সূরা আল-মুমিনুন (আয়াত: 76)
হরকত ছাড়া:
ولقد أخذناهم بالعذاب فما استكانوا لربهم وما يتضرعون ﴿٧٦﴾
হরকত সহ:
وَ لَقَدْ اَخَذْنٰهُمْ بِالْعَذَابِ فَمَا اسْتَکَانُوْا لِرَبِّهِمْ وَ مَا یَتَضَرَّعُوْنَ ﴿۷۶﴾
উচ্চারণ: ওয়া লাকাদ আখাযনা-হুম বিল’আযা-বি ফামাছতা কা-নূ লিরাব্বিহিম ওয়ামাইয়াতাদাররা‘ঊন।
আল বায়ান: আর অবশ্যই আমি তাদেরকে আযাব দ্বারা পাকড়াও করলাম, তবুও তারা তাদের রবের কাছে নত হয়নি এবং বিনীত প্রার্থনাও করে না।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৭৬. আর অবশ্যই আমরা তাদেরকে শাস্তি দ্বারা পাকড়াও করলাম, তারপরও তারা তাদের রব-এর প্রতি অবনত হল না এবং কাতর প্রার্থনাও করল না।(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: আমি তাদেরকে শাস্তি দ্বারা পাকড়াও করেছিলাম, কিন্তু তারা তাদের প্রতিপালকের নিকট নত হল না, আর তারা কাকুতি মিনতিও করল না।
আহসানুল বায়ান: (৭৬) আমি তাদেরকে শাস্তি দ্বারা পাকড়াও করলাম, কিন্তু তারা তাদের প্রতিপালকের প্রতি বিনয়ী হল না এবং সকাতর প্রার্থনাও করল না। [1]
মুজিবুর রহমান: আমি তাদেরকে শাস্তি দ্বারা ধৃত করলাম, কিন্তু তারা তাদের রবের প্রতি বিনত হলনা এবং কাতর প্রার্থনাও করলনা।
ফযলুর রহমান: আমি তাদেরকে আজাব দ্বারা পাকড়াও করেছিলাম। কিন্তু তারা তাদের প্রভুর কাছে নতিস্বীকার করেনি এবং মিনতিও করেনি।
মুহিউদ্দিন খান: আমি তাদেরকে শাস্তি দ্বারা পাকড়াও করেছিলাম, কিন্তু তারা তাদের পালনকর্তার সামনে নত হল না এবং কাকুতি-মিনুতিও করল না।
জহুরুল হক: আর আমরা ইতিপূর্বেই তাদের শাস্তিদ্বারা পাকড়াও করেছি, তথাপি তারা তাদের প্রভুর কাছে বিনত হ’ল না, আর তারা কাকুতি- মিনতিও করল না।
Sahih International: And We had gripped them with suffering [as a warning], but they did not yield to their Lord, nor did they humbly supplicate, [and will continue thus]
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৭৬. আর অবশ্যই আমরা তাদেরকে শাস্তি দ্বারা পাকড়াও করলাম, তারপরও তারা তাদের রব-এর প্রতি অবনত হল না এবং কাতর প্রার্থনাও করল না।(১)
তাফসীর:
(১) পূর্ববর্তী আয়াতে মুশরিকদের সম্পর্কে বলা হয়েছিল যে, তারা আযাবে পতিত হওয়ার সময় আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করে। আমি যদি তাদের ফরিয়াদের কারণে দয়াপরবশ হয়ে আযাব সরিয়ে দেই, তবে মজ্জগত অবাধ্যতার কারণে আযাব থেকে মুক্তি পাওয়ার পরীক্ষণেই ওরা আবার নাফরমানীতে মশগুল হয়ে যাবে। এ আয়াতে তাদের এমনি ধরণের এক ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে যে, তাদেরকে একবার এক আযাবে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দো’আর বরকতে আযাব থেকে মুক্তি পাওয়ার পরও তারা আল্লাহর কাছে নত হয়নি এবং শির্ককেই আঁকড়ে ধরে থাকে। মূলতঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কাবাসীদের উপর দুর্ভিক্ষের আযাব দেয়ার জন্য দোআ করেছিলেন। ফলে কুরাইশরা ঘোরতর দুর্ভিক্ষে পতিত হয় এবং মৃত জন্তু, কুকুর ইত্যাদি খেতে বাধ্য হয়।
অবস্থা বেগতিক দেখে আবু সুফিয়ান রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে উপস্থিত হয় এবং বলেঃ আমি আপনাকে আত্মীয়তার কসম দিচ্ছি। আপনি কি একথা বলেননি যে, আপনি বিশ্ববাসীদের জন্যে রহমতস্বরূপ প্রেরিত হয়েছেন? তিনি উত্তরে বললেন হ্যাঁ, নিঃসন্দেহে আমি একথা বলেছি, এবং বাস্তবেও তাই। আবু সুফিয়ান বললঃ স্বগোত্রের প্রধানদেরকে তো বদর যুদ্ধে তরবারী দ্বারা হত্যা করেছেন। যারা জীবিত আছে, তাদেরকে ক্ষুধা দিয়ে হত্যা করছেন। আল্লাহর কাছে দোআ করুন, যাতে এই আযাব আমাদের উপর থেকে সরে যায়।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম দো'আ করলেন। ফলে, তৎক্ষণাৎ আযাব খতম হয়ে যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতেই উক্ত আয়াত নাযিল হয়। আয়াতে বলা হয়েছে যে, আযাবে পতিত হওয়া এবং আযাব থেকে মুক্তি পাওয়ার পরও তারা তাদের পালনকর্তার সামনে নত হয়নি। বাস্তব ঘটনা তাই ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দো’আয় দুর্ভিক্ষ দূর করা হলো কিন্তু মক্কার মুশরিকরা তাদের শির্ক ও কুফরে পূর্ববৎ অটল রইল। [সহীহ ইবনে হিব্বানঃ ১৭৫৩, (মাওয়ারিদুজ্জামআন]।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৭৬) আমি তাদেরকে শাস্তি দ্বারা পাকড়াও করলাম, কিন্তু তারা তাদের প্রতিপালকের প্রতি বিনয়ী হল না এবং সকাতর প্রার্থনাও করল না। [1]
তাফসীর:
[1] এখানে শাস্তি আযাব বলতে বদরের যুদ্ধে মক্কার কাফেরদের পরাজয়কে বুঝানো হয়েছে। যাতে তাদের ৭০ জন ব্যক্তি মারা পড়েছিল। অথবা সেই দুর্ভিক্ষের বছরকে বুঝানো হয়েছে যা নবী (সাঃ)-এর বদ্দুআর ফলে তাদের উপর এসেছিল। নবী (সাঃ) বদ্দুআ করেছিলেন, ‘‘হে আল্লাহ! ইউসুফ (আঃ)-এর যুগের ৭ বছর দুর্ভিক্ষের মত দুর্ভিক্ষে পীড়িত করে তাদের বিরুদ্ধে আমাকে সাহায্য কর।’’ (বুখারীঃ দু’আ অধ্যায়, মুসলিমঃ মাসাজিদ অধ্যায়।) যার ফলে মক্কার কাফেররা দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে। অতঃপর আবু সুফিয়ান নবী (সাঃ)-এর নিকট আসেন এবং আল্লাহ ও আত্মীয়তার দোহাই দিয়ে বললেন যে, ‘এখন আমরা জীব-জন্তুর চামড়া ও রক্ত পর্যন্ত ভক্ষণ করতে বাধ্য হয়েছি।’ এই পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াত অবতীর্ণ হয়।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৭৬-৮৩ নং আয়াতের তাফসীর:
(وَلَقَدْ أَخَذْنٰهُمْ بِالْعَذَابِ...) শানে নুযূল:
ইবনু আব্বাস (رضي الله عنه) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবূ সুফিয়ান রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলল: হে মুহাম্মাদ! আমি তোমাকে আল্লাহ তা‘আলার শপথ ও আত্মীয়তার সম্পর্কের মাধ্যম দিয়ে বলছি যে, আমরা গোবর ও রক্ত খেতে শুরু করে দিয়েছি। তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (মুসতাদরাক হাকিম ; ২:৩৯৪)
আল্লাহ তা‘আলা বলছেন, মানুষকে যখন কোন শাস্তি গ্রাস করে তখন তার উচিত আল্লাহ তা‘আলার কাছে নতি শিকার করা, তাঁর কাছে বিনয়ী হওয়া। কিন্তু তারা তা করে না। বরং যখন বিপদ চূড়ান্তভাবে এসে যায় তখন কল্যাণ থেকে নিরাশ হয়ে যায়। অথচ ইতোপূর্বে ছোট ছোট আযাব দ্বারা সতর্ক করা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَلَقَدْ أَرْسَلْنَآ إِلٰٓي أُمَمٍ مِّنْ قَبْلِكَ فَأَخَذْنٰهُمْ بِالْبَأْسَا۬ءِ وَالضَّرَّا۬ءِ لَعَلَّهُمْ يَتَضَرَّعُوْنَ - فَلَوْلَآ إِذْ جَا۬ءَهُمْ بَأْسُنَا تَضَرَّعُوْا وَلٰكِنْ قَسَتْ قُلُوْبُهُمْ وَزَيَّنَ لَهُمُ الشَّيْطٰنُ مَا كَانُوْا يَعْمَلُوْنَ)
“তোমার পূর্বেও আমি বহু জাতির নিকট রাসূল প্রেরণ করেছি; অতঃপর তাদেরকে অর্থসংকট ও দুঃখ-কষ্ট দ্বারা পীড়িত করেছি, যাতে তারা বিনীত হয়। আমার শাস্তি যখন তাদের ওপর আসল তখন তারা কেন বিনীত হল না? অধিকন্তু তাদের হৃদয় কঠিন হয়ে গেল এবং তারা যা করছিল শয়তান তা তাদের দৃষ্টিতে শোভন করেছিল।” (সূরা আন‘আম ৬:৪২-৪৩) অনুরূপ সূরা আ‘রাফের ৯৪-৯৫ নং আয়াতেও বলা হয়েছে।
সুতরাং প্রতিটি ব্যক্তির উচিত, যখনই কোন অন্যায় করবে তখন সাথে সাথে তাওবাহ করা। কেননা যদি সে তাওবাহ না করে আর গুনাহ করতেই থাকে তাহলে যখন আল্লাহ তা‘আলার শাস্তি এসে যাবে তখন আর শাস্তি থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে না।
(وَهُوَ الَّذِيْٓ أَنْشَأَ لَكُمْ)
‘তিনিই তোমাদের জন্য কর্ণ, চক্ষু ও অন্তঃকরণ সৃষ্টি করেছেন’ এ সম্পর্কে সূরা নাহলের ৭৮ নং আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন যে, তিনিই সকলকে পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিয়েছেন, প্রত্যেকেই নিজ আয়ূ পর্যন্ত বসবাস করবে অতঃপর যখন আয়ূ শেষ হয়ে যাবে তখন তাঁর দিকেই ফিরে যেতে হবে। যেমন আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
(قُلْ هُوَ الَّذِيْ ذَرَأَكُمْ فِي الْأَرْضِ وَإِلَيْهِ تُحْشَرُوْنَ - وَيَقُوْلُوْنَ مَتٰي هٰذَا الْوَعْدُ إِنْ كُنْتُمْ صٰدِقِيْنَ)
“বল: তিনিই পৃথিবীব্যাপী তোমাদেরকে ছড়িয়ে দিয়েছেন এবং তাঁরই কাছে তোমাদেরকে একত্রিত করা হবে। আর তারা বলে: তোমরা যদি সত্যবাদী হও (তবে বল:) এই প্রতিশ্র“তি কবে বাস্তবায়িত হবে?” (সূরা মুলক ৬৭:২৪-২৫)
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন: তিনিই জীবন দান করেন এবং তিনিই মৃত্যু দান করেন। এ ক্ষেত্রে কারো কোন ক্ষমতা নেই। হায়াত-মওতের মালিক একমাত্র তিনি। দিবা-রাত্রির পরিবর্তন তিনিই করে থাকেন। তিনি চাইলে ২৪ ঘন্টাই দিন রাখতে পারতেন, আবার চাইলে ২৪ ঘন্টাই রাত রাখতে পারতেন। কিন্তু বান্দার প্রতি তাঁর যে দয়া, তিনি তা করেননি। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَهُوَ الَّذِيْٓ أَحْيَاكُمْ ز ثُمَّ يُمِيْتُكُمْ ثُمَّ يُحْيِيْكُمْ ط إِنَّ الْإِنْسَانَ لَكَفُوْرٌ)
“এবং তিনিই তোমাদেরকে জীবন দান করেছেন; অতঃপর তিনিই তোমাদের মৃত্যু ঘটাবেন, পুনরায় তোমাদেরকে জীবন দান করবেন। মানুষ তো অতি মাত্রায় অকৃতজ্ঞ।” (সূরা হজ্জ ২২:৬৬) আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(قُلْ أَرَأَيْتُمْ إِنْ جَعَلَ اللّٰهُ عَلَيْكُمُ النَّهَارَ سَرْمَدًا إِلٰي يَوْمِ الْقِيَامَةِ مَنْ إلٰهٌ غَيْرُ اللّٰهِ يَأْتِيْكُمْ بِلَيْلٍ تَسْكُنُوْنَ فِيْهِ ط أَفَلَا تُبْصِرُوْنَ)
“বল: ‘তোমরা ভেবে দেখেছ কি, আল্লাহ তা‘আলা যদি দিনকে কিয়ামতের দিন পর্যন্ত স্থায়ী করেন, আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত এমন কোন্ মা‘বূূদ আছে, যে তোমাদের জন্য রাতের আবির্ভাব ঘটাবে যাতে তোমরা বিশ্রাম করতে পার? তবুও কি তোমরা ভেবে দেখবে না?” (সূরা কাসাস ২৮:৭২)
অতএব প্রমাণ দেয়ার পরও তারা পূববর্তীদের মত কথা বলে, পূর্বের অবাধ্য লোকেরা যে পথে চলেছে তারাও সে পথের পথিক। তারা বলত, আমরা কি মাটিতে পচে গলে যাওয়ার পরেও পুনরায় জীবিত হব। এটা অসম্ভব, আমাদের বাপ-দাদাদেরকেও এরূপ প্রতিশ্র“তি দেয়া হয়েছিল, কই তাদেরকে তো জীবিত করা হল না। যেমন তাদের কথা আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَضَرَبَ لَنَا مَثَلًا وَّنَسِيَ خَلْقَه۫ ط قَالَ مَنْ يُّحْيِ الْعِظَامَ وَهِيَ رَمِيْمٌ)
“আর সে আমার সম্পর্কে উদাহরণ বর্ণনা করে, অথচ সে নিজের জন্মের কথা ভুলে যায়। সে বলেঃ কে জীবিত করবে এ হাড়গুলোকে, যখন তা পচে গলে যাবে?” (সূরা ইয়াসীন: ৩৬:৭৮) অতএব আখিরাতের ওপর পূর্ণ বিশ্বাস রাখা জরুরী।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. শাস্তি আসার পূর্বে তাওবাহ করতে হবে। শাস্তি এসে গেলে তখন আর হায়-হুতাশ করে কোন লাভ হবে না।
২. জীবন ও মৃত্যুদানকারী একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা।
৩. পুনরুত্থান দিবস সত্য এবং মানুষকে পুনরায় জীবিত করা হবে।
৪. কুরআন কোন কল্পকাহিনী নয়, বরং এটি সত্যসহ প্রেরিত কিতাব।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৭৬-৮৩ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আমি তাদেরকে শাস্তি দ্বারা ধৃত করলাম অর্থাৎ আমি তাদের দুষ্কর্মের কারণে তাদেরকে কষ্ট ও বিপদে জড়িত করে ফেললাম, কিন্তু এতেও তারা না কুফরী পরিত্যাগ করলো, না তাদের প্রতিপালকের প্রতি বিনত হলো। বরং তখন তারা কুফরী ও বিভ্রান্তির উপর অটল থাকলো। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তাদের কাছে যখন আমার শাস্তি এসে গেল তখন কেন তারা বিনীতভাবে আমার দিকে ঝুঁকে পড়লো না। প্রকৃত ব্যাপার এই যে, তাদের অন্তর শক্ত হয়ে গেছে।” (৬:৪৩) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এই আয়াতে এ দুর্ভিক্ষের বর্ণনা রয়েছে যা কুরায়েশদের উপর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে না মানার কারণে পতিত হয়েছিল, যার অভিযোগ নিয়ে আবু সুফিয়ান (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর নিকট গমন করেছিলেন এবং তাঁকে বলেছিলেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! আমি তোমাকে আল্লাহর কসম দিয়ে ও আত্মীয়তার সম্পর্কের মাধ্যম দিয়ে বলছি যে, (দুর্ভিক্ষের কবলে পতিত হয়ে এখন) আমরা গোবর ও রক্ত খেতে শুরু করে দিয়েছি।” তখন আল্লাহ তা'আলা (আরবী) এই আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন। সুনানে নাসাঈতেও এটা বর্ণিত হয়েছে)
এ কথাও বর্ণিত আছে যে, কুরায়েশদের দুর্ব্যবহারে অতিষ্ঠ হয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের উপর বদ দু'আ করে বলেছিলেনঃ “হে আল্লাহ! হযরত ইউসুফ (আঃ)-এর যুগের মত এদের উপর সাত বছরের দুর্ভিক্ষ চাপিয়ে দিয়ে আমাকে সাহায্য করুন! (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে)
হযরত আমর ইবনে কাইসান (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত অহাব ইবনে মুনাব্বাহ (রঃ)-কে বন্দী করা হলে তথায় একজন নব যুবক তাঁকে বলেনঃ “হে আবু আবদিল্লাহ (রঃ)! আপনার মনোরঞ্জনের জন্যে আমি কিছু কবিতা পাঠ করাবো কি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “এখন আমরা আল্লাহর শাস্তির মধ্যে রয়েছি। আর যারা এরূপ অবস্থাতেও আল্লাহর দিকে ঝুঁকে পড়ে না তাদের বিরুদ্ধে কুরআন কারীমে অভিযোগ করা হয়েছে।” অতঃপর তিনি ক্রমান্বয়ে তিনটি রোযা রাখেন (মাঝে ইফতার না করে)। তখন তাকে জিজ্ঞেস করা হয়ঃ “হে আবু আবদিল্লাহ! এটা কিরূপ রোযা (যাতে আপনি মাঝে ইফতার করেননি)?” জবাবে তিনি বলেনঃ “আমাদের জন্যে একটি নতুন বিষয় উদ্ভাবন করা হয়েছে, সুতরাং আমরাও একটা নতুন বিষয় উদ্ভাবন করলাম। অর্থাৎ আমাদেরকে বন্দী করে বাড়াবাড়ি করা হয়েছে, সুতরাং আমরাও ইবাদতে বাড়াবাড়ি করলাম।” (মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে এটা বর্ণনা করা হয়েছে)
এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ অবশেষে যখন আমি তাদের জন্যে কঠিন শাস্তির দর্য খুলে দেই তখনই তারা এতে হতাশ হয়ে পড়ে। অর্থাৎ যে শাস্তির কথা তারা কল্পনাও করেনি সেই শাস্তি আকস্মিকভাবে যখন তাদের উপর এসে পড়ে তখন তারা পরিত্রাণ লাভে সম্পূর্ণরূপে নিরাশ হয়ে পড়ে।
আল্লাহ তা'আলা মানুষকে অসংখ্য নিয়ামত দান করেছেন। তিনি চক্ষু, কর্ণ, অন্তঃকরণ এবং জ্ঞান-বুদ্ধি দিয়েছেন যাতে তারা চিন্তা-গবেষণা করে তার একত্ব ও ব্যাপক ক্ষমতা এবং একচ্ছত্র আধিপত্য অনুধাবন করতে পারে। কিন্তু যতই নিয়ামত বৃদ্ধি পাচ্ছে ততই শুকরগুযারী কমে যাচ্ছে। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা অল্পই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে থাকো।” আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) তোমার চাহিদা থাকলেও অধিকাংশ লোকই মুমিন নয়।` (১২:১০৩)।
অতঃপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ তাঁর বিরাট সাম্রাজ্য এবং মহাশক্তির বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেনঃ তিনিই তোমাদেরকে পৃথিবীতে বিস্তৃত করেছেন এবং তোমাদেরকে তাঁরই নিকট একত্রিত করা হবে। প্রথমে তিনি সৃষ্টি করেছেন, মৃত্যুর পরে পুনরায় তিনিই সৃষ্টি করবেন। ছোট, বড়, পূর্বের ও পরের কেউই অবশিষ্ট থাকবে না। পচা সড়া হাড়কে জীবিতকারী এবং মানুষকে মৃত্যুদানকারী একমাত্র তিনিই। তাঁর হুকুমেই দিন যাচ্ছে রাত্রি আসছে এবং রাত্রি যাচ্ছে দিন আসছে। সুশৃংখলভাবে একটার পর একটা আসছে ও যাচ্ছে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সৃর্ষে পক্ষে সম্ভব নয় চন্দ্রের নাগাল পাওয়া এবং রজনীর পক্ষে সম্ভব নয় দিবসকে অতিক্রম ; এবং প্রত্যেকে নিজ নিজ কক্ষপথে সন্তরণ করে।” (৩৬:৪০) তাই মহান আল্লাহ বলেনঃ তবুও কি তোমরা বুঝবে না? এতো বড় বড় নিদর্শন দেখেও কি তোমরা তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহকে চিনবে না? তিনি যে মহা-ক্ষমতাবান ও অসীম জ্ঞানের অধিকারী এটা তোমাদের মেনে নেয়া উচিত।
এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ এতদসত্ত্বেও তারা বলে, যেমন বলেছিল তাদের পূর্ববর্তীরা। প্রকৃত কথা এই যে, এ যুগের কাফির ও পূর্ববর্তী যুগের কাফিরদের অন্তর একই। তাদের ও এদের উক্তির মধ্যে কোনই পার্থক্য নেই। ঐ উক্তি হলোঃ “আমাদের মৃত্যু ঘটলে এবং আমরা মৃত্তিকা ও অস্থিতে পরিণত হলেও কি পুনরুত্থিত হবো? এটা বোধগম্য নয়। এই প্রতিশ্রুতি আমাদেরকে দেয়া হয়েছে এবং অতীতে আমাদের পূর্বপুরুষদেরকেও এই প্রতিশ্রুতিই দেয়া হয়েছিল। এটা তো সে কালের উপকথা ব্যতীত আর কিছুই নয়। কিন্তু আমরা সে মৃত্যুর পরে কাউকেও জীবিত হতে দেখিনি।” এর দ্বারা তারা বুঝাতে চেয়েছে যে, পুনরুত্থান সম্ভব নয়। যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ তাআলা তাদের সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(তারা বলে, আমরা কি পূর্বাবস্থায় প্রত্যাবর্তিত হবো) গলিত অস্থিতে পরিণত হওয়ার পরও? তারা বলে, তাই যদি হয় তবে তো এটা সর্বনাশা প্রত্যাবর্তন। এটা তো শুধু এক বিকট আওয়াজ, তখনই ময়দানে তাদের আবির্ভাব হবে।” (৭৯: ১১-১৪) আর এক জায়গায় মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “মানুষ কি দেখে না যে, আমি তাকে সৃষ্টি করেছি শুক্রবিন্দু হতে? অথচ পরে সে হয়ে পড়ে প্রকাশ্য বিতণ্ডাকারী। আর সে আমার সামনে উপমা রচনা করে অথচ সে নিজের সৃষ্টির কথা ভুলে যায়; বলে, অস্থিতে প্রাণ সঞ্চার করবে কে যখন ওটা পচে গলে যাবে? বলঃ ওর মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করবেন তিনিই যিনি এটা প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি প্রত্যেকটি সৃষ্টি সম্বন্ধে সম্যক পরিজ্ঞাত।” (৩৬:৭৭-৭৯)
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।