আল কুরআন


সূরা আল-মুমিনুন (আয়াত: 52)

সূরা আল-মুমিনুন (আয়াত: 52)



হরকত ছাড়া:

وإن هذه أمتكم أمة واحدة وأنا ربكم فاتقون ﴿٥٢﴾




হরকত সহ:

وَ اِنَّ هٰذِهٖۤ اُمَّتُکُمْ اُمَّۃً وَّاحِدَۃً وَّ اَنَا رَبُّکُمْ فَاتَّقُوْنِ ﴿۵۲﴾




উচ্চারণ: ওয়া ইন্না হা-যিহীউম্মাতুকুম উম্মাতাওঁ ওয়াহিদাতাওঁ ওয়া আনা-রাব্বুকুম ফাত্তাকূন।




আল বায়ান: তোমাদের এই দীন তো একই দীন। আর আমি তোমাদের রব, অতএব তোমরা আমাকে ভয় কর।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৫২. আর আপনাদের এ উম্মত তো একই উম্মত(১) এবং আমিই আপনাদের রব; অতএব আমারই তাকওয়া অবলম্বন করুন।(২)




তাইসীরুল ক্বুরআন: তোমাদের এসব উম্মাত তো একই উম্মাত, আর আমিই তোমাদের প্রতিপালক, কাজেই আমাকেই ভয় কর।




আহসানুল বায়ান: (৫২) নিশ্চয় তোমাদের এই জাতি একই জাতি[1] এবং আমিই তোমাদের প্রতিপালক; অতএব তোমরা আমাকে ভয় কর।



মুজিবুর রহমান: এবং তোমাদের এই যে জাতি এটাতো একই জাতি এবং আমিই তোমাদের রাব্ব; অতএব আমাকে ভয় কর।



ফযলুর রহমান: আর এটাই তোমাদের ধর্ম, একই ধর্ম; আর আমি তোমাদের প্রভু; অতএব, আমাকে ভয় কর।



মুহিউদ্দিন খান: আপনাদের এই উম্মত সব তো একই ধর্মের অনুসারী এবং আমি আপনাদের পালনকর্তা; অতএব আমাকে ভয় করুন।



জহুরুল হক: আর -- "নিঃসন্দেহ তোমাদের এই সম্প্রদায় একই সম্প্রদায়, আর আমিই তোমাদের প্রভু, অতএব আমাকেই তোম রা ভক্তিশ্রদ্ধা করো।"



Sahih International: And indeed this, your religion, is one religion, and I am your Lord, so fear Me."



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৫২. আর আপনাদের এ উম্মত তো একই উম্মত(১) এবং আমিই আপনাদের রব; অতএব আমারই তাকওয়া অবলম্বন করুন।(২)


তাফসীর:

(১) “তোমাদের উম্মত একই উম্মত”। অর্থাৎ তোমরা একই দলের লোক। أمة শব্দটি যদিও সম্প্রদায় ও কোন বিশেষ নবীর জাতির অর্থে প্রচলিত ও সুবিদিত, তবুও কোন কোন সময় তরীকা ও দ্বীনের অর্থেও ব্যবহৃত হয়। যেমন (إِنَّا وَجَدْنَا آبَاءَنَا عَلَىٰ أُمَّةٍ) “আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদেরকে একটি দ্বীনে (তরীকা বা জীবনপদ্ধতিতে) পেয়েছি”। [সূরা আয-যুখরুফঃ ২২] তাই ‘উম্মত’ শব্দটি এখানে এমন ব্যক্তি সমষ্টির জন্য ব্যবহৃত হয়েছে যারা কোন সম্মিলিত মৌলিক বিষয়ে একতাবদ্ধ।

নবীগণ যেহেতু স্থান-কালের বিভিন্নতা সত্বেও একই বিশ্বাস ও একই দাওয়াতের উপর একতাবদ্ধ ছিলেন, তাই বলা হয়েছে, তাদের সবাই একই উম্মত। [দেখুন, কুরতুবী; ইবন কাসীর; ফাতহুল কাদীর] পরবর্তী বাক্য নিজেই সে মৌলিক বিষয়ের কথা বলে দিচ্ছে যার উপর সকল নবী একতাবদ্ধ ও একমত ছিলেন। আর তা হলো, একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করা। যার অপর নাম ইসলাম। নবীরা সবাই ইসলামের দিকে আহবান জানিয়েছেন। তাদের দ্বীনও ছিল ইসলাম। তাদের অনুসারীরাও ছিল মুসলিম। এ হিসেবে সমস্ত নবী-রাসূল ও তাদের সত্যিকারের উম্মতগণ একই উম্মত হিসেবে গণ্য। তারা সবাই মুসলিম উম্মত।


(২) আয়াতের মূল বক্তব্য হচ্ছে, নূহ আলাইহিস সালাম থেকে নিয়ে ঈসা আলাইহিস সালাম পর্যন্ত সকল নবী যখন এ তাওহীদ ও আখেরাত বিশ্বাসের শিক্ষা দিয়ে এসেছেন তখন অনিবাৰ্যভাবে এ থেকে প্রমাণ হয়, এ ইসলামই মানুষের জন্য আল্লাহর মনোনীত দ্বীন। সুতরাং একমাত্র তারই তাকওয়া অবলম্বন করা উচিত। তাঁকেই রব মানা এবং তাঁরই কেবল ইবাদাত করাই এর দাবী। এমন কোন কাজ করো না যা তোমাদের উপর আমার আযাবকে অবশ্যম্ভাবী করে দিবে। যেমন আমার সাথে শির্ক করা, অথবা আমার নির্দেশের বিরোধিতা, আমার নিষেধের বিপরীত কাজ করা। [ফাতহুল কাদীর] এ আয়াত অন্য আয়াতের মত যেখানে বলা হয়েছে, আর নিশ্চয় মসজিদসমূহ আল্লাহরই জন্য। কাজেই আল্লাহর সাথে তোমরা অন্য কাউকে ডেকো না।” [সূরা আল-জিন: ১৮] [কুরতুবী]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৫২) নিশ্চয় তোমাদের এই জাতি একই জাতি[1] এবং আমিই তোমাদের প্রতিপালক; অতএব তোমরা আমাকে ভয় কর।


তাফসীর:

[1] أمَّة (জাতি) বলতে দ্বীনকে বুঝানো হয়েছে। আর জাতি বা দ্বীন এক হওয়ার অর্থ সমস্ত নবীগণ একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করার আহবান করে গেছেন। কিন্তু মানুষ তাওহীদ (এক আল্লাহর ইবাদত করার) পথ ছেড়ে দিয়ে বিভিন্ন দল, জাতি ও সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। প্রত্যেক দল নিজ নিজ বিশ্বাস ও কর্ম নিয়ে আনন্দিত; যদিও সে সত্য হতে অনেক দূরে অবস্থান করছে।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৫০-৫৬ নং আয়াতের তাফসীর:



(وَجَعَلْنَا ابْنَ مَرْیَمَ...)



এখানে ঈসা (عليه السلام) ও তাঁর মা মারইয়াম আলাইহাস সালাম-এর কথা বলা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা দুজনকেই নিদর্শন বানিয়েছিলেন। ঈসা (عليه السلام) তো একজন নিজেই নিদের্শন; শিশু অবস্থায় কথা বলেছেন, আল্লাহ তা‘আলার অনুমতিতে মৃত মানুষ জীবিত করতেন, এছাড়াও তাঁকে অনেক নিদর্শন দেয়া হয়েছিল। মারইয়াম (عليه السلام) নিদর্শন হলেনন তিনি বিনা স্বামীতে গর্ভধারণ করেছেন। رَبْوَةٍ অর্থ উঁচু ভূমি। যখন মারইয়াম (عليه السلام) গর্ভবতী হলেন তখন হয়তো লোকালয় থেকে উঁচু কোন স্থানে চলে গিয়েছিলেন। সে জায়গাটা ছিল নিরাপদ, আর প্রস্রবণ বলতে সে ঝরণাকে বুঝানো হয়েছে যা ঈসা (عليه السلام)-এর জন্মের সময় অলৌকিভাবে প্রবাহিত হয়েছিল। এ বিষয়ে পূর্বে সূরা মারইয়ামে আলোচনা করা হয়েছে।



(أَيُّهَا الرُّسُلُ كُلُوْا..... بَلْ لَّا یَشْعُرُوْنَ)



উক্ত আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সমস্ত রাসূলদেরকে নির্দেশ প্রদান করছেন যে, তারা যেন হালাল খাদ্য ভক্ষণ করে এবং সৎ আমল করে। কেননা হালাল ভক্ষণ ব্যতীত সৎ আমল কবূল হয় না। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে:



আবূ হুরাইরাহ (رضي الله عنه) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: হে মানুষ সকল! নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র, আর তিনি পবিত্র ব্যতীত অপবিত্র কোন কিছু গ্রহণ করেন না। আর আল্লাহ তা‘আলা মু’মিনদেরকে তাই নির্দেশ দিয়েছেন যার নির্দেশ দিয়েছেন নাবী-রাসূলদেরকে। তখন তিনি এ আয়াতটি পাঠ করেন। অতঃপর এক ব্যক্তির কথা আলোচনা করলেন, সে তার সফরকে দীর্ঘায়িত করেছে, তার চুলগুলো ছিল এলোমেলো। তার খাদ্য-পানীয় ও পোশাকসহ তার সমস্ত কিছু ছিল হারাম। সে তার দু’হাত আকাশের দিকে তুলে বলতে লাগল, হে আমার প্রতিপালক! হে আমার প্রতিপালক! কিন্তু তার দু‘আ কিভাবে কবূল করা হবে, এটা অসম্ভব। (সহীহ মুসলিম: ৬৫)



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(يٰٓأَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا كُلُوْا مِنْ طَيِّبٰتِ مَا رَزَقْنٰكُمْ وَاشْكُرُوْا لِلّٰهِ إِنْ كُنْتُمْ إِيَّاهُ تَعْبُدُوْنَ)



“হে ঈমানদারগণ! আমি তোমাদেরকে যা জীবিকাস্বরূপ দান করেছি সেই পবিত্র বস্তুসমূহ খাও এবং একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর যদি তোমরা একমাত্র তাঁরই ইবাদত কর।” (সূরা বাকারাহ ২:১৭২) প্রত্যেক নাবী-রাসূল হালাল রুযী উপার্জন করতেন এবং খেতেন। যেমন দাঊদ (عليه السلام)-এর ব্যাপারে এসেছে: তিনি নিজ হাতের পরিশ্রমে উপার্জন খেতেন। (সহীহ বুখারী হা: ২০৭২)



নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: প্রত্যেক নাবী ছাগল চরিয়েছেন। আমিও সামান্য পারিশ্রমিকের বিনিময়ে মক্কাবাসীর ছাগল চরিয়েছি। (সহীহ বুখারী হা: ২২৬২)



সুতরাং প্রত্যেক মু’মিন ও মুসলিম নর-নারীর ওপর আবশ্যক হল যে, হালাল খাদ্য ভক্ষণ করা এবং হারাম খাদ্য পরিহার করা। কেননা হারাম খাদ্য খেয়ে আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করলে সে ইবাদত কখনো কবূল হয় না। তাই মুসলিম সমাজে একজন হারামখোরের কোন সম্মান নেই, যদিও সে কারূনের মত পাহাড় সমান সম্পদ গড়ে তুলে। সম্মান ও ইজ্জতের অধিকারী একমাত্র তারাই যারা পরিশ্রম করে হালাল উপার্জন খায় যদিও তারা গরীব হয়।



অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন, তোমরা সকলে একই জাতি, তোমাদের দীন এক, রব একজন। সুতরাং আল্লাহ তা‘আলার আদেশ পালন আর নিষেধ বর্জন করার মাধ্যমে তাঁকে ভয় কর। এর দ্বারা মূলত আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে দলে দলে বিভক্ত না হয়ে জামাতবদ্ধ হয়ে থাকার নির্দেশ প্রদান করেছেন। আল্লাহ তা‘আলার বাণী:



(اِنَّ ھٰذِھ۪ٓ اُمَّتُکُمْ اُمَّةً وَّاحِدَةًﺘ وَّاَنَا رَبُّکُمْ فَاعْبُدُوْنِﮫوَتَقَطَّعُوْٓا اَمْرَھُمْ بَیْنَھُمْﺚ کُلٌّ اِلَیْنَا رٰجِعُوْنَ)



“নিশ্চয়ই‎ এরা তোমাদের জাতিন এরা তো একই জাতি এবং আমিই তোমাদের প্রতিপালক, অতএব আমার ইবাদত কর‎। কিন্তু তারা নিজেদের ব্যাপারে পরস্পরের মধ্যে ভেদ সৃষ্টি করেছে। প্রত্যেকেই আমার নিকট প্রত্যাবর্তনকারী।” (সূরা আম্বিয়াহ ২১:৯২-৯৩)



এভাবে নিষেধ করার পরও যারা নাবীদের পথ বর্জন করে নিজেদের মাঝে দলাদলি সৃষ্টি করে তারা তাদের দীনকে নাবীদের দীন থেকে সম্পর্কচ্যুত করে ফেলেছে। প্রত্যেক দল নিজেদের নিকট যে সকল দলীল-প্রমাণ রয়েছে তা নিয়ে সন্তুষ্ট, তারা তাদের দলীল-প্রমাণের আলোকে মনে করে তারাই সঠিক পথের ওপর প্রতিষ্ঠিত।



غمرة অর্থ প্রচুর পরিমাণ পানি যা মাটি ঢেকে নেয়। ভ্রষ্টতার অন্ধকারও এত গভীর যে, তাতে নিমজ্জিত ব্যক্তির সত্য দৃষ্টিগোচর হয় না। এখানে غمرة অর্থ বিমূঢ়তা, গাফলতি, উদাসীনতা ও বিভ্রান্তি। আয়াতে ধমকস্বরূপ তাদেরকে বিভ্রান্তিতে থাকতে দেয়া বা ছেড়ে দেয়ার কথা বলা হয়েছে। উপদেশ বা নসীহত করা হতে বাধা দেয়া উদ্দেশ্য নয়। অতএব নিষেধ করা সত্ত্বেও যারা দলে দলে বিভক্ত হয় এবং ফেতনা-ফাসাদ সৃষ্টি করে তাদের স্থান হচ্ছে জাহান্নাম। তাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি থেকে কেউ রক্ষা করতে পারবে না।



সুতরাং প্রত্যেকটি মুসলিমের অবশ্য কর্তব্য হল মুসলিম মিল্লাতকে আঁকড়ে ধরে থাকা এবং দলে দলে পৃথক না হওয়া। যারা দলাদলি সৃষ্টি করে তারা ইসলামের বাইরে।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. সর্বদা হালাল খাদ্য ভক্ষণ করতে হবে।

২. সকল নাবীর ধর্ম একই, আর তা হল এক আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত আর কারো ইবাদত করা যাবে না।

৩. দলে দলে বিভক্ত হওয়া মানে ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করা।

৪. আল্লাহ তা‘আলা যা হালাল করে দিয়েছেন সে সকল বস্তু পবিত্র।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৫১-৫৬ নং আয়াতের তাফসীর:

আল্লাহ তা'আলা তাঁর সমস্ত নবী (আঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তাঁরা যেন হালাল খাদ্য ভক্ষণ করেন এবং সৎ কার্যাবলী সম্পাদন করেন। সুতরাং প্রমাণিত হলো যে, হালাল খাদ্য সৎ কার্যের সহায়ক। নবীগণ (আঃ) সর্বপ্রকারের মঙ্গল সঞ্চয় করেছেন। কথা, কাজ, পথ-প্রদর্শন, উপদেশ ইত্যাদি সবকিছুই জমা করেছেন। এখানে আল্লাহ পাক রং, স্বাদ ইত্যাদি বর্ণনা করেননি, বরং শুধুমাত্র হালাল খাদ্য খেতে বলেছেন। আবূ মাইসারা আমর ইবনে শুরাহবীল (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ঈসা (আঃ) তার মাতার বয়ন করার পারিশ্রমিক হতে খেতেন। সহীহ হাদীসে আছে যে, এমন কোন নবী ছিলেন না যিনি ছাগল চরাননি। সাহাবীগণ তখন জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনিও কি (ছাগল চরিয়েছেন)?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “হ্যা, আমিও কয়েকটি কীরাতের (কীরাত হলো এক আউন্সের চব্বিশভাগের একভাগ পরিমাণ ওজন) বিনিময়ে মক্কাবাসীর ছাগল চরাতাম।”

আর একটি সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, হযরত দাউদ (আঃ) স্বহস্তের উপার্জন হতে ভক্ষণ করতেন। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তা'আলার নিকট সবচেয়ে বেশী পছন্দনীয় রোযা হলো হযরত দাউদ (আঃ)-এর রোযা। আর আল্লাহ তাআলার নিকট সর্বাপেক্ষা প্রিয় কিয়াম (রাত্রিকালে ইবাদতে দাঁড়িয়ে থাকা) হলো হযরত দাউদ (আঃ)-এর কিয়াম। তিনি অর্ধেক রাত্রি ঘুমাতেন, এক তৃতীয়াংশ রাত্রি পর্যন্ত তাহাজ্জুদের নামায পড়তেন এবং এক ষষ্ঠাংশ শুয়ে থাকতেন। একদিন তিনি রোযা রাখতেন ও একদিন রোযা ছেড়ে দিতেন। যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি কখনো পৃষ্ঠ প্রদর্শন করতেন না।

শাদ্দাদ ইবনে আউসের কন্যা হযরত উম্মে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ (একদা) দিনের প্রথম ভাগে কঠিন গরমের সময় আমি এক পেয়ালা দুধ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে প্রেরণ করি এই উদ্দেশ্যে যে, তিনি এটা দ্বারা রোযার ইফতার করবেন। তিনি আমার প্রেরিত দূতকে এই বলে ফিরিয়ে পাঠালেনঃ “এ দুধ যদি তোমার নিজের বকরীর হতো তবে আমি তা পান করতাম। আমি তখন বলে পাঠালামঃ আমি এ দুধ নিজের মাল দ্বারা ক্রয় করেছি। তখন তিনি তা পান করলেন। পরের দিন শাদ্দাদের কন্যা উম্মে আবদিল্লাহ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! দিনের দীর্ঘ সময়ের অত্যন্ত গরমের মধ্যে আমি আপনার নিকট দুধ পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু আপনি আমার দূতকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন (এর কারণ কি?)!` উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হ্যা, আমি এরূপ করতেই আদিষ্ট হয়েছি। নবীরা শুধু হালাল খাদ্যই ভক্ষণ করে থাকেন এবং ভাল কাজই সম্পাদন করেন। (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হে লোক সকল! নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র। পবিত্র ছাড়া তিনি কিছুই কবুল করেন না। মুমিনদেরকে তিনি তিনি ঐ হুকুমই দিয়েছেন যে হুকুম তিনি রাসূলদেরকে (আঃ) দিয়েছেন। তিনি বলেছেনঃ “হে রাসূলগণ! তোমরা পবিত্র খাদ্য ভক্ষণ কর ও সৎ কার্য সম্পাদনা কর এবং জেনে রেখো যে, তোমরা যা কিছু আমল করছে আমি তা দেখতে রয়েছি” আর এক জায়গায় তিনি বলেনঃ “হে মুমিনগণ! তোমরা শৰি ৰাদ্য ভক্ষণ কর যা আমি তোমাদেরকে জীবিকারূপে দান করেছি।` অতঃপর তিনি এমন একটি লোকের বর্ণনা দেন যে দীর্ঘ সফর করে, যার চুল থাকে এলো মেলো এবং চেহারা থাকে ধূলো বালিতে আচ্ছন্ন। সে আকাশের দিকে হাত তুলে বলে হে আমার প্রতিপালক! হে আমার প্রতিপালক!' কিন্তু তার দুআ কবুল করা হবে এটা অসম্ভব (কেননা, সে হারাম পন্থায় উপার্জন করে ও হারাম খাদ্য ভক্ষণ করে)। (এ হাদীসটি সহীহ মুসলিম, জামেউত তিরমিযী ও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন)

মহান আল্লাহর উক্তিঃ ‘তোমাদের এই যে জাতি এটা তো একই জাতি। অর্থাৎ হে নবীগণ (আঃ)! তোমাদের এই দ্বীন একই দ্বীন, এই মিল্লাত একই মিল্লাত। আর তাহলো শরীক বিহীন এক আল্লাহর ইবাদতের দাওয়াত দেয়া। এ জন্যেই এর পরে বলেছেনঃ “আমিই তোমাদের প্রতিপালক! সুতরাং আমাকে ভয় কর।’ সূরায়ে আম্বিয়ায় এর ব্যাখ্যা গত হয়েছে।

(আরবী) এর উপর (আরবী) বা অবস্থা বোধক-এর কারণে যবর দেয়া হয়েছে। যে উম্মতদের নিকট নবীদেরকে (আঃ) পাঠানো হয়েছিল তারা তাদের নিজেদের মধ্যে তাদের দ্বীনকে শতধা বিভক্ত করে ফেলেছিল এবং এতেই তারা সন্তুষ্ট ছিল। তাই মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রত্যেক দলই তাদের নিকট যা আছে তা নিয়েই আনন্দিত। সুতরাং তাদেরকে ধমকের সুরে বলা হচ্ছেঃ কিছুকালের জন্যে তাদেরকে তাদের বিভ্রান্তির মধ্যে থাকতে দাও। অবশেষে তাদের ধ্বংসের সময় এসে পড়বে। তাদেরকে পানাহার ও হাসি খুশীতে মগ্ন থাকতে দাও। সত্বরই তারা তাদের কৃতকর্মের ফল জানতে পারবে।

মহান আল্লাহর উক্তিঃ তারা কি মনে করে যে, আমি তাদেরকে যে মাল-ধন ও সন্তান-সন্ততি দান করেছি তা তাদের মঙ্গলের জন্যে? আমি তাদের উপর সন্তুষ্ট বলেই কি তাদেরকে এ সবকিছু দিয়েছি? কখনই না। তাদের এ ধারণা সম্পূর্ণ অমলক। তারা প্রতারণার মধ্যে পড়ে গেছে। তারা মনে করছে যে, দুনিয়ায় যেমন তারা সুখে-শান্তিতে রয়েছে, অনুরূপভাবে আখিরাতেও তারা সুখ-শান্তি লাভ করবে। তাদেরকে সেখানে তাদের কৃতকর্মের শাস্তি দেয়া হবে না। এটা তাদের সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। তাদেরকে কিছুদিনের জন্যে অবকাশ দেয়া হচ্ছে মাত্র। কিন্তু তারা বুঝে না। প্রকৃত ব্যাপার তারা অনুধাবন করতে পারে না। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অতএব তাদেরকে (কাফিরদেরকে) অবকাশ দাও; তাদেরকে অবকাশ দাও কিছুকালের জন্যে।” (৮৬:১৭) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাকে বিস্মিত না করে; আল্লাহ এর দ্বারা তাদেরকে পার্থিব জীবনে শাস্তি দিতে চান।” (৯:৫৫) অন্য এক জায়গায় রয়েছেঃ ১)

অর্থাৎ “আমি তাদেরকে অবকাশ দিয়ে থাকি যাতে তাদের পাপ বৃদ্ধি হয়।” (৩:১৭৮) মহান আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত। অর্থাৎ “আমাকে ছেড়ে দাও এবং তাকে যাকে আমি সৃষ্টি করেছি অসাধারণ করে। আমি তাকে দিয়েছি বিপুল ধন-সম্পদ এবং নিত্য সঙ্গী পুত্রগণ। আর তাকে দিয়েছি স্বচ্ছন্দ জীবনের প্রচুর উপকরণ। এরপরেও সে কামনা করে যে, আমি তাকে আরো অধিক দিই। না, তা হবে না, সে তো আমার নিদর্শন সমূহের উদ্ধত বিরুদ্ধাচারী।” (৭:১১-১৬) অন্যত্র আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের মাল ও তোমাদের সন্তান-সন্ততি তোমাদেরকে আমার নৈকট্য লাভ করাতে পারবে না, আমার নৈকট্য লাভকারী তো তারাই হবে যারা ঈমান এনেছে ও ভাল কাজ করেছে।” (৩৪:৩৭) এই বিষয়ের আরো বহু আয়াত রয়েছে। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, যে কওমকে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দান করা হয়েছে তারা প্রতারিত হয়েছে। ধন-মাল ও সন্তানাদি দ্বারা মানুষের গুণ ও মহত্ত্ব প্রকাশ পায় না, বরং তাদের কষ্টিপাথর হলো ঈমান ও সৎ আমল।

হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা তোমাদের মধ্যে তোমাদের চরিত্রকে বন্টন করে দিয়েছেন যেমনভাবে তোমদের মধ্যে বন্টন করেছেন তোমাদের জীবিকাকে। যাকে তিনি ভালবাসেন তাকেও দুনিয়া দান করেন এবং যাকে ভালবাসেন না তাকেও দুনিয়া (-এর সুখ-ভাগে) দান করে থাকেন। আর দ্বীন শুধু তাকেই তিনি দান করেন যাকে ভালবাসেন। সুতরাং যাকে আল্লাহ তা'আলা দ্বীন দান করেন, জানবে যে, তাকে তিনি ভালবাসেন। যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! বান্দা মুসলিম হয় না যে পর্যন্ত না তার হৃদয় ও জিহ্বা মুসলিম হয়। আর বান্দা মুমিন হয় না যে পর্যন্ত না তার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ হয়।” সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তার অনিষ্ট কি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “প্রতারণা, যুলুম ইত্যাদি। জেনে রেখো যে, যে ব্যক্তি হারাম উপায়ে মাল উপার্জন করে, অতঃপর তা থেকে খরচ করে, তার খরচে বরকত দেয়া হয় না এবং সে যে দান করে সেই দান গৃহীত হয় না। সে যা কিছু ছেড়ে যাবে তা হবে তার জন্যে জাহান্নামের খাদ্যসম্ভার। আল্লাহ তাআলা মন্দকে মন্দ দ্বারা মুছে ফেলেন না। বরং তিনি মন্দকে মিটিয়ে থাকেন ভাল দ্বারা। কলুষতা কলুষতাকে দূর করে না। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।