সূরা ত্ব-হা (আয়াত: 1)
হরকত ছাড়া:
طه ﴿١﴾
হরকত সহ:
طٰهٰ ۚ﴿۱﴾
উচ্চারণ: তা-হা-
আল বায়ান: ত্ব-হা
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১. ত্বা-হা,(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: ত্ব-হা-।
আহসানুল বায়ান: (১) ত্ব-হা-।
মুজিবুর রহমান: ত্ব-হা
ফযলুর রহমান: ত্বা হা [পবিত্র কোরআনে কোন কোন সূরার শুরুতে শব্দসংক্ষেপের আদলে সন্নিবেশিত এ জাতীয় বিচ্ছিন্ন হরফমালার প্রকৃত তাৎপর্য আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না]।
মুহিউদ্দিন খান: তোয়া-হা
জহুরুল হক: ত্বা, হা।
Sahih International: Ta, Ha.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১. ত্বা-হা,(১)
তাফসীর:
(১) ত্বা-হা শব্দটি হুরুফে মুকাত্তাআতের অন্তর্ভুক্ত। যেগুলো সম্পর্কে পূর্বেই বলা হয়েছে যে, এর প্রকৃত অর্থ মহান আল্লাহ্ই ভাল জানেন। তবে উম্মতের সত্যনিষ্ঠ আলেমগণ এর কিছু অর্থ বৰ্ণনা করেছেন। যেমন, হে মানব! অথবা হে পুরুষ। কাযী ইয়াদ বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতের সালাতে এক পায়ের উপর ভর করে কুরআন তেলাওয়াত করতেন। যা তার জন্য অনেক কষ্টের কারণ হয়ে পড়েছিল। ফলে এ সম্বোধনের মাধ্যমে বলা হচ্ছে যে, যমীনের সাথে মিশে থাকেন অর্থাৎ দু'পায়ের উপর ভর করে দাঁড়িয়ে অথবা বসে বসেও আপনি কুরআন তেলাওয়াত করতে পারেন। [ইবন কাসীর]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১) ত্ব-হা-।
তাফসীর:
-
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: নামকরণ:
এ সূরার প্রথম আয়াত হল طٰهٰ । طٰهٰ শব্দ অর্থাৎ প্রথম আয়াত অনুসারেই এ সূরার নামকরণ করা হয়েছে। সূরার শুরুতে কুরআন নাযিলের উদ্দেশ্য, তারপর মূসা (عليه السلام)-এর তুর পাহাড়ে আল্লাহ তা‘আলার সাথে কথা বলা, ফির‘আউনের কাছে দাওয়াত, হারূন (عليه السلام)-কে নবুওয়াত প্রদান, ফির‘আউনের জাদুকরদের মুকাবেলা করা ও জাদুকরদের ঈমান আনয়ন, সামিরী কর্তৃক প্রবর্তিত বানী ইসরাঈলের গো-বাছুর পূজার কাহিনী ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। সূরার শেষের দিকে যারা আল্লাহ তা‘আলার প্রতি ঈমান না এনে তাঁর যিকির থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, যারা আল্লাহ তা‘আলার সাথে শির্ক করে কিয়ামতের দিন তাদের কঠিন পরিণতি এবং নিজে সালাত আদায় ও পরিবারের সকলকে সালাত আদায়ের নির্দেশ প্রদান সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
১-৮ নং আয়াতের তাফসীর:
(طٰھٰ ) ‘ত্বা-হা-’ এ গুলো হচ্ছে “হুরূফুল মুক্বাত্বআত” বা বিচ্ছিন্ন অক্ষরসমূহ। এ সম্পর্কে সূরা বাক্বারার শুরুতে আলোচনা করা হয়েছে। এর আসল উদ্দেশ্য বা অর্থ একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই ভাল জানেন।
لِتَشْقٰٓي অর্থাৎ ও কুরআন নাযিল ও শরীয়ত প্রদান করার উদ্দেশ্য এটা নয় যে, তুমি কষ্ট পাও। বরং তা প্রদান করা হয়েছে যাতে এর মাধ্যমে সৌভাগ্য ও সফলতা অর্জন করতে পার। (তাফসীর সা‘দী)
পরের আয়াতে সুস্পষ্টভাবে বলে দেয়া হয়েছে যারা আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করে তারা যেন উপদেশ গ্রহণ করতে পারে এজন্য কুরআন নাযিল করা হয়েছে । যেমন আল্লাহ অন্যত্র বলেন:
(سَيَذَّكَّرُ مَنْ يَّخْشٰي وَيَتَجَنَّبُهَا الْأَشْقٰي)
“যে ভয় করে সে উপদেশ গ্রহণ করবে। আর তা উপেক্ষা করবে সে, যে নিতান্ত হতভাগ্য।” (সূরা আ‘লা ৮৭:১০-১১)
তাফসীর আযওয়াউল বায়ানে এ আয়াতের দু’টি তাফসীর উল্লেখ করা হয়েছে:
১. কাফির-মুশরিকরা ঈমান না আনার কারণে তুমি আফসোস ও দুশ্চিন্তা করবে, নিজেকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেবে এজন্য কুরআন নাযিল করিনি। এ দিকেই ইঙ্গিত করে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(فَلَعَلَّكَ بَاخِعٌ نَّفْسَكَ عَلٰٓي اٰثَارِهِمْ إِنْ لَّمْ يُؤْمِنُوْا بِهٰذَا الْحَدِيْثِ أَسَفًا )
“তারা এ হাদীসকে (কুরআনকে) বিশ্বাস না করলে সম্ভবত তাদের পেছনে ঘুরে তুমি দুঃখে নিজেকে ধ্বংস করে দেবে।” (সূরা কাহ্ফ ১৮:৬)
২. রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন রাত্রিকালে সালাত আদায় করতেন তখন তাঁর পদদ্বয় ফুলে যেত। উক্ত আয়াত নাযিল করে আল্লাহ তা‘আলা বললেন: ‘তুমি কষ্ট পাও এজন্য আমি তোমার প্রতি কুরআন অবতীর্ণ করিনি’।
(اَلرَّحْمٰنُ عَلَي الْعَرْشِ اسْتَوٰي)
‘দয়াময় ‘র্আশে সমুন্নত’ অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা স্বসত্তায় আরশে সমুন্নত যেভাবে তাঁর সত্তার জন্য উপযোগী। কিভাবে কিরূপে জানা নেই। যেমন ইমাম মালেক (রহঃ) বলেছেন:
الاستواء معلوم، والكَيْف مجهول ، والإِيمان به واجب، والسؤال عنه بدعة
আল্লাহ তা‘আলা আরশের ওপরে রয়েছেন তা জ্ঞাত, কিভাবে আছেন তা অজ্ঞাত, এ ব্যাপারে ঈমান রাখা ওয়াজিব, কোনরূপ প্রশ্ন করা বিদ‘আত। (সফওয়াতুত তাফাসীর ১/৪১৮)
এ সম্পর্কে সূরা আ‘রাফের ৫৪ নং আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন, তিনিই আকাশ-জমিন ও এতদুভয়ের মাঝে যা কিছু রয়েছে সব কিছুর মালিক, এমনকি মাটির নিচে যা কিছু আছে তারও তিনি মালিক। অর্থাৎ সব কিছুর সার্বভৌমত্বের মালিক একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা। তিনি মানুষের প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য, স্বশব্দ ও নীরবের সকল কথা শুনতে পান, এমনকি তাদের অন্তরে যে বাসনা জাগে তাও জানেন।
আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
(وَأَسِرُّوْا قَوْلَكُمْ أَوِ اجْهَرُوْا بِه۪ط إِنَّه عَلِيْمٌ بِذَاتِ الصُّدُوْرِ)
“তোমরা তোমাদের কথা চুপে চুপে বল অথবা উচ্চৈঃস্বরে বল: তিনি তো অন্তরযামী।” (সূরা মুলক ৬৭:১৩)
সুতরাং আল্লাহ তা‘আলা থেকে কোন কিছু আড়াল করা সম্ভব নয়। তাই তাঁকে ভয় করে সকল অন্যায় কাজ বর্জন করা উচিত।
(اَللّٰهُ لَآ إِلٰهَ إِلَّا هُوَ)
অর্থাৎ সকল প্রকার ইবাদত পাওয়ার যোগ্য একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা, তাঁর সুন্দর সুন্দর অনেক নাম রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
(هُوَ اللهُ الْخَالِقُ الْبَارِئُ الْمُصَوِّرُ لَهُ الْأَسْمَا۬ءُ الْحُسْنٰي)
“তিনিই আল্লাহ সৃজনকর্তা, উদ্ভাবনকর্তা, রূপদাতা, সকল উত্তম নাম তাঁরই।” (সূরা হাশর ৫৯:২৪)
আল্লাহ তা‘আলার এ সুন্দর নামসমূহ ৯৯টির মাঝে সীমাবদ্ধ নয়, বরং অসংখ্য যা আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া কেউ জানেনা। এ সম্পর্কে সূরা আ‘রাফের ১৮০ নং আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. কুরআন কাউকে কষ্ট বা সমস্যায় নিপতিত করার জন্য নাযিল করা হয়নি। বরং মানুষকে উপদেশ দান করার জন্য নাযিল হয়েছে।
২. আল্লাহ তা‘আলা আরশের ওপর সমুন্নত।
৩. আকাশ-জমিনসহ যা কিছু আছে সকল কিছুর মালিক একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা।
৪. আল্লাহ তা‘আলা মানুষের সকল বিষয় সম্পর্কে অবগত আছেন।
৫. আল্লাহ তা‘আলার সুন্দর সুন্দর নাম রয়েছে। ৬. আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত সত্য কোন উপাস্য নেই।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: এই সূরা মক্কায় অবতারিত। ইমামদের ইমাম হযরত মুহাম্মদ ইবনু ইসহাক ইবনু খুযাইমা (রাঃ) স্বীয় কিতাব ‘আতাওহীদ’ এ হাদীস এনেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলা হযরত আদমকে (আঃ) সৃষ্টি করার এক হাজার বছর পূর্বে সূরায়ে তা-হা ও সূরায়ে ইয়াসীন পাঠ করেন, যা শুনে ফেরেশতারা মন্তব্য করেনঃ “ঐ উম্মত বড়ই ভাগ্যবান যাদের উপর এই কালাম অবতীর্ণ হবে। নিশ্চয় ঐ ভাষা কল্যাণ ও বরকত প্রাপ্তির হকদার যা দ্বারা আল্লাহর কালামের এই শব্দগুলি আদায় করা হবে।” (এই রিওয়াইয়াতটি গারীব এবং এতে নাকারত বা অস্বীকৃতিও রয়েছে। এর কর্ণনাকারী ইবরাহীম ইবনু মুহাজির এবং তার শায়েখের সমালোচনা করা হয়েছে)
১-৮ নং আয়াতের তাফসীর:
সূরায়ে বাকারার প্রারম্ভে হুরূফে মুকাত্তাআ’র পূর্ণ তাফসীর গত হয়েছে। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন। তবে এটাও বর্ণিত আছে যে, এর অর্থ হচ্ছে ‘হে ব্যক্তি! এটা মুজাহিদ (রঃ), ইকরামা (রঃ), সাঈদ ইবনু জুবাইর (রঃ), আতা (রঃ), মুহাম্মদ ইবনু কাব (রঃ), আবু মালিক (রঃ), আতিয়্যা আওফী (রঃ), হাসান (রঃ), যহ্হাক (রঃ), সুদ্দী (রঃ) এবং ইবনু আবাযীর (রঃ) উক্তি। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) সাঈদ ইবনু জুবাইর (রঃ) এবং সাওরী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এটা নাতিয়া কালেমা। এর অর্থ হচ্ছে ‘হে লোকটি!' আবু সালেহ (রঃ) বলেন যে, এটা কালেমায়ে মুরাব।
হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, নবী (সঃ) যখন নামায পড়তেন তখন এক পায়ের উপর দাড়াতেন ও অপর পাটি উঠিয়ে রাখতেন। তখন আল্লাহ তাআলা এই আয়াত অবতীর্ণ করেন। অর্থাৎ হে নবী (সঃ)! তুমি দু'পায়ের উপরই দাড়াও। আমি তোমাকে কেশ দিবার জন্যে তোমার প্রতি কুরআন অবতীর্ণ করি নাই।
বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং তাঁর সাহাবীগণ যখন কুরআন কারীমের উপর আমল শুরু করে দেন তখন মুশরিকরা বলতে লাগেঃ “এই লোকগুলি তো বেশ বিপদে পড়ে গেছে।” তখন আল্লাহ তাআলা এই আয়াত অবতীর্ণ করে জানিয়ে দেন যে, কুরআন মানুষকে কষ্ট ও বিপদে ফেলার জন্যে অবতীর্ণ হয় নাই। বরং এটা সৎ লোকদের জন্যে শিক্ষনীয় বিষয়। এটা খোদায়ী জ্ঞান। যে এটা লাভ করেছে সে খুব বড় সম্পদ লাভ করেছে। যেমন হযরত মুআবিয়া (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ যার প্রতি কল্যাণের ইচ্ছা করেন তাকে তিনি বোধ শক্তি দান করেন। (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে)
হযরত সা'লাবা ইবনু হাকাম (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা যখন স্বীয় বান্দাদের মধ্যে ফায়সালার জন্যে কুরসীর উপর উপবেশন করবেন তখন তিনি আলেমদেরকে বলবেনঃ “আমি আমার ইলম ও হিকমত তোমাদেরকে এ জন্যেই দান করেছিলাম যে, তোমাদের পাপসমূহ আমি মার্জনা করে দেবো এবং তোমরা কি করেছে তার কোন পরওয়া করো না।” (এ হাদীসটি হাফিয আবুল কাসেম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
প্রথম দিকে লোকেরা আল্লাহর ইবাদত করার সময় নিজেদেরকে রশিতে লটকিয়ে দিতো। অতঃপর আল্লাহ তাআলা স্বীয় কালাম পাকের মাধ্যমে তাদের ঐ কষ্ট দূর করে দেন এবং বলেনঃ “এই কুরআন তোমাদেরকে কষ্ট ও বিপদের মধ্যে নিক্ষেপ করতে চায় না। যেমন তিনি এক জায়গায় বলেনঃ “যত সহজে পাঠ করা যায় সে ভাবেই তা পাঠ কর।” এ কুরআন কেশ ও কষ্টদায়ক জিনিস নয়। রং এটা হচ্ছে করুণা, জ্যোতি, দলীল এবং জান্নাত। এই কুরআন সৎ লোকদের জন্যে ও খোদাভীরু লোকদের জন্যে উপদেশ, হিদায়াত ও রহমত স্বরূপ। এটা শ্রবণ করে আল্লাহ তাআলার সৎ বান্দারাহারাম ও হালাল সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করে। ফলে তাদের উভয় জগত সুখময় হয়। হে নবী (সঃ)! এই কুরআন তোমার প্রতিপালকের কালাম এটা তারই পক্ষ হতে অবতারিত, যিনি সমস্ত কিছুর সৃষ্টিকর্তা, মালিক, আহার্যদাতা এবং ব্যাপক ক্ষমতাবান। যিনি যমীনকে নীচু ও ঘন করেছেন এবং আকাশকে করেছেন উঁচু ও সূক্ষ্ম।
জামে তিরমিযী প্রভৃতি বিশুদ্ধ হাদীস গ্রন্থে রয়েছে যে, প্রত্যেক আকাশের পুরুত্ব হচ্ছে পাঁচ শ’ বছরের পথ। আর এক আকাশ হতে অপর আকাশের ব্যবধানও হলো পাঁচ শ’ বছরের রাস্তা। ইমাম ইবনু আবি হাতিম (রঃ) হযরত আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসটি এই আয়াতের তাফসীরেই আনয়ন করেছেন।
ঐ দয়াময় আল্লাহ আরশের উপর সমাসীন রয়েছেন। এর পূর্ণ তাফসীর সূরায়ে আ’রাফে গত হয়েছে। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তির কোন দরকার নেই। নিরাপত্তাপূর্ণ পন্থা এটাই যে, আয়াত সমূহ ও হাদীস সমূহের সিফাতকে পূর্ব যুগীয় গুরুজনদের নীতি অনুসারেই ওগুলোর বাহ্যিক শব্দ হিসেবেই মানতে হবে।
সমস্ত জিনিস আল্লাহ তাআলার অধিকারে রয়েছে। সবই তার দখল, চাহিদা,ও ইচ্ছাধীন। তিনিই সবারই সৃষ্টিকর্তা, অধিকর্তা উপাস্য ও পালনকর্তা। কারো তার সাথে কোন প্রকারের কোন অংশ নেই। সপ্ত যমীনের নীচেও যা আছে তারও মালিক তিনিই।
হযরত কা'ব (রাঃ) বলেন যে, যমীনের নীচে আছে পানি, পানির নীচে আছে যমীন, আবার যমীনের নীচে আছে পানি। এভাবে ক্রমান্বয়ে চলে গেছে। তারপর এর নীচে একটি পাথর আছে। তার নীচে এক ফেরেশতা আছেন। তাঁর নীচে একটি মাছ আছে যার দুটি ডানা আশ পর্যন্ত চলে গেছে। তার নীচে আছে বায়ু ও অন্ধকার। মানুষের জ্ঞান এখান পর্যন্তই আছে। এরপর কি আছে না আছে তা একমাত্র আল্লাহ তাআলাই জানেন। হাদীসে রয়েছে যে, প্রতি দুই যমীনের মাঝে পঁাচ শ' বছরের পথের ব্যবধান রয়েছে। সর্বোপরি যমীনটি মাছের পিঠের উপর রয়েছে, যার দুটি ডানা আসমানের সাথে মিলিত আছে। এই মাছটি আছে একটি পাথরের উপর। ঐ পাথরটি ফেরেশতার হাতে আছে। দ্বিতীয় যমীনটি হলো বায়ুর ভাণ্ডার। তৃতীয় যমীনে আছে জাহান্নামের পাথর। চতুর্থ যমীনে জাহান্নামের গন্ধক রয়েছে। পঞ্চম যমীনে আছে জাহান্নামের সর্প। ষষ্ঠ যমীনে রয়েছে জাহান্নামী বৃশ্চিক বা বিচ্ছু। সপ্তম যমীনে আছে জাহান্নাম। সেখানে ইবলীস শৃংখলিত অবস্থায় আছে। তার একটি হাত আছে সামনে এবং একটি আছে পিছনে। আল্লাহ তাআ'লাই যখন ইচ্ছা করেন তখন তাকে ছেড়ে দেন। (এ হাদীসটি খুবই গরীব। এটা রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে বর্ণিত কিনা এ ব্যাপারেও চিন্তা ভাবনার অবকাশ রয়েছে)
হযরত জাবির ইবনু আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেনঃ “আমরা তাবুকের যুদ্ধ শেষে ফিরে আসছিলাম। কঠিন গরম পড়ছিল। দুজন দুজন এবং চারজন চারজন করে লোক বিচ্ছিন্ন ভাবে পথ চলছিলেন। আমি সৈন্যদের শুরুতে ছিলাম। অকস্মাৎ একজন আগন্তুক এসে সালাম করলেন এবং জিজ্ঞেস করলেনঃ “আপনাদের মধ্যে মুহাম্মদ (সঃ) কোন ব্যক্তি?” আমি তখন তার সঙ্গে চললাম। আমার সঙ্গী আগে বেড়ে গেল। যখন সেনাবাহিনীর মধ্যভাগ আসলো তখন দেখা গেল যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ দলেই রয়েছেন। আমি ঐ আগন্তুককে বললামঃ ইনি হলেন হযরত মুহাম্মদ (সঃ) তিনি লাল বর্ণের উস্ত্রীর উপর সওয়ার ছিলেন। রৌদ্রের কারণে তিনি মাথায় কাপড় বেঁধে ছিলেন। ঐ লোকটি তার সওয়ারীর কাছে গেলেন এবং ওর লাগাম ধরে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেনঃ “আপনিই কি মুহাম্মদ (সঃ)?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “হ্যাঁ” লোকটি তখন তাকে বললেনঃ “আমি এমন কতকগুলি প্রশ্ন করতে চাই যার উত্তর দুনিয়াবাসীদের দু একজন ছাড়া কেউ দিতে পারে না। তিনি বললেনঃ “ঠিক আছে, যা প্রশ্ন করতে চান করুন। আগন্তুক বললেনঃ “নবীগণ ঘুম যান কি?` উত্তরে নবী (সঃ) বললেনঃ “তাদের চক্ষু ঘুমায় বটে, কিন্তু তাঁদের অন্তর জাগ্রত থাকে। লোকটি বললেনঃ “আপনি সঠিক উত্তরই দিয়েছেন। তিনি আবার প্রশ্ন করলেনঃ “আচ্ছা বলুন তো, শিশু কখনো পিতার সাথে সাদৃশ্য যুক্ত হয় এবং কখনো মাতার সাথে হয়, এর কারণ কি?” তিনি জবাবে বলেনঃ“জেনে রাখুন যে, পুরুষ লোকের মণি বা বীর্য সাদা ও গাঢ় হয়। আর স্ত্রী লোকের বীর্য হয় পাতলা। যার বীর্য প্রাধান্য লাভ করে, শিশু তারই সাদৃশ্যযুক্ত হয়ে থাকে। লোকটি বলেনঃ “আপনার এ উত্তরও সঠিক হয়েছে। পুণরায় লোকটি বললেনঃ “আচ্ছা বলুনতো, শিশুর কোন কোন অঙ্গ পুরুষের বীর্য দ্বারা এবং কোন কোন অঙ্গ স্ত্রীর বীর্য দ্বারা গঠিত হয়?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “পুরুষের বীর্য দ্বারা অস্থি, শিরা এবং পাছা গঠিত হয়, আর স্ত্রীর বীর্য দ্বারা গঠিত হয় গোশত, রক্ত ও চল। লোকটি বললেনঃ “এটাও সঠিক উত্তর হয়েছে।” অতঃপর বলেনঃ “বলুন তো, এই যমীনের নীচে কি আছে?” তিনি বলেনঃ “একটি মাখলুক রয়েছে। লোকটি প্রশ্ন করেনঃ “তার নীচে কি আছে?” তিনি উত্তর দেনঃ “যমীন।” লোকটি জিজ্ঞেস করেনঃ “এর নীচে কি আছে?” তিনি জবাব দেনঃ “পানি। আবার লোকটি প্রশ্ন করেনঃ “পানির নীচে কি আছে?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “অন্ধকার।` লোকটি পুণরায় জিজ্ঞেস করেনঃ “এর নীচে কি আছেঃ” তিনি জবাব দেনঃ “বায়ু।” লোকটি প্রশ্ন করেনঃ “বায়ুর নীচে কি আছে?` তিনি জবাবে বলেনঃ “মাটি। লোকটি জিজ্ঞেস করেনঃ “তার নীচে কি আছে?` এবার রাসূলুল্লাহর (সঃ) চক্ষু দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। তিনি বলেনঃ “মানুষের জ্ঞান তো এখন পর্যন্ত পৌঁছেই শেষ হয়ে গেছে। এরপরে কি আছে তার জ্ঞান একমাত্র সৃষ্টিকর্তারই আছে। হে প্রশ্নকারী! এই ব্যাপারে আপনি যাকে প্রশ্ন করলেন তিনি আপনার চেয়ে তা বেশী জানে না।” আগন্তুক ব্যক্তি তার সত্যতার সাক্ষ্য প্রদান করলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “এটা কে তা তোমরা জান কি?` সাহাবীগণ বললেনঃ “আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই (সঃ) ভাল জানেন। তিনি বললেনঃ “ইনি হলেন হযরত জিবরাঈল (আঃ)।` (এ হাদীসটি মুসনাদে আবি ইয়ালাতে বর্ণিত হয়েছে। তবে হাদীসটি খুবই গরীব। ঘটনাটি বড়ই বিস্ময়কর। এর বর্ণনাকারীদের একজন কাসেম ইবনু আবদুর রহমান রয়েছেন। ইমাম ইয়াহইয়া ইবনু মুঈন (রঃ) তাকে দুর্বল বলেছেন। ইমাম আবু হাতিম রাযী (রঃ) তাকে দুর্বল বলেছেন। ইমাম ইবনু আদী (রঃ) বলেছেন যে, তিনি অপরিচিত লোক। তিনি এতে গড়বড় করে দিয়েছেন। তিনি এটা ইচ্ছা করেই করুন বা এভাবেই পেয়ে থাকুন)
আল্লাহ তিনিই যিনি প্রকাশ্য, গোপনীয়, উঁচু, নীচু, ছোট ও বড় সব কিছুই জানেন। যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “(হে নবী (সঃ)! তুমি বলে দাওঃ তিনিই এটা অবতীর্ণ করেছেন যিনি আসমান সমূহ ও যমীনের গোপন বিষয়ের খবর রাখেন। তিনি ক্ষমাশীল ও দয়ালু।”
ইবনু আদম যা কিছু গোপন করে এবং স্বয়ং তার উপর যা কিছু গোপন রয়েছে, তা সবই আল্লাহ তাআলার নিকট প্রকাশমান। তার আমলকে তার জানার পূর্বেও আল্লাহ জানেন। সমস্ত অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ মাখলুকের সম্পর্কে জ্ঞান তার কাছে এমনই যেমন একজন লোকের সম্পর্কে জ্ঞান। সমস্ত মাখলুকের সৃষ্টি এবং তাদেরকে মেরে পুনরুজ্জীবিত করাও তাঁর কাছে একটি মানুষকে সৃষ্টি করা এবং তার মৃত্যুর পর পুনরুজ্জীবিত করার মতই (সহজ)। মানুষের অন্তরের ধারণা ও কল্পনার খবরও তিনি রাখেন। মানুষ বড় জোর আজকের গোপন আমলের খবর রাখে। আর সে কাল কি গোপনীয় কাজ করবে সেই খবরও আল্লাহ তাআলা রাখেন। শুধু ইচ্ছা নয়, বরং কুমন্ত্রণাও তার কাছে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান। কৃতকর্ম এবং যে আমল সে পরে করবে সেটাও তাঁর কাছে প্রকাশমান। তিনি সত্য ও যোগ্য উপাস্য। সমস্ত উত্তম নাম তারই।
সূরায়ে আরাফের তাফসীরের শেষে (আরবী) সম্পর্কে হাদীস সমূহ গত হয়েছে। সুতরাং প্রশংসা ও শুকরিয়া আল্লাহরই জন্যে।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।