সূরা আন-নামাল (আয়াত: 80)
হরকত ছাড়া:
إنك لا تسمع الموتى ولا تسمع الصم الدعاء إذا ولوا مدبرين ﴿٨٠﴾
হরকত সহ:
اِنَّکَ لَا تُسْمِعُ الْمَوْتٰی وَ لَا تُسْمِعُ الصُّمَّ الدُّعَآءَ اِذَا وَلَّوْا مُدْبِرِیْنَ ﴿۸۰﴾
উচ্চারণ: ইন্নাকা লা-তুছমি‘উল মাওতা-ওয়ালা-তুছমি‘উসসু ম্মাদ দু‘আ-আ ইযা-ওয়াল্লাও মুদবিরীন।
আল বায়ান: নিশ্চয় তুমি মৃতকে শোনাতে পারবে না, আর তুমি বধিরকে আহবান শোনাতে পারবে না, যখন তারা পিঠ দেখিয়ে চলে যায়।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৮০. মৃতকে তো আপনি শোনাতে পারবেন না(১), বধিরকেও পারবেন না ডাক শুনাতে, যখন তারা পিঠ ফিরিয়ে চলে যায়।
তাইসীরুল ক্বুরআন: তুমি মৃতদেরকে শুনাতে পারবে না, আর বধিরকেও আহবান শুনাতে পারবে না (বিশেষতঃ) যখন তারা পিঠ ফিরিয়ে চলে যায়।
আহসানুল বায়ান: (৮০) মৃতকে তুমি শোনাতে পারবে না, আর বধিরকেও তোমার আহবান শোনাতে পারবে না;[1] যখন ওরা পিছন ফিরে চলে যায়। [2]
মুজিবুর রহমান: মৃতকে তুমি কথা শোনাতে পারবেনা, বধিরকেও পারবেনা আহবান শোনাতে, যখন তারা পিছন ফিরে চলে যায়।
ফযলুর রহমান: তুমি তো মৃত কিংবা বধিরকে ডাক শোনাতে পারবে না, যখন তারা পিঠ ঘুরিয়ে চলে যায়।
মুহিউদ্দিন খান: আপনি আহবান শোনাতে পারবেন না মৃতদেরকে এবং বধিরকেও নয়, যখন তারা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে চলে যায়।
জহুরুল হক: তুমি নিশ্চয়ই মৃতকে শোনাতে পারবে না আর বধিরকেও আহ্বান শোনাতে পারবে না, যখন তারা ফিরে যায় পিছু হটে।
Sahih International: Indeed, you will not make the dead hear, nor will you make the deaf hear the call when they have turned their backs retreating.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৮০. মৃতকে তো আপনি শোনাতে পারবেন না(১), বধিরকেও পারবেন না ডাক শুনাতে, যখন তারা পিঠ ফিরিয়ে চলে যায়।
তাফসীর:
(১) মৃতরা কি কিছু শুনতে পায়? আর মৃতদের কি কিছু শোনানো সম্ভব? যে সমস্ত বিষয়ে সাহাবায়ে কিরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুমদের মাঝেও মতপার্থক্য ছিল মৃতদের শ্রবণ করার বিষয়টি সেগুলোর অন্যতম। [মাজমূ’ ফাতাওয়া: ৩/২৩০, ১৯/১২৩; আল-মুস্তাদরাক আলা মাজময়িল ফাতাওয়া: ১/৯৪] আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা এর পক্ষে এবং আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা বিপক্ষে মতপ্রকাশ করেছেন। [দেখুন: বুখারী: ৩৯৮০, ৩৯৮১; মুসলিম: ৯৩২] তাই তাবেয়ীগণ এবং এর পরবর্তী আলেমগণ সবাই ভিন্ন দুটি মতে বিভক্ত হয়েছেন। কুরআনের বিভিন্ন স্থানে যা এসেছে এখানে তা বর্ণনা করছি। আলোচ্য সূরা আন-নামল এর আয়াতে বলা হয়েছে, “মৃতকে তো আপনি শোনাতে পারবেন না”। সূরা আর-রূমে বলা হয়েছে, “আপনি তো মৃতকে শুনাতে পারবেন না” [সূরা আর-রূম: ৫২] অনুরূপভাবে সূরা ফাতিরে এসেছে, “আপনি শোনাতে পারবেন না যারা কবরে রয়েছে তাদেরকে” [সূরা ফাতির: ২২]
এতে বুঝা যায় যে, মৃতদেরকে শোনানোর দায়িত্ব মানুষের নয়, এটা আল্লাহর কাজ। তাই সর্বাবস্থায় মৃতরা শুনতে পাবে এটার সপক্ষে কোন দলীল নেই। তবে আল্লাহর ইচ্ছায় মাঝে মধ্যে তারা যে শুনতে পায় তার প্রমাণ আমরা পাচ্ছি এক হাদীসে, বন্দরের যুদ্ধের পরে কাফেরদের লাশ যখন একটি গর্তে রেখে দেয়া হলো, তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের লাশদের উদ্দেশ্য করে নাম ধরে ডেকে ডেকে বললেনঃ তোমরা কি তোমাদের মা’বুদদের কৃত ওয়াদাকে বাস্তব পেয়েছ? আমরা তো আমাদের মা’বুদের ওয়াদা বাস্তব পেয়েছি। সাহাবীগণ বললেনঃ রাসূল! আপনি এমন লোকদের সাথে কি কথা বলছেন যারা মরে পচে গেছে? তিনি বললেনঃ “আল্লাহর শপথ! তোমরা আমার কথা তাদের থেকে বেশী শুনতে পাচ্ছো না”। [বুখারীঃ ৩৭৫৭] সুতরাং কবর যেহেতু আখেরাতের ব্যাপার আর আখেরাতের ব্যাপারে যতটুকু কুরআন ও হাদীসে যা এসেছে তার বাইরে কোন কিছু বলা কোন ক্রমেই ঠিক নয়। [বিস্তারিত দেখুন: কুরতুবী; ফাতহুল কাদীর; নূ’মান খাইরুদ্দীন আল-আলূসী, আল-আয়াতুল বাইয়্যিনাত ফী আদামি সামায়িল আমওয়াত]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৮০) মৃতকে তুমি শোনাতে পারবে না, আর বধিরকেও তোমার আহবান শোনাতে পারবে না;[1] যখন ওরা পিছন ফিরে চলে যায়। [2]
তাফসীর:
[1] এটি ঐ সব কাফেরদের পরোয়া না করা এবং শুধু আল্লাহর উপর ভরসা করার দ্বিতীয় কারণ। আর তা হল তারা মৃত; যারা কিছু শুনে উপকৃত হতে সক্ষম নয়। অথবা বধির; যারা শুনতেও পায় না, বুঝেও না এবং পথও খুঁজে পায় না। অর্থাৎ, কাফেরদেরকে মৃতদের সাথে তুলনা করা হয়েছে; যাদের মধ্যে না কোন অনুভূতি থাকে, আর না জ্ঞান। অথবা বধিরদের সাথে তুলনা করা হয়েছে; যারা না উপদেশ ও নসীহত শোনে, আর না আল্লাহর দাওয়াত কবুল করে।
[2] অর্থাৎ, তারা পুরোপুরি সত্য হতে বৈমুখ ও বীতশ্রদ্ধ। কারণ বধির ব্যক্তি সামনা-সামনিই কোন কথা শুনতে সক্ষম নয়। সুতরাং মুখ ফিরিয়ে চলে যাওয়ার সময় তারা কিভাবে শুনতে সক্ষম হবে? কুরআন কারীমের এই আয়াত হতে এটাও জানা গেল যে, মৃতরা শুনতে পায় -এই বিশ্বাস করা কুরআনের পরিপন্থী। মৃতরা কারো কথা শুনতে পায় না। অবশ্য ঐ সব অবস্থার কথা স্বতন্ত্র; যে অবস্থায় তাদের শোনার ব্যাপারে শরীয়তের স্পষ্ট দলীল আছে। যেমন হাদীসে এসেছে যে, যখন মানুষ মৃতকে দাফন করার পর ফিরে যায়, তখন তারা তাদের জুতোর শব্দ শুনতে পায়। (বুখারী ৩৩৮, মুসলিম ২২০নং) অনুরূপ বদর যুদ্ধের পর যখন কাফেরদের মৃত লাশগুলোকে এক পরিত্যক্ত কূপে ফেলে দেওয়া হল, তখন নবী (সাঃ) তাদের উদ্দেশ্যে কিছু বললেন। সাহাবাগণ বললেন, ‘আপনি প্রাণহীন দেহের সঙ্গে কথা বলছেন?’ তিনি বললেন, ‘‘তোমাদের থেকে তারা আমার কথা বেশি ভালোভাবে শুনছে।’’ অর্থাৎ, মু’জিযাস্বরূপ মহান আল্লাহ তাঁর কথা মৃতদেরকে শুনিয়ে দিয়েছিলেন। (বুখারী ১৩০৭নং)
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৭৬-৮১ নং আয়াতের তাফসীর:
পূর্ববর্তী আয়াতসমূহে আল্লাহ তা‘আলার পরিপূর্ণ ক্ষমতা বিভিন্ন উদাহরণের মাধ্যমে প্রমাণ করা হয়েছে যে, কিয়ামতের বাস্তবতা যৌক্তিক সম্ভাব্যতার সাথে এর অবশ্যম্ভাবী বাস্তবতা নাবীদের ও ঐশী কিতাবাদির বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত। বর্ণনাকারীর সত্যবাদিতার ওপর সংবাদের বিশুদ্ধতা ও প্রামাণ্য হওয়া নির্ভরশীল। তাই এ আয়াতে বলা হয়েছে যে, এর সংবাদদাতা কুরআন এবং কুরআনের সত্যবাদিতা অনস্বীকার্য।
(إِنَّ هٰذَا الْقُرْاٰنَ يَقُصُّ....)
অর্থাৎ ইয়াহূদ ও খ্রিস্টানরা যেসকল বিষয়ে মতবিরোধ করেছিল কুরআন তার অধিকাংশ বিষয় বিচার-বিশ্লেষণ করে বিশুদ্ধ ফায়সালার পথ নির্দেশ করেছে।
যেমন তারা ঈসা (عليه السلام) সম্পর্কে মতভেদ করে, ইয়াহূদীরা তাঁকে তুচ্ছজ্ঞান করত আর খ্রিস্টানরা তাঁর সম্পর্কে বাড়াবাড়ী করত। এমনকি তারা বলত, ঈসা (عليه السلام) আল্লাহ তা‘আলার পুত্র। কুরআন এ বিবাদের মীমাংসা করে দিয়ে বলে:
(مَا الْمَسِيْحُ ابْنُ مَرْيَمَ إِلَّا رَسُوْلٌ ج قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ ط وَأُمُّه۫ صِدِّيْقَةٌ)
“মারইয়ামের ছেলে মাসীহ তো কেবল একজন রাসূল। তার পূর্বে বহু রাসূল গত হয়েছে এবং তার মা পরম সত্যনিষ্ঠা ছিল।” (সূরা মায়িদাহ ৫:৭৫)
সুতরাং এ কুরআন তাদের জন্যই হিদায়াত ও রহমত যারা আল্লাহ তা‘আলার কাছে আত্মসর্ম্পণ করে মু’মিন হয়েছে। অতএব আহলে কিতাবের সব বিরোধের মীমাংসা কুরআন করে দেয়ার পরে যদি ঈমান না আনে তাহলে মনঃক্ষুণœ হওয়ার কিছু নেই। বরং হে রাসূল! তুমি আল্লাহ তা‘আলার ওপর ভরসা রাখ। তুমি যে সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত আছো তা নিশ্চিত।
(إِنَّكَ لَا تُسْمِعُ الْمَوْتٰي....)
এখানে মৃত বলতে ঐ সকল লোকদেরকে বোঝানো হয়েছে যারা কুরআন ও হাদীসের কথা শোনার পর এর দ্বারা উপকার লাভ করতে পারে না। বরং এ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। তারাই হল মৃত মানুষের মত। মৃতরা যেমন শোনে না আবার দেখেও না তাদের অবস্থাও অনুরপ। সুতরাং যারা মু’মিন তারাই হিদায়াতের কথা শুনে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(إِنَّمَا يَسْتَجِيْبُ الَّذِيْنَ يَسْمَعُوْنَ وَالْمَوْتٰي يَبْعَثُهُمُ اللّٰهُ ثُمَّ إِلَيْهِ يُرْجَعُوْنَ)
“শ্রবণ করে শুধু তারাই যারা ডাকে সাড়া দেয়। আর মৃতকে আল্লাহ পুনর্জীবিত করবেন; অতঃপর তাঁর দিকেই তারা প্রত্যাবর্তীত হবে।”
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. কুরআন পূর্ববর্তী লোকদের মতভেদের সমাধান প্রদানকারী।
২. কুরআন মু’মিনদের জন্য রহমত ও পথনির্দেশ।
৩. আল্লাহ তা‘আলা মানুষের সকল বিষয়ের মীমাংসা করে দেবেন।
৪. সর্বাবস্থায় আল্লাহ তা‘আলার ওপরই ভরসা করা উচিত।
৫. যারা সত্য দীনের কথা শোনে ও তার দ্বারা উপকার লাভ করতে পারে না তারা মূলত মৃত মানুষের শামিল।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৭৬-৮১ নং আয়াতের তাফসীর
আল্লাহ স্বীয় পবিত্র কিতাব সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে বলেন যে, কুরআন যেমন রহমত স্বরূপ তেমনই ফুরকানও বটে। বানী ইসরাঈল অর্থাৎ যারা তাওরাত ও ইঞ্জীলের বাহক তাদের মতভেদের ফায়সালা এই কিতাবে রয়েছে। যেমন হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর ইয়াহূদীরা মিথ্যা অপবাদ দিয়েছিল এবং খৃষ্টানরা তাঁকে তাঁর সীমার চেয়ে বাড়িয়ে দিয়েছিল। কুরআন এর ফায়সালা করে দিয়েছে এবং ইফরাত (বাহুল্য) এবং তাফরীত (অত্যল্প)-কে ছেড়ে দিয়ে সত্য কথা প্রকাশ করেছে। কুরআন বলেছে যে, তিনি আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। আল্লাহর হুকুমে তিনি সৃষ্ট হয়েছেন। তাঁর মাতা ছিলেন অত্যন্ত পবিত্র ও সতী-সাধ্বী। সঠিক ও সন্দেহহীন কথা এটাই। এই কুরআন মুমিনদের অন্তরের হিদায়াত এবং তাদের জন্যে সরাসরি রহমত। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা তাদের ফায়সালা করবেন যিনি বদলা নেয়ার ব্যাপারে প্রবল পরাক্রান্ত এবং বান্দাদের কথা ও কাজ সম্পর্কে তিনি পূর্ণ ওয়াকিফহাল।
এরপর মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলেনঃ “তুমি আল্লাহর উপর নির্ভর কর। তুমি তো স্পষ্টভাবে সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত। আর বিরুদ্ধবাদীরা চিরন্তনরূপে হতভাগ্য। তাদের উপর তোমার প্রতিপালকের কথা বাস্তবায়িত হয়েছে। সুতরাং তাদের ভাগ্যে ঈমান নেই। তুমি যদি তাদের সমস্ত মু'জিযা প্রদর্শন কর তবুও তারা ঈমান আনয়ন করবে না। তারা মৃতের ন্যায়। আর তুমি তো মৃতকে কথা শুনাতে পারবে না এবং পারবে না তুমি বধিরকে তোমার ডাক। শুনাতে, যখন তারা পিঠ ফিরিয়ে চলে যায়। আর যারা চোখ থাকতেও অন্ধ সাজে তাদেরকে তুমি পথভ্রষ্টতা হতে পথে আনতে সক্ষম হবে না। তুমি শুনতে পারবে শুধু তাদেরকে যারা আমার আয়াতসমূহকে বিশ্বাস করে এবং তারাই তো আত্মসমর্পণকারী। তারা আল্লাহ ও তার রাসূল (সঃ)-কে স্বীকার করে এবং আল্লাহর দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থেকে আমল করে যায়।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।