সূরা আল-হজ্জ (আয়াত: 19)
হরকত ছাড়া:
هذان خصمان اختصموا في ربهم فالذين كفروا قطعت لهم ثياب من نار يصب من فوق رءوسهم الحميم ﴿١٩﴾
হরকত সহ:
هٰذٰنِ خَصْمٰنِ اخْتَصَمُوْا فِیْ رَبِّهِمْ ۫ فَالَّذِیْنَ کَفَرُوْا قُطِّعَتْ لَهُمْ ثِیَابٌ مِّنْ نَّارٍ ؕ یُصَبُّ مِنْ فَوْقِ رُءُوْسِهِمُ الْحَمِیْمُ ﴿ۚ۱۹﴾
উচ্চারণ: হা-যা-নি খাছমা-নিখ তাছামূফী রাব্বিহিম ফাল্লাযীনা কাফারূকুত্তি‘আত লাহুম ছিয়া-বুম মিন্না-রিইঁ ইউসাব্বুমিন ফাওকিরুঊছিহিমুল হামীম।
আল বায়ান: এরা দু’টি বিবদমান পক্ষ, যারা তাদের রব সম্পর্কে বিতর্ক করে। তবে যারা কুফরী করে তাদের জন্য আগুনের পোশাক প্রস্ত্তত করা হয়েছে। তাদের মাথার উপর থেকে ঢেলে দেয়া হবে ফুটন্ত পানি।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৯. এরা দু'টি বিবাদমান পক্ষ(১), তারা তাদের রব সম্বন্ধে বিতর্ক করে; অতএব যারা কুফরী করে তাদের জন্য কেটে তৈরি করা হয়েছে আগুনের পোষাক(২), তাদের মাথার উপর ঢেলে দেয়া হবে ফুটন্ত পানি।
তাইসীরুল ক্বুরআন: এরা বিবাদের দু’টি পক্ষ, (মু’মিনরা একটি পক্ষ, আর সমস্ত কাফিররা আরেকটি পক্ষ) এরা এদের প্রতিপালক সম্বন্ধে বাদানুবাদ করে, অতঃপর যারা (তাদের প্রতিপালককে) অস্বীকার করে, তাদের জন্য তৈরি করা হয়েছে আগুনের পোশাক, তাদের মাথার উপর ঢেলে দেয়া হবে ফুটন্ত পানি।
আহসানুল বায়ান: (১৯) এরা দু’টি বিবদমান দল;[1] তারা তাদের প্রতিপালক সম্বন্ধে বিতর্ক করে। সুতরাং যারা অবিশ্বাস করে, তাদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে আগুনের পোশাক; তাদের মাথার উপর ঢেলে দেওয়া হবে ফুটন্ত পানি।
মুজিবুর রহমান: এরা দু’টি বিবাদমান পক্ষ, তারা তাদের রাব্ব সম্বন্ধে বিতর্ক করে। যারা কুফরী করে তাদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে আগুনের পোশাক; তাদের মাথার উপর ঢেলে দেয়া হবে ফুটন্ত পানি –
ফযলুর রহমান: এরা (বিশ্বাসী আর অবিশ্বাসীরা) দুই প্রতিপক্ষ। তারা তাদের প্রভু সম্বন্ধে পরস্পর বিতর্ক করে। অতএব, অবিশ্বাসীদের জন্য আগুনের পোশাক তৈরী করা হয়েছে। তাদের মাথার ওপর থেকে ফুটন্ত পানি ঢেলে দেওয়া হবে।
মুহিউদ্দিন খান: এই দুই বাদী বিবাদী, তারা তাদের পালনকর্তা সম্পর্কে বিতর্ক করে। অতএব যারা কাফের, তাদের জন্যে আগুনের পোশাক তৈরী করা হয়েছে। তাদের মাথার উপর ফুটন্ত পানি ঢেলে দেয়া হবে।
জহুরুল হক: এরা হচ্ছে দুই প্রতিপক্ষ যারা তাদের প্রভু সন্বন্ধে বিতর্ক করে। তারপর যারা অবিশ্বাস পোষণ করে তাদের জন্যে আগুনের থেকে পোশাক তৈরি করা হয়েছে। তাদের মাথার উপর থেকে ফুটন্ত পানি ঢালা হবে,
Sahih International: These are two adversaries who have disputed over their Lord. But those who disbelieved will have cut out for them garments of fire. Poured upon their heads will be scalding water
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১৯. এরা দু’টি বিবাদমান পক্ষ(১), তারা তাদের রব সম্বন্ধে বিতর্ক করে; অতএব যারা কুফরী করে তাদের জন্য কেটে তৈরি করা হয়েছে আগুনের পোষাক(২), তাদের মাথার উপর ঢেলে দেয়া হবে ফুটন্ত পানি।
তাফসীর:
(১) আয়াতে উল্লেখিত দুই পক্ষ হচ্ছে, সাধারণ মুমিনগণ এবং তাদের বিপরীতে সব কাফের দল; ইসলামের যুগের হোক কিংবা পূর্ববর্তী যুগসমূহের। ইয়াহুদী, নাসারা, সাবেয়ী, মাজুস ও শির্ককারী সবাই এ কাতারভুক্ত। [ফাতহুল কাদীর] বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে, এই আয়াত সেই দুই পক্ষ সম্পর্কে নাযিল হয়েছে, যারা বদরের রণক্ষেত্রে একে অপরের বিপক্ষে সম্মুখ যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল। মুসলিমদের মধ্য থেকে আলী, হামযা, ওবায়দা রাদিয়াল্লাহু আনহুম ও কাফেরদের পক্ষ থেকে ওতবা ইবনে রবী’আ, তার পুত্ৰ ওলীদ ও তার ভাই শায়াবা এতে শরীক ছিল। তন্মধ্যে কাফের পক্ষের তিন জনই নিহত এবং মুসলিমদের মধ্য থেকে আলী ও হামযা রাদিয়াল্লাহু আনহুমা অক্ষত অবস্থায় ফিরে এসেছিলেন। ওবায়দা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু গুরুতর আহত অবস্থায় ফিরে এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে শাহাদাত বরণ করেন। আয়াত যে এই সম্মুখযোদ্ধাদের সম্পর্কে নাযিল হয়েছে, তা বুখারী ও মুসলিমের হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। [দেখুন: বুখারীঃ ২৭৪৩, মুসলিমঃ ৩০৩৩]
কিন্তু বাহ্যতঃ এই হুকুম তাদের সাথেই বিশেষভাবে সম্পর্কযুক্ত নয়; বরং সমগ্র উম্মতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য- যে কোন যামানার উম্মতই হোক না কেন। আয়াতে আল্লাহ সম্পর্কে বিরোধকারী সমস্ত দলগুলোকে তাদের সংখ্যাধিক্য সত্বেও দু'টি পক্ষে বিভক্ত করা হয়েছে। একটি পক্ষ নবীদের কথা মেনে নিয়ে আল্লাহর সঠিক বন্দেগীর পথ অবলম্বন করে। দ্বিতীয় পক্ষ নবীদের কথা মানে না এবং তারা কুফরীর পথ অবলম্বন করে। তাদের মধ্যে বহু মতবিরোধ রয়েছে এবং তাদের কুফৱী বিভিন্ন বিচিত্র রূপও পরিগ্রহ করেছে। কাতাদা বলেন, মুসলিম ও আহলে কিতাব দু'টি দলে বিভক্ত হয়ে তর্কে লিপ্ত হলো। আহলে কিতাবরা বলল, আমাদের নবী তোমাদের নবীর আগে আর আমাদের কিতাব তোমাদের কিতাবের আগে, সুতরাং আমরা তোমাদের থেকে উত্তম। অপরদিকে মুসলিমরা বলল, আমাদের কিতাব সমস্ত কিতাবের মধ্যে ফয়সালা করে (সেগুলোর সত্যাসত্য নিরূপন করে)।
আর আমাদের নবী সর্বশেষ নবী, সুতরাং আমরা তোমাদের থেকে উত্তম। তখন আল্লাহ ইসলামের অনুসারীদেরকে তাদের শক্ৰদের উপর প্রাধান্য দিয়ে আয়াত নাযিল করেন। [ইবন কাসীর] কোন কোন মুফাসসির বলেন, এখানে দুই প্রতিপক্ষ বলে জান্নাত ও জাহান্নাম বোঝানো হয়েছে। জাহান্নাম বলেছিল, আমাকে আপনার শাস্তির জন্য নির্ধারিত করে দিন। আর জান্নাত বলেছিল, আমাকে আপনার দয়ার জন্য নির্ধারিত করে দিন। [ইবন কাসীর; ফাতহুল কাদীর] তবে আয়াতে দু'টি দল বলে মুমিন ও কাফের ধরে নিলে সব মতের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান হয়ে যায়। [তাবারী; ইবন কাসীর]
(২) ভবিষ্যতে যে বিষয়টির ঘটে যাওয়া একেবারে সুনিশ্চিত তার প্রতি জোর দেবার জন্য সেটি এমনভাবে বর্ণনা করা হয় যেন তা ঘটে গেছে। আগুনের পোশাক বলতে সম্ভবত এমন জিনিস বুঝানো হয়েছে যাকে সূরা ইবরাহীমের ৫০ আয়াতে বলা হয়েছে যে, “তাদের জামা হবে আলকাতরার”। অৰ্থাৎ তাদের জন্য আগুনের টুকরা দিয়ে কাপড়ের মত করে তৈরী করে দেয়া হবে। [ইবন কাসীর] সায়ীদ ইবন জুবাইর বলেন, এখানে জামাগুলো হবে, তামার। যা গরম হলে সবচেয়ে বেশী তাপ সৃষ্টি হয়। [ইবন কাসীর]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১৯) এরা দু’টি বিবদমান দল;[1] তারা তাদের প্রতিপালক সম্বন্ধে বিতর্ক করে। সুতরাং যারা অবিশ্বাস করে, তাদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে আগুনের পোশাক; তাদের মাথার উপর ঢেলে দেওয়া হবে ফুটন্ত পানি।
তাফসীর:
[1] هذان خَصمَان (এরা দু’টি বিবদমান দল) এই দু’টি দ্বিবচন শব্দ। কিছু মুফাসসিরের নিকট এ থেকে উক্ত পথভ্রষ্ট দল এবং তাদের মোকাবেলায় মুসলিম দল উদ্দেশ্য বলেছেন। উভয় দল তাদের প্রতিপালক সম্বন্ধে কলহ-বিবাদ করে; মুসলিমরা তাঁর একত্ববাদ ও মৃত্যুর পর পুনর্জীবনে বিশ্বাসী। পক্ষান্তরে দ্বিতীয় দলটি আল্লাহর ব্যাপারে বিভিন্ন ভ্রষ্টতার শিকার। অন্য কিছু মুফাসসিরগণের নিকট এর মাধ্যমে বদর যুদ্ধে শরীক মুসলিম ও কাফেরদের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। যার শুরুতে মুসলিমদের মধ্যে হামযা, আলী, উবাইদাহ (রাঃ), আর অন্য দিকে তাঁদের মোকাবেলায় কাফেরদের মধ্যে উতবা, শাইবাহ ও অলীদ বিন উতবাহ ছিল। (বুখারীঃ সূরা হাজ্জের তাফসীর) ইমাম ইবনে কাসীর বলেন, এই দুই অর্থই সঠিক এবং আয়াতের সাথে সামঞ্জস্যশীল।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১৯-২২ নং আয়াতের তাফসীর:
(هٰذٰنِ خَصْمٰنِ اخْتَصَمُوْا فِيْ رَبِّهِمْ...) শানে নুযূল:
সাহাবী আবূ যার (رضي الله عنه) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: এ আয়াত হামযা (رضي الله عنه) ও তার দুই কাফির প্রতিদ্বন্দ্বী উবাইদা ও হারেস এবং আলী (رضي الله عنه) ও তার প্রতিদ্বন্দ্বী উতবাহ ও শাইবাহ প্রমুখের ব্যাপারে বদরের যুদ্ধের দিন নাযিল হয়। (সহীহ বুখারী হা: ৪৭৪৩, সহীহ মুসলিম হা: ৩০৩৩)
(هٰذٰنِ خَصْمٰنِ)
‘এরা দু’টি বিবদমান পক্ষ’ অর্থাৎ ১৭ নং আয়াতে উল্লিখিত বিভিন্ন দলের দিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহ তা‘আলা বলছেন: এ দু’ দল তথা মু’মিনদের দল ও অন্য (ইয়াহূদী, খ্রিস্টান, অগ্নিপূজক, সাবেয়ী ও মুশরিক) সকল কাফিরদের দল সবাই দাবী করে, তারা তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে সঠিক পথের ওপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু যারা কাফির (ইয়াহূদী, খ্রিস্টান, অগ্নিপূজক, সাবেয়ী ও মুশরিক) তাদের জন্য জাহান্নামের আগুনের পোশাক প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে এবং জাহান্নামে তাদের মাথার ওপর গরম পানি ঢেলে দেয়া হবে। পানি এত গরম হবে যে, তাদের পেটে যা কিছু আছে এবং তাদের গায়ের চামড়া গলে যাবে। আর জাহান্নামের ফেরেশতাদের হাতে লোহার হাতুড়ি থাকবে যা দ্বারা তাদের মাথায় আঘাত করবে। যখনই জাহান্নাম থেকে বের হতে চাইবে তখন ফেরেশতারা হাতুড়ি দিয়ে মাথায় আঘাত করে আবার জাহান্নামে ফিরিয়ে দিবে আর তিরস্কার করে বলবেন জাহান্নামের শাস্তি আস্বাদন কর। জাহান্নামীদের জন্য আগুনের পোশাক সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(سَرَابِيْلُهُمْ مِّنْ قَطِرَانٍ وَّتَغْشٰي وُجُوْهَهُمُ النَّارُ)
“তাদের জামা হবে আলকাতরার এবং অগ্নি আচ্ছন্ন করবে তাদের মুখমণ্ডল; (সূরা ইবরাহীম ১৪:৫০) আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
(أُولٰ۬ئِكَ الَّذِيْنَ أُبْسِلُوْا بِمَا كَسَبُوْا ج لَهُمْ شَرَابٌ مِّنْ حَمِيْمٍ وَّعَذَابٌ أَلِيْمٌۭ بِمَا كَانُوْا يَكْفُرُوْنَ)
“এরাই নিজেদের কৃতকর্মের জন্য ধ্বংস হবে; কুফরীর কারণে এদের জন্য রয়েছে ফুটন্ত পানীয় ও মর্মন্তুদ শাস্তি।” (সূরা আন‘আম ৬:৭০) জাহান্নামীদের পানীয় হিসেবে থাকবে গরম পানি যা তাদের পেটে যা আছে তা এবং তাদের চামড়া বিগলিত করবে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَإِنْ يَّسْتَغِيْثُوْا يُغَاثُوْا بِمَا۬ءٍ كَالْمُهْلِ يَشْوِي الْوُجُوْهَ)
“তারা পানীয় চাইলে তাদেরকে দেয়া হবে গলিত ধাতুর ন্যায় পানীয়, যা তাদের মুখমণ্ডল দগ্ধ করবে।” (সূরা কাহফ ১৮:২৯) ইমাম ইবনু কাসীর (রহঃ) বলেন: (শানে নুযূল ও তাফসীরে বর্ণিত কথা) উভয়ই ঠিক এবং আয়াতের সাথে সামঞ্জস্যশীল।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. প্রত্যেকেই দাবী করে তারা সঠিক পথের ওপর রয়েছে কিন্তু যাদের কোন সঠিক দলীল নেই তাদের দাবী গ্রহণযোগ্য নয়।
২. জাহান্নামীদের শাস্তির বিবরণ জানতে পেলাম।
৩. জাহান্নামীদের শাস্তি দেয়ার জন্য দায়িত্বশীল ফেরেশতা থাকবে।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১৯-২২ নং আয়াতের তাফসীর:
বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু যার (রাঃ) শপথ করে বলতেনঃ (আরবী) এই আয়াতটি হযরত হামযা (রাঃ) ও তাঁর দু’জন কাফির প্রতিদ্বন্দ্বী যারা বদরের যুদ্ধে তার প্রতিদ্বন্দ্বীতায় নেমেছিল এবং উত্তা’ ও তার দুই সঙ্গীর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়।” (এটা সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণনা করা হয়েছে)
হযরত কায়েস ইবনু ইবাদ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আলী ইবনু আবি তালিব (রাঃ) বলেনঃ “আমি কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম আমার যুক্তি পেশ করার জন্যে আল্লাহ তাআলার সামনে হাঁটুর ভরে পড়ে যাবো। হযরত কায়েস (রাঃ) বলেন যে, তার ব্যাপারেই এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।` (এটা ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন) বদরের যুদ্ধের দিন এই লোকগুলি একে অপরের সামনে এসেছিল। মুসলমানদের পক্ষ হতে ছিলেন হযরত আলী (রাঃ), হযরত হামযা (রাঃ) ও হযরত উবাইদাহ্ (রাঃ) এবং তাদের মুকাবিলায় কাফিরদের পক্ষ হতে এসেছিল যথাক্রমে শায়বা উবা’ এবং ওয়ালীদ। অন্য একটি উক্তি রয়েছে যে, এই দুটি বিবাদমান দল দ্বারা মুসলমান ও আহলে কিতাবকে বুঝানো হয়েছে। আহলে কিতাব মুসলমানদেরকে বলতোঃ “আমাদের নবী (আঃ) তোমাদের নবীর (সঃ) পূর্বে এসেছিলেন এবং আমাদের আসমানী কিতাব তোমাদের আসমানী কিতাবের পূর্বে অবতীর্ণ হয়েছে। সুতরাং তোমাদের অপেক্ষা আমরাই আল্লাহ তাআলার বেশী নিকটবর্তী। পক্ষান্তরে, মুসলমানরা তাদেরকে বলতেনঃ “আমাদের কিতাব তোমাদের কিতাবের ফায়সালাকারী এবং আমাদের নবী (সঃ) হলেন খাতেমুল আম্বিয়া। কাজেই আমরা তোমাদের চেয়ে উত্তম।” অতঃপর মহান আল্লাহ ইসলামকে জয়যুক্ত করেন এবং এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা সত্যতা প্রতিপাদনকারী এবং মিথ্যা প্রতিপন্নকারীদেরকে বুঝানো হয়েছে। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এই আয়াতে মু'মিন ও কাফিরের দৃষ্টান্ত দেয়া হয়েছে যারা কিয়ামত সম্পর্কে বিতর্কে লিপ্ত হয়েছিল। ইকরামা (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা জান্নাত ও জাহান্নামের উক্তি উদ্দেশ্য। জাহান্নাম প্রার্থনা করেছিল। “আমাকে শাস্তির মাধ্যম বানিয়ে দিন!” আর জান্নাত আবেদন জানিয়েছিলঃ “আমাকে রহমত (এর মাধ্যম) করুন।” মুজাহিদের (রঃ) উক্তি এই সমুদয় উক্তিকে অন্তর্ভূক্ত করে। বদরের ঘটনাও এরই অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। মু'মিনরা আল্লাহর দ্বীনের বিজয় কামনা করছিলেন। আর কাফিররা ঈমানের জ্যোতিকে নির্বাপিত করতে, সত্যের পতন ঘটাতে এবং বাতিলকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাচ্ছিল। ইমাম ইবনু জারিরও (রঃ) মুজাহিদের (রঃ) উক্তিটিই পছন্দ করেছেন এবং এটা অতি উত্তমও বটে। কেননা, এরপরেই রয়েছে যে, কাফিরদের জন্যে প্রস্তুত করা হয়েছে আগুনের পোশাক। এটা হবে তামার আকৃতি বিশিষ্ট। আর তাদের মাথার উপর ঢেলে দেয়া হবে ফুটন্ত পানি। এর ফলে তাদের উদরে যা আছে তা এবং তাদের চর্ম বিগলিত হয়ে যাবে।
হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “তাদের মাথার উপর গরম ফুটন্ত পানি ঢেলে দেয়া হবে। ফলে তাদের নাড়িভূঁড়ি ইত্যাদি পেট থেকে বেরিয়ে পায়ের উপর পড়ে যাবে। তারপর যেমন ছিল তেমনই হয়ে যাবে। আবার এইরূপ করা হবে।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
আবদুল্লাহ ইবনু সুররী (রঃ) বলেন যে, ফেরেশতা গরম পানির ঐ বাতিকে ওর কড়া দুটি ধরে আনয়ন করবেন এবং জাহান্নামীর মুখে ঢেলে দিতে চাইবেন। তখন সে হত বুদ্ধি হয়ে মুখ ফিরিয়ে নেবে। ফেরেশতা তখন তার মাথার উপর লোহার হাতুড়ী মারবেন। ফলে তার মাথা ফেটে যাবে। সেখান দিয়ে ফেরেশতা ঐ ফুটন্ত পানি ঢেলে দিবেন এবং ওটা সরাসরি তার পেটের মধ্যে প্রবেশ করবে।
রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যে হাতুড়ীগুলি দ্বারা জাহান্নামীদেরকে মারা হবে, যদি ওগুলির একটি যমীনে এনে রেখে দেয়া হয় তবে সমস্ত দানব ও মানব মিলেও তা উঠাতে সক্ষম হবে না। (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে)
হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)। বলেছেনঃ “যদি ঐ হাতুড়ি দ্বারা হাড়ের উপর মারা হয় তবে তা চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যাবে। ঐভাবে জাহান্নামীদের দেহও চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে। তারপর যেমন ছিল তেমনই করে দেয়া হবে। যে রক্ত পূজ জাহান্নামীদের খাদ্য হবে যদি ওর এক বাতি দুনিয়ায় বহিয়ে দেয়া হয় তবে ওর দুর্গন্ধে সমস্ত দুনিয়াবাসী ধ্বংস হয়ে যাবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)
হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ঐ হাতুড়ির আঘাত লাগা মাত্রই জাহান্নামীদের দেহের এক একটি অঙ্গ খসে পড়বে এবং সে হায়! হায়! বলে চীৎকার করবে।
মহান আল্লাহ বলেনঃ যখনই তারা যন্ত্রণায় কাতর হয়ে জাহান্নাম থেকে বের হতে চাইবে তখনই তাকে তাতে ফিরিয়ে দেয়া হবে।
হযরত সালমান (রঃ) বলেন যে, জাহান্নামের আগুন হবে কঠিন কালো ও ভীষণ অন্ধকারময়। ওর শিখাও উজ্জ্বল নয় এবং ওর অঙ্গারও আলোকোজ্জ্বল হবে না। অতঃপর তিনি এই আয়াতটি পাঠ করেন। হযরত যায়েদ ইবনু আসলাম (রাঃ) বলেন যে, জাহান্নামী তাতে শ্বাসও নিতে পারবে না।
হযরত ফু্যাইল ইবনু আইয়ায (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহর শপথ! জা হান্নামীদের সেখান থেকে ছুটবার কোন আশাও থাকবে না। তাদের পায়ে থাকবে ভারী বেড়ি এবং হাতে থাকবে শক্ত হাত কড়া। তবে অগ্নি শিখা তাদেরকে এতো উচুতে উঠিয়ে দেবে যে, যেন তারা বাইরে বেরিয়েই যায়। আর কি! কিন্তু ফেরেশতাদের ঘনের আঘাত খেয়ে তারা নীচে পড়ে যাবে। তাদেরকে বলা হবেঃ এখন আস্বাদ গ্রহণ কর দহন-যন্ত্রণা। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদেরকে বলা হবে তোমরা ঐ আগুনের শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করো যাকে তোমরা মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে।” তোমরা ওটাকে মিথ্যা জানতে কথা ও কাজে উভয় দিক দিয়েই।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।