং মহিলারা পুরুষের পেছনে পেছনে চলবে।

৫। কন্যার অভিভাবক কাউকে যোগ্য পাত্র মনে করলে সরাসরি প্রস্তাব দিতে পারবে।

৬। অহঙ্কার ও সীমালংঘন ধ্বংস ও পতনের মূল কারণ।

৭। আল্লাহ তা‘আলা উপরে আছেন, এ কথা ফির‘আউনও জানতো। যার ফলে হামানকে সুউচ্চ প্রাসাদ তৈরি করতে নির্দেশ দিয়েছিল ওপরে উঠে আল্লাহ তা‘আলাকে দেখবে বলে।

৮। কথা বলা আল্লাহ তা‘আলার একটি গুণ। আল্লাহ তা‘আলা কথা বলেন যেমন মূসা (عليه السلام)-এর সাথে কথা বলেছেন।

৯। প্রত্যেক নাবী-রাসূলগণ সমসমায়িক ক্ষমতাসীনদের কাছে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে গেছেন।

১০। দীনের কাজে অপরের সহযোগিতা নেয়া ও সহযোগিতা দেয়া উভয়টাই কল্যাণকর।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৩৬-৩৭ নং আয়াতের তাফসীর

হযরত মূসা (আঃ) নবুওয়াত রূপ উপহার লাভ করে এবং আল্লাহর সাহায্য প্রাপ্ত হয়ে আল্লাহ তা'আলার নির্দেশক্রমে মিসরে গিয়ে পৌঁছেন। সেখানে পৌঁছে তিনি ফিরাউন ও তার লোকদের সামনে আল্লাহর একত্ববাদ এবং তার রিসালাতের ঘোষণা দেন এবং তাঁকে প্রদত্ত মু'জিযাগুলো তাদেরকে প্রদর্শন করেন। ফিরাউনসহ সবারই এ দৃঢ় বিশ্বাস হয় যে, নিশ্চয়ই হযরত মূসা (আঃ) আল্লাহর নবী। কিন্তু সে যুগ যুগ ধরে যে অহংকার করে আসছিল তা এবং তার পুরাতন কুফরী মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। তাই অন্তরের বিশ্বাসকে গোপন রেখে সে মুখে বলতে শুরু করলো: “এটা তো যাদু ছাড়া কিছুই নয়।” অতঃপর সে স্বীয় দবদবাও শক্তির দাপট দেখিয়ে সত্যের বিরোধিতায় উঠে পড়ে লেগে গেল এবং আল্লাহর নবী (আঃ)-এর সামনে বললো : “আমরা তো কখনো শুনিনি যে, আল্লাহ এক। শুধু আমরা কেন? আমাদের পূর্বপুরুষরাও কখনো এরূপ কথা শুনেনি। আমরা বড়, ছোট সবাই বহু খোদার উপাসনা করে আসছি। এই নবী কোথা হতে এই নতুন কথা নিয়ে এসেছে?” উত্তরে হযরত মূসা (আঃ) বললেনঃ “আমাকে ও তোমাদেরকে আল্লাহ খুব ভাল রূপেই অবগত আছেন। তিনিই আমার ও তোমাদের মধ্যে ফায়সালা করবেন যে, কে সঠিক পথের উপর রয়েছে এবং আখিরাতে কার পরিণাম শুভ হবে। আল্লাহর সাহায্য কার সাথে রয়েছে তা তোমরা সত্বরই জানতে পারবে। যালিম অর্থাৎ মুশরিকদের পরিণাম কখনো শুভ হয় না। সুতরাং তারা সফলকাম হবে না।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।