সূরা আল-ফুরকান (আয়াত: 2)
হরকত ছাড়া:
الذي له ملك السماوات والأرض ولم يتخذ ولدا ولم يكن له شريك في الملك وخلق كل شيء فقدره تقديرا ﴿٢﴾
হরকত সহ:
ۣالَّذِیْ لَهٗ مُلْکُ السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضِ وَ لَمْ یَتَّخِذْ وَلَدًا وَّ لَمْ یَکُنْ لَّهٗ شَرِیْکٌ فِی الْمُلْکِ وَ خَلَقَ کُلَّ شَیْءٍ فَقَدَّرَهٗ تَقْدِیْرًا ﴿۲﴾
উচ্চারণ: আল্লাযীলাহুমুলকুছছামা-ওয়া-তি ওয়াল আরদি ওয়ালাম ইয়াত্তাখিয ওয়ালাদাওঁ ওয়ালাম ইয়াকুল্লাহূশারীকুন ফিল মুলকি ওয়া খালাকা কুল্লা শাইয়িন ফাকাদ্দারাহূতাকদীরা-।
আল বায়ান: যার অধিকারে রয়েছে আসমান ও যমীনের মালিকানা; আর তিনি কোন সন্তান গ্রহণ করেননি এবং সার্বভৌমত্বে তাঁর কোন শরীক নেই। তিনি সব কিছু সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তা নিপুণভাবে নিরূপণ করেছেন।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২. যিনি আসমানসমূহ ও যমীনের সার্বভৌমত্বের অধিকারী; তিনি কোন সন্তান গ্রহণ করেননি; সার্বভৌমত্ত্বে তার কোন শরীক নেই। তিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তা নির্ধারণ করেছেন যথাযথ অনুপাতে।
তাইসীরুল ক্বুরআন: যিনি যমীন ও আসমানের রাজত্বের মালিক, তিনি কোন সন্তান গ্রহণ করেননি, রাজত্বে তাঁর কোন অংশীদার নেই, তিনি সমস্ত কিছু সৃষ্টি করেছেন, আর সেগুলোকে যথাযথ করেছেন পরিমিত অনুপাতে।
আহসানুল বায়ান: (২) আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্ব তাঁরই।[1] তিনি কোন সন্তান গ্রহণ করেননি;[2] সার্বভৌম ক্ষমতায় তাঁর কোন অংশী নেই।[3] তিনি সমস্ত কিছু সৃষ্টি করেছেন এবং প্রত্যেককে যথোচিত আকৃতি দান করেছেন।[4]
মুজিবুর রহমান: যিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্বের অধিকারী; তিনি কোন সন্তান গ্রহণ করেননি; সার্বভৌমত্বে তাঁর কোন অংশীদার নেই। তিনি সমস্ত কিছু সৃষ্টি করেছেন এবং প্রত্যেককে পরিমিত করেছেন যথাযথ অনুপাতে।
ফযলুর রহমান: আসমান ও জমিনের রাজত্ব তাঁরই। তিনি কোন সন্তান গ্রহণ করেননি। রাজেত্ব তাঁর কোন অংশীদার নেই। তিনি প্রতিটি বস্তু সৃষ্টি করে তা পরিমাপমত সুনির্ধারিত করেছেন।
মুহিউদ্দিন খান: তিনি হলেন যাঁর রয়েছে নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের রাজত্ব। তিনি কোন সন্তান গ্রহণ করেননি। রাজত্বে তাঁর কোন অংশীদার নেই। তিনি প্রত্যেক বস্তু সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তাকে শোধিত করেছেন পরিমিতভাবে।
জহুরুল হক: তিনিই -- মহাকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্ব তাঁরই, আর তিনি কোনো সন্তান গ্রহণ করেন নি, আর সেই সাম্রাজ্যে তাঁর কোনো শরিকও নেই, আর তিনিই সব-কিছু সৃষ্টি করেছেন, তারপর তাকে বিশেষ পরিমাপে পরিমিত রূপ দিয়েছেন।
Sahih International: He to whom belongs the dominion of the heavens and the earth and who has not taken a son and has not had a partner in dominion and has created each thing and determined it with [precise] determination.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ২. যিনি আসমানসমূহ ও যমীনের সার্বভৌমত্বের অধিকারী; তিনি কোন সন্তান গ্রহণ করেননি; সার্বভৌমত্ত্বে তার কোন শরীক নেই। তিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তা নির্ধারণ করেছেন যথাযথ অনুপাতে।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (২) আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্ব তাঁরই।[1] তিনি কোন সন্তান গ্রহণ করেননি;[2] সার্বভৌম ক্ষমতায় তাঁর কোন অংশী নেই।[3] তিনি সমস্ত কিছু সৃষ্টি করেছেন এবং প্রত্যেককে যথোচিত আকৃতি দান করেছেন।[4]
তাফসীর:
[1] এটি তাঁর প্রথম গুণ। অর্থাৎ সৃষ্টি জগতে একমাত্র আধিপত্য তাঁর, অন্য কারো নয়।
[2] এখানে খ্রিষ্টান ও ইয়াহুদীদের এবং আরবের সেই লোকদের বিশ্বাস খন্ডন করা হয়েছে, যারা ফিরিশতাদেরকে আল্লাহর কন্যা মনে করত।
[3] এখানে মূর্তিপূজক মুশরিক ও (ভাল-মন্দ, আলো-অন্ধকারের স্রষ্টাস্বরূপ) দুই আল্লাহতে বিশ্বাসীদের বিশ্বাস খন্ডন করা হয়েছে।
[4] প্রত্যেক বস্তুর স্রষ্টা একমাত্র তিনিই এবং তিনি নিজ জ্ঞান ও ইচ্ছানুসারে নিজের সৃষ্টিকে প্রত্যেক সেই জিনিস দান করেছেন যা তার অবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অথবা প্রত্যেকের জীবিকা ও মৃত্যু আগে থেকেই নির্ধারিত করে রেখেছেন।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: নামকরণ:
(الْفُرْقَانَ) ফুরকান শব্দের অর্থ সত্য মিথ্যার পার্থক্যকারী। ফুরকান শব্দটি অত্র সূরার প্রথম আয়াতে উল্লেখ রয়েছে বিধায় এ সূরাটি উক্ত নামে নামকরণ করা হয়েছে। অধিকাংশ মুফাসসিরদের মতে সম্পূর্ণ সূরাটি মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে। ইবনু আব্বাস (رضي الله عنه) ও কাতাদাহ (رضي الله عنه) বলেন: ৬৮-৭০ এ তিনটি আয়াত মদীনায় অবতীর্ণ হয়েছে (কুরতুবী)। সূরায় কুরআনের মাহাত্ম্য, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর রিসালাতের সত্যতা এবং শত্র“দের পক্ষ থেকে উত্থাপিত আপত্তিসমূহের জবাব দেয়া হয়েছে।
১-৩ নং আয়াতের তাফসীর:
تَبٰرَكَ শব্দটি بركة থেকে উদ্ভূত। বরকতের অর্থন প্রভূত কল্যাণ। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: প্রত্যেক কল্যাণ ও বরকত আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে আসে, তাই তাঁর কাছেই বরকত কামনা করা উচিত। الْفُرْقَانَ শব্দের অর্থ সত্য-মিথ্যা, হালাল-হারাম, হিদায়াত-গুমরাহী, সৌভাগ্যশীল-দুর্ভাগার পার্থক্য নিরূপণকারী। এর দ্বারা “আল-কুরআন”-কে বুঝানো হয়েছে। যেহেতু কুরআন হক ও বাতিল, তাওহীদ ও শির্ক, ন্যায় ও অন্যায়ের মধ্যে পার্থক্য স্থাপন করেছে তাই আল-কুরআনকে ফুরকান নামে উল্লেখ করা হয়েছে।
(عَلٰی عَبْدِھ۪) ‘তাঁর বান্দার প্রতি’ অর্থাৎ এ কুরআন মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর অবতীর্ণ করা হয়েছে যাতে তিনি বিশ্ববাসীকে সতর্ক করতে পারেন। নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সারা পৃথিবীবাসীর জন্য প্রেরিত রাসূল। তাঁকে এ কুরআন দিয়ে প্রেরণ করা হয়েছে যাতে তিনি সৎকর্মশীলদের সুসংবাদ প্রদান করেন আর অসৎকর্মশীলদেরকে ভীতি প্রদর্শন করেন। তাঁর পর আর কোন নাবী ও রাসূল আগমন করবেন না। যেমন আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
(قُلْ يٰٓأَيُّهَا النَّاسُ إِنِّيْ رَسُوْلُ اللّٰهِ إِلَيْكُمْ جَمِيْعَا)
“বল ‘হে মানুষ! আমি তোমাদের সকলের জন্য আল্লাহ্র প্রেরিত রাসূল” (সূরা আ‘রাফ ৭:১৫৮)
হাদীসে এসেছে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: আমাকে পাঁচটি জিনিস দেয়া হয়েছে যা আমার পূর্বে আর কাউকে দেয়া হয়নি। অতঃপর তার মধ্যে থেকে একটি উল্লেখ করেন যে, প্রত্যেক নাবী-রাসূলকে তার নিজ সম্প্রদায়ের নিকট পাঠানো হয়েছে। আর আমাকে পাঠানো হয়েছে সকল মানুষের জন্য। (সহীহ বুখারী হা: ৩৩৫, সহীহ মুসলিম হা: ৫২১)
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা তাঁর চারটি ক্ষমতা বা বৈশিষ্ট্যের কথা বর্ণনা করেছেন। সেগুলো হল:
প্রথম বৈশিষ্ট্য:
তিনি আকাশ ও জমিনের একমাত্র মালিক। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(أَلَمْ تَعْلَمْ أَنَّ اللّٰهَ لَه۫ مُلْكُ السَّمٰوٰتِ وَالْأَرْضِ)
“তুমি কি জান না যে, আসমান ও জমিনের আধিপত্য আল্লাহরই।” (সূরা মায়িদাহ ৫:৪০) আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
( قُلِ اللّٰهُمَّ مَالِكَ الْمُلْكِ تُؤْتِي الْمُلْكَ)
“বলুন, হে আল্লাহ তা‘আলা! তুমিই রাজত্বের মালিক।” (সূরা আল ইমরান ৩:২৬)
দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য:
যারা আল্লাহ তা‘আলার অংশী সাব্যস্ত করেন যেমন ইয়াহূদীরা বলে, উযাইর আল্লাহ তা‘আলার ছেলে; খ্রিস্টানরা বলে, ঈসা আল্লাহ তা‘আলার ছেলে; মারইয়াম আল্লাহ তা‘আলার স্ত্রী; তাছাড়া আরবের মুশরিকরা ফেরেশতাদেরকে আল্লাহ তা‘আলার কন্যা মনে করে। তাদের বিশ্বাসকে খণ্ডন করে আল্লাহ তা‘আলা বলেন: তিনি কোন সন্তান গ্রহণ করেননি; সার্বভৌমত্বে তাঁর কোন শরীক নেই।
অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(قُلْ ھُوَ اللہُ اَحَدٌﭐﺆ اَللہُ الصَّمَدُﭑﺆ لَمْ یَلِدْﺃ وَلَمْ یُوْلَدْﭒﺫ وَلَمْ یَکُنْ لَّھ۫ کُفُوًا اَحَدٌﭓﺟ)
“বল: তিনিই আল্লাহ, একক। তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাঁকেও জন্ম দেয়া হয়নি। আর তাঁর সমতুল্য কেউ নেই।” (সূরা ইখলাস ১১২:১-৪)
অন্যত্রে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَّأَنَّه۫ تَعَالٰي جَدُّ رَبِّنَا مَا اتَّخَذَ صَاحِبَةً وَّلَا وَلَدًا)
“এবং নিশ্চয়ই আমাদের প্রতিপালকের মর্যাদা সমুচ্চ; তিনি কোন স্ত্রী গ্রহণ করেননি এবং কোন সন্তানও।” (সূরা জিন ৭২:৩)
তৃতীয় বৈশিষ্ট্য:
তিনি প্রত্যেকের তাকদীর বা ভাগ্য নির্ধারণ করেছেন, যার জন্য যা উপযোগী ও যা প্রয়োজন তিনি তা-ই দিয়ে দিয়েছেন। তাতে কোন প্রকার ঘাটতি রাখেননি।
আল্লাহর বাণী:
(الَّذِيْ خَلَقَ فَسَوّٰي وَالَّذِيْ قَدَّرَ فَهَدٰي)
“যিনি সৃষ্টি করেছেন; অতঃপর পরিপূর্ণভাবে সুবিন্যস্ত করেছেন, এবং যিনি পরিমাণ নির্ধারণ করেছেন, তারপর হিদায়াত দিয়েছেন।” (সূরা আলা ৮৭:২-৩)
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
(إِنَّا كُلَّ شَيْءٍ خَلَقْنٰهُ بِقَدَرٍ)
“নিশ্চয়ই আমি সকল কিছু সৃষ্টি করেছি নির্ধারিত পরিমাপে।” (সূরা কামার ৪:৫৯)
চতুর্থ বৈশিষ্ট্য:
প্রত্যেক বস্তুর স্রষ্টা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা, অন্য কেউ নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(ذٰلِکُمُ اللہُ رَبُّکُمْ خَالِقُ کُلِّ شَیْءٍﺭ لَآ اِلٰھَ اِلَّا ھُوَﺇ فَاَنّٰی تُؤْفَکُوْنَﮍ کَذٰلِکَ یُؤْفَکُ الَّذِیْنَ کَانُوْا بِاٰیٰتِ اللہِ یَجْحَدُوْنَﮎ)
“তিনি আল্লাহ, তোমাদের প্রতিপালক, সব কিছুর স্রষ্টা; তিনি ব্যতীত (সত্য) কোন মা‘বূদ নেই, সুতরাং তোমরা কোথায় পথভ্রষ্ট হয়ে ঘুরছ? এভাবেই পথভ্রষ্ট হয়ে তারা ঘুরে, যারা আল্লাহর নিদর্শনাবলীকে অস্বীকার করে।” (সূরা মু’মিন ৪০:৬২-৬৩)
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা নিজের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করার পর বাতিল ও ভ্রান্ত মা‘বূদের কিছু দুর্বলতার দিক তুলে ধরেছেন। আর তা হল:
১. তারা কোন কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না। যেমন আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
(إِنَّ الَّذِيْنَ تَدْعُوْنَ مِنْ دُوْنِ اللّٰهِ لَنْ يَّخْلُقُوْا ذُبَابًا وَّلَوِ اجْتَمَعُوْا لَه۫)
“তোমরা আল্লাহ তা‘আলার পরিবর্তে যাদেরকে ডাক তারা তো কখনো একটি মাছিও সৃষ্টি করতে পারবে না, এ উদ্দেশ্যে তারা সকলে একত্রিত হলেও।” (সূরা হজ্জ ২২:৭৩)
২. তাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে অর্থাৎ তারা অপরের সৃষ্ট বস্তু। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَالَّذِيْنَ يَدْعُوْنَ مِنْ دُوْنِ اللّٰهِ لَا يَخْلُقُوْنَ شَيْئًا وَّهُمْ يُخْلَقُوْنَ)
“তারা আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত অপর যাদেরকে আহ্বান করে তারা কিছুই সৃষ্টি করে না, তাদেরকেই সৃষ্টি করা হয়।’’ (সূরা নাহল ১৬:২০)
৩. তারা নিজেদের কোন উপকার ও ক্ষতি করতে পারে না। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(قُلْ مَنْ رَّبُّ السَّمٰوٰتِ وَالْأَرْضِ ط قُلِ اللّٰهُ ط قُلْ أَفَاتَّخَذْتُمْ مِّنْ دُوْنِه۪ٓ أَوْلِيَا۬ءَ لَا يَمْلِكُوْنَ لِأَنْفُسِهِمْ نَفْعًا وَّلَا ضَرًّا)
“বল: ‘কে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর প্রতিপালক?’ বল: ‘আল্লাহ তা‘আলা।’ বল: ‘তবে কি তোমরা অভিভাবকরূপে গ্রহণ করেছ আল্লাহ তা‘আলার পরিবর্তে অপরকে যারা নিজেদের লাভ বা ক্ষতি সাধনে সক্ষম নয়?’ (সূরা রাদ ১৩:১৬)
৪. তারা কাউকে মৃত্যু দান করতে পারে না আর না পারে জীবিত করতে এবং তারা মৃত্যুর পর পুনরুত্থান করতেও সক্ষম নয়। এ সকল বিষয়ে একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই ক্ষমতাবান, অন্য কেউ নয়। যেমন আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
(كَيْفَ تَكْفُرُوْنَ بِاللّٰهِ وَكُنْتُمْ أَمْوَاتًا فَأَحْيَاكُمْ ج ثُمَّ يُمِيْتُكُمْ ثُمَّ يُحْيِيْكُمْ ثُمَّ إِلَيْهِ تُرْجَعُوْنَ)
“কিভাবে তোমরা আল্লাহ তা‘আলাকে অস্বীকার করছ? অথচ তোমরা নির্জীব ছিলে, পরে তিনিই তোমাদেরকে জীবন দান করেছেন, এরপর তিনি তোমাদের মৃত্যু ঘটাবেন, পরে আবার জীবিত করবেন, অবশেষে তোমাদেরকে তাঁরই দিকে ফিরে যেতে হবে।” (সূরা বাকারাহ ২:২৮)
অতএব ইবাদতের একমাত্র যোগ্য আল্লাহ তা‘আলা অন্য কেউ নয়। কারণ তাদের হাতে কোনই ক্ষমতা নেই। আর যাদের কোন ক্ষমতা নেই তারা ইবাদতের যোগ্য বলে বিবেচিত হতে পারে না। সুতরাং আমাদের উচিত যারা কোন কিছু করার ক্ষমতা রাখে না তাদেরকে বর্জন করে সর্বশক্তিমান আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করা।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. কুরআন আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ হতে নাযিলকৃত কিতাব।
২. মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য রাসূল হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন।
৩. কুরআন মানুষের জন্য সতর্কবাণীস্বরূপ।
৪. সমস্ত কিছুর মালিক একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা, অন্য কেউ নয়।
৫. আল্লাহ তা‘আলা কোন সন্তান-সন্ততি গ্রহণ করেন না। তাঁর কোন শরীক নেই।
৬. পুনরুত্থানের মালিকও একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা, অন্য কেউ নয়।
৭. আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত অন্যান্য বাতিল মা‘বূদ কোন ক্ষমতা রাখে না, এমনকি নিজেদের কোন উপকার ও ক্ষতি করতেও পারে না।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১-২ নং আয়াতের তাফসীর
আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রহমত বা করুণার বর্ণনা দিচ্ছেন যাতে তার মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব জনগণের উপর প্রকাশিত হয়। তাঁর এই করুণা এই যে, তিনি তার পবিত্র কালাম কুরআন কারীমকে স্বীয় বান্দা হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা (সঃ)-এর উপর অবতীর্ণ করেছেন।
সূরায়ে কাহাফের শুরুতেও আল্লাহ তা'আলা স্বীয় প্রশংসা এই বিশেষণ দ্বারাই বর্ণনা করেছেন। এখানে তিনি নিজের সত্তাকে কল্যাণময় বলে বর্ণনা করেছেন।
এখানে মহান আল্লাহ (আরবিক্রিয়া ব্যবহার করেছেন। এর দ্বারা বার বার বেশী বেশী করে অবতীর্ণ হওয়া প্রমাণিত হয়। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেছেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ “যে কিতাব তিনি অবতীর্ণ করেছেন তাঁর রাসূল (সঃ)-এর উপর এবং যে কিতাব অবতীর্ণ করা হয়েছে ইতিপূর্বে।” (৪: ১৩৬) সুতরাং পূর্ববর্তী কিতাবগুলোকে (আরবি) এবং এই শেষ কিতাবকে (কুরআনকে) (আরবি) দ্বারা বর্ণনা করেছেন। এটা এ কারণেই যে, পূর্ববর্তী কিতাবগুলো এক সাথেই অবতীর্ণ হয়েছিল। আর কুরআন কারীম প্রয়োজন অনুপাতে অল্প অল্প করে অবতীর্ণ হতে থাকে। কখনো কয়েকটি আয়াত, কখনো কয়েকটি সূরা এবং কখনো কিছু আহকাম অবতীর্ণ হতে থাকে। এতে বড় এক নিপুণতা এই ছিল যে, লোকের উপর ওর প্রতি আমল কঠিন ও কষ্টকর না হয়। তারা যেন ওগুলো ভালভাবে মনে রাখতে পারে। আর মেনে নেয়ার জন্যে যেন তাদের অন্তর খুলে যায়। যেমন আল্লাহ তা'আলা এই সূরার মধ্যেই বলেনঃ “কাফিররা বলে- সমগ্র কুরআন তার নিকট একবারে অবতীর্ণ হলো না কেন? এভাবেই অবতীর্ণ করেছি তোমার হৃদয়কে ওটা দ্বারা মযবুত করবার জন্যে এবং ক্রমে ক্রমে স্পষ্টভাবে আবৃত্তি। করেছি। তারা তোমার নিকট এমন কোন সমস্যা উপস্থিত করেনি যার সঠিক সমাধান ও সুন্দর ব্যাখ্যা আমি তোমাকে দান করিনি।” এখানে এই আয়াতে এর নাম ফুরকান রাখার কারণ এই যে, এটা সত্য ও মিথ্যা এবং হিদায়াত ও গুমরাহীর মধ্যে পার্থক্যকারী। এর দ্বারা ভাল ও মন্দ এবং হালাল ও হারামের মধ্যে পার্থক্য নিরূপিত হয়।
কুরআন কারীমের এই পবিত্র বিশেষণ বর্ণনা করার পর যার উপর কুরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে তাঁর পবিত্র গুণাবলীর বর্ণনা দেয়া হয়েছে যে, তিনি বিশিষ্টভাবে তাঁরই ইবাদতে লেগে থাকেন। তিনি আল্লাহর বিশিষ্ট বান্দা। এটাই হলো সবচেয়ে বড় গুণ। এজন্যেই বড় বড় নিয়ামতের বর্ণনার সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এই বিশেষণেরই বর্ণনা দেয়া হয়েছে। যেমন মিরাজ সম্পৰ্কীয় ঘটনায় তিনি বলেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ “পবিত্র ও মহিমময় তিনি যিনি তাঁর বান্দাকে রজনীযোগে ভ্রমণ করিয়েছিলেন।” (১৭: ১) অন্য জায়গায় দু'আর স্থলে বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “এবং যখন আল্লাহর বান্দা (হযরত মুহাম্মাদ সঃ) ইবাদতের জন্যে দাড়িয়ে যায়।” (৭২: ১৯) এই বিশেষণই কুরআন কারীমের অবতরণ এবং নবী (সঃ)-এর নিকট বুযর্গ ফেরেশতার আগমনের মর্যাদার বর্ণনার সময় বর্ণিত হয়েছে।
এরপর ঘোষিত হচ্ছেঃ এই পবিত্র গ্রন্থ মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপর অবতীর্ণ করেছেন যাতে তিনি বিশ্বজগতের জন্যে সতর্ককারী হতে পারেন। এটা এমন একটি কিতাব যা সরাসরি হিকমত ও হিদায়াতে পূর্ণ। এই কিতাব বিশ্লেষিত মর্যাদা সম্পন্ন, স্পষ্টভাবে বর্ণিত ও সুদৃঢ়। বাতিল এর আশে পাশেও আসতে পারে না। এটা বিজ্ঞানময় ও প্রশংসিত আল্লাহর নিকট হতে অবতারিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সারা দুনিয়ায় এর প্রচার চালিয়ে যান। তিনি প্রত্যেক লাল ও সাদাকে এবং দূরের ও কাছের লোকেদেরকে আল্লাহর শাস্তি হতে ভয় প্রদর্শন করেন। যারাই আকাশের নীচে ও পৃথিবীর উপরে রয়েছে তাদের সবারই তিনি রাসূল। যেমন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি সমস্ত লাল ও সাদা মানুষের নিকট রাসূলরূপে প্রেরিত হয়েছি।” তিনি আরো বলেনঃ “আমাকে এমন পাঁচটি জিনিস দেয়া হয়েছে যেগুলো আমার পূর্বে কোন নবীকে দেয়া হয়নি। ওগুলোর মধ্যে একটি এই যে, আমার পূর্ববর্তী এক একজন নবী নিজ নিজ কওমের নিকট প্রেরিত হতেন। কিন্তু আমি সারা দুনিয়ার জন্যে প্রেরিত হয়েছি। স্বয়ং কুরআন কারীমে ঘোষিত হয়েছেঃ(আরবি)
অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাও- হে লোক সকল! নিশ্চয়ই আমি তোমাদের সবারই নিকট আল্লাহর রাসূল রূপে প্রেরিত হয়েছি।” (৭: ১৫৮) অর্থাৎ আমাকে রাসূলরূপে প্রেরণকারী এবং আমার উপর পবিত্র কিতাব অবতীর্ণকারী হলেন ঐ আল্লাহ যিনি আসমান ও যমীনের একক মালিক। তিনি যখন কোন কাজের ইচ্ছা করেন তখন শুধু বলেন- হও, আর তখনই তা হয়ে যায়। তিনিই মারেন, তিনিই জীবিত রাখেন। তাঁর কোন সন্তান নেই, কোন অংশীদার নেই। সবকিছুই তাঁরই সৃষ্ট। সবাই তাঁরই অধীনে লালিত পালিত। সবারই সৃষ্টিকর্তা, অধিকর্তা, রূযীদাতা, মা'বুদ এবং প্রতিপালক তিনিই। তিনিই প্রত্যেককে পরিমিত করেছেন যথাযথ অনুপাতে।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।