সূরা আল-মুমিনুন (আয়াত: 41)
হরকত ছাড়া:
فأخذتهم الصيحة بالحق فجعلناهم غثاء فبعدا للقوم الظالمين ﴿٤١﴾
হরকত সহ:
فَاَخَذَتْهُمُ الصَّیْحَۃُ بِالْحَقِّ فَجَعَلْنٰهُمْ غُثَآءً ۚ فَبُعْدًا لِّلْقَوْمِ الظّٰلِمِیْنَ ﴿۴۱﴾
উচ্চারণ: ফাআখাযাতহুমুসসাইহাতুবিলহাক্কিফাজা‘আলনা-হুম গুছাআন ফাবু‘দাল লিলকাওমিজ্জা-লিমীন।
আল বায়ান: অতঃপর যথার্থই তাদেরকে এক বিকট আওয়াজ পেয়ে বসল, তারপর আমি তাদেরকে খড়কুটায় পরিণত করলাম। সুতরাং যালিম কওমের জন্য ধ্বংস।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৪১. তারপর এক বিরাট আওয়াজ সত্যন্যায়ের সাথে(১) তাদেরকে পাকড়াও করল, ফলে আমরা তাদেরকে তরঙ্গ-তাড়িত আবর্জনার মত(২) করে দিলাম। কাজেই যালেম সম্প্রদায়ের জন্য রইল ধ্বংস।
তাইসীরুল ক্বুরআন: অতঃপর সত্যি সত্যিই এক ভয়ঙ্কর শব্দ তাদেরকে আঘাত করল আর তাদেরকে ভাগাড়ে পরিণত করলাম, কাজেই ধ্বংস হোক পাপী সম্প্রদায়।
আহসানুল বায়ান: (৪১) অতঃপর সত্যসত্যই এক বিকট শব্দ[1] তাদেরকে পাকড়াও করল এবং আমি তাদেরকে তরঙ্গ-তাড়িত আবর্জনা সদৃশ করে দিলাম;[2] সুতরাং ধ্বংস হয়ে গেল যালেম সম্প্রদায়।
মুজিবুর রহমান: অতঃপর সত্য সত্যই এক বিকট শব্দ তাদেরকে আঘাত করল এবং আমি তাদেরকে তরঙ্গ তাড়িত আবর্জনা সদৃশ করে দিলাম; সুতরাং ধ্বংস হয়ে গেল যালিম সম্প্রদায়।
ফযলুর রহমান: তারপর বিকট আওয়াজ ঠিকই তাদেরকে ঘায়েল করেছিল এবং আমি তাদেরকে আবর্জনায় পরিণত করেছিলাম। অতএব, অকল্যাণ রয়েছে জালেম সমপ্রদায়ের জন্য।
মুহিউদ্দিন খান: অতঃপর সত্য সত্যই এক ভয়ংকর শব্দ তাদেরকে হতচকিত করল এবং আমি তাদেরকে বাত্যা-তাড়িত আবর্জনা সদৃশ করে দিলাম। অতঃপর ধ্বংস হোক পাপী সম্প্রদায়।
জহুরুল হক: কাজেই এক মহাগর্জন তাদের পাকড়াও করল সঙ্গতভাবেই, আর আমরা তাদের বানিয়ে দিলাম আবর্জনা, তাই দূর হ’ল অত্যাচারী জাতি!
Sahih International: So the shriek seized them in truth, and We made them as [plant] stubble. Then away with the wrongdoing people.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৪১. তারপর এক বিরাট আওয়াজ সত্যন্যায়ের সাথে(১) তাদেরকে পাকড়াও করল, ফলে আমরা তাদেরকে তরঙ্গ-তাড়িত আবর্জনার মত(২) করে দিলাম। কাজেই যালেম সম্প্রদায়ের জন্য রইল ধ্বংস।
তাফসীর:
(১) অর্থাৎ তাদের উপর যে আযাব এসেছে সেটা যথার্থ ছিল। তাদের উপর কোন প্রকার যুলুম করা হয়নি। তাদের অপরাধের কারণেই সেটা এসেছে। আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাদের উপর যুলুম করেন না। তারা কুফরি ও সীমালঙ্ঘনের মাধ্যমে এটার হকদার হয়েছিল। সম্ভবত: বিরাট আওয়াজের সাথে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা ঝড়ো বাতাসও তাদের পেয়ে বসেছিল। [ইবন কাসীর]। যেমন অন্য আয়াতে এসেছে, “এটা তার রবের নির্দেশে সমস্ত কিছুকে ধ্বংস করে দেবে।” অতঃপর তাদের পরিণাম এ হল যে, তাদের বসতিগুলো ছাড়া আর কিছুই দেখা গেল না।” [সূরা আল-আহকাফ: ২৫]
(২) মূলে غثاء শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এর মানে হয় বন্যার তোড়ে ভেসে আসা ময়লা আবর্জনা, যা পরবর্তী পর্যায়ে কিনারায় আটকে পড়ে পচে যেতে থাকে। [ফাতহুল কাদীর]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৪১) অতঃপর সত্যসত্যই এক বিকট শব্দ[1] তাদেরকে পাকড়াও করল এবং আমি তাদেরকে তরঙ্গ-তাড়িত আবর্জনা সদৃশ করে দিলাম;[2] সুতরাং ধ্বংস হয়ে গেল যালেম সম্প্রদায়।
তাফসীর:
[1] এই বিকট শব্দের ব্যাপারে বলা হয় যে, এটি জিবরীল (আঃ)-এর শব্দ ছিল। আবার কেউ কেউ বলেন, এটি এমনিই একটি বিকট শব্দ ছিল, যার সঙ্গে ছিল প্রচন্ড ঝড়। এই দুয়ে মিলে তাদেরকে এক নিমেষে ধ্বংস করে ফেলল।
[2] غُثَاء হল সেই পানির স্রোতে ভেসে যাওয়া আবর্জনা; যাতে গাছের ছাল-পাতা, শুকনো ডাল-পালা, খড়কুটো ইত্যাদি জিনিস থাকে। আর যখন পানির স্রোত কমে যায়, তখন এগুলো শুকনো অবস্থায় অকেজো হয়ে পড়ে থাকে। ঠিক এই অবস্থাই হল এই সব অহংকারী মিথ্যাজ্ঞানকারিদের।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৩১-৪১ নং আয়াতের তাফসীর:
পূর্বের আয়াতগুলোতে নূহ (عليه السلام) ও তাঁর জাতি এবং যারা অবাধ্য ছিল তাদেরকে যেভাবে ধ্বংস করা হয়েছে সে সম্পর্কে আলোচনার পর এখানে আল্লাহ তা‘আলা বলছেন, ‘অতঃপর তাদের পরে অন্য এক সম্প্রদায় সৃষ্টি করেছিলাম’। নূহ (عليه السلام)-এর জাতিকে ধ্বংস করার পর অন্য যে জাতি সৃষ্টি করা হয়েছিল তারা হল সামূদ জাতি, যাদের কাছে সালেহ (عليه السلام)-কে প্রেরণ করা হয়েছিল। কারণ এ ঘটনা তাদের ঘটনার সাথে সাদৃশপূর্ণ। কেউ বলেছেন, তারা হল আদ জাতি। আল্লাহ তা‘আলা তাদের কাছে নাবী হিসেবে শু‘আইব (عليه السلام)-কে প্রেরণ করলেন। পূর্বের নাবীর মত তিনিও তাওহীদের দিকে দাওয়াত দিলেন। কিন্তু জাতির যারা নেতৃস্থানীয় এবং ক্ষমতাসীন তারা কুফরী করল এবং আখিরাতকে অস্বীকার করল। যেমন পূর্বের অন্যান্য জাতির নেতৃস্থানীয় লোকেরা কুফরী করেছিল। তাদের বিশ্বাস ছিল যিনি রাসূল হবেন তিনি আমাদের মত খাওয়া, পান করা থেকে অমুখাপেক্ষী হবেন, তিনি আমাদের থেকে আলাদা বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হবেন। তাই তারা তাদের মত খায়, পান করে এমন রাসূলকে মেনে নিতে পারল না। এখানে একটি বিষয় সুস্পষ্ট হয়ে যায় পূর্বের যুগের কাফিররাও জানত যে, যাকে তাদের কাছে রাসূল হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছে তিনি আমাদের মত রক্ত মাংসের মাটির তৈরি একজন মানুষ, খাওয়া-পান করার প্রয়োজন হয়। কিন্তু আমাদের সমাজে একশ্রেণির মুসলিম রয়েছে যারা আমাদের রাসূলকে মাটির তৈরি বিশ্বাস করতে চায় না। অথচ সকল নাবীকে মানুষের মধ্য হতেই প্রেরণ করা হয়েছে। তাছাড়া কুরআনে অনেক দলীল রয়েছে যা প্রমাণ করে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের মত মাটির তৈরি রক্ত মাংসের মানুষ।
(وَأَتْرَفْنٰهُمْ فِي الْحَيٰوةِ الدُّنْيَا)
অর্থাৎ আখিরাতে বিশ্বাস না করা ও পার্থিব সুখ-বিলাসের আতিশয্য... এ দুটি ছিল রাসূলের প্রতি ঈমান না আনার মূল কারণ। আজও বাতিলপন্থীরা উক্ত দু’কারণে হক পন্থীদের বিরোধিতা ও সত্যের দাওয়াত থেকে বিমুখ হয়।
সুতরাং সালেহ (عليه السلام)-এর জাতিরা বলল, তোমরা যদি তোমাদের মত একজন মানুষের অনুসরণ কর তাহলে তো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ মানুষ মানুষকে হিদায়াত দিতে পারে না, সে জন্য তার সাথে কোন ফেরেশতা থাকবে বা বড় কোন নিদর্শন থাকবে।
هَيْهَاتَ هَيْهَاتَ
অর্থাৎ তোমাদেরকে মৃত্যুর পর পুনরুত্থিত করা হবে বলে সে যে প্রতিশ্র“তি দিচ্ছে তা অসম্ভব, কোন দিনও তা হতে পারে না। বরং আমাদের যে দুনিয়ার জীবন এ জীবনই শেষ, জীবিত আছি, মারা যাব, আমাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে না। এ ব্যক্তি তোমাদেরকে যে পুনরুত্থানের প্রতিশ্র“তি প্রদান করছে, মূলত সে এ কথা বলে আল্লাহ তা‘আলার ওপর মিথ্যারোপ করছে।
এভাবে সালেহ (عليه السلام)-কে মিথ্যারোপ করলে নূহ (عليه السلام)-এর মত তিনিও আল্লাহর কাছে দু‘আ করলেনন ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে সাহায্য করুন; কারণ তারা আমাকে মিথ্যাবাদী বলে।’
(قَالَ رَبِّ انْصُرْنِيْ)
অর্থাৎ সালেহ (عليه السلام)-এর দু‘আ কবূল করে আল্লাহ তা‘আলা জানিয়ে দিলেনন অচিরেই তারা অনুতপ্ত হবে কিন্তু সে অনুতাপ কোন কাজে আসবে না। অতঃপর তাদেরকে বিকট আওয়াজ পাকড়াও করল এবং তারাও ধ্বংস হলো। এ সম্পর্কে সূরা হূদসহ অন্যন্য সূরাতে আলোচনা করা হয়েছে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. আল্লাহ তা‘আলা প্রত্যেক জাতির কাছে রাসূল প্রেরণ করেছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই তাওহীদের দিকে স্বজাতিকে আহ্বান করেছেন।
২. প্রত্যেক যুগের নেতৃস্থানীয় ও ক্ষমতাসীন ব্যক্তিরাই সত্যের বিরোধিতা করেছে এবং রাসূলদের সাথে বেআদবী করেছে।
৩. পৃথিবীর সকল বস্তুবাদীদের জন্য এখানে শিক্ষা রয়েছে যে, পূর্বের যুগের মানুষেরা পুনরুত্থানকে অস্বীকার করত ফলে তাদের পরিণাম ভাল হয়নি।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৩১-৪১ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, হযরত নূহ (আঃ)-এর পরেও বহু উম্মতের আগমন ঘটে। বলা হয়েছে যে, (আরবী) দ্বারা আদ সম্প্রদায়কে বুঝানো হয়েছে। আবার একথাও বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা বুঝানো হয়েছে সামূদ সম্প্রদায়কে। তাদের উপর বিকট শব্দের শাস্তি এসেছিল। যেমন এই আয়াতে রয়েছে। তাদের কাছেও রাসূল এসেছিলেন এবং আল্লাহর ইবাদত ও তাওহীদের শিক্ষা দিয়েছিলেন। কিন্তু তারা তাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে, বিরোধিতা করে এবং তার আনুগত্য করতে অস্বীকৃতি জানায়। কারণ শুধুমাত্র এটাই যে, তিনি মানুষ। তারা কিয়ামতকেও অস্বীকার করে। শারীরিক পুনরুত্থানকে তারা অবিশ্বাস করে এবং বলেঃ “ওটা অসম্ভব ব্যাপার। এই লোকটি নিজেই এটা বানিয়ে বলছে। আমরা এসব বাজে কথা বিশ্বাস করতে পারি না।” নবী (আঃ) তখন বলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমাকে সাহায্য করুন। কারণ তারা আমাকে মিথ্যাবাদী বলে।” উত্তরে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “অচিরেই তারা অনুতপ্ত হবে।” অতঃপর সত্যসত্যই এক বিকট আওয়ায তাদেরকে আঘাত করলো এবং তাদেরকে তরঙ্গ-তাড়িত আবর্জনা সদৃশ্য করে দেয়া হলো। সুতরাং যালিম সম্প্রদায় ধ্বংস হয়ে গেল। তারা এই শাস্তির যোগ্যই ছিল। প্রচণ্ড ঝটিকার সাথে সাথে ফেরেশতার বিকট ও ভয়াবহ শব্দ তাদেরকে টুকরা টুকরা করে ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন করে দিলো। ভূষির মত তারা উড়ে গেল। রয়ে গেল শুধু তাদের ঘরবাড়ীর ধ্বংসাবশেষ। তাই মহান আল্লাহ বলেনঃ “আমি তাদেরকে তরঙ্গ-তাড়িত আবর্জনা সদৃশ করে দিলাম। সুতরাং ধ্বংস হয়ে গেল যালিম সম্প্রদায়। যেমন অন্য জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাদের প্রতি যুলুম করিনি, বরং তারা নিজেরাই ছিল যালিম।” (৪৩:৭৬) সুতরাং আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর বিরোধিতা ও তাঁকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার ব্যাপারে মানুষের সতর্ক হওয়া উচিত।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।