সূরা আন-নূর (আয়াত: 39)
হরকত ছাড়া:
والذين كفروا أعمالهم كسراب بقيعة يحسبه الظمآن ماء حتى إذا جاءه لم يجده شيئا ووجد الله عنده فوفاه حسابه والله سريع الحساب ﴿٣٩﴾
হরকত সহ:
وَ الَّذِیْنَ کَفَرُوْۤا اَعْمَالُهُمْ کَسَرَابٍۭ بِقِیْعَۃٍ یَّحْسَبُهُ الظَّمْاٰنُ مَآءً ؕ حَتّٰۤی اِذَا جَآءَهٗ لَمْ یَجِدْهُ شَیْئًا وَّ وَجَدَ اللّٰهَ عِنْدَهٗ فَوَفّٰىهُ حِسَابَهٗ ؕ وَ اللّٰهُ سَرِیْعُ الْحِسَابِ ﴿ۙ۳۹﴾
উচ্চারণ: ওয়াল্লাযীনা কাফারূআ‘মা-লুহুম কাছারা-বিম বিকী‘আতিইঁ ইয়াহছাবুহুজ্জামআ-নু মাআন হাত্তাইযা-জাআহূলাম ইয়াজিদহু শাইআওঁ ওয়া ওয়াজাদাল্লা-হা ‘ইনদাহূ ফাওয়াফফা-হু হিছা-বাহূ ওয়াল্লা-হু ছারী‘উল হিছা-ব।
আল বায়ান: আর যারা কুফরী করে, তাদের আমলসমূহ মরুভূমির মরিচিকার মত, পিপাসিত ব্যক্তি যাকে পানি মনে করে। অবশেষে যখন সে তার কাছে আসবে, তখন সে দেখবে সেটা কিছুই নয়। আর সে সেখানে আল্লাহকে দেখতে পাবে। অতঃপর তিনি তাকে তার হিসাব পরিপূর্ণ করে দেবেন। আর আল্লাহ অতি দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩৯. আর যারা কুফরী করে(১) তাদের আমলসমূহ মরুভূমির মরীচিকার মত, পিপাসা কাতর ব্যক্তি যাকে পানি মনে করে থাকে, কিন্তু যখন সে সেটার কাছে আসে তখন দেখে সেটা কিছুই নয় এবং সে পাবে সেখানে(২) আল্লাহ্কে, অতঃপর তিনি তাকে তার হিসাব পূর্ণমাত্রায় দেবেন। আর আল্লাহ্ দ্রুত হিসেব গ্রহণকারী।
তাইসীরুল ক্বুরআন: আর যারা কুফুরী করে তাদের কাজকর্ম হল বালুকাময় মরুভূমির মরীচিকার মত। পিপাসার্ত ব্যক্তি সেটাকে পানি মনে করে অবশেষে সে যখন তার নিকটে আসে, সে দেখে ওটা কিছুই না, সে সেখানে পায় আল্লাহকে, অতঃপর আল্লাহ তার হিসাব চুকিয়ে দেন। আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণ করে থাকেন।
আহসানুল বায়ান: (৩৯) যারা সত্য প্রত্যাখ্যান করে, তাদের কর্ম মরুভূমির মরীচিকার ন্যায়; পিপাসার্ত যাকে পানি মনে করে থাকে। কিন্তু সে ওর নিকট উপস্থিত হলে দেখে তা কিছুই নয় এবং সেখানে সে আল্লাহকে পায়। অতঃপর তিনি তার কর্মফল পূর্ণমাত্রায় দান করেন।[1] আর আল্লাহ হিসাব গ্রহণে তৎপর ।
মুজিবুর রহমান: যারা কুফরী করে, তাদের আমলসমূহ মরুভূমির মরীচিকা সদৃশ। পিপাসার্ত যাকে পানি মনে করে থাকে, কিন্তু সে ওর নিকট উপস্থিত হলে দেখবে ওটা কিছু নয়, কিন্তু সে পাবে সেখানে আল্লাহকে। অতঃপর তিনি তার কর্মফল পূর্ণ মাত্রায় দিবেন; আল্লাহ হিসাব গ্রহণে তৎপর।
ফযলুর রহমান: আর যারা কুফরি করে তাদের কর্ম মরুভূমির মরীচিকার মত, যাকে তৃষ্ণার্ত ব্যক্তি পানি মনে করে; কিন্তু সে যদি তার কাছে যায় তাহলে দেখবে কিছুই নেই। সে নিজের কাছে আল্লাহকে পাবে। তিনি তাকে তার হিসাব পুরোপুরি মিটিয়ে দেবেন। আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী।
মুহিউদ্দিন খান: যারা কাফের, তাদের কর্ম মরুভুমির মরীচিকা সদৃশ, যাকে পিপাসার্ত ব্যক্তি পানি মনে করে। এমনকি, সে যখন তার কাছে যায়, তখন কিছুই পায় না এবং পায় সেখানে আল্লাহকে, অতঃপর আল্লাহ তার হিসাব চুকিয়ে দেন। আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী।
জহুরুল হক: পক্ষান্তরে যারা অবিশ্বাস পোষণ করে তাদের ক্রিয়াকর্ম মরুভূমির মরীচিকার ন্যায়, পিপাসার্ত তাকে পানি বলে মনে করে যে পর্যন্ত না সে তার কাছে আসে সে ঐটির কিছুই দেখতে পায় না, বরং সে আল্লাহকে তার সামনে দেখতে পাবে, সুতরাং তিনি তার হিসাব চুকিয়ে দেবেন। আর আল্লাহ্ হিসাব-নিকাশে তৎপর।
Sahih International: But those who disbelieved - their deeds are like a mirage in a lowland which a thirsty one thinks is water until, when he comes to it, he finds it is nothing but finds Allah before Him, and He will pay him in full his due; and Allah is swift in account.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৩৯. আর যারা কুফরী করে(১) তাদের আমলসমূহ মরুভূমির মরীচিকার মত, পিপাসা কাতর ব্যক্তি যাকে পানি মনে করে থাকে, কিন্তু যখন সে সেটার কাছে আসে তখন দেখে সেটা কিছুই নয় এবং সে পাবে সেখানে(২) আল্লাহ্–কে, অতঃপর তিনি তাকে তার হিসাব পূর্ণমাত্রায় দেবেন। আর আল্লাহ্ দ্রুত হিসেব গ্রহণকারী।
তাফসীর:
(১) অর্থাৎ আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর নবীগণ এবং সে সময় আল্লাহর নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে সত্যের শিক্ষা দিচ্ছিলেন সরল মনে তা মেনে নিতে অস্বীকার করে। [দেখুন: মুয়াস্সার]
(২) কোন কোন মুফাসসির বলেন, এ আয়াতে ‘সেখানে’ বলে দুনিয়াই উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে। কারণ, আল্লাহর পক্ষ থেকে কাফেরদের কর্মকাণ্ডের যাবতীয় প্রতিফল দুনিয়াতেই দিয়ে দেয়া হবে। যেমনিভাবে অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, “যে কেউ পার্থিব জীবন ও তার শোভা কামনা করে, দুনিয়াতে আমি ওদের কাজের পূর্ণ ফল দান করি এবং সেখানে তাদেরকে কম দেয়া হবে না। ওদের জন্য আখিরাতে আগুন ছাড়া অন্য কিছুই নেই এবং ওরা যা করে আখিরাতে তা নিস্ফল হবে এবং ওরা যা করে থাকে তা নিরর্থক।” [সূরা হুদ: ১৫–১৬]
অন্যত্র এসেছে, “যে কেউ আখিরাতের ফসল কামনা করে তার জন্য আমি তার ফসল বাড়িয়ে দেই এবং যে কেউ দুনিয়ার ফসল কামনা করে আমি তাকে তা থেকে কিছু দেই, আখিরাতে তার জন্য কিছুই থাকবে না।” [সূরা আশ-শূরা; ২০] তবে অধিকাংশ আলেমদের নিকট এ আয়াতে “সেখানে” বলে আখেরাতে মহান আল্লাহর দরবারে উপস্থিতির কথা বুঝানো হয়েছে। সেখানে তারা দুনিয়াতে যা করেছে সেটার প্রতিফল যদি প্রাপ্য হতো তবে তা দেয়া হতো। কিন্তু যেহেতু তাদের কৃত যাবতীয় কর্ম বিনষ্ট হয়েছে সেহেতু তারা সেখানে কিছুই পাবে না। যেমন, অন্য আয়াতে বলা হয়েছেঃ “আর আমরা তাদের কৃতকর্মের প্রতি লক্ষ্য করব, তারপর সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করব।” [সূরা আল ফুরকান: ২৩]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৩৯) যারা সত্য প্রত্যাখ্যান করে, তাদের কর্ম মরুভূমির মরীচিকার ন্যায়; পিপাসার্ত যাকে পানি মনে করে থাকে। কিন্তু সে ওর নিকট উপস্থিত হলে দেখে তা কিছুই নয় এবং সেখানে সে আল্লাহকে পায়। অতঃপর তিনি তার কর্মফল পূর্ণমাত্রায় দান করেন।[1] আর আল্লাহ হিসাব গ্রহণে তৎপর ।
তাফসীর:
[1] কর্ম বা আমল বলতে এমন আমলকে বুঝানো হয়েছে, যা কাফের মুশরিকরা নেকী ভেবে করে থাকে। যেমন দান-খয়রাত, জ্ঞাতি-বন্ধন বজায়, আল্লাহর ঘর নির্মাণ, হাজীদের খিদমত ইত্যাদি। سراب (মরীচিকা), চকচকে বালিরাশির উপর সূর্যকিরণ পড়লে দূর হতে যা দেখে পানির মত মনে হয়। سراب এর মূল অর্থঃ চলা। যেহেতু ঐ বালিরাশিকে দূর হতে পানি মনে হয়; যদিও তা বালি ছাড়া কিছুই নয়। অনুরূপ কাফেরদের আমল ঈমান না থাকার কারণে আল্লাহর নিকট মূল্যহীন হবে। তারা কোন নেক কাজের প্রতিদান পাবে না। হ্যাঁ যখন তারা আল্লাহর নিকট উপস্থিত হবে, তখন তিনি তাদের প্রতিটি আমলের হিসাব পূর্ণভাবে চুকিয়ে দেবেন।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৩৯-৪০ নং আয়াতের তাফসীর:
পূর্বের আয়াতে মু’মিনদের উত্তম আমলসমূহ বহুগুণে বৃদ্ধি করে দেনন এ সম্পর্কে আলোচনা করার পর এখানে কাফিরদের আমলের অবস্থার বর্ণনা নিয়ে এসেছেন। আল্লাহ তা‘আলা কাফিরদের আমলের দুটি উপমা পেশ করেছেন। প্রথমটি হচ্ছে ঐসকল কাফিরদের দৃষ্টান্ত যারা নিজেরা কুফরী করে এবং অন্যদেরকেও কুফরীর দিকে আহ্বান করে আর মনে করে যে, তারা হিদায়াতের ওপরই প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। কিন্তু এটা শুধু তাদের কল্পনা মাত্র। তাদের দৃষ্টান্ত হল এরূপ যেমন কোন পিপাসিত লোক মরুভূমির মরীচিকাকে পানি মনে করে সেখানে দৌঁড়ে যায় কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখে যে, কোন কিছুই নেই। তদ্রƒপ এ কাফিররাও মনে করে যে, তারা খুব ভাল কাজই করছে। কিন্তু তারা কিয়ামাতের দিন দেখতে পাবে যে, তাদের কোন নেকীই নেই। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(مَثَلُ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا بِرَبِّهِمْ أَعْمَالُهُمْ كَرَمَادِ نِاشْتَدَّتْ بِهِ الرِّيْحُ فِيْ يَوْمٍ عَاصِفٍ ط لَا يَقْدِرُوْنَ مِمَّا كَسَبُوْا عَلٰي شَيْءٍ ط ذٰلِكَ هُوَ الضَّلٰلُ الْبَعِيْدُ)
“যারা তাদের প্রতিপালককে অস্বীকার করে তাদের উপমা তাদের কর্মসমূহ ছাইয়ের মত যা ঝড়ের দিনের বাতাস প্রচণ্ড বেগে উড়িয়ে নিয়ে যায়। তারা যা উপার্জন করে তার কিছুই তাদের কাজে লাগাতে পারে না। এটা তো চরম গোমরাহী।” (সূরা ইবরাহীম ১৪:১৮)
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَقَدِمْنَآ إِلٰي مَا عَمِلُوْا مِنْ عَمَلٍ فَجَعَلْنٰهُ هَبَا۬ءً مَّنْثُوْرًا)
“আমি তাদের কৃতকর্মের দিকে অগ্রসর হব, অতঃপর সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করব।” (সূরা ফুরকান ২৫:২৩)
আর দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত হচ্ছে ঐ সকল কাফিরদের যারা অজ্ঞতার কারণে কোন প্রকার জ্ঞান ব্যতিরেকেই আহ্বানকারী কাফিরদের ডাকে সাড়া দেয়। তাদের দৃষ্টান্ত হল গভীর সমুদ্রতলের অন্ধকার, যাকে আচ্ছন্ন করে তরঙ্গের ওপর তরঙ্গ, যার ঊর্ধ্বে মেঘপুঞ্জ, অন্ধকারপুঞ্জ স্তরের ওপর স্তর, এমনকি সে হাত বের করলে তা আদৌ দেখতে পাবে না। এ অবস্থা অনুসরণকারী কাফিরদের হবে যারা নেতৃস্থানীয় কাফিরদেরকে অন্ধভাবে অনুসরণ করে থাকে। যাদের তারা অনুসরণ করে থাকে তাদেরকেও তারা সঠিকভাবে চিনে না। তারা ন্যায়ের ওপর আছে, না-কি অন্যায়ের ওপর আছে সেটাও তারা জানে না। তারা যাদের আনুগত্য করে চলেছে, তারা তাদেরকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে তারা এ খবর রাখে না।
এরপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন, তিনি যাকে হিদায়াতের জ্যোতি দান করেন না তার কোনই জ্যোতি নেই। অর্থাৎ সে সুপথপ্রাপ্ত হবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(مَنْ يُّضْلِلِ اللّٰهُ فَلَا هَادِيَ لَه۫)
“আল্লাহ তা‘আলা যাদেরকে পথভ্রষ্ট করেন তাদের কোন পথপ্রদর্শক নেই।” (সূরা আ‘রাফ ৭:১৮৬)
সুতরাং কোন কিছু মানতে গেলে বা আমল করতে গেলে তা প্রথমে যাচাই-বাছাই করে নিতে হবে। যদি সঠিক হয় তাহলে মানতে হবে, তা না হলে প্রত্যাখ্যান করতে হবে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. আল্লাহ তা‘আলার বিধানের কুফরী করা যাবে না এবং এদিকে কাউকে আহ্বানও করা যাবে না।
২. অন্ধের মত যাচাই-বাছাই না করে কারো অনুসরণ করা যাবে না।
৩. হিদায়াতের মালিক একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৩৯-৪০ নং আয়াতের তাফসীর
আরো দু'প্রকার কাফিরের এ দু’টি দৃষ্টান্ত বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন সূরায়ে বাকারার শুরুতে দু'শ্রেণীর দু’টি উপমা বর্ণনা করা হয়েছে, একটি আগুনের উপমা এবং একটি পানির উপমা। আর যেমন সূরায়ে রা’দে মানুষের অন্তরে স্থান ধারণকারী ইলম ও হিদায়াতের এরূপই আগুন ও পানির দুটি দৃষ্টান্ত পেশ করা হয়েছে। ঐ দু’টি সূরায় ঐ আয়াতগুলোর পূর্ণ তাফসীর গত হয়েছে। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই জন্যে।
প্রথমটি হচ্ছে ঐ কাফিরদের দৃষ্টান্ত যারা অন্যদেরকেও কুফরীর দিকে আহ্বান করে থাকে এবং মনে করে যে, তারা হিদায়াতের উপরই প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। কিন্তু ওটা শুধু তাদের কল্পনা মাত্র। তাদের দৃষ্টান্ত তো হলো এরূপ যেমন কোন পিপাসার্ত লোক মরুভূমিতে দূর থেকে চকচকে বালু দেখতে পায় এবং ওকে পানির তরঙ্গ মনে করে বসে।
(আরবি) শব্দটি (আরবি) শব্দের বহুবচন, যেমন শব্দটির বহুবচন হলো (আরবি) এবং (আরবি) শব্দের বহুবচন (আরবি) ও এসে থাকে, যেমন (আরবি) শব্দের বহুবচন (আরবি) ও আসে। (আরবি) শব্দের অর্থ হলো জনশূন্য প্রশস্ত ও বিস্তীর্ণ মরুভূমি। এরূপ মরুভূমিতেই মরীচিকা দৃষ্টিগোচর হয়ে থাকে। দুপুরের সময় এরূপই মনে হয় যে, পানির প্রশস্ত সমুদ্র তরঙ্গায়িত হচ্ছে। মরুভূমির উপর দিয়ে চলতে চলতে যখন কোন লোক পিপাসায় কাতর হয়ে ছটফট করে এবং ওষ্ঠাগত প্রাণ হয়ে যায়, আর উড্রান্তের মত পানির খোঁজে ফিরতে থাকে, তখন সে ওটাকে পানি মনে করে সেখানে পৌছে যায়। কিন্তু গিয়ে দেখে যে, সেখানে এক ফোটা পানিরও কোন নাম-নিশানা নেই। দ্রুপ এই কাফিররাও মনে করে নিয়েছে যে, তারা খুব ভাল কাজই করছে। কিন্তু কিয়ামতের দিন তারা দেখতে পাবে যে, তাদের কাছে একটা পুণ্যও নেই। হয়তো তাদের পুণ্য তাদের বদ নিয়তের কারণে নষ্ট হয়ে গেছে অথবা শরীয়ত মোতাবেক না হওয়ার কারণে নষ্ট হয়ে গেছে। মোটকথা, সেখানে পৌছবার পূর্বেই তারা জাহান্নামীদের তালিকাভুক্ত হয়ে গেছে। সুতরাং সেখানে তারা হয়ে গেছে সম্পূর্ণ শূন্য হস্ত। হিসাব গ্রহণের সময় স্বয়ং মহিমান্বিত ও প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ সেখানে বিদ্যমান। তিনি এক এক করে প্রত্যেকটি আমলের হিসাব গ্রহণ করছেন এবং ঐ কাফিরদের একটি আমলও পুণ্যের যোগ্যরূপে পাওয়া যাচ্ছেনা।
সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, কিয়ামতের দিন ইয়াহূদীদেরকে জিজ্ঞেস করা হবেঃ “দুনিয়ায় তোমরা কার উপাসনা করতে?” উত্তরে তারা বলবেঃ “আমরা আল্লাহর পুত্র (নাউযুবিল্লাহ) উযায়ের (আঃ)-এর উপাসনা করতাম।” তখন তাদেরকে বলা হবেঃ “তোমরা মিথ্যা কথা বলছো, আল্লাহর কোন পুত্র নেই। তারপর তাদেরকে প্রশ্ন করা হবেঃ “আচ্ছা, এখন তোমরা কি চাও?” তারা জবাবে বলবেঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা খুবই পিপাসার্ত। সুতরাং আমাদেরকে পানি পান করিয়ে দিন!” তখন তাদেরকে বলা হবেঃ “তোমরা কি দেখতে পাচ্ছ না (ঐ যে পানি দেখা যায়, সেখানে যাও কেন)?” অতঃপর দূর থেকে তারা জাহান্নামকে তেমনই দেখবে যেমন দুনিয়ায় মরীচিকা দেখা যায়। সুতরাং তারা পানি মনে করে ওদিকে দৌড় দেবে এবং সেখানে পৌছলেই তারা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।
এটা দৃষ্টান্ত হলো অনুসৃত লোকদের। এখন দৃষ্টান্ত বর্ণনা করা হচ্ছে অনুসরণকারী লোকদের, যারা মোটেই জ্ঞান রাখতো না। তারা পূর্ব বর্ণিত কাফিরদের অন্ধ অনুকরণ করতো। যাদের উপমা দেয়া হয়েছে গভীর সমুদ্রতলের অন্ধকারের সাথে, যাকে আচ্ছন্ন করে তরঙ্গের উপর তরঙ্গ, যার ঊর্ধ্বে মেঘপুঞ্জ, অন্ধকারপুঞ্জ স্তরের উপর স্তর, এমনকি সে হাত বের করলে তা আদৌ দেখতে পাবে না। এই অবস্থা ঐ অনুসরণকারী কাফিরদের হবে যারা নেতৃস্থানীয় কাফিরদেরকে অন্ধভাবে অনুসরণ করে থাকে। যাদের তারা অনুসরণ করে তাদেরকেও তারা সঠিকভাবে চিনে না। তারা ন্যায়ের উপর আছে কি অন্যায়ের উপর আছে সেটাও তারা জানে না। তারা তাদের পিছনে চলতে রয়েছে, কিন্তু তারা তাদেরকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে এ খবর তারা রাখে না। উদাহরণ স্বরূপ বলা হয়ে থাকে যে, কোন একজন অজ্ঞ লোককে জিজ্ঞেস করা হয়ঃ “তু কোখায় যাচ্ছ?” উত্তরে সে বলেঃ “আমি এই লোকটির সাথে যাচ্ছি।” আবার তাকে প্রশ্ন করা হয়ঃ “এ লোকটি কোথায় যাচ্ছে?” জবাবে সে বলেঃ “তা তো আমি জানি না।” যেমন সমুদ্র তরঙ্গায়িত হচ্ছে তেমনই এই কাফিরের কানে এবং চোখের উপর পর্দা পড়ে রয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “আল্লাহ তাদের অন্তরের উপর ও কানের উপর মোহর লাগিয়ে দিয়েছেন (শেষ পর্যন্ত)।” অন্য আয়াতে রয়েছে-(আরবি)
অর্থাৎ “তুমি কি ঐ ব্যক্তিকে দেখনি যে তার প্রবৃত্তিকে তার মা'বুদ বানিয়ে নিয়েছে, আর আল্লাহ তাকে জ্ঞানের উপর পথভ্রষ্ট করেছেন এবং তার কানের উপর ও অন্তরের উপর মোহর লাগিয়ে দিয়েছেন ও তার চোখের উপর পর্দা ফেলে দিয়েছেন?।” (৪৫: ২৩)
হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) বলেছেন যে, এই ধরনের লোক পাঁচটি অন্ধকারের মধ্যে থাকে। তার কথা, কাজ, যাওয়া, আসা এবং পরিণাম অন্ধকারের মধ্যে রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহ যাকে জ্যোতি দান করেন। তার জন্যে কোন জ্যোতিই নেই। অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা যাকে হিদায়াতের জ্যোতি দান না করেন সে হিদায়াত শূন্য থাকে এবং অজ্ঞতার মধ্যে জড়িয়ে পড়ে ধ্বংসের মধ্যে পতিত হয়। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন তার জন্যে কোন হিদায়াতকারী নেই।” (৭: ১৮৬) এটা ওরই মুকাবিলায় বলা হয়েছে যা মুমিনদের উপমার বর্ণনায় বলা হয়েছিল যে, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথ-নির্দেশ করেন তাঁর জ্যোতির দিকে। আমরা মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করছি যে, তিনি যেন আমাদের অন্তরে নূর সৃষ্টি করেন এবং আমাদের ডানে এবং বামেও যেন নূর বা জ্যোতি দান করেন। তিনি যেন আমাদের জ্যোতি বাড়িয়ে দেন এবং ওটাকে খুবই বড় ও বেশী করেন।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।