সূরা ত্ব-হা (আয়াত: 135)
হরকত ছাড়া:
قل كل متربص فتربصوا فستعلمون من أصحاب الصراط السوي ومن اهتدى ﴿١٣٥﴾
হরকত সহ:
قُلْ کُلٌّ مُّتَرَبِّصٌ فَتَرَبَّصُوْا ۚ فَسَتَعْلَمُوْنَ مَنْ اَصْحٰبُ الصِّرَاطِ السَّوِیِّ وَ مَنِ اهْتَدٰی ﴿۱۳۵﴾
উচ্চারণ: কুল কুল্লুম মুতারাব্বিসুন ফাতারাব্বাসূ ফাছাতা‘লামূনা মান আসহা-বুসসিরা-তিছ ছাবিইয়ি ওয়া মানিহতাদা-
আল বায়ান: বল, ‘প্রত্যেকেই প্রতীক্ষা করছে, অতএব তোমরাও প্রতীক্ষায় থাক। শীঘ্রই তোমরা জানতে পারবে কারা সঠিক পথের উপর রয়েছে এবং কারা হিদায়াতপ্রাপ্ত’।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৩৫. বলুন, প্রত্যেকেই প্রতীক্ষা করছে, কাজেই তোমরাও প্রতিক্ষা কর(১)। তারপর অচিরেই তোমরা জানতে পারবে কারা রয়েছে সরল পথে এবং কারা সৎপথ অবলম্বন করেছে।(২)
তাইসীরুল ক্বুরআন: বল, (ইসলামের অনুসারীদের পরিণতি দেখার জন্য চারপাশের) সবাই অপেক্ষা করছে, কাজেই তোমরাও অপেক্ষা কর, তাহলেই তোমরা জানতে পারবে যে, কারা সরল পথের পথিক আর কারা সঠিক পথপ্রাপ্ত।
আহসানুল বায়ান: (১৩৫) বল, ‘প্রত্যেকেই প্রতীক্ষা করছে[1] সুতরাং তোমরাও প্রতীক্ষা কর। অতঃপর তোমরা জানতে পারবে কারা আছে সরল পথে এবং কারা সৎপথ অবলম্বন করেছে।’ [2]
মুজিবুর রহমান: বলঃ প্রত্যেকেই প্রতীক্ষা করছে, সুতরাং তোমরাও প্রতীক্ষা কর, অতঃপর তোমরা জানতে পারবে কারা রয়েছে সরল পথে এবং কারা সৎ পথ প্রাপ্ত হয়েছে।
ফযলুর রহমান: বল, “সবাই প্রতীক্ষা করছে। অতএব, তোমরাও প্রতীক্ষা কর। তোমরা শিগগিরই জানতে পারবে, কারা সঠিক পথের অনুসারী এবং কারা হেদায়েতপ্রাপ্ত হয়েছে।”
মুহিউদ্দিন খান: বলুন, প্রত্যেকেই পথপানে চেয়ে আছে, সুতরাং তোমরাও পথপানে চেয়ে থাক। অদূর ভবিষ্যতে তোমরা জানতে পারবে কে সরল পথের পথিক এবং কে সৎপথ প্রাপ্ত হয়েছে।
জহুরুল হক: তুমি বলো -- " প্রত্যেকেই প্রতীক্ষা করছে, সুতরাং তোমরাও প্রতীক্ষা কর, তাহলে অচিরেই তোমরা জানতে পারবে কারা সঠিক পথের লোক এবং কারা সৎপথে চলেছে।"
Sahih International: Say, "Each [of us] is waiting; so wait. For you will know who are the companions of the sound path and who is guided."
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১৩৫. বলুন, প্রত্যেকেই প্রতীক্ষা করছে, কাজেই তোমরাও প্রতিক্ষা কর(১)। তারপর অচিরেই তোমরা জানতে পারবে কারা রয়েছে সরল পথে এবং কারা সৎপথ অবলম্বন করেছে।(২)
তাফসীর:
(১) অর্থাৎ যখন থেকে এ দাওয়াতটি তোমাদের শহরে পেশ করা হয়েছে তখন থেকে শুধুমাত্র এ শহরের নয় বরং আশেপাশের এলাকারও প্রতিটি লোক এর শেষ পরিণতি দেখার জন্য অপেক্ষা করছে। কার জন্য বিজয় রয়েছে এটা মুমিন, কাফের সবাই দেখার অপেক্ষায় আছে। [কুরতুবী]
(২) অর্থাৎ আজ তো আল্লাহ্ তা'আলা প্রত্যেককে মুখ দিয়েছেন, প্রত্যেকেই তার তরীকা ও কর্মকে উৎকৃষ্ট ও বিশুদ্ধ বলে দাবী করতে পারে। কিন্তু এই দাবী কোন কাজে আসবে না। উৎকৃষ্ট ও বিশুদ্ধ তরীকা তা-ই হতে পারে, যা আল্লাহর কাছে প্রিয় ও বিশুদ্ধ। আল্লাহর কাছে কোনটি বিশুদ্ধ, তার সন্ধান কেয়ামতের দিন প্রত্যেকেই পেয়ে যাবে। তখন সবাই জানতে পারবে যে, কে ভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট ছিল এবং কে বিশুদ্ধ ও সরল পথে ছিল। কে জান্নাতে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছে। [কুরতুবী] এটা কুরআনের অন্য আয়াতের মত হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে, “আর যখন তারা শান্তি প্রত্যক্ষ করবে, তখন জানতে পারবে কে অধিক পথভ্রষ্ট।” [সূরা আল-ফুরকান: ৪২] [ইবন কাসীর]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১৩৫) বল, ‘প্রত্যেকেই প্রতীক্ষা করছে[1] সুতরাং তোমরাও প্রতীক্ষা কর। অতঃপর তোমরা জানতে পারবে কারা আছে সরল পথে এবং কারা সৎপথ অবলম্বন করেছে।’ [2]
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, কাফের ও মুসলিম প্রত্যেকেই এই অপেক্ষায় আছে যে, দেখা যাক, কুফর বিজয়ী হয়, না ইসলাম।
[2] অর্থাৎ, সে জ্ঞান তোমাদের হয়ে যাবে যে, আল্লাহর সাহায্যে সফল ও কৃতকার্য কারা হবে। বলা বাহুল্য, এই সফলতা মুসলিমদের ভাগে এসেছিল। আর তাতে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, ইসলামই সরল পথ এবং তার অনুসারীরাই সৎপথপ্রাপ্ত।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১৩৩-১৩৫ নং আয়াতের তাফসীর:
মক্কার কাফির-মুশরিকরা বলত: মুহাম্মাদ যদি সত্য রাসূল হয়ে থাকে তাহলে তাঁর রবের থেকে কোন নিদর্শন নিয়ে আসে না কেন? অর্থাৎ তাদের মনমত নিদর্শন নিয়ে আসতে হবে। যেমন সূরা ইসরার ৯০-৯৩ নং আয়াতে বলা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহে তথা তাওরাত ইনজিল, যাবুর ইত্যাদিতে কি সুস্পষ্ট প্রমাণ আসেনি? সেখানে বলা হয়েছিল, আহমাদ নামে একজন নাবী আসবে, তাঁর কী কী গুণ থাকবে তাও আলোচনা করা হয়েছে। তারপরেও তাদের ঈমান আনতে বাধা কোথায়? মূলত যাদের ওপর আল্লাহর আযাবের কথা নির্ধারিত হয়ে গেছে তারা ঈমান আনবে না।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(إِنَّ الَّذِيْنَ حَقَّتْ عَلَيْهِمْ كَلِمَةُ رَبِّكَ لَا يُؤْمِنُوْنَ لا وَلَوْ جَا۬ءَتْهُمْ كُلُّ اٰيَةٍ حَتّٰي يَرَوُا الْعَذَابَ الْأَلِيْمَ)
“নিশ্চয়ই যাদের বিরুদ্ধে তোমার প্রতিপালকের বাক্য সাব্যস্ত হয়ে গিয়েছে, তারা ঈমান আনবে না, যদিও তাদের নিকট প্রত্যেকটি নিদর্শন আসে (তবুও তারা ঈমান আনবে না) যতক্ষণ না তারা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে।” (সূরা ইউনুস ১০:৯৬)
(مِّنْ قَبْلِھ۪)
তার পূর্বে বলতে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বুঝানো হয়েছে।
(كُلٌّ مُّتَرَبِّصٌ)
অর্থাৎ তোমরা আমার মৃত্যুর অপেক্ষা কর, আমি তোমাদের শাস্তির অপেক্ষা করি।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(قُلْ ھَلْ تَرَبَّصُوْنَ بِنَآ اِلَّآ اِحْدَی الْحُسْنَیَیْنِﺚ وَنَحْنُ نَتَرَبَّصُ بِکُمْ اَنْ یُّصِیْبَکُمُ اللہُ بِعَذَابٍ مِّنْ عِنْدِھ۪ٓ اَوْ بِاَیْدِیْنَاﺢ فَتَرَبَّصُوْٓا اِنَّا مَعَکُمْ مُّتَرَبِّصُوْنَ)
“বল: ‘তোমরা আমাদের দু’টি মঙ্গলের একটির প্রতীক্ষা করছ এবং আমরা প্রতীক্ষা করছি যে, আল্লাহ তোমাদেরকে শাস্তি দেবেন সরাসরি নিজ পক্ষ হতে অথবা আমাদের হস্ত দ্বারা। অতএব তোমরা প্রতীক্ষা কর, আমরাও তোমাদের সাথে প্রতীক্ষা করছি।’’ (সূরা তাওবা ৯:৫২)
মূলত যারা ঈমান না আনার তাদেরকে শত নিদর্শন দেখালেও ঈমান আনবে না। যারা আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করে তারাই দাওয়াতের মাধ্যমে উপকৃত হয়।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর গুণাগুণের বর্ণনা পূর্ববর্তী কিতাবেও এসেছিল।
২. যাদের প্রতি আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে হিদায়াত নেই তারা দাওয়াতের মাধ্যমেও কোন উপকৃত হয় না। যেমন রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর চাচা আবূ তালিব হয়নি।
সূরা ত্ব-হা-র তাফসীর সমাপ্ত
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১৩৩-১৩৫ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তাআলা কাফিরদের সম্পর্কে খবর দিচ্ছেন যে, তারা বলতোঃ এই নবী (সঃ) তার সত্যবাদিতার প্রমাণ স্বরূপ কোন মু'জিযা দেখাচ্ছেন না কেন? তাদেরকে উত্তরে বলা হচ্ছেঃ এটা হচ্ছে ঐ কুরআন যা পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবসমূহের খবর অনুযায়ী আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবী উম্মীর (সঃ) উপর অবতীর্ণ করেছেন, যিনি লেখা পড়া জানেন না। দেখো, এতে পূর্ববর্তী লোকদের অবস্থা লিপিবদ্ধ রয়েছে এবং ঠিক ঐ সব কিতাব মুতাবেকই রয়েছে যেগুলি ইতিপূর্বে আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে অবতীর্ণ হয়েছিল। কুরআন কারীম এ সবগুলোর রক্ষক। পূর্ববর্তী কিতাব গুলি হ্রাস বৃদ্ধি হতে পবিত্র নয় বলে কুরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে, যেন এটা ওগুলির শুদ্ধ ও অশুদ্ধকে পৃথক করে দেখিয়ে দেয় সূরায়ে আকাবৃতে কাফিরদের এই প্রতিবাদের জবাবে বলা হছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তুমি বলঃ নিদর্শন আল্লাহর ইচ্ছাধীন, আমি তো একজন প্রকাশ্য সতর্ককারী মাত্র। এটা কি তাদের জন্যে যথেষ্ট নয় যে, আমি তোমার নিকট কুরআন অবতীর্ণ করেছি যা তাদের নিকট পাঠ করা হয়? এতে অবশ্যই মু'মিন সম্প্রদায়ের জন্যে অনুগ্রহ ও উপদেশ রয়েছে।” (২৯:৫০-৫১)
রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক নবীকে (আঃ) এমন মু'জিযা দেয়া। হয় যে, তা দেখে মানুষ তাঁর নুবওয়াতের উপর ঈমান আনয়ন করে। কিন্তু আমাকে (মু'জিযারূপে) ওয়াহীর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা এই কিতাব অর্থাৎ কুরআন দান করেছেন। আমি আশা করি যে, কিয়ামতের দিন সমস্ত নবীর (আঃ) অনুসারী অপেক্ষা আমার অনুসারীদের সংখ্যা বেশী হবে।” (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)
এটা স্মরণীয় বিষয় যে, এখানে রাসূলুল্লাহর (সঃ) সবচেয়ে বড় মুজিযা’র বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। এর অর্থ এটা নয় যে, এ ছাড়া তাঁর অন্য কোন মুজিযা ছিলই না। এই পবিত্র কুরআন ছাড়াও তার মাধ্যমে বহু মু'জিযা প্রকাশ পেয়েছে যা গণনা করা যাবে না। কিন্তু ঐ অসংখ্য মুজিযার উপর সবেচেয়ে বড় মু'জিযা হলো এই কুরআন কারীম।
মহান আল্লাহ বলেনঃ যদি আমি এই সম্মানিত ও মর্যাদা সম্পন্ন শেষ নবীকে (সঃ) প্রেরণ করার পূর্বেই এই কাফিরদেরকে শাস্তি দ্বারা ধ্বংস করে দিতাম তবে তারা ওজর পেশ করে বলতোঃ যদি আমাদের কাছে কোন নবী আসতেন এবং আল্লাহ তাআলার কোন ওয়াহী অবতীর্ণ হতো তবে অবশ্যই আমরা তাঁর উপর ঈমান আনয়ন করতাম এবং তার অনুসরণ করতাম। আর তাহলে এই লাঞ্ছনা ও অপমান থেকে বাঁচতে পারতাম।” এ জন্যে আমি তাদের ঐ ওজরও কেটে দিলাম। তাদের কাছে রাসূল (সঃ) পাঠালাম এবং কিতাবও অবতীর্ণ করলাম। কিন্তু তথাপি ঈমান আনয়নের সৌভাগ্য তারা লাভ করলো না। আমি খুব ভালই জানি যে, একটি কেন, হাজার হাজার নিদর্শন দেখলেও তারা ঈমান আনবেন না! হাঁ,তবে যখন শাস্তি স্বচক্ষে দেখবে তখন ঈমান আনবে। কিন্তু তখন ঈমান আনা বৃথা। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি এই পবিত্র ও কল্যাণময় কিতাব অবতীর্ণ করেছি, সুতরাং তোমরা এর অনুসরণ কর ও ভয় কর, তাহলে তোমাদের উপর করুণা বর্ষণ করা হবে।` (৬:১৫৫) তিনি আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা আল্লাহর নামে শপথ করে বলে যে, যদি তাদের কাছে। কোন নিদর্শন আসে তবে তারা অবশ্যই ওর উপর ঈমান আনয়ন করবে।” (৬:১০৯)
এরপর আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবীকে (সঃ) বলেনঃ হে মুহাম্মদ (সঃ) ! যারা তোমাকে মিথ্যা প্রতিপাদন করছে, তোমার বিরুদ্ধাচরণ করছে এবং তাদের কুফরী ও হঠকারিতার উপর স্থির থাকছে তাদেরকে বলে দাওঃ প্রত্যেকেই প্রতীক্ষা করছে, সুতরাং তোমরাও প্রতীক্ষা কর, অতঃপর তোমরা জানতে পারবে কারা রয়েছে সরল পথে এবং কারা সৎপথ অবলম্বন করেছে।
এটা আল্লাহ তাআলার নিম্নের উক্তির মতইঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখন তারা শাস্তি অবলোকন করবে তখন কারা পথভ্রষ্ট তা তারা সত্বরই জানতে পারবে।” (২৫:৪২) মহান আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আগামী কল্য তারা জানবে, কে মিথ্যাবাদী, দাম্ভিক।”(৫৪:২৬)
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।