সূরা আল-মুমিনুন (আয়াত: 65)
হরকত ছাড়া:
لا تجأروا اليوم إنكم منا لا تنصرون ﴿٦٥﴾
হরকত সহ:
لَا تَجْـَٔرُوا الْیَوْمَ ۟ اِنَّکُمْ مِّنَّا لَا تُنْصَرُوْنَ ﴿۶۵﴾
উচ্চারণ: লা-তাজআরুল ইয়াওমা ইন্নাকুম মিন্না-লা-তুনসারূন।
আল বায়ান: আজ তোমরা সজোরে আর্তনাদ করো না। নিশ্চয় তোমরা আমার পক্ষ থেকে সাহায্যপ্রাপ্ত হবে না।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৬৫. তাদেরকে বলা হবে, আজ আর্তনাদ করো না, তোমাদেরকে তো আমাদের পক্ষ থেকে সাহায্য করা হবে না।
তাইসীরুল ক্বুরআন: (বলা হবে) ‘আজ চিৎকার করো না, আমার কাছ থেকে তোমরা সাহায্য পাবে না।’
আহসানুল বায়ান: (৬৫) (তাদেরকে বলা হবে,) আজ আর্তনাদ করো না। নিশ্চয় তোমরা আমার তরফ থেকে সাহায্য পাবে না। [1]
মুজিবুর রহমান: তাদেরকে বলা হবেঃ আজ আর্তনাদ করনা, তোমরা আমার সাহায্য পাবেনা।
ফযলুর রহমান: আজ চিৎকার করো না; তোমরা আমার সাহায্য পাবে না।
মুহিউদ্দিন খান: অদ্য চীৎকার করো না। তোমরা আমার কাছ থেকে নিস্কৃতি পাবে না।
জহুরুল হক: "আজ আর্তনাদ করো না, নিঃসন্দেহ তোমাদের ক্ষেত্রে -- আমাদের থেকে তোমাদের সাহায্য করা হবে না।
Sahih International: Do not cry out today. Indeed, by Us you will not be helped.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৬৫. তাদেরকে বলা হবে, আজ আর্তনাদ করো না, তোমাদেরকে তো আমাদের পক্ষ থেকে সাহায্য করা হবে না।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৬৫) (তাদেরকে বলা হবে,) আজ আর্তনাদ করো না। নিশ্চয় তোমরা আমার তরফ থেকে সাহায্য পাবে না। [1]
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, পৃথিবীতে আল্লাহর আযাবে আচ্ছন্ন হওয়ার পর কোন কান্নাকাটি ও আর্তনাদ আল্লাহর পাকড়াও হতে বাঁচাতে পারবে না। অনুরূপ আখেরাতের শাস্তি হতেও বাঁচানোর বা সাহায্য করার কেউ থাকবে না।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৬২-৬৭ নং আয়াতের তাফসীর:
(وَلَا نُكَلِّفُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا)
এখানে বলা হচ্ছে যে, আল্লাহ তা‘আলা মানুষের সাধ্যাতীত কোন বিষয় চাপিয়ে দেন না। বরং মানুষের পক্ষে যতটুকু সম্ভব ততটুকুই তার ওপর অর্পণ করা হয়। এ সম্পর্কে সূরা বাকারার শেষ আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।
(وَلَدَيْنَا كِتٰبٌ يَّنْطِقُ....)
‘এবং আমার নিকট আছে এক কিতাব যা সত্য ব্যক্ত করে’ এখানে কিতাব বলতে মানুষের আমলের কিতাব বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ মানুষরা দুনিয়াতে যা আমল করে তা একটি কিতাবে লিপিবদ্ধ করে রাখা হয়। কিয়ামতের দিন সে কিতাব মানুষের আমল সম্পর্কে কথা বলবে। আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
(هٰذَا كِتٰبُنَا يَنْطِقُ عَلَيْكُمْ بِالْحَقِّ ط إِنَّا كُنَّا نَسْتَنْسِخُ مَا كُنْتُمْ تَعْمَلُوْنَ)
“এ হল আমার কিতাব, এটা তোমাদের বিরুদ্ধে সত্য বলবে। তোমরা যা করতে তা আমি অবশ্যই লিপিবদ্ধ করিয়েছিলাম।” (সূরা জাসিয়া ৪৫:২৯)
সুতরাং মানুষের কোন আমল সেদিন লুক্কায়িত থাকবে না। তারা যা আমল করেছে, তাই সেখানে প্রকাশ পাবে, আর ঐ ভিত্তিতেই তাদেরকে প্রতিফল দেয়া হবে। কারো প্রতি কোন প্রকার জুলুম করা হবে না ।
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা বর্ণনা করেন, তাদেরকে যে সকল বিধি-বিধান দেয়া হয়েছে এসব থেকে জ্ঞানহীনতার কারণে তারা বিরত থাকে এবং এর পরিবর্তে তারা আরো অন্যায় কাজে লিপ্ত হয়। তারা একটু চিন্তা-ভাবনা করে দেখে না, কী করছে। তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَذَرْنِيْ وَالْمُكَذِّبِيْنَ أُولِي النَّعْمَةِ وَمَهِّلْهُمْ قَلِيْلًا - إِنَّ لَدَيْنَآ أَنْكَالًا وَّجَحِيْمًا)
“ছেড়ে দাও আমাকে এবং প্রাচুর্য্যবান মিথ্যা প্রতিপন্নকারীদের; আর কিছুকালের জন্য তাদেরকে অবকাশ দাও। নিশ্চয়ই আমার নিকট আছে শক্ত বেড়ী ও জ্বলন্ত আগুন।” (সূরা মুযযামমিল ৭৩:১১-১২)
مُتْرَفِيْهِمْ অর্থ নেতৃস্থানীয়, ক্ষমতাসীন। আযাব নেতৃস্থানীয় ও ক্ষমতাহীন সবার ওপরে আসবে। কিন্তু এখানে নেতৃস্থানীয়দের বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে কেন? কারণ সাধারণত সমাজের নেতৃত্ব এদের হাতেই থাকে। এরা যেভাবে চায় জাতির মুখ ফেরাতে পারে। যদি তারা আল্লাহ তা‘আলার অবাধ্যতার পথ অবলম্বন করে ও তার ওপর অবিচল থাকে, তাহলে তাদের দেখা-দেখি সমাজের মানুষও তাদের অনুসরণ করে এবং তওবা ও অনুশোচনার পথ ধরে না। এখানে নেতৃত্ব বলতে সে সব কাফিরদেরকে বুঝানো হয়েছে, যাদেরকে ধন-দৌলতের প্রাচুর্য ও সন্তান-সন্ততি দ্বারা সমৃদ্ধ করে অবকাশ দেয়া হয়েছে। যেমন এ শ্রেণির কিছু আয়াত পূর্বেও উল্লিখিত হয়েছে।
এমনকি যখন তাদেরকে তাদের এ সকল অপরাধের কারণে শাস্তি প্রদান করা হবে তখন তারা তথায় চিৎকার করতে থাকবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(كَمْ أَهْلَكْنَا مِنْ قَبْلِهِمْ مِّنْ قَرْنٍ فَنَادَوْا وَّلَاتَ حِيْنَ مَنَاصٍ)
“তাদের পূর্বে আমি বহু সম্প্রদায়কে ধ্বংস করেছি; তখন তারা আর্তনাদ করেছিল, কিন্তু তখন মুক্তি লাভের কোন সময় ছিল না।” (সূরা স্ব-দ ৩৮:৩)
তখন তাদেরকে নিষেধ করা হবে যে, আজকের দিনে তোমরা চিৎকার আর্তনাদ কর না। এখন চিৎকার করে কোনই লাভ নেই। কারণ তোমাদের নিকট আমার বিধি-বিধান আলোচনা করা হত, আমার আয়াতসমূহ পাঠ করা হত, তখন তোমরা তা থেকে বিমুখ ছিলে এবং এ বিষয়ে তোমরা অহঙ্কার করতে। সুতরাং আজকের দিনে আর্তনাদ করে কোনই লাভ হবে না। আজকে বরং এর জন্য তোমাদেরকে শাস্তি ভোগ করতে হবে। কারণ তোমরা গর্ব-অহঙ্কার করে আল্লাহ তা‘আলার আয়াতকে অস্বীকার করতে। আর আজকের দিনে তোমাদের এ শাস্তি কমানোও হবে না।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. সাধ্যের বাইরে মানুষকে আল্লাহ তা‘আলা কোন কাজ চাপিয়ে দেন না।
২. মৃত্যুর পর অনুশোচনা করে কোন লাভ হবে না।
৩. গর্ব-অহঙ্কার করা যাবে না, তা করলে সৎ আমল নষ্ট হয়ে যায়।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৬২-৬৭ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তাআলা খবর দিচ্ছেন যে, তিনি শরীয়তকে সহজ করেছেন। তিনি বান্দাদেরকে এমন কাজের হুকুম দেন না যা তাদের সাধ্যের অতিরিক্ত। অতঃপর কিয়ামতের দিন তিনি তাদের কাজের হিসেব গ্রহণ করবেন। ওগুলো তারা পুস্তিকাকারে লিখিতরূপে বিদ্যমান পাবে। এই আমলনামা সঠিকভাবে তাদের এক একটি কাজের কথা প্রকাশ করে দেবে। কারো উপর কোন প্রকারের যুলুম করা হবে না। কারো পুণ্য কমিয়ে দেয়া হবে না। তবে অধিকাংশ মুমিনের পাপ ক্ষমা করে দেয়া হবে।
ইরশাদ হচ্ছেঃ বরং এই বিষয়ে তাদের অন্তর অজ্ঞানতায় আচ্ছন্ন, এ ছাড়া আরো কাজ আছে যা তারা করে থাকে, যেমন শিরক ইত্যাদি। এ সবকিছু তারা নির্ভয়ে করে চলেছে। মৃত্যু পর্যন্ত তারা এসব মন্দ কাজ করতেই থাকবে যাতে তারা সমস্ত শাস্তির হকদার হয়ে যায়। যেমন ইতিপূর্বে হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে হাদীস বর্ণিত হয়েছেঃ “যিনি ছাড়া কোন মা'বুদ নেই তাঁর শপথ! কোন লোক জান্নাতের কাজ করতে করতে জান্নাত হতে মাত্র এক হাত দূরে রয়ে যায়, অতঃপর তার তকদীরের লিখন তার উপর বিজয়ী হয় এবং সে জাহান্নামীদের কাজ করতে শুরু করে দেয়। পরিণামে সে জাহান্নামে প্রবেশ করে।”
মহান আল্লাহর উক্তিঃ আর আমি যখন তাদের ঐশ্বর্যশালী ব্যক্তিদেরকে শাস্তি দ্বারা ধৃত করি তখনই তারা আর্তনাদ করে উঠে। সূরায়ে মুযযামিলে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “ছেড়ে দাও আমাকে এবং বিলাস সামগ্রীর অধিকারী সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদেরকে, আর কিছুকালের জন্যে তাদেরকে অবকাশ দাও। আমার নিকট আছে শৃংখল, প্রজ্বলিত অগ্নি।” (৭৩:১১-১২) অন্য জায়গায় আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তাদের পূর্বে আমি কত জনগোষ্ঠী ধ্বংস করেছি; তখন তারা আচষ্কার করেছিল। কিন্তু তখন পরিত্রাণের কোনই উপায় ছিল না।” (৩৮:৩) এখানে বলা হচ্ছেঃ আজ তোমরা চীৎকার করছো কেন? কেন আজ আর্তনাদ করছো? আজ এসবের কিছুই তোমাদের কাজে আসবে না। তোমাদের উপর আল্লাহর শাস্তি এসে পড়েছে। এখন চীৎকার আর্তনাদ সবই বৃথা। এমন কে আছে যে তোমাদেরকে সাহায্য করতে পারে?
এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ আমার আয়াত তো তোমাদের নিকট আবৃত্তি করা হতো, কিন্তু তোমরা পিছনে ফিরে সরে পড়তে দম্ভভরে।
(আরবী) তাদের সত্য হতে সরে পড়া ও সত্যকে অস্বীকার করা হতে (আরবী) হয়েছে যে, তারা ঐ সময় অহংকার করতো এবং সত্যপন্থীদেরকে তুচ্ছ জ্ঞান করতো। এই অর্থ হিসেবে (আরবী) এর (আরবী) সর্বনামটি হয়তো বা (আরবী)-এর দিকে অর্থাৎ মক্কার দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে যে, তারা সেখানে বাজে ও অর্থহীন গল্প-গুজব করতো। কিংবা ওর (আরবী) হবে কুরআন, যাকে তারা উপহাসের বস্তু বানিয়ে নিয়েছিল। কখনো ওটাকে কবিতা বলতো, কখনো বলতো ভবিষ্যৎ কথন ইত্যাদি। অথবা এর (আরবী) স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ)। রাত্রিকালে অযথা বসে থেকে তাদের গল্প-গুজবের মধ্যে তারা তাকে কখনো কবি বলতো, কখনো বলতো যাদুকর, কখনো বলতো, মিথ্যাবাদী এবং কখনো পাগল বলতো। অথচ ‘হারাম’ আল্লাহর ঘর, কুরআন তাঁর কালাম এবং মুহাম্মাদ (সঃ) তাঁর রাসূল, যাকে তিনি সাহায্য করেছেন এবং মক্কার উপর বিজয়ী করেছেন। মুশরিকদেরকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত অবস্থায় সেখান থেকে বের করিয়েছেন। আবার ভাবার্থ এও বলা হয়েছে যে, তারা বায়তুল্লাহর কারণে গর্ব করতো। তারা ধারণা করতো যে, তারা আল্লাহর বন্ধু ও প্রিয়পাত্র। অথচ ওটা ছিল তাদের অলিক ধারণা মাত্র। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, কুরায়েশ মুশরিকরা বায়তুল্লাহর উপর ফখর করতো এবং নিজেদেরকে ওর ব্যবস্থাপক এবং মুতাওয়াল্লী মনে করতো। অথচ না তারা ওটা আবাদ করতো না ওর আদব করতো। ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) এখানে অনেক কিছু লিখেছেন যেগুলোর মূল বক্তব্য এটাই।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।