সূরা আন-নূর (আয়াত: 23)
হরকত ছাড়া:
إن الذين يرمون المحصنات الغافلات المؤمنات لعنوا في الدنيا والآخرة ولهم عذاب عظيم ﴿٢٣﴾
হরকত সহ:
اِنَّ الَّذِیْنَ یَرْمُوْنَ الْمُحْصَنٰتِ الْغٰفِلٰتِ الْمُؤْمِنٰتِ لُعِنُوْا فِی الدُّنْیَا وَ الْاٰخِرَۃِ ۪ وَ لَهُمْ عَذَابٌ عَظِیْمٌ ﴿ۙ۲۳﴾
উচ্চারণ: ইন্নাল্লাযীনা ইয়ারমূনাল মুহসানা-তিল গা-ফিলা-তিল মু’মিনা-তি লু‘ইনূফিদদুনইয়া-ওয়াল আ-খিরাতি ওয়া লাহুম ‘আযা-বুন ‘আজীম।
আল বায়ান: যারা সচ্চরিত্রা সরলমনা মুমিন নারীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারা দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশপ্ত। আর তাদের জন্য রয়েছে মহাআযাব।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২৩. যারা সচ্চরিত্রা, সরলমনা-নির্মলচিত্ত, ঈমানদার নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে(১) তারা তো দুনিয়া ও আখেরাতে অভিশপ্ত এবং তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।(২)
তাইসীরুল ক্বুরআন: যারা সতী-সাধ্বী, সহজ-সরল ঈমানদার নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারা দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশপ্ত আর তাদের জন্য আছে গুরুতর শাস্তি।
আহসানুল বায়ান: (২৩) যারা সাধ্বী, নিরীহ ও বিশ্বাসী নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারা ইহলোক ও পরলোকে অভিশপ্ত এবং তাদের জন্য আছে মহাশাস্তি। [1]
মুজিবুর রহমান: যারা সাধ্বী, সরলমনা ও বিশ্বাসী নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে তারা দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশপ্ত এবং তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।
ফযলুর রহমান: যারা সতী অমনোযোগী (সরলমনা) ঈমানদার নারীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করে তারা এ দুনিয়ায় এবং পরকালে অভিশপ্ত। তাদের জন্য কঠোর শাস্তি রয়েছে।
মুহিউদ্দিন খান: যারা সতী-সাধ্বী, নিরীহ ঈমানদার নারীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারা ইহকালে ও পরকালে ধিকৃত এবং তাদের জন্যে রয়েছে গুরুতর শাস্তি।
জহুরুল হক: নিঃসন্দেহ যারা সতী-সাধ্বী, নিরীহ, বিশ্বাসিনী নারীকে অপবাদ দেয় তাদের ইহলোকে ও পরলোকে অভিশাপ দেওয়া হবে, আর তাদের জন্য রইবে কঠোর শাস্তি, --
Sahih International: Indeed, those who [falsely] accuse chaste, unaware and believing women are cursed in this world and the Hereafter; and they will have a great punishment
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ২৩. যারা সচ্চরিত্রা, সরলমনা-নির্মলচিত্ত, ঈমানদার নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে(১) তারা তো দুনিয়া ও আখেরাতে অভিশপ্ত এবং তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।(২)
তাফসীর:
(১) মূলে (গাফেলাত) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে, সরলমনা ও ভদ্র মহিলারা, যারা ছল-চাতুরী জানে না, যাদের মন নির্মল,কলুষমুক্ত ও পাক-পবিত্র, যারা অসভ্যতা ও অশ্লীল আচরণ কি ও কিভাবে করতে হয় তা জানে না এবং কেউ তাদের বিরুদ্ধে অপবাদ দেবে একথা যারা কোনদিন কল্পনাও করতে পারে না। হাদীসে বলা হয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, নিষ্কলুষ মহিলাদের বিরুদ্ধে অপবাদ দেয়া সাতটি সর্বনাশা কবীরাহ গোনাহের অন্তর্ভুক্ত। [দেখুন: বুখারীঃ ২৭৬৬, মুসলিমঃ ৮৯]
(২) আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহার এমন কতিপয় বৈশিষ্ট্য আছে, যেগুলো অন্য কোন মহিলার ভাগ্যে জোটেনি। তিনি নিজেও আল্লাহর নেয়ামত প্ৰকাশার্থে এসব বিষয় গর্বভরে বর্ণনা করতেন।
প্রথম- হাদীসে এসেছে, আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে বিয়ে হওয়ার পূর্বে ফিরিশতা জিবরীল আলাইহিস সালাম একটি রেশমী কাপড়ে আমার ছবি নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আগমন করেন এবং বলেনঃ এ আপনার স্ত্রী। তিরমিযী: ৩৮৮০]
দ্বিতীয়- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ছাড়া কোন কুমারী বালিকাকে বিয়ে করেননি।
তৃতীয়- তার কোলে মাথা রেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তেকাল করেন।
চতুর্থ-আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার গৃহেই তিনি সমাধিস্থ হন।
পঞ্চম- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট তখনো ওহী নাযিল হত, যখন তিনি আয়েশার সাথে একই লেপের নীচে শায়িত থাকতেন। অন্য কোন স্ত্রীর এরূপ বৈশিষ্ট্য ছিল না। [তিরমিযীঃ ৩৮৭৯]
ষষ্ট- আসমান থেকে তার নির্দোষিতার বিষয় নাযিল হয়েছে।
সপ্তম- তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খলীফার কন্যা এবং সিদ্দীকা ছিলেন। আল্লাহ্ তা'আলা যাদেরকে দুনিয়াতেই ক্ষমা ও সম্মানজনক জীবিকার ওয়াদা দিয়েছেন, তিনি তাদেরও অন্যতমা।
অষ্টম- সাহাবাগণ কোন ব্যাপারে সমস্যায় পড়ে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার কাছে আসলে তার কাছে কোন না কোন ইলম পেতেন।
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার ফকীহ ও পণ্ডিতসুলভ জ্ঞানানুসন্ধান এবং বিজ্ঞজনোচিত বক্তব্য দেখে মূসা ইবনে তালহা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেনঃ আমি আয়েশা সিদ্দীকা রাদিয়াল্লাহু আনহার চাইতে অধিক শুদ্ধভাষী ও প্রাঞ্জলভাষী কাউকে দেখিনি। [তিরমিযীঃ ৩৮৮৪] কোন কোন মুফাস্সির বলেনঃ ইউসুফ 'আলাইহিস সালামের প্রতি অপবাদ আরোপ করা হলে আল্লাহ তা'আলা একটি কচি শিশুকে বাকশক্তি দান করে ওর সাক্ষ্য দ্বারা তার দোষমুক্ততা প্রকাশ করেন। মারইয়ামের প্রতি অপবাদ আরোপ করা হলে আল্লাহ্ তা'আলা তার শিশু পুত্ৰ ঈসা ‘আলাইহিস সালামের সাক্ষ্য দ্বারা তাকে দোষমুক্ত করেন। আয়েশা সিদ্দীকা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহার প্রতি অপবাদ আরোপ করা হলে আল্লাহ্ তা'আলা কুরআনের দশটি আয়াত নাযিল করে তার দোষমুক্ততা ঘোষণা করেন, যা তার গুণ ও জ্ঞানগরিমাকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (২৩) যারা সাধ্বী, নিরীহ ও বিশ্বাসী নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারা ইহলোক ও পরলোকে অভিশপ্ত এবং তাদের জন্য আছে মহাশাস্তি। [1]
তাফসীর:
[1] কিছু মুফাসসির মনে করেন যে, এই আয়াতে বিশেষ করে আয়েশা (রাঃ) ও নবী (সাঃ)-এর অন্যান্য পবিত্রা স্ত্রীদের উপর অপবাদ দেওয়ার শাস্তির কথা বলা হয়েছে। আর তা হল এই যে, তাদের তওবার সুযোগ নেই। পক্ষান্তরে অন্য কিছু মুফাসসিরগণ এটিকে সকল মু’মিন মহিলাদের জন্য ব্যাপক বলে ব্যক্ত করেছেন। আর তাতে অপবাদ আরোপের সেই শাস্তির কথাই বলা হয়েছে, যা পূর্বে বলা হয়েছে। যদি অপবাদ আরোপকারী মুসলিম হয়, তাহলে তার অভিশপ্ত হওয়ার অর্থ হবে, সে দুনিয়াতে শাস্তিযোগ্য ও মুসলিমদের ঘৃণার পাত্র এবং তাদের সমাজ হতে দূরে থাকার যোগ্য। আর যদি অমুসলিম হয়, তাহলে এর অর্থ স্পষ্ট যে, সে দুনিয়া ও আখেরাতে আল্লাহর রহমত হতে বিতাড়িত ও বঞ্চিত।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১১-২৫ নং আয়াতের তাফসীর:
শানে নুযূল:
আয়িশাহ (رضي الله عنها) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর অভ্যাস ছিল যে, সফরে যাওয়ার সময় তিনি তাঁর স্ত্রীদের নামে লটারী করতেন। লটারীতে যার নাম উঠতো তাকে তিনি সাথে নিয়ে যেতেন। ঘটনাক্রমে তাঁর এক যুদ্ধে গমনের সময় লটারীতে আমার নাম উঠে আসে। আমি তাঁর সাথে গমন করি। আর এটা ছিল পর্দার বিধান অবতীর্ণ হওয়ার পরের ঘটনা। আমি আমার হাওদাতে বসে থাকতাম। যখন যাত্রীদল কোন জায়গায় নামতো তখন আমার হাওদা নামিয়ে নেয়া হত। আমি হাওদার মধ্যেই বসে তাকতাম। আবার যখন কাফেলা চলতে শুরু করত তখন আমার হাওদাও উটের ওপর উঠিয়ে দেয়া হত।
এভাবে আমরা গন্তব্যস্থলে পৌঁছে যাই। যুদ্ধ শেষে আমরা মদীনায় ফিরতে শুরু করি। আমরা মদীনার নিকটবর্তী হলে রাতে গমনের ঘোষণা দেয়া হয়। আমি প্রাকৃতিক প্রয়োজন পুরণের উদ্দেশ্যে বের হয়ে পড়ি এবং সেনা বাহিনীর তাঁবু থেকে বহু দূরে চলে যাই। প্রয়োজন পুরো করে আমি ফিরে এসে গলায় হাত দিয়ে দেখি যে, গলায় হার নেই। তখন হার খুঁজতে পুনরায় সেখানে যাই। আর তখন সেনাবাহিনী যাত্রা শুরু করে দিল। যে লোকগুলো আমার হাওদা উঠিয়ে দিত তারা মনে করল যে, আমি ঐ হাওদার মধ্যেই আছি, তাই তারা আমার হাওদাটি উটের পিঠে উঠিয়ে দিল এবং চলতে শুরু করল। ঐসময় পর্যন্ত স্ত্রীলোকেরা বেশি পানাহার করত না, ফলে তাদের দেহ বেশি ভারী হতো না। তাই আমাকে বহনকারীরা হাওদার মধ্যে আমার থাকা না থাকার কোন টেরই পেল না। তাছাড়া আমি ছিলাম ঐ সময় খুবই অল্প বয়সের মেয়ে। দীর্ঘক্ষণ পর আমি আমার হারানো হারটি খুঁজে পেলাম। সেনাবাহিনীর বিশ্রামস্থলে পৌঁছে সেখানে কাউকে পেলাম না। আমি যেখানে আমার উটটি ছিল সেস্থানে পৌঁছলাম। সেখানে আমি এ অপেক্ষায় বসে পড়লাম যে, সেনাবাহিনী সামনে অগ্রসর হয়ে যখন আমার না থাকার খবর জানবে তখন অবশ্যই এখানে লোক পাঠাবে। এমতাবস্থায় আমি ঘুমিয়ে পড়ি। আর সফওয়ান বিন মুআত্তাল আস-সুলামী আয-যাকওয়ানী যিনি সেনাবাহিনীর পিছনে ছিলেন এবং শেষ রাত্রে চলতে শুরু করলেন সকালে এখানে পৌঁছেন। তিনি একজন ঘুমন্ত মানুষকে দেখতে পেয়ে আমার নিকট আসলেন এবং আমাকে দেখে চিনতে পারলেন। তার
(إِنَّالِلّٰهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُوْنَ)
শব্দ শুনে আমি ঘুম থেকে জেগে উঠে নিজেকে চাদর দ্বারা সামলিয়ে নেই। তৎক্ষণাৎ তিনি তার উটটি বসিয়ে দেন এবং ওর হাতের ওপর নিজের পা রেখে সওয়ারীর ওপর আরোহণ করি। তিনি উটকে উঠিয়ে চালাতে শুরু করেন। আল্লাহ তা‘আলার শপথ! তিনি আমার সাথে কোন কথা বলেননি এবং আমিও তার সাথে কোন কথা বলিনি। প্রায় দুপুর বেলায় আমরা আমাদের যাত্রীদলের সাথে মিলিত হই। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মিথ্যুকেরা অপবাদের ঘটনা রটিয়ে দেয়। আর এই افك বা মিথ্যা অপবাদের ঘটনাকে কেন্দ্র করেই সূরা নূরের ১১-২০ নং আয়াত পর্যন্ত নাযিল হয় এবং প্রমাণিত হয় যে, আয়িশাহ সম্পূর্ণরূপে নির্দোষ। (সহীহ বুখারী হা: ৪৭৫০, সহীহ মুসলিম হা: ২৭৭০)
الْإِفْكِ বলতে সে মিথ্যা অপবাদ রটনার ঘটনাকে বুঝানো হয়েছে, যে ঘটনায় আয়িশাহ -কে অপকর্মের অপবাদ দেয়া হয়েছে।
(عُصْبَةٌ مِّنْكُمْ)
অর্থাৎ যারা এ মিথ্যা অপবাদ দানে জড়িত তারা তোমাদের মধ্যকার একটি জামাত, যারা নিজেদেরকে মু’মিন বলে থাকে। এদের মধ্যে কেউ মুনাফিক, আর কেউ প্রকৃত মু’মিন, কিন্তু মুনাফিকদের প্ররোচনায় সে সব হয়েছে। তারা হলেন হাসসান বিন সাবেত যিনি রাসূলের কবি বলে পরিচিত, মিসত্বাহ বিন আসাসাহ ও হামনাহ বিনতে জাহাশ।
(لَا تَحْسَبُوْهُ شَرًّا لَّكُمْ)
অর্থাৎ এ মিথ্যা অপবাদ রটানোর ঘটনাকে নিজেদের জন্য খারাপ মনে করো না। মান-সম্মানের ব্যাপার বলে যদিও বাহ্যিকভাবে খারাপ দেখা যাচ্ছে, কিন্তু এর মাধ্যমে যাকে অপবাদ দেয়া হয়েছে তাকে অপবাদ থেকে মুক্ত করা হবে, তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেয়া হবে এবং এর মাধ্যমে এ বিষয়ে শরীয়তের বিধান দেয়া হবে যা তোমাদের উপকারে আসবে। আর যারা অপবাদ দিয়েছে তাদের মধ্যে কে সত্যবাদী আর কে মিথ্যাবাদী এবং কে মূল হোতা তা চিহ্নিত করা হবে।
(وَالَّذِيْ تَوَلّٰي كِبْرَه)
‘এবং তাদের মধ্যে যে এ ব্যাপারে প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেছে’ প্রধান ভূমিকা পালন করেছে মুনাফিক নেতা আবদুল্লাহ বিন উবাই বিন সুলুল। সে এ অপবাদ রটনার ব্যাপারে অন্যদেরকে প্ররোচিত করেছে।
(لَوْلَآ إِذْ سَمِعْتُمُوْهُ ظَنَّ....)
মু’মিনরা যখন নিজেদের মাঝে এরূপ অপবাদমূলক কথা শুনবে তখন কী করণীয় হবে সে দিক নির্দেশনা দিয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন: হে মু’মিনগণ! যখন তোমরা এরূপ অপবাদমূলক কথা শুনলে কেন নিজেদের ব্যাপারে ভাল ধারণা করলে না? তা হলন যে অপবাদ দেয়া হয়েছে তা থেকে তিনি মুক্ত, এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা অপবাদ। অথচ অপবাদের জন্য চারজন সাক্ষী উপস্থিত করা উচিত তাও তারা করতে পারেনি, তারপরেও তোমরা মিথ্যা বলনি। উক্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার পরে হাসসান, মিসত্বাহ ও হামনাহ বিনতে জাহাশকে অপবাদের শাস্তি প্রদান করা হয়। (তিরমিযী হা: ৩১৮১, আবূ দাঊদ হা: ৪৪৭৪, হাসান) কিন্তু আব্দুল্লাহ বিন উবাইকে শাস্তি দেয়া হয়নি। বরং তার জন্য আখেরাতের শাস্তি প্রস্তুত রাখা হয়েছে, অপর দিকে মু’মিনদেরকে শাস্তি দিয়ে দুনিয়াতেই পবিত্র করা হয়েছে। ফলে আখিরাতে তাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে না।
অর্থাৎ তোমরা যে মিথ্যা অপবাদ রটিয়েছ, তার জন্য আল্লাহ তা‘আলা তোমাদেরকে পাকড়াও করতেন যদি তোমাদের প্রতি দুনিয়া ও আখিরাতে আল্লাহ তা‘আলার রহমত না থাকত।
(إِذْ تَلَقَّوْنَه۫ بِأَلْسِنَتِكُمْ....)
অর্থাৎ তোমরা বিষয়টি সত্য-মিথ্যা না জেনে, না বুঝে মুখে মুখে প্রচার শুরু করছ, আর বিষয়টিকে খুবই তুচ্ছ মনে করছ অথচ এটা আল্লাহ তা‘আলার নিকট খুবই বড় ধরণের অপরাধ। তোমাদের উচিত ছিল প্রচার না করে আল্লাহ তা‘আলার দিকে সোপর্দ করা। যেমন হাদীসে এসেছে: কোন কোন সময় মানুষ আল্লাহ তা‘আলার অসন্তুষ্টির এমন কথা উচ্চারণ করে ফেলে যার কোন গুরুত্ব তার কাছে নেই। কিন্তু ঐ কারণে সে জাহান্নামের এত নিম্নে পৌঁছে যায় যত নিম্নে আকাশ হতে জমিন রয়েছে। এমনকি তার চেয়েও নিম্নে চলে যায়। (সহীহ বুখারী হা: ৬৪৭৮, সহীহ মুসলিম হা: ২৯৮৮)
(وَلَوْلَآ إِذْ سَمِعْتُمُوْهُ قُلْتُمْ....)
এখানে মু’মিনদেরকে দ্বিতীয়বার শিক্ষা প্রদান করা হচ্ছে যে, যখন তারা এ অপবাদের কথা শুনেছিল তখন এ ব্যাপারে কোন কথা না বলে তাদের এমনটি বলা উচিত ছিল যে, আমাদের এ ব্যাপারে কিছুই বলা উচিত নয়। যখন তারা এমনটি করেনি তখন তাদের প্রথম বারের ঘটনার জন্য সর্তক করে বলা হচ্ছে যে, দ্বিতীয়বার যেন তারা আর এমনটি না করে। মূলত তাদেরকে এ বিষয়ে সর্তক করে হচ্ছে।
(إِنَّ الَّذِيْنَ يُحِبُّوْنَ أَنْ.....)
‘নিশ্চয়ই যারা পছন্দ করে যে, মু’মিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার হোক’ এটা তৃতীয় সতর্ক বাণী যে, যারা এ ধরণের কথা শুনবে তার জন্য ওটা ছড়ানো হারাম। কারণ যারা ছড়ায় তাদের মূল উদ্দেশ্য হল মু’মিনদেরকে কষ্ট দেয়া এবং তাদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার করা। যারা এ রকম জঘন্য কথা ছড়িয়ে বেড়ায় তাদেরকে পার্থিব জীবনে শাস্তি (হদ) এবং পরলৌকিক শাস্তি জাহান্নামে দেয়া হবে। হাদীসে এসেছে:
সাওবান (رضي الله عنه) হতে বর্ণিত, নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: তোমরা আল্লাহ তা‘আলার বান্দাদেরকে কষ্ট দিও না। এবং তাদের গোপনীয় দোষ অনুসন্ধান করো না। যে তার মুসলিম ভাইয়ের গোপনীয় দোষ অনুসন্ধান করবে আল্লাহও তার গোপনীয় দোষের পিছনে লাগবেন এবং তাকে এমনভাবে লাঞ্ছিত করবেন যে, তাকে তার বাড়ির লোকেরাও খারাপ দৃষ্টিতে দেখতে থাকবে। (মুসানাদ আহমাদ ৫/২৭৯)
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
كَفَي بِالْمَرْءِ كَذِبًا أَنْ يُحَدِّثَ بِكُلِّ مَا سَمِعَ
একজন ব্যক্তি মিথ্যুক হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শুনবে তাই বলে বেড়াবে। (সহীহ মুসলিম হা: ৫)
الْفَاحِشَةُ শব্দের অর্থ নির্লজ্জতা, বেহায়াপনা ও অশ্লীলতা। কুরআনে ব্যভিচার অর্থেও শব্দটি ব্যবহার হয়েছে। যেমন সূরা বানী ইসরাঈলের ৩২ নং আয়াতে বলা হয়েছে। অত্র আয়াতে ব্যভিচারের একটি মিথ্যা খবর প্রচার করাকেও অশ্লীলতা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ অপরাধ করা ও অপরাধমূলক কাজে সহযোগিতা করা উভয়ই সমান। সুতরাং শুধু অশ্লীলতার একটি মিথ্যা সংবাদ প্রচার করার কারণে যদি আল্লাহর কাছে এত বড় শাস্তিযোগ্য অপরাধ হয়, তাহলে যারা প্রতিনিয়ত সংবাদপত্র, রেডিও, টিভি, ভিডিও, সিডি ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে সমাজে অশ্লীলতা ছড়াচ্ছে ও ঘরে ঘরে পৌঁছে দিচ্ছে তারা আল্লাহর নিকট কত বড় অপরাধী। এমনিভাবে যারা পরিবারের মাঝে টি-ভি, ডিসের নামে অশ্লীলতাকে প্রশ্রয় দেয় তারাও কম অপরাধী নয়। সুতরাং আমাদের সতর্ক হওয়া উচিত, আমরা কোন্ দিকে পা বাড়াচ্ছি, আর সমাজকে কোন্ দিকে ঠেলে দিচ্ছি।
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা আবার মু’মিন বান্দাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। কারণ শয়তান কখনো ভাল কাজের দিক-নির্দেশনা দেয় না। সে শুধু অশ্লীল ও মন্দ কাজের দিক-নির্দেশনা দিয়ে থাকেন যার মাধ্যমে সমাজে খারাপ কাজ ছড়ানো যাবে এবং বিশৃংখলা সৃষ্টি করা যাবে ইত্যাদি। তাই আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(إِنَّ الشَّيْطَانَ لَكُمْ عَدُوٌّ فَاتَّخِذُوْهُ عَدُوًّا ط إِنَّمَا يَدْعُوْا حِزْبَه۫ لِيَكُوْنُوْا مِنْ أَصْحٰبِ السَّعِيْرِ)
“নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের শত্র“, সুতরাং তাকে তোমরা শত্র“রূপেই গ্রহণ কর। সে তার দলবলকে শুধু এজন্যই আহ্বান করে, যেন তারা (পথভ্রষ্ট হয়ে) জাহান্নামীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।” (সূরা ফাতির ৩৫:৬)
(وَلَوْلَا فَضْلُ اللّٰهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُه)
অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলার রহমত না থাকলে তোমাদের কেউ পাপ থেকে পবিত্র হতে পারত না, শয়তানের অনুসরণ থেকে পবিত্র হতে পারত না। শয়তান যেভাবে খারাপ কাজকে সুশোভিত করে দেয় সেদিকে তোমাদের মন চলে যেত। কেননা মানুষের মন তো খারাপ কাজের দিকে বেশি আকৃষ্ট হয়, তবে আল্লাহ তা‘আলা যাকে রহম করেন সে ব্যতীত। তাই আল্লাহ তা‘আলা যাকে ইচ্ছা পবিত্র করেন। সেজন্য নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দু‘আ করে বলতেন:
اللّٰهُمَّ آتِ نَفْسِي تَقْوَاهَا، وَزَكِّهَا أَنْتَ خَيْرُ مَنْ زَكَّاهَا، أَنْتَ وَلِيُّهَا وَمَوْلَاهَا
হে আল্লাহ তা‘আলা, আমার মনে তাক্বওয়া দাও, তা পবিত্র কর, কারণ তুমিই তো সর্বোত্তম পবিত্রকারী। তুমি এ মনের মালিক। (সহীহ মুসলিম হা: ২৭২২) ইফকের ঘটনা বর্ণনা করার পর এ আয়াত নিয়ে আসার উদ্দেশ্য হলন যারা উক্ত মিথ্যারোপে জড়িত হয়নি তাদের প্রতি আল্লাহ তা‘আলার বিশেষ রহমত রয়েছে। আর যারা জড়িত হয়েছে তাদের মধ্য হতে যাদেরকে পবিত্র করা হয়েছে তাদের প্রতি আল্লাহ তা‘আলার বিশেষ অনুগ্রহ ছিল।
(وَلَا يَأْتَلِ أُولُوا الْفَضْلِ....) শানে নযূল:
আবূ বকর (رضي الله عنه) যখন দেখলেন, মিসতাহ বিন আসাসাহ তার কন্যা আয়িশাহ (رضي الله عنها)-এর নামে মিথ্যা অপবাদ রটনায় জড়িত, তখন তিনি শপথ করলেন, আমি তার জন্য আর কোন কিছুই খরচ করব না। তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (সহীহ বুখারী হা: ৪৭৫৭, সহীহ মুসলিম হা: ২৪৮৮)
মিসতাহ একজন গরীব মুহাজির সাহাবী ছিলেন। আত্মীয়তার দিক থেকে তিনি আবূ বকর (রাঃ) এর খালাত ভাই ছিলেন। এ জন্য তিনি তার তত্ত্বাবধান ও ভরণপোষণের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। যখন সে অপবাদের সাথে জড়িত হয়ে যায় তখন আবূ বকর (রাঃ) এ শপথ করে বসেন।
উক্ত আয়াতে মূলত মন্দ কাজে শপথ গ্রহণ করতে নিষেধ করা হয়েছে যে, তোমাদের মধ্য থেকে যারা প্রাচুর্যের অধিকারী তারা যেন এমন অঙ্গীকারাবদ্ধ না হয় যে, নিকটাত্মীয়, ইয়াতীম, মিসকীন এবং যারা আল্লাহ তা‘আলার রাস্তায় হিজরত করেছে তাদেরকে কোন কিছুই দান করবে না। বরং আল্লাহ তা‘আলা তাদের প্রতি আরো সদয় হওয়ার জন্য নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তোমরা যদি তাদের প্রতি সদয় হও, যদি তাদেরকে ক্ষমা কর তাহলে আল্লাহ তা‘আলাও তোমাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন।
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন, যারা সতী-সাধ্বী, মু’মিন, অশ্লীলতার ব্যাপারে বেখবর তাদেরকে ব্যভিচারের অপবাদ দিবে, তারা দুনিয়া ও আখিরাতে লা‘নতপ্রাপ্ত। যেমনটি অত্র সূরার প্রথম দিকে ৪ নং আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।
এরপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন, যারা এরূপ সতী-সাধ্বী স্ত্রীদের নামে অপবাদ রটনা করবে তারা তো অভিশপ্ত, এমনকি তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো কাল কিয়ামাতের মাঠে তাদের বিরুদ্ধে এ সকল কাজের জন্য সাক্ষ্য প্রদান করবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(اَلْيَوْمَ نَخْتِمُ عَلٰٓي أَفْوَاهِهِمْ وَتُكَلِّمُنَآ أَيْدِيْهِمْ وَتَشْهَدُ أَرْجُلُهُمْ بِمَا كَانُوْا يَكْسِبُوْنَ)
“আজ আমি এদের মুখে মোহর মেরে দেব, এদের হাত আমার সাথে কথা বলবে এবং এদের পা সাক্ষ্য দেবে যা তারা করত সে সম্পর্কে।” (সূরা ইয়াসীন ৩৬:৬৫)
আনাস বিন মালিক (رضي الله عنه) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমরা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট ছিলাম। তখন তিনি হেসে দিলেন। তিনি বললেন, তোমরা কি জান কিসে আমাকে হাসাল? আমরা বললাম, আল্লাহ তা‘আলা এবং তাঁর রাসূলই ভাল জানেন। তখন তিনি বললেন: কিয়ামতের দিনে বান্দা তার রবের সাথে ঝগড়া করবে; এ দৃশ্য আমাকে হাসাল। সে বলবে, হে আমার রব! আপনি কি আমাকে জুলুম হতে বিরত রাখেননি? আল্লাহ তা‘আলা বলবেন, হ্যাঁ। তখন সে বলবে: আমি আমার সাক্ষ্য ব্যতীত আর কারো সাক্ষ্যকে আমার জন্য যথেষ্ট মনে করি না। তখন আল্লাহ তা‘আলা বলবেন, আজকের দিনে তোমার সাক্ষ্যই তোমার জন্য যথেষ্ট। তবে সম্মানিত লেখকগণ এ ব্যাপারে সাক্ষী। তখন তার মুখে মোহর মেরে দেয়া হবে। তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে বলা হবে কথা বল, তখন তারা তার সকল কিছুই প্রকাশ করে দিবে। তখন সে বলবে: তোমরা ধ্বংস হও। তোমাদের পক্ষ থেকেই তো আমি বিতর্কে লিপ্ত হয়েছিলাম। (সহীহ মুসলিম হা: ২২৮০)
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন, সেদিন প্রত্যেককে তার কর্মফল পুরোপুরি দেয়া হবে। কারো প্রতি কোন প্রকার কম করা হবে না। এবং কারো প্রতি কোন জুলুমও করা হবে না।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. কোন বিষয়ে সংবাদ পাওয়া মাত্রই তা রটিয়ে দেয়া যাবে না, বিশেষ করে যদি সেটা কারো জন্য কোন লজ্জাজনক বা অপমানকর বিষয় হয়।
২. মু’মিনগণ সর্বদা নিজেদের ব্যাপারে ভাল ধারণা পোষণ করবে, কারো সম্পর্কে কোন মন্দ ধারণা পোষণ করবে না।
৩. ব্যভিচারের ক্ষেত্রে চারজন সাক্ষী না মিললে ব্যভিচারের অভিযোগ করা যাবে না।
৪. কোন মন্দ কাজের ব্যাপারে শপথ করা যাবে না। যদি করা হয় তাহলে যখনই জানা যাবে যে, এটি ঠিক নয়, তখনই তা থেকে ফিরে এসে শপথ ভঙ্গের কাফফারা দিতে হবে।
৫. কারো দোষ-ত্র“টি অন্বেষণ করা যাবে না এবং তা প্রকাশও করা যাবে না।
৬. শয়তানের অনুসরণ করা যাবে না। কারণ শয়তান কখনো ভাল কাজের নির্দেশ প্রদান করে না।
৭. মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কিয়ামতের মাঠে সাক্ষ্য প্রদান করবে।
৮. মানুষের প্রতি কোন জুলুম করা হবে না।
৯. মানুষ কিয়ামতের মাঠে তাদের রবের সাথে বিতর্কে লিপ্ত হবে।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ২৩-২৫ নং আয়াতের তাফসীর
যারা সাধারণ সতী সাধ্বী, সরলমনা ও মুমিনা নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে তাদেরকে এখানে ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে। তাদেরই শাস্তি যদি এরূপ হয় তবে যারা নবী (সঃ)-এর স্ত্রী মুসলমানদের মাতাদের প্রতি অপবাদ আরোপ করে থাকে তাদের শাস্তি কি হতে পারে? বিশেষ করে ঐ স্ত্রীর উপর, যিনি হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর কন্যা ছিলেন।
উলামায়ে কিরামের এর উপর ইজমা রয়েছে যে, এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার পরেও যে ব্যক্তি হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে অপবাদের সাথে স্মরণ করে সে কাফির। কেননা, সে কুরআন কারীমের বিরুদ্ধাচরণ করলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অন্যান্য স্ত্রীদের ব্যাপারেও সঠিক উক্তি এটাই যে, তাঁরাও হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ)-এর মতই। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী।
মহান আল্লাহ বলেনঃ তারা দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশপ্ত এবং তাদের জন্যে আছে মহাশাস্তি। যেমন তার উক্তি অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবি) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-কে কষ্ট দেয়।” (৩৩: ৫৭)।
কারো কারো ধারণা এই যে, এটা বিশেষভাবে হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ কথাই বলেন। সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) এবং মুকাতিল ইবনে হাইয়ান (রঃ)-এরও এটাই উক্তি। (ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে এটা বর্ণনা করেছেন) অতঃপর তিনি যে বিস্তারিত রিওয়াইয়াত আনয়ন করেছেন তাতে হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর প্রতি অপবাদ আরোপ করা, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর প্রতি অহী আসা এবং এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার বর্ণনা রয়েছে। কিন্তু এই হুকুম হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর সঙ্গে বিশিষ্ট হওয়ার কথা বর্ণনা করা হয়নি। সুতরাং অবতীর্ণ হওয়ার কারণ বিশিষ্ট হলেও এর হুকুম সাধারণ। হতে পারে যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ গুরুজনের উক্তিরও ভাবার্থ এটাই। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
কোন কোন মনীষী বলেন যে, সমস্ত পবিত্র স্ত্রীর হুকুম এটাই বটে, কিন্তু মুমিনা স্ত্রীলোকদের হুকুম এটা নয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এই আয়াত দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর স্ত্রীগণ উদ্দেশ্য, এই অপবাদে যেসব মুনাফিক অংশ নিয়েছিল তারা সবাই অভিশপ্ত সাব্যস্ত হয় এবং আল্লাহর ক্রোধের কোপানলে পতিত হয়। এর পরে মুমিনা স্ত্রীলোকদের উপর অপবাদ আরোপকারীদের হুকুম হিসেবে (আরবি) এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। সুতরাং তাদেরকে চাবুক মারা হবে। তারা তাওবা করলে তাদের তাওবা কবুল করা হবে। কিন্তু তাদের সাক্ষ্য তখন থেকে নিয়ে চিরদিনের জন্যে অগ্রাহ্য হবে।
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) একবার সূরায়ে নূরের তাফসীর বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন যে, এই আয়াতটি রাসূলল্লাহ (সঃ)-এর স্ত্রীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। ঐ অপবাদ আরোপকারীদের তাওবা গৃহীত নয়। এ আয়াতটি অস্পষ্ট। আর চারজন সাক্ষী আনতে না পারার আয়াতটি সাধারণ ঈমানদার স্ত্রীলোকদের উপর অপবাদ আরোপকারীদের ব্যাপারে প্রযোজ্য। তাদের তাওবা গৃহীত। তাঁর এ কথা শুনে সভার লোকদের ইচ্ছা হলো যে, তারা তাঁর কপাল চুম্বন করবে। কেননা, তিনি খুবই উত্তম তাফসীর করেছিলেন। ইবহাম বা অস্পষ্ট দ্বারা উদ্দেশ্য এই যে, অপবাদের অবৈধতা সাধারণ। এটা প্রত্যেক সতী-সাধ্বী স্ত্রীলোকের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। আর এসব অপবাদ আরোপকারীদের সবাই অভিশপ্ত।
হযরত আবদুর রহমান (রাঃ) বলেন যে, প্রত্যেক অপবাদ রচনাকারী এই হুকুমের অন্তর্ভুক্ত, কিন্তু হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর ব্যাপারে এই হুকুম আরো বেশী প্রযোজ্য। ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) সাধারণত্বকেই পছন্দ করেন এবং এটাই সঠিকও বটে। সাধারণত্বের পৃষ্ঠপোষকতায় নিম্নের হাদীসটিও রয়েছেঃ
হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সাতটি ধ্বংসকারী পাপ থেকে তোমরা বেঁচে থাকো।” জিজ্ঞেস করা হলোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐগুলো কি?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “ঐগুলো হলোআল্লাহর সাথে শিরক করা, যাদু করা, বিনা কারণে কাউকেও হত্যা করা, সুদ খাওয়া, ইয়াতীমের মাল আত্মসাৎ করা, জিহাদের ময়দান থেকে পলায়ন করা এবং সতী-সাধ্বী, সরলা মুমিনা স্ত্রীলোকের উপর অপবাদ আরোপ করা।” (ইবনে আবি হাতিম (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) হাদীসটি তাখরীজ করেছেন) হযরত হুযাইফা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “সতী-সাধ্বী স্ত্রীলোকের উপর ব্যভিচারের অপবাদ আরোপকারীর একশ বছরের পুণ্য নষ্ট হয়ে যায়।” (এ হাদীসটি হাফিয আবুল কাসিম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইবনে। আব্বাস (রাঃ) বলেছেনঃ “মুশরিকরা যখন দেখবে যে, জান্নাতে নামাযীরা ছাড়া আর কেউই প্রবেশ করে না তখন তারা তাদের শিরকের কথা অস্বীকার করে বসবে। তৎক্ষণাৎ তাদের মুখের উপর মোহর মেরে দেয়া হবে এবং তাদের হাত-পা তাদের বিরুদ্ধে তখন সাক্ষ্য দিতে শুরু করবে। কাজেই তারা আল্লাহর কাছে কোন কথাই গোপন করতে পারবে না।` (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেন, কাফিরদের সামনে যখন তাদের মন্দ কার্যাবলী পেশ করা হবে তখন তারা ঐগুলোকে অস্বীকার করে বসবে এবং নিজেদেরকে নিস্পাপ বলবে। তখন। তাদেরকে বলা হবে-“এরা হলো তোমাদের প্রতিবেশী। এরা তোমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিচ্ছে। তারা বলবেঃ “এরা মিথ্যাবাদী।” আবার তাদেরকে বলা হবে-“এরা তোমাদের পরিবার ও গোত্রের লোক। এরা তোমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দান করছে। তারা জবাবে বলবেঃ “এরাও সব মিথ্যাবাদী।` তখন তাদেরকে বলা হবে- “আচ্ছা, তাহলে তোমরা শপথ কর।` তারা তখন শপথ করবে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে মূক বা বোবা করে দিবেন এবং তাদের হাত ও পা তাদের দুস্কার্যাবলীর সাক্ষ্য দেবে। ফলে তাদেরকে জাহান্নামে প্রবিষ্ট করা হবে। (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন। ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) স্বীয় তাফসীরে এটা বর্ণনা করেছেন)
হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, (একদা) আমরা নবী (সঃ)-এর নিকট হাযির ছিলাম এমন সময় তিনি হেসে ওঠেন। অতঃপর তিনি বলেনঃ “আমি কেন হাসলাম তা তোমরা জান কি?` আমরা উত্তরে বললামঃ আল্লাহ এবং তার রাসলই (সঃ) ভাল জানেন। তিনি তখন বলেন, কিয়ামতের দিন বান্দা প্রতিপালকের সাথে বিতর্কে লিপ্ত হবে। সে বলবেঃ “হে আমার প্রতিপালক! আপনি কি আমাকে যুলুম হতে বিরত রাখেননি?” আল্লাহ তা'আলা উত্তরে বলবেনঃ “হা।` সে বলবেঃ “আচ্ছা, আজ আমি যে সাক্ষীকে সত্যবাদীরূপে মেনে নিবো তার সাক্ষ্যই আমার ব্যাপারে বিশ্বাসযোগ্য হবে এবং ঐ সাক্ষী আমি নিজেই, আর কেউ নয়। আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ
“আচ্ছা ঠিক আছে। তুমি নিজেই তোমার সাক্ষী থাকো।” অতঃপর তার মুখে মোহর লাগিয়ে দেয়া হবে এবং তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে প্রশ্ন করা হবে, আর ওগুলো তার সবকিছুই প্রকাশ করে দেবে। সে তখন তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে বলবেঃ “তোমরা ধ্বংস হও। তোমাদের পক্ষ থেকেই তো আমি বিতর্কে লিপ্ত হয়েছিলাম।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ), ইমাম মুসলিম (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এ হাদীসটি গারীব বা দুর্বল। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)
হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন, হে আদম সন্তান! তুমি নিজেই তোমার মন্দ কার্যাবলীর সাক্ষী। তোমার দেহের সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তোমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে। তুমি এর খেয়াল রাখবে। তুমি প্রকাশ্য কার্যে ও গোপনীয় কার্যে আল্লাহকে ভয় করবে। আল্লাহর কাছে কোন কিছুই গোপন নেই। অন্ধকার তার সামনে আলোকময় থাকে এবং গোপনীয় বিষয় থাকে তার কাছে প্রকাশমান। আল্লাহর সাথে ভাল ধারণা রাখা অবস্থায় মৃত্যুবরণ কর। আল্লাহ ছাড়া আমাদের কোনই ক্ষমতা নেই।
এখানে দ্বীন দ্বারা হিসাব বুঝানো হয়েছে। জমহূরের কিরআতে (আরবি)-এর উপর যবর রয়েছে, কেননা, ওটা (আরবি)-এর (আরবি) বা বিশেষণ। মুজাহিদ (রঃ) (আরবি) পড়েছেন। এই হিসেবে (আরবি) এর (আরবি) হবে। হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ)-এর মাসহাফে পূর্বযুগীয় কোন কোন গুরুজন হতে (আরবি) এই রূপ পড়াও বর্ণিত আছে।
ঐ সময় মানুষ জানতে পারবে যে, আল্লাহর ওয়াদা অঙ্গীকার ও ভীতি-প্রদর্শন সবই সত্য। হিসাব গ্রহণে তিনি ন্যায়বান এবং যুলুম হতে তিনি বহুদূরে। হিসাব গ্রহণের ব্যাপারে তিনি বান্দার উপর তিল পরিমাণও যুলুম করবেন না।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।