সূরা আল-আম্বিয়া (আয়াত: 14)
হরকত ছাড়া:
قالوا ياويلنا إنا كنا ظالمين ﴿١٤﴾
হরকত সহ:
قَالُوْا یٰوَیْلَنَاۤ اِنَّا کُنَّا ظٰلِمِیْنَ ﴿۱۴﴾
উচ্চারণ: কা-লূইয়া-ওয়াইলানাইন্না-কুন্না-জা-লিমীন।
আল বায়ান: তারা বলল, ‘হায় আমাদের দুর্ভোগ! আমরা তো অবশ্যই যালিম ছিলাম।’
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৪. তারা বলল, হায়! দুর্ভোগ আমাদের! আমরা তো ছিলাম যালেম।(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: তারা বলল, ‘হায় আমাদের দুর্ভাগ্য! আমরা সত্যিই অন্যায়কারী ছিলাম।’
আহসানুল বায়ান: (১৪) ওরা বলল, ‘হায় দুর্ভোগ আমাদের! আমরা ছিলাম সীমালংঘনকারী।’
মুজিবুর রহমান: তারা বললঃ হায় দুর্ভোগ আমাদের! আমরাতো ছিলাম যালিম।
ফযলুর রহমান: তারা বলল, “হায় আমাদের কপাল! নিশ্চয়ই আমরা জালেম ছিলাম।”
মুহিউদ্দিন খান: তারা বললঃ হায়, দুর্ভোগ আমাদের, আমরা অবশ্যই পাপী ছিলাম।
জহুরুল হক: তারা বলেছিল -- "হায় আমাদের দুর্ভোগ! আমরা তো আলবৎ অন্যায়কারী ছিলাম।"
Sahih International: They said, "O woe to us! Indeed, we were wrongdoers."
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১৪. তারা বলল, হায়! দুর্ভোগ আমাদের! আমরা তো ছিলাম যালেম।(১)
তাফসীর:
(১) অর্থাৎ খেলা-তামাসা করা আমার কাজ নয়। এগুলোকে আমি অনাহুত ও আসার সৃষ্টি করিনি। বরং এটা বোঝানোর জন্য যে, এর একজন সৃষ্টিকর্তা রয়েছে, যিনি ক্ষমতাবান, যার নির্দেশ মানতে সবাই বাধ্য। তিনি নেককার ও বদকারের শাস্তি বিধান করবেন। তিনি আসমান ও যমীন এজন্যে সৃষ্টি করেননি যে মানুষ একে অপরের উপর যুলুম করবে। এজন্যে সৃষ্টি করেননি যে, তাদের কেউ কুফরী করবে, তাদেরকে যা নির্দেশ দেয়া হয়েছে তার বিরোধিতা করবে। তারপর মারা যাবে কিন্তু তাদের কোন শাস্তি হবে না। তাদেরকে এজন্যে সৃষ্টি করা হয়নি যে, তাদেরকে দুনিয়াতে ভাল কাজের নির্দেশ দিবেন না, খারাপ কাজ থেকে নিষেধ করবেন না। এ ধরনের খেলা একজন প্রাজ্ঞ থেকে কখনও হতে পারে না। এটা অবশ্যই প্রজ্ঞা বিরোধী কাজ। [কুরতুবী] বরং আল্লাহ আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন যথাযথভাবে, ইনসাফ ও ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠার জন্য। বরং তিনি সৃষ্টি করেছেন, “যাতে তিনি তাদের কাজের প্রতিফল দিতে পারেন যারা মন্দ কাজ করে এবং তাদেরকে তিনি উত্তম পুরস্কার দিতে পারেন যারা সৎকাজ করে।” [সূরা আন-নাজম: ৩১] [ইবন কাসীর]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১৪) ওরা বলল, ‘হায় দুর্ভোগ আমাদের! আমরা ছিলাম সীমালংঘনকারী।’
তাফসীর:
-
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১০-১৫ নং আয়াতের তাফসীর:
কুরআন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-সহ সকল মুসলিমদের জন্য সম্মান, মর্যাদা ও গৌরবের বস্তু। كِتٰبًا দ্বারা উদ্দেশ্য কুরআন, যিকর দ্বারা উদ্দেশ্য সম্মান। অর্থাৎ আমি আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের জন্য যে কুরআন নাযিল করেছি তাতো তোমাদের সম্মান ও মর্যাদার বস্তু। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সম্মান ও মর্যাদা হল, এটা তাঁর ওপর নাযিল করা হয়েছে, এটা তাঁর চিরস্থায়ী মু‘জিযাহ। আর মুসলিমদের জন্য সম্মান হল যদি মুসলিমরা এ কুরআন অনুসরণ করে তাহলে দুনিয়াতে সুপ্রতিষ্ঠিত হতে পারবে, তারা মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হতে পারবে যেমন অধিষ্ঠিত হয়েছিল সাহাবায়ে কেরাম।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
إِنَّ اللّٰهَ يَرْفَعُ بِهَذَا الْكِتَابِ أَقْوَامًا، وَيَضَعُ بِهِ آخَرِينَ)
আল্লাহ তা‘আলা এ কিতাবের মাধ্যমে একজাতিকে মর্যাদার আসনে উন্নীত করেন আরেক জাতিকে করেন অপমানিত। (সহীহ মুসলিম হা: ৮১৭) আখিরাতের সম্মান হল, কুরআন আমাদের পক্ষে সাক্ষ্য দিবে যদি তা মেনে চলি। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
وَالْقُرْآنُ حُجَّةٌ لَكَ أَوْ عَلَيْكَ
কুরআন তোমার পক্ষে দলীল হবে অথবা তোমার বিপক্ষে দলীল হবে। (সহীহ মুসলিম হা: ২২৩)
সুতরাং মুসলিমরা যদি এ কুরআন মেনে চলে তাহলে তারা মর্যাদার আসনে সমাসীন হতে পারবে যে মর্যাদার আসনে সমাসীন হয়েছিল সাহাবায়ে কেরাম।
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন, তিনি অনেক জনপদকে তাদের জুলুমের কারণে ধ্বংস করে দিয়েছেন, তারপর অন্যজাতি নিয়ে এসেছেন। قصم অর্থ ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ করা। যেমন সূরা মু’মিনূনে বলা হয়েছে আল্লাহ তা‘আলা নূহ (عليه السلام)-এর অবাধ্য জাতিকে ধ্বংস করে অন্য জাতি তথা সামুদ জাতি নিয়ে এসেছেন, তাদের মধ্যে যারা অবাধ্য হয়েছিল তাদেরকে ধ্বংস করে অন্য জাতি তথা লূত, শু‘আইব ও আইয়ূব প্রমুখ নাবীদের জাতি নিয়ে এসেছিলেন। আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
(وَكَمْ أَهْلَكْنَا مِنَ الْقُرُوْنِ مِنْۭ بَعْدِ نُوْحٍ ط وَكَفٰي بِرَبِّكَ بِذُنُوْبِ عِبَادِه۪ خَبِيْرًاۭبَصِيْرًا)
“নূহের পর আমি কত মানবগোষ্ঠী ধ্বংস করেছি! তোমার প্রতিপালক তাঁর বান্দাদের পাপাচারের সংবাদ রাখা ও পর্যবেক্ষণের জন্য যথেষ্ট।” (সূরা বানী ইসরাঈল ১৭:১৭)
ركض অর্থ ঘোড়ার ওপর চড়ে তাকে দৌড়ানোর জন্য পায়ের গোড়ালি দ্বারা আঘাত করা। অর্থাৎ যখন তারা চোখ দ্বারা আযাব দেখল এবং কান দ্বারা গর্জন শুনতে পেল তখন খুব দ্রুতগতিতে পলায়ন করার চেষ্টা করল। আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে তিরস্কার করে বলছেন, তোমরা পলায়ন করা না বরং সুখ-শান্তি ও ভোগ-বিলাসের জন্য যে উপকরণ তৈরি সংগ্রহ, জাঁকজমকপূর্ণ প্রাসাদ তৈরি করেছ সেগুলোর দিকে ফিরে এসো। কিন্তু তাদের পরিত্রাণের কোন উপায় নেই যেখানেই যাক না কেন।
خامد অর্থ নিভে যাওয়া আগুন। অর্থাৎ তাদেরকে শেষ পর্যন্ত কাটা ফসল ও নিভে যাওয়া আগুনের মত ভষ্মস্তুপে পরিণত না করা পর্যন্ত দুঃখ, অকল্যাণ ও আফসোসের আর্তনাদ করতেই থাকবে।
অতএব বোঝা গেল যে, আল্লাহ তা‘আলা কোন জনপদকে অযথা ধ্বংস করবেন না বরং তারা যখন জুলুমের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যায় তখনই তাদের ওপর নেমে আসে শাস্তি। আল্লাহ তা‘আলার শাস্তি নেমে আসার পর আর্তনাদ করে কোন উপকার হবে না। সুতরাং মক্কাবাসী তোমরা কেন এসব উপদেশ বাণী পাওয়ার পরেও সতর্ক হচ্ছো না?
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. কুরআন মুসলিমের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের মাধ্যম।
২. কুরআনের মাধ্যমে আল্লাহ এক জাতিকে সম্মানিত করেন, অপর জাতিকে অপমানিত করেন।
৩. যুগে যুগে অবাধ্য জাতিকে ধ্বংস করে অন্য জাতি নিয়ে আসা হয়েছিল। কিন্তু অধিকাংশরাই নাবীদের বিরোধিতা করেছে।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১০-১৫ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তাআলা স্বীয় পাক কালামের ফজিলত বর্ণনা করতঃ ওর মর্যাদার প্রতি আগ্রহ উৎপদিনের নিমিত্তে বলেনঃ তোমাদের উপর আমি এই কিতাব (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি। এতে তোমাদের শ্রেষ্ঠত্ব, তোমাদের দ্বীন, তোমাদের শরীয়ত এবং তোমাদের কথা আলোচিত হয়েছে। তবুও কি তোমরা বুঝবে না ও জ্ঞান লাভ করবে না? তোমরা কি এই গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামতের কদর করবে না? যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমার জন্যে ও তোমার কওমের জন্যে এটা উপদেশ এবং সত্বরই তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে।` (৪৩:৪৪)।
এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ আমি ধ্বংস করেছি কতজনপদ, যার অব্বিাসীরা ছিল যালিম। অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “নূহের (আঃ) পরে আমি বহু জনপদকে ধ্বংস করে দিয়েছি।` আর এক জায়গায় রয়েছেঃ “এমন বহু জনপদ, যা পূর্বে উন্নতি ও জঁকজমকপূর্ণ ছিল, কিন্তু পরে জনগণের জুলুমের কারণে আমি ওগুলিকে ধ্বংস করে দিয়েছি।”
মহান আল্লাহ বলেনঃ তাদেরকে ধ্বংস করে দেয়ার পর আমি তাদের স্থলে সৃষ্টি করেছি অপর জাতিকে। এক কওমের পর অন্য কওম এবং এরপর আর এক কওম, এভাবেই একে অপরের স্থলাভিষিক্ত হতে থেকেছে।
যখন ঐ লোকগুলি শাস্তি আসতে দেখে নেয় তখন তাদের বিশ্বাস হয়ে যায় যে, আল্লাহর নবীর ফরমান মোতাবেক আল্লাহর শান্তি এসে গেছে। তখন তারা হতবুদ্ধি হয়ে পালাবার পথ খুঁজতে থাকে। এদিক ওদিক তারা দৌড়তে শুরু করে। তখন তাদেরকে বলা হয়ঃ পলায়ন করো না, বরং নিজেদের প্রাসাদের দিকে এবং আরাম আয়েশ ও সুখ-সামগ্রীর দিকে ফিরে এসো। তোমাদের সাথে প্রশ্নোত্তর চলবে যে, তোমরা আল্লাহর নিয়ামত রাজির জন্যে তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিলে কি না। এই নির্দেশ হবে তাদেরকে ধমক দেয়া এবং লাঞ্ছিত ও অপমানিত করা হিসেবে। ঐ সময় তারা নিজেদের পাপরাশির কথা স্বীকার করে নেবে। তারা স্পষ্টভাবে বলবেঃ “আমরা তো ছিলাম অত্যাচারী। কিন্তু তখনকার স্বীকার করে কোনই লাভ হবে না। আল্লাহ পাক বলেনঃ তাদের এই আর্তনাদ চলতে থাকে যতক্ষণ না আমি তাদেরকে কর্তিত শস্য ও নির্বাপিত অগ্নি সদৃশ না করি।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।