সূরা আন-নূর (আয়াত: 30)
হরকত ছাড়া:
قل للمؤمنين يغضوا من أبصارهم ويحفظوا فروجهم ذلك أزكى لهم إن الله خبير بما يصنعون ﴿٣٠﴾
হরকত সহ:
قُلْ لِّلْمُؤْمِنِیْنَ یَغُضُّوْا مِنْ اَبْصَارِهِمْ وَ یَحْفَظُوْا فُرُوْجَهُمْ ؕ ذٰلِکَ اَزْکٰی لَهُمْ ؕ اِنَّ اللّٰهَ خَبِیْرٌۢ بِمَا یَصْنَعُوْنَ ﴿۳۰﴾
উচ্চারণ: কুল লিলমু’মিনীনা ইয়াগুদদূ মিন আবসা-রিহিম ওয়া ইয়াহফাজূ’ ফুরূজাহুম যালিকা আযকা-লাহুম ইন্নাল্লা-হা খাবীরুম বিমা ইয়াসনা‘ঊন।
আল বায়ান: মুমিন পুরুষদেরকে বল, তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখবে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করবে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র। নিশ্চয় তারা যা করে সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবহিত।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩০. মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাযত করে(১); এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র। তারা যা করে নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক অবহিত।
তাইসীরুল ক্বুরআন: মু’মিনদের বল তাদের দৃষ্টি অবনমিত করতে আর তাদের লজ্জাস্থান সংরক্ষণ করতে, এটাই তাদের জন্য বেশি পবিত্র, তারা যা কিছু করে সে সম্পর্কে আল্লাহ খুব ভালভাবেই অবগত।
আহসানুল বায়ান: (৩০) বিশ্বাসীদেরকে বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে[1] এবং তাদের যৌন অঙ্গকে সাবধানে সংযত রাখে;[2] এটিই তাদের জন্য অধিকতর পবিত্র। ওরা যা করে, নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে অবহিত।
মুজিবুর রহমান: মু’মিনদেরকে বলঃ তারা যেন দৃষ্টিকে সংযত করে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযাত করে। এতে তাদের জন্য উত্তম পবিত্রতা রয়েছে; তারা যা করে সেই বিষয়ে আল্লাহ অবহিত।
ফযলুর রহমান: মুমিনদেরকে বলবে, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং তাদের গুপ্তাঙ্গের হেফাজত করে। এটাই তাদের পবিত্র থাকার জন্য অধিকতর সহায়ক। তারা যা কিছু করে আল্লাহ সে সম্পর্কে অবহিত।
মুহিউদ্দিন খান: মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গর হেফাযত করে। এতে তাদের জন্য খুব পবিত্রতা আছে। নিশ্চয় তারা যা করে আল্লাহ তা অবহিত আছেন।
জহুরুল হক: তুমি মুমিন পুরুষদের বলো যে তারা তাদের দৃষ্টি অবনত করুক এবং তাদের আঙ্গিক কর্তব্যাবলীর হেফাজত করুক। এ তাদের জন্য পবিত্রতর। তারা যা করে আল্লাহ্ সে-বিষয়ে নিশ্চয়ই পূর্ণ ওয়াকিফহাল।
Sahih International: Tell the believing men to reduce [some] of their vision and guard their private parts. That is purer for them. Indeed, Allah is Acquainted with what they do.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৩০. মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাযত করে(১); এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র। তারা যা করে নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক অবহিত।
তাফসীর:
(১) যৌনাঙ্গ সংযত রাখার অর্থ অত্যন্ত ব্যাপক। নিম্নে তার কিছু উদাহরণ পেশ করা হলোঃ
* কুপ্রবৃত্তি চরিতাৰ্থ করার যত পন্থা আছে, সবগুলো থেকে যৌনাঙ্গকে সংযত রাখা। এতে ব্যভিচার, পুংমৈথুন, দুই নারীর পারস্পরিক ঘর্ষণ— যাতে কামভোব পূর্ণ হয় এবং হস্তমৈথুন ইত্যাদি সব অবৈধ কৰ্ম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। [দেখুন-সা’দী, ফাতহুল কাদীর] আয়াতের উদ্দেশ্য অবৈধ ও হারাম পন্থায় কাম প্রবৃত্তি চরিতার্থ করা এবং তার সমস্ত ভূমিকাকে নিষিদ্ধ করা। তন্মধ্যে কাম-প্রবৃত্তির প্রথম ও প্রারম্ভিক কারণ হচ্ছে- দৃষ্টিপাত করা ও দেখা এবং সর্বশেষ পরিণতি হচ্ছে ব্যভিচার। এ দু'টিকে স্পষ্টতঃ উল্লেখ করে হারাম করে দেয়া হয়েছে। এতদুভয়ের অন্তর্বর্তী হারাম ভূমিকাসমূহ- যেমন কথাবার্তা শোনা, স্পর্শ করা ইত্যাদি প্রসঙ্গক্রমে এগুলোর অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে।
ইবনে সীরীন রাহিমাহুল্লাহ আবিদা আস-সালমানী রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন যে, যা দ্বারা আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধাচরণ হয়, তাই কবীরা গোনাহ। কিন্তু আয়াতে তার দুই প্রান্ত- সূচনা ও পরিণতি উল্লেখ করা হয়েছে। সূচনা হচ্ছে চোখ তুলে দেখা এবং পরিণতি হচ্ছে ব্যভিচার। জারীর ইবন আব্দুল্লাহ বাজালী থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ “ইচ্ছা ছাড়াই হঠাৎ কোন বেগানা নারীর উপর দৃষ্টি পতিত হলে সেদিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নাও। [মুসলিমঃ ২১৫৯] আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসে আছে, ‘প্রথম দৃষ্টি মাফ এবং দ্বিতীয় দৃষ্টিপাত গোনাহ্। [আবু দাউদঃ ২১৪৯, তিরমিযীঃ ২৭৭৭, মুসনাদে আহমাদঃ ৫/৩৫১, ৩৫৭] এর উদ্দেশ্য এই যে, প্রথম দৃষ্টিপাত অকস্মাৎ ও অনিচ্ছাকৃত হওয়ার কারণে ক্ষমার্হ। নতুবা ইচ্ছাকৃতভাবে প্রথম দৃষ্টিপাতও ক্ষমার্হ নয়। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “আল্লাহ্ তা'আলা বনী আদমের উপর কিছু কিছু ব্যভিচার (যিনা) হবে জানিয়ে দিয়েছেন, তা অবশ্যই সংঘটিত হবে। চক্ষুর যিন হল তাকানো, ...। [বুখারীঃ ৬২৪৩, ৬৬১২, মুসলিমঃ ২৬৫৭]
* তদ্রূপ নিজের সতরকে অন্যের সামনে উন্মুক্ত করা থেকে দূরে থাকাও যৌনাঙ্গ সংযত করার পর্যায়ভুক্ত। [ফাতহুল কাদীর] পুরুষের জন্য সতর তথা লজ্জাস্থানের সীমানা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নাভী থেকে হাঁটু পর্যন্ত নির্ধারণ করেছেন। তিনি বলেছেনঃ “নাভী থেকে হাঁটু পর্যন্ত সতর।” [দারুকুতনীঃ ৯০২] শরীরের এ অংশ স্ত্রী ছাড়া আর কারোর সামনে ইচ্ছাকৃতভাবে খোলা হারাম। জারহাদে আল-আসলামী বৰ্ণনা করেছেন, একবার রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মজলিসে আমার রান খোলা অবস্থায় ছিল। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ “তুমি কি জানো না, রান ঢেকে রাখার জিনিস?” [তিরমিযী ২৭৯৬, আবু দাউদঃ ৪০১৪]
অন্য একটি হাদীসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ “নিজের স্ত্রী ও ক্রীতদাসী ছাড়া বাকি সবার থেকে নিজের সতরের হেফাজত করো।” এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করে, আর যখন আমরা একাকী থাকি? জবাব দেনঃ “এ অবস্থায় আল্লাহ থেকে লজ্জা করা উচিত, তিনিই এর হকদার।” [আবু দাউদঃ ৪০১৭, তিরমিযীঃ ২৭৬৯, ইবনে মাজহঃ ১৯২০]। অন্য হাদীসে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ “কোন লোক যেন অপর লোকের লজ্জাস্থানের দিকে না তাকায়, অনুরূপভাবে কোন মহিলা যেন অপর মহিলার লজ্জাস্থানের দিকে না তাকায় এবং কোন পুরুষ যেন অপর কোন পুরুষের সাথে একই কাপড়ে অবস্থান না করে, তদ্রুপ কোন মহিলাও যেন অপর মহিলার সাথে একই কাপড়ে অবস্থান না করে। [মুসলিমঃ ৩৩৮]
অপর এক হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা রাস্তায় বসা থেকে বেঁচে থাক। লোকেরা বললঃ আমরা এ ধরণের বসা থেকে বঁচতে পারি না; কেননা, সেখানে বসে আমরা কথাবার্তা বলে থাকি। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ যদি বসা ব্যতীত তোমার গত্যন্তর না থাকে তবে পথের হক আদায় করবে। তারা বললঃ পথের দাবী কি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ চক্ষু নত করা, কষ্টদায়ক বিষয় দূর করা, সালামের জবাব দেয়া, সৎকাজের আদেশ করা, অসৎকাজ থেকে নিষেধ করা। [বুখারীঃ ২৪৬৫, মুসলিমঃ ২১২১]
* অনুরূপভাবে দাড়ি-গোফ বিহীন বালকদের প্রতি ইচ্ছাকৃত দৃষ্টিপাত করাও অনুচিত। ইবনে কাসীর লিখেছেন- পূর্ববর্তী অনেক মনীষী শ্মশ্রুবিহীন বালকদের প্রতি আপলক নেত্ৰে তাকিয়ে থাকাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছেন এবং অনেক আলেমের মতে এটা হারাম।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৩০) বিশ্বাসীদেরকে বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে[1] এবং তাদের যৌন অঙ্গকে সাবধানে সংযত রাখে;[2] এটিই তাদের জন্য অধিকতর পবিত্র। ওরা যা করে, নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে অবহিত।
তাফসীর:
[1] যখন কোন ঘরে প্রবেশ করার জন্য অনুমতি গ্রহন আবশ্যক বলা হয়, তখন সেই সঙ্গে দৃষ্টি অবনত রাখারও আদেশ দেওয়া হল, যাতে বিশেষ করে অনুমতি গ্রহণকারীও নিজের দৃষ্টি সংযত করে।
[2] অর্থাৎ, অবৈধ ব্যবহার হতে তাকে হিফাযতে রাখে অথবা তাকে এমনভাবে গোপন রাখে, যাতে তার উপর অন্যের দৃষ্টি না পড়ে। এখানে এই উভয় অর্থই সঠিক। কেননা উভয়ই বাঞ্ছিত। পক্ষান্তরে দৃষ্টি সংযত রাখার কথা প্রথমে উল্লেখ হয়েছে এবং যৌনাঙ্গ হিফাযত করার কথা পরে উল্লেখ হয়েছে। কারণ দৃষ্টি-সংযমে শিথিলতাই যৌনাঙ্গ হিফাযত করার ব্যাপারে উদাসীনতার কারণ হয়।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৩০-৩১ নং আয়াতের তাফসীর:
অন্যের বাড়িতে প্রবেশের শিষ্টাচার বর্ণনা করার পর অত্র আয়াতদ্বয়ে মু’মিন নর-নারীর দৃষ্টি ও লজ্জাস্থান সম্পর্কে করণীয় কী সে সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে।
یَغُضُّوْا শব্দের অর্থ অবনত করা, নিচু করে রাখা, দৃষ্টি অবনত রাখার অর্থ হলন দৃষ্টিকে এমন বস্তু থেকে ফিরিযে নেয়া যা দেখা শরীয়ত নিষিদ্ধ ও অবৈধ করে দিয়েছে। (ইবনু কাসীর)
সুতরাং বেগানা নারীকে সরাসরি বা মিডিয়ার মাধ্যমে দেখা, কারো গুপ্তাঙ্গের দিকে দৃষ্টিপাত করা, কারো বাড়িতে উঁিক মারা এবং অশ্লীল দৃশ্যের দিকে দৃষ্টিপাত করা এতে শামিল। সাঈদ বিন আবূল হাসান হাসানকে বলেন: অনারবের মহিলারা বুক ও মাথা খুলে রাখে, তোমার দৃষ্টি তাদের থেকে ফিরিয়ে রাখবে। অতঃপর তিনি এ আয়াত তেলাওয়াত করলেন। (সহীহ বুখারী, কিতাবুল ইসতিযান, মুআল্লাক হাদীস)
জারীর বিন আবদুল্লাহ আল বাজালী (رضي الله عنه) বলেন: আমি নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে হঠাৎ দৃষ্টি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি আমাকে নির্দেশ দিলেন আমি যেন আমার দৃষ্টিকে ফিরিয়ে নেই। (সহীহ মুসলিম হা: ২১৫৯)
এমনকি এ দৃষ্টিপাত হতে বাঁচতে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবাদেরকে রাস্তায় বসা থেকেও নিষেধ করেছেন।
আবূ সাঈদ (رضي الله عنه) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: তোমরা রাস্তায় বসা থেকে বিরত থাক। তখন সাহাবারা বলল: হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! এটি ছাড়া তো আমাদের বসে কথা বলার জায়গা নেই। তখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: যদি তোমরা বাধ্যই হও তাহলে রাস্তার হক আদায় কর। সাহাবারা জিজ্ঞেস করল, রাস্তার হক কী? রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: দৃষ্টিকে অবনত রাখা, কষ্টদায়ক জিনিস সরানো, সালামের উত্তর দেয়া, সৎ কাজের আদেশ দেয়া, অসৎ কাজ হতে নিষেধ করা। (সহীহ বুখারী হা: ২৪৬৬, ৬২২৯, সহীহ মুসলিম হা: ১১৪)
নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আলী (رضي الله عنه)-কে বললেন: একবার দৃষ্টি চলে গেলে পুনরায় দৃষ্টিপাত করবে না, কারণ প্রথমবার দৃষ্টিপাত ক্ষমা করা হবে, কিন্তু দ্বিতীয়বার দৃষ্টি তোমার নয় (শয়তানের পক্ষ থেকে হয় সেজন্য তোমাকে পাকড়াও করা হবে)। (তিরমিযী হা: ২৭৭৭, আবূ দাঊদ হা: ২১৪৯, হাসান)
দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ দেয়ার পর আল্লাহ তা‘আলা লজ্জাস্থানের হেফাযতের নির্দেশ দিচ্ছেন। কারণ অধিকাংশ সময় লজ্জাস্থানের খিয়ানত হয় দৃষ্টির খেয়ানতের কারণে। সুতরাং দৃষ্টি সংযত করার সাথে লজ্জাস্থান হেফাযত করতে হবে। অর্থাৎ নিজ স্ত্রী ও অধিকারভুক্ত দাসী ব্যতীত অন্যের সাথে যৌন চাহিদা নিবারণ করাই হল লজ্জাস্থানের খিয়ানত করা। তা নারীর সাথে হোক বা পুরুষের সাথে হোক অথবা অন্য যে কোন কিছুর সাথে হোক না কেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَالَّذِيْنَ هُمْ لِفُرُوْجِهِمْ حٰفِظُوْنَ - إِلَّا عَلٰٓي أَزْوَاجِهِمْ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُمْ فَإِنَّهُمْ غَيْرُ مَلُوْمِيْنَ)
“এবং যারা নিজেদের লজ্জাস্থানকে হেফাযত করেন তাদের স্ত্রী অথবা অধিকারভুক্ত দাসীদের ক্ষেত্র ব্যতীত, এতে তারা নিন্দনীয় হবে না।” (সূরা মা‘আরিজ ৭০:২৯-৩০)
আবূ হুরাইরাহ (رضي الله عنه) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: বানী আদমের ওপর যিনার একটি অংশ লিখে দেয়া হয়েছে। এটি অবশ্যই তাকে পেয়ে বসবে। দুই চোখের যিনা হল দেখা, জিহ্বার যিনা হল কথা বলা, দু’ কানের যিনা হল শ্রবণ করা, দু’ হাতের যিনা হল ধরা, দু’ পায়ের যিনা হল হেঁটে যাওয়া, অন্তর তার আকাক্সক্ষা করবে এবং চাইবে। আর লজ্জাস্থান হয় এটিকে সত্য প্রমাণিত করবে, না হয় মিথ্যা প্রমাণিত করবে। (সহীহ বুখারী হা: ৩২৪৩, ৬৬১২)
এরপর আল্লাহ তা‘আলা পুরুষদেরকে সতর্ক করার পাশাপাশি নারীদেরকেও সতর্ক করছেন। অথচ আমরা জানি কুরআন যেখানে পুরুষদেরকে সম্বোধন করে নির্দেশ দিয়েছে সেখানে নারীরাও শামিল। তারপরেও এখানে নারীদেরকে আলাদাভাবে উল্লেখ করার কারণ হল বিষয়টির প্রতি গুরুত্বারোপ করা এবং তাদেরকেও বিশেষ সতর্ক করা। কারণ শুধু পুরুষেরাই দৃষ্টি সংযত করলে এবং লজ্জাস্থান হেফাযত করলে হবে না, সাথে সাথে নারীদেরকেও করতে হবে। অন্যথায় সমাজ থেকে অনাচার, ব্যভিচার ও অশ্লীলতা দূর করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে সমাজে অন্যায়, অশ্লীলতা ও বেহায়াপনা বিস্তারে নারীদের ভূমিকা অগ্রণী। কারণ আজ আধুনিকতার নামে নারীরা অবাধ মেলামেশা, অশ্লীল পোশাক পরিধান করে বাহিরে চলা ফেরা করা, চলচ্চিত্রের নামে দেহ ব্যবসা ও যুবকদেরকে খারাপ কাজে প্ররোচিত করা ইদ্যাদির মাধ্যমে নিজেদের লজ্জাস্থানের খিয়ানত করছে। যেখানে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
أَيُّمَا امْرَأَةٍ اسْتَعْطَرَتْ فَمَرَّتْ عَلَي قَوْمٍ لِيَجِدُوا مِنْ رِيحِهَا فَهِيَ زَانِيَةٌ
যে নারী আতর ব্যবহার করে কোন জাতির পাশ দিয়ে অতিক্রম করে যাতে তারা সুগদ্ধি পায় তাহলে সে নারী ব্যভিচারিণী। (নাসায়ী হা: ৫১২৬, তিরমিযী হা: ২৭৮৬, হাসান) সেখানে যারা এভাবে অর্ধ-উলঙ্গ হয়ে বের হয় তাদের কী অবস্থা হবে?
فُرُوْجَهُنَّ
নারীদের লজ্জাস্থান আপদমস্তক তথা সারা শরীর। একজন নারী বাইরে বের হলে সারা শরীক ঢেকে বের হবে এবং এমনভাবে ঢাকবে যাতে শরীরের উচু-নিঁচু অঙ্গের তারতম্য বুঝা না যায়। সুতরাং নারীরাও পর পুরুষ হতে নিজেদের দৃষ্টি সংযত রাখবে এবং লজ্জাস্থানকে হেফাযত করবে।
(وَلَا يُبْدِيْنَ زِيْنَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا)
‘তারা যেন যা সাধারণত প্রকাশ থাকে তা ব্যতীত তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে’ -সাধারণত প্রকাশ থাকে কোন্ সৌন্দর্য যা পর্দা করা সম্ভব নয়; এ ব্যাপারে আলেমদের তিনটি মত রয়েছে:
১. নারীদের শরীরের অন্তর্গত সৌন্দর্য, যেমন হাতের তালু ও চেহারা। এগুলো সাধারণত প্রকাশ পেয়ে যায়, ঢেকে রাখা সম্ভব হয় না। যেমন সালাত আদায় করতে গেলে, হজ্জ করতে গেলে, কারো সাথে কিছু আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে প্রকাশ পায়। এতটুকু পরিমাণ নারীর শরীর থেকে প্রকাশ পেয়ে গেলে গুনাহ হবে না। এ পক্ষে মত দিয়েছেন ইমাম কুরতুবী, যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস নাসিরুদ্দীন আলবানী (رحمه الله)। আয়িশাহ (رضي الله عنها) হতে বর্ণিত, আসমা বিনতে আবূ বকর (رضي الله عنها) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট প্রবেশ করলেন, এমনবস্থায় তার গায়ে পাতলা পোশাক ছিল। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন এবং তাকে বললেন: হে আসমা! একজন নারী যখন প্রাপ্তবয়স্ক হয় তখন তার থেকে এরূপ বেশি দেখা বৈধ নয়। এ কথা বলে তিনি চেহারা ও দুই হাতের তালুর দিকে ইশারা করলেন। (আবূ দাঊদ হা: ৪১০৪, মিশকাত হা: ৪৩৭২, হাসান)
২. বাইরের সৌন্দর্য যা শরীরের অঙ্গ নয়, এ সৌন্দর্য প্রকাশ পেলে শরীরের প্রতি দৃষ্টি যাবে না। যেমনন ইবনু মাসউদ (رضي الله عنه) বলেন: মহিলাদের গায়ের সব পোশাকের ওপর যে কাপড় থাকে বা চাদর। ইমাম শানকিত্বী (رحمه الله) বলেন; আমাদের কাছে এ কথাই বেশি প্রাধান্যযোগ্য এবং সংশয় ও ফেতনা থেকে অধিক সতর্কতা।
৩. শরীরের সাথে সম্পৃক্ত এমন বহিরাগত সৌন্দর্য, কিন্তু এ সৌন্দর্য প্রকাশ পেলে শরীরের অঙ্গ দেখা যাবে। যেমন মেহেদী. সুরমা ও অনুরূপ।
(وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلٰي جُيُوْبِهِنَّ)
‘তাদের ঘাড় ও বক্ষদেশ যেন মাথার কাপড় দ্বারা আবৃত করে’ যাতে মাথা, ঘাড়, গলা ও বুকের পর্দা হয়ে যায়। কারণ এ সমস্ত অঙ্গ খুলে রাখার অনুমতি নেই। সুতরাং যে সকল নারীরা বুকে, মাথায় কাপড় না দিয়ে বের হয় তাদের সতর্ক হওয়া উচিত। সূরা আহযাবের ৫৯ নং আয়াতে এ ব্যাপারে আলোচনা রয়েছে।
আয়িশাহ (رضي الله عنها) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: আল্লাহ তা‘আলা ঐ সকল স্ত্রীলোকদের ওপর রহম করুন যারা প্রথমে হিজরত করেছিল। যখন এ আয়াত নাযিল হয় তখন তারা নিজেদের চাদর ফেড়ে দোপাট্টা বানিয়েছিল। (সহীহ বুখারী হা: ৪৭৫৮)
(وَلَا يُبْدِيْنَ زِيْنَتَهُنَّ إِلَّا لِبُعُوْلَتِهِنَّ)
অর্থাৎ বেগানা পুরুষের সামনে যে সৌন্দর্য প্রকাশ করা নিষিদ্ধ ছিল ততটুকু পরিমাণ সৌন্দর্য আয়াতে উল্লিখিত ব্যক্তিদের সামনে প্রকাশ করতে পারবে। অর্থাৎ হাত, পা, চেহারা সাধারণত উক্ত ব্যক্তিদের সামনে খুলে রাখা যাবে। তবে স্বামীর কথা ভিন্ন। কারণ স্বামীর সাথে কোনরূপ পর্দা নেই। যেভাবে ইচ্ছা চলাফেরা করতে পারবে।
পিতা বলতে পিতা ও তার ওপরে দাদা এবং আরো যারা রয়েছে, শ্বশুর বলতে শ্বশুর ও তার ওপরে শ্বশুরের পিতা এবং আরো যারা রয়েছে। ছেলে বলতে নিজ ছেলে ও নাতি-নাতনীসহ আরো নিচে যারা রয়েছে। স্বামীর পুত্র বলতে অন্য স্ত্রীর গর্ভজাত বেটা ও তার নিচে যারা রয়েছে। ভাই বলতে সহোদর, বৈমাত্রিয় ও বৈপিত্রেয় তিন প্রকার ভাই বুঝানো হয়েছে।
نِسَا۬ئِهِنَّ তাদের নারী বলতে মুসলিম নারীদেরকে বুঝানো হয়েছে যাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে যে, তারা যেন কোন মহিলার শোভা-সৌন্দর্য, রূপ-লাবণ্য, দৈহিক আকার-আকৃতি নিজেদের স্বামীর কাছে বর্ণনা না করে। (সহীহ বুখারী হা: ৫২৪০) এছাড়া যে কোন কাফির মহিলার সামনে সৌন্দর্য প্রকাশ করা নিষেধ।
ইমাম আহমাদ (رحمه الله)-সহ অনেকে এমত দিয়েছেন। কেউ বলেছেন: তাদের নারীগণ বলতে যারা তাদের খিদমতে বা বাড়ির কাজ করে থাকে।
(مَا مَلَكَتْ أَيْمٰنُهُنَّ)
অর্থাৎ মুসলিম ও আহলে কিতাবের কৃতদাস-দাসী উভয়েই শামিল। একদা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ফাতিমা -এর বাড়িতে একজন গোলাম নিয়ে আসলেন যে নিজেকে ফাতিমার জন্য হেবা করে দিয়েছে। সে সময় ফাতিমার কাপড়ের এমন অবস্থা ছিল যে মাথা ঢাকলে পা খুলে যায়, আর পা ঢাকলে মাথা খুলে যায়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: কোন সমস্যা নেই, এখানে আমি তোমার পিতা ও তোমার গোলাম। (আবূ দাঊদ হা: ৪১০৬, ইরওয়া হা: ১৭৯৯, সহীহ)
(التّٰبِعِيْنَ غَيْرِ أُولِي الْإِرْبَةِ مِنَ الرِّجَالِ) الْإِرْبَةُ-
যৌন চাহিদা, অর্থাৎ যে সকল পুরুষের যৌন চাহিদা নেই তা অতি বৃদ্ধ হওয়ার কারণে হোক আর অন্য যেকোন কারণেই হোক, আবার কেউ বলেছেন তারা হল হিজড়া, তবে যারাই হোক তাদের যদি যৌন কামনা না থাকে এবং অন্যের কাছে পরনারীর সৌন্দর্যের কথা বলে না বেড়ায় তাহলে উক্ত পরিমাণ সৌন্দর্য প্রকাশ করা যাবে। অন্যথায় তাও নিষিদ্ধ। (সহীহ বুখারী হা: ৪৩২৪, সহীহ মুসলিম হা: ২১৮০)
الطِّفْلِ অর্থাৎ যারা সাবালক হয়নি বা নারী সংক্রান্ত জ্ঞান হয়নি।
(وَلَا يَضْرِبْنَ بِأَرْجُلِهِنَّ)
অর্থাৎ এমনভাবে চলাফেরা করবে না যাতে গোপন সৌন্দর্য মানুষ জেনে যায়। যেমন পায়ে নূপুর পরে শব্দ করে চলা।
নারী পুরুষের সম্মান, সম্ভ্রম ও মর্যাদা সংরক্ষণের এ দিক-নির্দেশনা দেয়ার পর আল্লাহ তা‘আলা সকলকে তাওবাহ করার নির্দেশ দিচ্ছেন। কারণ পূর্বে এ সংক্রান্ত যত অপরাধ রয়েছে, তাওবাহ করলে আল্লাহ তা‘আলা সেসবকে ক্ষমা করে দেবেন, ফলে তোমরা সফলকাম হবে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. নারী-পুরুষ সকলকে দৃষ্টি সংযত রাখতে হবে।
২. হারাম কোন কিছুর প্রতি দৃষ্টি গেলে সাথে সাথে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতে হবে।
৩. লজ্জাস্থানের হিফাযত করতে হবে।
৪. মহিলাদেরকে তাদের বক্ষদেশসহ আপাদমস্তক ভালভাবে ঢেকে চলাফেরা করতে হবে।
৫. আয়াতে যে সকল পুরুষের কথা বলা হয়েছে এরা ব্যতীত অন্যদের সাথে দেখা করা হারাম।
৬. সৌন্দর্য প্রকাশ করণার্থে জোরে জোরে পদক্ষেপ করা যাবে না।
৭. বিধর্মী মহিলাদের নিকট সৌন্দর্য প্রকাশ করা যাবে না।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিচ্ছেনঃ যেগুলোর প্রতি দৃষ্টিপাত করা আমি হারাম করেছি ওগুলোর প্রতি দৃষ্টিপাত করো না। হারাম জিনিস হতে চক্ষু নীচু করে নাও। যদি আকস্মিকভাবে দৃষ্টি পড়েই যায় তবে দ্বিতীয়বার আর দৃষ্টি ফেলো না।
হযরত জারীর ইবনে আবদিল্লাহ বাজালী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে হঠাৎ দৃষ্টি পড়ে যাওয়ার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ “সাথে সাথেই দৃষ্টি সরিয়ে নেবে।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) তার সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন) দৃষ্টি নিম্নমুখী করা, এদিক ওদিক দেখতে শুরু না করা, আল্লাহর হারামকত জিনিসগুলোকে না দেখা এই আয়াতের উদ্দেশ্য।
হযরত বুরাইদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আলী (রাঃ)-কে বলেনঃ “হে আলী (রাঃ)! দৃষ্টির উপর দৃষ্টি ফেলো না। হঠাৎ যে দৃষ্টি পড়ে ওটা তোমার জন্যে ক্ষমার্হ, কিন্তু পরবর্তী দৃষ্টি তোমার জন্যে ক্ষমার যোগ্য নয়।” (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
সহীহ হাদীসে হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “পথের উপর বসা হতে তোমরা বেঁচে থাকো।” সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কাজ কর্মের জন্যে এটা তো জরুরী?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “আচ্ছা, তাহলে পথের হক আদায় কর।` সাহাবীগণ আবার জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! পথের হক কি?” জবাবে তিনি বললেনঃ “দৃষ্টি নিম্নমুখী করা, কাউকেও কষ্ট না দেয়া, সালামের উত্তর দেয়া, ভাল কাজের আদেশ করা এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখা।`
হযরত আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “তোমরা ছ’টি জিনিসের দায়িত্ব নিয়ে যাও, তাহলে আমি তোমাদের জন্যে জান্নাতের দায়িত্ব নিচ্ছি। ছ'টি জিনিস হলোঃ কথা বলার সময় মিথ্যা বলো না, আমানতের খিয়ানত করো না, ওয়াদা ভঙ্গ করো না, দৃষ্টি নিম্নমুখী রাখবে, হাতকে যুলুম করা হতে বাঁচিয়ে রাখবে এবং নিজেদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করবে। (এ হাদীসটি আবুল কাসেম আল বাগাভী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি তার জিহ্বা ও লজ্জাস্থানের (রক্ষার) দায়িত্ব নেবে, আমি তার জন্যে জান্নাতের দায়িত্ব নেবো।` (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
হযরত উবাইদাহ (রাঃ) বলেন যে, যে কাজের পরিণাম হলো আল্লাহ তা'আলার অবাধ্যতা ওটাই কবীরা গুনাহ।
দৃষ্টি পড়ার পর অন্তরে ফাসাদ সৃষ্টি হয় বলেই লজ্জাস্থানকে রক্ষা করার জন্যে দৃষ্টি নিম্নমুখী রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। দৃষ্টিও ইবলীসের তীরসমূহের মধ্যে একটি তীর। সুতরাং ব্যভিচার হতে বেঁচে থাকা জরুরী এবং দৃষ্টিকে নিম্নমুখী রাখাও জরুরী। যেমন হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “নিজের লজ্জাস্থানের হিফাযত কর, তোমার পত্নী অথবী অধিকারভুক্ত দাসী ছাড়া (সবারই সংস্পর্শ থেকে)।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদ ও সুনান গ্রন্থে বর্ণিত আছে)
মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ এটাই তাদের জন্যে উত্তম। অর্থাৎ তাদের অন্তর পবিত্র রাখার ব্যাপারে এটাই উত্তম পন্থা। যেমন বলা হয়েছেঃ যে ব্যক্তি স্বীয় দৃষ্টিকে হারাম জিনিসের উপর নিক্ষেপ করে না, আল্লাহ তার চক্ষু জ্যোতির্ময় করে তোলেন এবং তার অন্তরও আলোকময় করে দেন।
হযরত আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যার দৃষ্টি কোন স্ত্রীলোকের সৌন্দর্যের প্রতি পতিত হয়, অতঃপর দৃষ্টি সরিয়ে নেয়, আল্লাহ তা'আলা এর বিনিময়ে তাকে এমন এক ইবাদত দান করেন যার মজা বা স্বাদ সে তার অন্তরেই উপভোগ করে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) (এ হাদীসের সনদগুলো দুর্বল বটে কিন্তু এটা উৎসাহ প্রদানের হাদীস। এসব হাদীসের সনদের প্রতি তেমন বেশী লক্ষ্য রাখা হয় না)
হযরত আবু উমামা (রাঃ) হতে মারফু’রূপে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হয় তোমরা তোমাদের দৃষ্টি নিম্নমুখী রাখবে, নিজেদের যৌন অঙ্গকে সংযত রাখবে এবং মুখমণ্ডলকে সোজা রাখবে, না হয় আল্লাহ তোমাদের চেহারা বদলিয়ে দিবেন।” (এ হাদীসটি তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দৃষ্টি শয়তানী তীরসমূহের মধ্যে একটি তীর। যে ব্যক্তি আল্লাহর ভয়ে নিজের দৃষ্টিকে সংযত রাখে, আল্লাহ তার অন্তরে এমন ঈমানের জ্যোতি সৃষ্টি করে দেন যে, সে ওর মজা উপভোগ করে থাকে।” (এ হাদীসটিও ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
আল্লাহ পাক বলেনঃ তারা যা করে আল্লাহ সে বিষয়ে অবহিত। তাদের কোন কাজ তাঁর কাছে গোপন নেই। তিনি চোখের খিয়ানত এবং অন্তরের গোপন রহস্যের খবরও রাখেন।
সহীহ হাদীসে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ইবনে আদমের যিম্মায় ব্যভিচারের অংশ লিখে দেয়া হয়েছে, সে অবশ্যই তা পাবে। চোখের ব্যভিচার হলো দেখা, মুখের ব্যভিচার বলা, কানের ব্যভিচার শুনা, হাতের ব্যভিচার ধরা এবং পায়ের ব্যভিচার চলা। অন্তর কামনা ও বাসনা রাখে। অতঃপর যৌন অঙ্গ এ সবগুলোক সত্যবাদী করে অথবা সবগুলোকে মিথ্যাবাদী বানিয়ে দেয়। (ইমাম বুখারী (রঃ) এ হাদীসটি তা’লীকরূপে বর্ণনা করেছেন) পূর্বযুগীয় অনেক মনীষী বালকদের ঘোরা ফেরাকেও নিষেধ করতেন। সুফী ইমামদের অনেকেই এই ব্যাপারে বহু কিছু কঠোরতা করেছেন। আহলে ইলম এটাকে সাধারণভাবে হারাম বলেছেন। আর কেউ কেউ এটাকে কবীরা গুনাহ বলেছেন।
হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন প্রত্যেক চোখই কাঁদবে, শুধুমাত্র ঐ চোখ কাঁদবে না যেই চোখ আল্লাহ তা'আলার হারামকৃত জিনিস না দেখে বন্ধ থেকেছে, আর ঐ চোখ যা আল্লাহর পথে জেগে থেকেছে এবং ঐ চোখ যা আল্লাহর ভয়ে কেঁদেছে, যদিও এ চোখের অশ্রু মাছির মাথার সমানও হয়।” (এ হাদীসটি ইবনে আবিদ দুনিয়া (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।