সূরা আন-নামাল (আয়াত: 4)
হরকত ছাড়া:
إن الذين لا يؤمنون بالآخرة زينا لهم أعمالهم فهم يعمهون ﴿٤﴾
হরকত সহ:
اِنَّ الَّذِیْنَ لَا یُؤْمِنُوْنَ بِالْاٰخِرَۃِ زَیَّنَّا لَهُمْ اَعْمَالَهُمْ فَهُمْ یَعْمَهُوْنَ ؕ﴿۴﴾
উচ্চারণ: ইন্নাল্লাযীনা লা-ইউ’মিনূনা বিলআ-খিরাতি যাইইয়ান্না-লাহুম আ‘মা-লাহুম ফাহুম ইয়া‘মাহূন।
আল বায়ান: নিশ্চয় যারা আখিরাতে বিশ্বাস করে না আমি তাদের জন্য তাদের আমলসমূহকে সুশোভিত করে দিয়েছি। ফলে তারা বিভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়ায়।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৪. নিশ্চয় যারা আখেরাতে ঈমান আনে না, তাদের জন্য তাদের কাজকে আমরা শোভন করেছি(১), ফলে তারা বিভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়ায়;
তাইসীরুল ক্বুরআন: যারা আখিরাতে বিশ্বাস করে না, তাদের (চোখে) তাদের কর্মকান্ডকে আমি সুশোভিত করেছি, কাজেই তারা উদভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়ায়,
আহসানুল বায়ান: (৪) নিশ্চয় যারা পরলোকে বিশ্বাস করে না, তাদের দৃষ্টিতে তাদের কর্মকে আমি শোভন করেছি, [1] ফলে ওরা বিভ্রান্তের মত ঘুরে বেড়ায়; [2]
মুজিবুর রহমান: যারা আখিরাতে বিশ্বাস করেনা তাদের দৃষ্টিতে তাদের কাজকে আমি শোভন করেছি, ফলে তারা বিভ্রান্তিতে ঘুরে বেড়ায়।
ফযলুর রহমান: যারা পরকাল বিশ্বাস করে না আমি তাদের কর্মকাণ্ডকে তাদের কাছে শোভনীয় করেছি; তাই তারা বিভ্রান্ত হয়।
মুহিউদ্দিন খান: যারা পরকালে বিশ্বাস করে না, আমি তাদের দৃষ্টিতে তাদের কর্মকান্ডকে সুশোভিত করে দিয়েছি। অতএব, তারা উদভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়ায়।
জহুরুল হক: নিঃসন্দেহ যারা পরকালে বিশ্বাস করে না তাদের ক্রিয়াকর্মকে আমরা তাদের জন্য চিত্তাকর্যক করেছি, ফলে তারা অন্ধভাবে ঘুরে বেড়ায়।
Sahih International: Indeed, for those who do not believe in the Hereafter, We have made pleasing to them their deeds, so they wander blindly.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৪. নিশ্চয় যারা আখেরাতে ঈমান আনে না, তাদের জন্য তাদের কাজকে আমরা শোভন করেছি(১), ফলে তারা বিভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়ায়;
তাফসীর:
(১) এখানে বলা হয়েছে যে, যারা আখেরাতে ঈমান রাখে না আমরা তাদের দৃষ্টিতে তাদের কুকর্মকে শোভন করে দিয়েছি। ফলে তারা সেগুলোকে উত্তম মনে করে পথ ভ্ৰষ্টতায় লিপ্ত থাকে। এটা এ জন্যই যে, তারা আখেরাতকে অস্বীকার করেছে। [ইবন কাসীর] সুতরাং আখেরাতকে অস্বীকার করাই তাদের জন্য যাবতীয় পতনের মূল কারণ হিসেবে বিবেচিত হলো। এক গুনাহ অন্য গুনাহর কারণ হয়। অন্য আয়াতে আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ “তারা যেমন প্রথমবারে তাতে ঈমান আনেনি তেমনি আমরাও তাদের মনোভাবের ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করে দেব এবং তাদেরকে তাদের অবাধ্যতায় উদভ্ৰান্তের মত ঘুরে বেড়াতে দেব।” [সূরা আল-আনআমঃ ১১০]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৪) নিশ্চয় যারা পরলোকে বিশ্বাস করে না, তাদের দৃষ্টিতে তাদের কর্মকে আমি শোভন করেছি, [1] ফলে ওরা বিভ্রান্তের মত ঘুরে বেড়ায়; [2]
তাফসীর:
[1] এটি পাপের পরিণাম ও তার বদলা যে, পাপ তাদেরকে ভাল মনে হয়। আর এর মূল কারণ হল পরকালে অবিশ্বাস। শোভন করার সম্পর্ক আল্লাহর দিকে করা হয়েছে, যেহেতু প্রতিটি জিনিস তার ইচ্ছাতেই হয়ে থাকে। তাছাড়া এর মধ্যে আল্লাহর সেই নীতি কার্যকর থাকে, যাতে তিনি সৎ লোকদের জন্য পুণ্যের এবং অসৎ লোকদের জন্য পাপের রাস্তা সহজ করে থাকেন। কিন্তু এই উভয়ের মধ্যে একটি রাস্তা বেছে নেওয়া মানুষের নিজের এখতিয়ারভুক্ত।
[2] অর্থাৎ, ভ্রষ্টতার যে রাস্তায় তারা চলতে থাকে তার বাস্তবিকতা তাদের অজানা থাকে এবং সঠিক রাস্তার দিশা পায় না।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: নামকরণ:
النَّمْلِ “নামল” শব্দের অর্থ পিপীলিকা। অত্র সূরার ১৮ নং আয়াতে সুলাইমান (عليه السلام)-এর সাথে পিপীলিকা সংক্রান্ত ঘটনা বর্ণিত হয়েছে, সেখান থেকেই উক্ত নামে সূরার নামকরণ করা হয়েছে।
সূরার শুরুতে কুরআন মু’মিনদের জন্য সুপথ প্রদর্শক ও সুসংবাদ, পক্ষান্তরে যারা মু’মিন নয় তাদের অশুভ পরিণতি বর্ণনা করা হয়েছে। তারপর মূসা (عليه السلام)-এর মিসর প্রত্যাবর্তনে আল্লাহ তা‘আলার সাথে কথোপকথন, সুলাইমান (عليه السلام) ও বিলকীসের বিস্তারিত ঘটনা এবং সালেহ (عليه السلام)-এর জাতি সামূদ ও লূত (عليه السلام)-এর জাতি সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হয়েছে। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলার রুবুবিয়্যাহ সম্পর্কে এবং কাফিদের পুনরুত্থানকে অসম্ভব মনে করাসহ অন্যান্য বিষয়েও আলোচনা করা হয়েছে।
১-৬ নং আয়াতের তাফসীর:
طٰسٓ (ত্বা-সীন)ন এ জাতীয় “হুরূফুল মুক্বাত্বআত” বা বিচ্ছিন্ন অক্ষর সম্পর্কে সূরা বাকারার প্রথেমেই আলোচনা করা হয়েছে। এগুলোর প্রকৃত উদ্দেশ্য একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই ভাল জানেন।
(تِلْكَ اٰيٰتُ الْقُرْاٰنِ وَكِتٰبٍ مُّبِيْنٍ)
অর্থাৎ শুরুতেই আল্লাহ তা‘আলা বলছেন এগুলো কুরআন ও সুস্পষ্ট কিতাবের আয়াত অর্থাৎ এতে হালাল-হারাম, হক-বাতিল সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। যেগুলোর ব্যাপারে কোন অস্পষ্টতা নেই। যাতে মানুষ কোন সংশয় ও সন্দেহে না থাকে। এ সম্পর্কে সূরা শুআরার প্রথমে আলোচনা করা হয়েছে।
(هُدًي وَّبُشْرٰي لِلْمُؤْمِنِيْنَ)
‘মু’মিনদের জন্য পথপ্রদর্শন ও সুসংবাদ।’ পরের আয়াতে মু’মিনদের বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করে আল্লাহ তা‘আলা বলেন: মু’মিন হল তারা যারা সালাত কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং আখিরাতের ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাসী। এ সম্পর্কে সূরা বাকারার ২-৫ নং আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা ঐ সকল লোকদের শাস্তির কথা বর্ণনা করছেন যারা আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে না। তাদের জন্য পার্থিব জগতের অসৎ কার্যকলাপ ও দুনিয়ার জীবনকেই আল্লাহ তা‘আলা সুন্দর করে তুলে ধরেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(زُيِّنَ لِلَّذِيْنَ كَفَرُوا الْحَيٰوةُ الدُّنْيَا)
“যারা কুফরী করেছে তাদের জন্য দুনিয়ার জীবনকে সুশোভিত করে দেয়া হয়েছে।” (সূরা বাকারাহ ২:১২১) ফলে দুনিয়ার চাকচিক্যে ও মোহে পড়ে তারা ঈমান আনতে পারে না, বরং তারা বিভ্রান্ত লোকদের মত ঘুরপাক খায়। এদের জন্যই রয়েছে নিকৃষ্ট শাস্তি। আর এরাই আখিরাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَنُقَلِّبُ أَفْئِدَتَهُمْ وَأَبْصَارَهُمْ كَمَا لَمْ يُؤْمِنُوْا بِه۪ٓ أَوَّلَ مَرَّةٍ وَّنَذَرُهُمْ فِيْ طُغْيَانِهِمْ يَعْمَهُوْنَ)
“তারা যেমন প্রথমবারে তাতে ঈমান আনেনি আমিও তাদের মনোভাবের ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করে দেব এবং তাদেরকে তাদের অবাধ্যতায় উদভ্রান্তের মত ঘুরে বেড়াতে দেব।” (সূরা আন‘আম ৬:১১০)
অতএব যারাই আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূলের অবাধ্য হবে, শয়তানের পথ অনুসরণ করবে তারাই আখিরাতে কঠিন শাস্তির অধিকারী হবে। যে শাস্তি থেকে কোনভাবেই পরিত্রাণ পাওয়া যাবে না। তাই আমাদের উচিত শয়তানের পথ বর্জন করে আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূলের পথে চলা।
(وَإِنَّكَ لَتُلَقَّي الْقُرْاٰنَ مِنْ لَّدُنْ حَكِيْمٍ عَلِيْمٍ)
‘নিশ্চয়ই তোমাকে আল-কুরআন দেয়া হচ্ছে প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞের নিকট হতে’ অর্থাৎ কুরআন নাযিল করা হয় প্রজ্ঞাময় ও মহান জ্ঞানী আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে, তারপর তুমি তা গ্রহণ কর। কুরআন কোন শয়তানের কথা নয়, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিজেরও কথা নয়, বরং তা আল্লাহ তা‘আলার কথা। সুতরাং মক্কার কাফিরসহ যারা বলে, মুহাম্মাদ তা রচনা করেছে কিম্বা শয়তান তার কাছে ওয়াহী করে; তাদের কথা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট। এ সম্পর্কে সূরা শু‘আরার ১৯২ নং আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. কুরআনের বিধি-বিধান সুস্পষ্ট এতে কোন প্রকার অস্পষ্টতা নেই।
২. কুরআন তাদের জন্যই সুসংবাদ বয়ে আনবে যারা সালাত আদায় করবে, যাকাত দেবে এবং আখিরাতের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাসী হবে।
৩. যারা কাফির তারা আখিরাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে ।
৪. কুরআন কোন মানব রচিত গ্রন্থ নয়, বরং সন্দেহাতীতভাবে তা আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ কিতাব।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১-৬ নং আয়াতের তাফসীর
সূরাসমূহের শুরুতে যে হুরূফে মুকাত্তাআত বা বিছিন্ন অক্ষরগুলো এসে থাকে সেগুলোর পূর্ণ আলোচনা সূরায়ে বাকারার শুরুতে করা হয়েছে। সুতরাং এখানে ওগুলোর পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন। এগুলো হলো উজ্জ্বল ও সুস্পষ্ট কুরআনের আয়াত। এগুলো হলো মুমিনদের জন্যে পথ-নির্দেশ ও সুসংবাদ। কেননা তারাই এগুলোকে বিশ্বাস করতঃ এগুলোর অনুসরণ করে থাকে। তারা কুরআনকে সত্য বলে স্বীকার করে এবং ওর উপর আমল করে থাকে।
এরা তারাই যারা সঠিকভাবে ফরয নামায আদায় করে এবং অনুরূপভাবে ফরয যাকাত প্রদানের ব্যাপারেও কোন ত্রুটি করে না। আর তারা পরকালের প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস রাখে। মৃত্যুর পরে পুনরুত্থান এবং এরপরে পুরস্কার ও শাস্তিকেও তারা স্বীকার করে থাকে। জান্নাত ও জাহান্নামকে তারা সত্য বলে বিশ্বাস করে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবি)
অর্থাৎ “তুমি বল- এই কুরআনি মুমিনদের জন্যে হিদায়াত ও শিফা (রোগমুক্তি), আর যারা মুমিন নয় তাদের কর্ণসমূহে বধিরতা রয়েছে।” (৪১:৪৪) আর এক জায়গায় রয়েছে (আরবি) অর্থাৎ “যেন তুমি এর দ্বারা আল্লাহ-ভীরুদেরকে সুসংবাদ দাও এবং অবাধ্য ও দুষ্ট লোকদেরকে ভয় প্রদর্শন কর।” (১৯:৯৭)
এখানেও মহান আল্লাহ বলেনঃ যারা আখিরাতে বিশ্বাস করে না তাদের দৃষ্টিতে তাদের কর্মকে আমি শোভনীয় করেছি। তাদের কাছে তাদের মন্দ কাজও ভাল মনে হয়। তাই তারা ঔদ্ধত্য ও বিভ্রান্তিতে ঘুরে বেড়ায়। তাদেরই জন্যে রয়েছে কঠিন শাস্তি এবং আখিরাতে তারাই হবে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত।
মহামহিমান্বিত আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলেনঃ হে নবী (সঃ)! নিশ্চয়ই তোমাকে আল-কুরআন দেয়া হয়েছে প্রজ্ঞাময় সর্বজ্ঞের নিকট হতে। তাঁর আদেশ ও নিষেধের মধ্যে কি নিপুণতা রয়েছে তা তিনিই ভাল জানেন। ছোট বড় সমস্ত কাজ সম্পর্কে তিনি পূর্ণ অবহিত। সুতরাং কুরআন কারীমের সবকিছুই নিঃসন্দেহে সত্য। এর মধ্যে যেসব আদেশ ও নিষেধ রয়েছে সবই ন্যায় ও ইনসাফপূর্ণ। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমার প্রতিপালকের কথা সত্য ও ন্যায় রূপে পূর্ণ হয়ে গেছে।” (৬: ১১৬)
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।