আল কুরআন


সূরা আল-ফুরকান (আয়াত: 64)

সূরা আল-ফুরকান (আয়াত: 64)



হরকত ছাড়া:

والذين يبيتون لربهم سجدا وقياما ﴿٦٤﴾




হরকত সহ:

وَ الَّذِیْنَ یَبِیْتُوْنَ لِرَبِّهِمْ سُجَّدًا وَّ قِیَامًا ﴿۶۴﴾




উচ্চারণ: ওয়াল্লাযীনা ইয়াবীতূনা লিরাব্বিহিম ছুজ্জাদাওঁ ওয়া কিয়া-মা-।




আল বায়ান: আর যারা তাদের রবের জন্য সিজদারত ও দন্ডায়মান হয়ে রাত্রি যাপন করে।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৬৪. এবং তারা রাত অতিবাহিত করে তাদের রব-এর উদ্দেশ্যে সিজদাবনত হয়ে ও দাঁড়িয়ে থেকে(১);




তাইসীরুল ক্বুরআন: আর তারা রাত কাটায় তাদের প্রতিপালকের উদ্দেশে সাজদায় অবনত ও দন্ডায়মান অবস্থায়।




আহসানুল বায়ান: (৬৪) এবং যারা তাদের প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সিজদাবনত হয়ে ও দন্ডায়মান থেকে রাত্রি অতিবাহিত করে।



মুজিবুর রহমান: এবং তারা রাত অতিবাহিত করে তাদের রবের উদ্দেশে সাজদাহবনত হয়ে ও দন্ডায়মান থেকে।



ফযলুর রহমান: যারা তাদের প্রভুর উদ্দেশ্যে সেজদারত ও দণ্ডায়মান অবস্থায় রাত কাটায়।



মুহিউদ্দিন খান: এবং যারা রাত্রি যাপন করে পালনকর্তার উদ্দেশ্যে সেজদাবনত হয়ে ও দন্ডায়মান হয়ে;



জহুরুল হক: আর যারা রাত কাটিয়ে দেয় তাদের প্রভুর জন্য সিজদাবনত হয়ে ও দাঁড়িয়ে থেকে।



Sahih International: And those who spend [part of] the night to their Lord prostrating and standing [in prayer]



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৬৪. এবং তারা রাত অতিবাহিত করে তাদের রব-এর উদ্দেশ্যে সিজদাবনত হয়ে ও দাঁড়িয়ে থেকে(১);


তাফসীর:

(১) অর্থাৎ তারা রাত্রি যাপন করে তাদের পালনকর্তার সামনে সিজদারত অবস্থায় ও দণ্ডায়মান অবস্থায়। ইবাদাতে রাত্রি জাগরণের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করার কারণ এই যে, এই সময়টি নিদ্রা ও আরামের। এতে সালাত ও ইবাদাতের জন্য দণ্ডায়মান হওয়া যেমন বিশেষ কষ্টকর, তেমনি এতে লোকদেখানো ও নাম যশোর আশংকাও নেই। উদ্দেশ্য এই যে, তারা দিবারাত্রি আল্লাহর ইবাদাতে মশগুল থাকে। কুরআন মজীদের বিভিন্ন স্থানে তাদের জীবনের এ দিকগুলো সুস্পষ্ট করে তুলে ধরা হয়েছে। যেমন অন্য সূরায় বলা হয়েছেঃ “তাদের পিঠ বিছানা থেকে আলাদা থাকে, নিজেদের রবকে ডাকতে থাকে আশায় ও আশংকায়।” [সূরা আস-সাজদাহঃ ১৬] অন্যত্র আরো বলা হয়েছেঃ “এ সকল জান্নাতবাসী ছিল এমন সব লোক যারা রাতে সামান্যই ঘুমাতো এবং ভোর রাতে মাগফিরাতের দোআ করতো।” [সূরা আয-যারিয়াতঃ ১৭–১৮]

আরো বলা হয়েছেঃ “যে ব্যক্তি হয় আল্লাহর হুকুম পালনকারী, রাতের বেলা সিজদা করে ও দাঁড়িয়ে থাকে, আখেরাতকে ভয় করে এবং নিজের রবের রহমতের প্রত্যাশা করে তার পরিণাম কি মুশরিকের মতো হতে পারে?” [সূরা আয-যুমারঃ ৯] হাদীসে সালাতুত তাহাজ্জুদের অনেক ফযীলত বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “নিয়মিত তাহাজ্জুদ আদায় কর, কেননা, এটা তোমাদের পূর্ববর্তী সকল নেককারদের অভ্যাস ছিল। এটা তোমাদেরকে আল্লাহ্ তা'আলার নৈকট্য দানকারী, মন্দ কাজের কাফফারা এবং গোনাহ থেকে নিবৃত্তকারী।” [সহীহ ইবনে খুযাইমাহঃ ১১৩৫] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেনঃ “যে ব্যক্তি এশার সালাত জামাআতে আদায় করে, সে যেন অর্ধারাত্রি ইবাদাতে অতিবাহিত করে এবং যে ব্যক্তি ফজরের সালাত জামাআতের সাথে আদায় করে, তাকে অবশিষ্ট অর্ধারাত্ৰিও ইবাদাতে অতিবাহিত্যকারী হিসেবে গণ্য করা হবে।” [মুসলিমঃ ৬৫৬]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৬৪) এবং যারা তাদের প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সিজদাবনত হয়ে ও দন্ডায়মান থেকে রাত্রি অতিবাহিত করে।


তাফসীর:

-


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৬৩-৭৪ নং আয়াতের তাফসীর:



অত্র আয়াতগুলোতে দয়াময় আল্লাহ তা‘আলার একনিষ্ঠ বান্দা যারা শুধুমাত্র আল্লাহ তা‘আলারই ইবাদত করে তাদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও আলামত উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে বিশ্বাসগত, দৈহিক ও আর্থিক যাবতীয় ব্যক্তিগত কর্মে আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বিধান অনুসরণ, অপর মানুষের সাথে সামাজিকতা ও সম্পর্ক স্থাপনের প্রকারভেদ, দিবারাত্রি ইবাদতের মাধ্যমে সাথে আল্লাহ তা‘আলা-ভীতি, যাবতীয় গোনাহ থেকে বেঁচে থাকার প্রয়াস, নিজের সাথে সাথে সন্তান-সন্ততি ও স্ত্রীদের সংশোধন চিন্তা ইত্যাদি বিষয়বস্তু শামিল রয়েছে। সেগুলো হল:



প্রথম গুণ:



عِبَادُ হওয়া। عِبَادُ শব্দটি عبد এর বহুবচন, অর্থন বান্দা, দাস, গোলাম, যে তার প্রভুর মালিকানাধীন এবং যার সমস্ত ইচ্ছা ও ক্রিয়াকর্ম প্রভুর আদেশ ও মর্জির ওপর নির্ভরশীল। আল্লাহ তা‘আলার আবদ বা দাস হতে পারা সৌভাগ্যের ও মর্যাদার ব্যাপার, সবাই আল্লাহ তা‘আলার আবদ হতে পারে না। আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে অনেক স্থানে আবদ বা দাস বলে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলার দাসত্ব দু’প্রকারন (১) عبودية لربوبيته বা আল্লাহ তা‘আলা প্রতিপালন করেন সে জন্য তাঁর দাসত্ব করা, এতে কাফির মুশরিক, মুসলিম সবাই শামিল। কেননা পৃথিবীর সবাই আল্লাহ তা‘আলার প্রতিপালন বা রুবুবিয়াহ স্বীকার করে। (২) عبودية لألوهيته বা আল্লাহ তা‘আলা মা‘বূদ বা তিনি ইবাদত পাওয়ার যোগ্য তাই তাঁর ইবাদত করা। এ প্রকার ইবাদত একমাত্র মুসলিমরাই করে থাকে, এখানে এ প্রকার ইবাদতকারী বান্দাদের আলোচনা করা হয়েছে। (তাফসীর সাদী)



দ্বিতীয় গুণ:



(يَمْشُوْنَ عَلَي الْأَرْضِ هَوْنًا)



‘যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে’ هَوْنً শব্দের অর্থ স্থিরতা, গাম্ভীর্য, বিনয়। অর্থাৎ গর্বভরে চলে না, অহংকারীর ন্যায় পা ফেলে না। আল্লাহ তা‘আলার ভয়ে খুব বিনয়-নম্রতার সাথে চলে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেনন



(وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا ط إِنَّ اللّٰهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُوْرٍ)



“এবং পৃথিবীতে গর্বভরে বিচরণ কর‎ না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা কোন দাম্ভিক, অহংকারকারীকে ভালোবাসেন না।” (সূরা লুকমান ৩১:১৮)



তৃতীয় গুণ:



(وَّإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجٰهِلُوْنَ قَالُوْا سَلَامًا)



‘এবং তাদেরকে যখন অজ্ঞ ব্যক্তিরা সম্বোধন করে তখন তারা বলে, ‘সালাম’; الْجٰهِلُوْنَ এখানে এই শব্দের অনুবাদ অজ্ঞ ব্যক্তিরা করা হয়েছে। কিন্তু এর অর্থ বিদ্যাহীন ব্যক্তি নয় বরং যারা মূর্খতাপূর্ণ কথাবার্তা বলে ও কাজ করে যদিও বাস্তবে বিদ্বান হয়। ‘সালাম’ শব্দ বলে এখানে প্রচলিত সালাম বুঝানো হয়নি। বরং নিরাপত্তার কথাবার্তা বুঝানো হয়েছে। ইমাম কুরতুবী নাহহাস থেকে বর্ণনা করেন যে, سلام শব্দটি تسليم থেকে নয় বরং تسلم থেকে উদ্ভুত যার অর্থ নিরাপদ থাকা। উদ্দেশ্য হলন মূর্খদের জবাবে তারা নিরাপত্তার কথাবার্তা বলে, যাতে অন্যরা কষ্ট না পায় এবং কোন বিশৃংখলা না হয় সে জন্য তাদের থেকে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



وَإِذَا سَمِعُوا اللَّغْوَ أَعْرَضُوْا عَنْهُ وَقَالُوْا لَنَآ أَعْمَالُنَا وَلَكُمْ أَعْمَالُكُمْ ز سَلٰمٌ عَلَيْكُمْ ز لَا نَبْتَغِي الْجٰهِلِيْنَ



“তারা যখন অসার বাক্য শ্রবণ করে তখন তারা তা উপেক্ষা করে চলে এবং বলে: ‘আমাদের কাজের ফল আমাদের জন্য এবং তোমাদের কাজের ফল তোমাদের জন্য এবং তোমাদের প্রতি ‘সালাম’। আমরা অজ্ঞদের সঙ্গ চাই না।’’ (সূরা কাসাস ২৮:৫৫)



চতুর্থ গুণ:



(وَالَّذِيْنَ يَبِيْتُوْنَ لِرَبِّهِمْ سُجَّدًا وَّقِيَامًا)



‘তারা আল্লাহ তা‘আলার আনুগত্য ও ইবাদতের মধ্যে রাত্রি অতিবাহিত করে।’ মানুষ যখন ঘুমিয়ে যায় তখন ইবাদতের কথা বলার কারণ হলন এ সময়টি হল নিদ্রা ও আরামের সময়, এ সময় সালাতের জন্য জাগ্রত হওয়া যেমন কষ্টকর ব্যাপার তেমনি এতে লোক দেখানোর কোন আশংকা থাকে না, ইবাদতে একাগ্রতা আসে। এ সময় আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন। আল্লাহ তা‘আলার বাণী:



(كَانُوْا قَلِيْلًا مِّنَ اللَّيْلِ مَا يَهْجَعُوْنَ -‏ وَبِالْأَسْحَارِ هُمْ يَسْتَغْفِرُوْنَ)‏



“তারা রাত্রির সামান্য অংশই নিদ্রাবস্থায় অতিবাহিত করত। রাত্রির শেষ প্রহরে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করত।” (সূরা যারিয়াত ৫১:১৭-১৮)



রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:



يَا أَيُّهَا النَّاسُ، أَفْشُوا السَّلَامَ، وَأَطْعِمُوا الطَّعَامَ، وَصَلُّوا وَالنَّاسُ نِيَامٌ تَدْخُلُونَ الجَنَّةَ بِسَلَامٍ



হে মানুষ সকল! সালামের প্রসার কর, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখ, মানুষকে খাদ্য খাওয়াও, রাতে সালাত আদায় কর যখন মানুষ ঘুমিয়ে যায়, তাহলে শান্তিতে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (তিরমিযী হা: ২৪৮৫, সহীহ)



পঞ্চম গুণ:



(وَالَّذِيْنَ يَقُوْلُوْنَ رَبَّنَا اصْرِفْ عَنَّا عَذَابَ جَهَنَّمَ)



‘তারা জাহান্নামের শাস্তি থেকে দয়াময় আল্লাহ তা‘আলার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে।’ অর্থাৎ রাতে ইবাদত করার পরেও নিশ্চিন্ত হয়ে বসে থাকে না বরং জাহান্নামের ভয়ে আল্লাহ তা‘আলার কাছে শাস্তি থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করে। কেননা তারা জানে যে, এ জাহান্নামের শাস্তি চিরস্থায়ী। এর থেকে আল্লাহ তা‘আলা মুক্তি না দিলে মুক্তি পাওয়ার কোন রাস্তা নেই। তারা আল্লাহ তা‘আলার শাস্তির ব্যাপারে ভয় করে। যেমন জাহান্নামের শাস্তির ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَلَا يُخَفَّفُ عَنْهُمْ مِّنْ عَذَابِهَا ط كَذٰلِكَ نَجْزِيْ كُلَّ كَفُوْرٍ)‏



“তাদের থেকে জাহান্নামের আযাবও হালকা করা হবে না। আমি এরূপই শাস্তি দিয়ে থাকি প্রত্যেক অকৃতজ্ঞকে।” (সূরা ফাতির ৩৫:৩৬)



ষষ্ঠ গুণ:



(وَالَّذِيْنَ إِذَآ أَنْفَقُوْا لَمْ يُسْرِفُوْا وَلَمْ يَقْتُرُوْا)



‘তারা খরচ করার সময় কৃপণতা করে না, আবার অপচয়ও করে না; বরং তারা এ ব্যাপারে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করে।’ ইবনু আব্বাস প্রমুখ বলেন: আল্লাহ তা‘আলার অবাধ্য কাজে ব্যয় করাকে اسراف বলা হয়, যদিও তা এক পয়সা হয়। কেউ বলেছেন, বৈধ ও অনুমোদিত কাজে প্রয়োজনাতিরিক্ত ব্যয় করাকেও اسراف বলা হয়। আর তারা তাক্বওয়া ও ভাল কাজে ব্যয় করতে কুন্ঠাবোধ করে না, যথাসম্ভব ব্যয় করার চেষ্টা করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَاٰتِ ذَا الْقُرْبٰي حَقَّه۫ وَالْمِسْكِيْنَ وَابْنَ السَّبِيْلِ وَلَا تُبَذِّرْ تَبْذِيْرًا)



“আত্মীয়-স্বজনকে তার প্রাপ্য অধিকার দাও এবং অভাবগ্রস্ত‎ ও মুসাফিরকেও; আর কিছুতেই অপব্যয় কর না।” (বানী ইসরাঈল ১৭:২৬) অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(إِنَّ الْمُبَذِّرِيْنَ كَانُوْآ إِخْوَانَ الشَّيَاطِيْنِ ط وَكَانَ الشَّيْطَانُ لِرَبِّهٰ كَفُوْرًا)‏



“যারা অপব্যয় করে তারা শয়তানের ভাই এবং শয়তান তার প্রতিপালকের প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ।” (সূরা ইসরা ১৭:২৭)



সপ্তম গুণ:



(وَالَّذِيْنَ لَا يَدْعُوْنَ مَعَ اللّٰهِ إلٰهًا اٰخَرَ)



‘তারা আল্লাহ তা‘আলার সাথে কাউকে ইলাহ হিসেবে আহ্বান করে না।’ অর্থাৎ তারা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করে, অন্য কাউকে তাঁর সাথে মা‘বূদ হিসেবে আহ্বান করে না। যেমন হাদীসে এসেছে: আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (رضي الله عنه) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞেস করা হলন সবচেয়ে বড় পাপ কোন্টি? তিনি বলেন: আল্লাহর সাথে শির্ক করা যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। (সহীহ বুখারী হা: ৬০০১-৪৪৭৭, সহীহ মুসলিম হা: ৮৬)



এ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(إِنَّه۫ مَنْ يُّشْرِكْ بِاللّٰهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللّٰهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوٰهُ النَّارُ ط وَمَا لِلظّٰلِمِيْنَ مِنْ أَنْصَارٍ)



“কেউ আল্লাহ তা‘আলার সাথে শরীক করলে আল্লাহ তা‘আলা তার জন্য জান্নাত অবশ্যই হারাম করবেন এবং তার আবাস জাহান্নাম। জালিমদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই।” (সূরা মায়িদাহ ৫:৭২)



অষ্টম গুণ:



(وَلَا يَقْتُلُوْنَ النَّفْسَ الَّتِيْ حَرَّمَ اللّٰهُ إِلَّا بِالْحَقِّ)



‘তারা অন্যায়ভাবে কোন মানুষকে হত্যা করে না।’ তবে যথাযথ কারণ পাওয়া গেলে ভিন্ন কথা, যথাযথ কারণ বলতে যে বিষয়টি বুঝনো হয়েছে তা হল: মুসলিম হওয়ার পর ধর্ম ত্যাগ করে মুর্তাদ হওয়া, এমতাবস্থায় তাকে হত্যা করা বৈধ। বিবাহের পর ব্যভিচারে লিপ্ত হলে তাকে হত্যা করা বৈধ। কাউকে হত্যা করলে কিসাসস্বরূপ তাকে হত্যা করা বৈধ।



নবম গুণ:



(وَلَا يَزْنُوْنَ)



‘তারা যিনা-ব্যভিচারে লিপ্ত হয় না।’ বরং নিজেদের সতীত্বকে হেফাযত করে। নিজ স্ত্রী বা দাসী ছাড়া অন্য কারো সাথে এ অপকর্মে লিপ্ত হয় না।



অতঃপর যারা এ সকল অপকর্মে বিশেষ করে উক্ত তিনটি যথা আল্লাহ তা‘আলার সাথে শির্ক, হত্যা ও ব্যভিচারে লিপ্ত হবে আল্লাহ তা‘আলা তাদের শাস্তির কথা বর্ণনা করেছেন যে, কিয়ামতের দিন এদের শাস্তি দ্বিগুণ করে দেয়া হবে। আর তারা সেখানে চিরস্থায়ীভাবে অবস্থান করবে। তবে যদি কেউ এগুলো করার পর অনুতপ্ত হয়ে ফিরে আসে, আল্লাহ তা‘আলার প্রতি ঈমান রাখে তাহলে আল্লাহ তা‘আলা তাকে ক্ষমা করে দেবেন এবং তার গুনাহগুলো আল্লাহ তা‘আলা নেকী দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন।



দশম গুণ:



(وَالَّذِيْنَ لَا يَشْهَدُوْنَ الزُّوْرَ)



‘তারা কোন ব্যাপারে কোন মিথ্যা সাক্ষী দেয় না।’ মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া অন্যতম একটি কবীরা গুনাহ, যা ব্যক্তিকে ও সমাজকে নষ্ট করে। হাদীসে এসেছে, আবূ বকর



(رضي الله عنه)



থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)‎ বলেছেন: আমি কি তোমাদেরকে সবচেয়ে বড় গুনাহ সম্পর্কে সচেতন করব না? এ কথাটি তিনি তিনবার বললেন, বর্ণনাকারী বলেন, তখন আমরা বললাম, হ্যাঁ। তখন রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)‎ বললেন: আল্লাহ তা‘আলার সাথে শির্ক করা, পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া, মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া। এ কথটি তিনি বার বার বলতে থাকলেন। (সহীহ বুখারী হা: ২৬৬৪, সহীহ মুসলিম হা: ৮৭)



একাদশ গুণ:



(وَإِذَا مَرُّوْا بِاللَّغْوِ مَرُّوْا كِرَامًا)



‘এবং অসার ক্রিয়াকলাপের সম্মুখীন হলে স্বীয় মর্যাদার সাথে সেটা পরিহার করে চলে।’ অর্থাৎ এমন মাজলিস বা আলোচনা সভা যেখানে এমন কথা-বার্তা হয় যা দুনিয়া ও আখিরাতের জন্য উপকারী নয়, তাহলে তারা সে সব মাজলিস ও বৈঠক বর্জন করে। এতে সকল প্রকার অসার কথা, গান-বাজনা ও অনর্থক কথা চলে আসে।



দ্বাদশ গুণ:



(وَالَّذِيْنَ إِذَا ذُكِّرُوْا بِاٰيٰتِ رَبِّهِمْ)



‘যাদের সম্মুখে তাদের প্রতিপালকের আয়াতসমূহ পাঠ করা হলে তারা অন্ধ ও বধিরসদৃশ আচরণ করে না।’ বরং এতে তাদের ঈমান আরো বৃদ্ধি পায় ও তার যথার্থ মূল্যায়ন করে, আল্লাহ তা‘আলার জন্য সিজদাবনত হয়, তাঁর প্রশংসা করে এবং অহংকার করে না।



যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন,



(إِنَّمَا يُؤْمِنُ بِاٰيٰتِنَا الَّذِيْنَ إِذَا ذُكِّرُوْا بِهَا خَرُّوْا سُجَّدًا وَّسَبَّحُوْا بِحَمْدِ رَبِّهِمْ وَهُمْ لَا يَسْتَكْبِرُوْنَ)



“কেবল তারাই আমার নিদর্শনগুলোর প্রতি ঈমান রাখে, যাদেরকে আমার আয়াতসমূহ যখন স্মরণ করিয়ে দেয়া হয় তখনই তারা সিজদায় লুটিয়ে পড়ে এবং স্বীয় প্রতিপালকের প্রশংসা, পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে, আর তারা অহঙ্কার করে না।” (সূরা সিজদাহ ৩২:১৫)



ত্রয়োদশ গুণ:



(وَالَّذِيْنَ يَقُوْلُوْنَ رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا)



‘এবং তারা প্রার্থনা করে বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিদেরকে আমাদের জন্য নয়ন প্রীতিকর এবং আমাদেরকে মুত্তাকীদের জন্য আদর্শস্বরূপ কর।’ সুতরাং আমরা যারা আল্লাহ তা‘আলার একনিষ্ঠ বান্দা হতে চাই তাদের উচিত উপরোল্লিখিত এ সকল বৈশিষ্ট্যগুলো অর্জন করা।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. আল্লাহ তা‘আলার সাথে কাউকে শরীক করা যাবে না।

২. কোন প্রকার গর্ব অহঙ্কার করা যাবে না।

৩. কোন প্রকার কৃপণতা ও অপচয় করা যাবে না।

৫. অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা যাবে না।

৫. অশ্লীল কার্যকলাপ করা যাবে না।

৬. ভুলবশত পাপ কাজ হয়ে গেলেও সাথে সাথে তাওবাহ করে নিতে হবে।

৭. মিথ্যা কথা বলা যাবে না ও মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া যাবে না।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৬৩-৬৭ নং আয়াতের তাফসীর

এখানে আল্লাহর মুমিন বান্দাদের গুণাবলীর বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। তারা ভূ-পৃষ্ঠে বিনয় ও নম্রতার সাথে চলাফেরা করে। তারা গর্ব-অহংকার, ঝগড়া-ফাসাদ এবং যুলুম-অত্যাচার করে না। যেমন হযরত লোকমান (আঃ) তার পুত্রকে বলেছিলেঃ (আরবি)

অর্থাৎ “তুমি ভূ-পৃষ্ঠে উদ্ধতভাবে বিচরণ করো না।” (৩১: ১৮) কৃত্রিমভাবে কোমর ঝুঁকিয়ে রুগ্ন ব্যক্তির মত পায়ে পায়ে চলা এখানে উদ্দেশ্য কখনই নয়। এটা তো রিয়াকারদের কাজ। তারা লোকদেরকে দেখানোর জন্যে এবং দুনিয়ার দৃষ্টি তাদের দিকে উঠিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্যেই এরূপ করে থাকে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অভ্যাস ছিল এর সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি এমনভাবে চলতেন যে, মনে হতো যেন তিনি কোন উঁচু জায়গা হতে নীচে নামছেন এবং যেন যমীনকে তাঁর জন্যে জড়িয়ে নেয়া হচ্ছে। পূর্বযুগীয় মনীষীরা রুগ্ন লোকদের মত কষ্টকর চলনকে অপছন্দ করতেন। বর্ণিত আছে যে, হযরত উমার (রাঃ) একটি লোককে খুবই ধীরে ধীরে চলতে দেখে জিজ্ঞেস করেনঃ “তুমি কি অসুস্থ?” উত্তরে লোকটি বলেঃ “না।” তিনি প্রশ্ন করেনঃ “তাহলে এরূপভাবে চলছো কেন? সাবধান! এরপরে যদি এরূপভাবে চল তবে তোমাকে চাবুক মারা হবে। শক্তির সাথে তাড়াতাড়ি চলবে।”

সুতরাং এখানে উদ্দেশ্য হলো শান্ত ও গাম্ভীর্যের সাথে ভদ্রভাবে চলা, দুর্বলতা ও অসুস্থতার ঢঙ্গে নয়। যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন তোমর নামাযের জন্যে আসে তখন দৌড়িয়ে এসো না, বরং শান্ত ও ধীরস্থিরভাবে এসো। জামাআতের সাথে যা পাবে তা আদায় করে নাও এবং যা ছুটে যাবে তা (পরে) পুরো করে নাও।” এই আয়াতের তফসীরে হযরত হাসান বসরী (রঃ) খুবই চমৎকার কথা বলেছেন। তা হলোঃ মুমিনদের চক্ষু, কর্ণ এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নত হয়ে থাকে, তাই অজ্ঞ ও নির্বোধ লোকেরা তাদেরকে অসুস্থ মনে করে। অথচ তারা অসুস্থ বা রুগ্ন নয়। বরং আল্লাহর ভয়ে তারা নত হয়ে থাকে। তারা পূর্ণভাবে সুস্থ-সবল রয়েছে, কিন্তু অন্তর আল্লাহর ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত রয়েছে। পরকালের জ্ঞান দুনিয়ার কামনা-বাসনা এবং ওর আঁকজমক থেকে তাদেরকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। কিয়ামতের দিন তারা বলবেঃ “ঐ আল্লাহর সমস্ত প্রশংসা যিনি আমাদের থেকে চিন্তা ও দুঃখ দূর করে দিয়েছেন। এতে কেউ যেন মনে করে যে, দুনিয়ার খাওয়া, পরা ইত্যাদির চিন্তা তাদের লেগেই থাকতো। না,। আল্লাহর শপথ! দুনিয়ার কোন দুঃখ ও চিন্তা তাদের কাছেও আসতো না। হ্যা, তবে আখিরাতের ভয় ও চিন্তা সদা তাদের লেগেই থাকতো। জান্নাতের কোন কাজকে তারা ভারী মনে করতো না, কিন্তু জাহান্নামের ভয় তাদেরকে কাঁদাতে থাকতো। যে ব্যক্তি আল্লাহর ভয় দেখানোর পরেও ভয় পায় না তার নফস দুঃখ ও আফসোসের মালিক (অর্থাৎ পরে তাকে আফসোসই করতে হবে)। যে ব্যক্তি শুধু পানাহারকেই আল্লাহর নিয়ামত মনে করে তার জ্ঞান কম। সে শাস্তির শিকার হয়ে আছে।

এরপর আল্লাহ তা'আলা তাঁর সৎ বান্দাদের গুণাবলীর বর্ণনা দিচ্ছেন যে, মূর্খ লোকেরা যখন তাদের সাথে মূখতাপূর্ণ কথা বলে তখন তারা এই মূর্খদের সাথে মূখতাপূর্ণ আচরণ করে না। বরং তাদেরকে ক্ষমা করে দেয়। মন্দ কথার প্রতিউত্তরে তারা কখনো মুখে মন্দ কথা উচ্চারণ করে না। যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অভ্যাস এই ছিল যে, কোন লোক যতই তাকে কড়া কথা বলতো ততই তিনি তাকে নরম কথা বলতেন। কুরআন কারীমের এই আয়াতে এই গুণেরই বর্ণনা দেয়া হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যখন তারা অসার ক্রিয়া-কলাপের কথা শুনে তখন তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।” (২৮:৫৫)।

নুমান ইবনে মাকরান আল মুযানী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ একটি লোক অন্য একটি লোককে গালি দেয়। কিন্তু ঐ লোকটি উত্তরে বলে- “তোমার উপর শান্তি বর্ষিত হোক।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) লোকটিকে বলেনঃ তোমাদের দু'জনের মাঝে ফেরেশতা বিদ্যমান ছিলেন। তিনি তোমার পক্ষ হতে গালিদাতাকে উত্তর দিচ্ছিলেন। সে তোমাকে যে গালি দিচ্ছিল, ফেরেশতা বলছিলেনঃ “এ নয়, বরং তুমি।” আর তুমি যখন বলছিলেঃ “তোমার উপর সালাম বর্ষিত হোক” তখন ফেরেশতা বলছিলেনঃ “তার উপর নয়, বরং তোমারই উপর (শান্তি বর্ষিত হোক)। শান্তি ও নিরাপত্তার হকদার তুমিই।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে) তাই বলা হয়েছে যে, মুমিনরা তাদের মুখে অশ্লীল বাক্য উচ্চারণ করে না। অকথ্য ভাষা প্রয়োগকারীর প্রতি তারা অকথ্য ভাষা প্রয়োগ করে না। ভাল কথা ছাড়া তাদের মুখ দিয়ে মন্দ কথা বের হয় না।

হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেনঃ আল্লাহর বান্দাদের দিনগুলো এমনভাবে অতিবাহিত হয় যে, অজ্ঞ লোকেরা তাদেরকে কড়া কথা বলে এবং তারা তা সহ্য করে নেয়। তাদের রাত্রি যেভাবে অতিবাহিত হয় তার বর্ণনা পরবর্তী আয়াতে রয়েছে।

মহান আল্লাহ বলেনঃ তারা রাত্রি অতিবাহিত করে তাদের প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সিজদাবনত হয়ে ও দণ্ডায়মান থেকে। তারা বিছানা হতে পৃথক হয়ে যায়। তাদের অন্তরে আল্লাহর ভয় বিদ্যমান থাকে। তারা আল্লাহর রহমতের আশা রাখে। তাই তারা তাঁর ইবাদতে রাত্রি কাটিয়ে দেয়।

তারা বলেঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের হতে জাহান্নামের শাস্তি বিদূরিত করুন! ওর শাস্তি তো নিশ্চিত বিনাশ। যেমন কবি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যদি তিনি শাস্তি দেন তবে তার শাস্তি তো নিশ্চিত বিনাশ ও অত্যন্ত কঠিন এবং চিরস্থায়ী, আর যদি তিনি দান করেন তবে তা তো অসংখ্য এবং বে-হিসাব।”

যে জিনিস আসে ও চলে যায় তা (আরবি) নয়। (আরবি) হলো ওটাই যা আসার পরে যাওয়ার নাম করে না বা সরে যায় না। আবার এ অর্থও করা হয়েছে যে, জাহান্নামের শাস্তি হচ্ছে ক্ষতিপূরণ যা নিয়ামতের অস্বীকারকারীদের নিকট হতে নেয়া হবে। তারা আল্লাহর দেয়া জিনিস তাঁর পথে ব্যয় করেনি। কাজেই আজ ওর ক্ষতিপূরণ এই হবে যে, তারা জাহান্নামকে পূর্ণ করে দেবে। ওটা হলো নিকৃষ্ট জায়গা, কুদৃশ্য, কষ্টদায়ক এবং বিপদ সংকুল স্থান।

মালিক ইবনে হারিস (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, যখন জাহান্নামবাসীকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে তখন সে কতকাল পর্যন্ত যে নীচে যেতেই থাকবে তা আল্লাহ পাকই জানেন। এরপর জাহান্নামের একটি দরজার উপর তাকে থামিয়ে দেয়া হবে এবং বলা হবেঃ এখন তুমি খুবই পিপাসার্ত হয়ে পড়েছে। সুতরাং এক পেয়ালা পানি পান করে নাও।' এ কথা বলে কালো সাপ ও বিষাক্ত বৃশ্চিকের বিষের এক পেয়ালা তাকে পান করানো হবে। ওটা পান করা মাত্রই তার দেহ হতে চামড়া খসে পড়বে, শিরাগুলো পৃথক হয়ে যাবে এবং অস্থিগুলো। পৃথক হয়ে পড়বে।

হযরত উবায়েদ ইবনে উমায়ের (রঃ) বলেন যে, জাহান্নামের মধ্যে কূপের মত গর্ত রয়েছে যার মধ্যে উটের মত বড় বড় সাপ রয়েছে এবং খচ্চরের মত বিরাট বিরাট বিচ্ছু রয়েছে। কোন জাহান্নামীকে যখন জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হয়। তখন ওগুলো বেরিয়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে এবং তার ওষ্ঠে, মাথায় এবং দেহের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে কামড় দেয়। ফলে তার সারা দেহে বিষ ছড়িয়ে পড়ে এবং পুরো মাথার চামড়া বিষের জ্বালায় দন্ধ হয়ে খসে পড়ে। তারপর ঐ সাপ ও বিচ্ছু চলে যায়।

হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেন, জাহান্নামী এক হাজার বছর পর্যন্ত ‘ইয়া হান্নানু’, ‘ইয়া মান্নানু' বলে চীকার করতে থাকবে। তখন আল্লাহ তাআলা হযরত জিবরাঈল (আঃ)-কে বলবেনঃ “যাও এবং দেখো, আমার এ বান্দা কি বলছে।” হযরত জিবরাঈল তখন আসবেন এবং দেখবেন যে, জাহান্নামবাসীরা সবাই খুবই খারাপ অবস্থায় রয়েছে এবং মাথা ঝাকিয়ে তারা কানাকাটি করছে। অতঃপর তিনি ফিরে গিয়ে মহামহিমান্বিত আল্লাহকে এই খবর দিবেন। তখন আল্লাহ তাআলা তাঁকে বলবেনঃ “তুমি আবার যাও এবং অমুক জায়গায় আমার এক বান্দা রয়েছে, তাকে নিয়ে এসো।” মহান আল্লাহর এই নির্দেশক্রমে হযরত জিবরাঈল (আঃ) যাবেন এবং লোকটিকে নিয়ে এসে আল্লাহর সামনে দাঁড় করিয়ে দিবেন। আল্লাহ তা'আলা তাকে জিজ্ঞেস করবেনঃ “হে আমার বান্দা! তুমি তোমার জায়গা কেমন পেয়েছো?” সে উত্তরে বলবেঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমার অবস্থানের জায়গাও নিকৃষ্ট এবং শয়নের জায়গাও মন্দ।” তখন আল্লাহ তা'আলা নির্দেশ দিবেনঃ “তাকে তার জায়গায় ফিরিয়ে নিয়ে যাও।” লোকটি তখন কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে আরয করবেঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমাকে যখন আমার ঐ স্থান থেকে বের করেছেন তখন আপনার সত্তা এরূপ নয় যে, আমাকে পুনরায় তাতে প্রবিষ্ট করবেন। আপনার করুণার আমি পূর্ণ আশা রাখি। সুতরাং হে আমার প্রতিপালক! আমার প্রতি দয়া করুন! আপনি যখন আমাকে জাহান্নাম হতে বের করেছেন এবং আমি খুশী হয়েছি তখন আর আমাকে আপনি জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন না এ বিশ্বাস আমার আছে।” তার এ কথায় পরম দয়ালু দাতা আল্লাহর তার প্রতি দয়া হবে এবং তিনি নির্দেশ দিবেনঃ “আচ্ছা, ঠিক আছে, আমার এ বান্দাকে ছেড়ে দাও।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)

এরপর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় মুমিন বান্দাদের আর একটি গুণের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, যখন তারা ব্যয় করে তখন তারা অপব্যয় করে না, কার্পণ্যও করে না, বরং তারা আছে এতদুভয়ের মাঝে মধ্যম পন্থায়। তারা এরূপ করে না যে, দান খয়রাত মোর্টেই করে না, সবই গচ্ছিত ও জমা রাখে। আবার এরূপও করে না যে, নিজের পরিবারবর্গকে বঞ্চিত রেখে সবই দান করে ফেলে। নিম্নের আয়াতে আল্লাহ এ হুকুমই দিয়েছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমার হাতটি তুমি তোমার ঘাড়ের সাথে বেঁধে রেখো না এবং সম্পূর্ণরূপে ছেড়েও দিয়ো না।” (১৭:২৯)

হযরত আবু দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “জীবন যাপনে মধ্যম পন্থা অবলম্বন মানুষের বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি (জীবন যাপনে) মধ্যম পন্থা অবলম্বন করে সে কখনো দরিদ্র হয় না।” (এ হাদীসটিও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

হযরত হুযাইফা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঐশ্বর্য, দারিদ্র্য ও ইবাদতে মধ্যম পন্থা অবলম্বন কতই না উত্তম জিনিস!” (এটা হাফিয আবু বকর আল বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেনঃ “আল্লাহর পথে যত ইচ্ছা খরচ কর, ওটা ইসরাফ বা অপব্যয় নয়।”

হযরত আইয়াস ইবনে মুআবিয়া (রাঃ) বলেনঃ “যেখানেই তুমি আল্লাহর হুকুমের আগে বেড়ে যাবে ওটাই ইসরাফ হবে।” আর বুযর্গদের উক্তি এই যে, আল্লাহর নাফরমানীতে খরচ করা হলো ইসরাফ।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।