সূরা আশ-শুআ‘রা (আয়াত: 3)
হরকত ছাড়া:
لعلك باخع نفسك ألا يكونوا مؤمنين ﴿٣﴾
হরকত সহ:
لَعَلَّکَ بَاخِعٌ نَّفْسَکَ اَلَّا یَکُوْنُوْا مُؤْمِنِیْنَ ﴿۳﴾
উচ্চারণ: লা‘আল্লাকা বা-খি‘উন নাফছাকা আল্লা-ইয়াকূনূমু’মিনীন।
আল বায়ান: তারা মুমিন হবে না বলে হয়ত তুমি আত্মবিনাশী হয়ে পড়বে।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩. তারা মুমিন হচ্ছে না বলে আপনি হয়ত মনোকষ্টে আত্মঘাতী হয়ে পড়বেন।
তাইসীরুল ক্বুরআন: তুমি হয়ত এ দুঃখে তোমার প্রাণনাশ করবে যে, তারা মু’মিন হচ্ছে না।
আহসানুল বায়ান: (৩) ওরা বিশ্বাস করে না বলে তুমি হয়তো মনঃকষ্টে আত্মঘাতী হয়ে পড়বে। [1]
মুজিবুর রহমান: তারা মু’মিন হচ্ছেনা বলে তুমি হয়ত মনকষ্টে আত্মবিনাশী হয়ে পড়বে।
ফযলুর রহমান: তারা ঈমান আনছে না বলে মনের দুঃখে তুমি যেন আত্মহনন করতে চাও।
মুহিউদ্দিন খান: তারা বিশ্বাস করে না বলে আপনি হয়তো মর্মব্যথায় আত্নঘাতী হবেন।
জহুরুল হক: তুমি হয়ত তোমার নিজেকে মেরেই ফেলবে যেহেতু তারা মুমিন হচ্ছে না।
Sahih International: Perhaps, [O Muhammad], you would kill yourself with grief that they will not be believers.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৩. তারা মুমিন হচ্ছে না বলে আপনি হয়ত মনোকষ্টে আত্মঘাতী হয়ে পড়বেন।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৩) ওরা বিশ্বাস করে না বলে তুমি হয়তো মনঃকষ্টে আত্মঘাতী হয়ে পড়বে। [1]
তাফসীর:
[1] নবী (সাঃ)-এর অন্তরে মানুষের প্রতি যে মমতা এবং তাদের হিদায়াতের জন্য তাঁর অন্তরে যে ব্যাকুলতা অনুভব করতেন তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এখানে।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: নামকরণ:
الشُّعَرَا۬ءُ শব্দটি شاعر এর বহুবচন, অর্থ হচ্ছে কবিগণ। এ সূরার ২২৪ নং আয়াতে الشُّعَرَا۬ءُ শব্দটি উল্লেখ রয়েছে, সেখান থেকেই সূরার নামকরণ করা হয়েছে।
সূরার শুরুতেই আল্লাহ তা‘আলা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সান্ত্বনা দিচ্ছেন, কাফিররা ঈমান আনবে না তাতে আফসোস করা ও চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। তারপর মূসা ও হারূন (عليهم السلام)-এর ফির‘আউনের কাছে তাওহীদের দাওয়াত, দাওয়াত পেয়ে ফির‘আউনের অবস্থান, জাদুকরদের সামনে মূসা (عليه السلام)-এর সাপের মু‘জিযাহ প্রদর্শন ও জাদুকরদের ঈমান আনয়ন, ঈমানদারদের সাথে নিয়ে সমুদ্র পারাপার, ইবরাহীম (عليه السلام) ও তাঁর মূর্তিপূজক জাতির বর্ণনা, কিয়ামতের দিন বিশুদ্ধ অন্তরের অধিকারীদের সফলতা, নূহ (عليه السلام) ও তাঁর জাতির কাছে তাওহীদের দাওয়াত, হূদ (عليه السلام), সালেহ (عليه السلام), লূত (عليه السلام), শু‘আইব (عليه السلام) ও তাঁদের জাতির বর্ণনা দিয়ে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে তাঁর নিকটাত্মীয়দের প্রতি আল্লাহ তা‘আলার আযাবের ভয় প্রদর্শন করার নির্দেশ দিয়েছেন, তারপর কবিদের অবস্থা তুলে ধরেছেন।
১-৯ নং আয়াতের তাফসীর:
طٰسٓمّ (ত্বা-সীন-মীম) এ জাতীয় “হুরূফুল মুক্বাত্বআত” বা বিচ্ছিন্ন অক্ষর সম্পর্কে সূরা বাকারার শুরুতে আলোচনা করা হয়েছে। এগুলোর আসল উদ্দেশ্য একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই ভাল জানেন।
শুরুতেই আল্লাহ তা‘আলা বলছেন, এগুলো সুস্পষ্ট কুরআনের আয়াত অর্থাৎ এতে হালাল-হারাম, হক-বাতিল সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। যেগুলোর ব্যাপারে কোন অস্পষ্টতা নেই। যাতে মানুষ কোন সংশয় ও সন্দেহে না থাকে।
بَاخِعٌ শব্দটি بخع থেকে উদ্ভূত, এর অর্থ যবেহ করতে গিয়ে গর্দানের শিরা পর্যন্ত পৌঁছা। এখানে অর্থ নিজেকে কষ্ট ও ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়া। অর্থাৎ কাফিররা ঈমান আনছে না এজন্য আফসোস ও চিন্তিত হয়ে নিজেকে হয়তো ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছো। আল্লাহ তা‘আলা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সান্ত্বনা দিয়ে বলছেন, এমন করার কোনই প্রয়োজন নেই। হিদায়াতের মালিক একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা, দাওয়াতি কাজ যা করার তুমি তা করে যাচ্ছ, এটাই তোমার কাজ। এ জন্য আল্লাহ তা‘আলা বলছেন, ‘আমি ইচ্ছা করলে আকাশ হতে তাদের নিকট এক নিদর্শন প্রেরণ করতাম’ অর্থাৎ প্রকাশ্য মু‘জিযাহ প্রদান করতেন, ফলে তাদের মাথা বিনয়ের সাথে নত হয়ে যেত।
আল্লাহ বলেন:
(وَلَوْ شَا۬ءَ رَبُّكَ لَاٰمَنَ مَنْ فِي الْأَرْضِ كُلُّهُمْ جَمِيْعًا ط أَفَأَنْتَ تُكْرِهُ النَّاسَ حَتّٰي يَكُوْنُوْا مُؤْمِنِيْنَ)
“তোমার প্রতিপালক ইচ্ছা করলে পৃথিবীতে যারা আছে তারা সকলেই ঈমান আনত; তবে কি তুমি মু’মিন হবার জন্য মানুষের ওপর জবরদস্তি করবে?” (সূরা ইউনুস ১০:৯৯) যেহেতু যখনই তাদের কাছে কোন উপদেশ বাণী এসেছে তখনই তারা তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, সুতরাং তারা শাস্তির হকদার। তাদের ভাগ্যে ঈমান নেই। তারা আমার নিদর্শন নিয়ে যে ঠাট্টা-বিদ্রƒপ করেছে তার ফলাফল অচিরেই পাবে। এ সম্পর্কে সূরা কাহফের ৬ নং ও সূরা হিজরের ৮৮ ও ৯৭ নং আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।
সুতরাং আল্লাহ তা‘আলা কাউকে কোন কিছু করতে বাধ্য করেন না। যার ইচ্ছা হয় ঈমান আনবে আবার যার ইচ্ছা হয় ঈমান আনবে না। এটা মানুষের ইচ্ছাধীন করা হয়েছে। যে ঈমান নিয়ে আসবে সে তার প্রতিদানস্বরূপ জান্নাত লাভ করবে। আর যে ঈমান আনবে না বরং কুফরী করবে তারা তাদের কুফরীর প্রতিদান অচিরেই বুঝতে পারবে। সুতরাং ঈমান আনা না আনা একান্তই মানুষের ব্যক্তিগত বিষয়। কোন জোর-জবরদস্তির বিষয় নয়।
এরপর আল্লাহ তা‘আলা তাঁর একটি ক্ষমতার কথা বর্ণনা করেছেন, তিনি জমিন হতে মানুষের জন্য সর্বপ্রকার উদ্ভিদ উদ্গত করেছেন। এ সম্পর্কে সূরা নাহলের ১০ ও ১১ নং আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।
সুতরাং আল্লাহ প্রত্যেক বিষয়ের ওপর ক্ষমতাবান। আর তিনিই একমাত্র ইবাদতের হকদার।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. যারা ঈমান আনবে তারা জান্নাতে যাবে আর যারা ঈমান আনবে না তারা জাহান্নামে যাবে।
২. আল্লাহ তা‘আলা কাউকে কোন কাজ করার জন্য বাধ্য করেন না।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: মালিক (রঃ)-এর রিওয়াইয়াতকৃত তাফসীরে এই সূরার নাম দেয়া হয়েছে সূরায়ে জামেআহ’।
১-৯ নং আয়াতের তাফসীর
হুরূফে মুকাত্তাআতের আলোচনা সূরায়ে বাকারার তাফসীরের শুরুতে গত হয়েছে। অতঃপর মহান আল্লাহ বলেনঃ এগুলো হলো সুস্পষ্ট কিতাবের আয়াত, যা খুবই স্পষ্ট, সম্পূর্ণ পরিষ্কার এবং হক ও বাতিল, ভাল ও মন্দের মধ্যে ফায়সালা ও পার্থক্যকারী।
মহামহিমান্বিত আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলেনঃ তারা ঈমান আনয়ন করছে না বলে তুমি দুঃখ করো না এবং নিজেকে ধ্বংস করে ফেলো না। এভাবে তিনি স্বীয় নবী (সঃ)-কে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। যেমন অন্য জায়গায় তিনি বলেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ “তারা ঈমান আনয়ন করছে না বলে তুমি দুঃখ করে নিজেকে ধ্বংস করো না।” (৩৫: ৮) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হয়তো তাদের পিছনে পড়ে তুমি আত্মবিনাশী হয়ে পড়বে।” (১৮৪৬)
মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি ইচ্ছা করলে আকাশ হতে তাদের নিকট এক নিদর্শন প্রেরণ করতাম, ফলে তাদের গ্রীবা বিনত হয়ে পড়তো ওর প্রতি। অর্থাৎ তাদেরকে ঈমান আনয়নে বাধ্য করার ইচ্ছা করলে আমি এমন জিনিস আকাশ হতে অবতীর্ণ করতাম যে, তা দেখে তারা ঈমান আনতে বাধ্য হতো। কিন্তু আমি তো তাদের ঈমান আনা বা না আনা তাদের ইচ্ছার উপর ছেড়ে দিয়েছি। অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবি)
অর্থাৎ “তোমার প্রতিপালক ইচ্ছা করলে পৃথিবীর সবাই অবশ্যই ঈমান আনয়ন করতো। তুমি কি লোকদেরকে বাধ্য করবে যে পর্যন্ত না তারা মুমিন হয়?” (১০: ৯৯) আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ “তোমার প্রতিপালক যদি ইচ্ছা করতেন তবে তিনি সমস্ত মানুষকে একই উম্মত (দল) করতে পারতেন।” (১১:১১৮) দ্বীন ও মাযহাবের এই বিভিন্নতাও আল্লাহ তা'আলারই নির্ধারণকৃত এবং এটা তার নিপুণতা প্রকাশকারী। তিনি রাসূল পাঠিয়েছেন, কিতাবসমূহ অবতীর্ণ করেছেন, দলীল-প্রমাণাদি কায়েম করেছেন, অতঃপর তিনি মানুষকে ঈমান আনয়ন করা বা করার ব্যাপারে স্বাধীনতা দিয়েছেন। এখন যে পথে ইচ্ছা সে চলতে থাকুক।
মহান আল্লাহ বলেনঃ যখনই তাদের কাছে দয়াময়ের নিকট হতে নতুন। উপদেশ আসে তখনই তারা তা হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়। অর্থাৎ যখনই আকাশ হতে তাদের নিকট কোন কিতাব আসে তখনই অধিকাংশ লোক মুখ ফিরিয়ে নেয়। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ “তুমি লালসা করলেও অধিকাংশ লোক মুমিন নয়।” (১২:১০৩)। তিনি আরো বলেনঃ
অর্থাৎ “পরিতাপ বান্দাদের জন্যে; তাদের নিকট যখনই কোন রাসূল এসেছে। তখনই তারা তাকে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করেছে।” (৩৬:৩০) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ “অতঃপর আমি পর্যায়ক্রমে রাসূল পাঠিয়েছি, কিন্তু যখনই কোন উম্মতের কাছে তাদের রাসূল এসেছে, তারা তাকে অবিশ্বাসই করেছে।” (২৩:৪৪) এজন্যেই আল্লাহ তা'আলা এখানে বলেনঃ “তারা তো অস্বীকার করেছে; সুতরাং তারা যা নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করতো তার প্রকৃত বার্তা তাদের নিকট শীঘ্রই এসে পড়বে।” যালিমরা অতিসত্বরই জানতে পারবে যে, তাদেরকে কোন পথে নিক্ষেপ করা হয়েছে।
এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ নিজের শান-শওকত, ক্ষমতা, শ্রেষ্ঠত্ব, সম্মান ও উচ্চ মর্যাদার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেনঃ যার কথা এবং যার দূতকে তোমরা অবিশ্বাস করছে তিনি এতো বড় ক্ষমতাবান ও চির বিরাজমান যে, তিনি একাই সারা যমীন সৃষ্টি করেছেন এবং তাতে প্রাণী ও নিষ্প্রাণ বস্তু সৃষ্টি করেছেন। ক্ষেত, ফলমূল, বাগ-বাগিচা ইত্যাদি সবই তাঁর সৃষ্ট।
হযরত শা’বী (রঃ) বলেন যে, মানুষ যমীনের উৎপন্নদ্রব্য স্বরূপ। তাদের মধ্যে যারা জান্নাতী তারা শরীফ ও ভদ্র এবং যারা জাহান্নামী তারা ইতর ও ছোটলোক। এতে সৃষ্টিকর্তার বিরাট ক্ষমতার বহু নিদর্শনাবলী রয়েছে যে, তিনি বিস্তৃত যমীন ও উঁচু আসমান সৃষ্টি করেছেন। এতদসত্ত্বেও অধিকাংশ লোক। ঈমান আনে না। বরং উল্টো তারা নবীদেরকে প্রতারক বলে থাকে। আল্লাহর কিতাবসমূহকে তারা স্বীকার করে না, তার হুকুমের তারা বিরোধিতা করে এবং তার নিষেধকৃত কাজ করে থাকে।
মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তোমার প্রতিপালক তো পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু। তিনি সবকিছুর উপরই পূর্ণ ক্ষমতাবান। তার সামনে তাঁর সৃষ্টজীব সম্পূর্ণ অপারগ ও অক্ষম। সাথে সাথে তিনি তাঁর বান্দাদের প্রতি বড়ই করুণাময় ও অনুগ্রহশীল। তার অবাধ্য বান্দাদেরকে শাস্তি দেয়ার ব্যাপারে তিনি তাড়াতাড়ি করেন না, বরং শাস্তি দিতে তিনি বিলম্ব করেন, যাতে তারা সৎ পথে ফিরে আসে। কিন্তু তবুও তারা সৎ পথে ফিরে আসে না। তখন তিনি তাদেরকে অতি শক্তভাবে পাকড়াও করেন এবং তাদের থেকে পুরোপুরিভাবে প্রতিশোধ গ্রহণ করেন। তবে যারা তাওবা করতঃ তার দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং তার অনুগত হয়ে যায়, তাদের প্রতি তিনি তাদের পিতা-মাতার চেয়েও বেশী দয়া করে থাকেন।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।