আল কুরআন


সূরা আন-নূর (আয়াত: 34)

সূরা আন-নূর (আয়াত: 34)



হরকত ছাড়া:

ولقد أنزلنا إليكم آيات مبينات ومثلا من الذين خلوا من قبلكم وموعظة للمتقين ﴿٣٤﴾




হরকত সহ:

وَ لَقَدْ اَنْزَلْنَاۤ اِلَیْکُمْ اٰیٰتٍ مُّبَیِّنٰتٍ وَّ مَثَلًا مِّنَ الَّذِیْنَ خَلَوْا مِنْ قَبْلِکُمْ وَ مَوْعِظَۃً لِّلْمُتَّقِیْنَ ﴿۳۴﴾




উচ্চারণ: ওয়া লাকাদ আনযালনাইলাইকুমআ-য়া-তিম মুবাইয়িানা-তিওঁ ওয়া মাছালাম মিনাল্লাযীনা খালাও মিন কাবলিকুম ওয়া মাও‘ইজাতাল লিল মুত্তাকীন।




আল বায়ান: আর নিশ্চয় আমি তোমাদের কাছে নাযিল করেছি সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ এবং তোমাদের পূর্বে যারা চলে গেছে তাদের দৃষ্টান্ত ও মুত্তাকীদের জন্য উপদেশ।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩৪. আর অবশ্যই আমরা তোমাদের কাছে নাযিল করেছি সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ, তোমাদের পূর্ববর্তীদের থেকে দৃষ্টান্ত ও মুত্তাকীদের জন্য উপদেশ।




তাইসীরুল ক্বুরআন: তোমাদের নিকট অবতীর্ণ করেছি সুস্পষ্ট আয়াত আর তোমাদের পূর্বে যারা অতীত হয়ে গেছে তাদের দৃষ্টান্ত ও মুত্তাকীদের জন্য দিয়েছি উপদেশ।




আহসানুল বায়ান: (৩৪) আমি তোমাদের নিকট অবতীর্ণ করেছি সুস্পষ্ট বাক্য, তোমাদের পূর্ববর্তীদের দৃষ্টান্ত এবং সাবধানীদের জন্য উপদেশ ।



মুজিবুর রহমান: আমি তোমাদের নিকট অবতীর্ণ করেছি সুস্পষ্ট আয়াত, তোমাদের পূর্ববর্তীদের দৃষ্টান্ত এবং মুত্তাকীদের জন্য উপদেশ।



ফযলুর রহমান: আমি তো তোমাদের কাছে অবতীর্ণ করেছি (সবকিছু) সুস্পষ্টকারী আয়াত, তোমাদের পূর্বে যারা চলে গিয়েছে তাদের দৃষ্টান্ত এবং মোত্তাকীদের জন্য উপদেশ।



মুহিউদ্দিন খান: আমি তোমাদের প্রতি অবতীর্ণ করেছি সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ, তোমাদের পূর্ববর্তীদের কিছু দৃষ্টান্ত এবং আল্লাহ ভীরুদের জন্যে দিয়েছি উপদেশ।



জহুরুল হক: আর আমরা নিশ্চয়ই ইতিমধ্যে তোমাদের কাছে সুস্পষ্ট নির্দেশাবলী অবতারণ করেছি, আর তোমাদের পূর্বে যারা গত হয়েছে তাদের উদাহরণ, আর ধর্মভীরুদের জন্য দিয়েছি উপদেশ।



Sahih International: And We have certainly sent down to you distinct verses and examples from those who passed on before you and an admonition for those who fear Allah.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৩৪. আর অবশ্যই আমরা তোমাদের কাছে নাযিল করেছি সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ, তোমাদের পূর্ববর্তীদের থেকে দৃষ্টান্ত ও মুত্তাকীদের জন্য উপদেশ।


তাফসীর:

-


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৩৪) আমি তোমাদের নিকট অবতীর্ণ করেছি সুস্পষ্ট বাক্য, তোমাদের পূর্ববর্তীদের দৃষ্টান্ত এবং সাবধানীদের জন্য উপদেশ ।


তাফসীর:

-


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৩২-৩৪ নং আয়াতের তাফসীর:



উক্ত আয়াতগুলোতে বিবাহ সংক্রান্ত কিছু বিধি-বিধান আলোচনা করা হয়েছে।



الْأَيَامٰي শব্দটি ايم শব্দের বহুবচন। অর্থন প্রত্যেক স্বাধীন এমন নর-নারী যার বিবাহ বর্তমান নেই। আসলেই বিবাহ করেনি, বা বিবাহের পর স্বামী বা স্ত্রীর মধ্যে কেউ মারা গেছে অথবা তালাকের কারণে বিচ্ছেদ হয়ে গেছে। এমন নর-নারীদের বিবাহ দিয়ে দেয়ার জন্য আল্লাহ তা‘আলা অভিভাবকদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, “বিবাহ দাও”, “বিবাহ কর” এ কথা বলেননি। সুতরাং বিবাহে কোন পুরুষ ও নারীর প্রত্যক্ষ পদক্ষেপ নেয়ার পরিবর্তে অভিভাবকের মাধ্যমে এ কাজ সম্পাদন করাই বিবাহের মাসনূন ও উত্তম পন্থা। এতে ধর্মীয় ও পার্থিব উপকারিতা রয়েছে। বিশেষতঃ মেয়েদের বিবাহ তারা নিজেরাই সম্পন্ন করতে পারবে না। এটা যেমন একটা নির্লজ্জ কাজ, তেমনি এতে অশ্লীলতার পথ খুলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। অভিভাবক ছাড়া যে সকল নারীদের বিবাহ হয়, তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ খুব দ্রুত ও বেশি হয়ে থাকে।



যে সকল মেয়েরা নিজেরাই নিজেদের বিবাহ দিয়ে থাকে তাদের বিবাহকে বাতিল বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:



أَيُّمَا امْرَأَةٍ نَكَحَتْ بِغَيْرِ إِذْنِ وَلِيِّهَا فَنِكَاحُهَا بَاطِلٌ، فَنِكَاحُهَا بَاطِلٌ، فَنِكَاحُهَا بَاطِلٌ



যে মহিলা অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিবাহ করে তার সে বিবাহ বাতিল, বাতিল, বাতিল। (তিরমিযী হা: ১১০২, সহীহ) সুতরাং অভিভাবকদের উচিত হবে যারা বিবাহের উপযুক্ত এবং যাদের বিবাহের প্রয়োজন তাদেরকে যথাসময়ে বিবাহ দিয়ে দেয়া। এতে দীন ও দুনিয়া উভয় জগতের উপকারিতা রয়েছে।



الصّٰلِحِيْنَ সৎন এখানে সৎ বলতে দীনদারিত্ব বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ তোমাদের যে সকল দাস-দাসী সৎ দীনদার, কোন ব্যভিচারে লিপ্ত নয়, বিবাহ করতে আগ্রহী তাদেরকে বিবাহ দিয়ে দাও। কিন্তু যদি দাস-দাসী ব্যভিচারী হয় তাদের বিবাহ দেয়া নিষেধ যতক্ষণ না তাওবাহ করে। দাস-দাসীদের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে ‘সৎ’ শব্দটি ব্যবহার করা হল কিন্তু পূর্বে মুসলিমদের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়নি। কারণ অধিকাংশ দাস-দাসীরা ব্যভিচারে লিপ্ত হয়। আবার ‘সৎ’ বলতে এটাও সম্ভাবনা রয়েছে যে, বিবাহের জন্য তারা উপযোগী ও বিবাহ করতে আগ্রহী। সুতরাং মালিক দাস-দাসীদেরকে বিবাহ করতে বাধ্য করতে পারবে, যদিও এ বিষয়ে মতামত রয়েছে।



(يُغْنِيَهُمُ اللّٰهُ مِنْ فَضْلِه)



‘তারা অভাবগ্রস্ত‎ হলে আল্লাহ তা‘আলা নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দেবেন’ এখানে আল্লাহ তা‘আলা স্বাধীন ও পরাধীন সকল দরিদ্র দম্পতিকে প্রতিশ্র“তি দিচ্ছেন যে, তারা অভাবগ্রস্ত হলে আল্লাহ তা‘আলা নিজ অনুগ্রহে অভাব মোচন করে দেবেন। হাদীসেও এসেছে:



আবূ হুরাইরাহ (رضي الله عنه) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)‎ বলেছেন: তিন ব্যক্তিকে সাহায্য করা আল্লাহ তা‘আলার ওপর আবশ্যক হয়ে যায়।



(১) ঐ ব্যক্তি যে বিবাহের মাধ্যমে নিজেকে পূতঃপবিত্র রাখতে চায়।

(২) ঐ মুকাতাব গোলাম, যে তার মালিকের সাথে চুক্তিকৃত টাকা আদায় করার ইচ্ছা রাখে এবং

(৩) আল্লাহ তা‘আলার পথে মুজাহিদ।

(তিরমিযী হা: ১৬৫৫, নাসায়ী হা: ৩১২০, হাসান)

তবে এ বিবাহের দ্বারা উদ্দেশ্য থাকতে হবে নিজেকে মন্দ কার্য-কলাপ থেকে পূতঃপবিত্র রাখা।



স্বাধীন ব্যক্তি দাসীদেরকে বিবাহ করা প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা সূরা নিসার ২৫ নং আয়াতে করা হয়েছে।



এরপর আল্লাহ তা‘আলা তাদের বর্ণনা দিচ্ছেন যাদের বিবাহ করার সার্মথ্য নেই। তারা যেন সামর্থ্যবান হওয়া পর্যন্ত নিজেকে পবিত্র রাখে, কোন অবৈধ সম্পর্কে জড়িত হয়ে নিজেকে কলুষিত না করে। সামর্থ্য দু’ধরণেরন একটি হল আর্থিক, অন্যটি হল দৈহিক। এখানে মূলত আর্থিক সামর্থ্যরে কথা বলা হয়েছে। যেমন হাদীসে এসছে: আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (رضي الله عنه) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: হে যুবকের দলেরা! তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি বিবাহ করতে সক্ষম সে যেন বিবাহ করে, কেননা বিবাহ দৃষ্টিকে অবনত রাখে, লজ্জাস্থানকে হিফাযত করে। আর যে ব্যক্তি সামর্থ্য রাখবে না সে যেন সিয়াম পালন করে। কেননা এটি তার যৌনশক্তিকে দমন করবে। (সহীহ বুখারী হা: ১৯০৫, সহীহ মুসলিম হা: ১৪০০) সুতরাং যাদের বিবাহ করার সামর্থ্য নেই তাদের উচিত বেশি বেশি নফল রোযা রাখা।



استعفف নিজেকে পবিত্র রাখা,



(لَا يَجِدُوْنَ نِكَاحًا)



বা বিবাহের ব্যয়ভারন যেমন মাহর, ভরণ-পোষণ, বাসস্থান ইত্যাদি। অর্থাৎ যার এসব সামর্থ্য নেই সে যেন নিজেকে পবিত্র রাখে।



(وَالَّذِيْنَ يَبْتَغُوْنَ الْكِتٰبَ)



অর্থাৎ তোমাদের অধীনে যে সকল দাস-দাসী রয়েছে তারা যদি তোমাদের সাথে চুক্তি করতে চায় এমর্মে যে, কিছু অর্থ দিয়ে দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিবে তাহলে তাদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হও। কেননা ইসলাম চায় দাসপ্রথা উচ্ছেদ হয়ে যাক, সেহেতু তোমরা তাদের মাঝে কোন কল্যাণ দেখতে পেলে চুক্তিতে রাজি হয়ে যাবে।



‘যদি তোমরা তাদের মধ্যে মঙ্গলের সন্ধান পাও’ অর্থাৎ সততা ও আমানতদারীর ওপর তোমাদের বিশ্বাস থাকে অথবা তারা কোন কাজে পারদর্শি হয় যাতে উপার্জন করে চুক্তির অর্থ পরিশোধ করে দিতে পারবে, যদি তাদের মাঝে অর্থ পরিশোধের সামর্থ্য বুঝতে পারো তাহলে রাজি হয়ে যাবে। কেউ কেউ বলেছেন, এ আদেশ পালন করা ওয়াজিব আবার কেউ বলেছেন, মুস্তাহাব। বর্ণিত আছে যে, উমার (رضي الله عنه)-এর যুগে আনাস (رضي الله عنه)-এর সীরিন নামক একজন গোলাম তাঁর কাছে আবেদন জানায় যে, তিনি যেন তার সঙ্গে তার মুক্তির জন্য লিখিত চুক্তিতে আবদ্ধ হন। আনাস (رضي الله عنه) তা প্রত্যাখ্যান করেন। তখন গোলামটি উমার (رضي الله عنه)-এর নিকট গিয়ে তার বিরুদ্ধে নালিশ করে। তখন উমার (رضي الله عنه) আনাসকে ডেকে বললেন চুক্তিবদ্ধ হওয়ার জন্য। কিন্তু তিনি অস্বীকার করেন। উমার (رضي الله عنه) তাকে চাবুক মারেন এবং কুরআনের এ আয়াতটি পাঠ করেন। তখন আনাস (رضي الله عنه) চুক্তিতে আবদ্ধ হন। (সহীহ বুখারী হা: ৩/১৫১



بَابُ المُكَاتِبِ، وَنُجُومِهِ فِي كُلِّ سَنَةٍ نَجْمٌ)



এরপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন: আল্লাহ তা‘আলা তোমাদেরকে যে সম্পদ দান করেছেন তা হতে তোমাদের দাস-দাসীদেরকে দান কর, এতে তোমাদের দান করাও হবে এবং তাদের উপকারও হবে যে, তাড়াতাড়ি তারা তোমাদের সাথে চুক্তিকৃত অর্থ পরিশোধ করতে পারবে। সে জন্য আল্লাহ তা‘আলা যাকাত বন্টনের আটটি খাতের মধ্যে একটি দাসমুক্তির খাতও রেখেছেন।



(وَلَا تُكْرِهُوْا فَتَيٰتِكُمْ عَلَي الْبِغَا۬ءِ)



‘তাদেরকে ব্যভিচারিণী হতে বাধ্য কর না’ ইসলাম পূর্ব যুগের লোকেরা শুধু কিছু অর্থের লোভে নিজেদের দাসীদেরকে ব্যভিচারে লিপ্ত করত। এতে তাদের ইচ্ছা থাকুক আর না থাকুক। আল্লাহ মুসলিমদেরকে এ রকম কাজ করতে নিষেধ করে বলছেন, তোমরা তোমাদের দাসীদেরকে ব্যভিচারে বাধ্য করো না। ‘সতীত্ব রক্ষা করতে চাইলে’ একথা স্বাভাবিক পরিস্থিতির দিকে খেয়াল করে বলা হয়েছে। নচেৎ এর অর্থ এ নয় যে, তারা সতীত্ব রক্ষা করতে না চাইলে বা তারা ব্যভিচার পছন্দ করলে ব্যভিচার করতে দাও। বরং এ নির্দেশের উদ্দেশ্য এই যে, সামান্য পার্থিব অর্থের লোভে দাসীদেরকে ব্যভিচারে জড়ায়ো না। কারণ এ উপার্জন হারাম। তবে যদি তাদেরকে এ খারাপ কাজ করতে বাধ্য করা হয়, তাহলে তাদের কোন পাপ হবে না। আল্লাহ তা‘আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করলে আল্লাহ তা‘আলা অবশ্যই তাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন। হাদীসে এসেছে: আমার উম্মাতের ভুল-ত্র“টি আর এমন কাজ যা করতে বাধ্য করা হয়, তা ক্ষমার যোগ্য। (ইবনু মাযাহ হা: ২০৪৩, সহীহ)



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. অভিভাবকদের উচিত ছেলে-মেয়েরা উপযুক্ত হলে বিবাহ দিয়ে দেয়া।

২. বিবাহের মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলার অনুগ্রহ লাভ করা যায়।

৩. যাদের বিবাহ করার আর্থিক সামর্থ্য নেই তাদের উচিত, সামর্থ্যবান হওয়া পর্যন্ত নিজেকে পবিত্র রাখা।

৪. কোন দাস যদি নিজেকে মুক্ত করণার্থে চুক্তিবদ্ধ হতে চায় তাহলে তার সাথে লিখিতভাবে চুক্তিবদ্ধ হওয়া উচিত।

৫. কোন দাস-দাসীকে ব্যভিচারের জন্য জবরদস্তি করা উচিত নয়।

৬. দাস-দাসীদেরকে নিজের সম্পদ থেকে দান করা যেতে পারে।

৭. কুরআন মূলত একটা উপদেশ বাণী।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৩২-৩৪ নং আয়াতের তাফসীর

এখানে আল্লাহ তা'আলা বহু কিছু হুকুম বর্ণনা করেছেন। প্রথমে তিনি বিবাহের বর্ণনা দিয়েছেন।

আলেম জামাআতের খেয়াল এই যে, যে ব্যক্তি বিয়ে করার সামর্থ্য রাখে তার জন্যে বিয়ে করা ওয়াজিব। দলীল হিসেবে তাঁরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিম্নের বাণীটি গ্রহণ করেছেনঃ “হে যুবকের দল! তোমাদের মধ্যে যে বিয়ে করার ক্ষমতা রাখে সে যেন বিয়ে করে। বিয়ে হলো দৃষ্টিকে নিম্নমুখীকারী এবং লজ্জাস্থানকে রক্ষাকারী। আর যে বিয়ে করার ক্ষমতা রাখে না সে যেন রোযা রাখে। এটাই তার জন্যে হলো অণ্ডকোষ কর্তিত হওয়া।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) তাখরীজ করেছেন)

অন্য একটি হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যেসব স্ত্রীলোক হতে অধিক সন্তান লাভের আশা আছে তোমরা ঐ সব স্ত্রীলোককে বিয়ে কর, যেন তোমাদের বংশ বৃদ্ধি হয়। আমি তোমাদের মাধ্যমে কিয়ামতের দিন অন্যান্য উম্মতের মধ্যে ফখর করবো।” এহদীসটি সুনানে বর্ণিত হয়েছে।

আর একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এমন কি অপূর্ণ অবস্থায় পড়ে যাওয়া (গর্ভপাত হওয়া) শিশুর সংখ্যা গণনা দ্বারাও আমি ফখর করবো।”

(আরবি) শব্দটি (আরবি) শব্দের বহু বচন। জাওহারী (রঃ) বলেন যে, ভাষাবিদদের মতে বিপত্নীক পুরুষ ও বিধবা নারীকে (আরবি) বলা হয়। সে বিবাহিত হোক অথবা অবিবাহিত হোক। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা আগ্রহ বৃদ্ধির জন্যে বলেনঃ যদি সে দচ্ছি হয় তবে আল্লাহ তাকে স্বীয় অনুগ্রহে সম্পদশালী বানিয়ে দিবেন। সে আবাদই হোক অথবা গোলামই হোক।

হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) বলেনঃ “বিয়ের ব্যাপারে আল্লাহর আদেশ মেনে চল, তাহলে তিনি তোমাদের কৃত ওয়াদা পুরো করবেন। আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যদি তারা দরিদ্র হয়, তবে আল্লাহ তাদেরকে স্বীয় অনুগ্রহে সম্পদশালী করে দিবেন।”

হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন, বিবাহে তোমরা ঐশ্বর্য অনুসন্ধান কর। কেননা, আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ “তারা দরিদ্র হলে আল্লাহ তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দিবেন।” (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-ও বর্ণনা করেছে)

হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তিন প্রকারের লোককে আল্লাহ তা'আলা সাহায্য করার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তারা হলো-বিবাহকারী, যে ব্যভিচার হতে বাঁচবার উদ্দেশ্যে বিয়ে করে থাকে, ঐ মুকাতাব গোলাম, যে তার চুক্তিকৃত টাকা আদায় করার ইচ্ছা রাখে এবং আল্লাহর পথের গাযী।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ ব্যক্তির বিবাহ একটি স্ত্রীলোকের সাথে দিয়ে দেন যার কাছে তার একটি মাত্র লুঙ্গী ছাড়া আর কিছুই ছিল না। এমনকি তার কাছে একটি লোহার আংটিও ছিল না। তার এতো অভাব ও দারিদ্র সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার বিয়ে দিয়ে দেন এবং তার মহর এই ধার্য করেন যে, তার কুরআন কারীম হতে যা কিছু মুখস্থ আছে তাই সে তার স্ত্রীকে মুখস্থ করিয়ে দেবে। এটা একমাত্র এরই উপর ভিত্তি করে যে, মহান আল্লাহ স্বীয় অনুগ্রহে তাকে এমন জীবিকা দান করবেন যা তার ও তার স্ত্রীর জন্যে যথেষ্ট হবে।

অধিকাংশ লোক একটি হাদীস আনয়ন করে থাকেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা দারিদ্রের অবস্থাতেও বিয়ে কর, আল্লাহ তোমাদেরকে অভাবমুক্ত করে দিবেন।” (ইমাম ইবনে কাসীর (রঃ) বলেনঃ সবল সনদে বা দুর্বল সনদেও এ হাদীসটি আমার চোখে পড়েনি। আর এই বিষয়ে এরূপ ঠিকানা বিহীন হাদীসের আমাদের কোন প্রয়োজনও নেই। কেননা, কুরআন কারীমের এই আয়াতে এবং উপরোক্ত হাদীসসমূহে এটা বিদ্যমান রয়েছে। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর)

এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ যাদের বিবাহের সামর্থ্য নেই, আল্লাহ তাদেরকে নিজ অনুগ্রহে অভাবমুক্ত না করা পর্যন্ত তারা যেন সংযম অবলম্বন করে।

রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হে যুবকের দল! তোমাদের মধ্যে যার বিয়ে করার সামর্থ্য আছে সে যেন বিয়ে করে। বিবাহ দৃষ্টিকে নিম্নমুখী রাখে এবং লজ্জাস্থানের হিফাযত করে। আর যার বিয়ে করার সামর্থ্য নেই সে যেন অবশ্যই রোযা রাখে এবং এটাই তার জন্যে খাসসী হওয়া (অণ্ডকোষ কর্তিত হওয়া)।” এই আয়াতটি সাধারণ। সূরায়ে নিসার আয়াতটি এর থেকে খাস বা বিশিষ্ট। ঐ আয়াতটি হলোঃ (আরবি) হতো (আরবি)

অর্থাৎ “তোমাদের মধ্যে কারো স্বাধীনা ঈমানদার নারী বিবাহের সামর্থ্য না থাকলে তোমরা তোমাদের অধিকারভুক্ত ঈমানদার নারীকে বিয়ে করবে; আল্লাহ তোমাদের ঈমান সম্বন্ধে পরিজ্ঞাত। তোমরা একে অপরের সমান, সুতরাং তাদেরকে বিয়ে করবে তাদের মালিকের অনুমতিক্রমে এবং যারা সচ্চরিত্রা, ব্যভিচারিণী নয় ও উপপতি গ্রহণকারিণীও নয় তাদেরকে তাদের মহর ন্যায়সঙ্গতভাবে দিবে। বিবাহিতা হবার পর যদি তারা ব্যভিচার করে তবে তাদের শাস্তি স্বাধীনা নারীর অর্ধেক; তোমাদের মধ্যে যারা ব্যভিচারকে ভয় করে এটা তাদের জন্যে; ধৈর্যধারণ করা তোমাদের জন্যে মঙ্গল।” (৪: ২৫) সুতরাং দাসীদেরকে বিয়ে করা অপেক্ষা ধৈর্যধারণই শ্রেয়। কেননা, এই অবস্থায় সন্তানদের উপর দাসত্বের দাগ পড়ে যায়।

হযরত ইকরামা (রাঃ) বলেন যে, যে পুরুষ লোক স্ত্রীলোককে দেখে এবং দেখার পর তার অন্তরে কাম প্রবৃত্তি জেগে ওঠে, সে যেন তৎক্ষণাৎ তার স্ত্রীর কাছে চলে যায়, যদি তার স্ত্রী বিদ্যমান থাকে। আর যদি তার স্ত্রী না থাকে তবে সে যেন আল্লাহ তা'আলার সার্বভৌম ক্ষমতার প্রতি লক্ষ্য রেখে ধৈর্যধারণ করে যে পর্যন্ত না আল্লাহ তাকে অভাবমুক্ত করেন।

অতঃপর আল্লাহ তাআলা গোলামদের মালিকদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তাদের দাসদাসীদের কেউ যদি তার মুক্তির জন্যে লিখিত চুক্তি করতে চায় তবে গন্ধ যেন তাদের সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ হয়, যদি তারা তাদের মধ্যে মঙ্গলের সন্ধান পায়। গোলাম তার উপার্জনের মাধ্যমে ঐ মাল জমা করতঃ মনিবকে দিয়ে দেবে এবং এই ভাবে তারা আযাদ বা মুক্ত হয়ে যাবে। অধিকাংশ আলেম বলেন যে, এ হুকুম জরুরী নয়। এটা ফরযও নয় এবং ওয়াজিবও নয়, বরং মুস্তাহাব। মনিবের এ অধিকার আছে যে, তার গোলাম কোন শিল্পকার্য জানলে যদি তাকে বলে যে, তাকে সে এতো এতো টাকা দিবে এবং এর বিনিময়ে সে তাকে আযাদ করে দিবে। তবে এটা মনিবের ইচ্ছাধীন। ইচ্ছা হলে সে তার সাথে চুক্তি করবে এবং না হলে না করবে। আলেমদের একটি জামাআত আয়াতের বাহ্যিক শব্দের প্রতি লক্ষ্য রেখে বলেন যে, গোলাম যদি তার মুক্তির জন্যে লিখিত চুক্তি করতে চায় তবে তার সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া তার মনিবের উপর ওয়াজিব।

বর্ণিত আছে যে, হযরত উমার (রাঃ)-এর যুগে হযরত আনাস (রাঃ)-এর সীরীন নামক একজন সম্পদশালী গোলাম তার কাছে আবেদন জানায় যে, তিনি যেন তার সাথে তার মুক্তির জন্যে লিখিত চুক্তিতে আবদ্ধ হন। কিন্তু হযরত আনাস (রাঃ) তা প্রত্যাখ্যান করেন। তখন গোলামটি হযরত উমার (রাঃ)-এর কাছে তাঁর বিরুদ্ধে নালিশ করে। হযরত উমার (রাঃ) তখন হযরত আনাস (রাঃ)-কে ডেকে গোলামের সাথে চুক্তি করতে নির্দেশ দেন। এবারেও হযরত আনাস (রাঃ) অস্বীকৃতি জানান। তখন হযরত উমার (রাঃ) তাঁকে চাবুক মারেন এবং গোলামের সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ হতে বাধ্য করেন। অতঃপর তিনি কুরআনে কারীমের এ আয়াতটি তাঁর সামনে তিলাওয়াত করেন। (এটা সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে)

হযরত আতা (রঃ) হতে দু’টি উক্তিই বর্ণিত আছে। ইমাম শাফেয়ী (রঃ)-এর প্রথম উক্তি এটাই ছিল। কিন্তু তাঁর নতুন উক্তি এই যে, চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া মনিবের উপর ওয়াজিব নয়।

ইমাম মালেক (রঃ) বলেনঃ “গোলাম তার মনিবকে তার সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ হতে আবেদন জানালে ঐ চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া মনিবের উপর ওয়াজিব নয়। কোন ইমাম যে কোন মনিবকে গোলামের মুক্তির জন্যে লিখিত চুক্তিতে আবদ্ধ হতে বাধ্য করেছেন এটা আমি শুনিনি। আল্লাহ তাআলার এ হুকুম অনুমতি হিসেবে, ওয়াজিব হিসেবে নয়। ইমাম আবু হানীফা (রঃ) প্রমুখ গুরুজনের এটাই উক্তি। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-এর মতে ওয়াজিব হওয়াই পছন্দনীয় উক্তি।

(আরবি) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো বিশ্বস্ততা, সত্যবাদিতা এবং মাল উপার্জন করার ক্ষমতা ইদ্যাদি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের যেসব গোলাম তাদের মুক্তির জন্যে তোমাদের সাথে লিখিত চুক্তিতে আবদ্ধ হতে ইচ্ছা করে তাহলে তোমরা দেখো যে, তাদের মধ্যে মাল উপার্জনের যোগ্যতা আছে কি না। যদি তাদের মধ্যে তা দেখতে পাও তবে তাদের মনোবাসনা পূর্ণ কর। আর তা দেখতে না পেলে নয়। কেননা, এমতাবস্থায় তারা নিজেদের বোঝা লোকদের উপর চাপিয়ে দেবে।” অর্থাৎ অর্থ যোগাড় করার জন্যে তাদের কাছে ভিক্ষা করবে।

এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহ তোমাদেরকে যে সম্পদ দিয়েছেন তা হতে তোমরা তাদেরকে দান করবে। অর্থাৎ তার নিকট হতে যে অর্থ আদায়ের চুক্তি হয়েছে তা হতে কিছু ক্ষমা করে দেবে। তা এক চতুর্থাংশ হোক বা এক তৃতীয়াংশ হোক বা অর্ধাংশ হোক অথবা কিছু অংশ হোক। নিম্নরূপ ভাবার্থও বর্ণনা করা হয়েছেঃ তাদেরকে যাকাতের মাল হতে সাহায্য কর। অর্থাৎ তাদেরকে তাদের মনিব এবং অন্যান্য মুসলমান যাকাতের মাল থেকে সাহায্য করবে যাতে তারা চুক্তির অর্থ পূর্ণ করে আযাদ হয়ে যেতে পারে।

পূর্বে হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে, যে তিন প্রকারের লোককে সাহায্য করার দায়িত্ব আল্লাহ তা'আলা গ্রহণ করেছেন তাদের মধ্যে এটাও এক প্রকার। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই প্রসিদ্ধতম উক্তি।

বর্ণিত আছে যে, হযরত উমার (রাঃ)-এর গোলাম আবূ উমাইয়া তার সাথে মুক্তির চুক্তি করেছিল। সে যখন তার প্রথম কিস্তির অর্থ নিয়ে হযরত উমার (রাঃ)-এর নিকট আগমন করে তখন তিনি তাকে বলেনঃ “যাও তুমি তোমার চুক্তির এ অর্থ পূরণে অন্যদের নিকটও সাহায্য প্রার্থনা কর।” তাঁর এ কথা শুনে গোলামটি বলেঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! শেষ কিস্তি পর্যন্ত তো আমাকেই পরিশ্রম করতে দিন!” জবাবে হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “না, আমার ভয় হচ্ছে বে, না জানি হয়তো আমি আল্লাহ তা'আলার ‘আল্লাহ তোমাদেরকে যে সম্পদ দিয়েছেন তা হতে তোমরা তাদেরকে দান করবে এই নির্দেশকে ছেড়ে দেবো।” সুরাং এটা ছিল প্রথম কিস্তী যা ইসলামে আদায় করা হয়। এটা মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে।

বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবনে উমার (রাঃ) চুক্তিকৃত গোলামকে প্রথম কিস্তির সময় নিজেও কিছু দিতেন না এবং কিছু মাফও করতেন না, এই ভয়ে যে, সে হয়তো শেষ পর্যন্ত এই অর্থ আদায় করতে পারবে না, কাজেই তাঁর প্রদত্ত সাদকা তাঁকেই ফিরিয়ে দেয়া হবে। তবে শেষ কিস্তির সময় তিনি ইচ্ছামত মাফ করে দিতেন।

আল্লাহ পাক বলেনঃ তোমাদের দাসীরা সততা রক্ষা করতে চাইলে পার্থিব জীবনের ধন-লালসায় তাদেরকে ব্যভিচারিণী হতে বাধ্য করো না।

অজ্ঞতা যুগের জঘন্য পন্থাসমূহের মধ্যে একটি পন্থা এও ছিল যে, তাদের দাসীরা যেন ব্যভিচার করে অর্থ উপার্জন করতঃ ঐ অর্থ মনিবদেরকে প্রদান করে এ কাজে তারা তাদেরকে বাধ্য করতো। ইসলাম এসে এই কু-প্রথার বিলুপ্তি সাধন করে।

বর্ণিত আছে যে, এ আয়াতটি আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সাল্ল মুনাফিকের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। সে এ কাজই করতো। তার দাসীর নাম ছিল মুআযাহ। অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, তার নাম ছিল মুসাইকাহ। সে ইসলাম গ্রহণ করেছিল। ইসলাম গ্রহণের পর সে এ কাজে অস্বীকৃতি জানায়। অজ্ঞতার যুগে তার দ্বারা এ কাজ চলতো। এমনকি তার অবৈধ সন্তানাদিও জন্মগ্রহণ করে। কিন্তু ইসলাম গ্রহণের পর সে এ কাজ করতে অস্বীকার করে। তখন ঐ মুনাফিক তার উপর জোর জবরদস্তি করে। ঐ সময় এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

বর্ণিত আছে যে, বদরের এক কুরায়েশী বন্দী আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই-এর নিকট ছিল। সে তার দাসী মুআযার সাথে অবৈধভাবে মিলিত হতে চাচ্ছিল। কিন্তু মুআযা ইসলাম গ্রহণের কারণে এই অবৈধ কাজ হতে নিজেকে বাঁচিয়ে চলছিল। আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই-এরও ইচ্ছা ছিল যে, তার ঐ দাসীটি যেন ঐ কুরায়েশী বন্দীর সাথে অবৈধভাবে মিলিত হয়। এ ব্যাপারে সে তার উপর জোর জবরদস্তি ও মারপিট করতো। তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয়।. এটা মুসনাদে আবদির রাযযাকে বর্ণনা করা হয়েছে।

অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, মুনাফিকদের এই নেতা তার ঐ দাসীটিকে তার অতিথিদের সেবার কার্যে পাঠিয়ে দিতে। দাসীটির ইসলাম গ্রহণের পর তাকে আবার এই কাজে পাঠাবার ইচ্ছা করলে সে প্রকাশ্যভাবে অস্বীকার করে এবং হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ)-এর কাছে তার এ বিপদের কথা বর্ণনা করে। হযরত আবু বকর (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে এ খবর পৌছিয়ে দেন। রাসুলুল্লাহ (সঃ) তখন আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইকে নিষেধ করে দেন যে, সে যেন তার ঐ দাসীকে সেখানে না পাঠায়। ঐ মুনাফিক তখন জনগণের মধ্যে এই গুজব রটিয়ে দেয় যে, হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) তার দাসীকে ছিনিয়ে নিচ্ছেন। তার ঐ কথার প্রতিবাদে এই আসমানী হুকুম নাযিল হয়।

আর একটি বর্ণনায় আছে যে, মুসাইকাহ ও মুআযাহ এ দু'জন দু’ব্যক্তির দাসী ছিল। তারা তাদেরকে ব্যভিচারে বাধ্য করতো। ইসলাম গ্রহণের পর মুসাইকা এবং তার মাতা এসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এ ব্যাপারে অভিযোগ করে। তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয়।

এটা যে বলা হয়েছে যে, যদি এ দাসীরা সততা রক্ষা করার ইচ্ছা করে, এর দ্বারা ভাবার্থ এটা নেয়া চলবে না যে, যদি তাদের সততা রক্ষার ইচ্ছা না হয় তবে এতে কোন দোষ নেই। কেননা, ঐ সময় ঘটনা এটাই ছিল। এ জন্যেই এইরূপ বলা হয়েছে। এটা কোন সীমাবদ্ধতা ও শর্ত হিসেবে বলা হয়নি। এর দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য ছিল ধন-সম্পদ লাভ করা। আর এ দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য এটাও ছিল যে, তাদের সন্তান জন্মগ্রহণ করবে এবং ঐ সন্তানদেরকে তারা তাদের দাসদাসী হিসেবে ব্যবহার করবে। হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সিংগা লাগানোর মজরী, ব্যভিচারের মজুরী এবং গণকের মজুরী গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন।

অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, ব্যভিচারের খরচা, সিঙ্গা লাগানো দ্বারা উপার্জন এবং কুকুরের মূল্য কলুষতাপূর্ণ।

এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যে ব্যক্তি দাসীদেরকে ব্যভিচারিণী হতে বাধ্য করে, আল্লাহ ঐ দাসীদেরকে তাদের প্রতি জবরদস্তি করার কারণে ক্ষমা করে দিবেন। কিন্তু তাদের যে মনিবরা তাদের উপর জোর জবরদস্তি করেছে তাদেরকে তিনি কঠিনভাবে পাকড়াও করবেন। এই অবস্থায় তারাই গুনাহগার হবে। এমনকি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রঃ)-এর কিরআতে (আরবি) পরে (আরবি) এর রয়েছে। অর্থাৎ “ঐ দাসীদের গুনাহ পতিত হবে ঐ লোকেদের উপর যারা তাদেরকে বাধ্য করেছে।”

মারফু হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “অল্লিাহ তা'আলা আমার উম্মতের ভুল করা, ভুলে যাওয়া এবং যে কাজের উপর তাদেরকে বাধ্য করা হয়েছে এগুলো ক্ষমা করে দিয়েছেন।”
পরে।

মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি আমার পাক কালাম কুরআন কারীমের এই উজ্জ্বল ও সুস্পষ্ট আয়াত তোমাদের সামনে বর্ণনা করে দিয়েছি। পূর্ববর্তী লোকদের ঘটনাবলীও তোমাদের সামনে বিদ্যমান রয়েছে যে, সত্যের ঐ বিরুদ্ধাচরণকারীদের পরিণাম কি হয়েছে এবং কেমন হয়েছে! ওটাকে একটি কাহিনী বানিয়ে দেয়া হয়েছে। পরবর্তী লোকদের জন্যে ওটাকে একটা শিক্ষা ও উপদেশমূলক ঘটনা করে দেয়া হয়েছে। যাতে আল্লাহভীরু লোকেরা এর থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে এবং আল্লাহ তা'আলার বিরুদ্ধাচরণ হতে বেঁচে থাকে।

হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ “কুরআন কারীমে তোমাদের মতভেদের ফায়সালা বিদ্যমান রয়েছে। এতে রয়েছে তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেদের সংবাদ এবং পরে সংঘটিত হবে এরূপ বিষয়ের অবস্থার বর্ণনা। এগুলো বাজে কথা নয়। এগুলোকে যে বেপরোয়াভাবে ছেড়ে দিবে তাকে আল্লাহ তা'আলা ধ্বংস করবেন এবং যে এটা ছাড়া অন্য কিতাব খোজ করবে, আল্লাহ তাকে পথভ্রষ্ট করবেন।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।