সূরা আল-আম্বিয়া (আয়াত: 9)
হরকত ছাড়া:
ثم صدقناهم الوعد فأنجيناهم ومن نشاء وأهلكنا المسرفين ﴿٩﴾
হরকত সহ:
ثُمَّ صَدَقْنٰهُمُ الْوَعْدَ فَاَنْجَیْنٰهُمْ وَ مَنْ نَّشَآءُ وَ اَهْلَکْنَا الْمُسْرِفِیْنَ ﴿۹﴾
উচ্চারণ: ছু ম্মা সাদাকনা-হুমুল ওয়া‘দা ফাআনজাইনা-হুম ওয়া মান নাশাউ ওয়া আহলাকনাল মুছরিফীন।
আল বায়ান: অতঃপর আমি তাদের প্রতি কৃত ওয়াদা পূর্ণ করলাম। আর আমি তাদেরকে ও যাদেরকে ইচ্ছা করি রক্ষা করলাম এবং সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে ধ্বংস করে দিলাম।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৯. তারপর আমরা তাদের প্রতি কৃত ওয়াদা সত্য করে দেখলাম, ফলে আমরা তাদেরকে ও যাদেরকে ইচ্ছে রক্ষা করেছিলাম এবং সীমালংঘনকারীদেরকে করেছিলাম ধ্বংস।(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: অতঃপর আমি তাদেরকে দেয়া আমার ওয়া‘দা সত্যে পরিণত করলাম। ফলতঃ আমি তাদেরকে এবং আরো যাদেরকে চাইলাম রক্ষা করলাম আর সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে ধ্বংস করে দিলাম।
আহসানুল বায়ান: (৯) অতঃপর আমি তাদের প্রতি আমার প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করলাম, সুতরাং আমি তাদেরকে এবং যাদেরকে ইচ্ছা রক্ষা করলাম। আর সীমালংঘনকারীদেরকে ধ্বংস করলাম। [1]
মুজিবুর রহমান: অতঃপর আমি তাদের প্রতি আমার প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করলাম, আমি তাদেরকে ও যাদেরকে ইচ্ছা রক্ষা করেছিলাম এবং যালিমদেরকে করেছিলাম ধ্বংস।
ফযলুর রহমান: অতঃপর আমি তাদেরকে দেওয়া ওয়াদা সত্যে পরিণত করেছি এবং তাদেরকে ও (তাদের সাথে) যাদেরকে ইচ্ছা রক্ষা করেছি আর সীমালংঘন-কারীদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছি।
মুহিউদ্দিন খান: অতঃপর আমি তাদেরকে দেয়া আমার প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করলাম সুতরাং তাদেরকে এবং যাদেরকে ইচ্ছা বাঁচিয়ে দিলাম এবং ধবংস করে ছিলাম সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে।
জহুরুল হক: তারপর তাঁদের কাছে আমরা ওয়াদা পূর্ণ করেছিলাম, সুতরাং আমরা তাঁদের উদ্ধার করেছিলাম আর তাদেরও যাদের আমরা ইচ্ছা করেছিলাম, আর আমরা ধ্বংস করেছিলাম সীমা-লংঘনকারীদের।
Sahih International: Then We fulfilled for them the promise, and We saved them and whom We willed and destroyed the transgressors.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৯. তারপর আমরা তাদের প্রতি কৃত ওয়াদা সত্য করে দেখলাম, ফলে আমরা তাদেরকে ও যাদেরকে ইচ্ছে রক্ষা করেছিলাম এবং সীমালংঘনকারীদেরকে করেছিলাম ধ্বংস।(১)
তাফসীর:
(১) অর্থাৎ পূর্ববর্তী ইতিহাসের শিক্ষা শুধুমাত্র একথা বলে না যে, পূর্বে যেসব রাসূল পাঠানো হয়েছিল তারা মানুষ ছিলেন বরং একথাও বলে যে, তাদের সাহায্য ও সমর্থন করার এবং তাদের বিরোধিতাকারীদেরকে ধ্বংস করে দেবার যতগুলো অংগীকার আল্লাহ তাদের সাথে করেছিলেন সবই পূর্ণ হয়েছে এবং যেসব জাতি তাদের প্রতি অমর্যাদা প্ৰদৰ্শন করার চেষ্টা করেছিল তারা সবাই ধ্বংস হয়েছে। [ইবন কাসীর] কাজেই নিজেদের পরিণতি তোমরা নিজেরাই চিন্তা করে নাও।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৯) অতঃপর আমি তাদের প্রতি আমার প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করলাম, সুতরাং আমি তাদেরকে এবং যাদেরকে ইচ্ছা রক্ষা করলাম। আর সীমালংঘনকারীদেরকে ধ্বংস করলাম। [1]
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, প্রতিশ্রুতি অনুসারে নবীদের ও মু’মিনদেরকে আমি মুক্তিদান করলাম এবং সীমালংঘনকারী কাফের ও মুশরিকদের আমি ধ্বংস করে দিলাম।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৭-৯ নং আয়াতের তাফসীর:
এ আয়াতে মক্কার কাফির-মুশরিকসহ সকল যুগের রাসূলের ব্যাপারে ভ্রান্ত ধারণা পোষণকারীদের জবাব দেয়া হয়েছে। নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে দেখে মক্কার মুশরিকরা বলছিল এ কেমন রাসূল! যে খাবার খায়, বাজারে যায়। রাসূল তো এমন হওয়া দরকার যার আমাদের মত খাওয়া, পান করা এবং বাজারে যাওয়ার প্রয়োজন হবেনা, বরং রাসূল হবেন একজন ফেরেশতা বা তার সাথে ফেরেশতা থাকবেন।
আল্লাহ তা‘আলা বলছেন: ‘তোমার পূর্বে রাসূল হিসেবে আমি পুরুষ মানুষই পাঠিয়েছিলাম’ অর্থাৎ যত রাসূল দুনিয়াতে আগমন করেছে সবাই পুরুষ মানুষ ছিলেন। তাদের এমন শরীর দিয়েছিলেন যা খাবারের মুখাপেক্ষী ছিল, তারা চিরস্থায়ীও ছিলনা। অতএব হে মক্কাবাসী! তোমাদের যদি এ কথা বিশ্বাস না হয় তাহলে যারা জ্ঞানী তথা তোমাদের মাঝে আসমানী কিতাবের জ্ঞান রয়েছে এমন ব্যক্তিদের জিজ্ঞেস কর। যেমন আহলে কিতাবরা, যারা তাওরাত ও ইনজিল পেয়েছে এবং সঠিক ধর্মের ওপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। এখান থেকে আরেকটি বিষয় বুঝা গেল যে, কোন নারী নাবী হননি। কারণ নবুআতের দায়িত্ব ও কর্তব্য এমন, যা কোন নারীর স্বভাব ও প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যেমন আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
(وَمَآ أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ إِلَّا رِجَالًا نُّوْحِيْٓ إِلَيْهِمْ مِّنْ أَهْلِ الْقُرٰي)
“তোমার পূর্বেও জনপদবাসীর মধ্য হতে পুরুষকেই প্রেরণ করেছিলাম, যাদের নিকট ওয়াহী পাঠাতাম।” (সূরা ইউসুফ ১২:১০৯)
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
(وَمَا جَعَلْنَا لِبَشَرٍ مِّنْ قَبْلِكَ الْخُلْدَ ط أَفَاْئِنْ مِّتَّ فَهُمُ الْخٰلِدُوْنَ)
“আমি তোমার পূর্বেও কোন মানুষকে অনন্ত জীবন দান করিনি; সুতরাং তোমার মৃত্যু হলে তারা কি চিরজীবী হয়ে থাকবে?” (সূরা আম্বিয়া ২১:৩৪)
যদি দুনিয়াতে ফেরেশতা বসবাস করত তাহলে ফেরেশতাকে রাসূল হিসেবে প্রেরণ করতেন।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(قُلْ لَّوْ كَانَ فِي الْأَرْضِ مَلَا۬ئِكَةٌ يَّمْشُوْنَ مُطْمَئِنِّيْنَ لَنَزَّلْنَا عَلَيْهِمْ مِّنَ السَّمَا۬ءِ مَلَكًا رَّسُوْلًا)
“বল: ‘ফেরেশতাগণ যদি নিশ্চিন্ত হয়ে পৃথিবীতে বিচরণ করত তবে আমি আকাশ হতে তাদের নিকট অবশ্যই ফেরেশ্তা রাসূল করে পাঠাতাম।’’ (সূরা ইসরা ১৭:৯৫)
أَهْلَ الذِّكْرِ
অর্থ আহলুল ইলম বা জ্ঞানী, এখানে আহলে কিতাবদেরকে বুঝানো হয়েছে যারা পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবের জ্ঞান রাখত। এ আয়াত থেকে অনেকে তাকলীদের দলীল পেশ করতে অপচেষ্টা করে থাকে। বরং এ আয়াত তাকলীদের বিরুদ্ধে দলীল। বলা হয়েছে না জানা থাকলে জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞেস করতে। আর জ্ঞানী তো একজন নয়, জ্ঞানী ব্যক্তি অনেক থাকেন। সুতরাং কোন বিষয়ে না জানা থাকলে সুষ্ঠু সমাধানের জন্য একাধিক জ্ঞানীর কাছে জিজ্ঞাসা করবে।
অতএব মানুষকেই রাসূল হিসেবে প্রেরণ করা মানুষদের জন্য উপযোগী ও যুক্তিযুক্ত। যেহেতু সাধারণ মানুষের মতই নাবী-রাসূলগণ মাটির তৈরী, সেহেতু তারাও আহার গ্রহণ করা, বাজারে যাতায়াত করার মুখাপেক্ষী ছিল, এটাই স্বাভাবিক। সুতরাং এসব প্রমাণাদি পেশ করার পরেও যারা সঠিক বিষয়ে ঈমান আনবে না তাদের ধ্বংস অনিবার্য, যেমন পূর্ববর্তীরা হয়েছিল।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. সকল রাসূল মাটির তৈরি ছিলেন, মানুষের যা প্রয়োজন হত তাদেরও তাই হত।
২. জানা না থাকলে যারা জানে তাদের নিকট মানার উদ্দেশ্যে জেনে নিতে হবে।
৩. কোন মানুষ দুনিয়াতে চিরস্থায়ী নয়, এমন কি নাবী-রাসূলগণও নন।
৪. কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা আলেমের তাকলীদ করা বৈধ নয়, বরং যিনি কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে সঠিক ফায়সালা দেবেন তার কথাই গ্রহণ করতে হবে।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৭-৯ নং আয়াতের তাফসীর:
মানুষের মধ্য হতে কেউ যে রাসূল হতে পারেন কাফিররা এটা অস্বীকার করতো। তাদের এই বিশ্বাস খণ্ডন করার জন্যে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ হে নবী (সাঃ) তোমার পূর্বে যত নবী ও রাসূল এসেছিল সবাই তো মানুষই ছিল, তাদের কেউই ফেরেশতা ছিল না। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তোমার পূর্বে আমি যত সব রাসূল পাঠিয়েছিলাম এবং তাদের কাছে ওয়াহী করেছিলাম তারা সূবাই শহরবাসী মানুষই ছিল।” (১২৪ ১০৯) অন্য এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে নবী (সঃ) ! তুমি বলঃ আমি তো নতুন অসাধারণ এবং প্রথম নবী নই।” (৪৬:১) এই কাফিরদের পূর্ববর্তী কাফিররাও তাদের নবীদেরকে মান্য করার ব্যাপারে এই কৌশলই অবলম্বন করেছিল। যেমন কুরআন কারীমে এই বর্ণনা রয়েছে যে, তারা বলেছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ “একজন মানুষই কি আমাদেরকে পথ প্রদর্শন করবে?” (৬৪:৬) এখানে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ আচ্ছা, তোমরা আহলে ইলম অর্থাৎ ইয়াহুদী, খৃস্টান ও অন্যান্য দলকে জিজ্ঞেস করে দেখো তো যে, তাদের কাছে কি মানুষই রাসূল হয়ে এসেছিল, না ফেরেশতা?` এটাও আল্লাহ তাআলার একটা অনুগ্রহ যে, মানুষের কাছে তাদেরই মত মানুষকে রাসূলরূপে প্রেরণ করে থাকেন যাতে তারা তাদের সাথে উঠা বসা করতে পারে এবং তাদের নিকট হতে শিক্ষা গ্রহণ করতে সক্ষম হয়। আর যাতে তারা তাদের কথাই বুঝতে পারে। তাদের কেউই এরূপ দেহ বিশিষ্ট ছিল না যে, তাদের পানা হারের প্রয়োজন হতো না। বরং তারা সবাই পানাহারের মুখাপেক্ষী ছিল যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমার পূর্বে যতগুলি রাসূল পাঠিয়েছিলাম তারা সবাই খাদ্য খেতো এবং বাজারে চলাফেরাও করতো।` (২৫:২০) অর্থাৎ তারা সবাই মানুষই ছিল। মানুষের মতই তারা পানাহার করতো এবং কাজকর্ম ও ব্যবসা বাণিজ্যের জন্যে বাজারে গমনাগমন করতে থাকতো।
সুতরাং এগুলো তাদের পয়গম্বরীর পরিপন্থী নয়। যেমন মুশরিকরা বলতোঃ (আরবী) অর্থাৎ “এটা কেমন রাসূল যে, সে খাদ্য খায় ও বাজারে গমনাগমন করে? তার কাছে কোন ফেরেশতা আসে না কেন, যে তার সংগে থাকত সতর্ককারীরূপে? আচ্ছা এটা না হয় না-ই হলো, তা হলে তাকে কোন ধন ভাণ্ডারের মালিক বানিয়ে দেয়া হয় নাই কেন? কেনই বা তাকে কোন বাগান প্রদান করা হয় নাই। যদ্ধারা সে স্বচ্চলভাবে জীবন যাপন করতো?” (২৫:৭-৮) অনুরূপভাবে পূর্ববর্তী নবীরাও দুনিয়ায় চিরস্থায়ী ভাবে অবস্থান করে নাই। এসেছে ও গিয়েছে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের পূর্বে কোন মানুষের জন্যে আমি চিরস্থায়ী জীবন করি নাই।` (২১৪ ৩৪) তাদের কাছে অবশ্যই আল্লাহর ওয়াহী আসতো এবং ফেরেশতারা তাঁর আহ্কাম পৌঁছিয়ে দিতেন। ফুমের কারণে ধ্বংস হয়ে যায় এবং তারা পরিত্রাণ পায়। তাদের অনুসারীরাও সফলকাম হয় এবং সীমা অতিক্রমকারীদেরকে অর্থাৎ নবীদেরকে যারা মিথ্যা প্রতিপাদন করেছিল তাদেরকে তিনি ধ্বংস করে দেন।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।