সূরা আশ-শুআ‘রা (আয়াত: 139)
হরকত ছাড়া:
فكذبوه فأهلكناهم إن في ذلك لآية وما كان أكثرهم مؤمنين ﴿١٣٩﴾
হরকত সহ:
فَکَذَّبُوْهُ فَاَهْلَکْنٰهُمْ ؕ اِنَّ فِیْ ذٰلِکَ لَاٰیَۃً ؕ وَ مَا کَانَ اَکْثَرُهُمْ مُّؤْمِنِیْنَ ﴿۱۳۹﴾
উচ্চারণ: ফাকাযযাবূহু ফাআহলাকনা-হুম ইন্না ফী যা-লিকা লাআ-য়াতাও ওয়ামা-কা-না আকছারুহুম মু’মিনীন।
আল বায়ান: অতঃপর তারা তাকে অস্বীকার করল, ফলে তাদেরকে আমি ধ্বংস করে দিলাম; নিশ্চয় এতে নিদর্শন রয়েছে। আর তাদের অধিকাংশ মুমিন ছিল না।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৩৯. সুতরাং তারা তার প্রতি মিথ্যারোপ করল ফলে আমরা তাদেরকে ধ্বংস করলাম। এতে তো অবশ্যই আছে নিদর্শন; কিন্তু তাদের অধিকাংশই মুমিন নয়।(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: অতঃপর তারা তাকে মিথ্যে ব’লে প্রত্যাখ্যান করল। তখন আমি তাদেরকে ধ্বংস করে দিলাম। অবশ্যই এতে নিদর্শন রয়েছে, কিন্তু তাদের অধিকাংশই বিশ্বাস করে না।
আহসানুল বায়ান: (১৩৯) সুতরাং ওরা তাকে মিথ্যাজ্ঞান করল, ফলে আমি ওদেরকে ধ্বংস করলাম। [1] এতে অবশ্যই আছে নিদর্শন; কিন্তু ওদের অধিকাংশই বিশ্বাস করে না।
মুজিবুর রহমান: অতঃপর তারা তাকে প্রত্যাখ্যান করল এবং আমি তাদের ধ্বংস করলাম। এতে অবশ্যই রয়েছে নিদর্শন; কিন্তু তাদের অধিকাংশই মু’মিন নয়।
ফযলুর রহমান: এভাবে তারা তাকে প্রত্যাখ্যান করল আর আমি তাদেরকে ধ্বংস করে দিলাম। এর মধ্যে অবশ্যই একটি নিদর্শন আছে; কিন্তু তাদের অধিকাংশই ঈমানদার ছিল না।
মুহিউদ্দিন খান: অতএব, তারা তাঁকে মিথ্যাবাদী বলতে লাগল এবং আমি তাদেরকে নিপাত করে দিলাম। এতে অবশ্যই নিদর্শন আছে; কিন্তু তাদের অধিকাংশই বিশ্বাসী নয়।
জহুরুল হক: কাজেই তারা তাঁকে প্রত্যাখ্যান করল, সুতরাং আমরা তাদের ধ্বংস করেছিলাম। নিঃসন্দেহ এতে তো এক নিদর্শন রয়েছে, কিন্ত তাদের অধিকাংশই বিশ্বাসী নয়।
Sahih International: And they denied him, so We destroyed them. Indeed in that is a sign, but most of them were not to be believers.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১৩৯. সুতরাং তারা তার প্রতি মিথ্যারোপ করল ফলে আমরা তাদেরকে ধ্বংস করলাম। এতে তো অবশ্যই আছে নিদর্শন; কিন্তু তাদের অধিকাংশই মুমিন নয়।(১)
তাফসীর:
(১) আল্লাহ তা’আলা বলেছেন যে, তারা তাদের নবী হুদ আলাইহিস সালাম এর উপর মিথ্যারোপ করেছিল, ফলে আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছেন। [ইবন কাসীর]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১৩৯) সুতরাং ওরা তাকে মিথ্যাজ্ঞান করল, ফলে আমি ওদেরকে ধ্বংস করলাম। [1] এতে অবশ্যই আছে নিদর্শন; কিন্তু ওদের অধিকাংশই বিশ্বাস করে না।
তাফসীর:
[1] আ’দ জাতি ছিল পৃথিবীর শক্তিশালী জাতিদের অন্যতম। যাদের ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন,{الَّتِي لَمْ يُخْلَقْ مِثْلُهَا فِي الْبِلَادِ} অর্থাৎ, এ রকম জাতি পৃথিবীতে সৃষ্টিই হয়নি। (সূরা ফাজর ৮ আয়াত) অর্থাৎ, এমন জাতি যারা শক্তি, ক্ষমতা ও প্রতাপের দিক দিয়ে তাদের মত। সেই জন্য তারা বলত,{مَنْ أَشَدُّ مِنَّا قُوَّةً} আমাদের থেকে শক্তিশালী আর কে আছে? (সূরা হা-মীম সাজদাহ ১৫ আয়াত) কিন্তু যখন ঐ জাতি কুফরীর রাস্তা ত্যাগ করে ঈমানের রাস্তা অবলম্বন করল না, তখন মহান আল্লাহ আযাব স্বরূপ এক কঠিন ঝড় তাদের উপর প্রেরণ করলেন, যা অবিরত সাত রাত আট দিন তাদের উপর বয়েছিল। ঝড় এক একটি মানুষকে উপরে তুলে মাটির উপর আছড়ে দিয়েছিল, যার কারণে তাদের মাথা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে মগজ বের হয়ে গিয়েছিল এবং তাদের লাশগুলি বিনা মাথায় এমনভাবে মাটির উপর পড়ে ছিল, যেন তা খেজুরের সারশূন্য কান্ড। তারা পাহাড় কেটে, পাহাড়ের গুহায় বিশাল বিশাল প্রাসাদ তৈরী করেছিল, পানির জন্য গভীর কূপ খনন করেছিল এবং বহু বাগানের মালিক ছিল তারা। কিন্তু যখন আল্লাহর আযাব এসে পৌঁছল, তখন এ সমস্ত জিনিস তাদের কোনই কাজে এল না। আর তা তাদেরকে পৃথিবী হতে নিশ্চিহ্ন করে ছাড়ল।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১২৩-১৪০ নং আয়াতের তাফসীর:
এখানে আল্লাহ তা‘আলা হূদ (عليه السلام) ও তার জাতি ‘আদ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। যারা ছিল পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে শক্তিশালী জাতি।
তাদের কাছে অন্যান্য নাবীদের মত হূদ (عليه السلام) আল্লাহ তা‘আলার ভয় ও নিজের রিসালাতের প্রতি আহ্বান জানিয়ে দাওয়াতী কাজ শুরু করলেন এবং দাওয়াতী কাজের জন্য কোন পারিশ্রমিক চান না সে কথাও জানালেন, উপরন্তু তাদের ওপর আল্লাহ তা‘আলার নেয়ামতগুলো স্মরণ করিয়ে দিলেন। কিন্তু অন্যান্য জাতির ন্যায় তারাও দাওয়াত বর্জন করল। তারা বলল: ‘তুমি উপদেশ দাও অথবা না-ই দাও, উভয়ই আমাদের জন্য সমান।’ হূদ (عليه السلام) তাদেরকে তাওহীদের দাওয়াত দিলে তারা যে অদ্ভূত আচরণ করেছে তার বিবরণ সূরা আ‘রাফের ৬৫-৭২ নং আয়াতের তাফসীরে উল্লেখ হয়েছে।
(إِنْ هٰذَآ إِلَّا خُلُقُ الْأَوَّلِيْنَ)
অর্থাৎ নাবীদের দাওয়াত বর্জন করা পূর্ববর্তীদের স্বভাব। তাদের স্বভাব ধারণ করে এরাও অস্বীকার করল। ফলে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছেন। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَاَمَّا عَادٌ فَاُھْلِکُوْا بِرِیْحٍ صَرْصَرٍ عَاتِیَةٍﭕ سَخَّرَھَا عَلَیْھِمْ سَبْعَ لَیَالٍ وَّثَمٰنِیَةَ اَیَّامٍﺫ حُسُوْمًاﺫ فَتَرَی الْقَوْمَ فِیْھَا صَرْعٰیﺫ کَاَنَّھُمْ اَعْجَازُ نَخْلٍ خَاوِیَةٍﭖفَھَلْ تَرٰی لَھُمْ مِّنْۭ بَاقِیَةٍ)
“আর ‘আদ সম্প্রদায়, তাদেরকে ধ্বংস করা হয়েছিল এক প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড় দ্বারা। যা তিনি তাদের ওপর প্রবাহিত করেছিলেন বিরামহীনভাবে সাত রাত ও আট দিন, তুমি (উপস্থিত থাকলে) সেই সম্প্রদায়কে দেখতে খেজুর কাণ্ডের ন্যায় সেখানে ছিন্ন ভিন্নভাবে পড়ে আছে। তুমি কি তাদের কাউকেও অবশিষ্ট দেখতে পাও?” (সূরা হাক্কাহ ৬৯:৬-৮)
তাই আমাদের আগে থেকেই সতর্ক হওয়া উচিত যে, তারা এক শক্তিশালী জাতি হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ তা‘আলার আযাব থেকে বাঁচতে পারেনি, আমরাও যদি নাফরমানী করি তাহলে আমাদের ওপরও শাস্তি আসবে আর তখন আল্লাহ তা‘আলার শাস্তি থেকে কেউ আমাদেরকে রক্ষা করতে পারবে না। অতএব আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করে সকল প্রকার শির্ক ও ঈমান বিনষ্টকারী আমল বর্জন করে বেশি বেশি সৎ আমল করা অবশ্য কর্তব্য।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১৩৬-১৪০ নং আয়াতের তাফসীর
হযরত হূদ (আঃ)-এর হৃদয়গ্রাহী বর্ণনা এবং উৎসাহ প্রদান ও ভয় প্রদর্শনযুক্ত ভাষণ তাঁর কওমের উপর মোটেই ক্রিয়াশীল হলো না। তারা পরিষ্কারভাবে বলে দিলোঃ “(হে হৃদ আঃ)! তুমি আমাদেরকে উপদেশ দাও আর না-ই দাও, উভয়ই আমাদের জন্যে সমান। আমরা তোমার কথা মেনে নিয়ে আমাদের পূর্বপুরুষদের রীতি-নীতি পরিত্যাগ করতে পারি না। আমাদের ঈমান আনয়নের ব্যাপারে তোমাদের নিরাশ হয়ে যাওয়া উচিত আমরা তোমার উপর ঈমান আনবো না।” প্রকৃতপক্ষে কাফিরদের অবস্থা এটাই। তাদেরকে বুঝানো ও উপদেশ দান বৃথা।
শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে আল্লাহ তা'আলা একথাই বলেছিলেনঃ ‘যারা কাফির হয়েছে তাদেরকে তুমি ভয় প্রদর্শন কর বা না-ই কর, উভয়ই তাদের জন্যে সমান, তারা ঈমান আনবে না।” আর এক জায়গায় রয়েছেঃ “নিশ্চয়ই যাদের উপর তোমার প্রতিপালকের কথা বাস্তবায়িত হয়েছে তারা ঈমান আনয়ন করবে না।”
(আরবি)-এর দ্বিতীয় কিরআত (আরবি) ও রয়েছে। অর্থাৎ হে হৃদ (আঃ)! তুমি.যে কথা আমাদেরকে বলছো এটা তো পূর্ববর্তীদের কথিত কথা।' যেমন কুরাইশরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেছিলঃ “এগুলো তো পূর্ববর্তীদের কাহিনী, যেগুলো সকাল-সন্ধ্যায় তোমার সামনে পাঠ করা হয়। আর এক জায়গায় রয়েছেঃ “এটা একটা মিথ্যা অপবাদ যা তুমি নিজেই গড়িয়ে নিয়েছো এবং কিছু লোককে নিজের পক্ষে করে নিয়েছো।” প্রসিদ্ধ কিরআত হিসেবে অর্থ হবেঃ “যার উপর আমরা রয়েছি ওটাই আমাদের পূর্বপুরুষদের মাযহাব। আমরা তো তাদের পথেই চলবো এবং তাদের রীতি-নীতিরই অনুসরণ করবো। আর এর উপরই আমরা মৃত্যু বরণ করবো। তুমি যা বলছে তা বাজে কথা। মৃত্যুর পরে আমাদেরকে পুনরায় জীবিত করা হবে এটা ঠিক নয়। আমাদেরকে শাস্তিও দেয়া হবে না। শেষ পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধাচরণ ও অবিশ্বাস করার কারণে তাদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হয়। প্রচণ্ড বায়ু প্রেরণ করে তাদেরকে মূলোৎপাটিত করা হয়। এরাই ছিল প্রথম আ'দ। এদেরকেই ইরামাযাতিল ইমাদ বলা হয়েছে। এরা ইরাম ইবনে সাম ইবনে নূহ (আঃ)-এর বংশধর ছিল। তারা সুউচ্চ প্রাসাদে বাস করতো। ইরাম ছিল হযরত নূহ (আঃ)-এর পৌত্রের নাম। ইরাম কোন শহরের নাম ছিল না। কেউ কেউ ইরামকে শহরের নামও বলেছেন বটে, কিন্তু এটা বানী ইসরাঈলের উক্তি। তাদের মুখ থেকে শুনে অন্যেরাও একথা বলে দিয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে এর কোন ম্যুবৃত দলীল নেই। এ কারণেই কুরআন কারীমে ইরামের উল্লেখের পরেই বলা হয়েছেঃ (আরবি)
(আরবি) অর্থাৎ “যার সমতুল্য কোন শহরে সৃষ্টি করা হয়নি।” (৮৯: ৮) যদি ইরাম দ্বারা শহর উদ্দেশ্য হতো তবে বলা হতো।
অর্থাৎ “কোন দেশ যার মত শহর নির্মাণ করা হয়নি।” কুরআন কারীমের অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবি)
অর্থাৎ “আ’দ সম্প্রদায় অন্যায়ভাবে ভূ-পৃষ্ঠে অহংকার করে এবং বলে-আমাদের অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী আর কে আছে? তারা কি দেখেনি যে, যে আল্লাহ তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন তিনি তাদের চেয়ে বহুগুণে শক্তিশালী? তারা তার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করতো।” (৪১:১৫)
এটা আমরা পূর্বেই বর্ণনা করেছি যে, তাদের উপর শুধু বলদের নাক পরিমাণ বায়ু পাঠিয়েছিলেন। ঐ বায়ুই তাদের শহরগুলো এবং তাদের ঘরবাড়ীগুলো নিশ্চিহ্ন করে দেয়। যেখান দিয়েই ঐ বায়ু প্রবাহিত হয় সব সাফ করে দেয়। কওমের সবারই মাথা দেহ হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। আল্লাহর শাস্তিকে তারা বাতাসের আকারে দেখে দূর্গে, প্রাসাদে এবং সুরক্ষিত ঘরে আশ্রয় নেয়। মাটিতে গর্ত খনন করে তারা তাদের অর্ধেক দেহকে তাতে ঢুকিয়ে দিয়ে নিজেদেরকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু আল্লাহর শাস্তিকে কোন কিছু বাধা দিতে পারে কি? এ শাস্তি এক মিনিটের জন্যেও কাউকেও অবকাশ দেয় না। মহামহিমান্বিত আল্লাহ তাদের এ ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেনঃ “আ’দ সম্প্রদায়, তাদেরকে ধ্বংস করা হয়েছিল এক প্রচণ্ড ঝঞাবায়ু দ্বারা, যা তিনি তাদের উপর প্রবাহিত করেছিলেন সপ্তরাত্রি ও অষ্টদিবস বিরামহীনভাবে; তখন তুমি উক্ত সম্প্রদায়কে দেখতে তারা সেখানে লুটিয়ে পড়ে আছে সারশূন্য বিক্ষিপ্ত খর্জুর কাণ্ডের ন্যায়।” মহান আল্লাহ বলেনঃ এতে অবশ্যই নিদর্শন রয়েছে, কিন্তু তাদের অধিকাংশই ঈমানদার নয়। আল্লাহ হলেন মহাপরাক্রমশালী ও পরম দয়ালু।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।