আল কুরআন


সূরা আন-নামাল (আয়াত: 8)

সূরা আন-নামাল (আয়াত: 8)



হরকত ছাড়া:

فلما جاءها نودي أن بورك من في النار ومن حولها وسبحان الله رب العالمين ﴿٨﴾




হরকত সহ:

فَلَمَّا جَآءَهَا نُوْدِیَ اَنْۢ بُوْرِکَ مَنْ فِی النَّارِ وَ مَنْ حَوْلَهَا ؕ وَ سُبْحٰنَ اللّٰهِ رَبِّ الْعٰلَمِیْنَ ﴿۸﴾




উচ্চারণ: ফালাম্মা-জাআহা-নূদিইয়া আম বূরিকা মান ফিন্না-রি ওয়া মান হাওলাহা- ওয়া ছুবহা-নাল্লা-হি রাব্বিল ‘আ-লামীন।




আল বায়ান: তারপর সে যখন সেখানে এসে পৌঁছল, তখন ডেকে বলা হল, ‘বরকতময় যা এ আলোর মধ্যে ও এর চারপাশে আছে। আর সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহ মহাপবিত্র, মহিমান্বিত’।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৮. অতঃপর তিনি যখন সেটার কাছে আসলেন(১), তখন ঘোষিত হল, বরকতময়, যা আছে এ আলোর মধ্যে এবং যা আছে এর চারপাশে(২), আর সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহ্ পবিত্র ও মহিমান্বিত!(৩)




তাইসীরুল ক্বুরআন: অতঃপর সে যখন আগুনের কাছে আসল তখন আওয়াজ হল- ‘ধন্য, যারা আছে এই আলোর মধ্যে আর তার আশেপাশে, বিশ্বজাহানের প্রতিপালক পবিত্র, মহিমান্বিত।




আহসানুল বায়ান: (৮) অতঃপর সে যখন আগুনের নিকট এল তখন তাকে ডেকে বলা হল, ‘যে (এই) আগুনে এবং যারা ওর চারিপাশে আছে তারা বরকতপ্রাপ্ত, [1] বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ পবিত্র ও মহিমার্নিত।[2]



মুজিবুর রহমান: অতঃপর সে যখন ওর নিকট এলো তখন ঘোষিত হলঃ ধন্য সেই ব্যক্তি যে আছে এই আগুনের মধ্যে এবং যারা আছে ওর চতুস্পার্শ্বে। জগতসমূহের রাব্ব আল্লাহ পবিত্র ও মহিমান্বিত।



ফযলুর রহমান: অতঃপর সে যখন ঐ আগুনের কাছে এল তখন তাকে সম্বোধন করে বলা হল, “বরকতময় তিনি, যিনি আগুনের মধ্যে আছেন এবং যারা তার আশেপাশে আছেন। বিশ্বজগতের প্রভু আল্লাহ কত মহান!



মুহিউদ্দিন খান: অতঃপর যখন তিনি আগুনের কাছে আসলেন তখন আওয়াজ হল ধন্য তিনি, যিনি আগুনের স্থানে আছেন এবং যারা আগুনের আশেপাশে আছেন। বিশ্ব জাহানের পালনকর্তা আল্লাহ পবিত্র ও মহিমান্বিত।



জহুরুল হক: অতঃপর যখন তিনি এর কাছে এলেন তখন আওয়াজ হলো এই বলে -- "ধন্য সেইজন যে আগুনের ভেতরে এবং যে এর আশেপাশে রয়েছে। আর সকল মহিমা বিশ্বজগতের প্রভু আল্লাহ্‌র!



Sahih International: But when he came to it, he was called, "Blessed is whoever is at the fire and whoever is around it. And exalted is Allah, Lord of the worlds.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৮. অতঃপর তিনি যখন সেটার কাছে আসলেন(১), তখন ঘোষিত হল, বরকতময়, যা আছে এ আলোর মধ্যে এবং যা আছে এর চারপাশে(২), আর সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহ্ পবিত্র ও মহিমান্বিত!(৩)


তাফসীর:

(১) যখন তিনি গাছের কাছে আসলেন, তখন তিনি ভয়ানক ও আশ্চর্যজনক এক দৃশ্য দেখতে পেলেন, তিনি সেখানে দেখতে পেলেন সবুজ গাছে আগুন জলছে। আর সে আগুনে শুধু আলোর তীব্ৰতাই প্রকাশ পাচ্ছে। অপরদিকে গাছটিতেও সবুজতা ও সজীবতা বেড়েই চলেছে। তারপর তিনি তার মাথা উপরের দিকে উঠালেন, দেখলেন সে নূর আকাশ পর্যন্ত ছেয়ে আছে। ইবন আব্বাস বলেন, এটা কোন আগুন ছিল না বরং জ্বলে উঠার মত আলো ছিল। তখন মূসা আলাইহিস সালাম আশ্চর্যান্বিত ও হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেন। আর তখনই বলা হল, যিনি আগুনে আছেন তিনি বরকতময় হোন। ইবন আব্বাস বলেন, বরকতময় হওয়ার অর্থ, পবিত্র ও মহিয়ান হওয়া। আর তার পাশে যারা আছে তারা হচ্ছেন ফিরিশতা। [ইবন কাসীর]


(২) এখানে আল্লাহর বাণীঃ “বরকতপূর্ণ হয়েছে, যা আছে এ আলোর মধ্যে এবং যা আছে এর চারপাশে” এর মধ্যে আলোতে কে আছে এবং আলোর চারপাশে কি আছে তা নির্ধারণ করার ব্যাপারে কয়েকটি মত রয়েছে।

এক. এখানে ‘অগ্নিতে যা আছে তা দ্বারা মূসা আলাইহিস সালামকে বুঝানো হয়েছে। আর তখন এর চারপাশে যা আছে তা বলে আশেপাশে উপস্থিত ফেরেশতাদেরকে বুঝানো হবে। [বাগভী; কুরতুবী]

দুই. কোন কোন মুফাসসির এখানে ‘অগ্নিতে যা আছে’ বলে ফেরেশতাদেরকে উদ্দেশ্য নিয়েছেন এবং ‘এর চারপাশে যা আছে’ তা বলে মূসা আলাইহিস সালামকে বুঝানো হয়েছে বলে মত প্রকাশ করেছেন। [বাগভী]

তিন. ‘এখানে অগ্নিতে যা আছে’ তা বলে আল্লাহর নূরকে বুঝানো হয়েছে, আর ‘এর চারপাশে যা আছে’ তা বলে ফেরেশতা [ইবন কাসীর] অথবা মূসা বা সেই পবিত্ৰ উপত্যকা অথবা সে গাছ সবই উদ্দেশ্য হতে পারে। আর এ মতটিই অধিক গ্রহণযোগ্য। তবে কোন অবস্থাতেই এখানে ‘অগ্নিতে যা আছে’ দ্বারা স্বয়ং আল্লাহ তা'আলার পবিত্র ও মহান সত্তা বুঝানো হবে না। কেননা স্রষ্টা তাঁর আরশে রয়েছেন। কোন সৃষ্টিবস্তুর মধ্যে স্রষ্টার অনুপ্রবেশ হতে পারে না। এটা তাওহীদের পরিপন্থী কথা। সুতরাং রাব্বুল আলামিনের নূরের আলোর দ্বারাই সে গাছ কোন ভাবে আলোকিত হয়েছিল। তবে সরাসরি কোন আলো কোথায় পতিত হলে তা ভষ্ম হয়ে যাবে।

হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “আল্লাহ ঘুমান না, ঘুমানো তার জন্য সমীচীনও নয়, ইনসাফের পাল্লা বাড়ান এবং কমান, দিবাভাগের আগেই রাতের আমল তার কাছে উত্থিত হয় অনুরূপভাবে রাত্রি আগমণের আগেই তার কাছে দিবাভাগের আমল উত্থিত হয়। তাঁর পর্দা হলো নূরের। যদি তিনি তার পর্দাকে অপসারণ করেন তবে তা তার চেহারার আলো দৃষ্টিশক্তি যতদূর যায় ততদুর জ্বলিয়ে ভষ্ম করে দেবে।” [সহীহ মুসলিমঃ ১৭৯]


(৩) অর্থাৎ তিনি আরাশের উপর থেকেও যমীনে এক গাছের উপরে তাঁর আলো ফেলে সেখান থেকে তাঁর বান্দা মূসার সাথে কথা বলছেন। তিনি অত্যন্ত মহান ও পবিত্র, তিনি যা ইচ্ছে করতে পারেন। তাঁর সত্তা, গুণাগুণ ও কার্যধারা কোন কিছুই কোন সৃষ্টজীবের মত হতে পারে না। তাঁর সৃষ্ট কোন কিছু তাঁকে আয়ত্ব করতে পারে না। আসমান ও যমীন তাঁকে ঘিরে রাখতে পারে না। তিনি সুউচ্চ, সুমহান, সমস্ত সৃষ্টিকুল থেকে পৃথক। [ইবন কাসীর]

তিনি এ গাছের উপর থেকে কথা বললেও এটা যেন কেউ মনে না করে বসে যে, তিনি সৃষ্ট কোন কিছুর ভিতরে প্রবেশ করেছেন। এ আয়াতাংশ বলার উদ্দেশ্য সম্ভবত এও হতে পারে যে, দুনিয়াতে অধিকাংশ শির্ক সংঘটিত হয়েছে আল্লাহ সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে। তাঁর কোন দৃষ্টি কোন কিছুর উপর পতিত হলে মানুষ সেটাকেই ইলাহ মনে করে পুজা করতে আরম্ভ করে। যদি আল্লাহকে সঠিকভাবে তাঁর মর্যাদা, সম্মান ও প্রতিপত্তি দেয়া হতো তা হলে কেউ শির্কে লিপ্ত হতো না। তাই এখানে তাঁকে এ ধরণের কাজ থেকে মুক্ত করার জন্য নির্দেশ দেয়া হচ্ছে।


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৮) অতঃপর সে যখন আগুনের নিকট এল তখন তাকে ডেকে বলা হল, ‘যে (এই) আগুনে এবং যারা ওর চারিপাশে আছে তারা বরকতপ্রাপ্ত, [1] বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ পবিত্র ও মহিমার্নিত।[2]


তাফসীর:

[1] দূর হতে যেখানে আগুনের শিখা দেখা যাচ্ছিল, সেখানে পৌঁঁছলেন অর্থাৎ, ত্বুর পাহাড়ে এবং দেখলেন এক সবুজ গাছ হতে আগুনের শিখা উপরে উঠছে। এটি বাস্তবে আগুন ছিল না; বরং আল্লাহর নূর ছিল। যার আলো আগুনের মত মনে হচ্ছিল। مَنْ فِي النَّار (যে আগুনে আছে) বলতে মহান আল্লাহ। আর نار (আগুন) বলতে তাঁর নূরকে বুঝানো হয়েছে। আর وَمَنْ حَوْلَهَا (যারা ওর চারিপাশে আছে) বলতে মূসা (আঃ) ও ফিরিশতাদেরকে বুঝানো হয়েছে। হাদীসে মহান আল্লাহর পর্দাকে نور (জ্যোতি) আর এক অন্য বর্ণনায় نار (আগুন) বলে অভিহিত করা হয়েছে। আর বলা হয়েছে যে, তিনি যদি নিজেকে পর্দা থেকে প্রকাশ করে দেন তাহলে তাঁর প্রতাপ সমস্ত সৃষ্টিকে পুড়িয়ে ছাই করে দেবে।

(মুসলিমঃ ঈমান অধ্যায়, বিস্তারিত দেখার জন্য দ্রষ্টব্যঃ ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়াহ ৫/৪৬৪- ৪৫৯)

[2] এখানে আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনার অর্থ এই যে, ঐ অদৃশ্য ডাক হতে কেউ যেন এটা মনে না করে যে, আল্লাহ ঐ গাছ বা আগুনে প্রবেশ করে আছেন; যেমন অনেক মুশরিকরা ধারণা করে থাকে। বরং এটি সত্য দর্শনের একটি পদ্ধতি যার দ্বারা প্রত্যেক নবীকে নবুঅতের শুরুতে সম্মানিত করা হয়। কখনো ফিরিশতার মাধ্যমে, আবার কখনো বা স্বয়ং আল্লাহ নিজেকে প্রকাশ করে এবং সরাসরি কথোপকথনের মাধ্যমে; যেমন, এখানে মূসা (আঃ)-এর সাথে ঘটেছে।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৭-১৪ নং আয়াতের তাফসীর:



মূসা (عليه السلام) দীর্ঘদিন মাদইয়ানে অবস্থান করার পর যখন মিশরের উদ্দেশ্যে স্বস্ত্রীক রওনা দিলেন তখন পথিমধ্যে রাত হয়ে যায়, ফলে তারা পথ হারিয়ে ফেলেন, আর তখন ছিল প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। তাই মূসা (عليه السلام) স্ত্রীকে লক্ষ্য করে আয়াতে উল্লিখিত কথা বললেন। মূসা (عليه السلام) সেখানে গেলে আল্লাহ তা‘আলা ডাক দিলেন এবং উল্লিখিত কথা বললেন। এর মাধ্যমে মূসা (عليه السلام)-এর নবুওয়াত ও আল্লাহ তা‘আলার সাথে কথা বলা শুরু হয়। এ সম্পর্কে সূরা আ‘রাফ ও সূরা ত্ব-হা-র ৯-১৪ নং আয়াতে ইতোপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে, সূরা কাসাসের ৩৯-৩১ নং আয়াতসহ অন্যান্য স্থানেও আলোচনা করা হবে ইনশা-আল্লাহ।



(وَجَحَدُوْا بِهَا وَاسْتَيْقَنَتْهَآ أَنْفُسُهُمْ)



‘তারা অন্যায় ও ঔদ্ধতভাবে নিদর্শনগুলো প্রত্যাখ্যান করল’ অর্থাৎ তারা যখন মূসা (عليه السلام)-এর আনীত নিদর্শনাবলী প্রত্যক্ষ করল তখন দৃঢ়ভাবে জানতে পারল যে, মূসা (عليه السلام) যা কিছু নিয়ে এসেছেন তা সত্য ও আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট নিদর্শন। কিন্তু তারপরেও তারা অন্যায় ও ঔদ্ধত্যতাবশত অস্বীকার করল। সুতরাং সত্যকে জানার পরেও অহংকার, অন্যায় ও ঔদ্ধত্যতাবশত অস্বীকার করা কুফরী কাজ। সত্যকে চেনা ও জানার পরেও অস্বীকার করলে জাহান্নাম ছাড়া কোন পথ নেই।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. প্রয়োজন মেটানোর জন্য স্বাভাবিক উপায়াদি অবলম্বন করা তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী নয়।

২. সাধারণ মজলিসে নির্দিষ্ট করে স্ত্রীর আলোচনা না করা, বরং ইশারা-ইঙ্গিতে বলা উত্তম।

৩. সত্যকে জানার পরেও অস্বীকার করা হারাম।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৭-১৪ নং আয়াতের তাফসীর

আল্লাহ তা'আলা স্বীয় প্রিয় পাত্র হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে হযরত মূসা (আঃ)-এর ঘটনা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। তিনি হযরত মূসা (আঃ)-কে মর্যাদাসম্পন্ন নবী বানিয়েছিলেন, তার সাথে কথা বলেছিলেন, তাঁকে বড় বড় মু'জিযা দান করেছিলেন এবং ফিরাউন ও তার লোকদের কাছে তাঁকে নবীরূপে প্রেরণ করেছিলেন। কিন্তু ঐ কাফিরের দল তাকে অস্বীকার করে। তারা কুফরী ও অহংকার করে এবং তাঁর অনুসরণ করতে অস্বীকৃতি জানায়।

মহান আল্লাহ বলেন যে, যখন হযরত মূসা (আঃ) নিজের পরিবারবর্গকে নিয়ে চলছিলেন তখন তিনি পথ ভুলে যান। রাত্রি এসে পড়ে এবং চতুর্দিক ঘন অন্ধকারে ছেয়ে যায়। একদিকে তিনি অগ্নিশিখা দেখতে পান। তখন তিনি তাঁর পরিবারবর্গকে বলেনঃ “তোমরা এখানে অবস্থান কর। আমি ঐ আলোর দিকে যাচ্ছি। হয়তো সেখানে কেউ রয়েছে, তার কাছে পথ জেনে নেবো, অথবা সেখান হতে কিছু আগুন নিয়ে আসবো। যাতে তোমরা আগুন পোহাতে পার। হলোও তাই। সেখান হতে তিনি একটি বড় খবর আনলেন এবং বড় একটা নূর (জ্যোতি) লাভ করলেন।

এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, যখন হযরত মূসা (আঃ) ঐ আলোর নিকট পৌঁছলেন তখন তিনি সেখানকার দৃশ্য দেখে হতবাক হয়ে গেলেন। তিনি একটি সবুজ রং গাছ দেখলেন যার উপর আগুন জড়িয়ে রয়েছে। অগ্নিশিখা প্রচণ্ড আকার ধারণ করেছে এবং গাছের শ্যামলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। উপরের দিকে তাকিয়ে তিনি দেখতে পান যে, ঐ নূর আকাশ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। প্রকৃতপক্ষে ওটা আগুন ছিল না। বরং জ্যোতি ছিল। সেটা আবার ছিল বিশ্বপ্রতিপালক এক ও শরীকবিহীন আল্লাহর। হযরত মূসা (আঃ) অত্যন্ত বিস্মিত হয়েছিলেন এবং তিনি কোন কিছুই বুঝতে পারছিলেন না। হঠাৎ শব্দ আসলোঃ ধন্য সে ব্যক্তি যে আছে এই অগ্নির মধ্যে এবং যারা আছে ওর চতুষ্পর্শ্বে (অর্থাৎ ফেরেশতামণ্ডলী)।

হযরত আবু মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ নিদ্রা যান না এটা তার জন্যে উপযুক্ত নয়। তিনি দাঁড়িপাল্লাকে নীচে নামিয়ে দেন এবং উঁচু করে থাকেন। রাত্রির কাজ দিনের পূর্বেই এবং দিনের কাজ রাত্রির পূর্বেই তাঁর নিকট উঠে যায়। (এ হাদীসটি মুসনাদে আবি হাতিমে বর্ণিত হয়েছে) “তার পর্দা হলো জ্যোতি অথবা অগ্নি। যদি ওটা সরে যায় তবে তার চেহারার তাজাল্লীতে ঐ সমুদয় জিনিস পুড়ে যাবে যেগুলোর উপর তাঁর দৃষ্টি পড়বে (অর্থাৎ সারা জগত)।` এটুকু মাসঊদী (রঃ) বেশী করেছেন। এ হাদীসের বর্ণনাকারী আবু উবাইদাহ (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করার(আরবি) এ আয়াতটিই পাঠ করেন।

জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ পবিত্র ও মহিমান্বিত। তিনি যা চান তা-ই করে থাকেন। তাঁর সৃষ্টের মধ্যে তাঁর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কেউই নেই। তিনি সমুচ্চ ও মহান। তিনি সমুদয় সৃষ্ট হতে পৃথক। যমীন ও আসমান তাকে পরিবেষ্টন করতে পারে না। তিনি এক, তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন। তিনি মাখলুকের সঙ্গে তুলনীয় হওয়া হতে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র।

এরপর আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, তিনি হযরত মূসা (আঃ)-কে সম্বোধন করে বলেনঃ হে মূসা (আঃ)! আমি তো আল্লাহ, পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।

অতঃপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ হযরত মূসা (আঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেনঃ “হে মূসা (আঃ)! তুমি তোমার হাতের লাঠিখানা যমীনে ফেলে দাও যাতে তুমি স্বচক্ষে দেখতে পাও যে, আল্লাহ তাআলা স্বেচ্ছাচারী এবং তিনি সবকিছুর উপরই পূর্ণ ক্ষমতাবান।” আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ শ্রবণ মাত্রই হযরত মূসা (আঃ) তাঁর লাঠিখানা মাটিতে ফেলে দেন। তৎক্ষণাৎ লাঠিখানা এক বিরাট সাপ হয়ে যায় এবং চলতে ফিরতে শুরু করে। লাঠিকে এরূপ বিরাট জীবন্ত সাপ হতে দেখে হযরত মূসা (আঃ) ভীত হয়ে পড়েন। কুরআন কারীমে (আরবি) শব্দ রয়েছে, এটা হলো এক প্রকার সাপ যা অতি দ্রুত চলতে পারে এবং খুবই ভয়াবহ হয়ে থাকে। একটি হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঘরে অবস্থানকারী সাপকে মেরে ফেলতে নিষেধ করেছেন।

মোটকথা, হযরত মূসা (আঃ) ঐ সাপ দেখে ভীত হয়ে পড়েন এবং ভয়ের কারণে স্থির থাকতে পারেননি, বরং পিঠ ফিরিয়ে সেখান হতে পালাতে শুরু করেন। তিনি এতো ভীত-সন্ত্রস্ত ছিলেন যে, একবার মুখ ঘুরিয়েও দেখেননি। তৎক্ষণাৎ আল্লাহ তা'আলা ডাক দিয়ে বললেনঃ “হে মূসা (আঃ)! ভীত হয়ো না। আমি তো তোমাকে আমার মনোনীত রাসূল ও মর্যাদা সম্পন্ন নবী বানাতে চাই। এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ “তবে যারা যুলুম করার পর মন্দকর্মের পরিবর্তে সৎ কর্ম করে তাদের প্রতি আমি ক্ষমাশীল পরম দয়ালু।” এখানে হয়েছে। এই আয়াতে মানুষের জন্যে বড়ই সুসংবাদ রয়েছে। যে কেউই কোন অন্যায় ও মন্দ কাজ করবে, অতঃপর লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়ে ঐ কাজ ছেড়ে দেবে ও খাটি অন্তরে তাওবা করবে এবং আল্লাহর দিকে ঝুঁকে পড়বে, আল্লাহ তা'আলা তার তাওবা ককূল করে নিবেন। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আমি ঐ ব্যক্তির উপর অত্যন্ত ক্ষমাশীল যে তাওবা করে, ঈমান আনে এবং ভাল কাজ করে অতঃপর হিদায়াত লাভ করে।” (২০:৮২) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ “যে ব্যক্তি খারাপ কাজ করে অথবা নিজের নফসের উপর যুলুম করে।” (৪:১১০) এই বিষয়ের আয়াত বহু রয়েছে।

লাঠি সাপ হয়ে যাওয়া একটি মুজিযা, এর সাথে সাথে হযরত মূসা (আঃ)-কে আর একটি মু'জিযা দেয়া হচ্ছে। আল্লাহ তা'আলা তাঁর প্রিয় নবী হযরত মূসা (আঃ)-কে সম্বোধন করে বলেনঃ তোমার হাত তোমার বক্ষপার্শ্বে বস্ত্রের মধ্যে প্রবেশ করাও, তাহলে এটা বের হয়ে আসবে শুভ্র নির্দোষ হয়ে। এটা ফিরাউন ও তার সম্প্রদায়ের নিকট আনীত নয়টি নিদর্শনের অন্তর্গত, যেগুলো দ্বারা আমি সময়ে সময়ে তোমার পৃষ্ঠপোষকতা করবো, যাতে তুমি সত্যত্যাগী ফিরাউন ও তার কওমের উপর প্রভাব বিস্তার করতে পার ।

এ নয়টি মু'জিয়া এগুলোই ছিল যেগুলোর বর্ণনা, (আরবি) (১৭: ১০১) এই আয়াতে রয়েছে যার পূর্ণ তাফসীর ওখানেই গত হয়েছে।

যখন এই সুস্পষ্ট ও প্রকাশমান মু'জিযাগুলো ফিরাউন ও তার লোকদেরকে দেখানো হলো তখন তারা হঠকারিতা করে বললোঃ “এটা তো সুস্পষ্ট যাদু। আমরা তোমার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করাবার জন্যে আমাদের বড় বড় যাদুকরদেরকে আহ্বান করছি। যাদুকরদের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলো। আল্লাহ তা'আলা সত্যকে জয়যুক্ত করলেন এবং ঐ হঠকারিদের সবকিছুই ব্যর্থ হয়ে গেল। তবুও তারা। বাহ্যিক মুকাবিলা হতে সরলো না। শুধু যুলুম ও ফখরের উপর ভিত্তি করেই তারা সত্যকে অবিশ্বাস করতে থাকলো।

মহান আল্লাহ বলেনঃ দেখো, বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পরিণাম কতই না। বিস্ময়কর ও শিক্ষামূলক হয়েছিল। একই বারে একই সাথে সবাই তারা সমদে নিমজ্জিত হয়েছিল। সুতরাং হে শেষ নবী (সঃ)-কে অবিশ্বাসকারীর দল! তোমরা এই নবী (সঃ)-কে অবিশ্বাস করে নিজেদেরকে নিরাপদ মনে করে বসো না। কেননা, এই নবী (সঃ) তো হযরত মূসা (আঃ) অপেক্ষাও উত্তম ও শ্রেষ্ঠতর। তার দলীল প্রমাণাদি ও মু'জিযাগুলোও হযরত মূসা (আঃ)-এর মু'জিযাগুলো অপেক্ষা বড় এবং মযবূত। স্বয়ং তাঁর ঐ অস্তিত্ব, তাঁর স্বভাব চরিত্র, পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের এবং পূর্ববর্তী নবীদের (আঃ) তাঁর সম্পর্কে শুভ সংবাদ ও তাঁদের নিকট হতে তার জন্য আল্লাহ তা'আলার ওয়াদা অঙ্গীকার গ্রহণ ইত্যাদি সবকিছুই তার মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। সুতরাং তোমরা তাঁকে না মেনে নির্ভয়ে থাকবে এটা মোটেই উচিত নয়।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।